বিশেষ প্রতিবেদন: মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় ও গা ছমছমে বস্তুর নাম ‘ব্ল্যাক হোল’ বা কৃষ্ণগহ্বর। সাধারণ ধারণানুসারে, ব্ল্যাক হোলের অভিকর্ষজ টান এতটাই প্রবল যে আলোসহ যেকোনো পদার্থ এর অদৃশ্য সীমানা ‘ইভেন্ট হরাইজন’ (Event Horizon) অতিক্রম করলে আর কখনোই ফিরে আসতে পারে না। কিন্তু ১৯৭৪ সালে বিশ্বখ্যাত তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং এক যুগান্তকারী ধারণা দেন—ব্ল্যাক হোল পুরোপুরি ‘কালো’ নয়। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার প্রভাবে এর ইভেন্ট হরাইজন থেকে অনবরত অত্যন্ত মৃদু কোয়ান্টাম তাপীয় বিকিরণ নির্গত হয়, যা হকিং রেডিয়েশন (Hawking Radiation) নামে পরিচিত।
মহাকাশের আসল ব্ল্যাক হোল থেকে নির্গত এই বিকিরণ মেপে দেখা একপ্রকার অসম্ভব, কারণ এর তাপমাত্রা মহাজাগতিক ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশনের চেয়েও অনেক কম। ফলে দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী ধরে হকিংয়ের এই তত্ত্ব কেবল গাণিতিক হিসাব-নিকাশেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে সম্প্রতি আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Amsterdam) থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স ইনস্টিটিউটের গবেষক লোট মার্টেনস (Lotte Mertens) এবং তাঁর আন্তর্জাতিক গবেষক দল সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়েছেন। তারা গাণিতিক ও কম্পিউটেশনাল মডেলে পরমাণুর চেইন (Atomic Chain) ব্যবহার করে একটি ‘অ্যানালগ বা সিন্থেটিক ব্ল্যাক হোল’ তৈরি করেছেন এবং হকিং রেডিয়েশনের গাণিতিক সত্যতা প্রমাণ করেছেন।
কীভাবে তৈরি হলো ল্যাবের ‘অ্যানালগ ব্ল্যাক হোল’?
মহাকাশে না গিয়ে ল্যাবরেটরি মডেলে মহাবিশ্বের জটিলতম ঘটনা পুনর্নির্মাণ করাই হলো এই গবেষণার মূল চালিকাশক্তি। গবেষকরা কোনো যন্ত্রপাতির ভৌত ইলেকট্রন প্রবাহের বদলে পরমাণুর একটি এক-মাত্রিক (1D) চেইনের গাণিতিক মডেল তৈরি করেন।
-
ইলেকট্রনিক হপিং অ্যাম্প্লিচিউড (Electronic Hopping Amplitude): এক পরমাণু থেকে অন্য পরমাণুতে ইলেকট্রনের লাফিয়ে চলার ক্ষমতা বা গতিবেগ পরিবর্তন করে স্থানকালের (Space-time) বক্রতা তৈরি করা হয়।
-
সিন্থেটিক ইভেন্ট হরাইজন: চেইনের একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে ইলেকট্রনের গতিকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, যা একটি কৃত্রিম ইভেন্ট হরাইজন বা অদৃশ্য সীমানা হিসেবে কাজ করে।
এই কাঠামোর মাধ্যমে যখন ইলেকট্রনের স্থানিক বৈশিষ্ট্য বা কোয়ান্টাম স্টেট পর্যবেক্ষণ করা হয়, তখন দেখা যায় যে কৃত্রিম ইভেন্ট হরাইজন পার হওয়ার সময় সেখানে একটি সুনির্দিষ্ট তাপীয় বিকিরণ বা থার্মাল স্পেকট্রাম তৈরি হচ্ছে।
গবেষণার মূল পর্যবেক্ষণ ও হকিং তত্ত্বের সুনির্দিষ্ট মিল
গবেষণাপত্রটিতে কৃত্রিম ইভেন্ট হরাইজনের তাপীয় আচরণ বিশ্লেষণ করে কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে:
Physical Review Research জার্নালে “Thermalization by a synthetic horizon” শিরোনামে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, সিমুলেশনে প্রাপ্ত বিকিরণের বর্ণালী ও তাপমাত্রা ঠিক ততটাই, যতটা স্টিফেন হকিং কোয়ান্টাম থার্মোডায়নামিকসের সাহায্যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।
কেন এটি পদার্থবিজ্ঞানে মাইলফলক?
পদার্থবিজ্ঞানের দুটি প্রধান স্তম্ভ হলো—সাধারণ আপেক্ষিকতা (General Relativity), যা বড় মহাজাগতিক বস্তু পরিচালনা করে এবং কোয়ান্টাম মেকানিক্স (Quantum Mechanics), যা ক্ষুদ্রতম পরমাণুর জগৎ চালনা করে। এই দুই বিপরীতধর্মী তত্ত্বকে এক সুতোয় বাঁধার নাম “কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি” (Quantum Gravity)।
-
মহাকাশের ব্ল্যাক হোল বনাম অ্যানালগ মডেল: মহাকাশের ব্ল্যাক হোল পর্যবেক্ষণ করতে আমাদের বহু আলোকবর্ষ দূরে টেলিস্কোপ তাক করতে হয়, যেখানে সিগন্যাল পাওয়া প্রায় অসম্ভব। কিন্তু আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অ্যানালগ মডেলটি প্রমাণ করেছে যে, স্থানকালের বক্রতা তৈরি করতে বিশাল ভরের নক্ষত্রের প্রয়োজন নেই; কোয়ান্টাম সিস্টেমের সঠিক বিন্যাসের মাধ্যমেও ব্ল্যাক হোলের তাপীয় বৈশিষ্ট্য তৈরি করা সম্ভব।
-
কোয়ান্টাম সিমুলেশনের ক্ষমতা: এই মডেল দেখিয়ে দিয়েছে যে, ল্যাবরেটরিতে কম্পিউটেশনাল কোয়ান্টাম সিমুলেটর ব্যবহার করে মহাবিশ্বের জটিলতম ভৌত ঘটনা সমাধান করা সম্ভব।
কঠোর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে এটি মহাকাশের ব্ল্যাক হোলের সরাসরি পর্যবেক্ষণ নয়, বরং একটি অকাট্য গাণিতিক ও কোয়ান্টাম যাচাইকরণ। এটি নিশ্চিত করে যে হকিং রেডিয়েশন কেবল একটি কাল্পনিক ধারণা নয়, বরং পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মে সুপ্রতিষ্ঠিত এক অনিবার্য বাস্তবতা।
#বিজ্ঞান #ব্ল্যাকহোল #স্টিফেনহকিং #মহাকাশবিজ্ঞান #পদার্থবিজ্ঞান #কোয়ান্টামমেকানিক্স #গবেষণা
#ScienceNews #BlackHole #HawkingRadiation #StephenHawking #QuantumPhysics #EventHorizon #PhysicsBreakthrough #TheoreticalPhysics
![]()




