তোমাতে আমার ঠিকানা (সপ্তম পর্ব)
বারিদ বরণ
পরের দিন দুপুর।
সরকারি হাসপাতালের ভিড়ভাট্টার মাঝখানে এক ধুলো জমা, চাদরে দাগ ধরা শয্যা, অভির পিঠের ঘামে স্যাঁতস্যাঁতে।
সেই খাটেই শুয়ে আছে অভি।কপালে সাদা ব্যান্ডেজ, গালে শুকনো রক্তের দাগ।হঠাৎ চোখ ফাঁক করতেই তার সামনে ফুটে উঠল ম্লান সাদা দেওয়াল, খসে পড়া চুনকাম আর গরমে ঘামতে থাকা রোগীদের ভিড়।
চমকে উঠে বসতে গেল সে।
কিন্তু মাথায় যেন আগুনের মতো ব্যথা ছুটে এল।
অভি ককিয়ে উঠল,
“আঃ… মা গো!”
পাশে বসা শুভদা তাড়াতাড়ি ঝুঁকে পড়ল।
আতঙ্কিত গলায় বলল,
“এই যে! কী করছিস তুই?
ডাক্তার বলেছে এখনই উঠে বসা যাবে না।আরও রক্ত ঝরবে।”
অভি আবার শুইয়ে পড়ল, চোখ বুজল।হাঁপাতে হাঁপাতে দুর্বল কণ্ঠে বলল,
“শুভদা… সুচি কেমন আছে?
ওকে কিছু হয়নি তো?”
শুভদা অভির কাঁধে হাত রাখল, চোখে আশ্বাস।
“চিন্তা করিস না।ও এখন নিরাপদে আছে, বড় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।ডাক্তাররা বলেছে বিপদ কেটে গেছে।”
অভির মুখে হালকা হাসি ফুটল।
চোখ ভিজে উঠল অজান্তেই।
হঠাৎ হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল শুভদার হাতে,
ফিসফিস করলো,
“ভালোই হলো… আমি যদি না থাকি তাও… ও যেন বেঁচে থাকে।”
শুভদার বুকটা কেমন যেন ভারী হয়ে উঠল।সে অভির হাত শক্ত করে ধরল, তারপর হঠাৎ রাগে গলা কাঁপতে লাগল।
শুভদা কঠিন গলায় বলল,
“কি সব আজগুবি বলছিস তুই অভি?না থাকিস মানে কী?
তুই কি শুধু ওর জন্যই বাঁচবি?
তোর নিজের স্বপ্নের কি হবে?
তুই কি ভুলে গেছিস তুই বলেছিলি—
একদিন ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট হবি,মানুষের জন্য লড়বি?
তোর বাবা মা গ্রামে বসে কী আশায় আছে জানিস?তারা তোকে ভরসা করে, তোকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে।তুই কি ওদের ভরসা ভাঙবি?”
অভি চুপ করে শুয়ে রইল।চোখের কোণে জল জমে উঠল।
সে ঠোঁট কামড়ে ধীরে বলল,
“শুভদা… আমি হাল ছাড়িনি।
কিন্তু… ওর কথা ভাবলেই বুকটা হালকা হয়ে যায়।”
শুভদা এবার কণ্ঠ নরম করল, মাথায় হাত রাখল।
“আমি জানি রে, তুই মানুষকে ভালোবাসিস, এটাই তোর সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু মনে রাখ—
তোর লড়াই অনেক বড়।সুচিকে পাশে চাইলে চাই,কিন্তু নিজের স্বপ্নটাও আঁকড়ে ধরতে হবে।”
অভি ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।তার চোখে তখন একসাথে বেদনা আর দৃঢ়তার ছাপ।
শুভদা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
অভি শুয়ে আছে, চোখে জল।
তারপর হঠাৎ শুভদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“অভি, শুন।সুচরিতা খুব ভালো মেয়ে, আমি জানি।কিন্তু তুই ভুলে যাস না—সে সেন সাহেবের মেয়ে।ওর কিছু হবে না রে, ওর পাশে সব সময় টাকা, ক্ষমতা, বড় বড় ডাক্তার আছে।কাল দেখলি না, অ্যাম্বুলেন্স, প্রাইভেট হাসপাতাল, কতো লোক ছুটলো?”
অভি নিঃশব্দে শুনছিল, চোখ নামানো।
শুভদা এবার আরও দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“কিন্তু তুই?তোর এখনো অনেক দূর যেতে হবে।তুই তো শুধু নিজের জন্য না, পুরো গ্রামটার, তোর মা-বাবার, আর যতো গরিব ছেলেপুলের ভরসা।
তুই যদি আজ হাল ছেড়ে দিস,
তাহলে তোর স্বপ্নের কি হবে, বল?”
অভির বুকটা কেঁপে উঠল। সে ঠোঁট কামড়ে ধীরে ধীরে বলল,
“তুমি ঠিকই বলছ শুভদা…
আমি দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম।”
শুভদা এবার একটু হাসল, অভির কাঁধে হাত রাখল,
“এইবার প্রতিজ্ঞা কর—
আবার দাঁড়াবি, আবার লড়বি।
সুচিকে রক্ষা করতে চাইলে করিস,কিন্তু আগে নিজেকে গড়।
কারণ তোকে এখনও অনেক দূর হাঁটতে হবে বাবা।”
অভির চোখে জল জমলেও এবার সেই জলের আড়ালে এক ঝলক দৃঢ়তা ফুটে উঠল।
শুভদা একটু চুপ করে অভির দিকে তাকাল।অভির চোখে তখনো অশ্রু ঝিকমিক করছে।
শুভদা নরম গলায়, কিন্তু কঠিন সত্যি শোনাল,
“অভি, তুই আর একটা খুব বাস্তব কথা ভেবে দেখেছিস কি কোনোদিন? সুচরিতা কে তুই ভালোবাসিস বা পাশে দাঁড়াতে চাইছিস—ভালো কথা। কিন্তু বল তো, ওর সাথে তোর ফারাকটা কি তুই বুঝিস?”
অভি চমকে তাকাল শুভদার দিকে।
শুভদার চোখ গরম হয়ে উঠল,
“ও সেন সাহেবের মেয়ে।ওর চারপাশে আলো, টাকা, প্রভাব—সব আছে।তুই কী? কি আছে রে তোর ?
–ছেঁড়া জামা, মাথা ফাটা স্বপ্ন, আর হাজারটা কষ্ট?
তুই চাইলে সুচির পাশে দাঁড়াতেই পারিস,কিন্তু সেই যোগ্যতা কি অর্জন করেছিস?আজও দেখ—ও বেসরকারি হাসপাতালের এয়ার কন্ডিশনড রুমে শুয়ে আছে,আর তুই? সরকারি হাসপাতালের ধুলো জমা খাটে।”
অভি থম মেরে গেল।তার বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।চোখে জলের পর্দা ভেসে উঠল।
অভি ফিসফিস করে বলে,
“মানে, আমি… আমি কি কখনোই ওর সমান হতে পারব না শুভদা?”
শুভদা এবার অভির হাত শক্ত করে ধরল।দৃঢ় গলায় বলল,
“পারবি রে, অভি!কিন্তু আজ না।তোকে এখনও অনেক পথ হাঁটতে হবে, অনেক লড়াই করতে হবে।যোগ্যতা অর্জন কর, নিজের স্বপ্ন পূরণ কর, তারপর দাঁড়াস ওর পাশে।সেই দিন সুচিও তোকে নিয়ে গর্ব করবে।”
অভির চোখে ব্যথা আর জেদের মিশ্রণ ফুটে উঠল।সে ঠোঁট কামড়ে মাথা নেড়ে বলল,
“ঠিক বলেছ, শুভদা…
আমি এখনো প্রস্তুত নই।কিন্তু আমি হবই।আমি প্রমাণ করব।”
কথার ঝড় শেষে ঘরে নীরবতা নেমে এসেছে।
অভি শুয়ে আছে, চোখ বন্ধ, বুকের ভেতরে জেদ আর যন্ত্রণা একসাথে ঘুরপাক খাচ্ছে।শুভদা তার পাশে বসে, ধীরে ধীরে মাথায় হাত বুলিয়ে যাচ্ছে।
ঠিক তখনই দরজার বাইরে হালকা শব্দ।
বাবু ভেতরে ঢুকল।
মুখে একটু ক্লান্তি, তবে চোখে স্বস্তির ঝিলিক।
বাবু উচ্ছ্বাসে বলল,
“অভি দাদা! অবশেষে তোমার মুখে কথা শুনতে পেলাম।আমি তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।”
অভি মাথা ঘুরে তাকাল, মৃদু হেসে বলল,
“আমি আছি বাবু… বেঁচে আছি।”
বাবু তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রাখল।আশ্বস্ত গলায় বলল,
“হ্যাঁ দাদা, তুমি আছো—এটাই অনেক বড় ব্যাপার।তোমাকে দেখে আমার বুকটা হালকা হল।”
একটু থেমে বাবুর মুখে একরাশ মিষ্টি গম্ভীরতা ফুটে উঠল।
আস্তে আস্তে বলল,
“শোনো দাদা, একটা খবর দিই…
সুচিদি এখন অনেকটা ভালো আছে। ডাক্তাররা বলছে ধীরে ধীরে সেরে উঠছে।কিন্তু জানো তো?…”
অভির বুক ধক করে উঠল।
আতঙ্কিত গলায় জিজ্ঞাসা করলো,
“কিন্তু কী, বাবু?”
বাবু ঠোঁটে হাসি এনে বলল,
“কিন্তু সুচিদি একটানা তোমার খোঁজ করছে।বারবার বলছে—”অভি দাদা কেমন আছে? ও কি ভালো আছে?”
“আমি না বললে শান্তি পাচ্ছে না।”
অভির চোখে হঠাৎ জল ভরে উঠল।ক্লান্ত মুখে একরাশ তৃপ্তি আর মমতার হাসি ফুটে উঠল।সুচির খোঁজ নেওয়ার কথা শুনে তার অন্তরে যেন এক নতুন আলো জ্বলে উঠল।
শুভদা চুপচাপ তাকিয়ে রইল, মনে মনে বলল,
“এমন সম্পর্ক, এমন টান… সমাজের বাঁধনেও সহজে ভাঙবে না।”
অভি চোখ নামিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“তোর সুচিদি… আমার খোঁজ করছে…”
তার ঠোঁটে চাপা হাসি ফুটে উঠল, কিন্তু চোখে জমে থাকা জল গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে।
বাবু পাশে দাঁড়িয়ে গর্বভরে তাকিয়ে রইল।তার মনে হচ্ছিল, যেন অভির এই কষ্টের লড়াই কোনোভাবে সুচির ভালোবাসায় সার্থকতা পাচ্ছে।
শুভদা চুপচাপ বসে সব দেখছিল।তার চোখে অভির হাসি ধরা দিলেও মনের ভেতরে তীব্র একটা প্রশ্ন কিলবিল করে উঠল।
শুভদা মনে মনে নিজেকে উদ্দেশ করে বলল,
“হ্যাঁ, আমি জানি দুজনের টানটা সত্যি, খাঁটি…কিন্তু এই সম্পর্ক কি টিকবে?
আকাশ-পাতাল ফারাক ওদের মধ্যে।একদিকে সেন সাহেবের অট্টালিকা, ক্ষমতা, ঐশ্বর্য…
অন্যদিকে আমার এই অভি—একটা গরিব ঘরের ছেলে, যার পকেটে আজও দুটো পয়সা জোটে না।কোনোদিন যদি সমাজ, পরিবার, কিংবা সময় এই সম্পর্ক ভেঙে দেয়,
তাহলে তো বেচারার প্রাণটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে।”
শুভদার বুকের ভেতর হঠাৎ একটা অজানা ব্যথা চেপে বসল।সে ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে অভির মাথায় হাত রাখল, যেন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল,
“যা-ই হোক, যতটুকু পারি আমি অভির পাশে দাঁড়াবো।কারণ আমি চাই না, ওর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্বপ্নটা ভেঙে গিয়ে ওর বুকটা খালি হয়ে যাক।”
বাবু বাইরের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো ।
দিনভর ব্যস্ত হাসপাতালের করিডোরে সন্ধ্যার আলো মিশে এসেছে।হঠাৎই ডাক্তার বাবু সাদা কোট পরে ঢুকলেন ওয়ার্ডে।
অভি চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিল, শুভদা তার মাথার পাশে বসা।
ডাক্তার বাবু অভিকে পরীক্ষা করে নরম গলায় বললেন,
“চিন্তার কিছু নেই। রোগী আগের থেকে অনেকটাই ভালো আছে।
আজ রাতে আমরা আরেকটু অবজারভেশন রাখব।সব ঠিক থাকলে কাল ছেড়ে দেওয়া হবে।
তবে অন্তত দু’সপ্তাহ ওকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে।”
শুভদার মুখে একটু স্বস্তির ছায়া নামল।
বাবু তখনও করিডোরে দাঁড়িয়ে ডাক্তার বাবুর কথা শুনছিল, মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
অভি আধখোলা চোখে ডাক্তারকে দেখল, মৃদু গলায় বলল,
“ডাক্তারবাবু… আমি তো খুব তাড়াতাড়ি কাজে ফিরতে চাই। পড়াশোনাও আছে।”
ডাক্তার একটু হেসে মাথা নাড়লেন,
“পড়াশোনা, কাজ—সবই হবে। আগে শরীরটা ঠিক করো।মনে রেখো, তুমি যদি ভেঙে পড়ো তবে তোমার স্বপ্নগুলোও ভেঙে পড়বে।”
এই কথাগুলো শুনে অভি চুপ করে গেল, যেন ভেতরে কোথাও এক দৃঢ় সংকল্প আরও মজবুত হলো।
ডাক্তার চলে যাওয়ার পর ঘরে যেন একটা হালকা প্রশান্তি নেমে এলো।অভির মাথার পাশে বসা শুভদা গভীর নিঃশ্বাস ফেলল।
শুভদা হেসে বলল,
“দেখলি তো? ডাক্তারবাবু বললেন সব ঠিক হয়ে যাবে। তবে এবার কিন্তু বেয়াদপি করলে চলবে না… শরীরটা ভালো করে না সামলালে আমি তোকে ছেড়ে কথা বলব না।”
অভি মৃদু হেসে চোখ নামাল। কণ্ঠে দুর্বলতা,তবুও শান্ত সুরে বলল,
“শুভদা, তুমি পাশে আছ বলেই তো এ যাত্রা টিকে গেলাম।”
শুভদা হাত নেড়ে বিরক্তির ভান করল,
“এইসব নাটক কোরো না। তোর অনেক পথ বাকি, মনে রাখিস। তবে… এখন শুধু বিশ্রাম। বুঝলি?”
এই সময় বাবুও উঠে দাঁড়াল।
“দাদা, আমি যাচ্ছি। কাল আবার আসব।আর হ্যাঁ সূচি দিদিও ভালো আছে, তাই তুমি একদম চিন্তা কোরো না।”
অভির চোখে এক মুহূর্ত আলো খেলে গেল। ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটল, কিন্তু সে কিছু বলল না।
বাবু বিদায় নিল।
শুভদা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমি এখন মেসে যাই। রাতের খাবার নিয়ে আসব। রাতে তির সাথেই থাকবো রে।তোকে একা রেখে যাব না।”
অভি নীরবে মাথা নাড়ল।শুভদার পায়ের শব্দ করিডোরে মিলিয়ে গেল।
বাইরে হাসপাতালের উঠোনে রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে, দূরে কুকুর ডাকছে।ঘরের ভেতরে অভি শুয়ে রইল একা—কিন্তু তার ভেতরের শূন্যতা ভরে উঠছিল এক নামের প্রতিধ্বনিতে,
“সুচি… সুচি…”
হাসপাতালের আধো অন্ধকার ঘরে নিস্তব্ধতা। দেওয়ালের সাদা ছোপে টিউব লাইটের হালকা আলো, আর দূরে কোথাও নার্সদের আসা-যাওয়ার ক্ষীণ শব্দ।
অভি চোখ বন্ধ করল। শরীরের ক্লান্তি তাকে শুইয়ে রেখেছে, কিন্তু মন? মন যেন বিক্ষুব্ধ সমুদ্র।
সে ভাবতে লাগল,
“এ কী হচ্ছে আমার? আমি তো এসেছিলাম শুধু পড়াশোনার জন্য। বাবা ভ্যান চালায়, মা দিনমজুরি করে, সেই সংসারটার ভার তো আমার কাঁধে। আমি কি ভুলে যাচ্ছি সব? শুধু একটা মেয়ের জন্য?”
তবে পরক্ষণেই সূচির মুখ ভেসে উঠল তার চোখের সামনে।সেই দৃঢ় দৃষ্টি, যখন বস্তির ভিড়ে দাঁড়িয়ে সে প্রতিবাদ করেছিল।
সেই মমতা, যখন সবাই তাকে এড়িয়ে গিয়েছিল অথচ সূচি এগিয়ে এসে বলেছিল,
“আপনি গরীব হতে পারেন, কিন্তু যোগ্যতার জোরেই এখানে এসেছেন।”
অভির বুক কেঁপে উঠল।
“আমি কি তবে… সত্যিই ওকে ভালোবেসে ফেলেছি?”
তার মন আবার দ্বিধায় ডুবে গেল,
“কিন্তু আমি কে? এক মাটির ঘরে জন্মানো ছেলে, প্রতিদিন সংগ্রাম করে বাঁচতে শেখা এক মানুষ। আর সূচি? সেন জুয়েলার্সের রাজকন্যা! যার সামান্য কষ্ট হলেও পুরো শহরের সেরা ডাক্তার, সেরা হাসপাতাল দৌড়ে আসে। সেই মেয়ের পাশে আমি কীভাবে দাঁড়াবো? আমার কি সেই অধিকার আছে?”
মাথার যন্ত্রণায় চোখ ভিজে উঠছিল, কিন্তু আসলে সেই ব্যথা শুধু শরীরের ছিল না—ছিল মনেরও।অভি যেন নিজেকেই প্রশ্ন করতে লাগল,
“ভালোবাসা কি শুধু হৃদয় দিয়ে হয়? নাকি এর জন্য দরকার সমান সামাজিক অবস্থান? যদি সত্যিই আমি ওকে ভালোবেসে ফেলি, তবে কি ওর জীবনে বোঝা হয়ে দাঁড়াবো?”
এক মুহূর্তে আবার ভেতরের কণ্ঠস্বর জেগে উঠল,
“না, সূচি আলাদা। ও কেবল ধনীর মেয়ে নয়। ওর চোখে যে আগুন আছে, যে সাহস আছে, ও যে স্বপ্ন দেখে—সেই স্বপ্ন তো আমার সাথেই মেলে। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন।”
অভির ঠোঁটে অচেতনেই হালকা এক হাসি ফুটল।
“হয়তো এটাই ভালোবাসা। ভয়, দ্বিধা, অপরাধবোধ—সব কিছুর মাঝেও যখন একজন মানুষ তোমার মনে আলো জ্বালায়।”
অভি ঘুমিয়ে পড়ল।
কিন্তু ঘুমের ভেতরেও তার কানে বাজছিল সেই নাম—
“সুচি…”
সরকারি হাসপাতালের করিডোরে দিনের আলো পড়েছে। জানালার ফাঁক গলে হালকা রোদ এসে অভির বিছানার পাশে পড়ছে।শরীর কিছুটা স্বস্তি পেলেও মাথার যন্ত্রণা এখনো রয়ে গেছে।
অভি এক পাশ ফিরে চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিল।
নিঃশব্দে তার পাশে এসে দাড়ালো বাবু, সাথে মালবিকা দেবী।
বাবু উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,
“দাদা! দেখো কে এসেছেন! মা এসেছেন তোমাকে দেখতে।”
অভি বাবুর গলার আওয়াজে চোখ খুললো, একটু বিস্মিত হয়ে তাকাল। মালবিকা দেবীকে এখানে দেখার মতো অভির মন প্রস্তুত ছিল না।সে তো ভেবেছিল তার খোঁজ নিতে বস্তির ছেলেরাই আসবে। কিন্তু সেন পরিবারের ভদ্রমহিলা নিজে এসেছেন!
মালবিকা ধীরে ধীরে অভির শয্যার কাছে এগোলেন। তার মুখে মায়ার ছায়া, চোখে মাতৃসুলভ স্নেহ।চুপচাপ কিছুক্ষণ অভির দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেন মেয়ের প্রাণ বাঁচাতে লড়াই করা এই ছেলেটির প্রতি মনের ভেতর গভীর কৃতজ্ঞতা জমে আছে।
অভি অসহায়ভাবে উঠে বসতে চাইলে মালবিকা হাত তুলে নরম গলায় বললেন,
“না না, শুয়ে থাকো। তুমি এখন দুর্বল, বসতে হবে না।”
অভি কিছুটা লজ্জিত গলায় বলল,
“আপনার আসার দরকার ছিল না, ম্যাডাম। আমি তো একেবারে সাধারণ ছেলে। আপনি কষ্ট করলেন কেন?”
মালবিকা ধীরে ধীরে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, গলার স্বর যেন ভেতরের আবেগ সামলাতে গিয়ে আরও ভারী হয়ে উঠল,
“তুমি সাধারণ ছেলে বলছো? আমার মেয়ে আজ বেঁচে আছে তোমার জন্য। রক্তাক্ত শরীর নিয়েও তুমি ওকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছ। এ কৃতজ্ঞতা আমি কীভাবে শোধ করব বলো?”
অভির গলা শুকিয়ে এলো।
অভি নিচু স্বরে বলল,
“আমি যা করেছি… সেটা তো যেকোনো মানুষ করত।”
মালবিকা চোখের কোণে ভিজে ওঠা অশ্রু সামলে নিলেন,
“না বাবা, সবাই করতে পারে না। তাই আমি এসেছি শুধু তোমাকে ধন্যবাদ জানাতে নয়—বরং আমার আশীর্বাদ দিতে।”
অভির বুক কেঁপে উঠল।
মনে মনে ভাবল,
“এমন স্নেহ… আমি তো নিজের মা ছাড়া আর কোথাও পাইনি।”
কিছুক্ষণের নিরবতা।
মালবিকার মুখে ক্লান্তি, চোখ দুটো লালচে। রাতভর ঘুম হয়নি হয়তো।
তিনি আস্তে আস্তে বসে পড়লেন অভির মাথার পাশে।হাত বাড়িয়ে অভির কপালে স্পর্শ করলেন—কোনো অচেনা ছাত্র নয়, যেন নিজের ছেলে।
মালবিকার গলা কেঁপে উঠছে,
“বাবা… তুমি না থাকলে আজ আমার সূচি বাঁচত না।তুমি নিজের জীবনটা বাজি রেখে ওকে হাসপাতালে এনেছ…
কীভাবে তোমাকে ধন্যবাদ দেব আমি?”
অভির চোখ ভিজে উঠল। ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“মা… আমি তো কিছু করিনি। আমার কর্তব্য ছিল…”
মালবিকার বুক ফেটে কান্না এল, তিনি হঠাৎ অভির হাত নিজের বুকে চেপে ধরলেন।
“না বাবা, কর্তব্য নয়… এটা হয়তো তারও উপরে আরোও কিছু ।”
একটু থেমে বললেন,
“আমি জানি না ভাগ্য আমাদের কেন এমন দুঃসময় দিল, কিন্তু আজ থেকে তুমি আমার কাছেও ছেলে হয়ে রইলে।তোমার শরীরটা ভেঙে গেছে… অথচ তুমি একলা, পাশে কেউ নেই তোমার।
এ অন্যায়, খুব অন্যায়…”
মালবিকা আর সামলাতে পারলেন না। অভির হাত ধরে কাঁদতে লাগলেন।
অভি চোখ বন্ধ করল। বুকের ভেতর যন্ত্রণা গুমড়ে উঠল,
“নিজের মা দূরে… আর আজ অপরিচিত এক মায়ের বুকে আমি কান্না শুনছি।
এতটা মায়া কি আমি সত্যিই পাওয়ার যোগ্য?”
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে গেল।
বাবু একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল,
একজন জননী তার সব কৃতজ্ঞতা ও করুণ স্নেহ উজাড় করে দিচ্ছেন, আর এক দরিদ্র ছেলের ভাঙা বুক ভরে উঠছে এক অচেনা মায়ের অশ্রুজলে।
মালবিকা ধীরে ধীরে অভির মাথায় হাত রাখলেন।একটু ইতস্তত করলেন। আস্তে আস্তে অভির দিকে তাকিয়ে বললেন,
” শোনো বাবা,তুমি নিজের জীবনটাকে বাজি রেখে আমার সূচিকে আগলে রেখেছ।তুমি নিছক ছাত্র নও, তুমি আমার চোখে সত্যিকারের নায়ক।”
একটু থামলেন। হয়তো আসল কথাটা বলতে গিয়ে একটু আটকালেন,
আমি জানি—তুমি কতটা কষ্টে বড় হচ্ছ।
তোমার মা–বাবা গরীব মানুষ, অথচ তুমি স্বপ্ন দেখছ সমাজের জন্য কাজ করার।তুমি পড়াশোনা করতে এসেছ, অথচ আজ হাসপাতালের এই ধুলো জমা শয্যায় একলা পড়ে আছো।এ অন্যায়। তোমার এই ত্যাগ বৃথা যেতে আমি দেব না।”
তিনি অভির কপালে হাত বুলিয়ে দিলেন। যেন আশীর্বাদ দিচ্ছেন,
“আজ থেকে আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি—তুমি একা নও।তোমার চিকিৎসা, তোমার পড়াশোনা, তোমার ভবিষ্যৎ—সবকিছুর দায়িত্ব আমি নিলাম।
আমার সূচির মতোই তুমি আমার সন্তান।তুমি শুধু সুস্থ হয়ে ওঠো বাবা, বাকি পথ আমি তোমার পাশে হাঁটব।”
অভির চোখে জল ভেসে উঠল। বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্ট গলে গিয়ে অশ্রু হয়ে গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে।শক্ত করে চোখ বন্ধ করে শুধু ফিসফিস করে বলল,
“মা…”
অভির জীবনের দারিদ্র্যের অন্ধকারে প্রথমবার আলো জ্বলে উঠল—এক অচেনা মায়ের প্রতিশ্রুতিতে।কিন্তু হঠাৎ যেন ভেতর থেকে এক ঝড় বয়ে গেল। নিজেকে সামলে নিলো যেনো।সে চুপচাপ নিজের হাতটা আলগো করে টেনে নিল।গভীর শ্বাস নিয়ে, ব্যথা সয়ে ধীরে ধীরে উঠে বসল।
কাঁপা কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে ,
“না মা, আপনার কথাগুলো আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।
কিন্তু আমি কারো দান নিয়ে বাঁচতে চাই না।যেদিন থেকে আমি স্বপ্ন দেখেছি সমাজের জন্য কিছু করার,সেদিনই ঠিক করেছিলাম,নিজের রক্ত, ঘাম আর পরিশ্রম দিয়েই সেই স্বপ্ন পূরণ করব।আমি মাথা নত করে বাঁচতে পারব না।”
মালবিকা বিস্মিত চোখে অভির দিকে তাকিয়ে আছেন।অভির কণ্ঠ ক্রমে শক্ত হলো,
“আমি জানি আমি গরীব, নিঃস্ব।
কিন্তু গরীব মানে ভিক্ষুক নয়।
আমার বাবা ভ্যান চালিয়ে সংসার চালান, মা অন্যের জমিতে মাটি খুঁড়ে আমাদের মুখে ভাত তুলে দেন।
তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে আমি কিভাবে অন্যের দয়া মেনে নেব?না মা, আমি চাই না কেউ বলুক অভি কারো সাহায্যে মানুষ হয়েছে।আমি চাই সবাই বলুক—অভি নিজের যোগ্যতায় উঠে দাঁড়িয়েছে।”
অভির চোখে তখন জ্বলছে তীব্র দীপ্তি।একদিকে মাথার যন্ত্রণা, শরীরের দুর্বলতা—তবুও তার কণ্ঠে অনমনীয় দৃঢ়তা।
মুহূর্তটা যেন সময় থমকে গেল।
মালবিকার চোখ ভিজে উঠল, কিন্তু সেই ভিজে ওঠার ভেতরও ফুটে উঠল গর্বের আলো।
তিনি ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন,
“তুমি সত্যিই অন্যরকম ছেলে, অভি…তোমার জন্য সূচি গর্ব করবে।”
অভি নিঃশব্দে চোখ বন্ধ করল।
মনে মনে যেন প্রতিজ্ঞা করল,
কোনো দয়া নয়, কোনো দান নয়,শুধু নিজের শক্তি, নিজের মেধা, নিজের শ্রম।
এই পথেই সে জিতবে।
হাসপাতালের কোলাহল আর ওষুধের গন্ধ থেকে মুক্তি পেয়ে অবশেষে অভি ফিরল মেসে। শরীর এখনো দুর্বল, কিন্তু মনে এক অদ্ভুত শান্তি। শুভ দা তাকে সাবধানে ধরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে তুলল, ঘরের খাটে শুইয়ে দিলো।
শুভ দা একটু কড়া গলায় বলল,
“তোকে এখনও বেশ কয়েকদিন বিশ্রাম নিতে হবে। একদম বাইরে পা মারাবি না, ডাক্তার বারণ করেছেন।”
অভি মৃদু হেসে মাথা নেড়ে চুপ করে রইল।
এমন সময় দরজায় টোকার শব্দ। মেসের মালিক সুধীর বাবু ভেতরে এসে দাঁড়ালেন। মুখে সদাশয় ভাব, কণ্ঠে আশ্বাস।
“অভি, আমি পুরো ব্যাপারটা তোমার হেড স্যারকে জানিয়ে দিয়েছি। উনি খুব চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন, তবে আমি আশ্বস্ত করেছি যে এখন তুমি অনেকটা ভালো আছো। উনি বলেছেন তোমার চিকিৎসার খরচ বা পড়াশোনার কোনো অসুবিধা হলে যেন আমি সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে জানাই। তুমি একেবারেই চিন্তা কোরো না।”
অভির চোখ ভিজে উঠল।গ্রামের ছেলে হয়ে শহরে এসে এমন মমতা, এমন আপন জনদের পাশে পাওয়া—ভাবতেই মনটা ভরে গেল।
সে ধীরে উঠে বসতে চাইলো, কিন্তু শুভ দা হাত চেপে আবার শুইয়ে দিলো।
অভি হেসে ফিসফিস করে বলল
“আপনাদের মত মানুষ না থাকলে, আমি এতদূর আসতেই পারতাম না।”
সুধীর বাবু সস্নেহে তার মাথায় হাত রেখে বললেন,
“তুই মন দিয়ে পড়াশোনা কর, বাকি চিন্তা আমাদের।”
ঘরের ভেতরে এক অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল। অভির মনে হলো—এ শহরটা এখন আর অচেনা নেই।
সুধীর বাবু চলে যাওয়ার পর, অভি একটু চোখ বন্ধ করে শুলো।বাইরে সন্ধ্যে নামছে, হালকা বাতাসে জানলার পর্দা নড়ছে। হঠাৎ তার মনে ঝটকা মেরে উঠল,
“আরে! আমি তো এতদিন টিউশনে যাইনি…
সে অস্থির হয়ে উঠে বসতে গেল, কিন্তু মাথা আবার ঘুরে উঠল। শুভ দা তাড়াতাড়ি তাকে ধরে আবার শুইয়ে দিলো।
শুভ দা কড়া গলায় বলল,
“এইসব এখন মাথায় আনবি না। শরীরটা আগে ঠিক কর।টিউশনের কথা এখন থাক। আর আমি নিজেই গিয়েছিলাম ওদের বাড়ী — বলে এসেছি। তুই চিন্তা করিস না, তারা সব জানে। তোকে নিয়ে তারা-ও খুব চিন্তিত।”
একটু থেমে শুভদা আরো বলল , ওরা শুধু চিন্তিত বললে ভুল বলা হবে রে। ওরা তো তোকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত। ”
অভি অবাক হয়ে তাকাল শুভ দার দিকে,
“তুমি… সব সামলে দিয়েছ?”
শুভদা বলতে থাকলো,
” তোর অবস্থা শুনে ভদ্রলোক প্রথমে একটু নিস্তব্ধ হয়ে গেলেন কয়েক মুহূর্ত। তারপর যেই শুনলেন যে তুই ভালো আছিস হঠাৎ যেন ভেতর থেকে এক অদ্ভুত আলো বেরিয়ে এলো তাঁর চোখে। তিনি আমার হাত ধরে উত্তেজিত গলায় বললেন,
“জানেন? আমি অনেকদিন ধরে লক্ষ্য করছি, অভির সংস্পর্শে আমার ছেলে বদলাতে শুরু করেছে। যে ছেলেটা রাতদিন নষ্টামি করত, এখন বই হাতে নিয়ে বসে… চোখে একরকম স্বপ্ন দেখার আগুন জ্বলছে। এটা শুধু টিউশন নয়, অভি তাকে আস্তে আস্তে নতুন মানুষ করে তুলছে।”
তিনি ভারী নিঃশ্বাস ফেললেন, তারপর দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
“অভি শুধু আমার ছেলেকে নয়, এই সমাজকেও বদলাতে পারবে একদিন। আমি ওকে সুস্থ্য করতে যা করার দরকার, সব করব। আপনি শুধু জানাবেন আমাকে।”
শুভ দা মৃদু হাসল, চোখে অদ্ভুত মমতা,
” তুই পারবি রে অভি, একদিন তোর হাত ধরেই সমাজ বদলাবে।”
একটু থামলেন,
“তোকে আমি ছোট ভাইয়ের মতো দেখি রে। তুই পড়ে কিছু একটা হবি, সেটাই আমার স্বপ্ন। তাই এইসব ছোটখাটো চিন্তা আমার ঘাড়ে দে। তুই শুধু পড়াশোনা আর শরীরটা ঠিক রাখিস।”
অভির চোখ আবার ভিজে উঠল। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত কৃতজ্ঞতা জমে উঠল।
সে ফিসফিস করে বলল,
“শুভ দা, আমি একদিন ঠিক তোমাদের স্বপ্ন পূরণ করব… নিজের স্বপ্নও।”
ভোরের স্নিগ্ধ আলো তখনো পুরোপুরি মেসের উঠোনে ঢোকেনি। সাতসকালে দরজায় কড়া পড়ল। শুভদা দরজা খুলতেই অভি বিস্ময়ে চমকে উঠল—
হেডস্যার!
সাদা ধবধবে ধুতি-পাঞ্জাবি পরা, চোখে চিরচেনা দৃঢ়তা আর মমতার ছাপ। স্যার সোজা ভেতরে এসে অভির মাথায় হাত রাখলেন।
অভি তখনো কিছুটা দুর্বল শরীরে বিছানায় শুয়ে। স্যারকে দেখে সে লজ্জিত হয়ে আধশোয়া হয়ে বসে পড়ল। গলা যেন আটকে এল,
“স্যার, আমি আপনাকে কষ্ট দিলাম…”
হেডস্যার মৃদু হেসে বললেন,
“কষ্ট নয় অভি, আমি তো এসেছি তোকে নতুন করে শক্তি দিতে। তোর ভেতরে যে আগুন আছে, তাকে নেভাতে দিস্ না। মনে রাখিস—শরীর রক্তাক্ত হতে পারে, কিন্তু স্বপ্নকে রক্তাক্ত হতে দেওয়া যাবে না।”
অভির বুকের ভেতরটা যেন কেঁপে উঠল। তার চোখ ভিজে গেল অশ্রুতে।
স্যার আবার বললেন,
“তুই গরিব ঘরের ছেলে, তাই লড়াইটা আরও কঠিন। কিন্তু কঠিন লড়াই থেকেই বড় জয় আসে। আমি তোর ভেতরে সেই জেদ, সেই অদম্য শক্তি দেখতে পাচ্ছি। দাঁড়াস দৃঢ় হয়ে, আর পিছন ফিরে তাকাস না।”
অভির হাত দুটো স্যার শক্ত করে ধরে রইলেন।সেই মুহূর্তে অভি অনুভব করল—তার বুকের ভেতর একটা নতুন শক্তি, নতুন আলো জেগে উঠছে।
হেডস্যার অভির মাথায় হাত রেখে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর গলা নামিয়ে বললেন,
“তোর মা-বাবা ভালো আছেন অভি। কিন্তু এই ঘটনাগুলো আমি তাঁদের কানে তুলিনি।জানি, শুনলে ভেঙে পড়বেন, চিন্তায় অস্থির হবেন। তাই নিজেই চলে এলাম তোর খোজ নিতে।”
অভির চোখে জল এসে গেল। গলা কাঁপা কাঁপা—
“স্যার… মা-বাবাকে আমি দুশ্চিন্তায় ফেলতে চাই না। ওনারাই তো আমার লড়াইয়ের শক্তি।”
স্যার গভীর মমতায় তাকালেন,
“সেটাই তো, অভি। সেই শক্তিকে অটুট রাখবি। তুই শুধু মনে রাখিস—তোর বাবার ঘামে, তোর মায়ের অশ্রুতে জন্ম নিয়েছে তোর স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে কোনও দিন অপমান করিস না।”
অভির বুক কেঁপে উঠল। মনে হলো, জীবনের সমস্ত দুঃখ-কষ্ট যেন এই কথাগুলোর ভেতরেই গলে গেল।
কয়েকদিন কেটে গেছে। অভি এখন অনেকটাই সুস্থ। শরীর আগের মতো ক্লান্ত নয়, মাথার যন্ত্রণাও অনেকটা কমেছে।তবুও শুভদা এখনও তাকে বাইরে যেতে দিচ্ছে না।
সে হাসতে হাসতে বলে,
“তুই যে আবার গায়ের জোরে কোথাও দৌড়ে চলে যাবি, সেটা আমি জানি। তাই আগে পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত দরজার বাইরে এক পা নয়।”
অভি একটু মুচকি হাসল, কিছু বলল না। ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়াল।
বিকেলের পড়ন্ত আলো তখন ঘরে ঢুকছে। লালচে সোনালি রোদে চারপাশ যেন গলে গিয়ে এক অপরূপ রূপকথার জগৎ তৈরি করেছে। দূরে গাছেদের মাথায় আলো ঝিলিক দিচ্ছে, কোথাও কোথাও পাখিরা বাসায় ফিরছে। হালকা স্নিগ্ধ বাতাস এসে তার চোখে-মুখে আলতো করে লাগছে।
অভি চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত গভীরভাবে শ্বাস নিল। মনে হলো যেন এই বাতাস তার সমস্ত যন্ত্রণা ধুয়ে দিচ্ছে, মনের ভার হালকা হয়ে যাচ্ছে।
মনের ভেতরে সে ফিসফিস করে বলল,
“জীবনটা এখনও কত সুন্দর… কত লড়াই বাকি… আমি হেরে যাব কেন?”
তার ভেতরে এক অদ্ভুত শক্তি জন্ম নিল। সূচির সেই অচেতন মুখ, বস্তির অসহায় মানুষগুলো, শুভ দার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা—সব মিলিয়ে তার বুকের ভেতর জেগে উঠল এক দৃঢ় প্রতিজ্ঞা।
অভি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে পড়ন্ত রোদের মায়ায় ডুবে আছে। হঠাৎ পিছন থেকে শুভদার গলা,
“অভি! দেখ তো, কে এসেছে…”
অভি চমকে ঘুরে তাকাল।দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে সুচরিতা।
অভির চোখে প্রথমেই পড়ল—এই কদিনে মেয়েটার শরীরটা যেন অনেকটাই ভেঙে গেছে। মুখে ক্লান্তির ছাপ, চোখের নীচে হালকা কালি। তবু তার চোখের ভেতরে এক অদ্ভুত উজ্জ্বল আলো—যেনো সব ক্লান্তিকে অতিক্রম করে কারও জন্য, কোনো বিশ্বাসের জন্য বেঁচে আছে।
অভি হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মনে হলো, বুকের ভেতর হঠাৎ ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
সুচি আস্তে ঘরে ঢুকল। শুভদা একটু সরে দাঁড়াল।
ক্লান্ত হাসি দিয়ে বলল,
“অভি… কেমন আছো তুমি?”
সুচির মুখে প্রথমবার এই তুমি ডাকটা আজ বড্ড আপন লাগলো।অভির গলা শুকিয়ে গেল। যেনো কোনো শব্দ বেরোতে চাইছে না। মাথায় শুধু ঘুরতে লাগল,
“এই মেয়ে তো নিজেই ক’দিন আগে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে, অথচ আজ এসেছে আমাকে দেখতে… আমার জন্য…!”
তার ভেতরে আনন্দ, অবিশ্বাস আর অপরাধবোধ—সব একসাথে ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ল।
অভি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। বুকের ভেতর হাহাকার জমে গলা আটকে দিয়েছে। অবশেষে আস্তে বলল,
“আমি তো ভালো আছি… কিন্তু তুমি… তোমাকে দেখে তো মনে হচ্ছে এই ক’দিনে তুমি অনেক কষ্ট পেয়েছো…”
সুচি মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলল,
“কষ্ট? কষ্ট তো তখনই যখন কাউকে হারানোর ভয় থাকে। আমি তো তোমাকে হারাতে বসেছিলাম অভি… যখন শুনলাম তোমাকে রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তখন মনে হয়েছিল সব শেষ হয়ে গেল। আজ তোমাকে সুস্থ দেখে… আমার মনে হচ্ছে আমি আবার বাঁচলাম।”
অভির চোখ ভিজে উঠল। তার গলা কেঁপে গেল,
“সুচরিতা… তুমি এত বড়লোকের মেয়ে। তোমার জন্য কত মানুষ আছে, কত সুবিধা আছে। অথচ কেনো তুমি আমার জন্য এতটা কাঁদলে? আমি তো কিছুই নই তোমার তুলনায়।”
সুচি এবার এক পা এগিয়ে এল। তার চোখে জলের ঝিলিক, কিন্তু কণ্ঠে দৃঢ়তা,
“না অভি, তুমি ‘কিছুই নও’ না। তুমি আমার সবকিছু। সেই দিন বস্তির মাটিতে তুমি যখন আমাকে আগলে রাখলে,নিজের রক্ত ঝরিয়ে আমাকে বাঁচালে… তখনই বুঝেছি, এ জীবনে আর কাউকে নয়, শুধু তোমাকেই চাই। তোমার যোগ্যতার কাছে সব ঐশ্বর্য ফিকে হয়ে যায়।”
অভি যেনো বিশ্বাস করতে পারছিল না। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
“সুচি… তুমি কি জানো, তুমি কি বলছো?”
সুচি মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ, জানি। আজ আমি আমার মনের কথা স্পষ্ট করে বলছি—আমি তোমাকে ভালোবাসি অভি। তোমার লড়াই, তোমার স্বপ্ন, তোমার মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা… এটাই আমার জীবনেও চাই।”
অভির চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে দিল।সুচি সেই হাত ধরে ফেলল দৃঢ়ভাবে।
“তুমি আমাকে স্বপ্ন দেখাচ্ছো সুচি… কিন্তু আমি প্রতিজ্ঞা করছি, আমি আমার যোগ্যতায় তোমার পাশে দাঁড়াবো। আর কখনো তোমাকে নিরাশ করব না।”
শুভ দা এক কোণে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে সবকিছু দেখছিল। তার মনে হচ্ছিল, হয়তো এই অসম সম্পর্কের মধ্যে সত্যিই এক স্বর্গীয় মিলন ঘটছে। শুভ দা উপলদ্ধি করলো,এই মুহূর্তে ওদের একটু একা থাকা দরকার। শুভ দা গলা খাঁকারি দিলো,
“আমি একটু বাইরে থেকে আসছি রে অভি। তোরা কথা বল।”
এ কথা বলে সে দরজা টেনে নীরবে বেরিয়ে গেল।
ঘর নিঃশব্দ হয়ে গেল। শুধু জানালার বাইরে বিকেলের আলো ঘরে এসে পড়ছে। অভি আর সুচি মুখোমুখি বসে রইল, দুজনের চোখ দুজনের চোখে বাঁধা।
একটু পরে অভি গলা কাঁপিয়ে বলল,
“সুচি, তুমি জানো আমি সারাজীবন কী ভেবেছি? আমি ভেবেছি বড়লোকের দুনিয়া আর গরিবের দুনিয়া আলাদা—এই দুই কখনো এক হতে পারে না। কিন্তু তুমি এসে আমার সেই ধারণা ভেঙে দিলে। তুমি আমার পাশে দাঁড়ালে, যখন আমি ভেবেছিলাম কেউই পাশে থাকবে না। আমি ভেবেছিলাম, একা লড়াই করব… অথচ তুমি আমার শক্তি হয়ে গেলে।”
সুচির চোখে জল ভরে উঠল। সে ধীরে ধীরে অভির হাতটা নিজের হাতে নিল।
“অভি, তুমি জানো, আমি ছোটবেলা থেকেই কত মানুষকে দেখেছি—বাবার ব্যবসার লোক, পার্টির অতিথি, দুনিয়ার নানা ক্ষমতাবান মানুষ। কিন্তু তাদের ভেতরে আমি কখনো সেই মানবিকতা পাইনি, যা তোমার চোখে দেখেছি। আমি ভেবেছি টাকাই সব, অথচ তুমি আমাকে শিখিয়েছো মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাই আসল সম্পদ। তুমি আমার কাছে শুধু প্রিয় নও—তুমি আমার আদর্শ।”
অভির চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তার বুক কেঁপে উঠল।
“আমি তো স্বপ্ন দেখেছিলাম শুধু মানুষ হয়ে ওঠার, সমাজের জন্য কিছু করার… কিন্তু ভাবিনি কখনো তোমার মতো কেউ আমার জীবনে আসবে। আজ মনে হচ্ছে, আমার স্বপ্নের সাথে সাথে আমার জীবনেরও মানে খুঁজে পেয়েছি।”
সুচি একটুখানি হাসল, ভিজে গলায় বলল,
“তাহলে আমিও তোমাকে আজ স্বীকার করি—আমি তোমাকে ভালোবাসি, অভি। শুধু ভালোবাসি না, আমি বিশ্বাস করি তুমি পারবে। আমি তোমার পাশে থাকব, যত ঝড়-ঝাপটা আসুক না কেন।”
অভি সুচির হাতটা বুকে চেপে ধরল। গলায় কাঁপা স্বর,
“তাহলে প্রতিজ্ঞা করছি, সুচি—আমাদের স্বপ্নগুলো আমি কোনোদিন ভাঙতে দেব না। তুমি আমার আলো, আমি সেই আলো ধরে লড়াই করে যাব। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত।”
সুচি মাথা নামিয়ে চোখের জলে ভিজে থাকা মুখটা লুকিয়ে ফেলল অভির কাঁধে। ঘরটা নিঃশব্দে ভরে উঠল এক গভীর ভালোবাসার আলোয়—যেন দুটো ক্লান্ত আত্মা একে অপরের মধ্যে শান্তি খুঁজে পেল।
ঘরে নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। বাইরে সূর্য ডুবছে ধীরে ধীরে। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা পড়ন্ত রোদের আলো ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে, অন্ধকার নামছে চারদিকে।
কিন্তু ঘরের ভেতরে যেন এক অদ্ভুত আলো ছড়িয়ে পড়ল। দু’জনের মনের মিলনে, দু’জনের চোখের জল আর হাতের দৃঢ় বাঁধনে যেন চারপাশ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
অভি মনে মনে অনুভব করল,
“সন্ধ্যা নেমে এলো ঠিকই, কিন্তু আজ আমার জীবনে এক নতুন ভোরের সূচনা হলো।”
সুচি মৃদুস্বরে ফিসফিস করে বলল,
“অভি, বাইরের অন্ধকার যতই বাড়ুক না কেন, আমাদের ভেতরের এই আলো যেন কোনোদিন নিভে না যায়।”
অভি সূচিকে আরও শক্ত করে চেপে ধরল।
দুজনেই চুপ করে রইল, শুধু হৃদয়ের স্পন্দন যেন বলে গেল,
“আমরা আর একা নই। আমরা একসাথে।”
বাইরে রাত নেমে এলো, কিন্তু সেই ছোট্ট ঘরের ভেতর প্রেম আর স্বপ্নের প্রদীপ জ্বলে উঠল—যা অন্ধকারকে ছাপিয়ে আলো হয়ে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল।।
—oooXXooo—
![]()







