ফেল করা মাস্টারমশাই
বাসুদেব চন্দ
সাহিত্যের প্রধান দুটি উপাদান হল প্লট এবং প্রকাশভঙ্গি। বাকি উপাদানগুলিও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
ভাষা, শব্দচয়ন, দ্বন্দ্ব, বাক্যগঠন, বানান, এবং যতিচিহ্ন, এগুলোর যথাযথ ব্যবহার হলে তবেই লেখা সুখপাঠ্য হয়।
একজন লেখকের কল্পনাশক্তি, সংযমবোধ, রসবোধ যত সুন্দর হবে তাঁর সৃষ্টিও তত সুন্দর হবে।
আরও একটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হল- বিষয়বস্তুর বিভিন্নতা বজায় রাখা। একই ধরনের লেখা লিখলে পাঠক খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আপনাকে ভুলে যাবে।
লেখার মূল মাধ্যম হল ভাষা, যা নির্ভর করে বিষয়বস্তু এবং চরিত্রের বিশেষত্বের ওপরে। লেখা যত সাবলীল হবে পাঠক তত আকৃষ্ট হবে।
লেখা ভালো না হলে আপনি যতই পাঠকের দরজায় কড়া নাড়বেন পাঠকবাবু বলে দেবেন- “বল বাবু বাড়ি নেই”।” ‘পুরাতন ভৃত্য’ও বাবুর আদেশ পালন করতে এসে আপনাকে বলবে- “বাবু বলল- ‘বাবু বাড়ি নেই”।”
আর লেখার মতো লেখা হলে-
মাঝরাতে তালা ভেঙে পাঠক আপনার ঘরে ঢুকবে, পা টিপে টিপে এসে আপনার কবিতাটি পড়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে আপনার বুকের ওপর একটি লাল টকটকে গোলাপ রেখে আবার পা টিপে টিপে বেরিয়ে যাবেন!
পরদিন সকালে ওই গোলাপ নিয়ে যদি আপনার ঘরে অশান্তি বাঁধে, তার দায় কিন্তু পাঠকের নয়!
যদিও পাঠকের মন জয় করা অত সহজ নয়। ভালো লাগা কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।
●পাঠ করার সময় পাঠকের মানসিক অবস্থা কেমন ছিল-
●পাঠকের সঙ্গে লেখকের ব্যক্তিগত সম্পর্ক কী-
●লেখক যে বিষয়টি নিয়ে লিখলেন সে-বিষয়টি পাঠকের পছন্দের তালিকায় পড়ে কি না-
●পাঠক কি শুধুই পাঠক, না কি লেখালিখিও করেন-
ইত্যাদি ইত্যাদি…….
আমার মতে আপনি যদি পাঁচজন পাঠকের মন জয় করতে পারেন তাহলে আপনি একজন ভালো লেখক।
মনে রাখবেন- এই পাঁচজনের মধ্যে আপনিও একজন পাঠক যিনি গল্পটা লেখা থেকে শুরু করে পোস্ট করা বা ছাপানো পর্যন্ত অন্তত দশবার পড়েছেন।
★
আমার গল্পের সেরা মন্তব্যটা আপনাদের সঙ্গে একটু শেয়ার করি-
বছর চারেক আগে একটি গ্রুপে ‘নৈহাটি জংশন’ গল্পটি পোস্ট করেছিলাম।
তিনদিন ধরে কয়টা ‘লাইক ইমজি’ পেলেও একটি মন্তব্যও জোটেনি!
বুঝলাম- গ্রুপের কোষ্ঠকাঠিন্য রোগ আছে!
হঠাৎ একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি মন্তব্যের ঝড় বইছে!
ওঁদের মন্তব্যে যাওয়ার আগে গল্পটা দুটো লাইনে বলি, না-হলে মন্তব্যের গভীরে পৌঁছতে পারবেন না।
বয়স হয়ে গেলে মা-বাবা বোঝা হয়ে যায়, তখন একার পক্ষে দু-জনের ভার বহন করা ‘সম্ভব নয় বলে’ দুই ডাক্তার-ভাই ভাগাভাগি করে মা-বাবাকে রাখেন। তিনমাস অন্তর অন্তর ওই অভাগা বুড়ো-বুড়ি একে অপরকে কাছে পান নৈহাটি জংশনে, তাও আবার মিনিট দশেকের জন্য!
ওখানে একটা যায়গায় বলেছিলাম- “বিশেষ কোনও কারণে সেদিন হাওড়া স্টেশনে ‘জম্বু তাওয়াই এক্সপ্রেস ঢুকতে দেরি করেছিল।”
গল্পের মূল বক্তব্যের ধারে কাছ দিয়ে না গিয়ে ওই দু-জন পাঠক টানা তিনদিন ধরে ঝগড়া করে গেলেন অন্য একটি বিষয় নিয়ে!
একজন বলছেন- জম্বু তাওয়াই এক্সপ্রেস শিয়ালদহে ঢোকে, আরেকজন বলছেন- “হাওড়ায় ঢোকে!”
আমিও তিনদিন ধরে ওঁদের সঙ্গে ‘হাওড়া আর শিয়ালদহ’ করে গেলাম!
—oooXXooo—
![]()







