মাছের ঝোল
ইন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায়
ঝিনকে পুকুরে আজ মাছ ধরা হচ্ছে। অনেক ভোরে চলে মাছধরা। এই এলাকার ঝিনকের মাছ এর স্বাদটাই আলাদা। বিরাট পুকুরটাকে কেউ কেউ আবার দীঘিও বলে। মাছের ভাগ করবে বলে সমু বামুন ঘুরঘুর করছে। কেমন করে মাছের ভাগ করতে হবে সব খাতায় লেখা আছে। একটু পরেই সমস্ত মাছ বারোয়ারির পরায় জড়ো করে দেওয়া হবে।
একটা চেয়ারে বসে সমু বামুন বলে যাবে “একটাকে ভেঙে তিনটে করো। তিনটেকে ভেঙে ছটা করো। “
গ্রাম ষোলোআনার পুকুর। তার মধ্যে আবার ঘোষ,বোস,মিত্তিরদের ভাগ বেশি। ভাগীদাররা যেভাবে মাছের দিকে চোখ ফেড়ে তাকিয়ে থাকে তাতে মাছরাঙা,বকেরা লজ্জা পাবে।গাঁয়ের যত ঝগড়া এই পুকুর নিয়ে। এখন আবার নতুন ছেলে ছোকরারা পুকুরের দায়িত্ব নিয়েছে। আগে সদা জেলে পুকুর করতো। কত মামলা মকোদ্দমা করেও ঝিনকের চাষ করতে পারলে না। শেষকালে জমি জায়গাতে হাত পড়ল।
সমু বামুন বলেছিল “দ্যাখ সদা। আগের যুগ আর নেই। এখনকার ছেলে ছোকরাদের মুখের ভাষা খারাপ।
এই যে একবেলা মাছ ভাগ করতে মুখে রক্ত ওঠার খাপ। তা যুগ যুগ ধরে দুশো টাকা ধরায়। আগে যৌথ থেকে একটা মাছ দিতো। ছেলেপুলে নিয়ে আয়েশ করে ভাত খেতাম। বউ সেদিন সরুচাল রাঁধতো। সেসব দিন যেন গল্পকথা।”
বস্তুত সদানন্দ একগুঁয়ে। ওর বউ পইপই করে বলেছিল :বড়নোকদের সাথে লাগতে যেও না। আমরা গরীব মানুষ। ওরা ভিটে মাটি চাটি করবে”।
তাইই হল। প্রবলের সাথে দুর্বল কখনও পারে? শুধুই কী তাই। ছটা ছেলের পর একটা মেয়ে হয়েছিল। সদানন্দ নাম রেখেছিল আদুরী। কত ইচ্ছা ছিল আদুরীকে ভালো ঘরে বে দেবে। গাঁয়ের বলখেলার মাঠে সেবার কালীপুজোর মেলায় গিয়ে বাপের মুখে চুনকালি দিলে। ছ্যা করো। অমন মেয়ে শেষে কিনা কোন বিহারী ছেলে বে করলে।
কতাটা যখন কানে এলো তখনই সদানন্দ বললে “ঘরে যেন না ঢোকে ও মেয়ে।ওর মুখ দেখাও পাপ।বাপের নাম ডোবালে তো বটেই। তার উপরে ওই ছেলেটার দেশে বউ আছে কি না তাই বা কে জানে?
আদুরী দেখতে সুন্দরী। কী সুন্দর তার চুল। চোখ দুটো তে বড়ো মায়া। বিয়ের পর কোথায় যে থাকবে তাই চিন্তা। ওর বর ওকে বিহারে নিয়ে যেতে চায়। আদুরী কিছুতেই রাজি হয় না। শেষে ঘোষেরা বললে “আদুরী। তোর বাপ কতদিন ঝিনকে চাষ করেছে। তা তুই ঝিনকের পাড়ে ঘর তুলে থাক”।
আদুরীর ভবিষ্যত ভালোবাসার হল না। আদুরীর ছেলেটা জন্মানোর সাথে সাথেই ওর বর সুরেশ দেশে পালিয়ে গেল। আদুরী শুনেছিল ওর বাড়ি পাটনা। কিন্তু কোথায় সঠিক জানে না। এদেশে এসেছিল ইঁটভাটায় কাজ করতে। তবে আদুরী ঝিনকের পাড়ে রয়ে গেল।
প্রথম প্রথম সদা খুব রেগেছিল।
একে নিজের পছন্দের বিয়ে করেছে। তার উপর চালচুলোহীন ওই বিহারীকে। আর যে ঝিনকের জন্য তার এত বড়ো কষ্ট সেই ঝিনকের পাড়েই কিনা রয়ে গেল!
আদুরী এখন ভাবে খুব বড়ো ভুল হয়েছে সুরেশের ছেঁদো কথাতে ভুলে।
আদুরীর ছেলেটা এখন আশা ভরসা। লোকের বাড়িতে ঝি এর কাজ করে আদুরী। ঘোষেরা ওকে চাল দেয় দশকেজি করে। মিত্র আর বোসেরা টাকা দেয়। অরবে পরবে কাপড় আর ছেলেটার জামা প্যান্ট দেয়।
সদানন্দের অন্তরটা কাঁদে। কী সুন্দর স্বপ্ন দেখতো সে। একটিমাত্র মেয়ের বিয়ে দেবে ঘটাপটা করে। শেষে কি না এমন কপাল।
ঝিনকের মাছে সবার লোভ। ঘোষেদের কর্তা বলে ‘এত পুকুরের মাছ খেয়েছি। ঝিনকের মাছের কাছে কেউ নেই “।
আগের দিনে সদানন্দ যখন পুকুর চাষ করত তখন তার বাড়িতেও মাছের ঝোল হোতো। আদুরীর মা প্রতিমা বড়ো বড়ো মাছের ঝোল রাঁধতো। একবার হালকা করে মাছ গুলো ভেজে ফালা ফালা করে আলু ভেজে জিরেবাটা দিয়ে ঝোল করেছিল প্রতিমা। নামাবার সময় পোস্ত কাঁচালঙ্কা বেটে দিয়েছিল। আদুরী সেদিন দুবার ভাত খেয়েছিল মাছের ঝোল দিয়ে।কথাতেই আছে কাতলা মাছের পাতলা ঝোল। শরীরে শক্তি দেয়।
মাধবপুরের চম্পা মাছ ব্যবসা করে। যাদের ভাগ বেশি তারা বেশ কিছুটা বিক্রি করে চম্পার কাছে। পাইকারি দামে কিনে গঞ্জের বাজারে বিক্রি করে। বয়সটা আদুরীর মতোই। ওরা একই ক্লাসে পড়ত। জালে মাছের সাথে উঠে আসা গেঁড়ি গুগলি কুড়োচ্ছিল। আদুরী উঠোন ঝাঁটাচ্ছিল তখন। চম্পা বললে “অ্যাই আদুরী। গুগলী খাবি”?
আদুরী খুশি হল চম্পাকে দেখে। বাস্তবিক দুজনেই ঘর পোড়া গরু। আদুরীর মুখে হাসির ঝলক। বললে “দাঁড়া যাচ্ছি”।
গুগলী কুড়িয়ে সেপটিপিন দিয়েই গুগলী ছাড়াচ্ছিল ওরা। হঠাৎই চম্পা বললে “তোর সুরেশের কোনও খবর পেলি? আবার বিয়ে করেনি তো?”
দ্বিতীয় কথাতে চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো। তার একটুও বিশ্বাস হয় না যে সুরেশ আবার সংসার পাতবে। কতদিন সুরেশ কলাটা মূলোটা নিজে না খেয়ে আদুরীকে খাইয়েছে। যখনই বেশি উপার্জন করেছে আদুরীকে কাপড় কিনে দিয়েছে। কাজল পেন্সিল দিয়ে আদুরীর চোখ এঁকেছে। আদুরীর কোনও দিন তো মনে হয় না সুরেশ আবার নতুন ঘাটে নোঙর করেছে।গল্প
চম্পা ঠ্যালা দেয় আদুরীকে। জিজ্ঞেস করে “বরের কথাতে বেহুঁশ হলি না কি লো। ওসব ছাড় দিকি। পুরুষ মানুষ কখনও ভালোবাসার মর্ম বোঝে না। এই আমার জেবনটা দ্যাখ। বাপ মদ খেতো। একদিন এক বুড়োর কাছে বেচলে। ছোট্ট মেয়ে আমি। কিছু ই বুঝি না। বুড়োর ঘরে গিয়ে দেখি তার সাজানো সংসার। দুমুঠো খাবার জন্য ওখেনে রয়ে গেনু। সবাই আমাকে কলঙ্ক দিলে।”
আদুরী বললে “ওই বুড়ো তোকে বে করেছিল”?
চম্পা চিৎকার করে ওঠে “কীসের বে! মন নেই যেখেনে”!
আদুরী কথা বাড়াতে চায় না। ও জানে বিশে ওকে ভালোবাসে। এখনই তার কথা আসবে।
আদুরীদের জীবনের যন্ত্রণা কখনও নেভে না। যন্ত্রণা কখনও বাসি হয় না । তবুও একটা স্বপ্ন নিয়ে বাঁচে। ও যেন স্বপ্ন সন্ধানী। সংসার নৌকার কান্ডারী আদুরী। চম্পাকে বাগ্যতা করে ও। চম্পা কঠোর। কেমন যেন পুরুষালী। সেই কোন কাল থেকেই বিশেকে ভালোবাসে। বিশের মা মুক্তকেশী বললে “কিছুতেই চম্পাকে বউ হিসেবে মানবে না। ওর তো বে হয়েছিল “।
মায়ের জেদ রক্ষা করতে সেদিন বিশের বে হল বটে তবে সেটা সুখের হল না।
কথা বলতে বলতে অনেক দেরী হয়েছে আজ। চম্পা চলে গেল। কাঠের উনানে ঘুঁটের উতো দিলে আদুবী। দাউ দাউদাউ করে জ্বলছে উনান। একটা হাঁড়িতে চালে জলে বসালে। উঠোনে বেগুন গাছে বেগুন ধরে আছে। একটা বেগুন এনে ধুয়ে ভাতে দিলে।
গেঁড়ি গুগলি নুন দিয়ে কষটাতে হবে। তবে সাদা ধবধবে হবে। কটা চিংড়িমাছ পেয়েছে আদুরী। ঘুষো চিংড়িমাছ। ভাত ফুটছে টগবগ করে। এই ভাত হল গিয়ে মা লক্ষ্মী। সুরেশ রুটি খেতে ভালোবাসতো। কতদিন সুরেশ মাংস আনত ।রুটির সাথে মাংস খুব জমে। তবুও ভাতের নেশা ছিল আদুরীর। অনেক সময়ই পান্তা খেতো শুকনো লঙ্কা ভেজে। বেগুন টা এতক্ষণ সেদ্ধ হয়ে গেছে। একা থাকলে সুরেশ এর কথা ভাবে আদুরী। চম্পা কতদিন বলে নিজেকে ভালোবাস আদুরী। আপনি বাঁচতে বাপের নাম। অত মশাই মশাই করে বরকে সেবা করলি। কোথা চলে গেল। তোর কথা ভাবলে না। এমনকি ছেলের কথা ও না। অমন পেরেমের মাথাতে ঝাঁটা।
এসব কথা অবলীলায় বলে চম্পা। ও একটা মেয়ে বটে।
ভাতের থেকে বেগুন সরালে আদুরী। একটা সানকিতে রেখে চটকে নিলে। এই বেগুন টার জাত ভালো। ভাতের ফ্যান গেলে কড়া বসালে। তেল দিলে কড়াতে। ঘুষো চিংড়িমাছ ভাজছে। আদুরীর ছেলে এক পা ধুলো নিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলে।
বললে “মাগো। কী মাছ ভাজছিস। ঘুষো?
আদুরী হেসে কুটিকুটি। বলল “তোকে বেগুন চিংড়ি রেঁদে দেবো”।
ছেলে বললে “ওই গল্প টা বল”!
আদুরী উত্তর দেয় “কোন গল্প টা?”
ছেলের চোখ চকচক করে। বলে সেই রে। ঘুষো চিংড়িমাছ। যাকে গলা ফাটা কাকটা বলেছিল “তোকে খাবো লো লো লো লো লো”।
আদুরী বললে “চিংড়িমাছ কী বলেছিল বল”?
ছেলেটা খিলখিল করে হাসছে।তারপর আধো আধো গলাতে বললে “আমাকে খাক।তাতে দুঃখ নেই। কিন্তু লো বললে কেন “?
আদুরী ভাবে এই ছেলেটার কত বুদ্ধি। পৃথিবীর এক আশ্চর্য শিশু কেমন করে জন্মেছে আদুরীর পেটে।
ছেলে বললে “জানিস মা। আজ একটা দাদুকে এই ঘুষোর গল্প বলেছি। কত আদর করলে আমাকে। বললে “খোকা। তোমার বাড়ি কুনখানে”?
তোমার নাম বলতেই বললে আদুরীর ছেলেটার খুব বুদ্ধি”।
আদুরী বুঝতে পারে ওই মানুষ টা তার বাবা। বুকে অভিমান তার। চম্পার মতো আদুরী কখনও হবে না। নতুন করে সংসার বাঁধার স্বপ্ন তার নেই। নতুন কিছু ভাবতেই হবে। ভগমান দুটো হাত দিয়েছেন। উপায় একটা বের করবে সে।
রাতের অন্ধকার যত ঘনিয়ে আসে দুশ্চিন্তা ঘিরে ধরে আদুরীকে। এই বিপুল পৃথিবীর কতটুকুই সে জানে। পাড়া গাঁয়ের অশিক্ষিত পেত্নি সে। কোনও আশ্রয় নেই তার যাকে মনের কথা বলা যায়।
পরের দিন বেশ কিছুটা কলাই ডাল ভেজালে আদুরী। দুপুরে এই ডাল বেটে বড়ি দেবে সে। কতরকমের বড়ি। ভাজা খাবার, ঝোলের। জেলের মেয়ে সে। গৃহকর্মে খুব চটপটে।
আজ কারো বাড়িতে কাজে যাবে না ঠিক করল। এখন চম্পার কাছে যাবে সে। চম্পার মন ভালো। ওর এখন অনেক টাকা। বিশের বড়ো চাকরি। ওর বউ ওকে ছেড়ে গেছে। বিশে চম্পাকে বে করেছে। কাগজে সই করে যে বিয়ে।
গাঁয়ের বুক চিরে যেখানে সড়ক পথ সেখানেই উপস্থিত হল আদুরী। ওর নামটা যেন ওর জীবন কে ব্যঙ্গ করে। সকলের উপেক্ষিতা সে। ওর জীবনের কথা,ওর না পাওয়ার বেদনা, ওর প্রতি প্রতারণার কথা কোনও খানে কেউ জানবে না। নারীত্বের সম্মান না পাক সে, মাতৃত্ব টিকে আছে। তার নাড়ি ছেঁড়া ধন একদিন অনেক অনেক বড়ো হবে। তখন সবাই আঙুল তুলে বলবে “ওই দেখ। একটা মা যাচ্ছে। খোকার মা। তখন পরিচয় হবে আদুরীর।গর্ব হবে তার। কথাতেই আছে “ঘরের গাছা আর কোলের বাছা কখনও বেইমানি করে না।”
দুর্গাপুর যাবার রাস্তার পাশে চম্পার ঘর। সরকারের জমি। এখন আছে। পরে আদেশ এলে উঠে যেতে হবে। দুপাশে গাঁ ষোলো আনার চাষের জমি। মাঝে মাঝেই ডিপটিউযেল। জলের অভাব নেই। চম্পার বাড়ির কাছে গিয়ে বললে “চম্পা। তোর বাড়ির সামনে যে জায়গাটা সরকারের খাস তাতে একটা দোকান খুলব। তুই আপত্তি করবি চম্পা?”
চম্পার খুশি আর ধরে না। বললে “ধুর বোকা! সরকারের খাস জমি। ওর মালিক আমি না কি? তা তুই কীসের দোকান খুলবি ঠিক করেছিস”?
আদুরী আমতা আমতা করে। ঠিক সেই সময়ই কয়েক জন লরির খালাসী আসে। বলে “এখানে কিছু খাবার পাওয়া যাবে”?
আদুরী বললে “তোমরা কতজন আছো?
ওরা দশজন জানালে আদুরী বলে আমি তোমাদের খাবার দেবো। এখনই রান্নার আয়োজন করছি।তোমরা টাকা দাও”।
রাস্তার ধারে আদুরীর রান্না শুরু হল। বেশ কিছুটা ডালবাটা নুন দিয়ে ফেটিয়ে নিলে আদুরী। চম্পা কোদাল দিয়ে গর্ত করে উনান করে দিলে। সরষে আর শুকনো লঙ্কা বাটছে আদুরী। উনানে ভাত ফুটছে। ভাতের গন্ধ খিদেকে বাড়িয়ে দিয়েছে আরও। ঝুড়ি তে ভাত ছেঁকে কড়া বসালে আদুরী। কাঠখড়ি এনে দিচ্ছিল চম্পা। হঠাৎই সে চেঁচিয়ে বললে “অ্যাই দ্যাখ। তোর ছেলে আসছে তোর বাপের সাথে”।
আদুরীর ভয় হয়। বাবা আসছে। আবার বাবা কষ্ট পাবে না তো। এছাড়া আর কী বা করবে সে?
এতগুলো লোক খাবে। হঠাৎই এরা কোত্থেকে উপস্থিত হল। কথাতেই আছে জোগাড় করবে চিন্তামণি। নৈলে অত বড়ো মাছ হাতে সদানন্দ এসে হাজির হবেই বা কেন। ডাক দিল “আদুরী মা। এই মাছ খান ধর”।
অনেক দিন পর বাপের কণ্ঠস্বর শুনে আদুরী আবেগে ভেসে যেতে থাকে।
বাপ কাঁদে,মেয়েও কাঁদে। যেন কতদিন কার অভিমান গলে যায়।
ছেলেটা আধো আধো সুরে বলে “মাছের ঝোল করবি মা”।
বড়া গুলো কড়া থেকে তুলে সরষে লঙ্কা বাটা জলে গুলে জলটা কড়ার মধ্যে দেয় আদুরী। অনেক টা জল। কাঠের উনান উস্কে দেয়। টগবগ করে জল ফুটলে তাতে হলুদ আর নুন দিয়ে বড়াগুলো দিয়ে দেয়। এই বড়ার ঝালদা শুকনো শুকনো নামাতে হবে। কী সুন্দর একটা গন্ধ রান্নার। সবার খিদে পেয়ে যায়।
চম্পা একটা আঁশবঁটি আনলো। বললে “খুড়ো। এই কাতলা মাছ কোথায় পেলে? নিশ্চয়ই ঝিনকের মাছ?”
সদানন্দ মাথা নাড়ে। এই তল্লাটে ঝিনকের মাছ সব থেকে স্বাদ বেশি। চম্পার যেন আনন্দের সীমা নেই। এতবড় মাছ। হাসিমুখ করে বললে “অ আদুরী? মাছের মাথা কে খাবে লো? “
আদুরী মৃদু ধমক দেয় “এতখানি বয়স হল এখনও এসব শেখাতে হবে না কি ? মাথা নয়, মুড়ো বল”।
চম্পা উত্তর দেয় “ঠিক আছে ।মুড়ো। এবার বল তাতে মাছ রাখবো কি না”?
আদুরী বললে “মাছ রাখার দরকার নেই। কানঘেঁষে কাট। কাল মাছের মুড়োর আলুডাল হবে”।
সদানন্দ শীতের মিষ্টি রোদ পোহাচ্ছিল আর নাতির সাথে বকবক করছিল। অস্ফুটে বলল “মুড়োর আলুডাল তো কখনও খাইনি মা”।
আদুরী বললে “কাল রাঁদবো বাবা। আজ বড়ার ঝালদা আর মাছের ঝোল হবে। সাথে ধনেপাতা তেঁতুল ক্বাথ দে মাখবো”।
সদানন্দ বললে “বাঁশ ঝাড় থেকে বরং কটা বাঁশ কেটে আনি। তোর দোকান করে দেবো।সোজা বাঁশ কাটতে হবে”।
চম্পা বললে “আদুরী রান্না করুক। চলো খুড়ো। আমিও যাই।পঞ্চু জ্যাঠা বলছিল যে বাঁশ ছোট্ট তে নুইয়ে থাকে সেগুলো ভালো হয় “
সদানন্দ বলে সে তো প্রবাদ কথা। কাঁচাতে যদি না নোয়ায় বাঁশ/পাকলে করে টাঁশ টাঁশ “।
ওরা চলে গেলে আদুরী ভাবে “ও কথা মানুষের জীবনে সত্যিই। ও যদি তখন বাবার কথা শুনতো তবে এমন হোতো না।
মাছ ধুয়ে নুন হলুদ আর লেবু মাখায় আদুরী। আবার কড়া বসেছে। চম্পার ঘরের চালে দুটো পাখি অনবরত খুনসুটি করে চলেছে। আদুরীর মনে হয় ওরা নিশ্চয়ই সোয়ামী স্তিরি। এই এখনই আবার ভাব হয়ে যাবে। ওরা গা ঘসছে এখন। আদুরীর মনে পড়ে তার সোয়ামীর কথা। তাকে ছেড়ে তবে কি সে অন্য ঘাটে নোঙর বাঁধলো। তার কী কখনও মনে হবে না আদুরীর কথা। কতদিন কত সোহাগ করেছে। কখনও তো মনে হয় নি একদিন সে চলে যাবে। আর আসবে না।
অনেক দেরি হয়ে গেল । তেলটা গরম হয়ে গেছে। মাছ ভাজতে লাগল আদুরী। টাটকা মাছ। পিসগুলো অনেক বড়ো। একপিঠ ভাজা হোক। ততক্ষণে মশলা করে নিল আদুরি। ফালা ফালা করে আলু কাটা। কাতলা মাছের পাতলা ঝোল। পেটের তৃপ্তি। কতদিন এমন মাছ খায় নি সে।
বাঁশ কেটে নিয়ে এল সদানন্দ। এখন নারকেল দড়ি দিয়ে দোকান তুলবে। খাওয়া দাওয়া মিটুক আগে। এই সড়ক পথে রোজ কত গাড়ির আনাগোনা। সবাই যদি আদুরীর রান্না খায় তবে আদুরী দু পয়সার মুখ দেখবে। নাতিটার ভবিষ্যত ভাবনা আছে।
খালাসী চালক মিলে প্রায় পনের জন খেলো। মাথা পিছু দুশো টাকা নিলে আদুরী। তারপর তাদের আনন্দ টা উপরি পাওনা। ওদের গাড়ি খারাপ হয়ে গেছে। কদিন এখানেই খাবে। সাথে আরও দু একজন খদ্দের। সবাই কে খাইয়ে ওরা খেতে বসলো। চম্পা বললে “তোর দুকানের নাম কী দিবি লো”।
ছেলেটা খেতে খেতে আধো আধো স্বরে বলল “মাছের ঝোল “।
বৃদ্ধ সদানন্দ বললে “সেই ভালো। দোকানের নাম মাছের ঝোল থাক। আমরা বাঙালী। মাছ না হলে বাঁচি নে। তার উপরই জেতে জেলে। আমার নাতির কথা থাক”।
কয়েক টা চেয়ার টেবিল জোগাড় করল সদানন্দ। আর বড়ো করে কাগজের সাইনবোর্ড দিলে মাছের ঝোল।
চম্পা বললে রাতের বেলা আলোর জোগান আমার বাড়ি থেকেই দেবো। এরা রাতে খাবে।”
আদুরীর বাড়ির উঠানে বেগুন গাছ। বড়ো বড়ো বেগুন ধরে আছে। রাতে রুটির সাথে বেগুন মহারাণী রাঁদবে। একবার বাড়িতে এল আদুরী। এই কাজে লাভ বেশি। লোকের বাড়ির ঠিকা কাজ আর সে করতে পারবে না।
এদিকে ঘরে ঢুকতে যা দেরী। বোসগিন্নী এসে হাজির। বললে “তোর কী আক্কেল আদুরী। সকাল থেকে তোর পাত্তা নেই। বাড়ির সিষ্টির কাজ পড়ে আছে। কে করবে ওসব।তোর বাপ!”
শেষ কথাটাতে আদুরীর রাগ হল। বলল “দেখো কাকী।আমাকে যা বলার বলো। আমার বুড়ো বাপের কথা আনবে না। সে তোমাদের কোন পাকা ধানে মৈ দিলে শুনি?”
বোস গিন্নিমা চোখ কপালে তুলে বললে “বুঝেছি। ওই কালনাগিনী চম্পার পাল্লাতে পরিচিস। তাই অমন মুখের উপর বুলি দিচ্ছিস”!
আদুরী চুপ করে যায়। প্রবলের কাছে সে নিতান্তই দুর্বল। এই দুর্বল অবস্থার জন্য তার সোয়ামী দায়ী। একটা কান্না দলা পাকাল ওর গলার কাছে।শান্ত করে বললে “কাকী। ঠিকা কাজে আমার সংসার চলে না। তাই দোকান খুলেছি।”
দুমদুম পা ফেলে বোস গিন্নিমা চলে গেল আর নিমেষের মধ্যেই রাষ্ট্র হয়ে গেল। পুকুর ঘাটে মিত্তির রাষ্ট্র বললে “দোকান খুলেছে। নাম আবার মাছের ঝোল “।
বিভিন্ন ব্যঙ্গ বিদ্রুপ আদুরীকে খোঁচা দিতে লাগল। এতদিন আদুরী যাদের আত্মার আত্মীয় ভাবতো তারা কোন ক্ষমতা বলে যেন আদুরীর শত্রু হয়ে গেল। আদুরীর কী তবে নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার নেই। সে তো সৎ পথে কিছু উপার্জন করতে চায়। তার নাড়ি ছেঁড়া ধন কে মানুষ করতে চায়।
আদুরী দমবে না। একটা আশার আলো সে দেখতে পাচ্ছে। সরকারের খাস জমিতে একটা দোকান। মাছের ঝোল নামটা খারাপ কি? বাঙালির প্রিয় খাবার মাছ। এখানে টাটকা মাছ পাওয়া যাবে যখন। ছেলের জন্য এতকিছু হল। নৈলে বাপটা আসতো না। এখন আদুরীকে কে থামাবে।
আদুরীর পুঁজি নেই বললেই চলে। সকালের টাকাটা আঁচলের খুঁটে বেঁধে রেখেছে সে। খুব কম খরচে মানুষ এর কাছে সুন্দর রান্না তুলে ধরবে সে। ওর বাড়ির উঠানে বেগুন গাছ গুলোতে এত্ত বেগুন। ওগুলো দিয়ে রাঁধবে বেগুন মহারাণী।
সদানন্দ হাসলে। “বললে একেবারে মহারাণী। তাহলে তো জমে ক্ষীর”।
পাঁচশ টাকা বাবার হাতে দিয়ে আদুরী ফর্দ করে দিলে। টুকিটাকি কত জিনিস। আবার কাল বিক্রির পর বেশকিছু টাকা হবে। সদানন্দ চলে গেল। ঘরে একটা পিদিম জ্বালিয়ে ছেলেকে নিয়ে আদুরী চলল। গিয়ে চক্ষু চড়কগাছ। চারদিক আলোর ফিনকি ফুটছে। চম্পার জন্য এটা সম্ভব হল। ওর ঘরে বিশে ছিল। বেরিয়ে এসে বললে ‘আমার দশটা রুটি আর বেগুন মহারাণী লাগবে। এই দুশো টাকা ধরো”।
বড়ো গামলাতে জল ভরে তাতে বেগুন কেটে ধুয়ে নিল আদুরী। বড়ো করে কাটা। প্রথমে ভেজে নিলো বেগুন গুলো। তারপর কালোজিরে কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিলে। পেঁয়াজ কুচি তারপর দিলে। এদিকে কাজু, চারমগজ আর পোস্ত বাটা রেডি। ভাজা পেঁয়াজ এর ওপর দিয়ে লঙ্কা হলুদ আর নুন দিলে। এরপর টক দৈ দিয়ে ভাজা বেগুন দিয়ে কষালে। চম্পা বললে “সত্যিই মহারাণী”।
মহারাণীর কদরে রুটি বিক্রির ধুম পড়ল। সদানন্দ বললে “তোর হাতের গুণ আছে বটে মা। খুব সোয়াদ “।
আদুরীর মাথাতে চলে পরের দিনের চিন্তা। লাভ করতে হবে আবার খদ্দের রাখতে হবে। কাল সে কী রান্না করবে রাতের মধ্যেই ঠিক করতে হবে। সদানন্দ বললে ‘আড়ত থেকে মাছ কিনলে দাম কম হবে। আমি ভোরে মাছ এনে দেবো”।
আদুরী ঘাড় নেড়ে সায় দেয়।
শীতের ভোরে সদানন্দ মাছ আনতে যায়। মেয়েটার বাড়িতেই এখন তার থাকা। যতদিন খাটতে পারতো ততদিন ছেলে বউ এর সংসারে তার কদর ছিল। এখন কেউ তাকে মানতে চায় না। সে যে বাড়ির কর্তা সেটা নামেই। এখন সংসারের মধ্যেই রাজনীতি। সেদিন ছেলেরা আলোচনা করলে প্রত্যেকের সংসারে বাপ একমাস করে খাবে। সদানন্দ বুঝতেই পারল সংসারের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। এই মেয়েটার কাছেই সে শান্তি পায়। এখন সে সবাই কে বলে “ছেলের থেকে মেয়ে ভালো”।
বাবা চলে গেলে আদুরী মাঠের দিকে গেল। কত বেতো শাক আলুজমিতে। আলুজমি টানা হয়ে গেলে এগুলোর অস্তিত্ব থাকবে না। আঁচল ভর্তি করে শাক তুলল সে। এই প্রকৃতির দান কী কম? ঘরের পোরোলে একটা মানগাছ হয়েছে। অমৃতমান। একদিন ওর ডাঁটা খেয়েছিল। একটুও চুলকানি নেই। মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল “মান দিয়ে মাছের ঝোল করবে। অনেক দিন আগে যখন নতুন বিয়ে হয়েছিল তখন সুরেশ কে একবার খাইয়েছিল। কত খুশি হয়েছিল সুরেশ। কোথায় যে গেল মানুষ টা কে জানে”।
শাক তুলে বাড়ি আসছিল আদুরী। ঘোষেদের নাচের কাছে আসতেই ওরা ডাকলে “হ্যাঁ লা আদুরী। তুই কাজ ছেড়ে দোকান খুললি। ওখেনে কি রোজ মাছের ঝোল হয় না কি লো। “
আদুরী হাসিমুখ করে বললে ‘হ্যাঁ। কাল মান দিয়ে মাছের ঝোল হবে। সাথে বেতো শাক এর ঘন্ট”।
ঘোষ গিন্নিমা বললে “আমি বিধবা মানুষ। মাছের খোঁজে আমার কী? তা হ্যাঁ রে আদুরী, সে ছোঁড়া কুতায়? বলি রোজ রোজ মাছের ঝোল রাঁধছিস,খাচ্ছিস আর সোয়ামীর খবর রাখিস না। সে কী বেঁচে আছে আদৌ? শাঁখা সিঁদুর পরে নেচে বেড়াচ্ছিস “।
ঘোষ গিন্নিমা বলতে থাকলে থামে না। আদুরী কখনও এমন করে ভাবে নি। এইসব ক্ষুরধার বাক্যবাণ তাকে যেন জর্জরিত করে তুলল। পথে আসতে তার পা দুটো কাঁপতে লাগল। এত নিষ্ঠুর এই সমাজ। আদুরীর শরীর যেন অবশ হতে থাকল “।
আদুরীর জীবনের পট পরিবর্তন হয়েছে। গড় গড়িয়ে চলছে তার মাছের ঝোল। কতরকমের রান্না মাথা থেকে বের করতে হয় তাকে। ভালো আয় করতে না পারলে চলবে কেন? গ্রামের আনাচে কানাচে শাকের অভাব নেই। আর বাপের সুবাদে সস্তাতে মাছের জোগান। নম্র বিনয়ী আদুরীকে খদ্দের দের ভালো লাগে।
সেদিন বেতো শাকের পোস্ত করবে ভেবেছিল। নতুন জিনিস। চম্পা বাধ সাধলে। বললে “তোর কী মাথা খারাপ হয়ে গেছে? পোস্ত খাইয়ে লাভ করবি। তার থেকে সরষে লঙ্কার ঝাল কর”।
আদুরীর মন সায় দেয় না। খদ্দের হল গিয়ে লক্ষ্মী। আবার চম্পার কথাটা ফেলে দেবার নয়। সত্যিই তো। সে ব্যবসা করতে নেমেছে। আবেগে ভাসলে কী করে হবে!!
আদুরীর মাথা আজকাল বিদ্যুত এর মতো খেলে। বস্তাতে তিল এর খোসা ছাড়িয়ে কৌটো ভর্তি করেছে সে। বেশ খানিক টা তিল বেটে নিল আদুরী। তারপর খানিক পোস্ত। বেতো শাক বালতিতে ফেলে ধুয়ে নিল। আলু ডুমো ডুমো কেটে ধুয়ে নিল। বেশ খানিক পেঁয়াজ বাটলে। কড়ার মধ্যে তেল দিয়ে তাতে আলু গুলো ভাজতে লাগল।
তারপর তাতে পেঁয়াজ বাটা, হলুদ আর লঙ্কা দিয়ে কষালো। অল্প জল দিয়েছিল। এরপর তিল বাটা আর নুন দিলে। বেতো শাক দিয়ে কড়াতে ঢাকা দিল। শাকের জলে আলু ও সিদ্ধ হল। নামাবার আগে পোস্ত টা দিলে।
কে বলবে ওটা তিলবাটার তরকারি। চম্পা গজগজ করতে থাকে। অতটা পোস্ত দিয়ে হোটেল চালাবি। পুঁজিবাটা বেলেঘাটা হয়ে যাবে। দেখিস এখন।
সবাই খেতে বসে অবাক। এত পোস্ত দিয়েছে বেতোশাকে। কী অপূর্ব। সাথে মাছের ঝোল। মান দিয়ে মাছের ঝোল। তোফা খাওয়া । কয়েক জন বিহারী খেতে বসে হিন্দিতে কথা বলছিল। কিছু কিছু হিন্দি আদুরী বোঝে। তার কান ওদের দিকে।
ওরা যখন কথা বলছিল তখন আদুরীর কানে এসেছিল সুরেশ নামটা। তবে কি এরা সুরেশ কে চেনে? ওই সুরেশ কি সেই সুরেশ যে তাকে বিয়ে করেছিল? একটা কৌতুহল আর চিন্তার মধ্যেই থাকল আদুরী।
লোকটা বলছিল সুরেশ কাল এই হোটেলে আসবে। এখানকার খাবার খুব ভাল। আদুরীর মনে হল ধুর!কী সব ভাবছে ও। সুরেশ যদি সত্যিই আসতো তবে তার সাথে নিশ্চয়ই দেখা করত।
যদি সুরেশ হয় আদুরী তাকে আবার বেঁধে রাখবে। সত্যিই সে তার কাছে থাকবে তো। সেদিন ঘোষেদের বাড়ির কীর্তনের আসরে রাধার কষ্ট শুনে আদুরীর চোখের জল বাগ মানেনি। ভালোবাসার মর্ম আদুরী এখন বুঝতে পারে।
আজ খুব শীত পরেছে।এত শীতের আহার পাহার রাত আগে কখনও হয় নি। সদানন্দ বললে ‘এত শীতে জেলেরা আজ কেউ জলে নামতে পারবে না। কদিন আড়তে খোকা ইলিশ এর আমদানী খুব। ওই এনে দেবো”।
আদুরীর মনে আনন্দ ধরে না। ইলিশ মাছ!যদি সুরেশ সত্যিই আসে তবে তাক লাগিয়ে দেবে সে। ইলিশ মাছ ভীষণ ভালোবাসতো সুরেশ। কাল ও রান্না করবে ।
সরষে ইলিশ, বেগুনের ভর্তা আর লাউ দিয়ে ডাল। বেগুন ভর্তাতে ডিম ফাটিয়ে দেবে। যদি একবার সুরেশ আসে তবে আদুরীর আর ভয় নেই। সে জানবে তার সোয়ামী বেঁচে আছে। সে সাজবে,শাঁখা সিঁদুর পরবে, মাছ খাবে তৃপ্তি করে।
অনেক ভোরে উঠল আদুরী। পাঁচিলের উপর বসে একটা কালপেঁচা। কী কুয়াশা আজ। কিছু দেখা যাচ্ছে না। বাবা চলে গেছে মাছ আনতে।
হোটেলের দিকেই চলল আদুরী। রাতে ভালো ঘুম হয় নি। তার মন বলছে সুরেশ আজ আসবে। কোন মন্ত্রবলে একটা বিশ্বাস তার মনের গহীনে বলছে সে আসবে। আদুরীর ভালোবাসার মৃত্যু হবে না। খোকা আবার তার বাবাকে ফিরে পাবে।
উঠোন এর বেগুন গাছ থেকেই বেগুন তুলেছিল আদুরী। ঘরের চালে লাউগাছে এই সবে জালি ধরেছে। প্রথম লাউটা পাড়ল।
কী কচি। লাউ দিয়ে ডাল পেট ঠান্ডা রাখে।
আদুরীর আগে ডালটা সিদ্ধ করতে দেয়। তারপর লাউ কাটতে বসে। কুচি কুচি কেটে ধুয়ে আধ সিদ্ধ ডালে ফেলে দেয়। লাউ আর ডাল সেদ্ধ করে রেখে দেবে।নুন,হলুদ দিয়েছে। কী চাপ চাপ ডাল। পরে সাঁতলে নেবে। এখন বেগুন কাটতে বসল। বেগুন ভর্তা সুরেশ খুব পছন্দ করে।
কড়ার তেলে বেগুন আর টমেটো ভেজে নেয় আদুরী। তারপর বড়ো সানকিতে কষটাতে থাকে। কড়ার মধ্যে পেঁয়াজ রসুন লঙ্কা ভাজে। ওতে ডিম ফাটিয়ে ভুজিয়া করে টমেটো বেগুন মাখা দিয়ে রান্না করে। কী অপূর্ব গন্ধ। নাকে এলেই খিদে পেয়ে যায়।
আদুরীর আবার মনে পড়ল সুরেশ এর কথা। ছোটো ছেলের মতো হাত পাততো। আদুরী মৃদু ধমক দিতো। ইসসস!এখনই খাবে বুঝি!
চোখে জল আসে আদুরীর। জীবনের সেই পরম ক্ষণ কখনও কোনও মানুষ ভুলতেই পারে না।
চম্পার চোখ কপালে ওঠে।চেঁচিয়ে ওঠে “কী বিড়বিড় করে বকছিস। এই ভোরে রান্না। তোর কী মাথা খারাপ হল আদুরী”?
সদানন্দ ইলিশ এনেছে। রুপোর মতো চকচকে ইলিশ। বেশ বড়ো। একেকটা পাঁচশ ওজন হবে। ভাত বসিয়ে দিলে আদুরী। মাছ কাটতে বসে হাতটা কেটে গেল। চম্পা বললে তুই ওঠ। অমন আনমনা কেনে বল দিকি?”
আদুরীর মনের অবস্থা চম্পা কী করে বুঝবে। আদুরী আজ যেন ভগবানের ভোগ রান্না করছে।
ভাতটা নামিয়ে শুকনো লঙ্কা আর গোটা জিরে দিয়ে ফোড়ন দিলে। এবার মাছ রান্না করবে। সরষে পোস্ত বাটা দিয়ে ইলিশ। মাছ হালকা ভাজলে আদুরী। তারপর মশলা দিয়ে মাছ যখন ফুটছে তখন মুখে জল দিয়ে আয়নাতে মুখ দেখলে আদুরী। এ কী অবস্থা মুখের। কতদিন আয়না দেখেনি। সুরেশ তাকে চিনতে পারবে না। ব্যাগ থেকে সিঁদুর কৌটো বার করে সিঁথি রাঙালে। কপালে টিপটা পরতে যাবে অমনি একটা চিৎকার কানে এল। আদুরীর হাত থেকে সিঁদুর কৌটো আচমকা মাটিতে। আঁতকে উঠল আদুরী। ওই বিহারী গুলো কাকে চ্যাংদোলা করে আনছে। রক্ত!অনেক রক্ত! আদুরীর দোকানের দিকে আসছে। যখন কাছে এল তখন আদুরী ভীষণ চিৎকার করে কেঁদে উঠল।
নেই। সুরেশ নেই। ঘন কুয়াশার মধ্যেই গাড়ি চালাচ্ছিল। তারপর,,,,
মাছের ঝোল তখনও ফুটছে।
সমাপ্ত
![]()







