পরিত্যক্ত ভূতুড়ে ট্রেন স্টেশন
বাসুদেব দাশ
শীতটা বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে এবার । এরকম শীত বহু বছর পরে না । এই রকম শীত আমাদের ছোট বেলায় পড়তো। দশ পনেরো বছরের মধ্যে এরকম শীত পড়তে দেখা যায় নি। একটু অন্ধকার বাড়তেই পথ ঘাট সব জন শূন্য হয়ে যায় । বাজার ঘাট দোকান পাট সব খাঁ খাঁ করছে। একটাও খরিদ্দার নেই। নিস্তব্ধ পরিবেশে টু শব্দ পর্যন্ত শোনা যাচ্ছে না। শীতের জন্য অন্ধকারের ঘনত্ব একটু বেশি মনে হচ্ছে। অন্ধকার যেন ঘিরে ধরেছে সম্পূর্ণ পাড়াটাকে। তারা শঙ্কর বাইরের সব কাজ সেরে তাড়াতাড়ি বাড়ী ফিরে এসেছে। আরাম কেদারায় বসে তারা শঙ্কর সবে চায়ের কাপে চুমুক দিয়েছে মাত্র এমনি ডোর বেল বাজার শব্দ হয় । স্ত্রী মধুবালা দরজা খুলে দেখে হাবু কাবু আর গবু চাদর গায় দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দরজার বাইরে । তারা শঙ্কর ডাক দিতেই ওরা তিন জন ভিতরে ঢুকে সোফায় হেলান দিয়ে বসে পরে হাত পা গুটিয়ে। মধু বালা আরও তিন কাপ চা এনে দিয়ে যায়। তারপর আম একটা বাটিতে করে আমতেল দিয়ে মুড়ি মেখে দিয়ে যায়। চা মুড়ি খাওয়া হলে তারা শঙ্কর আয়েস করে একটা বিড়ি ধরায়। বিড়িটায় শেষ টান মেরে তারা শঙ্কর বলে আজ তোদের একটা পরিত্যক্ত রেল স্টেশনের মধ্যে ভূতের আড্ডা কিভাবে জমে উঠেছিল সেই গল্প বলবো।
দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর পোল্যান্ডের অনেক গুলো অঞ্চল জার্মান দখল মুক্ত হয়ে পোল্যান্ডের অধীনে ফিরে আসে। বিশেষ করে লোয়ার সাইলেসিয়া অঞ্চল। সেই সময় জার্মান জনগণ এই সব অঞ্চল থেকে বসবাস গুটিয়ে জার্মানিতে চলে যায়। তারফলে পোল্যান্ডের এই সব অঞ্চল গুলো জন্যশূন্য হয়ে দীর্ঘ দিন ফাঁকা পরে থাকে। এই জায়গা গুলো আজ এক নীরব ভুতুড়ে পরিবেশ সৃষ্টি করে দাঁড়িয়ে আছে সময়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে । জন কোলাহল পূর্ণ রেল স্টেশন আজ নিস্তব্ধ রেল স্টেশন আর মাইলের পর মাইলের রেল লাইন পরে আছে কালের নীরব সাক্ষী হয়ে। এই সব স্টেশন থেকে আর কোন ট্রেন ছাড়ে না। তাই লোকজনের ব্যস্ততাও আর নেই। অসংখ্য পরিত্যক্ত ট্রেন ও স্টেশন অসহায় ভাবে সময়ের কাছে হার মেনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে। সেই সময় মানুষের স্রোত সমুদ্রের ঢেউয়ের মত চলতে থাকতো দিন রাত বিরামহীন ভাবে। এই স্টেশন গুলো আজ কালের ভার বহন করতে না পেরে ঝরঝরে হয়ে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যেতে চাইছে । প্রকৃতিও যেন তার নিজের জমি নিজে ফিরিয়ে নিয়ে শান্তি পেতে চাইছে । ঝোপ ঝাড় লতা গুলমো দিয়ে প্রকৃতি এই পরিত্যক্ত রেল স্টেশন গুলোকে ঘিরে ধরেছে চারি দিক থেকে। সেই ব্যস্ত রেল স্টেশনে আজ মানুষের প্রবেশ করা দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে রেল ব্রিজ গুলোর উপর দিয়ে এক সময় যাত্রী বাহী ট্রেন ও মাল গাড়ি অসীমিত ভার নিয়ে দুরন্ত গতিতে ছুটে চলতো আজ তা স্পন্দন হীন লোহার কাঠামো মাত্র।মানুষের জীবনের খবর নিয়ে যে রেল একদিন মাইলের পর মাইল পারি দিত শব্দের গতিতে আজ তা নিথর দেহ মাত্র। ঝমঝম আওয়াজ করে মানুষের কানে তালা লাগিয়ে দিত যে রেল তাঁরা আজ নীরব ভুতুড়ে স্মৃতি স্তম্ভ হয়ে ঘুমিয়ে আছে আছে অরণ্যের গভীরে । হারিয়ে যাওয়া সময়ের কঙ্কাল যেন যৌবন কালের কোলাহল মুখর সময়ের প্রতিধ্বনির স্মৃতি জাগিয়ে তুলছে চাইছে মানুষের মনে । মনে করিয়ে দিতে চায় সেই সময়কার জন সমুদ্রের কোলাহল। সারা দিন মানুষের ঢল নামতো আজকের এই পরিত্যক্ত স্টেশনে। তারপর আস্তে আস্তে ইতিহাসের পাতার ভাঁজে চাপা পরে গেছে।
এতো শক্ত ভীত, অসাধারণ প্রকৌশল ও অনন্য স্থাপত্য হওয়া সত্তেও কি অদ্ভুত ভাবে পরিত্যক্ত হয়ে গেলো এই স্টেশন গুলো । এর পিছনে লুকিয়ে আছে পোল্যান্ডের রাজনীতি, সীমান্ত পুনর গঠন ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের দীর্ঘ ইতিহাস। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর পোল্যান্ডের ভূরাজনীতির মানচিত্র পুরোপুরি পাল্টে যায়। জার্মান নাগরিকরা পোল্যান্ড ছেড়ে তাদের নিজেদের দেশ জার্মানিতে ফিরে যায়। পোল্যান্ডে তারপর নতুন জন বিন্যাস হয়। পরিত্যক্ত জন শূন্য জায়গায় পুরানো রেল লাইন ও স্টেশন গুলো অপ্রয়োজনীয় হয়ে পরে প্যাসেঞ্জারের অভাবে । জন বিন্যাস অনুযায়ী নতুন লাইন ও স্টেশন নির্মাণ করতে পোল্যান্ড সরকারকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে । তার ফলে পুরানো অপ্রয়োজনীয় স্টেশন গুলো মেরামত করার জন্য মারাত্মক আর্থিক সংকট দেয়া দেয় । ৯০ দশকে পোল্যান্ডে কমিউনিজম সরকারের পরিবর্তন হয়ে যায়। তারপর মুক্ত বাজার অর্থনীতি চালু হয়। একে একে নানা কারণে পোল্যান্ডের শত শত রেল স্টেশন তাদের গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। এক রাতের মধ্যে এই সব পলি স্টেট রেল ওয়েজ ও স্টেশন গুলো বন্ধ হয়ে যায়। তারপর থেকে এই পরিত্যক্ত স্টেশন গুলোতে ভূতের আড্ডা জমতে থাকে রোজ রাতে ।ইতিহাসের পাতার ভাঁজে ভাঁজে অনেক গল্প আছে যা মানুষকে কখনো কাঁদিয়েছে আবার কখনো শিহরিত করেছে। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় স্থান পায়নি এমন অনেক গল্প আছে যা অতি পৈশাচিক ও ভয়ঙ্কর হিংস্র সেই গল্প গুলো মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে যুগ যুগ ধরে। লোয়ার সাইলেসিয়া অঞ্চলের এই রকমই একটা পরিত্যক্ত স্টেশনের ভূতের গল্প আজ বলবো তোদের। শোন…..
অ্যালবার্ট পেট্রা ঘুরতে ঘুরতে ঐ রকম একটা পরিত্যক্ত রেল স্টেশনে এসে পড়েছে। এই অঞ্চল বা স্টেশনটার বিষয়ে সে কিছু জানে না বা কোন দিন কিছু শোনেনি। পথ চিনতে না পেরে ভুল করে বন জঙ্গল ঘেরা এই স্টেশনে ঢুকে পড়েছে। কিভাবে যে এসে পড়েছে সেটা সে কিছু বুঝতে পারছে না। এখান থেকে বের হবার পথও সে জানে না। এই জঙ্গলের মধ্যে এ রকম বিরাট বড় একটা রেল স্টেশন পরিত্যক্ত অবস্থায় পরে আছে কেন সেটা তার কাছে অদ্ভুত লাগছে। একটা স্টেশনে যা যা থাকে সবই আছে এখানে। টিকিট কাউন্টার, রিজারভেশন কাউন্টার, মাল বুকিং কাউন্টার, স্টেশন মাস্টারের ঘর আরও কতক গুলো ঘর সারি সারি ফাঁকা পরে আছে। লতা পাতা গাছ গড়ান আগাছায় ভর্তি হয়ে আছে । সূর্যের আলো ভালো করে ঢুকতে না পাড়ায় দিনের বেলাতেও আবছা অন্ধকার হয়ে আছে গোটা স্টেশন চত্তরটা। ঝিঁঝিঁ পোকার কনসার্ট বেজে চলেছে সারাক্ষণ । শিয়ালও এখানে আছে বলে তার মনে হয়। মাঝে মাঝে চিৎকার শোনা যাচ্ছে। তা থেকে বোঝা যায় যে শিয়াল ডাকছে। তবে সাপ কোপের দেখা এখনো পাওয়া যায় নি। কোথাও কোথাও অন্ধকার এত বেশি যে মনে হয় কেউ যেন মোটা কালো পর্দা টাঙিয়ে রেখেছে। জঙ্গল ঘেরা স্টেশনের মধ্যে অনেক পথ হাঁটার পরও কোন একজন মানুষের সাথে তার দেখা হলো না। যত দূর চোখ যায় স্থানটা পুরোপুরি জন মানবহীন বলেই মনে হয় । লোকালয় আছে বলে তার পরিচয় এখনো পাওয়া যায় নি । ঘর বাড়ী দোকান পাটের কোন চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। তবে চারি দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে অসংখ্য রেলের বগির কঙ্কাল আর ভাঙা চোরা রেল লাইন। স্টেশনের এক পাশে আছে একটা বড় পুকুর।যার জল দিয়া রেলের বগি গুলোকে এক সময় ধোঁয়ান হতো। পুকুরটাকে ঘিরে রয়েছে অনেক বড় বড় বৃক্ষ রাজি ও লতা গুলমো জাতীয় ঝোপ ঝাড় । তার মধ্যে হয়তো বাসা বেঁধেছে সাপ কোপ জাতীয় বন্য প্রাণী। এখানকার গাছ গুলোতে প্রচুর পাখি আছে । দিনের শেষে পাখিরা বাসায় ফিরে চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে। বেশ কিছুটা হাঁটার পরও কোন মানুষের সাক্ষাৎ না পেয়ে আলবার্টের মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিতে থাকে । একটু একটু ভয়ও লাগে । দিনের আলো দূরে সরে সরে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে রাতের কালো ছায়া নেমে এসে স্টেশনটাকে গিলে নিচ্ছে একটু একটু করে । স্টেশনের পেটের ভিতরে থাকা সব কিছুই চাপা পরে যাচ্ছে অন্ধকারে। সময় যত গড়াচ্ছে অন্ধকারের ঘনত্ব তত বেড়ে যাচ্ছে । আবছা হয়ে আসছে স্টেশনের ভিতরটা। এক সময় গভীর অন্ধকার নেমে আসে পুরো স্টেশন জুড়ে। কোথাও প্রদীপ বা ইলেকট্রিকের আলো জ্বলছে না। কেমন একটা গা ছমছমে ভাব। এমন সময় অ্যালবার্ট দেখতে পায় যে তার সামনে পুকুরের দিক থেকে কে একজন মধ্য বয়স্ক লোক তার দিয়ে হেঁটে আসছে । লোকটাকে দেখে অ্যালবার্ট প্রথমে চমকে যায় এবং ভয়ে তার বুকটা কেঁপে ওঠে । তারপর লোকটা যখন ওকে জিজ্ঞেস করে যে তুমি কে বাবা ? আর এখানে কেনো এসেছো ? লোকটার এই রকম সহানুভূতি সুলভ কথা শুনে অ্যালবার্ট একটু স্বস্তি বোধ করে এবং তার ভয়টাও দূর হয়ে যায় । অ্যালবার্ট বলে , “কাকা বাবু আমার নাম অ্যালবার্ট পেট্রা। আমি পথ চিনতে না পেরে ভুল করে এখানে এসে পড়েছি। কি করে এখান থেকে বের হয়ে যাবো তা বুঝতে পারছি না।” মধ্য বয়স্কটি বলে “বাবা তুমি তো ভুল জায়গায় এসে পড়েছো। আর এখানে যে একবার আসে সে আর এখান থেকে বের হয়ে যেতে পারে না।” বৃদ্ধর এই কথা শুনে অ্যালবার্টের গায়ের লোম খাঁড়া হয়ে যায়। হৃৎপিণ্ড ধুকপুক করতে থাকে। অ্যালবার্ট বলে “কেনো কাকা বাবু ?” কাকা বাবু… সে অনেক কথা। পরে একদিন সময় করে বলবো। আর এখন তো রাত হয়ে গেছে সুতরাং আজ আর তুমি এখান থেকে কোথাও যেতে পারবে না। আজকে এখানেই থেকে যেতে হবে তোমাকে । সবে মাত্র সন্ধ্যা সাত টা বাজে তাতেই মনে হচ্ছে রাত বারো টা বেজে গেছে । নিশুতি রাত। একেবারে নিঝুম পুরী। অ্যালবার্ট জিজ্ঞেস করে কাকা বাবু আমি থাকবো কোথায় ? ঐ যে স্টেশনের বাতি ঘরটা দেখতে পাচ্ছ তুমি ওখানেই থাকবে। ওখানে আমার মেয়ে “রোজ ” আছে তুমি গিয়ে ওকে বলো যে তোমার বাবা “থার্মাল “পাঠিয়েছে। ব্যস ও সব ব্যবস্থা করে দেখে। তোমার কোন ভয় নেই। এখানে তোমার আতিথিয়তার কোন অভাব হবে না।
অ্যালবার্ট স্টেশনের বাতি ঘরে গিয়ে দেখে কুড়ি বাইশ বছরের একটি মেয়ে লোহার রেলিং এ হেলান দিয়ে আরাম করে বসে আছে। ওর গায়ের রং পুরো সাদা। মাথার চুলও সাদা। অ্যালবার্ট মেয়েটিকে নিজের পরিচয় দিয়ে বলে আমি “অ্যালবার্ট “, আর তুমি ? মেয়েটি… আমি “রোজ “। কিন্তু তুমি এখানে ? অ্যালবার্ট… আমাকে তোমার বাবা তোমার কাছে পাঠিয়েছেন। আজকের রাতটা এখানে থাকার ব্যবস্থা করে দেবার জন্য। মেয়েটি ও আচ্ছা বলে তাকে সাদরে আমন্ত্রণ করে ঘরে নিয়ে গিয়ে বসায়। বলে দেখো অচেনা অজানা জায়গা তাই হুটহাট করে কোথায়ও চলে যেও না যেন। বিপদ হতে পারে। ঘরটা অন্ধকার। ভালো করে কিছু দেখতে পাওয়া যায় না। মেয়েটার গায়ের রং সাদা বলে ওকে দেখতে পাওয়া গেছে । অ্যালবার্ট… ঘরে আলো জ্বালোনি কেনো ? রোজ (মেয়েটি )… আমাদের আলো লাগে না। অন্ধকারে দেখে দেখে অভ্যস হয়ে গেছে । আমরা অন্ধকারে সব কিছুই দেখতে পাই। অ্যালবার্ট রোজের কথা শুনে ঘাবড়ে যায়। একটা শিহরণ খেলে যায় তার সারা শরীরে। অ্যালবার্ট…কিন্তু আমি দেখবো কেমন করে ? রোজ ..তোমার দেখার জন্য আলোর ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। রোজ একটা পাত্র থেকে কিছুটা চর্বি এনে মাটির সরার উপর রেখে ফুঁ দিয়ে আলো জ্বালিয়ে দিল। এবার অ্যালবার্টের মুখে স্বস্তি ফিরে এলো। কিন্তু একটু ভয়ও হলো ফুঁ দিয়ে আলো জ্বালানো দেখে । ওঁদের ব্যবহার ভীষণ মমতাময় যা ভাবা যায় না। মাঝে মাঝে অ্যালবার্টের মনে সন্দেহ হয় যে ভালো ব্যবহার দিয়ে বস করে শেষে বধ করে না দেয়। এই কথা মনে হতে অ্যালবার্টের মুখটা থমথমে হয়ে যায়। রোজ বলে তুমি কি আমাকে ভয় পাচ্ছ ? অ্যালবার্ট… জানি না। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না যে তোমাদের ভয় পাবো না কি স্বস্তি পাবো। রোজ ..দেখো আমরা কারো ক্ষতি করি না। তুমি ভয় পেয়ো না। এখন বল তুমি কি খাবে ? অ্যালবার্ট… এখানে আমার পছন্দের খাবার তুমি পাবে কোথায় ? রোজ .. তুমি বলো, এখানে সব পাওয়া যাবে। অ্যালবার্ট… তোমাকে যত দেখছি ততই অবাক হচ্ছি। মনে হচ্ছে তুমি কল্প তরু। রোজ …না,আমি ঐ সব কিছু না। আমাদের একটা পাওয়ার (power )
আছে সেটা দিয়ে আমরা যা চাই তাই করতে পারি। অ্যালবার্ট… ঠিক আছে, আমি গন্ধরাজ মোমো খেতে চাই। রোজ নিমেষের মধ্যে গন্ধরাজ মোমো এনে দিল। অ্যালবার্ট দেখে অবাক হয়ে গেলো। রোজ ..অ্যালবার্ট তুমি খেতে বস আমি তোমার খাবার পরিবেশন করে দিচ্ছি। অ্যালবার্ট খেতে বসে যায়। কি ভালো স্বাদ গন্ধরাজ মোমোর । চমৎকার রান্না। মুখে লেগে থাকার মত। অ্যালবার্ট…রোজ তুমি খাবে না। রোজ … আমাদের খেতে লাগে না। আমাদের খিদা তৃষ্ণা কিছু নেই। অ্যালবার্ট… তাহলে তুমি বেঁচে আছো কেমন করে ? রোজ …জানি না আমি বেঁচে আছি না মরে আছি । আমার প্রাণ আছে কিনা সেটাও আমি জানি না। অ্যালবার্ট..,. তবে কি তুমি অতি প্রাকৃতিক ? রোজ …তা বলতে পারবো না। তুমি আমাকে অতি প্রাকৃতিক বা অশরীরী যা খুশি বলতে পার তাতে কোন অসুবিধা নেই। রোজের মুখে এই কথা শুনে অ্যালবার্টের হৃৎপিণ্ডটা মোচড় দিয়ে ওঠে। শিরদাঁড়া দিয়ে এক পশলা শীতল বায়ু বয়ে যায়। শরীর ঠান্ডা হয়ে আসে।
অ্যালবার্ট…রোজ এখানে তুমি আর তোমার বাবা ছাড়া তো আর কারোকে আমি দেখতে পাচ্ছি না। তোমার মা কোথায় ? হঠাৎ রোজের বাবা এসে ঘরে ঢোকে। অ্যালবার্টের কথাটা শুনতে পেয়ে রোজের বাবা বলেন…সে এক মর্মান্তিক কাহিনী বাবা। একবার এক অমাবস্যার রাতে রোজের মা “হেলেনা ” পুকুরে ডুব দিয়ে স্নান করার জন্য জলে নামে । জলে নেমে ডুব দিয়ে সে আর জলের উপরে ওঠে আসে নি। জলের তলায় কোথায় হারিয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজি হয়। ডুবুরি এনে সারা পুকুরে তন্ন তন্ন করে তল্লাশি চালানো হয় কিন্তু তাকে আর পাওয়া যায় নি। এক সপ্তাহ বাদে হেলেনার কঙ্কাল পুকুর পারে পরে থাকতে দেখা যায়। মুখটা তখনও চেনা যাবার মত অবস্থায় ছিল। শরীরের জায়গায় জায়গায় মাংস পেশী হাড়ের সঙ্গে লেগে ছিল। সারা শরীর থেকে মাংস যেভাবে খুবলে খেয়েছে সেটা এক নৃশংস দানবীয় কাজ ছাড়া আর কিছুই না। বিরল তমো এক নিষ্ঠুর ঘটনা। কে বা কারা তাকে টেনে নিয়ে গেলো, খুন করলো আর কেনোই বা খুন করলো তার কিছুই জানতে পারলাম না। সেটা রহস্য আবৃত হয়েই রয়ে গেলো। মেয়েটা তখন কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল “বাবা আমরা আর এখানে থাকবো না, চলো আমরা অন্য কোথাও চলে যাই।” সেই তখন থেকে মেয়েটা মা হারা। তখন ওঁর বয়স কত আর হবে। পাঁচ বছর কি ছয় বছর হবে। তারপর থেকে আমি যত বারই এই স্টেশন চত্তর থেকে বেরিয়ে যেতে চেষ্টা করেছি তত বারই বাঁধার সম্মুখীন হয়ে আবার এখানে ফিরে এসেছি। প্রত্যেক বার হেলেনা এসে আমার পথ আগলে দাঁড়াতো। বলতো, “আমাকে এখানে একা ফেলে রেখে কোথায় যাচ্ছ। আমাকে ফেলে রেখে যেতে পারবে না। তোমরা এখানেই থাকো। তবু তো আমি প্রতি অমাবস্যার রাতে তোমাদের দেখতে পাই। এটুকুই আমার শান্তি। ” এরপর প্রতি আমাবস্যার রাতে আমি পুকুর ঘাটে গিয়ে হেলেনার সঙ্গে দেখা করে আসি। তাই এই স্টেশন ছেড়ে আমাদের আর কোথাও যাওয়া হয় নি। মেয়েটা এখানে থাকতে না চাইলোও ওকে ওঁর মায়ের কথা বলে ভুলিয়ে রেখেছি। ঠিক তখন থেকেই এক প্রকার বন্ধি হয়ে আমরা এখানে থেকে যেতে বাধ্য হয়েছ।
একবার এক আমাবস্যার রাতে আমি বাড়ী ছিলাম না। মেয়েটা একা একা পুকুর ঘাটে গিয়েছিলো মায়ের সঙ্গে দেখা করতে। তখন পা পিছলে পরে যায়। সারা রাত ঐভাবে ঘাটে পরে ছিল। সকাল বেলা আমি বাড়ী এসে দেখি মেয়েটা ঘরে নেই। আমি দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে পুকুর ঘাটে গিয়ে দেখি মেয়েটা ঘাটে পরে আছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটাকে তুলে নিয়ে হাসপাতালে যাই। ডাক্তার বাবু পরীক্ষা করে দেখে বলেন যে মেয়ে আর আমাদের মধ্যে নেই। ওঁ না ফেরার দেশে চলে গেছে।আকাশ বাতাস কাঁপানো চিৎকার বের হতে গিয়ে হয়তো ওঁর বুকের মধ্যে আটকে গিয়ে হার্ট অ্যাটাক হয়ে মারা গেছে।অ্যালবার্ট…তাহলে ও কে ? থার্মাল বলে তার কয়েক দিন বাদে এক দিন দেখি রোজ ঘরে শুয়ে আছে। তারপর থেকে ও এখানে এই ভাবে আছে। আমি কিছু জানতে চাইনি কারণ তবুও তো আমি মেয়েটাকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি। অ্যালবার্টের মনে পরে যায় যে বাতি ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে তার শরীরটা কেমন ভারী ভারী লেগেছিল। এখন মনে হচ্ছে অতি প্রাকৃতিক শক্তির অবস্থানের কারণেই হয়তো অমুন হয়েছিল।
থার্মাল তার মেয়ে রোজকে ডাক দিয়ে বলে, অ্যালবার্টের শোবার জন্য বিছানা পেতে দিতে। এই বলে থার্মাল অন্ধকারের মধ্যে কোথায় মিলিয়ে যায়। অ্যালবার্ট কিছু বুঝতে পারে না। একদম ঘুটঘুটে অন্ধকার। রাত সারে আটটাতেই যেন গভীর,নিঝুম রাত। রোজ বাবার কথা মত জরাজীর্ণ ছেড়া ফাঁটা কাঁথা কম্বল দিয়ে একটা তক্তপোষের উপর অ্যালবার্টের জন্য বিছানা পেতে ওকে শুতে ডাক দেয়। অ্যালবার্ট বলে যে রোজ তুমি কোথায় শোবে ? রোজ , আমি ঐ বারান্দায় মেঝের উপর শুয়ে পড়বো। অ্যালবার্ট বলে না, আমি একটা ছেলে হয়ে খাটে শোবো আর তুমি মেয়ে হয়ে শীতের মধ্যে মেঝেতে শোবে এটা ঠিক না। রোজ , না না আমাদের ঠান্ডা গরম কিছু হুঁশ হয় না। নিপার মুখে এই কথা শুনে অ্যালবার্টের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যায়। শীতের রাতে গা ঘামিয়ে ভিজে যায়। রোজের এই কথা অ্যালবার্টের বুকে শিলের মত বেঁধে । অ্যালবার্ট রোজকে জিজ্ঞেস করে যে কাকা বাবু কোথায় গেলেন ? রোজ থমথমে মুখে ভয়ার্ত স্বরে বলে যে পুকুরের ঘাটে। বাবা সারা রাত ঐ ঘাটে বসে থাকে। যদি মায়ের দেখা পায় তার জন্য। আমাকে মা কয়েক বার পুকুর ঘাটে ডেকেছিল কিন্তু আমি একবার গিয়ে মায়ের বীভৎস রূপ দেখে আঁতকে উঠেছিলাম। তারপর থেকে আর যাই নি। অ্যালবার্ট বুঝে নেয় যে কাকা বাবু ওঁনার স্ত্রীর প্রেতাত্মার মায়ায় পড়ে গেছেন । অ্যালবার্ট শুয়ে পরে ঠিকই কিন্তু তার চোখে ঘুম আসে না। কিছুক্ষণ বিছানায় গড়াগড়ি দিয়ে আধ শোয়া হয়ে চর্বির ম্লান আলোতে অ্যালবার্ট চারি দিকে তাকিয়ে রাতের দৃশ্য দেখার চেষ্টা করে। কাকা বাবু তো আগেই বেরিয়ে গেছে এবার সে রোজকেও দেখতে পায় না। দেখতে না পেয়ে অ্যালবার্ট রোজ রোজ বলে চিৎকার করে ডাকে কিন্তু তার গলা দিয়ে স্পষ্ট কোন স্বর বের হয় না। শুধু হেড়ে গলার মত গোঙ্গানির আওয়াজ বের হয়। বাইরে বাঁশ ঝাড়ের বাঁশের পাতায় বাতাস লেগে শন শন করে আওয়াজ হচ্ছে। সেই আওয়াজের জন্য তার গলার আওয়াজ চাপা পরে যাচ্ছে। তার নিজের কণ্ঠস্বর নিজের কাছে অদ্ভুত লাগে। লজ্জা পেয়ে সে চিৎকার করা বন্ধ করে দেয়। একটু পরে সে দেখতে পায় যে রোজ তার বিছানার পাশে বসে তার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। চোখাচখি হতেই অ্যালবার্টের সম্বিত ফিরে আসে এবং সে লজ্জা পেয়ে মাথা নীচু করে নেয়। রোজ ভীষণ আদুরে গলায় বলে আমাকে খুঁজজো ? অ্যালবার্ট মাঝে মাঝে ভাবে যে রোজ কি তার প্রেমে পরে গেছে । অ্যালবার্ট… হ্যাঁ, তুমি কোথায় চলে গিয়েছিলে ? রোজ .. আমি কোথাও যাই নি তো। আমি তোমার পাশেই বসে ছিলাম। অ্যালবার্ট… কিন্তু আমি তোমাকে দেখতে পাই নি। আমার ঘুম আসছে না। নানা রকম দুঃশ্চিন্তা হচ্ছে। রোজ ..তোমার দুঃশ্চিন্তা করার কোন দরকার নেই। আমি থাকতে কেউ তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।
এক প্রহর দুই প্রহর করতে করতে রাত প্রায় শেষ হয়ে আসে। কাকা বাবু পুকুর ঘাট থেকে ফিরে এসে অ্যালবার্টকে বলে “খোকা বাবু ঘুম ভেঙেছে ? এবার তো বের হতে হবে। চলো আমি তোমাকে স্টেশন পার করে দিয়ে আসি । “এই বলে কাকা বাবু ঘরের ভিতরের একটা গর্ত থেকে একটা ধারালো ছুরি বের করে নিজের পকেটে ঢুকিয়ে নেয় । কাকা বাবুর গলার এই কণ্ঠস্বরটা আগের মত মায়া জড়ানো সহানুভূতির না । অনেকটা ভারি ও কর্কশ। বলা ভালো নিষ্ঠুর । এই আদেশ বা হুকুম যেন কোন হিংস্র পশুর কণ্ঠস্বরের মত অ্যালবার্টের কানে বাজে। অ্যালবার্ট বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখে তখনও রাতের অন্ধকারের রেস কাটে নি। কালো চাদরে মোরা আছে অরণ্য আবৃত গোটা স্টেশনটা। সূর্যদেব ঘুম ভেঙে জেগে উঠে পুর আকাশে রঙিন আভা ছড়ায় নি। এখনো পাখিরা জেগে উঠে কিছিরমিচির শব্দ করে খাবার সংগ্রহ করতে বাইরে যাবার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেনি। শীতের কুয়াশার চাদর ঘিরে ধরে রেখেছে পুর অঞ্চলটা। পুকুরের দিক থেকে কোন হিংস্র দানবের ভয়ার্ত গর্জন শীতের ভারি বাতাসের দেওয়াল ভেদ করে ভেসে আসছে অ্যালবার্টের কানে । আবছা আলোতে অ্যালবার্ট ঐ দিকে তাকিয়ে দেখে যে পুকুরের জল ফণা তুলে প্রচন্ড বেগে ফুঁসে ফুঁসে উঠছে। মনে হচ্ছে তাঁর লেলিহান জিওভা মুহূর্তে গ্রাস করে ফেলবে গোটা বিশ্বটাকে। যেন কোন ক্ষুধার্ত পশু বহু দিন পর শিকারের গন্ধ পেয়ে ফুর্তিতে নৃত্য করছে।অ্যালবার্ট দেখতে পায়, কাকা বাবু বাতাসের কানে ফিসফিস করে বলছে “হেলেনা ধৌর্য ধরে চুপ করে থাকো। চেঁচামেচি করো না,ঐ ছেলেটা টের পেয়ে যাবে, বুঝতে পেরে যাবে আমাদের দুরভিসন্ধি। সমস্ত পরিকল্পনা মাটি হয়ে যাবে। শেষে মানুষের তাজা রক্ত আমি তোমাকে পান করাতে পারবো না। লক্ষ্মীটি শান্ত হয়ে থাকো । আজ তোমাকে আমি একটা গোটা তরতাজা মানুষের তাজা গরম রক্তের স্বাদ পাইয়ে তবে ক্ষান্ত হবো।” তার সঙ্গে জলের মধ্যে থেকে তীব্র ঝাঁঝালো দুর্গন্ধ ভেসে আসছে বাতাসে । যাকে বলে এক্কেবারে ভোমরা গন্ধ। মরা বা পঁচা মাংসের উৎকট গন্ধ। এই গন্ধে অ্যালবার্টের পেটের নারীভুঁড়ি সব বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। পুকুর পারের ঝোপের মধ্যে একটা ছায়া নড়াচড়া করছে কিন্তু তাঁর কোন কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছে না অ্যালবার্ট। সে বুঝতে পারে যে সে কোন ভালো জায়গায় আসেনি। এটা বলতে গেলে একটা মরণ ফাঁদ। এই সব দেখে শুনে আলবার্ট প্রচন্ড ভয় পেয়ে যায়। তার বুকের পাঁজরের হাড় গুলো কামার শালার হাপরের মত দ্রুত উঠা নামা করতে থাকে । মনে হচ্ছে পাঁজর ভেঙে হৃৎপিণ্ড এখনি বাইরে বেরিয়ে আসবে। ভয়ে তার পা দুটো ভীষণ ভারি হয়ে যায় । টেনে তুলতে পারে না। এক পা দু পা করে সে কাকা বাবুর পিছন পিছন হাঁটতে থাকে। অ্যালবার্টের মনে পড়ে যায় কাকা বাবুর প্রথম সাক্ষাতের সেই কথা যে “এখানে যে একবার আসে সে আর এখান থেকে ফিরে যেতে পারে না। ” এটাই হয়তো সত্য। অ্যালবার্ট ভাবছে কাকা বাবু হয়তো তার পকেটে রাখা ছুরি দিয়ে আমাকে খুন করবে। আমার রক্ত স্ত্রীর প্রেত আত্মাকে পান করাবে। জানি না কাকা বাবু মানুষ না মানুষের ছদ্ধবেশে কোন পিশাচ বা প্রেত আত্মা। এই সন্দেহ ধিকি ধিকি করে বাড়তে থাকে অ্যালবার্টের মনের অলিন্দে । কিন্তু অ্যালবার্ট জানে না যে কাকা বাবু সারা রাত ধরে অনেক বার চেষ্টা করেছে তাকে হত্যা করে তার তাজা রক্ত নিজের স্ত্রীকে পান করিয়ে তাকে তুষ্ট করতে। প্রতি বারই থার্মাল ব্যর্থ হয়েছে রোজের জন্য। রোজ প্রাণ পন চেষ্টা করেছে বাবার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে অ্যালবার্টকে বাঁচাতে। রোজের এই চেষ্টার পিছনে কি আছে অ্যালবার্ট তার কিছুই জানে না। প্রেম না নিছকই সহানুভূতি। আর সেটা শুধু রোজই জানে।
পুকুরের কাছাকাছি আসতেই এক সঙ্গে অসংখ্য ক্ষুধার্ত পৈশাচিক হিংস্র দাঁত উল্লাসে থর থর করে কাঁপতে থাকে মানুষের তাজা গরম রক্ত পান করার জন্য। অ্যালবার্ট বুঝে নেয় যে এখন যদি দৌড়ে এখান থেকে পালিয়ে যেতে না পারি তবে আমার মৃত্যু সুনিশ্চিত। অ্যালবার্ট তখন বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করে অন্ধকারের মধ্যে দৌড়ে পালিয়ে যেতে চেষ্টা করে । মরিবাচি করে সে দৌঁড়াতে থাকে। কিছুতেই সে থামে না। সে বুঝে নেয় যে থেমে যাওয়া মানে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা । সে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে ঠিক করে যে সে কিছুতেই হারবে না। তার হেরে যাওয়া মানে প্রেতে আত্মার কাছে মানুষের পরাজয়। এ পরাজয় মানা যাবে না। এক নাগাড়ে অনেকটা পথ দম বন্ধ করে দৌড়ে পেরিয়ে আসার পর অ্যালবার্ট দেখতে পায় যে তার পিছনে রোজ তাঁর বাবা ও মায়ের প্রেত আত্মার সাথে ভয়ঙ্কর লড়াই করছে। রোজের বাবার বীভৎস চেহেরা দেখে অ্যালবার্ট বুঝতে পেরে যায় যে সেও মানুষ না। নিশ্চিত কোন ভূত প্রেত। রোজ তাঁর বাবাকে বলছে, “হয় অ্যালবার্টকে বাঁচাও আর নয়তো আমাকে মেরে ফ্যালো । ” বাবা.. “তুই সরে যা তুই সরে যা মা । আমাদের কাজ আমাদের করতে দে। ” ভূতেদেরও সন্তানের উপর মায়া হয়। রোজ …” না, অ্যালবার্টকে বিপদের মধ্যে ফেলে রেখে আমি যেতে পারবো না। তোমরা ওকে ছেড়ে দাও। ” রোজ …” অ্যালবার্ট পালাও, পালাও, পালিয়ে যাও। আমি আমার বাবা মায়ের প্রেত আত্মার সঙ্গে বুঝে নিচ্ছি। তোমার কোন ক্ষতি আমি হতে দেবো না । তুমি তোমার জীবনের শেষে মৃত্যুর পর আমার সঙ্গে দেখা করবে। আমি তত দিন তোমার জন্য অপেক্ষা করবো।”এরপর কখন যে অ্যালবার্ট ঐ অভিশপ্ত স্টেশনটা পেরিয়ে চলে এসেছে তা সে বুঝতে পারেনি। একটা ইটের রাস্তায় এসে ব্যালান্স হারিয়ে পরে যায়। পরে গিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে। তার সারা শরীরে স্বস্তির আমেজ ফুটে উঠেছে । যুদ্ধ জয়ের স্বস্তি। ইটের রাস্তায় শুয়ে শুয়ে সে শেষ রাতের বিভৎসতার কথা ভাবতে থাকে। রোজের শেষের কথা গুলো সব সে শুনতে পেয়েছে কিন্তু উত্তর দিতে না পেরে কষ্টও পেয়েছে । এই গোলক ধাঁধার মধ্যে থেকে বেঁচে ফিরে আসতে পেরে মনে মনে সে রোজকে ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা জানিয়েছে সহস্র বার । তারপর অ্যালবার্ট যত দিন বেঁচেছিল সে তার মনের মনি কোঠায় রোজের স্মৃতি যত্ন করে বাঁচিয়ে রেখেছিলো। এক সময় রাতের অন্ধকারের বুক চিরে ভোরের সূর্যো সতেজ আলো সঙ্গে নিয়ে উদয় হয়। সেই আলোতে মিশে ছিল প্রাণ ভরে বাঁচার আশ্বাস।
একজন প্রাত ভ্রমণকারি অ্যালবার্টকে ঐ ভাবে পড়ে থাকতে দেখে ঘাবড়ে যায়। সে বুঝতে পারেনা যে মরে গেছে না বেঁচে আছে। প্রাত ভ্রমণকারি জোরে জোরে “ওভাই ওভাই” বলে ডাকতে থাকে। কিন্তু অ্যালবার্ট কোন সারা না দিয়ে বেহুস হয়ে এক ভাবে পরে থাকে । তারপর ঐ ভদ্রলোক চিৎকার করে আরও দু একজনকে জড় করে। চেঁচামেচি শুনে এর পাশের বাড়ী থেকে এক ভদ্রলক বেরিয়ে আসেন। উনি ঘরের থেকে এক বোতল জল এনে অ্যালবার্টের চোখে মুখে ছিটিয়ে দেয়। তাতে অ্যালবার্ট একটু নড়াচড়া দেয়। আরও বেশি জল দিলে সে ধড়ফড় করে উঠে বসে। এবার তার বেশ শীত লেগে যায় । তারপর ঐ ভদ্রলোক এক কাপ গরম চা এনে অ্যালবার্টকে দেয় । সেই চা খেয়ে অ্যালবার্ট একটু সুস্থ বোধ করে । সুস্থ হয়ে অ্যালবার্ট রাতের সমস্ত ঘটনা রাস্তায় বসে সবাইকে বলে। প্রেত আত্মার মায়া জাল কেটে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত বেঁচে ফিরে আসার জন্য সবাই অ্যালবার্টকে আশীর্বাদ করে। সে জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে , জয়ের শ্বাস,প্রাণ ভরে বাঁচার শ্বাস।
তারা শঙ্কর…কেমন হলো ?
হাবু, কাবু আর গবু এক সঙ্গে বলে ওঠে, “অসাধারণ!!”তোমার জবাব নেই তারা দা।
সমাপ্ত
![]()







