অসামাজিক জীবন
সুবর্ণ রুদ্র
দমদমের এই গলিটায় দুপুর নামে খুব অলস পায়ে। প্লেনের গমগমে আওয়াজটা যখন মাথার ওপর দিয়ে সাঁ করে বেরিয়ে যায়, জানলার শার্সিতে একটা মৃদু কাঁপন লাগে। সেই কাঁপনটুকু বাদ দিলে বাকিটা স্থবির; যেন অনন্তকাল ধরে তপ্ত পিচের ওপর দিয়ে একটা হলদে ট্যাক্সি চলে যাচ্ছে, আর তার যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে আছে রাস্তার ধারের কৃষ্ণচূড়া গাছটা। আমার এই একতলার ঘরের জানলা দিয়ে ঠিক ওইটুকুই দেখা যায়। লোকে বলে আমি অসামাজিক; কথাটা পুরোপুরি মিথ্যে নয়, আবার সম্পূর্ণ সত্যিও নয়। সত্যি-মিথ্যের মাঝখানে যে একটা সরু, স্যাঁতস্যাঁতে গলি থাকে, আমার জীবনটা অনেকটা সেরকম।
আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী—তাদের চোখে, আমি, অমলভূষণ মিত্র, একজন অহংকারী, মেজাজী বৃদ্ধ। আমি কোনও অনুষ্ঠানে যাই না, এমনকি যখন যাই, তখনও হাতে প্লেট বা থালা তুলি না। লোকেরা ফিসফিস করে বলে, “অমলদার বৌ চলে যাওয়ার পর থেকে লোকটার মেজাজ কেমন খিটখিটে হয়ে গেছে,” অথবা কেউ একটু এগিয়ে গিয়ে বলে, “টাকার গরম। আমাদের মতো সাধারণ পোশাকের লোকের সাথে মিশতে পারেন না!” আমি শুনি, আর মনে মনে হাসি। ওদের কী করে বোঝাই, আমার এই দূরত্ব অহংকারের বর্ম নয়, এ হলো ডাক্তারের টেনে দেওয়া লক্ষণরেখা। আমার হার্ট বাবাজি কবে-ই উত্তর দিয়েছেন। ওদিকে প্রেশার আর সুগার—এই দুই ভাই মিলে শরীরে নতুন জোট সরকার গড়েছে। ডাক্তার স্পষ্ট বলেছেন, “মিত্র সাহেব, যদি বাঁচতে চান, জিভে তালা দিন। খাবারকে দেখবেন কিন্তু তাকে আপন ভাববেন না। বাইরের খাবার তো দূরের কথা, বেশি তেল-ঝাল দিয়ে ঘরে রান্না করা খাবারও মুখে তুলবেন না।”
তাই আমার জীবন এখন সেদ্ধ লাউ, সেদ্ধ পেঁপে আর এক বাটি স্বাদহীন পথ্যেই সীমাবদ্ধ। এদিকে, আমার বাড়িতে প্রতিদিনই রান্নার উৎসব। আমার ছেলে সৌরভ আর বৌমা রীতা—দুজনেই আধুনিক ও ব্যস্ত। তাদের রান্নাঘরে কন্টিনেন্টাল, চাইনিজ আর মোগলাইয়ের অবাধ আনাগোনা। যখন রান্নাঘরের চিমনি ভেদ করে আমার ঘরে চিলি চিকেন বা মাটন বিরিয়ানির গন্ধ ভেসে আসে, আমি চোখ বন্ধ করে ফেলি। রবীন্দ্রনাথ হয়তো এমনই মুহূর্তের জন্য লিখেছিলেন, “যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই, যাহা পাই তাহা চাই না।” কী নিদারুণ সত্যি! আমি প্রতিদিন সেই গন্ধ শুঁকি, চোখ দিয়ে তাদের সাজানো খাবার দেখি, আর মনে মনে তার স্বাদ গ্রহণ করি। সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছিলেন, ‘বই কিনে কেউ কোনোদিন দেউলে হয় না’। আমি একটু বদলে নিয়ে বলি, ‘কল্পনায় খেয়েও কেউ কোনোদিন অসুস্থ হয় না’। আমি এখন জিভ ছাড়া বাকি চার ইন্দ্রিয় দিয়েই কন্টিনেন্টাল খাবার খাই।
সৌরভ আমার কর্তব্যপরায়ণ ছেলে। অফিস থেকে ফিরে সে নিয়ম করে আমার ঘরে উঁকি দিয়ে যায়, “বাবা, তুমি ঠিক আছো? কিছু লাগবে?” এর কিছুক্ষণ পরেই রীতা হাতে করে আমার ‘পথ্য’-এর প্লেটটা নিয়ে আসে, “বাবা, এটা খেয়ে নিন। আর হ্যাঁ, ওদিকে তাকাবেন না, শরীর খারাপ করবে।” তাদের এই যত্নটুকু বড় বেশি হিসাবি, বড় বেশি লোক দেখানো। ঠিক যেন একটা চেকবক্সে টিক চিহ্ন দেওয়া—’বাবার যত্ন নেওয়া হলো’। কথোপকথনের আড়ালে আমি স্পষ্ট শুনতে পাই তাদের চাপা বিরক্তি, “এই বয়সে রাতে কিছু একটা হলে আবার হাসপাতাল দৌড়াতে হবে!” এই নিয়ন্ত্রিত জীবন, এই একাকী ঘর—সবকিছুই আমার নিঃসঙ্গতাকে আরও তীব্র করে তোলে। আমি ‘অসামাজিক’ নই, আমি আসলে এক অদৃশ্য মানুষ।
সেদিন বিকেলে, অগত্যা সবজি সেদ্ধটা গিলে জানলার বাইরে তাকালাম। একটা কাক কর্কশ স্বরে ডাকছিল। হঠাৎই ছেলেবেলার রবিবারের দুপুরগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠল। উঠোনের মাটির মাদুরে বসে সবাই মিলে খাচ্ছি। আমার মায়ের হাতের আলু-বেগুন দিয়ে রান্না করা সেই পাতলা মাছের ঝোল, যার ওপরে কয়েকটি কাঁচা লঙ্কা আর ধনেপাতার কুচি ভাসছে। ওহ! কী তার স্বাদ! আমার মায়ের হাতের সেই সাধারণ ঝোল আজকের এই ক্লাউড কিচেন থেকে আনা হাজার টাকার খাবারের পাশে অমৃত-সমান। আজকের ছেলেমেয়েরা ‘কমফোর্ট ফুড’ বলে একটা শব্দ ব্যবহার করে। আমার কমফোর্ট ফুড ছিল মায়ের ভালোবাসায় মাখা ওই মাছের ঝোল। মার্সেল প্রুস্ট বলেছিলেন, ‘অতীতের স্মরণ শুধু তাকে জানা নয়, তাকে নতুন করে তৈরি করাও বটে।’ স্মৃতিকাতরতা এক বিপজ্জনক নেশা, মুহূর্তেই বর্তমানকে দুঃস্বপ্ন করে তোলে।
এরই মধ্যে নীলাদের বাড়ি থেকে আমন্ত্রণপত্রটা এলো। রিতার খুড়তুতো বোনের বিয়ে। জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন। আমি যেরকমটা আশঙ্কা করেছিলাম, ঠিক সেটাই হলো।
“বাবা, তোমাকে যেতেই হবে। ওটা আমার খুব কাছের আত্মীয়ের বাড়ি,” সৌরভ বলল। ওর কথার মধ্যে অনুরোধের চেয়ে আদেশ বেশি, “না গেলে পরে কথা শুনতে হবে।”
“আমার শরীর…” আমি বলার চেষ্টা করলাম।
রীতা প্রায় কাঁদোকাঁদো হয়ে বলল, “বাবা, প্লিজ! তুমি না গেলে খুব খারাপ দেখাবে। লোকে কী বলবে? সবাই বলবে, শুধু তোর শ্বশুরমশাই এলেন না!”
‘লোকে কী বলবে’—এই বাক্যটা যেন বাঙালির জাতীয় আপ্তবাক্য। এর পায়ে কত ইচ্ছা-অনিচ্ছা যে বলিদান হয়, তার হিসাব কে রাখে! আমি আর না করতে পারলাম না। যেতে রাজি হলাম, তবে শর্ত একটাই—বেশি রাত করব না, আর কিছু খাব না।
বিয়েবাড়িতে পৌঁছে মনে হলো, আমি ভুল গ্রহে এসে পড়েছি। চোখ ধাঁধানো আলো, কান ফাটানো সঙ্গীত, দামী শাড়ি আর উগ্র পাঁচ মেশালি সুগন্ধি—সব মিলিয়ে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ। চারপাশে মানুষের কোলাহল, হাসির হুল্লোড়, খাবারের স্টল থেকে ওঠা ধোঁয়া। আমার ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ ভালোবাসা মনটা এই কৃত্রিম সুগন্ধির অত্যাচারে হাঁসফাঁস করছিল। এই রঙিন ছবির মধ্যে নিজেকে একটা সাদা-কালো বিন্দুর মতো লাগছিল। দেয়ালে ঝোলানো এক পুরনো, অপ্রয়োজনীয় ছবির মতো একা। সবাই খাচ্ছে, গল্প করছে, সেলফি তুলছে। আর আমি এক কোণে দাঁড়িয়ে। একা। বড্ড একা। আমার মঞ্জুলার কথা মনে পড়ছে!
হঠাৎ মায়ের বলা একটা পুরনো কথা মনে পড়ল। আমি যখন কিশোর, তখন সদ্য প্রেমে পড়ে হৃদয় ভেঙে দিশেহারা। একদিন মা চা দিতে এসে আমার বিষণ্ণ মুখ দেখে বললেন, “জানি রে, প্রেমে সবাই পড়ে। কিন্তু বয়স বড় বালাই। কম বয়সে প্রেম ভুল করে, কারণ তখন আবেগ কথা বলে। আর বেশি বয়সে প্রেম টেকে, কারণ তখন অভিজ্ঞতা কথা বলে।” আমি তখন এর মানে বুঝিনি, কিন্তু আজ, এই ভিড়ের কোলাহলে দাঁড়িয়ে, হঠাৎ করে বুঝলাম অভিজ্ঞতার ভালোবাসা ঠিক কেমন হয়।
মনটা আর এক মুহূর্তও থাকতে চাইল না। তাড়াতাড়ি নবদম্পতির হাতে উপহারের প্যাকেটটা তুলে দিয়ে আশীর্বাদের ভঙ্গি করলাম। আজকালকার ছেলেমেয়েরা পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করার প্রয়োজন বোধ করে না, শুধু আলতো করে হাসে। যুগলক্ষণ! দু-একজন পরিচিতের দিকে তাকিয়ে সৌজন্যের হাসি হাসলাম, আর “এই তো, একটু পরেই খাচ্ছি” বলে খাবারের অনুরোধ এড়ালাম। তারপর এক ঝটকায় সোজা বাইরে।
গেট থেকে বেরিয়ে একটা লম্বা শ্বাস নিলাম। বাইরের ধুলোমাখা বাতাস ভেতরের কৃত্রিম ঠান্ডার চেয়ে অনেক বেশি আপন মনে হলো। একটু এগোতেই রাস্তার ওপারে, হারিকেনের টিমটিমে আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা ফুচকাওয়ালাটাকে চোখে পড়ল। ব্যস! আমার পা দুটো যেন সেখানেই আটকে গেল। কতদিন… কতদিন খাইনি! জিভটা বিদ্রোহ করে উঠল। মনের ভেতর থেকে মঞ্জুলা যেন বলে উঠল, “সারা জীবন তো নিয়ম মানলে, কী হলো তাতে? একবার ভাঙলে কী এমন অশুদ্ধ হবে? খাবারের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মরবে নাকি?”
আমি রাস্তা পার হলাম। মনের দ্বিধাকে নরকে পাঠিয়ে এগিয়ে গেলাম। সমাজের চোখ, ডাক্তারের নিষেধ, ছেলে-বৌমার বিরক্তি—সব তুচ্ছ। ফুচকাওয়ালার কাছে গিয়ে ভাঙা গলায় বললাম, “কড়া করে ঝাল আর টক দিয়ে দশটা ফুচকা দিন তো ভাই।”
লোকটা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল। হয়তো আমার পোশাকের আর বয়সের সঙ্গে এই অনুরোধটা মেলাতে পারছিল না। কিন্তু পেশাদার মানুষ, কিছু বলল না। শালপাতার বাটিতে টলটলে তেঁতুল জলে ডোবানো ফুচকাটা যেই না মুখে পুরেছি… আহা! যেন স্বর্গের অমৃত! তবুও পুরনো অভ্যাসবশত বললাম, “আর একটু বিটনুন হলে জমে যেত।”
ফচাৎ! ফচাৎ! এক-একটা গোলা যখন পেটে চালান করছি, সে যে কী আনন্দ, তা ভাষায় প্রকাশ করার নয়।
শুধু এই স্বাদটাতেই মনে হলো সময় চল্লিশ বছর পিছিয়ে গেছে। এ তো শুধু ফুচকা নয়, এ একটা টাইম মেশিন। এই স্বাদ, এই গন্ধ—এটাই ছিল আমার আর মঞ্জুলার গোপন সঙ্কেত। মঞ্জুলা, আমার প্রৌঢ়ত্বের প্রেম। আমরা দুজনেই ষা-ট পেরনো মধ্যবয়সী (বৃদ্ধ নই), সংসারের যাঁতাকলে পিষ্ট দুটো একলা মানুষ। ওর স্বামী নেই, আমার স্ত্রী নেই। ছেলেমেয়েরা নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। আলাপ হয়েছিল এক লাইব্রেরিতে। তারপর এই ফুচকার দোকানে এসে সম্পর্কটা গভীর হয়েছিল।
মঞ্জুলা পাশে থাকলে ঠিক বলত—
“আজকের ফুচকাটা বেশি টক, তাই না, অমল?”
“তোমার কথার চেয়ে কম,” আমি হেসে উত্তর দিতাম।
আমাদের ভালোবাসা ছিল শান্ত, গভীর, অভিজ্ঞতায় ভরা। তাতে আবেগের বাড়াবাড়ি ছিল না, ছিল পারস্পরিক নির্ভরতা। আমরা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতাম না, বর্তমানের ছোট ছোট মুহূর্তগুলো চুরি করে বাঁচতাম। এই ফুচকা খাওয়া ছিল আমাদের ছোট্ট বিদ্রোহ, সমাজের চোখকে ফাঁকি দিয়ে নিজেদের জন্য বাঁচা। আমি প্রতি সন্ধ্যা…য় বাসে চেপে চলে যেতাম গোরাবাজার নরেন্দ্র হলের সামনে, আর মঞ্জুলা আসত বাজারের ব্যাগ নিয়ে। বেশ কিছু সময় আমরা কাটাতাম আমাদের মতো করে। বলার কেউ ছিল না। ফুচকা খাওয়া মানেই সেদিনের মত আড্ডা শেষ।
তারপর… তারপর একদিন হঠাৎ মঞ্জুলা চলে গেল। ওর ছেলে আমেরিকা থেকে এসে ওকে নিয়ে গেল। শেষদিন, এই ফুচকার দোকানে দাঁড়িয়ে মঞ্জুলা আমার হাত ধরে বলেছিল, “যদি কখনও খুব একা লাগে, এখানে এসে ফুচকা খেয়ো। আমার কথা ভেবো। এই স্বাদের মধ্যে ঠিক আমাকে খুঁজে পাবে।”
আজ এত বছর পর… ফুচকাওয়ালা অষ্টম ফুচকাটা হাতে দিল। ঝাল আর নোনতা জলে চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। এটা কি ফুচকার ঝাল, নাকি স্মৃতির ঝাঁঝ? কে জানে! দশটা ফুচকা খাওয়ার পর মনে হলো, ফুসফুসে বিশুদ্ধ অক্সিজেন ভরলাম। এ শুধু খাওয়া নয়, এ ছিল আমার নিয়ন্ত্রিত জীবনে নিজের ইচ্ছাকে প্রতিষ্ঠা করার মুহূর্ত। মঞ্জুলার কাছে রাখা আমার নীরব প্রতিশ্রুতি।
এক অদ্ভুত তৃপ্তি নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। মুখে গোপন জয়ের হাসি। সমাজ আমাকে ‘অসামাজিক’ বলে, কিন্তু আমার মতো সামাজিক আর কে আছে? আমি তো আজও আমার প্রেমের সঙ্গে, আমার স্মৃতির সঙ্গে কথা বলি।
বাড়ি ফিরে দেখি, ওরা ফেরেনি। ঘরে ঢুকে আলো জ্বাললাম না। অন্ধকারটাই ভালো লাগছে। কিছুক্ষণ পর গাড়ির শব্দ। সৌরভ আর রীতা ফিরল। ঘরে ঢুকেই সৌরভ তার দায়িত্ববোধ থেকে জিজ্ঞেস করল, “বাবা, ওখানে কিছু খাওনি তো?”
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আমি শান্ত, শীতল গলায় ডাহা মিথ্যে বললাম, “না।”
এই ছোট্ট মিথ্যাচারে কোনো অপরাধবোধ ছিল না। ছিল নিজের জন্য চুরি করা এক টুকরো আনন্দ, অনেকটা ছোটবেলায় লুকিয়ে “নবকল্লোল” পড়ার মতো! একটা গোপন প্রতিশ্রুতি রাখার পরম তৃপ্তি। ওরা বিয়েবাড়ির খাবারের গল্প করতে করতে নিজেদের ঘরে চলে গেল।
আমি জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। মাথার ওপর দিয়ে আরও একটা প্লেন সাঁ করে বেরিয়ে গেল, তার দুটো লাল আলো অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। আমি বুঝলাম, সামাজিক হওয়া মানে ভিড়ের মধ্যে মিশে যাওয়া নয়। সামাজিকতা হলো নিজের আত্মার সঙ্গে সংযোগ রাখা। যে সংযোগ আজ আমি খুঁজে পেয়েছি।
লোকে আমাকে অসামাজিক বলে দূরে ঠেলে দেয়। আমার ছেলে-বৌমা কর্তব্য করে, কিন্তু ভালোবাসে না। ডাক্তার নিয়ম বেঁধে দেয়, কিন্তু বাঁচার আনন্দ দেয় না। তাহলে আমার জীবনের আসল অপরাধী কে?
আজ আমি সেই অপরাধের বিরুদ্ধে আমার রায় দিয়েছি। এই ফুচকার স্বাদ শুধু আমার জিভের জন্য নয়, আমার আত্মার জন্য। মঞ্জুলা হয়তো হাজার হাজার মাইল দূরে, কিন্তু আমি জানি, ও ঠিক টের পেয়েছে। আমাদের ভালোবাসা লুকিয়ে ছিল, কিন্তু মরেনি। মানুষ কী দেখল, সমাজ কী বলল, তাতে কী এসে যায়! আসল গল্পটা তো মনের ভেতরে লেখা থাকে, বাইরে নয়।
আমার জীবনের আসল অপরাধী কোনো ব্যক্তি নয়। আমার অপরাধী হলো ‘লোকে কী বলবে’ নামক সেই অদৃশ্য দৈত্যটা, যা আমার বার্ধক্যকে এক নিঃসঙ্গ কারাগারে পরিণত করেছে। আর আজ রাত্রিতে, দশটা ফুচকার বিনিময়ে আমি সেই কারাগার থেকে এক মুহূর্তের জন্য জামিন পেয়েছি। এই স্বাদ যদি আমার শেষ যাত্রার সঙ্গীও হয়, ক্ষতি নেই।
শেষ
![]()







