জিঘাংসা
কাকলি ঘোষ
মৃত্যু পথযাত্রী ছেলের শিয়রে দাঁড়িয়ে আছি। নিরুপায় দৃষ্টিতে দেখছি ওর আস্তে আস্তে নিভে যাওয়া। ডাক্তার এসেছিলেন একটু আগেই। জবাব দিয়ে গেছেন। বলে গেছেন আর কিছুক্ষণ মাত্র। তার পরেই চিরতরে থেমে যাবে ও। কমে যাবে যন্ত্রণা। শীতল হয়ে যাবে সব প্রদাহ। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে অচেতন হয়ে পড়ে আছে কমলা। ডাক্তার শেষ নিদান হাঁকার সঙ্গে সঙ্গেই জ্ঞান হারিয়েছে ও। আমিই শুধু চেয়ে আছি নিস্পলক দৃষ্টিতে। না ছেলের দিকে না। ওই জানালাটার দিকে। থেকে থেকেই ওখানে এসে দাঁড়াচ্ছে কুচকুচে কালো সেই বেড়ালটা। সবুজ হিংস্র মনি বার করে যেন থাবা শানাচ্ছে আমার দিকে চেয়ে। ঠিক ছেলের মাথার দিকের জানালাটার নিচে ! উফফ ! অসহ্য। কী চায় ওটা ? আজ সকাল থেকে ঘুরে ফিরে আসছে কেন এখানে? কী করে আসছে? যত বার তাড়াই ততবার আসে। কমলাকে বলতে অবাক হয়ে তাকিয়েছে ! ও নাকি দেখতেই পাচ্ছে না। কী আশ্চর্য ! জলজ্যান্ত ওই রকম মিশমিশে একটা কালো বেড়াল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাবা চাটছে ওখানে আর ও দেখতে পাচ্ছে না !
কী বলি বলুন তো ? আপনারা নিশ্চয় দেখতে পাচ্ছেন। কী বলছেন ? পাচ্ছেন না ? সে কী মশাই? অদ্ভুত তো ! তাহলে আমি কী করে স্পষ্ট দেখছি? কী বলছেন ? প্রথম দেখছি কি না ?
না না প্রথম না। এটাকে আমি চিনি। এই পাড়ায় বাড়ি করে আসার পর থেকেই দেখছি। এমনিতেই বেড়াল কুকুর আমি কোনোদিন ভালোবাসি না। দেখলেই গা ঘিনঘিন করে। তার ওপর এইরকম কালো মিশমিশে বেড়াল ! ওইরকম সবুজ চোখ ! তাকালেই কেমন যেন বিতৃষ্ণায় গুলিয়ে ওঠে শরীর। কমলা আবার ঠিক উল্টো। বিড়াল কুকুর ওর একেবারে খুব ভালোবাসার জায়গা। জানে আমি করব না তাই প্রতিদিন নিজেই বাজারে গিয়ে মাছের তেল, মাংসের ছাঁট জোগাড় করে আনবে।ভাত মেখে বাড়ির দরজার সামনে রাজ্যের কুকুর বেড়াল জুটিয়ে খাওয়াবে। এগুলোর মধ্যেই ওই কালো বেড়ালটাকে দেখেছি। কী জানি কেন ওটার প্রতি কমলার একটু বাড়তি প্রশ্রয়ও চোখে পড়েছে। মাঝে মাঝেই দেখতে পাই রান্নাঘরের বারান্দায় বা বাইরের রকে মেজাজে শুয়ে রোদ পোহাচ্ছে। দেখলেই রে রে করে তেড়ে গেছি । আর আমার রুদ্র মুর্তি দেখে ওটাও লেজ তুলে ছুটে পালিয়েছে। অফিস যাওয়া আসার পথে কাছাকাছি থাকলে কেমন যেন পা নিশপিশ করত অকারনেই। কমলা আমার এরকম আচরণে কষ্ট পেত। কিন্তু চুপচাপই থাকত। ইদানিং তো খোকনের অসুখের বাড়াবাড়ি হবার পর থেকে একেবারেই চুপ করে গেছে ও।
খোকন। আমাদের একমাত্র সন্তান। দুরারোগ্য ব্যাধিতে মৃত্যুশয্যায়। ডাক্তার , ওষুধ, লৌকিক, অলৌকিক সব দরজায় ঘুরে আজ শেষের দিন উপস্থিত। আজ খোকনের সব যন্ত্রণার উপশম হবে। নিশ্চিন্তে শান্তির ঘুমে ঘুমিয়ে পড়বে ও। দেখছেন না ওর শরীরটা আস্তে আস্তে কেমন নিস্তেজ হয়ে আসছে ? ঠিক যেমন সেদিন ওই —
না না। বিশ্বাস করুন আমি এতটাও ঠিক চাই নি। আগের মুহুর্ত পর্যন্ত ভাবিও নি । আসলে অফিসের ওই রামশরণ — হ্যাঁ হ্যাঁ আমাদের ওই পিয়ন রামশরণ — ওর কথাগুলো কেমন যেন গোলমাল করে দিল সব। এমনিতেই মাথার ঠিক নেই তখন। দিন দিন বেড়ে চলেছে ছেলের অসুখ ! ওষুধ , ডাক্তার , সপ্তাহে তিন দিন রক্ত বদল সব মিলিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে । খরচ আর একই সংগে একমাত্র সন্তানের আসন্ন মৃত্যু সম্ভাবনা আমাকে যেন পাগল করে তুলেছিল। তাও তখনও মাথায় এসব কিছু ছিল না জানেন ? একদিন —
একদিন ওই রামশরণ কী কারণে যেন বাড়িতে এল। সেদিন খোকনের খুব বাড়াবাড়ি। কমলা ছেলেকে বুকে নিয়ে বসে আছে। ডাক্তার চলে যাচ্ছেন আমি তাকে এগোতে বাইরে এসেছি। দেখি রামশরন ঢুকছে। চোখের ইশারায় ওকে বসতে বলে ডাক্তারকে ছেড়ে এসে দেখি ও এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে বারান্দার দিকে। আমাকে দেখেই জিজ্ঞেস করল,
” এই কালো বেড়াল কতদিন ধরে পুষছেন দাদা ?”
” পোষা না। ওটা এমনি আসে। বউ খেতে টেতে দেয়। “
” তাড়ান। এক্ষুনি তাড়ান। এ সব কত অমঙ্গল ডেকে আনে সংসারে জানেন ? “
” দূর “, হেসে উড়িয়ে দিই ওর কথা।
” না দাদা। সত্যি বলছি। এইরকম মিশমিশে কালো বেড়াল আসলে মৃত্যুর দূত। আপনারা শহরের লোক। এসব মানেন না। আমরা গ্রাম দেশের মানুষ। বিশ্বাস করি। আপনি নিজেই দেখবেন হিসেব করে । দেখবেন যবে থেকে ও বাড়িতে ঢুকেছে সেদিন থেকেই খোকনের অসুখ বাড়তে শুরু করেছে। ”
পুরোপুরি বিশ্বাস না করলেও কেমন যেন অজান্তেই একটা হিসেব চলে এলো মনের মধ্যে। আবছা যেন মনে হল কিছুটা হলেও সত্যি বলছে রামশরন। তারপর থেকেই ওটাকে দেখলে আমার কী রকম যেন রাগ হয়ে যেত। কমলাকে ডেকে বলে দিলাম খাবার দেওয়া বন্ধ করতে। অফিসে গেলেই রামশরণ কী এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে থাকত আর বিড়বিড় করে বলত ,
” ঠিক হচ্ছে না দাদা । তাড়ান তাড়ান। সর্বনাশ হবার আগে কিছু করুন। ”
কিন্তু কী করব ? দেখলেই তো তাড়া করি। জুতো, লাঠি, যা পাই হাতের কাছে , তাই নিয়েই ছুটে যাই। চলে যায় তখনকার মত। কিন্তু পরে আবার দেখি ঠিক এসে বসে আছে ! কমলা ওর বরাদ্দ মাছের কাঁটা মাখা ভাত দিয়ে রেখেছে জবা গাছের নীচে। মুখ নীচু করে খাচ্ছে আর আড়ে আড়ে তাকাচ্ছে আমার দিকে। বেশ ভারী হয়ে গেছে চেহারা খেয়ে খেয়ে। কমলার দিকে একবার কটমট করে তাকিয়ে তেড়ে যেতে যাব তক্ষুনি ও ভাঙ্গা গলায় বলে উঠল, ” অমন করো না। পোয়াতি ওটা। তাড়াতে নেই। অমঙ্গল হয়। “
থমকে গেলাম। পোয়াতি ! তার মানে আবার ওই রকম কালো কালো কতগুলো বাচ্চা কিলবিল করবে বাড়ির মধ্যে।
আহ্ ! ম্যাগো ! ঘেন্নায় যেন বমি উঠে আসে ভেতর থেকে । কমলার দিকে তাকিয়ে দেখি ও সস্নেহে তাকিয়ে আছে বেড়ালটার দিকে। দেখলে যেন গা জ্বলে । কোন মানে আছে এত আদিখ্যেতার ! কী আছে ওই কুৎসিত জীবটার মধ্যে? নিষেধ করলেও শোনে না। কেমন যেন রাগ চড়তে লাগল মাথায়। দেখলেই আগুন ছুটতে থাকে শরীরে।চেষ্টা করি। নিজেকে অনেক বোঝাই। একটা তুচ্ছাতিতুচ্ছ প্রাণীকে নিয়ে এত বিদ্বেষ, এরকম টেনশন করাটা ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু সেটা যতক্ষণ ওটা চোখের সামনে থাকে না সেই সময়টুকুই। দেখলেই মাথা জ্বলতে থাকে । শেষে একদিন —
ওই দেখুন আবার এসেছে ওটা ! দেখুন ! কী ভয়ানক জিঘাংসা ঝরে পড়ছে ওর চোখ দিয়ে ! জ্বল জ্বল করে জ্বলছে সবুজ মনি দুটো ! আর ওর মাথাটা ঠিক যেখানটায় আমি সেদিন — আহ্ !
কিন্তু বিশ্বাস করুন ! সত্যি আমি করতে চাই নি অতটা ! কিন্তু ওই যে কী এক অবুঝ রাগ চেপে বসলো সেদিন মাথায়। কমলা তখন স্নানে গেছে।
সেদিন কী কারণে ছুটি ছিল । দুপুরবেলা খোকনের মাথার কাছেই হিসেব নিয়ে বসেছিলাম। মাসের শেষের দিক। হাতে টাকা পয়সাও কমে এসেছে। তারই মধ্যে এ সপ্তাহেই আরো দুটো নতুন ওষুধ লিখে দিলেন ডাক্তার। জানি নিরর্থক। কিন্তু তবুও তো কিনতেই হবে। সপ্তাহের শেষের দিকে আবার একবার রক্ত বদলানো আছে। এখন সপ্তাহে তিন দিন করতে হচ্ছে। ন্যাতার মত পড়ে আছে ছেলেটা। একটু আগেই এক বাটি দুধ নিয়ে খাওয়াবার চেষ্টা করছিল কমলা। পারে নি। আজকাল কিছু মুখেই দিতে চায় না। ভাবতে ভাবতে একটু বোধ হয় অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ কী করে কে জানে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জাগ্রত হয়ে উঠল। কী যেন একটা অস্বস্তি জানান দিলো ভেতর থেকে। চোখ তুলে তাকিয়ে দেখি কখন নিঃশব্দে ঘরে ঢুকেছে বেড়ালটা। দিব্যি নিশ্চিন্ত মনে মুখ ডুবিয়ে দিয়েছে খোকনের দুধের বাটিতে। চুক চুক করে নিঃশেষ করে দিচ্ছে পুরো দুধটা। নিমেষের মধ্যে যেন শয়তান ভর করল মাথায়। দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল আগুন ! স্থান, কাল ,পাত্র বিচার করার সত্ত্বাটুকু খোয়ালাম। মুহুর্তে হাতের সামনে রাখা ভারী পাথরের ফুলদানীটা ওর মাথা লক্ষ্য করে —
আহ্ ! একটা তীব্র চিৎকার ! দুটো কালো লোমশ পায়ের অসহায় দপদপানি ! আর তারপরই —
সব নিস্তব্ধ ! কিন্তু শয়তানটা তখনো আমার মাথা থেকে নামেনি। ফিস ফিস করে কানের কাছে তখনো বলে চলেছে এই বেলা – হ্যাঁ হ্যাঁ এই বেলা কেউ দেখার আগেই ফেলে দিতে হবে।
নিঃশব্দে উঠলাম। একটা প্লাস্টিকের থলেতে ভরে নিলাম ওটাকে। উঠোন থেকে কুড়িয়ে নিলাম দুটো আধলা ইঁট। তারপর বাইরে বেরিয়ে সবসুদ্ধু সজোরে ছুঁড়ে দিলাম সামনের ডোবাটায়।
ডুবে গেলো জানেন ! হ্যাঁ। সত্যি বলছি। ডুবে গেলো। ভেসে ওঠার কোন উপায়ই তো ছিল না ! বাঁচারও !
তবু কী করে এলো বলুন তো?! কী করে ! ওই যে ! ওই আবার ! আবার এসেছে ! দেখুন না প্লিজ। একটু তাড়িয়ে দিন না ! দিন না প্লিজ।
সমাপ্ত
![]()







