বিশেষ প্রতিবেদন: ভারতের পরিবেশ দূষণের দুই প্রধান ভিলেন এখন আবাসন শিল্পের রক্ষাকর্তা। একদিকে ফসলের অবশিষ্টাংশ বা ‘পরালি’ পোড়ানোর ধোঁয়া, আর অন্যদিকে প্লাস্টিক বর্জ্যের স্তূপ—এই দুই অভিশাপকে আশীর্বাদে বদলে দিয়েছেন আইআইটি যোধপুরের (IIT Jodhpur) বিজ্ঞানীরা। তারা তৈরি করেছেন এমন এক ‘কার্বন-নেগেটিভ’ (Carbon-Negative) ইট, যা কেবল সস্তা নয়, পরিবেশবান্ধবও বটে।
সমস্যার পাহাড় যখন সমাধানের পথ দেখায়
প্রতি বছর ভারতে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন টন কৃষি বর্জ্য উৎপন্ন হয় এবং ৩.৫ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য জমা হয়। বিশেষ করে উত্তর ভারতে শীতকালে পরালি পোড়ানোর ফলে বায়ু দূষণ যে ভয়াবহ আকার ধারণ করে, তা সারা বিশ্বের উদ্বেগের কারণ। আইআইটি যোধপুরের বিজ্ঞানী প্রিয়ব্রত রাউতের নেতৃত্বে একটি দল এই সমস্যার এক অভিনব সমাধান খুঁজে বের করেছেন— বায়োব্রিক (Biobrick) এবং এগ্রো-প্লাস্টিক ব্লক (Agro-plastic Block)।
কীভাবে তৈরি হচ্ছে এই জাদুকরী ইট?
চিরাচরিত লাল ইট তৈরিতে প্রচুর পরিমাণে মাটি লাগে এবং তা ভাটায় ৯০০-১০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পোড়াতে হয়। এতে প্রচুর কার্বন নিঃসরণ হয়। কিন্তু বায়োব্রিকের পদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা:
-
উপাদান: ধান বা গমের খড়, আখের ছিবড়ে এবং চুনাপাথর ভিত্তিক বিশেষ বাইন্ডার।
-
পদ্ধতি: কৃষি বর্জ্যকে ছোট ছোট টুকরো করে ফাইবারে রূপান্তর করা হয়, এরপর বাইন্ডারের সাথে মিশিয়ে ছাঁচে ফেলে প্রাকৃতিক উপায়ে শুকানো হয়।
-
প্লাস্টিকের ব্যবহার: এগ্রো-প্লাস্টিক ব্লকে পরিত্যাক্ত প্লাস্টিককে গলিয়ে বাইন্ডার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, ফলে প্লাস্টিক বর্জ্যের স্থায়ী নিষ্পত্তি ঘটে।
কেন একে ‘কার্বন-নেগেটিভ’ বলা হচ্ছে?
সাধারণ ইট তৈরিতে যে পরিমাণ কার্বন বায়ুমণ্ডলে মেশে, এই বায়োব্রিক তার উল্টো কাজ করে। ১. গাছ বা শস্য বড় হওয়ার সময় বায়ুমণ্ডল থেকে যে কার্বন শোষণ করে, তা এই ইটের ভেতরে চিরস্থায়ীভাবে ‘লক’ হয়ে যায়। ২. এতে ব্যবহৃত চুনাপাথর বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে ধীরে ধীরে পাথরে পরিণত হয়। অর্থাৎ, এই ইট তৈরিতে যতটা কার্বন নির্গত হয়, তার চেয়ে বেশি কার্বন এটি পরিবেশ থেকে কমিয়ে দেয়।
বাড়ির জন্য এর উপকারিতা:
বিজ্ঞানীদের মতে, এই ইটের ব্যবহার বাড়ির বাসিন্দাদের জন্যও লাভজনক:
-
থার্মাল ইনসুলেশন: এই ইট তাপ কুপরিবাহী। ফলে এই ইটের তৈরি বাড়ি গরমকালে ঠান্ডা এবং শীতকালে গরম থাকে। এটি এসি বা হিটারের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।
-
শব্দ নিরোধক: বাইরের গোলমাল ঘরের ভেতর কম পৌঁছায়।
-
হালকা ওজন: সাধারণ ইটের তুলনায় এটি হালকা হওয়ায় যাতায়াত খরচ কম এবং ভূমিকম্পের ঝুঁকিও কমায়।
গবেষণাগার থেকে বাস্তব জমিতে
আইআইটি যোধপুর ক্যাম্পাসে ইতিমধ্যেই এই বায়োব্রিক দিয়ে একটি পরীক্ষামূলক কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা দেখছেন যে ভারতের আর্দ্রতা ও তাপমাত্রায় এই ইটের স্থায়িত্ব কেমন। কৃষকদের জন্য এটি এক নতুন আয়ের উৎস হতে পারে, কারণ তারা এখন পরালি না পুড়িয়ে তা আইআইটি বা সংশ্লিষ্ট শিল্প সংস্থাকে বিক্রি করতে পারবেন।
পরিশেষে
‘ওয়েস্ট টু ওয়েলথ’ (Waste to Wealth) বা বর্জ্য থেকে সম্পদ তৈরির এই ভারতীয় প্রযুক্তি আগামী দিনে নির্মাণ শিল্পে গেম-চেঞ্জার হতে চলেছে। সরকার ও শিল্প মহল যদি হাত মেলায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে মধ্যবিত্তের সস্তার বাড়ির স্বপ্নও পূরণ হবে, আর পৃথিবীও শ্বাস নেবে দূষণমুক্ত নির্মল বাতাসে।
#পরিবেশ_বান্ধব #আইআইটি_যোধপুর #বায়োব্রিক #পরালি_দূষণ #গৃহ_নির্মাণ #বিজ্ঞান_প্রযুক্তি #ইকো_ফ্রেন্ডলি #নতুন_আবিষ্কার #বর্জ্য_থেকে_সম্পদ
#Biobricks #IITJodhpur #SustainableConstruction #WasteToWealth #EcoFriendlyHome #CarbonNegative #GreenTechnology #PlasticWasteManagement #AgricultureInnovation #ClimateChangeIndia
![]()






