বিশেষ প্রতিবেদন: শহরের রাজপথ হোক বা পাড়ার অলিগলি—মাঝরাতেই হোক বা ভরদুপুরে, হঠাৎ এক বিকট শব্দে বুক কেঁপে ওঠে সাধারণ মানুষের। মনে হয় যেন কোনো বিস্ফোরণ ঘটল! আসলে তা নয়, এগুলো হলো কিছু অসচেতন বাইক আরোহীর মডিফাইড বা ‘ফাটা’ সাইলেন্সারের আওয়াজ। স্রেফ ‘সোয়্যাগ’ বা স্টাইল দেখানোর চক্করে এই বাইক আরোহীরা জনজীবন অতিষ্ঠ করে তুলছেন। কিন্তু আর নয়! এবার এই ধরনের ‘শব্দাসুর’দের বিরুদ্ধে কোমর বেঁধে নামছে পুলিশ ও প্রশাসন।
মডিফাইড সাইলেন্সার – কেন এই উন্মাদনা?
মূলত রয়্যাল এনফিল্ড (Bullet) বা বিভিন্ন স্পোর্টস বাইকের আসল সাইলেন্সার খুলে সেখানে লাগানো হচ্ছে ‘ফ্রি-ফ্লো’ বা ‘আফটার মার্কেট’ সাইলেন্সার। তরুণ প্রজন্মের একাংশের মধ্যে ধারণা যে, বাইকের আওয়াজ যত বেশি হবে, রাস্তা তত বেশি ‘অ্যাটেনশন’ পাওয়া যাবে। এক ধরণের বিকৃত মানসিকতা থেকে রাস্তায় সবার মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য তারা এই শব্দদূষণ করে থাকেন, যা আসলে তাদের ব্যক্তিত্বের নেতিবাচক দিকটিই প্রকাশ করে। কিন্তু এই ক্ষণিকের আনন্দ অন্যের জন্য কতটা যন্ত্রণাদায়ক, তা অনেকেই ভুলে যাচ্ছেন। তারা বুঝতে চান না বা পরোয়া করেন না যে তার এই ক্ষণিকের আনন্দ রাস্তার পাশের হাসপাতাল, স্কুল, বা বাড়িতে থাকা অসুস্থ মানুষ, শিশু ও বয়স্কদের জন্য কতটা স্বাস্থ্য ঝুঁকি।
জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব
চিকিৎসকদের মতে, এই উচ্চমাত্রার শব্দ কেবল বিরক্তির কারণ নয়, এটি স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ:
-
হৃদরোগীদের বিপদ: হঠাৎ বিকট শব্দে অ্যাড্রেনালিন রাশ হয়, রক্তচাপ বেড়ে যায়, হার্ট অ্যাটাক পর্যন্ত হতে পারে।
-
শিশু ও বয়স্কদের সমস্যা: শিশু ও বয়স্কদের শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
-
মানসিক চাপ: দীর্ঘক্ষণ এই শব্দদূষণের ফলে ঘুমের ব্যাঘাত, মানুষের মধ্যে খিটখিটে মেজাজ ও উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
আইন কী বলছে?
ভারতীয় মোটর ভেহিক্যাল অ্যাক্ট (Motor Vehicles Act) অনুযায়ী, কোনো যানবাহনের আসল গঠন পরিবর্তন করা বা পরিবেশের ক্ষতি করে এমন সাইলেন্সার লাগানো দণ্ডনীয় অপরাধ।
যখন পুলিশ হলো কঠোর
ঘটনা ১: সম্প্রতি বেঙ্গালুরুতে পুলিশ একটি বিশেষ অভিযান চালিয়ে প্রায় ১,০০০টি অবৈধ সাইলেন্সার জব্দ করে। মাঝরাস্তায় রোলার দিয়ে সেগুলো পিষে দেওয়া হয় যাতে অন্য বাইক আরোহীরা বার্তা পায়। ঘটনা ২: পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলাতেও এখন ট্রাফিক পুলিশ ‘ডেসিবেল মিটার’ দিয়ে বাইকের শব্দের মাত্রা পরীক্ষা করছে। নির্ধারিত মাত্রার (সাধারণত ৮০ ডেসিবেল) বেশি শব্দ হলেই স্পট ফাইন এবং সাইলেন্সার খোলার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।
সাধারণ মানুষের করণীয়
যদি আপনার এলাকায় নিয়মিত এমন বাইকের উপদ্রব দেখা যায়, তবে আপনি:
-
নিকটস্থ ট্রাফিক পুলিশ স্টেশনে অভিযোগ জানাতে পারেন।
-
বাইকের নম্বর প্লেটের ছবি বা ভিডিও করে পুলিশের সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে (Twitter/Facebook) ট্যাগ করতে পারেন।
-
পাড়ার ক্লাবে বা গেটেড কমিউনিটিতে এই বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে পারেন।
পরিশেষে: একজন প্রকৃত বাইকপ্রেমী কখনোই তার বাইকের শব্দের মাধ্যমে অন্যের বিরক্তির কারণ হন না। যারা সাইলেন্সার ফাটিয়ে বা মডিফাই করে রাস্তায় শব্দতান্ডব চালায়, তারা শুধু আইন ভাঙছে না, বরং নিজেদের সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং সচেতনতার অভাবকেই প্রকট করে তুলছে। এই শব্দ কোনো ‘গর্বের’ বিষয় নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ব্যাধি। রাস্তা সবার জন্য। আপনার শখ যেন অন্যের কষ্টের কারণ না হয়। ‘শব্দহীন’ সুস্থ সমাজ গড়তে ট্রাফিক আইন মেনে চলুন। মনে রাখবেন, স্টাইল বা গতি নয়, নিরাপদ এবং শান্তিপূর্ণ যাতায়াতই হোক একজন প্রকৃত বাইক রাইডারের পরিচয়।
#শব্দদূষণ #ট্রাফিকআইন #বাইকলাইফ #সতর্কবার্তা #কলকাতাপুলিশ #মোটরসাইকেল #পরিবেশরক্ষা #সাইলেন্সার #বাংলাখবর
#NoisePollution #ModifiedExhaust #TrafficRules #RoadSafety #MotorVehicleAct #BikeLife #PoliceAction #ViralNews #IndiaRoads
![]()






