স্টাফরুম
ইন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায়
তেঁতুলতলা হাইস্কুলের সামনে রিকশাটা দাঁড়াল। এটা স্কুল না হরপ্পা মহেঞ্জোদাড়ো কে জানে। স্কুল সার্ভিস কমিশনের চিঠিটা দুদিন আগে পেয়েছিল। মাঝে শনিবার আর রবিবার গেছে। আজ সোমবার। সোমদেবের ভক্ত অঞ্জলি। পুজো করে এসেছে আজ।
সংসারে এত টানাটানির মধ্যেই একটা আলো অঞ্জলির সার্ভিস পাওয়াটা। বিনা চিকিৎসায় ছোট্ট ভাই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল যেদিন সেদিন থেকেই অঞ্জলির মনে হয়েছিল কিছু একটা করতেই হবে।
যতক্ষণ কোনও চাকরি না পাওয়া যায় ততক্ষণ কেউ শিক্ষার দাম দেয় না। সকলেই নাক সিঁটকেছে। যেন গেল গেল ভাব।
এই তো সেদিনের কথা ।মাসি পর্যন্ত মাকে স্পষ্ট শুনিয়ে গেল “তোর মেয়েকে যা দেখতে তাতে কোনও ছেলের পছন্দ হবে না”।
এইসব কথা শুনে মা কেমন যেন আচরণ করত। যেন অঞ্জলি মানেই গেল গেল রব। সেই অঞ্জলি আজ নিজের চেষ্টাতে চাকরি পেয়েছে। সবাই চুপ। কেউ কেউ দেঁতো হাসি হাসছে। কত যেন শুভাকাঙ্ক্ষী।
ঠাগমা একটা কথা বলতেন “পুড়বে নারী উড়বে ছাই/ তবে নারীর গুণ গাই”।
রিকশার মধ্যে এইসব ভাবতে ভাবতেই আসছিল অঞ্জলি। বাস থেকে নেমে তিন কিমি দূরে এই স্কুল। রিকশা ওয়ালা বললে “দিদিমণি। এই হল আমাদের ইস্কুল “
অঞ্জলি বুঝতেই পারেনি এটা স্কুল বাড়ি। সঙ্গে বাবা এসেছে। সংসারের কাণ্ডারী এই মানুষ টা নড়বড়ে সংসার নৌকার মালিক।
বাবার মুখে কান পর্যন্ত হাসি আজ।.যেন একটা অবলম্বন পেয়েছে মানুষ টা। চারদিকে শুধুই লোন। অপমান তার নিত্য সঙ্গী। আজ আশার আলো তার চোখে মুখে বাঁধ ভেঙেছে।
বাবার জন্য একটা কান্না দলা পাকিয়ে গলার কাছে জমাট বেঁধে গেল অঞ্জলির। বাবাকে দেখলে এই পুরুষ জাতির প্রতি তার সম্ভ্রম জাগে। কী অপরিসীম আত্মত্যাগ এই মানুষ টার। এক ঢোল এক কাঁসির মতো একটা পোশাক পরে সারাদিন কঠোর পরিশ্রম করে ও এমন আনন্দ মাখা মুখ কী করে যে সম্ভব কে জানে? অঞ্জলি বাবাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পুরুষ মনে করে।বাবা তার কাছে ভগবান!
বাংলার শিক্ষিকা। শরৎচন্দ্রের কথা মনে এল অঞ্জলির। ।
“মেয়েকে যে মানুষ বলে নয়, কেবল মেয়ে
বলে, ভার বলে নেয় না, সেই কেবল এর দুঃখ
বৈতে পারে, অপরে পারে না । আর কেবল
নেওয়াই নয়, মেয়েমানুষকে মানুষ করার ভারও
তারই উপরে এবং এইখানেই পিতৃত্বের
সত্যকার গৌরব । “
স্কুলের মধ্যে হৈচৈ। আগামীকাল সরস্বতী পুজো। ছেলে মেয়েদের মধ্যে একটা বেনিয়মের হাওয়া।
অঞ্জলির সাথে বাবা এসেছে। দুজন কে একসাথে ঢুকতে দেখে ছেলে মেয়েদের মধ্যেই একটা গুঞ্জন শোনা গেল। অন্ধকার একটা গলির মধ্যে ঢুকতেই ডানপাশে একটা ঘর দেখতে পেল অঞ্জলি। ওর সোজাসুজি আর একটা ঘরে চারজন স্যার ম্যাডাম দেখতে পেল অঞ্জলি।একটা হাইস্কুলের স্টাফরুম এইটুকু কেন? প্রশ্ন টা মাথার মধ্যেই এল। একটা দিদিমণি আছেন। চকিত দৃষ্টি বিনিময় মাত্র। লাল শাড়ি। মাথারচুল খোলা। এক পিঠ চুল। কোনও ক্লিপ পর্যন্ত নেই। অফিসের দিকে এগিয়ে গেল অঞ্জলি। পর্দা সরিয়ে অবাক হয়ে গেল। একজন বয়স্ক মানুষের সাথে এ কাকে দেখছে অঞ্জলি। সুপুরুষ,গৌরবর্ণের এই মানুষটা একদিন বলেছিলেন “মানুষের অসাধ্য কিছুই নেই। মানুষ সব পারে। শুধুই পরিশ্রম করে যাও। কখন লক্ষ্যের পাঁচিল ধরা দেবে তুমিও বুঝতে পারবে না”।
সেই আদিত্য বাবু এখানে। চকচক করে উঠল অঞ্জলির মুখ। এতক্ষণ যে ভয় ছিল তা নিমেষে উধাও। গলা দিয়ে বেরিয়ে এল “স্যার। আসবো”?
মোটা কালো ফ্রেমের চশমা মুখ তুললেন। বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে। তেইশ বছরের অঞ্জলির চোখে আনন্দাশ্রু। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল “স্যার “।
স্যার এর মুখে বিদ্যুত এর ঝিলিক। চোখ দুটো চিকচিক করছে। চেয়ার থেকে উঠে পড়লেন। তারপর বললেন “আরে অঞ্জলি। এসো এসো। আমি এইমাত্র বলছিলাম তোমার কথা। আমাদের সহকারী প্রধান শিক্ষক গোকুলবাবু জেনে এসেছেন আমাদের স্কুলে অঞ্জলি নামের কেউ আসছেন। আমার মনে হয়েছিল হয়ত তুমি আসছো। কেমন কাকতালীয় মিলে গেল। আমি খুব খুশী আজ অঞ্জলি।”
অঞ্জলির মাথাটা নেমে এল গুরুর পায়ে। স্বর্গ থেকে দেবতারা ও বুঝি এমন দৃশ্য দেখলেন।
গোকুল বাবু জানালেন ডি আই এর চিঠি কয়েক দিন এর মধ্যেই পেয়ে যাবো। তারপর তোমার অ্যাপোয়েন্টমেন্ট লেটার যাবে। আমার আর এক মাস চাকরি আছে। তোমার অ্যাপ্রুভাল করে দিয়ে ই যাবো।সমস্ত স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকা এবার অফিসের সামনে। ফিসফিস আওয়াজ “নতুন দিদিমণি হেডের ছাত্রী।”
অঞ্জলি বাইরে বেরিয়ে দেখলে একজন তার বাবাকে সিগারেট দিলে।
বাবা বললে “আমার মেয়েটাকে আপনাদের কাছে দিয়ে গেলাম। ওকে দেখবেন। খুব মুখচোরা লাজুক। তবে গান গায় দারুণ “
লোকটি অঞ্জলির কাছে এসে বলল “শুনলি তো। তোর বাবা কী বলে গেল। দরকার হলে তোকে শাসন করব। তোর দাদা আমি। এই স্কুলের ক্লার্ক। আমার নাম দিবাকর। “
গল্প
অঞ্জলির মতো মেয়েদের জীবন প্রতিকূলতাতে ভরা। সাধ্যের বাইরে গিয়ে অসাধ্যসাধন করেছে অঞ্জলি। ইস্টার্ন জোনে সেকেন্ড হয়েছে সে। নতুন স্কুলে নিজের স্যার কে প্রধান হিসাবে দেখে আশ্চর্য হল অঞ্জলি। এই আদিত্য বাবু তার জীবনের সবক্ষেত্রে কীভাবে পথপ্রদর্শক হয়ে গেলেন।
সন্ধ্যা দিয়ে কাঠের উনানে ভাত বসিয়েছে মা। ভাতের গন্ধ খিদেটা বাড়িয়ে দিচ্ছে যেন। বাবা মাংস এনেছে আজ। খুব খুশি আজ ওরা। কী দুঃসহ জীবন পিছনে ফেলে ওরা এগোবে। নেই রাজ্য থেকে সব পেয়েছির দেশে। প্রতিবেশীদের উঁকিঝুঁকি মাকে আর বিব্রত করবে না।
মাংসের পাতলা ঝোল আর ভাত খেয়ে অঞ্জলি নিজের ঘরে ঢুকল। বিছানাতে গা এলিয়ে দিলে ও ঘুম কিছুতেই আসছে না আজ। অতীতের দিকে ফিরে তাকাতে এখন ভয় হয়। তখন নাইনে পড়ে অঞ্জলি। হঠাৎই ঠিক হল স্কুল থেকে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া হবে। রাজগীর, নালন্দা, পাটনা।
অঞ্জলি দক্ষিণেশ্বর আর আদ্যাপীঠে গিয়েছিল। ঠাকুমার সাথে। এছাড়া কোথাও কখনও বেড়াতে যায়নি। আজ সুযোগ উপস্থিত।.খরচাটা ও কম। সরকারের ভর্তুকি আছে। বায়না জুড়ল। সে বেড়াতে যাবে। বাবা বলেছিল “অনেক গুলো টাকা।.দেখি জোগাড় করতে পারি কিনা।”
বাবা নিরাশ করেনি। একটা গরু বিক্রি করে অঞ্জলির হাতে দিয়েছিল দুহাজার টাকা। অনেকে বলেছিল “এ কী মেয়েটার চালচলন। বাপটাকে নিঃস্ব করে ছাড়বে”।
আজ অঞ্জলির মনে হচ্ছিল বাবা মায়ের কাছে এই ঋণ সে জন্ম জন্মান্তরে ও শোধ করতে পারবে না। কত না পাওয়ার মধ্যে ও তারা অঞ্জলির দুঃখে কাতর হয়েছে।
অষ্টম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণিতে প্রথম হল অঞ্জলি। আর তখন আদিত্য বাবু স্কুলে জয়েন করলেন। ফিজিক্স এর স্যার। বুদ্ধিতে চকচক করত চোখ দুটো। উনি একটা বড়ো স্কুলে নিযুক্ত না হয়ে অঞ্জলিদের এই গন্ডগ্রামে পড়াতে এলেন। কো এড স্কুল। স্যার বলতেন “যেখানে অনেক আছে সেখানে কাজ কোথায়? আমি এই আকাঁডা মাটির প্রতিমা বানাবো”।অঞ্জলি এসব কথার অর্থ বোঝে এখন। সে ও তাই করবে। রাতের অন্ধকারে তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল রবি ঠাকুরের কবিতা
“এইসব মূঢ ম্লান মুক মুখে দিতে হবে ভাষা/ এইসব শ্রান্ত শুষ্ক ভগ্ন বুকে/জাগায়ে তুলিতে হবে আশা”।
অঞ্জলি মনে মনে ঠিক করেছে দুঃখী মানুষ এর অগৌরব দূর করবে সে। সে হবে অনুপ্রেরণা এই বিশ্বের অসহায় শিশুদের। ঈশ্বর এর তাই ইচ্ছা। পরমেশ্বর সেই জায়গাটাতে ই এনেছেন তাকে।
আজ অঞ্জলির দুচোখে কীসের প্লাবন! একটা মহত কর্ম সাগরে ঝাঁপ দেবে পাড়ার সেই অবহেলিত অঞ্জলি।
.অঞ্জলি স্কুল সার্ভিস কমিশনের রেকোমেন্ডেশন লেটার এনে নির্দিষ্ট দিনে শুরু করল তার জয়যাত্রা। স্টাফরুম এ তার চেয়ার দেখিয়ে দিলেন প্রধান শিক্ষক। সকলের সাথেই পরিচয়পর্ব চলতে লাগল। সহজ সরল অঞ্জলি তার সব উত্তর দিতে লাগল। তবে এই স্কুলে দুটো স্টাফরুম তাকে বেশ বিচলিত করল।
কয়েক দিন অতিবাহিত। হঠাৎই একদিন সুলতাদি ডাকল অঞ্জলিকে। স্কুলের প্রার্থনা সবে শেষ হয়েছে। সেই চুল এলো করা দিদিমণি। বললে “অ্যাই মেয়েটা। ওঘরে বসেছ বলে আমার সাথে কথা ই বলছ না। কেন? তোমার স্যার মানা করেছেন বুঝি”?
কথার মাঝে স্যার এর প্রসঙ্গ আসাতে বিরক্ত বোধ করল অঞ্জলি। তবুও বলল “বেশ তো। আজ টিফিনের সময় আসব”।
এই কথোপকথন চলাকালীন আদিত্য বাবু হনহন করে অঞ্জলির কাছে হাজির। বললেন “এই যে অঞ্জলি। একবার টিফিনের সময় আমার কাছে আসবে তো। গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে”।
স্যার চলে যেতেই আবার সুলতাদির প্রশ্ন “কী ব্যাপার বলোতো। হঠাৎ স্যার তোমাকে ডাকছেন “!
অঞ্জলি বুঝতেই পারল স্যার সম্পর্কে এর কৌতুহল একটু বেশিই। বলল “এখন ও তো বলেন নি কী কারণ। জেনে বলব”।
চতুর্থ ঘন্টার পর টিফিন। অঞ্জলি অফিসের দিকে যাচ্ছে। অপর্ণাদি বলল “তুমি কোথায় চললে? টিফিন করবে তো!”
অঞ্জলি বলল “স্যার এর কাছে যাচ্ছি। “
অপর্ণাদি কঠিন স্বরে বলল “এত স্যার স্যার করো কেন বলতো? লোকটা কিন্তু সুবিধার না এই বলে রাখলুম “।
অঞ্জলি বুঝতেই পারছে স্কুলে একটা চাপা অশান্তির পরিবেশ যেন। তবুও চুপ করে যায় সে। অফিসে পা দিতেই স্যার বলেন “তোমাকে একটা কাজ করতে হবে অঞ্জলি। আমাদের ছাত্র ছাত্রীরা জাতীয় সঙ্গীত বেসুরো আর ভুল গায়। তুমি ওদের তালিম দাও। আর প্রতিদিন হারমোনিযাম বাজিয়ে গান করবে তুমি। শিক্ষার্থীরা গলা মেলাবে”।
অঞ্জলি বলল “তাই হবে স্যার।”
আদিত্য বাবু বললেন “শুধুই পুথিগত শিক্ষা নয়। এক্সট্রা ক্যারিকুলার অ্যাক্টিভিটি প্রয়োজন। মানুষ কত এগিয়ে যাচ্ছে। তোমার উপর ভার দিলাম সময় পেলেই এগুলোর দিকে নজর দিও। শিক্ষকতা মহান বৃত্তি। এটাকে চাকরি ভেবো না অঞ্জলি। এ হল সেবা।”
.
অঞ্জলির কাছে স্টাফরুম একটা আতঙ্ক হয়ে যাচ্ছে যেন। সে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে চাকরি পেয়েছে। অথচ উঠতে বসতে তাকে নিয়ে টিপ্পনি তার সহ্য হচ্ছে না।দরকার নেই এইসব স্টাফেদের। শত অভাব সহ্য করা অঞ্জলি কত লাঞ্ছনা পেয়েছে জীবনে। তার আত্মসম্মান অনেক বেশি। রক্ত বীজের বংশধর এই অঞ্জলির মতো মেয়েরা। যারা একমুঠৌ ছাতু খেয়ে পৃথিবী টলিযে দিতে পারে। মনে মনে ঠিক করল কাজ খুঁজে নেবে সে।কারণ সে শিক্ষিকা। সমাজগঠন তার হাতে।
স্কুলে নতুন হারমোনিযাম এল। প্রতিদিন অঞ্জলি বাজিয়ে ছাত্র ছাত্রীদের সাথে গলা মেলায়। স্কুলের শুরুটা এখন বেশ গুরুগম্ভীর।
অঞ্জলির মন এখন ভালোবাসাতে পরিপূর্ণ। নিজেকে খুব দামী মনে হয় তার। বাড়িতে এসে মায়ের কাছে ছাত্র ছাত্রীদের নিত্য দিনের দুষ্টুমির কথা বলে আর হাসতে থাকে। অঞ্জলির আত্মীয়রা অঞ্জলিকে কখনও সুন্দর বলেনি। কিন্তু এই নিষ্পাপ শিশুদের কাছে তাদের নতুন দিদিমণি খুব সুন্দর। ভীষণ প্রিয়।
স্কুলের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের মেয়াদ শেষ হয়েছে। নতুন করে গঠন করতে হবে। তাই আদিত্যবাবু পরের দিন স্টাফ মিটিং ডাকলেন। ষষ্ঠ ঘন্টার পর মিটিং।
অ্যাটেনডেন্স এর খাতা আনতে স্টাফরুম এ ঢুকেই অঞ্জলির কানে এল “তাহলে আমাদের নতুন দিদিমণি অ্যাকাডেমিক এ যাচ্ছেন। নৈলে আবার মিটিং কেন “?
অপর্ণাদি বললেন “যত্তসব আদিখ্যেতা। আমরা যেন টিকটিকির ডিম। কিছুই বুঝিনা”।
অঞ্জলির মাথাতে কিছুই ঢুকছে না। এই মিটিং এ তার নাম আসছে কেন! কী চায় এরা। কেন তাকে নিয়ে এদের এত মাথাব্যথা। এই সিনিয়র টিচারদের সে তো কখনও অপমান করে না। তবে এদের কী হল! কী করেছে সে?
দিনের পর দিন হেডের উপর রাগের খোরাক মেটাতে অঞ্জলির উপর বাক্যবাণ চালিয়ে যাচ্ছেন এরা। অঞ্জলির নীরবতা আর নিষ্ঠা ওদের কাছে তবে কি ঈর্ষার বিষয় হল। অঞ্জলি কেন এসব সহ্য করবে? আর চুপ থাকা যাবে না।
আমিনুল স্যার ইতিহাসের শিক্ষক।.ধর্মপ্রাণ মুসলমান। পাঁচ ওক্ত নমাজ পড়েন। সাথে আছেন নজরুল স্যার। উনি আগে নামাজ পডতেন না। বর্তমানে উনি ও নামাজ পড়তে যান। স্কুলের কাছেই মসজিদ। সেকেন্ড পিরিযডের পর প্রতিদিন দুজনে চলে যান। ফিরে আসেন টিফিনের পর।
অবশেষে মিটিং বসলো। অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল গঠন হল। নতুন সদস্যা হল অঞ্জলি। আদিত্য বাবুর ইচ্ছা ছিল তাই। আদিত্য বাবু বললেন “পরের দিন থেকে স্কুলের ডিসিপ্লিন রক্ষা করবেন। প্রতিটি টিচার এবং ননটিচিং স্টাফ প্রার্থনাতে উপস্থিত থাকবেন।.এটা আমার নির্দেশ বলতে পারেন। “
আজ একটু আগেই বাড়ি ফিরেছে অঞ্জলি। মা মোচার চপ বানিয়ে মুড়ি দিল। আকাশের মুখ ভার। এখন ই ঝড় আসবে। প্রথম কালবৈশাখী। বেশ আমোদ লাগে। বাবা মোচার চপ খেতে ভীষণ ভালোবাসে। অঞ্জলি বলল “আজ কিন্তু কফি খাবো”।ঝড়ের অনেক ভূমিকা থাকে জীবনে। যা কিছু জীর্ণ দীর্ণ জীবনহারা তার বুকে ঝড় নামুক। শুকনো বুকে লাগুক প্রাণের হাওয়া।
কফি খেতে খেতে শান্তিনিকেতন পড়ছিল অঞ্জলি। রবি ঠাকুর লিখেছেন মরুভূমির উটের কথা। খাদ্য পায় না তবুও চলে। পানীয় নেই তবুও চলে। দূরন্ত মরু ঝড়ের মধ্যে চুপ করে দাঁড়িয়ে ফুৎকারে উড়িয়ে দেয় ঝড়কে।
অঞ্জলির আজ যেন নেশাতে পেয়েছে। গলা ছেড়ে গেয়ে ওঠে “খরবাযু বয় বেগে/চারিদিক ছায় মেঘে/ওগো নেয়ে নাও খানি বাইও।”
পরের দিন অঞ্জলি স্কুল বেরোবে। মা তাকিয়ে থাকে অঞ্জলির দিকে। তার সেই গোবেচারা মুখচোরা মেয়েটার মধ্যে আজ কী যেন দেখছে মা। এত প্রাণশক্তি,এত ব্যক্তিত্ব কী করে এল মেয়েটার মধ্যে। কদিন আগেও কেউ কিছু বললে যে বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদতো তার আজ কত পরিবর্তন।
ওলকপি দিয়ে ডিমের ঝোল রেঁধেছিল মা।.অঞ্জলি খেয়ে খুব সুন্দর একটা শাড়ি পরল। নীল মেঝে আর গোলাপী পাড়। খুব মিষ্টি লাগছিল অঞ্জলিকে।
গতকালের পর আজ স্টাফরুমে ও ঝড়ের পূর্বাভাস। অপর্ণাদি বললেন “অত দূর থেকে এই বয়সে হাঁপাতে হাঁপাতে আসি। এমন পাষাণ তো জীবনে দেখিনি। কথাতেই আছে কারো পৌষমাস তো কারো সর্বনাশ। এসব ডিসিপ্লিন এর কথা আগে তো কখনও বলতে শুনিনি”!
নজরুল স্যার বললেন “চুপ করুন। দেয়ালের ও কান আছে। বুঝতে পারছেন না কী চলছে “।
এরমধ্যেই সুলতাদি যোগ দিলেন। তীব্র ব্যঙ্গ করে বললেন “রূপ চাই রূপ!আপনার কী সে বয়স আছে যে আপনার কথাতে হেড উঠবে বসবে। সবাই তো আর আমার আপনার মতো খোলামনের না। স্কুলে এসে ই রাজনীতি শুরু করেছে। ছ্যা করো”।
অঞ্জলির কান্নাটা গলার কাছে দলা পাকিয়ে যায়। ওরা এসব কেন বলছে। মিটিং এ কিছু না বলে এখানে কেন? এ কী ধরণের অসভ্যতা? অঞ্জলির একটুও ভালো লাগছে না। ও ভেবেছিল শিক্ষক সমাজ জাতির মেরুদন্ড। এই যদি মেরুদন্ড হয় তবে তো সর্বনাশ। কী করবে এখন সে। তার কী করা উচিত। সহকর্মীদের সম্পর্কে নালিশ করবে প্রধানের কাছে? তারপর সেই তো এদের কাছেই বসতে হবে।
মনটা খারাপ হয়ে গেছে অঞ্জলির। কিন্তু বাড়ি ফিরে আর এক বিপত্তি। কাল থেকে ইউনিট টেস্ট শুরু। আর আজ মায়ের শরীর খারাপ। এসেই মাকে নিয়ে ডাক্তার এর কাছে ছুটল অঞ্জলি।
পরের দিন খুব গম্ভীর হয়ে অঞ্জলি বসে রইল। তাকে এ যাবত গম্ভীর হতে কেউ দেখেনি।আদিত্য বাবু লক্ষ করলেন ব্যাপার টা। বললেন “কী হয়েছে অঞ্জলি। তোমাকে বিমর্ষ লাগছে!”
অঞ্জলি কেঁদে ফেলল। বলল “মা খুব অসুস্থ। খুব চিন্তার মধ্যেই আছি”
আদিত্য বাবু বললেন “বেশ তো। আজ এখন বাড়ি চলে যাও”।
অঞ্জলি বলল “পরীক্ষা শেষ হতে দশ.মিনিট বাকি”।
আদিত্য বাবু বললেন “আমি সামলে নিচ্ছি। তুমি মায়ের কাছে যাও”।
পরের দিন স্কুলে যেতে পারল না অঞ্জলি। মায়ের শরীর খারাপ। হাই প্রেসার। এর মধ্যে সংসারের কাজ অঞ্জলিকে করতে হবে। তাছাড়া শনিবার। লিখিত পরীক্ষা আজ নেই। ফরমেটিভ টেস্ট। মাঝে রবিবার থাকার জন্য মা অনেক টা সুস্থ। সোমবার যথারীতি স্কুল।
দুটোর মধ্যেই মিটে গেল পরীক্ষা। অঞ্জলি দেখল ছাত্র ছাত্রীদের চলে যাবার পর অষ্টম শ্রেণির কক্ষে টিচারদের জমায়েত। কী সব হাত পা নেড়ে বলছে। কী হয়েছে কে জানে। শনিবার তো আসে নি। এরমধ্যেই আবার কী হল!
দিবাকর বাইরে বেরিয়ে অঞ্জলির মুখোমুখি হল। বললে “তোর মা কেমন আছে রে?”
অঞ্জলি হাসিমুখ করে বললে “হ্যাঁ দাদা। এখন ভালো আছে আগের থেকে। ” তারপর ফিসফিস করে বললে “আজ তো একটা পরীক্ষা ছিল। তবে কি আজ ছুটি হয়ে যাবে”?
দিবাকর ইশারাতে ওদের দিকে দেখালে। বললে “সব একজোট হয়েছে। তোর বিরুদ্ধেই ওদের অভিযোগ। একটু পরেই স্টাফ কাউন্সিলের মিটিং। “
অঞ্জলি চোখ কপালে তুলে বললে “মানে! কী করেছি আমি। “
দিবাকর ফ্যাক করে হেসে বললে “যা বলার মিটিং এ বলবি। চুপ থাকবি না। আর আমি তো আছি। দেখা যাক না ওদের আস্ফালন কতটা”।
ভীষণ একটা ভয় কাজ করতে লাগল। তার অপরাধ যে কি কিছুই ভেবে পেল না অঞ্জলি। কদিন আগেও নজরুল স্যার আর সুলতাদির মুখ দেখাদেখি বন্ধ ছিল। আজ আবার কত ভাব দুজনের। অঞ্জলির কাছে গল্প করেছিল নজরুল স্যার। স্টাফরুম এ ওদের কতরকমের আলোচনা চলে। নৈলে অঞ্জলি কী করে জেনেছিল ওই সুলতাদি গ্র্যাজুয়েশনে মাত্র 35%নম্বর পেয়েছিল। শুধু লেডি ব্রেবোন থেকে কোন সেলাই এর ডিগ্রির জন্য কর্মশিক্ষার টিচার এখন।
এখানেও এরা থেমে নেই। উনি অল্প বয়সে ভুলবশত ইঁটভাঁটার শ্রমিক কে বিয়ে করেছেন। তাকে দেখে আগের হেড মাস্টার রিকশা ওয়ালা ভেবেছিল। এইসব মুখরোচক গল্প ওদের সময় কাটানোর মাধ্যম। আর আজ এরা এক হয়েছে। অঞ্জলিকে নিয়ে মিটিং। দিবাকর দা না বললে অঞ্জলি জানতেই পারত না।
টিফিন শেষ হল। এবার মিটিং। অঞ্জলি মনে মনে দৃঢ় হল। আজ সে চুপ করে থাকবে না। ভিতরে যে আগুন টা এতদিন ধিকধিক করছিল আজ তার বহি:প্রকাশ ঘটবে। তার সরলতাকে ওরা দুর্বলতা ভেবেছে। খিলখিল নকল হাসির ঝঙ্কার তুলে বসল সুলতাদি। অপর্ণাদি। কে বলবে ওরা আলাদা স্টাফরুম এ বসে। নজরুল স্যার মিটিমিটি হাসছে। যেন আচ্ছা নাস্তানাবুদ করা যাবে এমন ভাব।
প্রধান শিক্ষক এলেন। অঞ্জলি উঠে দাঁড়াল। বাকীরা বেঞ্চে বসে। সকলেই যে যার স্থানে। আমিনুল স্যার স্টাফ কাউন্সিলের সেক্রেটারি। অঞ্জলিকে বহিন রলে ই ডাক। আদিত্য বাবুর নির্দেশে মিটিং শুরু হল। আমিনুল স্যার উঠে দাঁড়িয়ে বললেন “কয়েক দিন আগে আপনি বলেছিলেন স্কুলে ডিসিপ্লিন বজায় রাখতে হবে। আর এই কারণেই প্রার্থনার সময় সকলেই যাতে উপস্থিত থাকেন সেটা বলেছিলেন। এটা আমরা সকলেই মেনেছি।”
প্রধান শিক্ষক বললেন “স্কুলের মধ্যে ডিসিপ্লিন জরুরি। শিক্ষার্থীরা আপনাদের দ্বারাই অনুপ্রাণিত হয়। আপনাদের আচরণ, কাজকর্ম ওরা নকল করে। অতএব এটাই কি বাঞ্ছিত নয়?”
এবার অপর্ণাদি উঠলেন। বললেন “প্রশাসনিক ক্ষেত্রে আপনার পক্ষপাতিত্ব আছে। আপনি তো জানেন আমার বাড়ি সিঁথির মোড়ে। সেখান থেকে প্রতিদিন কীভাবে আসি। আমার পক্ষে রোজ প্রার্থনাতে উপস্থিত থাকতে গেলে আরও আগে বের হতে হবে। অথচ অন্যদের ক্ষেত্রে আপনি বেশ সহৃদয়।
প্রধান শিক্ষক রেগে গেলেন। ভদ্রভাবে কথা বলুন ম্যাডাম। স্কুলের একটা ডিসিপ্লিন আছে। এক দুদিন আপনার সমস্যা হতেই পারে। কিন্তু প্রতিদিন আপনার নিয়ম চলবে কি করে? “
সুলতাদি বাজখাঁই গলায় বললেন “তাহলে তো কাউকেই আপনি সুযোগ দিতে পারবেন না। বিশেষ কাউকেই নয় “।
প্রধান শিক্ষক বললেন “ব্যক্তিগত সুযোগ সুবিধা আপনারা প্রত্যেকেই নিয়ে থাকেন। কারণ আমি জানি পারিবারিক দায়িত্ব আছে আমাদের। কিন্তু স্কুলের ডিসিপ্লিন মানতেই হবে”।
আমিনুল স্যার এবার মুখ খুললেন। বললেন “স্কুলের পরীক্ষার সময় তাহলে একজনকে আপনি দশ মিনিট আগে কী করে ছেড়ে দিলেন। এটা কী স্বজন পোষণ হচ্ছে না”?
এবার সবটা পরিস্কার হয়ে গেল অঞ্জলির কাছে। যেন একটা ইঞ্জিন ধকধক করে জ্বলে উঠল। এই সিনিয়র দের সে এতদিন সম্মান করেছে। ভাবতে নিজের প্রতি ঘৃণা হল। উঠে দাঁড়াল অঞ্জলি।
কঠিন স্বরে অঞ্জলির প্রশ্নবান “আমি জানতে চাই আমিনুল স্যার আপনার মিটিং এ কাকে সুযোগ দেবার কথা বলছেন। পরীক্ষার দশ মিনিট আগে কে চলে গেছে। এই প্রকাশ্য মিটিং এ তার নাম বলুন আপনি। এত গোপনীয়তা কীসের “?
গোটা ঘর গমগম করে উঠল। শান্ত বেচারা মেয়েটার গলাতে এত কাঠিন্য দেখে সকলেই ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল। আমিনুল স্যার আমতা আমতা করে বললেন “না। মানে তোমার উপর কোনও রাগ আমাদের নেই। আসলে আমরা নিয়ম টা জানতে চাইছিলাম। স্যার বলেছেন স্কুলের ডিসিপ্লিন আছে। তাই এই বক্তব্য “।
দিবাকর ঝাঁঝিয়ে উঠল। বলল “বেশি ধানাই পানাই না করে নামটা জানতে চাইছেন ম্যাডাম। বলুন “।
আদিত্য বাবু বললেন “হ্যাঁ বলুন। কাকে ইঙ্গিত করছেন আপনারা”?
আমিনুল স্যার বললেন “হ্যাঁ। আমরা অঞ্জলির কথা ই রলছি।”
আগুন জ্বলে গেল অঞ্জলির মাথাতে। উঠে দাঁড়িয়ে সে চিৎকার করে বলে উঠল “আপনি কি কোনও সুযোগ নেন না! এই যে প্রতি শুক্রবার ক্লাস ফাঁকি দিয়ে আপনি আর নজরুল স্যার নামাজ পডতে যাবো বলে বেরিয়ে যান এ নিয়ম কি হেড মাস্টার ম্যানুয়াল এ আছে? বিদ্যালয় তো ধর্ম নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান। কারো ধর্মাচরণে আঘাত করা আমার উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু আপনি তো সুযোগ নেন স্যার “!
দিবাকর বলল “সবপাখি মাছ খায়। দোষ হয় মাছরাঙার”।
প্রধান শিক্ষক মুচকি হাসলেন। বললেন “তাহলে সুযোগ তো সবাই নেন। খামোখা একজন কে বলে কী লাভ!”
মিটিং শেষ হয়ে গেল। আর অঞ্জলি বুঝতে পারল জীবনের পথটা ফুলে ঢাকা নয়। বাসে জানালার ধারে বসে এসবই ভাবছিল অঞ্জলি। সমাজ সংসার এর মতো স্টাফরুম টা ও তাকে আঘাত করতে ছাড়ল না। এসব নিয়েই তো জীবন।
(সমাপ্ত)
![]()







