আপনি কি জানেন? আপনি স্থির নন! পৃথিবী আপনাকে নিয়ে প্রতি সেকেন্ডে ৩০ কিমি বেগে ছুটছে। ঘূর্ণনের সেই গোপন রহস্য, যা বিগ ব্যাং থেকে জীবন সৃষ্টি করেছে।
ঘূর্ণন নিয়ে একটা প্রতিবেদন
মহাবিশ্বের দিকে তাকালে আমাদের মনে হয় যেন আমরা এক স্থির, শান্ত গ্রহের উপর দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু বাস্তবে এই অনুভূতিটি সম্পূর্ণ একটি ভ্রম। আপনি এই মুহূর্তে যে চেয়ারে বসে আছেন, সেটি আপনাকে নিয়ে অবিশ্বাস্য গতিতে ছুটে চলেছে। ক্ষুদ্রতম কণা থেকে শুরু করে বৃহত্তম গ্যালাক্সি পর্যন্ত—এই ব্রহ্মাণ্ডের কোনো কিছুই স্থির নয়।
আমরা আজ ডুব দেব সেই মহাজাগতিক ঘূর্ণন বা ‘স্পিন’-এর গভীরে, যা আমাদের অস্তিত্বের সবচেয়ে মৌলিক রহস্যগুলির মধ্যে অন্যতম।
১. স্থিরতার সেই বিরাট ভ্রম (The Illusion of Stillness)
আপনি সত্যিই কত দ্রুত গতিতে আছেন? শুনলে চমকে উঠবেন:
-
নিজস্ব ঘূর্ণন (Rotation): বিষুব রেখায় পৃথিবী প্রায় ১,৬৭৪ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা (১০৪০ মাইল/ঘণ্টা) বেগে নিজের অক্ষে ঘুরছে।
-
সূর্যের চারিদিকে কক্ষপথ (Orbit): পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে গড়ে ১,০৭,২০৮ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা (৬৬,৬১৬ মাইল/ঘণ্টা) বেগে! অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩০ কিলোমিটার।
-
ছায়াপথে গতি (Galactic Motion): আমাদের সৌরজগৎ এই গতিতেই মিল্কিওয়ে বা আকাশগঙ্গার কেন্দ্রে চারপাশে ছুটছে প্রায় ৭,৯০,০০০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা (৪,৯০,০০০ মাইল/ঘণ্টা) বেগে।
তবে এই বিশাল গতি আমরা অনুভব করি না কেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আইজ্যাক নিউটনের আবিষ্কৃত জড়তা (Inertia) নিয়মের মধ্যে। আমাদের শরীর, বায়ুমণ্ডল, এবং চারপাশের সব কিছুই একই গতিতে চলছে। অনেকটা চলন্ত ট্রেনের কামরার ভেতরে বসে থাকার মতো—যতক্ষণ ট্রেনটি মসৃণ গতিতে চলে, ততক্ষণ আমরা তার গতি টের পাই না।
২. ঘূর্ণন কীভাবে প্রাণের জন্ম দিল?
পৃথিবীর ঘূর্ণন কেবল দিন-রাত তৈরি করে না; এটি আমাদের গ্রহকে বাসযোগ্য করে তুলেছে। ঘূর্ণন বন্ধ হলে কী হতো? পৃথিবীর এক দিক ঝলসে যেত, অন্য দিক জমে বরফ হয়ে যেত।
-
চৌম্বক ক্ষেত্র (Magnetic Field): পৃথিবীর কেন্দ্রের গলিত লোহার স্রোত ঘূর্ণনের ফলেই চালিত হয়। এই স্রোত একটি শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে। এই অদৃশ্য বর্মটি সূর্য থেকে আসা ক্ষতিকারক সৌর বায়ু (Solar Wind) থেকে আমাদের বায়ুমণ্ডলকে রক্ষা করে। এটি ছাড়া মঙ্গল গ্রহের মতো আমাদের গ্রহটিও জল এবং বাতাস হারিয়ে মরুভূমিতে পরিণত হতো।
-
আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ (Climate Control): ঘূর্ণনের ফলে তৈরি হয় কোরিওলিস এফেক্ট (Coriolis Effect), যা বাতাস এবং সমুদ্র স্রোতকে বাঁকিয়ে দেয়। এই কারণেই ঘূর্ণিঝড়গুলো গোল হয়ে ঘোরে। এই ঘূর্ণন ছাড়া পৃথিবীর আবহাওয়া কোনো সুনির্দিষ্ট প্যাটার্নে বাঁধা থাকত না।
৩. বিগ ব্যাং এবং প্রথম মোচড় (The First Spin)
মহাবিশ্বের সবকিছু কীভাবে ঘোরা শুরু করল? পদার্থবিজ্ঞানীরা এর কারণ হিসেবে কৌণিক ভরবেগের সংরক্ষণ (Conservation of Angular Momentum)-কে দায়ী করেন।
বিগ ব্যাং-এর পর, মহাবিশ্ব যখন সংকুচিত হচ্ছিল, তখন গ্যাস এবং ধুলোর বিশাল মেঘ মাধ্যাকর্ষণের টানে দ্রুত ঘুরতে শুরু করে—যেমনটা একজন আইস স্কেটার হাত গুটিয়ে নিলে তার ঘোরার গতি বেড়ে যায়। বিজ্ঞানীরা আদি মহাবিশ্বের উষ্ণতার সামান্য তারতম্য (কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন) লক্ষ করেছেন, যা হয়তো প্রথম ঘূর্ণন তৈরি করেছিল। সেই প্রথম মোচড়ই আজকের গ্যালাক্সি আর গ্রহদের ঘূর্ণনের জন্ম দিয়েছে।
৪. স্থান-কাল বাঁকানো এবং অদৃশ্য শক্তি
চরম গতিতে ঘুরতে থাকা বস্তু কেবল তাদের চারপাশের জিনিস নয়, স্বয়ং স্থান-কাল (Spacetime)-কেও মোচড় দেয়। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ (General Relativity) অনুযায়ী, নিউট্রন তারা বা ব্ল্যাক হোলের মতো বিশাল ঘূর্ণায়মান বস্তু স্থানকালের বুননকে আক্ষরিক অর্থে টেনে নিয়ে যায়। এই প্রভাবকে বলা হয় ফ্রেম-ড্র্যাগিং (Frame-dragging)। ব্ল্যাক হোলের কাছাকাছি এই মোচড় এতটাই চরম যে, ভেতরের কণাগুলো আলোর গতিতে ঘুরতে বাধ্য হয়!
এছাড়াও, ছায়াপথগুলি যে অবিশ্বাস্য গতিতে ঘুরছে, তাতে পদার্থবিদ্যার নিয়ম অনুযায়ী তাদের ছিটকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা। তাদের এক জায়গায় ধরে রেখেছে এক অদৃশ্য শক্তি—ডার্ক ম্যাটার (Dark Matter)।
-
মহাজাগতিক পরিসংখ্যান: বর্তমানে মহাবিশ্বের মোট ভর-শক্তির প্রায় ৮৫ শতাংশই হলো ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জি। এর মধ্যে
-
ডার্ক ম্যাটার: প্রায় ২৭%
-
ডার্ক এনার্জি (Dark Energy): প্রায় ৬৮%
-
সাধারণ দৃশ্যমান পদার্থ (Ordinary Matter): মাত্র ৫%
-
এই ২৭% ডার্ক ম্যাটারই হলো সেই অদৃশ্য আঠালো বস্তু, যা ঘূর্ণায়মান গ্যালাক্সিদের ভেঙে যাওয়া থেকে রক্ষা করে।
৫. গতির কি কোনো শেষ আছে?
মহাবিশ্বের সব গতিই কি একদিন থেমে যাবে? আমাদের গ্রহ অলরেডি তার ছন্দ হারাচ্ছে। চাঁদের মাধ্যাকর্ষণের টানে পৃথিবীর ঘূর্ণন প্রতি শতাব্দীতে প্রায় ১.৭ মিলিসেকেন্ড করে ধীর হচ্ছে।
বহু বিলিয়ন বছর পর আমাদের মিল্কিওয়ে এবং তার প্রতিবেশী আন্ড্রোমিডা ছায়াপথ সংঘর্ষে লিপ্ত হবে। তাদের মিলিত ঘূর্ণন স্থির হয়ে এক বিশাল প্রায় গতিহীন উপবৃত্তাকার ছায়াপথে পরিণত হবে। মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতিতে পদার্থবিদরা যাকে ‘হিট ডেথ’ (Heat Death) বলেন—তখন তাপমাত্রা সর্বত্র সমান হয়ে যাবে, এবং নড়াচড়া বা গতির আর কোনো কারণ থাকবে না। তবে কৌণিক ভরবেগ (Angular Momentum) সম্পূর্ণ ধ্বংস হয় না, তা কেবল মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে।
![]()






