অব্যক্ত ভালোবাসা
অরবিন্দ নাহা
ছেলেটার নাম ত্রিদিব।একেবারেই সাধারণ,না খুব সুন্দর, না আছে তার মাঝে অতি চালাকি বরং তাকে বুদ্ধিমান বলাই শ্রেয়। মেয়েটার নাম পিয়ালী। খুব বেশি কথা বলতো না, তবে তার গভীর কালো দুটি চোখে জমে আছে অনেক না বলা কথার নীরবতা। দুজনের পরিচয় হয়েছিল ন্যাশনাল লাইব্রেরীতে। একই বইয়ের খোঁজে দু’জনে একই সঙ্গে হাত রেখেছিল পার্থিব বইটির ওপর। মেয়েটির আঙ্গুলের ছোঁয়া নিজের আঙুলে লাগতেই মুহূর্তে হাতটা সরিয়ে নিয়ে ত্রিদিব বলল-সরি,বুঝতে পারিনি। কয়েক মুহূর্তের চোখাচুখি,-দু’পক্ষই নীরব। নীরবতা ভেঙে ত্রিদিবই বলল, তুমি চাইলে বইটা নিতে পারো। পিয়ালী হালকা হেসেছিল। সেই হাসিটাই এক গভীর রেখাপাত করে স্থায়ীভাবে রয়ে গিয়েছিল ত্রিদিবের মনে, তারপর থেকে দু’জনের দেখা হতে লাগলো কখনো লাইব্রেরীতে অথবা লাইব্রেরী চত্বরে অবস্থিত ক্যান্টিনে। কথা বেশি হতো না কিন্তু নীরব চোখের ভাষায় যেন অনেক কথা বলা হয়ে যেত। ত্রিদিব ধীরে ধীরে এক সময় আবিষ্কার করলো সে মেয়েটিকে ভালোবেসে ফেলেছে। কিন্তু সাহস করে বলে উঠতে পারছিল না। আর পিয়ালী সব বুঝেও নীরব ছিল এক ব্যথাতুর মন নিয়ে। কারণ ইচ্ছে থাকলেও সে তার পরিবারের দায়িত্ব এড়িয়ে ত্রিদিবকে সব কথা বলে তার কাছাকাছি হতে পারছিল না। মনে দ্বিধা-সংকোচ-ভবিষ্যতের ভয়ে।
এক সময় ইউনিভার্সিটি শেষ হলো। বন্ধ হলো লাইব্রেরীতে যাওয়া-আসা। যে যার জীবনকে নিজের মতো করে গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। তারই মাঝে ত্রিদিবের মনে ক্ষীনআশা ছিল হয়তো ফিরে তাকাবে পিয়ালী। কিন্তু সে আর ফিরে তাকাইনি। মাসের পর মাস ক্যালেন্ডার পাতা উল্টে কেটে গেল প্রায় বছর দু’য়েক।
একদিন ডাক মারফৎ একটা বিয়ের কার্ড পেল ত্রিদিব। পরিচিত হাতের লেখা কার্ডের ওপরে দেখে বুকের হৃদপিন্ডটা ছলাৎ করে উঠলো – ত্রিদিব কে কাঁপিয়ে দিয়ে শুরু হল হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। মস্তিষ্কটা যেন অবশ হয়ে গেল। তবু কাঁপাহাতে খামের ভেতর হাতটা ঢোকাতেই একখণ্ড কাগজ উঠে এলো,–সেই পরিচিত হাতের লেখা “আগামী ৯ই মার্চ সন্ধ্যা লগ্নে বিয়ে,বাড়ির সামনের মাঠটায় প্যান্ডেল করে আয়োজন…..আর পড়তে পারে না ত্রিদিব। কার্ডটা পাশে ছুঁড়ে ফেলে দিল কি এক অব্যক্ত যন্ত্রণা নিয়ে। বিয়ের সারাটা দিন ঘরময় পায়চারী করে সিদ্ধান্ত নিল সে যাবে–সে পুরুষ নয়, সে যাবেই। তাছাড়া একটা কৌতুহলও আছে পাত্রটি তার চাইতে কিসে বেশি ? সৌন্দর্যে -বিদ্যায়-মানসিকতায় নাকি টাকায় ?
সাজানো বিয়ে বাড়ির আলোর ছ’টায় চোখ ধাঁদিয়ে গেল। সামনের দিকে পা ফেলে আর এগোতে না পেরে এক জায়গায় এসে স্থবিরের মত দাঁড়িয়ে পড়লো ত্রিদিব। এমন সময় ফুল দিয়ে সাজানো একটা গাড়ি থামতেই “বর এসেছে-বর এসেছে “বলতে বলতে বাড়ির ভেতরথেকে বেরিয়ে এলো -গার্গী-দেবস্মিতা-মহাশ্বেতা নামের পিয়ালীর তিন বন্ধু, যারা ত্রিদিবের পূর্ব পরিচিত। সবাই প্রায় একসঙ্গে বলে উঠলো,-একি,আপনি এখানে কেন?চলুন–ভেতরে চলুন । কোনক্রমে অস্ফুটোস্বরে ত্রিদিব জিজ্ঞাসা করলো, “পিয়ালী কোথায়?” -ও তো “কনের”ঘরে, চলুন। বাড়ির ভেতর থেকে রণডালা নিয়ে বেড়িয়ে আসছেন মহিলারা। ত্রিদিবের হৃদয়ে তখন রক্তক্ষরণ হয়ে চলেছে অবিরত।
“কোনে”র ঘরে ঢুকেই ত্রিদিব বিস্ময়ে স্তম্ভিত। পিয়ালী চন্দন দিয়ে সাজিয়ে দিচ্ছিল তার ছোট বোন পায়েলকে। পিয়ালী এগিয়ে এসে ত্রিদিবের হাতটা ধরে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে বলল – তোমার মুখটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে বিয়ের কার্ডটা তুমি পড়োনি। পায়েল এগিয়ে এসে ত্রিদিবকে নমস্কার করে বলল, -আপনার কথা এত শুনেছি যে এই প্রথম দেখলেও আপনাকে চিনতে আমার কোন অসুবিধা হয়নি। এখন বেশি সময় নেই, তাই আপনার বিস্ময়ের উত্তর সংক্ষেপে বলছি। বাবা তার বন্ধুকে দেওয়া কথা রাখতেই দিদির জায়গায় আজ আমি “কোনে”। তবে আমার শ্বশুরবাড়ির সবাই আমাকে মন থেকেই মেনে নিয়েছে। আমরা সবাই খুশি। আমরা আরো খুশি হবো -যেদিন আপনি দিদিকে আপনার বাড়ি নিয়ে যাবেন।পিয়ালী লজ্জায় ঘর থেকে দৌড়ে বেড়িয়ে মিশে গেল বন্ধুদের সাথে। পিয়ালী বেরিয়ে যেতেই পায়েল আগের অসমাপ্ত কথার রেস টেনে আবার বলা শুরু করল,-দিদির জেদের কাছে একসময় সবাইকে হার মানতে হয়। দিদি আমাকেই প্রথম বলেছিল,-বিয়ে করলে আপনাকেই করবে নতুবা কাউকে নয়। মা -বাবা সব জানে। আমার ব্যাপারটা মিটে গেলেই মা-বাবা আপনাদের বাড়ি যাবে কথা বলতে। কি এখন খুশি তো এবার তো একটু হাসুন। ত্রিদিব পায়েলের চিবুকটা তুলে ধরে কপালে একটা স্নেহ চুম্বন দিয়ে বলল,-এমন দায়িত্বশীল মিষ্টি একটা শালী পেলে হাসি তো আপনা আপনি আসবে। তবে শুধু হাসলে তো হবে না, বড় হিসেবে এখন থেকে আমারও কিছু দায়িত্ব আছে। আমি বরং অতিথিদের আপ্যায়নের দিকটা একটু দেখি। ত্রিদিব ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই পিয়ালী দৌড়ে এসে পায়েলকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে। তবে এ কান্না সুখের কান্না–সুখাশ্রু।
—oooXXooo—
![]()







