আপন জন (পর্ব সপ্তবিংশ)
কাকলি ঘোষ
চুপ করে বিছানার এক কোণে বসেছিল রিন্টি। মনটা যেন ভালো লাগছে না ওর। কোথাও কিছু একটা গোলমাল ঠেকছে। অথচ ধরতে পারছে না। আচ্ছা ওই যে লোকটা । আজ সন্ধেবেলা এল। ওই লোকটা কি ভালো লোক? দেখে তো খারাপ মনে হয় নি। কী সুন্দর চেহারা ! কত দামী জামা কাপড় ! হাতে কতগুলো আংটি ! চোখ ঝলসে যাচ্ছিল যেন পাথরের ছটায়। বৌদি যখন খাবার নিয়ে ওকে ওই ঘরে যেতে বলল ওর একটু লজ্জাই লাগছিল। এরকম ভাবে আগে কখনও কোন অচেনা পুরুষের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় নি তো। একটু বাধ বাধ ঠেকছিল। কিন্তু বৌদি বলল যেতে। লোকটা দেখছিল ওকে। কেমন করে যেন দেখছিল। মনে হচ্ছিল ওর শরীর থেকে যেন চোখ দিয়েই জামা কাপড় খুলে নিচ্ছে। কেন এরকম মনে হচ্ছিল।কে জানে ? বৌদি হাসছিল। দাদা হাসছিল। বারবার লোকটাকে বলছিল খাবার খেতে। গ্লাসে সোনার মত রঙের একটা শরবত খেতে। আরও ইংরেজিতে কী সব বলছিল। বোঝে নি ও। কিন্তু।কেন যেন মনে হচ্ছিল ওকে নিয়েই কথা হচ্ছে। লোকটা কাবাবে একটু একটু কামড় দিতে দিতে দেখছিল ওকে। ও চলে আসতে চাইছিল। বৌদি বারন করল। বলল দাঁড়িয়ে থাকতে। কোন মানে হয়? ও ওদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকে কী করবে ? তবু দাঁড় করিয়ে রাখল বৌদি। বেশ কিছুক্ষণ পর লোকটার খাওয়া শেষ হলে যেতে বলল। পালিয়ে এসে বেঁচেছে বাবা ! কী চাউনি !
পরে অবশ্য লোকটা চলে যেতে বৌদি বলল লোকটার ওকে পছন্দ হয়েছে। নারী কল্যাণ সমিতিতে ওর জায়গা হবে। কিন্তু বৌদি যে বলেছিল ওই সমিতি বৌদির। তাহলে লোকটার কথায় কেন হবে? বৌদি হাসল শুনে। বলল বৌদি শুধু চালায়। আসলে জায়গা, টাকা সব নাকি।ওই লোকটার। অনেক নাকি বড় লোক !
সে তো হল। কিন্তু ওর যে মন খচখচ করছে। যেতে হবে বলে নাকি এই বাড়ি ছাড়তে হবে বলে ? কী জানি?
বৌদি বলছে ওখানে গেলে ভবিষ্যত উজ্জ্বল হবে। নিজে কাজ শিখে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে। পয়সা রোজগার হবে। সম্মান পাবে সবার কাছে। বড় বড় মানুষরা আসেন। তারা কত কী লেখেন কাগজে। ছবি তোলেন। কত লোক চিনবে। জানবে। অনেক ভালো ভালো জায়গায় যেতে পারবে। একটা মানুষের মত জীবন হবে। বাড়ি থেকে এই যে চলে আসা এটা সার্থক হবে। আর এখানে থাকলে সারা জীবন বাসন মেজে , ঘর মুছে কাটাতে হবে। হাতে হাজা হবে। পায়ে নখ কুনি। লোকে বাসন মাজুনি ঝি বলবে। বয়স হয়ে গেলে কেউ কাজ দেবে না। তখন চলবে কী করে?
আর তাছাড়া এখনো এত কম বয়স। দেখতে শুনতে ভালো। ভালো কাজ করতে করতে ভালো কারুর সঙ্গে আলাপ হলে সংসারী ও হতে পারবে কখনও। এটা শুনে ও অবশ্য খুব লজ্জা পেয়েছে। মনে মনে হেসেছেও। ওর মত মেয়েদের আবার ঘর সংসার। কে করবে ? কেনই বা করবে? আর সেসব কথা ও ভাবেও না। কিন্তু এত সব ভালো কথার পরেও কেন মন সায় দিচ্ছে না এটাই বুঝতে পারছে না। ওই লোকটাকে যেন কেমন একটা লাগছে ওর। অথচ বৌদি বলছে খুব ভালো। কী যে করে ? বৌদি সব গুছিয়ে রাখতে বলেছে। কাল বিকেলের দিকে যাবে ওরা। মন খারাপ লাগছে খুব। এক মাসের বেশি হল বোধ হয় এই বাড়িতে। কল্পনা দি এত ভালবাসে যে বলার নয়। রোজ কাছে বসিয়ে গল্প করে। নিজে খাবার বেড়ে দেয়। বৌদিও খুবই যত্ন করল। কাজের লোকের মত না। বাড়ির লোকের মত রেখেছিল এরা। সবাইকে ছেড়ে যেতে কী যে কষ্ট হবে !
বৌদি অবশ্য বলছে কষ্টের কী আছে ? আসবি তো তুই আবার। মাঝে মাঝে আসবি। দেখে যাবি। কল্পনাদি শুনেই চোখে আঁচল চাপা দিয়েছে। বুড়ো বাবু বা গিন্নিমা এদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে কিন্তু ততটা কিছু না। খুব বুড়ো দুজনেই। নিজেদের ঘর ছেড়ে খুব একটা বেরোন না কেউ। যার যার নিজের নিজের কাজের লোক আছে। তারাই সামলায়। বৌদি তো নিচে নামেই না। দাদা রোজ একবার করে দেখা করে যায়।
একটা ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ায় রিন্টি।একটা বাহারি ব্যাগ দিয়েছে বৌদি। জামা কাপড় গুলো ভরতে হবে। এক মাসে কত জিনিসই তো জমেছে। সব কী নেওয়া যায়? যাবার আগে সুখেনদা আর বৌদিকেও একটা খবর দেওয়া হল না। কে জানে বৌদি খবর দেবে কিনা?
ক্রমশ…
![]()







