।। তোমাতে আমার ঠিকানা ।।
অষ্টম পর্ব
বারিদ বরণ
রাত গভীর। পড়ার টেবিলে খোলা বই, কিন্তু সুচির চোখ যেন অক্ষরের ভেতরেও কিছু খুঁজছে।
পড়ার বদলে আজ মনটা একেবারে অন্য পথে হাঁটছে।
তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে একটাই ভাবনা—অভি।
সেই ছেলেটা, যে মাটির ঘরে বড় হয়েছে,যার চোখে জেলাশাসক হওয়ার স্বপ্ন জ্বলে,যে সমাজের অবহেলায় হার মানেনি,বরং লড়াই করে টিকে আছে নিজের যোগ্যতায়।
আর সে?
সুচরিতা সেন—
“সেন জুয়েলার্স”-এর মালিকের একমাত্র মেয়ে,যার জন্ম থেকেই সব কিছু হাতে সাজানো।কোনো অভাব নেই, কোনো ভয় নেই,
তবু কেন তার মনে হচ্ছে সে অভির থেকে ছোটো,
অর্থে নয়, মনুষ্যত্বের বিচারে?
তার মনটা কেমন অদ্ভুত দ্বিধায় ডুবে গেছে।সে অভিকে ভালোবাসে, এতে কোনো সন্দেহ নেই,কিন্তু এই ভালোবাসা যেন এক অসম যুদ্ধে নামা।যেখানে একপাশে আছে বিলাসিতা, আরেক পাশে সংগ্রাম।
সুচি ভাবে—
“আমি তো কোনোদিন ক্ষুধা দেখিনি, অভাব দেখিনি,
অভি যেভাবে লড়ছে, তার হাজার ভাগের একটাও আমি পারব?”
অভি তো নিজের ঘামের উপর ভর করে এগোচ্ছে,আর সে?
তার পাশে দাঁড়ানোর সাহস কি তার আছে?
নাকি, তার উপস্থিতি অভির লড়াইকে দুর্বল করে দেবে?
এই ভাবনাটা সুচিকে গ্রাস করে।
বুকে চাপা কষ্ট, এক অজানা অপরাধবোধ।
সে ভাবে—
“অভি তো আমায় বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছিল।
কিন্তু আমি তার জন্য কী করেছি?”
এ যেন এক অসম বন্ধন—দুই জীবন, দুই পৃথিবী।একটা পায়ের নিচে নরম কার্পেট,
আরেকটা খালি পায়ে কাঁকরের পথ।তবু সেই দুই পথ এক জায়গায় এসে মিলেছে,
মানবতার, স্বপ্নের, আর ভালোবাসার মাটিতে।
সূচি নিজের অজান্তেই ফিসফিসিয়ে ওঠে,
” না অভি আমি কোনোদিনও তোমাকে ছেড়ে যাব না। নিজের সর্বস্ব দিয়েই তোমার পাশে থাকবো আমি চিরটাকাল।”
সুচির চোখ ভিজে আসে।
সে ধীরে ধীরে নিজের ডায়রির পাতায় লিখতে থাকে,
“অভি, তুমি যেখানে লড়ছো, আমি সেখানেই তোমার পাশে থাকব।কিন্তু তোমার শক্তি হয়ে, তোমার বোঝা হয়ে নয়।তোমার সমান হতে চাই আমি,কারণ ভালোবাসা মানে ভিক্ষে নয়, সহযাত্রা।”
কাল সকালে পরীক্ষা।
তবু আজ তার ভিতরটা অদ্ভুত দৃঢ়তায় ভরে গেছে।এই ভালোবাসা এখন তাকে দুর্বল নয়,বরং আরও অদম্য করে তুলেছে।
সে মনে মনে ভাবে,
এই ছেলেটিই তাকে শিখিয়েছে মানুষ হওয়ার অর্থটা কী।বাবা হয়তো তাকে দিয়েছে ঐশ্বর্য,
কিন্তু অভি তাকে দিয়েছে মানবিকতা।তবু সে ভেতরে ভেতরে লড়ছে।পরীক্ষার খাতায় ভালো রেজাল্ট করা দরকার,
যাতে বাবাকে বলতে পারে—
“বাবা, আমি তোমার পথে না গিয়েও সফল হতে পারি।”
আর অভির সামনে মাথা উঁচু করে বলতে পারে,
“আমি কেবল সহানুভূতির প্রতীক নই, আমি তোমার সমকক্ষ হতে পেরেছি।”
এই দুইয়ের মাঝে সে যেন নিজেই হারিয়ে যাচ্ছে।রাতের বাতাসে জানালা দুলছে,সুচি চোখ বন্ধ করে গভীর নিশ্বাস নেয়।
মৃদুস্বরে নিজেকেই বলে,
“না, আমি থামব না।আমি বাবার ছায়া থেকেও বেরোব,আর অভির পাশে থাকব।কিন্তু নিজের যোগ্যতায়, নিজের সম্মানে।”
বাতাসে একটা দৃঢ়তা মিশে গেল।এই প্রথমবার, সুচির মনে হলো—তার পথটা যত কঠিনই হোক,সে একা নয়।তার মনের ভেতর এখন দুই আগুন জ্বলছে। একটা বিদ্রোহের, আর একটা ভালোবাসার।আর দুটোই তাকে মানুষ বানিয়ে তুলছে।
সূচি জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। বস্তির দিকে তাকালো। গাঢ় অন্ধকার যেনো গ্রাস করেছে। শ্মশানের নিস্তব্ধতা ভেঙে পাশের গলি থেকে দুটো কুকুর ডেকে উঠল। যেনো এক অশনি সংকেত দিলো।
বস্তির অবস্থা অশান্ত।
রাতে মাঝেমাঝে ঝাঁ চকচকে গাড়ি এসে থামে, গলির মুখে দাঁড়ায় কিছু লোক। কেউ জানে না কী কথা হয়, কিন্তু সবাই ভয়ে দরজা টেনে দেয়।
সূচি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ভাবে—
“এই না জানি আবার কি হয়ে যায়।”
তার মনে হয়, এ যেন এক অদৃশ্য বিস্ফোরণের আগে নিঃশব্দ অপেক্ষা।
খুট করে দরজাটা খুলে যায়। সূচি ঘুরে দাঁড়ায়। মালবিকা দেবী ঘরে ঢোকেন।
“মা,তুমি ঘুমাওনি এখনো?”
” অনেক রাত হয়েছে মা, এবার শুয়ে পর। কাল পরীক্ষা আছে।”
“হ্যাঁ মা ,এইতো শুয়ে পড়ছি।”
সূচি এসে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়।
মালবিকা দেবী বলেন,
“মনটা একটু শান্ত রাখ মা।পরীক্ষার সময় মাথা ঠান্ডা রাখতে হয়।”
যেনো মেয়ের মনের ভিতরটা উনি দেখতে পাচ্ছেন।
সূচি শুধু মাথা নাড়ে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে জানে,
শান্তি এখন কেবল বাহ্যিক,তার মনের গভীরে চলছে এক অজানা ঝড়।
আলো টা নিভিয়ে দিলেন মালবিকা, দরজা টা ভেজিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন তিনি।
সকালের রোদ হালকা উষ্ণ। কলেজের আঙিনায় ছায়া-আলো খেলা করছে।সুচি গেট পেরিয়ে ঢুকেই চারদিকে তাকালো,
চোখ খুঁজছে এক পরিচিত মুখ।
কয়েক পা হেঁটে সে দেখে, পুরোনো অশ্বত্থ গাছটার নিচে অভি বসে আছে।
চেনা ভঙ্গি। বইয়ে মুখ গুঁজে, যেন চারপাশের পৃথিবী তার কাছে অচেনা। বাতাসে পাতার মৃদু শব্দ, আর তার পাতা ওল্টানোর ছন্দ—এই দুইটাই শোনা যাচ্ছে।
সুচি ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে পাশে বসে পড়ল।অভি একটু চমকে তাকাল, তারপর হালকা হেসে বলল,
“তুমি? এত তাড়াতাড়ি?”
সুচি হাসলো না, শুধু বলল,
“তুমি সকাল থেকে কিছু খাওনি নিশ্চয়?”
অভি মৃদু গলায় বলল, “না, তেমন ক্ষিদে পাইনি।”
সুচি ব্যাগ খুলে তাতে হাত ঢোকাল,একটা টিফিনবক্স বের করল।ভেতরে রুটি, আলু-পনিরের তরকারি, আর একটা ছোট্ট লাড্ডু।
মৃদু কণ্ঠে বলল,
“মা বানিয়েছে… আমি জানতাম তুমি সকাল থেকে কিছু খাবে না, তাই একটু বেশি এনেছি।”
অভি দ্বিধায় পড়ে গেল,
“না না, তোমারটা তুমি খাও, আমি….”
সুচি বাধা দিয়ে বলল,
“না, আজ আমি খাওয়াবো তোমাকে। আর তর্ক নয়।”
তার কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত দৃঢ়তা, কিন্তু চোখে মমতা।
সে টিফিন খুলে অভির মুখে এক টুকরো রুটি ও পনির এগিয়ে দিল।অভি অনিচ্ছায় নিল, কিন্তু প্রথম গ্রাসেই থেমে গেল।তার চোখে জল চিকচিক করছে—এই শহরে, যেখানে সে প্রতিদিন টিউশনের টাকা দিয়ে খাবার জোগাড় করে,সেখানে কেউ এমন আন্তরিকতার সঙ্গে তার মুখে খাবার তুলেছে,
এ তার কাছে অলৌকিক।
সুচি নরম গলায় বলল,
“অভি, তুমি আমার কাছ থেকে কিছু নিতে চাও না, আমি জানি।
কিন্তু আজ এটুকু খাবার… এটা দান নয়, ভালোবাসা।”
অভি নিচু স্বরে বলল,
“তুমি জানো তো, এই শহরে আমি একা নই,যতক্ষণ তুমি আছো…”
সুচি মৃদু হেসে বলল,
“আমি তো আছি।তোমার পাশেই থাকবো সারাজীবন।”
দুজনেই কিছুক্ষণ নীরবে বসে রইল।গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো তাদের মুখে খেলছে।
পরীক্ষার শুরুর সংকেত দিয়ে ঘণ্টা পরে উঠলো, দুজনেই উঠে ক্লাসের দিকে এগোলো।
পরীক্ষা শেষ।
সূচি বইয়ের ব্যাগ ঝোলাতে ঝোলাতে বেরিয়ে এসেছে কলেজের গেট দিয়ে।
দূরের রাস্তায় বিকেলের হালকা রোদ,আর বাতাসে হালকা ঠান্ডা, যেন কিছুটা প্রশান্তি বয়ে আনছে।
সরাসরি কলেজ থেকে বেরিয়ে এসে সূচি যখন পায়ে পায়ে বস্তির পথে হাঁটছিল,তার মনে এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি জেগে উঠল। অভি বোধহয় পরীক্ষা হল থেকে এখনো বেরিয়ে আসেনি। অন্যদিন হলে সূচি কলেজ মাঠের ওপ্রান্তে অশ্বত্থ গাছটার নিচে গিয়ে অভির জন্য অপেক্ষা করতো।
কিন্তু আজ সে অভি কে বস্তিতে নিয়ে যাবেনা। তাই অভি তাকে দেখে ফেলার আগেই সে কলেজ থেকে বেরিয়ে পড়েছে।
একদিকে অভি যেনো তার জীবনে নতুন ভোরের আলো নিয়ে এসেছে। তাকে পাশে পেয়ে সূচি মনে মনে আনন্দ পেয়েছে।সুচির ভেতরে গর্ব—অভি এত সাহসী, এত দৃঢ়!
একটা সাধারণ ছেলে, গ্রাম থেকে উঠে এসেছে ,শহরের এই কলেজে নিজের যোগ্যতা দিয়ে প্রতিটি বাধা পার করছে। তাকে নিজের যোগ্যতা দিয়ে নিজের কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছতে হবে।
কিন্তু অন্যদিকে সেই আনন্দের সঙ্গে খেলে যাচ্ছে এক অদ্ভুত দুশ্চিন্তা।কারণ আজ সে চাইছে সুচির পাশে দাঁড়াতে, তার ঝামেলা ভাগ করতে।
সূচি মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করলো,
“আমি কি তাকে বিপদে ফেলব? আমি তো চাইনি, কিন্তু ও তো নিজের ইচ্ছায়, আমার লড়াই এর শরিক হয়ে পড়ছে!”
সুচি জানে, অভি যদি পাশে থাকে, সে শুধু সাহায্য করছে না, নিজের জীবনকেও ঝুঁকিতে ফেলছে।তার চোখে এক অজানা আবেগ, বুকের ভেতর এক অদৃশ্য দমকা হাওয়া।একই সঙ্গে মনে হচ্ছে—অভির এই দায়িত্ব নেওয়ার দৃঢ়তা তার হৃদয়ে একটা নতুন শক্তি ঢুকাচ্ছে।এক ধরনের নিরাপত্তা, সে পাশে থাকলে ভয় কমে, কিন্তু সাথে আসে দায়িত্বের বোঝা।
“অভি যদি থাকে… তবে আমি আরও সাহসী হতে পারব,” সূচি ভেতরে ভেবেছে।
সুচির মনে হলো, এই অনুভূতিই হয়তো তাদের সম্পর্কের প্রথম গভীর ছায়া,যা নিঃশব্দে এক অটুট বন্ধনের সূচনা করেছে।
কিন্তু সেই সাহসের সঙ্গে আছে এক হালকা কাঁপন,এই বন্ধন অসম, বিপজ্জনক, সমাজের, ভাগ্যের, আর বাস্তবতার দেয়াল দিয়ে ঘেরা।
সুচির মনে এক অদ্ভুত দোলাচলের বাতাস বয়ে চলেছে।
” না অভিকে আর এই ঝামেলায় জড়াতে দেওয়া যাবেনা। আমি চাইনা আমার জন্য অভি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পড়ুক।”
পেছন থেকে পরিচিত কণ্ঠ শোনা গেল—ও,
“সূচি! কোথায় যাচ্ছ?”
সূচি ঘুরে দেখল, অভি তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে।চোখে সতেজ, মুখে চিন্তায় ভরা।
“বস্তিতে যাচ্ছি,” সূচি মৃদু গলায় বলল।
অভি তৎক্ষণাৎ বলল,
“আমি তোমার সঙ্গে আসব।”
সূচি কেমন যেন ঝাপসা হয়ে গেল।ভেতরটা গাঢ় ভয় আর দ্বিধায় ঢেকে গেল।
সে জানে,যদি অভি তার সঙ্গে আসে, সে এই ঝামেলায় জড়াবে, বিপদের মুখে পড়বে।
তবু অভি তো এক চ্যালেঞ্জে লড়াই করতে পারে,কিন্তু এই বস্তির অন্ধকার বাস্তবতা অন্যরকম।
সূচি দ্রুত কিছুক্ষণ থেমে দাঁড়িয়ে বলল,
“না অভি, তুমি আসবে না।
এই ঝামেলায় আমি তোমাকে জড়াতে চাই না।আমার নিজের দায়িত্ব আছে, আর তোমার নিজের জীবন, নিজের ভবিষ্যৎ।
তুমি এখানে আসলে বিপদে পড়বে, আমি সেটা চাই না।”
অভি চোখে চমক, কিন্তু তার কণ্ঠে দৃঢ়তা,
“সূচি, তুমি একা যাবে না। তোমার পাশে থাকব।যে লড়াই তুমি একা করছ, আমি সাহায্য করব।আমি শুধু দেখব না, আমি অংশ নেব। আর ভবিষ্যতের কথা বলছো ! সে গাঁটছড়া তো আগেই বেঁধে দিয়েছো।তাই তোমার পাশে থাকাটাও যে আমার দায়িত্ব।”
সূচি এক মুহূর্তের জন্য স্থবির হয়ে রইল।ভেতরে একটা অজানা ভয়, আবার গর্বের মিশ্রণ।মনে মনে ভাবল, অভি যে তার এই লড়াইকে নিজের অংশ মনে করছে,সে নিজের আত্মসম্মান, সাহস আর নৈতিক শক্তি দিয়ে তার পাশে দাঁড়াচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত সূচি গভীর শ্বাস ফেলে বলল,
“তুমি আসলে, আমিও এই দায়িত্ব থেকে সরে যাবো। তবু তোমাকে জড়াবো না।”
অভি হেসে বলল,
“কোনো ঝামেলায় তোমাকে আমি একা ছেড়ে দিতে পারি না,
আমি তোমার পাশে থাকব এটাই যে আমারও কর্তব্য। এ কথা কি তুমি অস্বীকার করতে পারবে বলো।”
সূচির চোখে অজানা দমকা জল ভাসতে লাগল,তবু সে সামলে নিল।
” কিন্তু! “
“আর কোনো কিন্তু নয় সূচি। তোমার হাত তো ছেড়ে দেওয়ার জন্য ধরিনি আমি।”
দৃঢ়তার সাথে বলল সে। অভির চোয়াল শক্ত হলো। সুচির হাত টা সে টেনে নিলো নিজের দিকে,
“এই যুদ্ধে দুজন একসাথে,
কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপে সতর্ক হয়ে লড়বো আমরা,কারণ এই ঝামেলা কোনো সাধারণ ঝামেলা নয়।”
সূর্য ডুবে আসছে, বিকেলের নরম আলো ধীরে ধীরে গভীর ছায়ায় মিলছে।
সূচি চোখ মেলে তাকালো অভির দিকে।ভেতরের ভয় আর কণ্ঠহীন আনন্দ,দুটোই একসাথে খেলছে।কিন্তু মুখে কিছু বলল না।মনে হলো, এ যাত্রা শুধু বস্তিতে যাওয়া নয়, এটা দুজনের এক নতুন লড়াই, এক নতুন ব ইলন্ধন।
আজ সূচি একা নয়।অভি পাশে আছে, সে জানে যেকোনো বিপদের মুখোমুখি কিভাবে দাঁড়াতে হয়।
সুচি ভেতরে চিন্তায় ডুবে বলল,
“অভি, সাবধানে—এখানে শুধু সাহস নয়, পরিকল্পনাও দরকার।”
অভি হালকা হেসে বলল,
“আমি প্রস্তুত। আজ তোমার জন্য, বস্তির জন্য, আর নিজের জন্যও।
তুমি শুধু পাশে থেকো।”
সুচির বুক কেমন কেঁপে উঠল।
একদিকে ভয়, অন্যদিকে আনন্দ।ভয়, কারণ এই ঝামেলা ঝুঁকিপূর্ণ।আনন্দ, কারণ তার ভালবাসার মানুষটি তার পাশে আছে, জীবনের এই কঠিন মুহূর্তে।
সূর্য তখন ইতিমধ্যেই লুকোচুরি খেলছে,বস্তির গলির মধ্যে ছায়া দীর্ঘ হয়ে গেছে।
সূচি ধীরে ধীরে গলি দিয়ে ঢুকল, ব্যাগ কাঁধে ঝুলছে, মনে এক অদ্ভুত উত্তেজনা।পেছন থেকে আসে অভির ধীর পদধ্বনি — সে পাশে আছে, শান্ত, দৃঢ়।
মস্তানরা এখন আর নেই।কিন্তু বস্তিতে স্বস্তি নামেনি, নেমেছে এক অদ্ভুত নীরবতা।
সূচি থমকে দাঁড়াল।যে বস্তিটাকে সে চেনে, সেখানে এই সময় বাচ্চাদের দৌড়ঝাঁপ থাকে,কোনো না কোনো ঘর থেকে ভেসে আসে বাসনের খুটখাট আওয়াজ,মেয়েদের কথা, ঝগড়া, হাসি—জীবনের শব্দ।
আজ কিছুই নেই।
গলির ভেতর দিয়ে হেঁটে আসতে আসতে সূচির বুকটা কেমন ভারী হয়ে উঠল।
মাটিতে ছড়ানো কিছু ভাঙা খেলনা,একটা উল্টে রাখা টিনের হাঁড়ি, সবই আছে, শুধু মানুষের শব্দ নেই, বড্ড প্রাণহীন লাগছে আজ।
অভিও বুঝতে পারল এই নীরবতার ভয়ংকর রূপ।
সে ধীরে বলল,
“এই শান্তিটা ঠিক শান্তি নয়,নিশ্চয় কিছু একটা ঘটেছে।”
সূচি মাথা নাড়ল।
তার মনে হচ্ছিল,এই নিস্তব্ধতা যেন কোনো ঝড়ের আগে হাওয়া থেমে যাওয়া।যেন বস্তির মানুষগুলো বুকের ভেতর সব কথা চেপে রেখেছে,কারণ তারা জানে,
ঝড়টা আবার আসবে।
একটা ঘরের দরজার ফাঁক দিয়ে একজন বয়স্ক মহিলা চুপচাপ তাকিয়ে ছিল,চোখে জল নেই,
কিন্তু সেই চোখে ছিল প্রস্তুতি—
সব হারানোর প্রস্তুতি।
সূচির গলা শুকিয়ে এলো।সে বুঝল,
এই নীরবতাই সবচেয়ে ভয়ংকর।
কারণ চিৎকার থামলে লড়াই থামে না,লড়াই তখন আরও গভীরে ঢুকে যায়।
অভি চুপ করে তার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
দুজনেই বুঝতে পারছিল—এই শান্ত বস্তির ভেতরেই জন্ম নিচ্ছে পরবর্তী সংঘর্ষের ছায়া।এটা কেবল সময়ের অপেক্ষা।
আজ এমন কিছু ঘটেছে,
যাতে সমস্ত বস্তিবাসী নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।কেউ চেঁচাচ্ছে না,কেউ প্রশ্ন করছে না,কেউ প্রতিবাদও করছে না।
সূচরিতার মনে হচ্ছিল,এই নীরবতা শুধু ভয়ের নয়,এই নীরবতা অপমানেরও।
একটু দূরে, বস্তির মাঝখানের খোলা জায়গাটায় কয়েকটা কাগজ মাটিতে পড়ে আছে।হাওয়ায় উল্টে যাচ্ছে—লাল কালিতে বড় বড় অক্ষর, উচ্ছেদের নোটিশ।
কেউ ছিঁড়ে ফেলেনি।কেউ পুড়িয়েও দেয়নি।সবাই দেখেছে…আর চুপ করে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করেছে।
একটা বাচ্চা মায়ের আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল।চোখে প্রশ্ন,
“আমরা কি আজ এখানে থাকব না?”
মা কোনো উত্তর দেয়নি।কারণ উত্তর জানলেও বলার শক্তিটাই যেনো নেই তার।
অভি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মুঠো শক্ত করল।এই নীরবতায় তার মনে জমে উঠছিল এক পাহাড়সম রাগ, এক বিস্ফোরনের অপেক্ষায় ক্ষণ গুনছিল।
সূচির বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল।সে ভাবেনি, কাগজের কয়েকটা পাতাই এভাবে একটা গোটা জনপদকে চুপ করিয়ে দিতে পারে।এটা শুধু উচ্ছেদের নোটিশ নয়,এটা ছিল মানুষের অস্তিত্বে সিল মারা এক নিঃশব্দ ঘোষণা।
সূচি ফিসফিস করে বলল,
“অভি… এরা ভয় পেয়ে ক্লান্ত হয়ে গেছে।”
বস্তির ওপর তখন সন্ধ্যা নামছিল।কিন্তু সূচিতার মনে হচ্ছিল,আজ অন্ধকারটা নামেনি আকাশ থেকে,নেমে এসেছে মানুষের চোখের ভেতরে।
সূচির ভেতরে ধীরে ধীরে একটা স্পষ্ট সিদ্ধান্ত জন্ম নিচ্ছিল।সে আর শুধু ভয় পেয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে না।আইন আছে, নথি আছে, মানুষ আছে,এই উচ্ছেদকে থামানোর নিশ্চয় কোনো রাস্তা আছে।
সে মনে মনে হিসেব করতে লাগল—কোনো লিগ্যাল এইড সেল,কোনো মানবাধিকার সংগঠন, প্রয়োজনে কোর্ট।এই লড়াই হবে কাগজে-কলমে, নিয়মের পথে।
ঠিক তখনই বস্তির এক কোণ থেকে চাপা গলায় কথা ভেসে এলো।একজন লোক ধীরে বলছিল,
“দিদি… ওরা যাওয়ার সময় বলে গেছে,তিন দিনের মধ্যে বস্তি পুড়িয়ে মারবে।”
কথাটা বাতাসে ঝুলে রইল।
কেউ চিৎকার করল না।কেউ কাঁদল না।নিস্তব্ধতা আরও ঘন হয়ে গেল।সূচির বুকের ভেতরটা হিম হয়ে এলো।আইন, কোর্ট, নথি—সব কিছুর সময় লাগে।
কিন্তু তিন দিন?
সে চারদিকে তাকাল।মনে মনে ভাবলো,
“এই মানুষগুলো,এদের কাছে পালানোর জায়গা নেই,রক্ষার দেয়াল নেই,শুধু আছে ভয় আর অসহায় অপেক্ষা।”
অভি ধীরে এগিয়ে এসে দাঁড়াল সূচির পাশে।তার চোখে আগুন, কিন্তু কণ্ঠে সংযম। সে বলল,
“এই জন্যই ওরা হুমকি দেয়, কারণ ওরা জানে, ভয় দেখাতে পারলেই আইনকে হারানো যায়।”
সূচি চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য।তার মাথার ভেতর তখন দুটো ঘড়ি একসাথে টিকটিক করছে,
একটা আইনের,আর একটা মৃত্যুর হুমকির।সে বুঝল,
এই লড়াই শুধু কোর্টে হবে না,
এই লড়াই শুরু হবে আজ থেকেই।ধীরে কিন্তু স্পষ্ট গলায় সে বলল,
“আমরা আইনি লড়াই করব।কিন্তু এই তিন দিন আমরা কাউকে একা থাকতে দেব না।”
বস্তির মানুষের চোখে প্রথমবার
একটা ছোট আলো জ্বলে উঠল।
ভরসার আলো।ঝড় আসছে, এটা সবাই জানে।কিন্তু সেই ঝড়ের সামনে দাঁড়ানোর সাহস টাই কেউ যুগিয়ে উঠতে পারছে না। মস্তানদের হুমকি আর ভয়ের চাপ এতটাই ঘন যে শব্দ বেরোচ্ছে না কারও গলা থেকে।
ঠিক তখনই অভি এগিয়ে এলো।
সে চেঁচাল না,হাত উঁচু করেও কথা বলল না।শুধু সবার চোখের দিকে তাকাল,
“শোনো,”
তার কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু ভিতরে লোহার দৃঢ়তা।
“ভয় পাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ভয় পেয়ে যদি আমরা আলাদা আলাদা হয়ে যাই,তাহলেই ওরা জিতে যাবে।”
এবার যেনো বস্তির লোকজন ভিতর থেকে রুখে দাঁড়ানোর একটা তাগিদ অনুভব করলো।
ভিড়ের মধ্যে থেকে বাবু এগিয়ে এলো,
“তুমি ঠিক বলেছো অভি দা।”
এবার আরো কয়েকটা ছেলে অভির সামনে এসে দাড়ালো।
একটু থেমে এবার অভি বলল,
“ওরা বলেছে তিন দিন।এই তিন দিন কেউ বস্তি ছাড়বে না।রাতে কেউ একা থাকবে না।সবাই মিলেই থাকব।”
একজন বৃদ্ধ ফিসফিস করে বলল,
“কিন্তু বাবা… যদি ওরা সত্যিই আগুন দেয়?”
অভি সরাসরি উত্তর দিল,
“তাহলে একসাথে প্রতিরোধ করব।আগুনে একা পুড়লে মৃত্যু,একসাথে দাঁড়ালে বাঁচার সম্ভাবনা।”
কথাগুলো ভারী, কিন্তু সত্য।সে চারদিকে তাকিয়ে বলল,
“আমাদের কাছে লাঠি নেই,কিন্তু সংখ্যা আছে।আমাদের কাছে টাকা নেই,কিন্তু ঐক্য আছে।”
একটা কিশোর এগিয়ে এসে বলল,
“দাদা, আমরা পাহারা দেব।রাতে পালা করে থাকব।”
অভি মাথা নেড়ে বলল,
“ঠিক তাই।আজ থেকে এই বস্তিতে কেউ একা নয়।”
সূচি দূরে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্যটা দেখছিল।
তার চোখে জল নয়—গর্ব।
সে বুঝল,
আইনি লড়াই সে লড়বে,কিন্তু মানুষের লড়াইটা
অভির মতো মানুষের হাতেই নিরাপদ।
বস্তির নিস্তব্ধতার ভেতরে ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছিল
এক নতুন শব্দ,সাহসের শব্দ।
অভি আর একটু সামনে এগিয়ে দাঁড়াল।এবার তার কণ্ঠে শুধু সাহস নয়—পরিকল্পনা।
সে বলল,
“শোনো, ভয় পেয়ে কেউ আজ রাতেই জিনিসপত্র গুছাবে না।
এতে ওরা আরও সাহস পাবে।”
সে এক এক করে সবাই কে বোঝাতে লাগল,
“রাতে তিনটে দলে ভাগ হবে সবাই।এক দল গলির মুখে,
এক দল মাঝখানে,এক দল বস্তির শেষ প্রান্তে।মোবাইল যাদের আছে, চার্জ দিয়ে রাখবে।কিছু হলে সঙ্গে সঙ্গে খবর দেবে।”
সূচি পাশে দাঁড়িয়ে যোগ করল,
“আমি কাল সকালেই আইনি ব্যবস্থা শুরু করছি।কোনো নোটিশ কপি ছিঁড়বেন না, যেখানে দেওয়ালে লাগানো আছে, সেখানেই থাকুক। ওটাই প্রমাণ।”
একজন মহিলা ভাঙা গলায় বলল,
“দিদি… আমরা কি সত্যিই বাঁচব?”
সূচি তার হাতটা ধরল।চোখে চোখ রেখে বলল,
“আপনারা একা নন।এই লড়াইটা আমরা সবাই মিলে লড়বো।”
একটা বাচ্চা সূচির আঁচল ধরেছিল।সূচি নিচু হয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
“ভয় পাস না,তুই এখানেই খেলবি।”
অভি শেষবারের মতো বলল,
“এই তিন দিন কেউ কাউকে ছেড়ে যাবে না।যদি ওরা আসে,
আমরা একসাথে থাকব।”
বস্তির মানুষগুলো মাথা নাড়ল।
চোখে ভয় আছে,কিন্তু তার সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে কিছুটা দৃঢ়তা।
সূচি আর অভি ধীরে ধীরে বস্তি থেকে বেরিয়ে এল।পেছনে ফেলে এল অসংখ্য চোখ,
যেগুলো এখন তাদের দিকে তাকিয়ে আছে ভরসার আশায়।
গলির শেষ মাথায় এসে সুচি থামল।
একবার পেছনে তাকাল।
“অভি”
সে বলল নিচু স্বরে,
“আমরা ঠিক কাজটাই করছি তো?”
অভি ধীরে উত্তর দিল,
“ভয় পেয়েও যদি কেউ ঘুরে দাঁড়ায়,তাহলেই সেটা ঠিক কাজ।”
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।তারপর আলাদা পথে হাঁটল—
কিন্তু একই লড়াইয়ের দিকে।
অভিকে বিদায় দিয়ে সূচি ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে রওনা হলো।
রাত নামছে—কিন্তু সে রাত শান্ত নয়, ভারী। আকাশের গায়ে লালচে আভাটা মিলিয়ে যেতে যেতে ধূসর নীলের একটা স্তর ছড়িয়ে পড়েছে।
শেষ সূর্যের আলোটা যেন অনিচ্ছেয় বিদায় নিচ্ছে,
পাতার ফাঁক গলে পড়ে থাকা আলো-ছায়ার খেলায়
পথটাকে আরও নিঃসঙ্গ করে তুলছে।রাস্তার ধারে একাকী দাড়িয়ে থাকা শিউলি গাছ থেকে হালকা ফুল ঝরে পড়ছে—কোনো শব্দ নেই,শুধু মাটিতে পড়ে থাকা ফুলগুলোও কেমন যেনো মুষড়ে পড়েছে, অজানা আশঙ্কায় নীরবতা পালন করছে।
বাতাসে ভেসে আসছে ভেজা মাটির গন্ধ,দিনের শেষ উষ্ণতা ছুঁয়েরাতের শীতলতা ধীরে ধীরে নামছে।বাড়ির জানালাগুলোতে এক এক করে আলো জ্বলছে, হলুদ আলোয় মানুষের ঘরোয়া জীবন শুরু হচ্ছে,কিন্তু সূচির মনে সে আলো ঢুকতে পারছে না।
হাঁটতে হাঁটতে সূচি বুঝতে পারল,রাত শুধু আকাশে নামছে না—তার মনেও নেমে আসছে একটা গভীর, অশান্ত অন্ধকার।হঠাৎ করে দুটো কুকুর একসাথে ডেকে উঠল।।সুচি খেয়াল করেনি যে সে বাড়ীর গেটের সামনে চলে এসেছে।
রাত নেমেছে।
বাইরের অস্থির, ভারী রাতটাকে পেছনে ফেলে সূচি গেট ঠেলে বাড়ির ভেতরে ঢুকল। বাতাসে এখনো বস্তির ধুলো আর আতঙ্কের গন্ধ লেগে আছে। কিন্তু এই বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই সবকিছু হঠাৎ বদলে গেল।
এই বাড়ির ভেতরটা যেন আরেক জগৎ—পরিচ্ছন্ন, সাজানো, নীরব।তবু এই নীরবতার ভেতরেও
একটা অদৃশ্য চাপ লেগে আছে।
বারান্দার মার্বেলের মেঝেতে তার পায়ের শব্দ পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে—
টক… টক…
শব্দগুলো যেন তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে,এ বিলাসবহুল বাড়িতে হাতে গোনা কিছু মানুষ থাকেন। আর ওই বস্তিতে একটু আশ্রয়, একটু মাথা গুঁজে থেকে কত মানুষ জীবনে সংগ্রাম করে চলেছে প্রত্যেকটা দিন, প্রত্যেকটা রাত।
বাড়ির ভেতর একটা পরিচিত সুগন্ধ।আগরবাতির আর পলিশ করা কাঠের গন্ধ—তাকে একসময় নিরাপত্তার অনুভূতি দিত।আজ সেই গন্ধটা যেন শ্বাসরুদ্ধকর।দূরের ঘর থেকে ঘড়ির টিকটিক শব্দ ভেসে আসছে,প্রতিটা সেকেন্ড তার বুকের ভেতর গিয়ে আঘাত করছে।
বারান্দা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই সে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল।
ড্রয়িং রুম থেকে ভেসে আসছে কথা বলার শব্দ। একাধিক কণ্ঠ, কিন্তু কোনোটা চেনা নয়।স্বরগুলো নিচু, চাপা, যেন ইচ্ছে করেই দরজার বাইরে না যায়। কথার ভেতরে একটা অস্বস্তিকর কঠোরতা আছে, যা শুনেই বুকটা কেমন করে উঠল।
সূচি ধীরে পা ফেলল। পায়ের শব্দ যেন না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখল। ড্রয়িং রুমের দরজার আড়ালে এসে দাঁড়িয়ে সে স্পষ্ট শুনতে পেল—
“তিন দিনের বেশি সময় দেওয়া যাবে না।”
“উপর থেকে চাপ আছে।”
“ঝামেলা হলে আমরা সামলে নেব।”
কথাগুলো আলাদা আলাদা ভাসছে, কিন্তু একসাথে মিলেই যেন তার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল। সে জানে না কারা এসেছে, কেন এসেছে, কিন্তু বস্তির হুমকির সঙ্গে এই কথাগুলোর অদ্ভুত মিল আছে—এইটুকু বুঝতে তার দেরি হলো না।
ড্রয়িং রুমের ঝলমলে আলো দরজার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসছে। সেই আলোয় দাঁড়িয়ে সূচির নিজের ছায়াটা লম্বা হয়ে মেঝেতে পড়েছে—একটা দ্বিধাগ্রস্ত, অথচ ক্রমশ দৃঢ় হয়ে ওঠা ছায়া।এই বাড়ি, এই ঘর, এই মানুষগুলো—সবই তার পরিচিত জগৎ। তবু এই মুহূর্তে সে বুঝতে পারছে, আজ সে আর শুধু এই বাড়ির মেয়ে নয়। বাইরে যে আগুন ধীরে ধীরে জ্বলছে, তার আঁচ এখানেও এসে পড়েছে।
সূচি একবার গভীর শ্বাস নিল। তারপর নিজেকে সামলে নিলো।
বাবার কণ্ঠ শুনতে পেলো সুচি—বিমল সেনের গলা, চেনা, ভারী, ব্যবসায়ীর আত্মবিশ্বাসে মোড়া।
ড্রয়িং রুমের দরজার আড়াল থেকে সূচি কান খাঁড়া করলো। পর্দার ফাঁক দিয়ে ভিতরটা সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।
বাবার সামনে বসে থাকা লোকটা স্পষ্টতই বাইরে থেকে আসা—কণ্ঠে প্রশাসনিক ছায়া, কথায় ক্ষমতার গন্ধ। সুচি আগে কখনও দেখেনি এই লোকটাকে।
সোফার আরেকপাশে বসে আছে এক মাড়োয়ারি ভদ্রলোক। সাদা পাঞ্জাবি, গলায় মোটা সোনার চেন, কথার ফাঁকে ফাঁকে হিসেবি হাসি। তিনি বেশি কথা বলছেন না, কিন্তু যখনই বলেন, তখনই বোঝা যায় টাকার জোরে বলা কথা।
অচেনা লোকটা বলছিল, “সেনবাবু,বস্তিতে যেসব গুণ্ডা গিয়ে হুমকি দিয়েছে, ওরা নিজেরা কিছু করেনি। উপরের নির্দেশ ছাড়া ওদের সাহস নেই।”
বিমল সেন চেয়ারে একটু সামনে ঝুঁকলেন,
“উপর বলতে কাকে বোঝাচ্ছেন?”
গলাটা শান্ত, কিন্তু তাতে চাপা রাগ।
মাড়োয়ারি ভদ্রলোক এবার মুখ খুললেন,
“বুঝতেই পারছেন সেন সাহাব। উই জমিটা বহুদিন ধরে চোখে আছে আমাদের । ডেভেলপমেন্ট হোবে, বড় প্রজেক্ট। কিছু লোক আবেগ দিখাচ্ছে বলেই দেরি হুচ্ছে।”
লোকটা এবার বলল,
“গুণ্ডা পাঠানো হয়েছে ভয় দেখানোর জন্য। যাতে নিজেরাই উঠে যায়। উচ্ছেদে আইন লাগবে না।”
এই কথাটা শুনে সূচির বুকের ভেতর কেমন করে উঠল।
ভয় দেখানো—মানে আগুন, রক্ত, মৃত্যু।
বিমল সেন এবার গম্ভীর হয়ে উঠলেন।
“কিন্তু আমি তো পরিষ্কার বলেছি, এইভাবে নয়। আমি উচ্ছেদের বিরোধী। আইন মেনে কথা বলতে হবে।”
মাড়োয়ারি ভদ্রলোক হালকা হেসে বললেন,
“সেনজি, আপনি ব্যওসা বুঝেন। আবেগ দিয়ে শহর চুলে না। আর একটু কঠোর না হলে কাজ হোবে না।”
দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে সূচির হাত দুটো মুঠো হয়ে গেল।এই লোকগুলোর কথায় বস্তির মানুষগুলো যেন কাগজের পুতুল—চাইলে সরিয়ে দেওয়া যায়, পুড়িয়ে দেওয়া যায়।
বিমল সেন চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
“আমি এর সঙ্গে নেই। স্পষ্ট বলছি—গুণ্ডাগিরি আমি সমর্থন করি না। আর যদি কারও ক্ষতি হয়, তার দায় আমি নেব না।”
ঘরের ভেতরে কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা নেমে এল।
সূচি বুঝতে পারল—আজ এই ঘরেই দুটি পৃথিবী মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে, একটা টাকা আর ক্ষমতার। আরেকটা মানুষের বেঁচে থাকার।আর এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সে নিজেই।
মারোয়ারী লোকটি বলে উঠলো,
” আপনি রাজি না হলেও কাজ আটকাবে না, সেওভি শুনে রাখুন সেন সাহাব।”
মাড়োয়ারি ভদ্রলোকের কথায় বিমল সেনের মুখের রঙ বদলে গেল। এতক্ষণ যে সংযমটা ধরে রেখেছিলেন, সেটা আর থাকল না।
তিনি হঠাৎ চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালেন।
“না,”
গলাটা এবার কাঁপছে রাগে,
“এভাবে হবে না। মানুষকে ভয় দেখিয়ে, আগুন দেখিয়ে উন্নয়ন হয় না। ওখানে বাচ্চা আছে, বুড়ো মানুষ আছে। আমি এটা মানি না।”
ড্রয়িং রুমে যেন হঠাৎ তাপমাত্রা বেড়ে গেল।
মাড়োয়ারি ভদ্রলোক এবার একটু নড়ে বসলেন।ধুতি-পাঞ্জাবির ভাঁজে হাত রেখে, ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হিসেবি হাসি। বিমল সেনের প্রতিবাদ শেষ হতে না হতেই তিনি ধীরে গলা খোলেন,
“সেনজি,”
কণ্ঠে আবেগ নেই, আছে শুধু হিসেব,
“আপনি বড় মানুষ, আমরা আপনার রেসপেক্ট করি। কিন্তু কথা বুঝে শুনুন। এই জমি নিয়ে ডিল অনেক দূর এগিয়ে গেছে।”
বিমল সেন তাকালেন তাঁর দিকে। “ডিলের নামে মানুষ পুড়িয়ে মারবেন?”
অচেনা লোকটা এতক্ষণ শান্ত ছিল। এবার সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। চোখে কোনো আবেগ নেই, কেবল হিসেবি দৃঢ়তা।সে ঠান্ডা গলায় বলল,
“সেনবাবু।”
“আপনি আপত্তি জানাতে পারেন। সেটা আপনার অধিকার। কিন্তু একটা কথা পরিষ্কার করে বলি—এখন অ্যাকশন ডে এসে গেছে।”
মাড়োয়ারি ভদ্রলোক শান্তভাবে যোগ করলেন— “আর অ্যাকশন ডে মানে আর পিছনে যাওয়া নেই। আজ যদি আমরা নরম হই, কাল পুরো প্রজেক্ট ডুবে যাবে। কোটি কোটি টাকার প্রশ্ন।”
বিমল সেনের কণ্ঠ আরও কঠিন হলো,
“অ্যাকশন ডে মানে কী? কার বিরুদ্ধে? নিরীহ মানুষের?”
লোকটা সামান্য হেসে বলল, “যারা বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাদের বিরুদ্ধেই অ্যাকশন। শহর এগোবে, কিছু মানুষ পড়ে যাবে—এটাই বাস্তব।”
‘অ্যাকশন ডে’—মানে আর শুধু হুমকি নয়, এবার সত্যিই কিছু ঘটবে।
এই কথায় বিমল সেনের চোখ জ্বলে উঠল।
“আমি চুপ করে থাকব না।”
মাড়োয়ারি ভদ্রলোক মুখে আর হাসি রাখলেন না। “তাহলে আপনাকেও ফল ভুগতে হতে পারে, সেনজি। আমরা কাউকে টার্গেট করতে চাই না… কিন্তু প্রজেক্ট আটকানোও বরদাস্ত করা যাবে না।”
এই কথাটা যেন ঘরে একটা চাবুকের মতো পড়ল।পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে সূচির বুক ধক করে উঠল।
মাড়োয়ারি ভদ্রলোক শান্ত স্বরে যোগ করল— “সেনজি, আপনি চাইল সরে যেতেই পারেন। কিন্তু সময়ের স্রোত থামানো যায় না।”
বিমল সেন চোখ তুলে তাকালেন,
“আমি থামাতে না পারলেও, চুপ করে থাকব না। মনে রাখবেন—আমি এর বিরুদ্ধে যাব।”
লোকটা এবার আর হাসল না। “তাহলে আপনাকেও প্রস্তুত থাকতে হবে, সেনবাবু। কারণ কাল থেকে পরিস্থিতি বদলাবে।”
কথাটা বলে সে ঘুরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।মাড়োয়ারি ভদ্রলোকও ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। ড্রয়িং রুমে আবার নীরবতা নামল।
কিন্তু সেই নীরবতা আর শান্ত নয়, ওটা ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা।আর পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে সূচি বুঝে গেল, বস্তির জন্য সময় ফুরিয়ে আসছে।
এটা শুধু হুমকি নয়।এটা ঠান্ডা মাথার পরিকল্পনা।
ওরা বেরিয়ে যেতেই ড্রয়িং রুমটা হঠাৎ খুব বড় আর খুব ফাঁকা মনে হলো।ঝলমলে আলো জ্বলে আছে, অথচ বিমল সেনের বুকের ভেতর কোথাও যেন অন্ধকার জমে উঠল। তিনি কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন—কিংকর্তব্যবিমূঢ়, সিদ্ধান্ত আর দায়িত্বের মাঝখানে আটকে।
ঠিক তখনই পর্দার আড়াল থেকে ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকল সুচি।তার পায়ের শব্দ প্রায় নেই। মুখে কোনো চাঞ্চল্য নেই, শুধু চোখে জমে থাকা একরাশ দৃঢ়তা। বিমল বাবু মেয়েকে দেখে যেন একটু চমকে উঠলেন। কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই সুচি শান্ত গলায় বলে উঠল,
“আমি সব শুনেছি, বাবা।”
বিমল সেন থমকে গেলেন।
কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ থেকে বললেন,
“তুমি… কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলে?”
সুচি সামনে এসে দাঁড়াল। চোখ নামিয়ে নয়, বাবার চোখের দিকেই তাকিয়ে বলল,
“যখন মানুষকে পুড়িয়ে মারার কথা হচ্ছিল, তখন থেকেই।”
বিমল বাবুর কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো।
“এই সব তোমার শোনার কথা ছিল না, মা। এগুলো বড়দের জগৎ—নোংরা, কঠিন।”
সুচি মাথা নাড়ল।
“বড়দের জগৎ বলেই কি চুপ করে থাকব? ওই বস্তির মানুষগুলো কি মানুষ নয়?”
বিমল বাবু গভীর নিশ্বাস নিলেন।
“আমি চেষ্টা করছি সুচি। কিন্তু ব্যাপারটা আমার একার হাতে নেই। টাকার জোর, ক্ষমতার জোর,সব মিলিয়ে……”
সুচি কথার মাঝখানে খুব ধীরে, কিন্তু স্পষ্ট করে বলল,
“তাই তো আমাকে লড়তে দাও, বাবা।”
বিমল সেন অবাক হয়ে তাকালেন।
“তুই লড়বি?”
“হ্যাঁ,”
সুচির গলা এবার আরও দৃঢ় হলো,
“ওরা যেটাকে প্রজেক্ট বলছে, আমি সেটাকে মানুষের জীবন বলে দেখি। যদি তুমি আটকে যাও, তাহলে আমি এগোবো। আইনি লড়াই হোক, মানুষের পাশে দাঁড়ানো হোক—কিছু একটা করতেই হবে।”
বিমল বাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। মেয়ের চোখে তিনি আজ কোনো কিশোরীকে দেখছেন না—দেখছেন এক দৃঢ়, সচেতন মানুষকে।
ধীরে বললেন,
“এই পথে গেলে তোমার জীবন বদলে যাবে সুচি। ঝুঁকি আছে।”
সুচি খুব শান্তভাবে উত্তর দিল, “যে জীবন অন্যায় দেখে চুপ করে থাকে, সেটা বদলালেই ভালো, বাবা।”
ড্রয়িং রুমের ঝলমলে আলোয় বাবা-মেয়ের দু’টি ছায়া পাশাপাশি পড়ে রইল।
এই মুহূর্তে যেন দু’জনেই বুঝে গেলেন—লড়াইটা শুরু হয়ে গেছে।
বিমল বাবু এবার আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে রইলেন না।
মনের ভেতরের দ্বিধা, ভয়, হিসেব—সব কিছুকে যেন এক ঝটকায় সরিয়ে দিলেন।
“আর দেরি করা যাবে না,” নিজেকেই বললেন তিনি।
“আজ না হলে কখনোই না।”
প্রথমেই তাঁর মাথায় এলো,থানায় যেতে হবে।কিন্তু পরমুহূর্তেই থমকে গেলেন।অভিযোগ করতে গেলে প্রমাণ চাই।কে গুণ্ডা পাঠিয়েছে, কার নির্দেশে হুমকি—সবই তো কথার কথা।কাগজে-কলমে কিছু নেই।
বিমল বাবু চেয়ারে বসে পড়লেন। কপালে ভাঁজ, চোখে তীব্র চিন্তা।হঠাৎ যেন বহুদিন আগের একটা নাম মনে পড়ে গেল।
শুভময় চৌধুরী।
কলেজ জীবনের বন্ধু।
আজ বড় উকিল, কিন্তু সম্পর্কটা এখনও পুরোনো দিনের মতোই অকৃত্রিম। আইনের ফাঁকফোকর যেমন চেনে, তেমনই মানুষের পাশেও দাঁড়াতে জানে।বিমল বাবু আর এক সেকেন্ডও দেরি করলেন না।ফোনটা তুলে নাম্বার ডায়াল করলেন।দু’বার রিং যেতেই ওপাশ থেকে পরিচিত কণ্ঠ, “আরে বিমল! বহুদিন পর! কী হাল বল?”
বিমল বাবু গলা শক্ত করে বললেন,
“শুভময়, গল্প করার সময় নেই। বড় বিপদে পড়েছি। আজই তোমার সাহায্য দরকার।”
ওপাশের কণ্ঠ মুহূর্তে বদলে গেল।
“কি হয়েছে বলো। আমি শুনছি।”
বিমল বাবু সংক্ষেপে সব বললেন,বস্তির উচ্ছেদের হুমকি, গুণ্ডা, তিন দিনের আল্টিমেটাম, প্রশাসনের নীরবতা।
শুভময় চুপ করে শুনল। তারপর ধীরে কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল,
“ঠিক আছে। আগে শান্ত হও।
প্রমাণ আমরা বানাবো না,প্রমাণ আমরা জোগাড় করবো।আজ রাতেই আমি কাজ শুরু করছি।”
বিমল বাবুর বুকের ভেতর জমে থাকা চাপটা একটু হালকা হলো।
“তুমি পাশে থাকলেই চলবে বন্ধু।”
শুভময় হেসে বলল,
“বন্ধু বলে কথা। লড়াই শুরু হলো, বিমল। এবার পিছু হটার প্রশ্ন নেই।”
ফোনের ওপাশে শুভময় চৌধুরী একটু থেমে গলা নামালেন।
“কিন্তু…”
ব্যাপারটা যে এতটাও হালকা নয়, তা তিনিও খুব ভালো করেই বুঝতে পারছিলেন।
“একটা কাজ করো, বিমল,” তিনি বললেন,
“তুমি বরং কাল বিকেলে আমার চেম্বারে একবার এসো, ভায়া। মুখোমুখি বসে একটু কথা বলা দরকার।”
বিমল বাবু কিছু বলার আগেই শুভময় আবার যোগ করলেন, “এর মধ্যে আমি আমার কিছু সোর্স লাগাচ্ছি।কে গুণ্ডা পাঠিয়েছে, কার স্বার্থ জড়িয়ে আছে,আর ওই মারোয়ারি লোকটা ঠিক কোথা থেকে উঠে এসেছে—সব খোঁজ নেব।”
বিমল বাবু যেন একটু স্বস্তি পেলেন।
“তাহলে থানায় এখনই যাওয়া ঠিক হবে না?”
শুভময় দৃঢ় স্বরে বললেন,
“না। আবেগে গিয়ে অভিযোগ করলে উল্টে ওরা সাবধান হয়ে যাবে।প্রমাণ ছাড়া গেলে লাভ নেই।আমরা আগে মাটি শক্ত করব, তারপর আঘাত।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে আবার বলল,
“আর একটা কথা, বিমল।”
শুভময় একটু থামলেন, চিন্তিত সুরে বললেন,
“এই ব্যাপারে তোমার মেয়েকে খুব বেশি সামনে আনবে না।ওদের নজর খুব খারাপ।”
বিমল বাবুর কণ্ঠে দৃঢ়তা ফিরে এলো।
“চিন্তা করো না। আমি সামলাবো। শুধু তুমি পাশে থেকো।”
শুভময় হালকা হেসে বলল, “সেটা নতুন করে বলার দরকার নেই।কাল বিকেলে দেখা হচ্ছে তবে।”
ফোন টা কেটে গেল।
এতক্ষণ সুচি চুপ করে পাশে দাঁড়িয়েছিল। এবার তার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙলো যেনো।
“উনি কি বললেন বাবা?”
বিমল বাবু সব খুলে বললেন। লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি,
“দেখা যাক কাল কি হয়।”
বিমল বাবু জানালার দিকে তাকালেন। বাইরে রাত গাঢ় হচ্ছে।কিন্তু তাঁর ভেতরে প্রথমবারের মতোএকটা স্পষ্ট পথরেখা আঁকা হয়ে গেল।
সূচি নিজের ঘরের দিকে যেতে উদ্যত হলো। এতক্ষণ সে খেয়াল করেনি, মা কখন যেনো তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। নিঃশব্দে তাদের কথা শুনছিল। মায়ের মুখটাও কেমন যেনো শুকিয়ে আছে।
সুচি আর কথা না বাড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে ধীরে ধীরে সিঁড়ি ভাঙল। প্রতিটা ধাপে উঠতে উঠতে তার মনে পড়ল বস্তির মুখগুলো—ভয়ে শক্ত হয়ে থাকা চোখ, নিঃশব্দ ঘর, খালি চুলোর হাঁড়ি। এই বাড়ির উষ্ণ আলো আর সেখানে জমে থাকা অন্ধকারের মধ্যে পার্থক্যটা আজ খুব স্পষ্ট।
নিজের ঘরের সামনে এসে সে থামল। দরজার হাতল ধরেও এক মুহূর্ত খুলল না। এই ঘরের ভেতরে তার সব আছে—আরাম, নিরাপত্তা, নিশ্চিন্ত জীবন। কিন্তু আজ সে বুঝতে পারছে, শুধু এগুলো থাকলেই মানুষ ঠিক থাকে না।শেষ পর্যন্ত দরজাটা খুলে ঘরে ঢুকল। দরজা বন্ধ হতেই বাড়ির নীরবতা যেন আরও ঘন হয়ে উঠল। সূচি বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। মাথার ভেতর একটাই ভাব ঘুরছে—এই বাড়ি কি সত্যিই তার, নাকি সে আজ থেকে অন্য কোথাও নিজের জায়গা খুঁজছে?
ঘরের আলো জ্বলা থাকল, কিন্তু সূচির ভেতরে রাত নেমে এল।
পরের দিন বিকেলে বিমল বাবু যখন বেরোতে উদ্যত হলেন, সুচি আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। যেনো সে প্রস্তুত হয়েই ছিল। একপ্রকার জোর করেই বলল,
“আমি যাব বাবা। আমাকে একা রেখে যেও না।”
বিমল বাবু প্রথমে আপত্তি করতে চেয়েছিলেন।
“এগুলো বড়দের কথা, মা। তুমি,..”
কিন্তু সুচির চোখের দিকে তাকিয়ে থেমে গেলেন।সেই চোখে জেদ নয়, ছিল অশান্তি।
রাতভর না ঘুমোনোর ছাপ, অজানা আশঙ্কার ছায়া।
শেষমেশ তিনি শুধু বললেন, “ঠিক আছে। কিন্তু চুপচাপ থাকবে।”
গাড়িতে বসে সুচি জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।আজ সকালে সে কলেজে যায়নি।
মনটাই যেন বসছিল না কোথাও।ক্লাসে বসে বইয়ের দিকে তাকিয়েও শব্দগুলো ধরা দিত না—এই অস্থিরতায়।
তার মনে পড়ছিল অভির কথা।
এই সময়টায় নিশ্চয়ই সে গাছতলায় বসে পড়ছে,হয়তো চোখ তুলে তাকাচ্ছে, ওই দুজোড়া চোখ শুধুই সুচিকে খুঁজে ফিরছে। সুচি আজ আসেনি কেন, সেই চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়ছে।
একটা হালকা ব্যথা বুকের ভেতর মোচড় দিল।
সে জানে, অভি চিন্তা করবে।
কিন্তু তবুও সে কিছু করতে পারছে না। সে মনে মনে বলল,
“ওকে এই ঝামেলায় জড়াতে পারি না আমি,”
নিজেকে বারবার বুঝিয়ে নিচ্ছিল সুচি। অভির লড়াই আলাদা—আরও কঠিন, আরও দীর্ঘ।তার জীবনে নতুন করে বিপদ ডেকে আনার অধিকার সুচির নেই।
গাড়িটা যখন শুভময় চৌধুরীর চেম্বারের সামনে থামল,সুচি গভীর নিশ্বাস নিল।আজকের এই পথে হাঁটাটা সহজ নয়, সে জানে।তবু মনে মনে ঠিক করে নিল,যা-ই হোক, সে লড়াই থেকে পিছিয়ে আসবে না।
শুভময় চৌধুরী ওদের দেখেই উঠে দাঁড়ালেন।
মুখে সেই পুরোনো দিনের উষ্ণ হাসি, যেন অনেকদিন পর কাছের মানুষ এসেছে।
“আরে বিমল! এসো, এসো,” বলেই তিনি হাত বাড়ালেন।
তারপর সুচির দিকে তাকিয়ে একটু থেমে বললেন,
“এই বুঝি তোমার মেয়ে? তোমার চোখটাই পেয়েছে।”
সুচি ভদ্রভাবে মাথা নোয়াল, কিন্তু মনটা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই।ভেতরে এক অদ্ভুত তাড়না—সব কথা এখনই জানতে হবে, এক মুহূর্তও দেরি সহ্য হচ্ছে না।
চেম্বারটা পুরোনো কলকাতার গন্ধ মাখা। দেয়াল জুড়ে মেহগনি কাঠের তাক, সারি সারি মোটা ফাইল,কিছুতে ধুলো জমেছে, কিছু আবার নতুন করে বাঁধাই করা।এক কোণে বড় জানালা, লোহার গ্রিলে আটকে থাকা বিকেলের আলো,চৌকো চৌকো ছায়া ফেলেছে মেঝের ওপর।
চেয়ারগুলো ভারী, কালচে কাঠের, বসলে যেন শরীর নিজেই স্থির হয়ে যায়।
একটা পুরোনো দেওয়ালঘড়ি টিক টিক শব্দে সময়ের হিসেব কষছে,এই মুহূর্তে সুচির কাছে সেই শব্দটা অসহ্য লাগছে।
টেবিলের ওপর ছড়ানো কাগজ, কিছু নোট, হলুদ হয়ে যাওয়া আইন বই,আর পাশে রাখা এক কাপ আধখাওয়া চা,সব মিলিয়ে জায়গাটায় একটা গম্ভীর অথচ ভরসার আবহ।
শুভময় বাবু বসতে বললেন, “নাও, বসো। আগে একটু জল খাও।”
সুচি চেয়ারে বসে পড়ল ঠিকই,
কিন্তু আঙুলগুলো অজান্তেই শক্ত হয়ে মুঠো বেঁধে আছে।
সে বারবার ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে, মনে হচ্ছে প্রতিটা সেকেন্ড দেরি মানেই বস্তির মানুষের ওপর আরেকটু বিপদ নেমে আসছে।
শুভময় বাবু সুচির অস্থিরতা বুঝতে পেরে হালকা হেসে বললেন,
“ব্যস্ত হয়ো না মা। যা জানার, সবই বলবো।কিন্তু লড়াইয়ে নামলে প্রথমেই ধৈর্য্য রাখতে হয়।”
সুচি চুপ করে রইল।
চোখে শুধু একটাই প্রশ্ন, এখন কী করা যাবে?
শুভময় বাবু যেনো বুঝতে পারলেন সুচির ভেতরের অস্থিরতা।
চেয়ারের পিঠে হেলান দিয়ে বসে পড়লেন তিনি, টেবিলের ওপর রাখা ফাইলটা ধীরে নিজের দিকে টেনে নিলেন।তার মুখের অভিব্যক্তি দেখেই সুচির বুকটা কেঁপে উঠল।
“কাল রাত থেকে আমি যা ইনফরমেশন পেয়েছি,” শুভময় বাবু গম্ভীর গলায় বললেন,
“তা খুবই বিপদজনক।”
বিমল বাবু সোজা হয়ে বসলেন। “মানে কি তার?”
শুভময় বাবু চোখ তুলে তাকালেন—একবার বিমলের দিকে, তারপর সুচির দিকে।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
“এটা শুধু কয়েকটা গুণ্ডা বা লোকাল মস্তানের ব্যাপার নয়।
এখানে একেবারে ক্ষমতার মাথা জড়িয়ে আছে।”
ঘরের ভেতর যেন বাতাস ভারী হয়ে গেল।
ঘড়ির টিকটিক শব্দটা আরও জোরে কানে লাগতে লাগল।
শুভময় বাবু বললেন,
“ওই মারোয়ারি লোকটা,সে শুধু ফ্রন্ট। আসল খেলোয়াড়রা পর্দার আড়ালে।একজন বড় ডেভেলপার, তার সঙ্গে এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক লবি,
আর প্রশাসনের ভেতরের দু-একজন লোক—সবাই মিলে চাপ দিচ্ছে।”
সুচির মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“মানে… থানায় গেলেও…”
শুভময় মাথা নাড়লেন।সুচিকে শেষ করতে না দিয়েই বললেন,
“ খবরদার।থানায় গেলে উল্টে তোমরাই ফেঁসে যেতে পারো।ওরা এতটাই আত্মবিশ্বাসী যে প্রকাশ্যে হুমকি দিতে পারছে।তিন দিনের আল্টিমেটাম,এটা কোনো ছোটখাটো লোকের সাহস বলে মনে হয় তোমাদের?”
বিমল বাবু গলা শক্ত করে বললেন,
“কিন্তু ওই নিরীহ মানুষগুলো? ওদেরকে উচ্ছেদ করে দেওয়া, বা মেরে ফেলার হুমকি? ওরা কি আইন মানে না?”
শুভময় বাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “আইন !
আইনকে কে কীভাবে ব্যবহার করছে, সেটাই আসল প্রশ্ন বিমল।”
শুভময় বাবু চেয়ার থেকে উঠে জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়ালেন। একটা সিগারেট ধরালেন।বাইরে সন্ধ্যার আলো ম্লান হয়ে আসছে, রাস্তার কোলাহলও যেন দূরে সরে গেছে। সিগারেটের কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়া জানলা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে।কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তিনি ধীরে ফিরে এলেন।
“আর একটা কথা আছে,”
বললেন তিনি, গলা আরও নিচু করে,
“এখানে যাঁর নাম উঠে আসছে, তিনি ক্ষমতার একেবারে শীর্ষে বসে আছেন। প্রকাশ্যে কিছু বলার আগে দশবার ভাবতে হয়।”
বিমল বাবু থমকে গেলেন। “রাজনৈতিক নেতা?”
শুভময় বাবু মাথা নাড়লেন। “হ্যাঁ। এমন একজন,যার অঙ্গুলি হেলনেই সরকার চলে, যাঁর সামনে প্রশাসনের বড় বড় কর্তারাও সাবধান থাকে।সমস্যাটা এখানেই—রক্ষকই এখানে ভক্ষক হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
সুচির বুকের ভেতর কেমন করে উঠল।
“তাহলে… পুলিশও তো?”
শুভময় বাবু কথাটা শেষ হতে দিলেন না।
“সেটাই তো ভয় মা,সব জায়গায় ফাইল পৌঁছানোর আগেই থেমে যাবে।এই বাস্তবতাটা মেনে নিয়েই আমাদের এগোতে হবে।”
তিনি আবার চেয়ারে বসলেন।
এই প্রথম তাঁর মুখে দ্বিধার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল।
“সত্যি কথা বলতে কী,”
শুভময় বাবু ধীরে বললেন,
“এই মুহূর্তে আদৌ কতটা করা যাবে, সেটা নিয়েও আমি দোলাচলে আছি।আইন আছে, কিন্তু আইন প্রয়োগ করবে যারা, তারাই যদি প্রশ্নের মুখে পড়ে,
তাহলে লড়াইটা সহজ থাকে না।”
ঘরের ভেতর একটা ভারী নীরবতা নেমে এলো।সুচি দেখল,এই মানুষটা, যিনি এত বছর ধরে আদালতে দাঁড়িয়ে লড়াই করেছেন,আজ তিনিও চিন্তিত।
সুচি এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার হঠাৎ বলে উঠল, “তাহলে আমরা কি কিছুই করতে পারব না?”
শুভময় বাবু সুচির দিকে তাকালেন।তিনি দৃঢ়ভাবে বললেন,
“না, এই মুহূর্তে কোনো আশার আলো আমি দেখছি না। ”
বিমল বাবু শান্ত গলায় বললেন, “তবু চুপ করে থাকা তো চলবে না, শুভময়।”
শুভময় বাবু ধীরে মাথা তুললেন।
“না, চলবে না।কিন্তু আবেগে নয়।একটা ভুল পা মানেই শুধু মামলাটা ভেস্তে যাওয়া নয়—
বস্তির মানুষগুলোর ওপর প্রতিশোধ নেমে আসতে পারে।”
সুচি এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“যদি আমরা কিছু না করি, তাহলেও তো ওরা বিপদে পড়বে।”
শুভময় বাবু সুচির দিকে তাকালেন।মুহূর্তের জন্য যেন তাঁর দ্বিধা একটু কেটে গেল।
“ঠিক বলেছ,”
তিনি ধীরে বললেন,
“এই জন্যই এখনই লড়াইটা ছাড়ছি না।কিন্তু আমাদের এমন পথ খুঁজতে হবে,যাতে ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে নয়—আইনের আলোয় দাঁড়িয়ে আঘাত করা যায়।”
“এই লড়াইটা আবেগে নয়—বুদ্ধিতে জিততে হবে।”
চেম্বারের পুরোনো ঘড়িটা আবারও টিকটিক করে উঠল।সময় যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে—
এই লড়াইয়ে সময়ই সবচেয়ে বড় শত্রু।
শুভময় বাবুর চেম্বার থেকে বেরোনোর পর ওরা দুজনেই প্রায় চুপচাপ।কথা বলার মতো কথা কারও মুখে নেই।গাড়ির জানালা দিয়ে শহরটা ছুটে যাচ্ছে—লাইট জ্বলছে, দোকান খুলছে, মানুষ হাসছে।
সবকিছু স্বাভাবিক।
এই স্বাভাবিকতাই যেন সবচেয়ে ভয়ের।সুচির বুকের ভেতর কেমন একটা অজানা চাপ।
বারবার মনে হচ্ছে—কিছু একটা ঠিক নেই।কিন্তু কী, সে নিজেও বলতে পারছে না।
বিমল বাবু হঠাৎ বললেন,
“আজ বস্তিতে কেউ গেছে?”
সুচি মাথা নাড়ল। “না বাবা… আজ আমি তো যাইনি।”
গাড়ির ভেতর আবার নীরবতা।
“আমি গতকাল গিয়েছিলাম, ওদেরকে বার বার করে বলে এসেছি, ওরা যেনো সবাই একসাথে জোটবদ্ধ হয়ে থাকে। বস্তির ছেলেরা সবাই পালা করে পাহারা দিচ্ছে।”
তবে আমি না গেলেও অভি হয়তো যাবে ওখানে আজ।”
বিমল বাবু জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলেন। “অভি” এই নামটা কানে যেতেই সুচির দিকে তাকালেন। তার মুখে পরিষ্কার বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠল, কিন্তু মুখে কিছু বললেন না।
পাকা ব্যবসায়ী মানুষ তিনি। মেয়ের এই মানসিক পরিস্থিতির মধ্যে এই প্রসঙ্গ তিনি এড়িয়ে যেতে চাইলেন। তবে বাবার এই বিরক্তি ভাব সুচিরও চোখ এড়ালো না।
বাড়িতে ফিরেও সেই অশান্তি কাটল না।ড্রয়িং রুমে আলো জ্বলছে,মালবিকা দেবী ওদের দেখেই উঠে এলেন,যেনো ওদের অপেক্ষাতেই বসে ছিলেন তিনি।
“কী হলো? কিছু বোঝা গেল?”
বিমল বাবু শুধু বললেন,
“সব খুব জটিল।”
সুচি নিজের ঘরে চলে গেল।
বই খুলে বসতে চাইল, পারল না।ডায়েরি খুলল—কলম কাঁপছে।বারবার অভির কথা মনে পড়ছে।
ও এখন কোথায়?
বস্তিতে গেছে কি?
ওকে তো আজ কিছু বলাই হয়নি।একবার ফোন তুলল,
আবার রেখে দিল। মনে মনে বলল,
” একটা ফোন পর্যন্ত নেই ছেলেটার।”
এই মুহূর্তে অভির সাথে কথা বলতে পারলে হয়তো মন টা একটু হালকা হতো।
“ কিন্তু না,”
পরমুহুর্তেই নিজেকে সামলে নিলো সে। নিজেকে বলল সে,
“ওকে এই ঝঞ্ঝাটে জড়াতে পারি না।”
সুচি জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়ালো।
রাত নামছে ধীরে ধীরে।বাইরে হঠাৎ বাতাস থেমে গেল।
জানালার পর্দা নড়ছে না।
আকাশে মেঘ জমেছে, কিন্তু বৃষ্টি নেই।অকারণেই বুক ধড়ফড় করছে তার।
মালবিকা এসে সুচির কাধে হাত রাখলেন। এবার যেনো সুচির এতক্ষণের জমে থাকা পুঞ্জীভূত মেঘ বর্ষাতে চাইল। সে মাকে কাধে মাথা রেখে তাকে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে উঠলো।
মেয়ের গাল দিয়ে গড়িয়ে পড়া জলে তার কাধের আঁচল ভিজে গেলো।মালবিকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন । মেয়েকে একটু সামলে নেওয়ার সুযোগ দিলেন।
আস্তে আস্তে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন,
“চল এবার একটু কিছু খেয়ে নিবি চল।”
“না মা ক্ষিদে নেই।”
দেখো বোকা মেয়ে, তুই না খেয়ে থাকলে কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে?” একটু অভিমান করে বললেন মালবিকা দেবী।
একটু থেমে বললেন,
” আয় দিকি আমার সাথে। তোর ঠাকুমা সকাল থেকে তোর খোজ করছেন। ঠাকুমার কাছে গিয়ে একটু বস,আমি চট করে তোর খাবারটা নিয়ে আসি।”
তিনি একপ্রকার টানতে টানতেই সূচিকে নিয়ে গেলেন ঠাকমার ঘরে।
সূচিকে দেখেই ঠাকুমা বললেন,
” এস এস দিদিভাই , এতক্ষণে এই বুড়িটার কথা মনে পড়লো তাহলে।”
কি যে বলনা ঠাম্মি,তুমি হচ্ছো আমার, ফ্রেন্ড, ফিলোসফার আর গাইড। “
ঠাকুমা শুধু বললেন,
“আজ মনটা ভালো নেই। খুব খারাপ কিছু হবে মনে হচ্ছে বারবার।”
ঠিক তখনই দূরে কোথাও একটা কুকুরের তীব্র ডাক।
তারপর আরেকটা।তারপর অনেকগুলো।
রাত গভীর।
হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল।
বাড়িটা অন্ধকারে ডুবে গেল এক মুহূর্তে। মালবিকার গলা শোনা গেল— “এই সময়ে লাইট গেল কেন?”
জানলা দিয়ে আগুনের আলো একটু ঝলসে উঠল যেনো—সুচি নিশ্চিত নয়, চোখের ভুলও হতে পারে।
হঠাৎ করেই—বিস্ফোরণের শব্দ।
এতটাই তীব্র যে জানালার কাঁচ কেঁপে উঠল।
কেউ কিছু বোঝার আগেই—আরেকটা।
এইবার শব্দটা যেন আরও কাছ থেকে এলো।
বিমল বাবু ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।মুখের রঙ বদলে গেছে।
“এই আওয়াজ… বস্তির দিক থেকেই আসছে।”
সুচির শরীরটা এক মুহূর্তের জন্য অসাড় হয়ে গেল।
মাথার ভেতর যেন কিছু ভেঙে পড়ল।তাহলে কি যে আশঙ্কাটা সারাদিন ধরে বুকের ভেতর ঘুরছিল,যেটাকে সে বারবার অস্বীকার করতে চেয়েছিল,সেটাই সত্যি হয়ে গেল।দৌড়ে বস্তির দিকের বারান্দায় গেলো ওরা। এ কি দৃশ্য।
দাউ দাউ করে জ্বলছে সর্বহারা বস্তি। চারিদিকে শুধু “আগুন,আগুন বলে চিৎকার করছে সবাই। বাতাসে শুধুই সর্বহারাদের আর্তনাদ ভেসে বেড়াচ্ছে।
সুচির চোখে জল চলে এলো। “হে ভগবান…”
এক মুহূর্ত দেরি করলেন না বিমল বাবু।সুচির হাত ধরে প্রায় টেনে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন বাড়ির পেছনের দিকের দরজা দিয়ে।রাতের অন্ধকারে পা ফেলতেইনাকে এসে লাগল সেই পরিচিত, ভয়ংকর গন্ধ—
পোড়া প্লাস্টিক, পোড়া কাপড়, পোড়া মানুষের জীবনের গন্ধ।
পেছনের গলিটা পেরোতেই আগুনটা চোখে পড়ে—থেমে থাকা নয়, জ্বলছে।
সুচি দৌড়তে শুরু করল।
বিমল বাবুও পিছিয়ে থাকলেন না।
বস্তিতে পৌঁছে তারা দেখল বস্তির মাথার ওপর যেন আগুন নেমে এসেছে। লেলিহান শিখা এক ঘর থেকে আরেক ঘরে ছুটে যাচ্ছে।টিনের চালগুলো প্রথমে লাল হয়ে উঠছে,তারপর বিকট শব্দে ধসে পড়ছে।
“বাঁচাও… আমার ঘরে কেউ আছে!”
“জল! জল!”
“ওদিকে আগুন ধরেছে!”
চিৎকার, হাঁকডাক, দৌড়ঝাঁপ—
সব একসাথে।কিন্তু কোথাও কোনো শৃঙ্খলা নেই।
শুধু আতঙ্ক।
বিমল বাবু কাঁপা হাতে থানায় ফোন করেছিলেন।
একবার।
দুবার।
তিনবার।
ফোন বেজে গেছে।কেউ তোলেনি।
সুচি দাঁতে দাঁত চেপে ফায়ার ব্রিগেডে ফোন করল।
ওপাশ থেকে একটাই কথা— “যাচ্ছি ম্যাডাম… একটু সময় লাগবে।”
একটু সময়।
এই ‘একটু সময়’-এর মধ্যেই
আরেকটা ঘর আগুনে ঢুকে গেল।
বস্তির মানুষ নিজেরাই ঝাঁপিয়ে পড়েছে।কেউ বালতি বালতি জল ছুঁড়ছে,কেউ মাথায় ভেজা কাপড় বেঁধে আগুনের দিকে দৌড়চ্ছে।একজন বুড়ো মানুষ
নিজের পোড়া হাত নিয়েইআরেকজনের ঘর বাঁচাতে ছুটছে।
একটা মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করছে,
“আমার মা ঘরের ভেতরে! কেউ তো বাঁচাও।”
কেউ শুনছে না তার কথা।শোনার সময় নেই।
সুচি একটা বালতি তুলে নিয়েছিল।বিমল বাবু বাধা দিতে গিয়েও পারলেন না।আগুনের তাপে মুখ ঝলসে যাচ্ছে।
চোখ দিয়ে জল পড়ছে—ধোঁয়ায়, ভয়ে, অসহায়তায়।
একটার পর একটা ঘর আগুনের কাছে হেরে যাচ্ছে।
কোথাও একটা ছোট সিলিন্ডার ফেটেআরেকটা বিস্ফোরণ।
মানুষ ছিটকে পড়ছে।
কেউ পড়ে গিয়ে উঠতে পারছে না।এই আগুন কোনো দুর্ঘটনা নয়—এটা বোঝার জন্য আর প্রমাণ লাগছে না।যে হুমকি তিন দিনের কথা বলেছিল,সে কথা এক রাতেই বাস্তব হয়ে গেল।
একটার পর একটা মানুষ আগুনের গ্রাসে ভস্মিভূত হয়ে যাচ্ছে। বাতাসে পোড়া মাংসের গন্ধ।
একটা এম্বুলেন্স পর্যন্ত আসেনি।
দুজন ছুটছে একজনকে কোলে নিয়ে, সারা শরীর তার ঝলসে গেছে। শুধুই আর্তনাদ আর আর্তনাদ।
সুচির গা টা গুলিয়ে উঠলো।
এক ঘন্টা পরে,
ঠিক এক ঘন্টা পরে,
দূর থেকে সাইরেনের শব্দ ভেসে এল।কেউ একজন চিৎকার করে উঠল,
“ এসেছে! এসেছে! ফায়ার ব্রিগেড এসেছে।”
এক মুহূর্তের জন্য যেন সবাই থমকে গেল।সুচির বুকের ভেতর আটকে থাকা শ্বাসটা একটু ছাড়ল।
বিমল বাবু অবচেতনে বললেন,
“এবার হয়তো….”
কিন্তু সেই আশাটা বেশিক্ষণ টিকল না।বস্তির সরু, আঁকাবাঁকা গলিতে বড় ইঞ্জিন ঢোকার কোনো রাস্তা নেই।
লাল রঙের ফায়ার ইঞ্জিনটা অনেকটা দূরেই আটকে গেল।
দূর থেকেই পাইপ টেনে জল ছেটাতে শুরু করল তারা।
কিন্তু তখন আগুন যে আর একটা ঘরে নেই—আগুন বস্তির ভেতর ঢুকে গেছে।দূর থেকে ছোড়া জল লেলিহান শিখার কাছে পৌঁছনোর আগেই
ধোঁয়া আর তাপে মিলিয়ে যাচ্ছে।কাজের কাজ কিছুই হলো না।
এর মধ্যেই আরও একটা টিনের চাল ধসে পড়ল।তার নিচে কী ছিল, কে ছিল,কেউ জানে না,
কেউ জানার সাহসও করছে না।
একজন দমকল কর্মী চিৎকার করে বলছিল,
“আর কাছে যেতে পারছি না! তাপ খুব বেশি!”
বস্তির মানুষ তখনও চেষ্টা করে যাচ্ছে।কেউ আধপোড়া জামা পরে,কেউ খালি গায়ে,
কেউ শিশুকে কোলে নিয়েই
আগুনের পাশ দিয়ে ছুটছে।
কিন্তু আগুন কারও কথা শুনছে না।
আরও আধঘন্টা পর
দুটো অতিরিক্ত ফায়ার ইঞ্জিন এলো।
ততক্ষণে—প্রায় পুরো বস্তি
ছাই।যেখানে দুপুরেও হাঁড়ির শব্দ ছিল,বাচ্চাদের হাসি ছিল,
জীবনের তাপ ছিল—
সেখানে এখন কালো ধোঁয়া,
পোড়া কাঠ,গলতে থাকা টিন
আর ছাইয়ের স্তূপ।
কেউ বসে পড়েছে পোড়া মাটিতে।কেউ নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে….চোখে জল নেই,কণ্ঠে শব্দ নেই।
পুরো বস্তিটাই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। যেনো একটা জ্বলন্ত ধ্বংসস্তূপ। অগ্নিদেবতা এতক্ষণ তাঁর তাণ্ডবলীলা চালিয়ে এবার যেনো একটু হাপিয়ে উঠে বিশ্রাম নিচ্ছেন।কিন্তু ধোঁয়া এখনও উঠছে।কালচে ছাই বাতাসে উড়ছে,চোখে পড়লেই জ্বালা ধরছে।যে ঘরগুলো একটার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল,সেগুলো এখন আর আলাদা করে চেনা যায় না।সব একসাথে পুড়ে একটা কালো, বিকৃত জমাট রূপ নিয়েছে।
সুচি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ল।পা আর এগোচ্ছে না।
এই সেই জায়গা—যেখানে সে বাচ্চাদের পড়াতে বসত,এইখানেই ছিল টিনের বেঞ্চ,একটা ভাঙা টেবিল।
এখন সেখানে শুধু ছাই। পাশের কাঁঠাল গাছটাও ঝলসে গিয়ে প্রাণহীন একটা কালো দৈত্যের মত দাঁড়িয়ে আছে মাত্র।
ছাইয়ের মধ্যে পড়ে আছে একটা আধপোড়া স্লেট,
চকচকে কালো দাগে অর্ধেক লেখা—
“অ আ ক খ…”
সুচির বুকের ভেতর থেকে একটা চাপা শব্দ বেরিয়ে এলো।
কান্না নয়,আর্তনাদও নয়।
হঠাৎ সুচির চোখে পড়ল,ছাইয়ের মধ্যে পড়ে আছে একটা আধপোড়া খাতা।সে তুলে নিল।
পাতার এক কোণে এখনও দেখা যাচ্ছে অক্ষর—
“আমার স্বপ্ন”
সুচির হাত কেঁপে উঠল।
এক কোণে কয়েকটা বাচ্চা বসে আছে।
একটা শিশুর গলা কানে এলো— “দিদি… আমার বইটা নেই…”
সুচি তাকাল।
মুখে কালো ছাই,চোখ দুটো ভয়ে বড় হয়ে আছে।
সুচির বুকের ভেতর কিছু একটা ভেঙে পড়ল।
এই সেই বাচ্চারা—যাদের সে পড়াতে আসত।
আজ তাদের হাতে বই নেই,মাথার ওপর ছাদ নেই।
সুচি এগিয়ে গিয়ে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল।শিশুটাকে বুকে টেনে নিল।
হঠাৎ সুচির কানে এলো একজন বস্তির বৃদ্ধ কাঁপা গলায় বলছে,
“এইখানেই…
এইখানেই ছিল আমার নাতনি ছোট্ট পিংকি আর ওর মা…
বেরোতে পারেনি…।”
পিংকি নামটা শুনেই সুচির ভিতর টা কেঁপে উঠলো। দৌড়ে গেলো সে।
দু’জন দমকল কর্মী আধপোড়া টিন সরাচ্ছিল।টিনটা সরতেই
ছাইয়ের ভেতর থেকেএকটা ছোট্ট হাত দেখা গেল।কালো হয়ে গেছে।
তবু স্পষ্ট বোঝা যায়—ওটা একটা ছোট্ট বাচ্চার হাত।
সুচির শ্বাস আটকে গেল যেনো ওই মুহূর্তে।
মনে মনে সে প্রমাদ গুনলো,
এ সেই পিংকি নয়তো? যে সকালবেলা তাকে ডেকে বলত,
“দিদি, আজ একটুও দেরি করবে না কিন্তু।”
যে অক্ষর লিখতে না পারলে
তার আঁচলে মুখ লুকাত। তার এই স্বপ্নের পাঠশালার ছোট্ট ক্লাস মনিটর।
আস্তে আস্তে ছোটো বাচ্চার কালো হয়ে যাওয়া পোড়া দেহটা টিনের নিচ থেকে বড় করা হলো।
ওইতো ওইতো, সেই পরিচিত হাতের বালাটা দেখতে পেলো সূচি। মাথায় আধপোড়া লাল ফিতেটা।
সুচির চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।
চারপাশের শব্দ মিলিয়ে যেতে লাগল।মানুষের কান্না, দমকলের চিৎকার,বিমল বাবুর ডাক—সব দূরে সরে গেল।
সুচি এক পা এগোতে গিয়ে হোঁচট খেল।তার ঠোঁট নড়ল—কোনো শব্দ বেরোল না।চোখের সামনে ছাইয়ের মধ্যে পড়ে থাকা ওই ছোট্ট হাতটাই শুধু ভাসতে লাগল।
তারপর—সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
“সুচি!”
বিমল বাবুর চিৎকার ভেসে এলো।
কিন্তু সুচি তখন আর কিছু শুনছে না।আগুনের থেকেও ভয়ংকর এক সত্য তার ভেতরটাকে পুড়িয়ে দিয়ে
তাকে অজ্ঞান করে দিয়েছে।
——-*** ——-
![]()







