আতঙ্কের সেই রাত
বাসুদেব দাশ
কলিংবেল বাজার শব্দ শুনতে পেয়ে অহর্নিশ দরজা খুলে দেখে এক অপরিচিত মধ্য বয়স্কা ভদ্রমহিলা বাড়ীর গেটে দাঁড়িয়ে আছেন । মুখের উজ্জ্বল্য ভাব দেখে বয়সটা আন্দাজ করতে একটু অসুবিধা হচ্ছে। মেয়ে না বলে মহিলা বলাটাই বয়সের সঙ্গে মানান সই বলে অহর্নিশের মনে হয়েছে। মুসলধারে বৃষ্টি হওয়ায় ভদ্রমহিলার মাথার চুল এবং শাড়ির বেশির ভাগটাই ভিজে গেছে। ভদ্র মহিলা কাঁচুমাচু মুখ করে বলে… হঠাৎ করে বজ্র বিদ্যুৎ সহ বৃষ্টি নেমে পড়ে কিন্তু আমার কাছে ছাতা নেই তাই আমি অনেকটাই ভিজে গেছি। যদি কিছু মনে না করেন তো একটা কথা বলি। অহর্নিশ… হ্যাঁ বলুন। ইতস্তত করার কিছু নেই। ভদ্রমহিলা… আমার নাম ঋষিকা, এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমি একদম ভিজে যাচ্ছি। যদি একটু ভিতরে বসতে দিতেন ? বৃষ্টি থামলেই আমি চলে যাবো। আমার বাড়ী অনেকটা দূরে তাই ভিজে কাপড়ে অনেকক্ষণ থাকলে জ্বর এসে যেতে পারে। তাই বিশ্বাস করে যদি একটু জায়গা দেন। অহর্নিশ…না না এতে অবিশ্বাসের কি আছে ? ইস আপনি তো একদম ভিজে গেছেন। আসুন, আপনি ভিতরে এসে বসুন। ঋষিকা… আপনাকে যে কি বলে ধন্যবাদ দেবো ? অহর্নিশ… ঠিক আছে, ধন্যবাদের কিছু নেই। আপনি এই সোফাটাতে বসুন। ঋষিকা….কিন্তু আমি এই ভিজে কাপড়ে বসলে সোফাটা ভিজে যাবে। অহর্নিশ… কিন্তু তা বলে তো দাঁড়িয়ে থাকা ভালো দেখায় না। এটলিস্ট আপনি আমার গেস্ট। ঋষিকা…আপনি কি এখানে একাই থাকেন ? অহর্নিশ… হ্যাঁ, সাত বছর হলো আমার স্ত্রী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তারপর থেকে আমি একাই আছি। ঋষিকা… সরি, আমি বুঝতে পারিনি। অহর্নিশ… আপনি একটু চা কিম্বা কফি খাবেন কিছু ? ঋষিকা… কফি। অহর্নিশ… ঠিক আছে আমি বানিয়ে নিয়ে আসছি। ঋষিকা… আপনি বানাবেন ? আমাকে কিচেনটা দেখিয়ে দিন না, আমি বানাচ্ছি। অহর্নিশ… আপনাকে আমার স্ত্রীর একটা কাপড় দি, আপনি কতক্ষন ভিজে কাপড়ে থাকবেন ? ঋষিকা… তার দরকার নেই। বৃষ্টি থামলেই আমি চলে যাবো। অহর্নিশ… কিন্তু বৃষ্টি থামার তো কোন লক্ষণই দেখতে পাচ্ছি না। আপনি ওয়াশরুমে গিয়ে পোষাকটা চেঞ্জ করে নিন, আমি কফি নিয়ে আসছি। ঋষিকা…. অনেক বেলা হয়ে গেলো, এবার তো আমাকে যেতে হবে। অহর্নিশ…. কিন্তু বৃষ্টি
তো থামে নি । যাবেন কি করে ? ঋষিকা…. কিন্তু যেতে তো আমাকে হবেই। অহর্নিশ… যেভাবে বৃষ্টি পড়ছে তাতে বাড়ী পৌঁছাতে পৌঁছাতে আপনি কাক ভেজা হয়ে যাবেন। ঋষিকা… আমার উপর ভীষণ মায়া চলে এসেছে আপনার। ধন্যবাদ। অহর্নিশ… অনেক রাত হয়ে গেছে। বৃষ্টির জন্য বাস হয়তো বন্ধ হয়ে গেছে এতক্ষন। আপনি যাবেন কি করে ? রাস্তায় গিয়ে বিপদে পরে যাবেন । ঋষিকা,… কিন্তু কি করবো ? আহর্নিশ…যদি কিছু না মনে করেন,এখানে রাতটা থেকে কাল ভোর বেলা চলে যেতে পারেন । যদি আমাকে বিশ্বাস হয় আপনার ? ঋষিকা… বিশ্বাস অবিশ্বাসের কথা না। আহর্নিশ… তাহলে আমি রান্না করছি এক গাল মুখে দিয়ে রাতটা কোন রকমে কাটিয়ে দিয়ে কাক ভোরে বেরিয়ে যাবেন। ঋষিকা… মাঝ খান থেকে আপনাকে বিপদে ফেললাম। অহর্নিশ… ছিঃ ছিঃ , আপনি আমাকে কোন বিপদে ফেলেন নি। ঋষিকা…. চলুন আমি আপনাকে রান্নায় সাহায্য করি। আহর্নিশ… না না আপনি আবার কেনো ? আপনি আমার গেস্ট। আপনি বসুন। আমার অভ্যাস আছে। আমি পারবো। ঋষিকা… আমি সবজি কেটে দিচ্ছি।
আস্তে আস্তে অহর্নিশ রান্না ঘর থেকে সরে এসে সোফায় বসে টিভি দেখতে থাকে আর ঋষিকা রান্নাটা কমপ্লিট করে। ওরা দু জন্ই হারিয়ে যাওয় একটা অতীতকে মনের মধ্যে খুঁজতে থাকে। একটু বাদে দু জন অনাত্মীয় নারী পুরুষ, অনাত্মীয় দম্পতিও বলা যেতে পারে খাবার টেবিলে মুখোমুখি খেতে বসে। দু জনেরই পুরানো মরচে পড়া স্মৃতি ফর্দা ভেদ করে বেরিয়ে সামনে আসতে চাইছিল । অতীত যেন সামনে এসে দাঁড়াতে চাইছে। কিছুক্ষণ কারো মুখে কোন কথা নেই। যেন কোন নৈশব্দে গ্রাস করে নিয়েছে পুরো ঘরটাকে । হঠাৎ এই নৈশব্দের মধ্যে থেকে অহর্নিশের বুকের পাঁজর ভেঙে শব্দ বেরিয়ে আসে মুক্ত বাতাসে। অহর্নিশ…এই রান্নার স্বাদটা ঠিক আমার স্ত্রীর হাতের রান্নার মতো। ঋষিকার বুকের ভিতর থেকে গলার মধ্যে দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস গড়িয়ে পড়লো ঘরের মেঝেতে । ঋষিকার খুব আক্ষেপ হয় এই জীবন বয়ে বেড়াবার জন্য। একটা শব্দহীন নীরব কান্না বেরিয়ে আসতে চায় তার বুকের পাঁজর ভেঙে। মনের ভিতরের দগদগে ঘাটাকে সে কিছুতেই নিরাময় করতে পারছে না সে ।
ঋষিকা…. কি বললে ? রান্নাটা… যা তুমি বলে ফেললাম। আহর্নিশ… কোন অসুবিধা নেই। আমার স্ত্রী বেঁচে থাকলে সে তোমার বয়সিই হতো।
ঋষিকা… সে কি সত্য সত্যিই ক্যান্সারে মারা গিয়েছিল ? না কি অন্য…
অহর্নিশ…অন্য ? কি অন্য ?
ঋষিকা… সেটা তো তুমি ভালো যান।
আহর্নিশ….তুমি কি ঈশিতাকে চিনতে ?
ঋষিকা….সেই দগদগে ঘা তো এখনো নিরাময় হয় নি। ভুলতে চাইলেও ভুলতে পারছি কোথায় ? অনেক রাত হয়েছে ঘুমিয়ে পর। অহর্নিশ,… তুমি ঐ খাটে শুয়ে পর আমি এই সোফাটায় একটু গড়িয়ে নেবো। রাতে আমার ঘুম ভালো হয় না। ঋষিকা…. তুমি শুয়ে পর আমি তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি দেখবে ঘুম এসে যাবে।
সত্যি সত্যিই অল্প সময়ের মধ্যে অহর্নিশ ঘুমিয়ে পরে। কিন্তু ঋষিকা ঘুমায় না । জেগে থাকে বহু দিনের লালিত পালিত প্রতিশোধের স্পৃহাকে বুকে নিয়ে। কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে। তারপর দেখে অহর্নিশের হৃদ স্পন্দন বন্ধ হয়ে গেছে। অহর্নিশের ভবলীলা সাংগ হয়ে গেছে। সুযোগ বুঝে সে বাইরে যাবার ঘরের দরজা আর মেইন গেট খুলে রাখে। সব কটা ঘর,রান্না ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়। তারপর অহর্নিশকে টেনে বাথরুমে নিয়ে যায়। ওর গায়ে আগুন লাগিয়ে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। যাবার আগে একটা সিগারেট ধরিয়ে অর্ধেকটা পোড়া অবস্থায় পাশে রেখে দেয়। ঘরের দরজা ও গেট বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে দিয়ে যায়। যাতে অহর্নিশ বাইরে বেরিয়ে লোক ডাকতে না পারে । গভীর রাতে সারা পাড়া যখন ঘুমের কোলে ঢোলে পড়েছে ঠিক তখনই ঋষিকা তার প্রতিশোধের আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে তার জন্য অপেক্ষারত গাড়িতে করে পালিয়ে যায়। অহর্নিশের গায়ে আগুন লেগে গেলেও সে চিৎকার করতে পারেনি । একটা বিড়াল ধূপফাপ করে আওয়াজ করতে থাকে ঘরের মধ্যে বাইরে বের হবার জন্য । অনেক বাড়ী থেকেই আওয়াজটা ক্ষীণ স্বরে শুনতে পেয়েছে কিন্তু পরিষ্কার করে কিছু বুঝতে পারেনি তাই কেউ আসে নি অহর্নিশকে বাঁচাতে। সকাল বেলা পাশের বাড়ীর অঙ্কিত রায় অহর্নিশকে ডেকে জিজ্ঞাসা করতে এসে বার বার কলিং বেল বাজাবার পরও কোন সারা না পেয়ে সে আরও তিন চার জনকে ডেকে আনে। কিন্তু ভিতর থেকে কেউ সারা দেয় না। গেট বাইরে থেকে বন্ধ থাকায় ওনারা ভিতরে ঢুকতে পারে না। এতে সবারই সন্দেহ বেড়ে যায়। অঙ্কিত বাবুরা সবাই মিলে থানায় যায় রিপোর্ট করতে। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ওনাদের সঙ্গে নিয়ে অহর্নিশের বাড়ী আসে। দরজা ভেঙে যা দেখলো তাতে সবাই চমকে ওঠে। অহর্নিশ আদ পোড়া শরীর নিয়ে মরে পরে আছে ঘরের মেঝেতে। মাথা এবং বুকের দিকটা পুরোটা পুরে গেছে। অহর্নিশের ডেড বডি আর পোড়া সিগারেটের টুকরো পাওয়া যায় ঘরের মেঝে থেকে । বেড রুমের বালিশ থেকে লম্বা দু গাছা চুল পাওয়া যায় আর একটা নাইটি। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে বিড়ালটা লাফ দিয়ে বেরিয়ে যায়। কে বা কারা অহর্নিশকে খুন করলো আর কেনই বা খুন করলো না কি আত্মহত্যা সেটা পুলিশের কাছে একটা বিরাট বড় রহস্য সৃষ্টি করেছে। পাড়ার লোকেদের মধ্যেও এই কেসটা চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। পাড়ার লোকেরা কেউ কিচ্ছু বুঝতে পারে না। পুলিশ স্বতপ্রণদিত হয়ে একটা খুনের FIR করে খুনের তদন্ত শুরু করে। অহর্নিশের বডি পোস্টমর্টেম করতে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয় । ক্রাইম সিন্ সুরক্ষিত রাখার জন্য ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখে । ফরেন্সিক দপ্তরের আধিকারিকদের খবর দেওয়া হয়। ফিঙ্গার প্রিন্ট এক্সপার্টদের ডেকে তালার হাতের ছাপ সংগ্রহ করা হয়।
পুলিশ অন্ধকারে ঢিল ছোড়ার মত করে তদন্ত শুরু করে। অহর্নিশের একদম পাশের বাড়ী অঙ্কিত রায়কে দিয়ে তদন্ত শুরু করে। পুলিশ… আচ্ছা অঙ্কিত বাবু কাল রাতে কোন চিৎকার চেঁচামেচি শুনতে পেয়েছিলেন ? অঙ্কিত…না স্যার, সেরকম কিছু কানে আসেনি। আসলে তো বের হয়ে দেখতাম। পুলিশ…. অহর্নিশ বাবু কেমন লোক ছিলেন ?
অঙ্কিত… প্রতিবেশিদের সঙ্গে ওঁনার মেলামেশা ছিল না। সুতরাং ওনি কেমন মানুষ ছিলেন সেটা বলা আমার পক্ষে খুব মুশকিল । পুলিশ…. ওনি কি একাই থাকতেন ?
অঙ্কিত…ওঁনার স্ত্রীর মৃত্যুর পর ওনি একাই থাকতেন। পুলিশ…. ওঁনার স্ত্রী কবে এবং কিভাবে মারা গেছেন ?
অঙ্কিত…. ওনি বলেছেন যে ওঁনার স্ত্রী ক্যান্সারে মারা গেছেন। তা প্রায় বছর সাতেক হবে। পুলিশ…. স্ত্রীর সঙ্গে কেমন সম্পর্ক ছিল ওঁনার ? অঙ্কিত,… প্রায় দিনই চিৎকার চেঁচামেচি শুনতাম। তবে কার দোষ যার গুণ বলতে পারবো না স্যার। পুলিশ…. ঠিক আছে। দরকার হলে আবার ডাকবো।
পুলিশ আর এক জন প্রতিবেশী, শুনেত্র বাবুর কাছে যায়। পুলিশ… কাল রাতে কোন চিৎকার চেঁচামেচি বা কোন আওয়াজ শুনতে পেয়েছেন ? মানে অহর্নিশ বাবুর বাড়ীতে কোন গন্ডগোল চলছিল বলে কি কিছু শুনতে পেয়েছেন। শুনেত্র….. না স্যার সেরকম কিছু কানে আসেনি। যা জানার সকাল বেলাতেই জানতে পারি। তারপর তো থানায় যাই সবার সাথে। পুলিশ… এটা কি খুন না আত্ম হত্যা।
শুনেত্র… স্যার এ বিষয়ে আমার কোন আইডিয়া নেই। পুলিশ….ঘরের দরজা জানালা সব বন্ধ। বাইরে থেকে তালা দেওয়া। কে বা কারা খুন করে পালিয়ে গেল ? শুনেত্র… কিছুই বুঝতে পারছি না স্যার।
পুলিশ… যদি আত্মা হত্যা হয় তবে বাইরে থেকে তালা দিল কে ? শুনেত্র… এটাই তো অদ্ভুত লাগছে। পুলিশ.. কেউ কোন প্রতিশোধ নিল ? শুনেত্র… এই সন্দেহও একদম উড়িয়ে দেওয়া যাবে না স্যার।
কিভাবে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাবে পুলিশ কিচ্ছু বুঝে উঠতে পারে না। তাই বার বার আন্দাজে তীর ছুঁড়ছে আর প্রতি বারই লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয়ে ফিরে আসছে । অহর্নিশ বাবুর মোবাইলের কল লিস্ট বের করা হয়েছে কিন্তু সেখানে কোন সুত্র পাবার মতো কল নেই। ফোনের ট্র্যাক রিপোর্ট ঘরের মধ্যেই দেখাচ্ছে। ঘরের মধ্যে থেকে সেরকম কোন কিছু পাওয়া যায় নি। যেটা পুলিশের সুত্র হিসাবে ব্যবহার হতে পারে। শুধু একটা নাইটি পাওয়া গেছে। ওটা সম্ভবত ওনার স্ত্রীর হবে। তবে যেহেতু ওঁনার স্ত্রী সাত বছর আগে মারা গেছেন তাই ঐ নাইটি টা কে এবং কেনো বাইরে বের করলো সেটা একটা দেখার বিষয় ? তবে কি কোন মহিলার আগমন ঘটে ছিল ওঁনার ঘরে ? এই চিন্তাটাও পুলিশের মাথায় ঘুঁরপাক খাচ্ছে। ওঁনার বেড রুমের বালিশ থেকে কয়েকটা লম্বা চুল পাওয়া গেছে যা কিনা ওঁনার ঘরে কোন মহিলার আগমন প্রমান করে। কারণ ঐ চুল কোন মহিলার মাথার । যদি কোন মহিলা ওঁনার ঘরে এসে থাকে তবে কে সেই মহিলা ? অহর্নিশের সঙ্গে ঐ মহিলার সম্পর্কই বা কি ? সেই মহিলাই কি খুন করে দরজায়, গেটে তালা দিয়ে পালিয়ে যায়। ঐ মহিলা কি প্রতিশোধ নিতে ওঁনার ঘরে প্রবেশ করেছিলেন ? মহিলা ওঁনার পরিচিত হওয়ায় ওনি স্বেচ্ছায় তাকে ঘরে প্রবেশ করতে দিয়েছিলেন। আর যদি ঐ মহিলা ওঁনার পূর্ব পরিচিত না হন তবে ঐ উনি তাকে ভিতরে প্রবেশ করতে দিয়েছিয়েলেন কেনো ? সিগারেট টা কে ধরালো বা কে খেলো ? সিগারেটের আগুন থেকে কি ওর গায়ে আগুন লেগে গিয়েছিলা ? এই রকম নানা প্রশ্ন আসছে পুলিশের মাথায়। এই সব প্রশ্নে উত্তর জানার জন্য অহর্নিশের বাবা মাকে দরকার কিম্বা ওনার মৃতা স্ত্রীর বাবা মাকে দরকার। কিন্তু ওনাদের ঠিকানা পাওয়া যাবে কি করে ? দিন তিনেক বাদে অহর্নিশের মা আসেন ছেলের সঙ্গে দেখা করতে। এসে ছেলের মারা যাওয়ার কথা শুনে উন মূর্ছা যান
। অঙ্কিত বাবু থানায় ফোন করে পুলিশকে মা আসার খবরটা জানিয়ে দেন। পুলিশ ততক্ষণাৎ ছুটে আসে। পুলিশ…. আপনার মনের অবস্থা আমরা ঠিক বুঝতে পারছি কিন্তু খুনের তদন্তকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য নিরুপায় হয়ে আমরা আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করবো। আপনি বিরক্ত না হয়ে যা জানেন সেটা বলে আমাদের তদন্তে সাহায্য করুন। আপনার ছেলের খুনিকে ধরার জন্য আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করুন। আপনার সঙ্গে আর কে কে থাকেন ? মা,পিয়ালী দেবী… আমার স্বামী আর আমার ছোট ছেলে ও তার স্ত্রী। পুলিশ…. আপনি কবে জানলেন যে আপনার ছেলে খুন হয়েছে ? পিয়ালী….
আজই জানলাম এখানে এসে। পুলিশ… আহর্নিশ বাবু আপনাদের সঙ্গে থাকতেন না কেনো ? পিয়ালী… ওর স্ত্রী আমাদেরকে মানিয়ে নিতে পারে নি তাই ও আলাদা বাড়ী কিনে স্ত্রীকে নিয়ে এখানে চলে আসে। পুলিশ….অহর্নিশ বাবুর স্ত্রী কিভাবে মারা যান ? পিয়ালী…ক্যান্সারে। পুলিশ…. কে খুন করতে পারে বলে আপনার মনে হয় ? পিয়ালী… জানি না স্যার। আপনারা খুনিকে ধরে ওর উপযুক্ত শাস্তি দিন। পুলিশ…
আপনাদের পরিবারের কেউ শত্রু আছে ? পিয়ালী… আমাদের সঙ্গে শত্রুতা আছে এমন কারোকে তো জানি না আমি। আমি তো কোন দিন শুনিনি। পুলিশ….. আপনার স্বামী ও ছোট ছেলেকে থানায় পাঠাবেন। পিয়ালী…. ওদের কি দরকার পুলিশ….আমাদের সবাইকেই দরকার। পুলিশ…আপনার বড় পুত্র বধূর বাপের বাড়ীর ঠিকানা দিন।
তিন দিন পেরিয়ে গেলো এখনো পুলিশ কোন লাইন অফ ইনভেস্টিগেশনই পেলো না।এতো দেরি হলে খুনি পালিয়ে যেতে যথেষ্ট সময় পেয়ে যাবে। পাখি উড়ে গেলে কাজটা খুব কঠিন হয়ে যাবে । তাই পাখি এলাকা ছাড়া হবার আগেই তাকে খাঁচায় বন্দি করতে হবে। পুলিশ এরপর অহর্নিশ বাবুর বাবা ও ভাইয়ের সাথে কথা বলতে তাদের বাড়ী যায়। ডোরবেল বাজতেই বাবা শ্রী অরুণাশু বাবু এসে দরজা খুলে পুলিশকে ভিতরে নিয়ে গিয়ে বসায়। অরুণাশু বাবু… বলুন স্যার কি জানতে চান ? আমার ছেলের খুনিকে স্যার তাড়াতাড়ি করে ধরে উপযুক্ত শাস্তি দিন। পুলিশ…. আপনার ছেলেকে কে মারতে পারে বলে আপনার মনে হয় ? অরুণাশু….আমি তো কিছু আইডিয়াই করতে পারছি না স্যার। পুলিশ… আচ্ছা আপনার ছেলে বৌ মা কি নেশা করতেন, পার্টিতে যেতেন ? অরুণাশু… না,স্যার আমি সেরকম দেখিনি কোন দিন। তবে আমার আড়ালে করতো কিনা জানি না। পুলিশ… আপনার ছেলের স্ত্রী মারা যাবার পর আর বিয়ে করেন নি কেনো ? অরুণাশু… স্ত্রী ঈশিকার স্মৃতি ভুলতে পারেনি বলে। তাছাড়া আবার যদি কোন ঘটনা ঘটে যায় তারও একটা ভয় কাজ করেছে। পুলিশ … আপনার বৌ মা মারা যাবার পর আপনার ছেলের কাছে কি মহিলাদের যাতায়াত ছিল ? আপনার ছেলে কি অনেক মহিলার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলতো। তাই কি সে বিয়ে করতে চায় নি ? অরুণাশু ….. না স্যার, সেরকম কিছু ঠিক না । পুলিশ…. আপনার ছেলের বেড রুম থেকে মহিলাদের চুল পাওয়া গেছে। কি বলবেন ? অরুণাশু… এটা আপনারা তদন্ত করে দেখুন স্যার।
পুলিশ এরপর অহর্নিশের শ্বশুর বাড়ী ভদ্রেশ্বর মানকুণ্ডুর হাউসিং কমপ্লেক্সে গিয়ে হানা দেয়। ওখানে গিয়ে কারোকে পায় না পুলিশ। কমপ্লেক্সের সেক্রেটারি বলেন যে ওরা পাঁচ বছর আগে এখানকার ফ্ল্যাট বিক্রি করে চলে গেছে। কোথায় গেছে সে বিষয়ে কিছু বলে যায় নি। পুলিশ হতাশ হয়ে ফিরে আসে। এই ভাবে এক সপ্তাহ কেটে যায় কিন্তু পুলিশ যে জায়গা থেকে শুরু করেছিল সেই জায়গাতেই আটকে আছে। এমন কি এগোবার জন্য কোন ক্লু পর্যন্ত পায় নি। খোচররাও কোন খবর আনতে পারছে না। একের পর এক হিস্ট্রি শিটারদের ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে কিন্তু কোন সুত্র পুলিশের হাতে আসে না। কেসটার ভাবিষ্যৎ পুরোপুরি অনিশ্চিত।
পুলিশ অহর্নিশের বাড়ীর গলির মধ্যে কারো বাড়ীতে C C TV আছে কিনা সেটা খোঁজ করে দেখার জন্য লোক পাঠায়। পুলিশ দুটো বাড়ীতে C C TV র সন্ধান পায়। এবার পুলিশ একটা ব্রেকথ্রু পেয়ে যায় কেস টার লিড দেবার মতো। দুটো CC TV রই ফুটেজ সংগ্রহ করে নিয়ে আসে পুলিশ। ঐ দিন মুসল ধারে বৃষ্টি হওয়ার কারণে সব বাড়ীর দরজা জানলা বন্ধ ছিল। তার ফলে রাস্তায় আলো কম ছিল। C C TV র রেকর্ডে একটা চার চাকার গাড়ি গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। আলো কম থাকায় গাড়ির ড্রাইভার ও প্যাসেঞ্জারকে ভালো করে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। গাড়ির নাম্বার প্লেটটা অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তবে নাম্বারটা পড়তে পাড়া গেছে। এরপর পুলিশের তদন্তে বিরাট গতি এসে যায়। পুলিশ সব গ্যারেজে এই নম্বরের গাড়ির সন্ধান করতে লোক লাগিয়ে দিয়েছে। মোটর ভিহিকলস থেকে ঐ নাম্বারের গাড়িটার মালিকের নাম এবং ঠিকানা সংগ্রহ করে নিয়েছে। গাড়িটা তড়িৎ বাস্কের নামে রেজিস্ট্রি করা আছে। বাড়ী হুগলীর খানাকূলে। পুলিশ তড়িৎ বাস্কের বাড়ী গিয়ে তাকে পাকড়াও করে। পুলিশ… এই গাড়িটা আপনার ? তড়িৎ… হ্যাঁ, কিন্তু কেনো। পুলিশ… এই গাড়িটা চালায় কে ? তড়িৎ…. ড্রাইভার আছে। পুলিশ…. কি নাম ড্রাইভারের ? তড়িৎ…. পারমজিৎ। পুলিশ… ড্রাইভারকে ডাকুন। তড়িৎ…. ও তো গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেছে। পুলিশ… ও আসলে থানায় দেখা করতে বলবেন। তড়িৎ.. কেনো স্যার ? পুলিশ…. ও এক জনকে মার্ডার করেছে। আপনার গাড়িটা থানায় আটক থাকবে। তড়িৎ…এটা কি করে সম্ভব স্যার। পরের দিন তড়িৎ ড্রাইভার পরমজিৎ কে নিয়ে থানায় যায় দেখা করতে। পুলিশ….এই পনেরো দিনের মধ্যে তুই ক জন মহিলা প্যাসেঞ্জার তুলেছিলিস ? পরমজিৎ… সেটা তো মনে নেই স্যার। পুলিশ… কোন কোন রাস্তায় গিয়েছিল তারা সেটা তো বল। পরমজিৎ…. মনে নেই স্যার। পুলিশ…..তোর মনে আছে কিন্তু টুই বলছিস না। পরমজিৎ… না স্যার, মনে থাকলে বলবো না কেনো ? আমার তো কোন অসুবিধা নেই। পুলিশ… এক সপ্তাহ আগে হরিহর পাড়া লেন থেকে কোন মহিলা প্যাসেঞ্জারকে তুলেছিলিস ? পরমজিৎ… হ্যাঁ স্যার। ওনি অন লাইনে আমার গাড়ি বুক করে ছিলেন। রাত দের টার সময় ওনি গাড়িতে উঠে ছিলেন। পুলিশ… ঐ প্যাসেঞ্জারকে ছাড়লি কোথায় ? পরমজিৎ… বাদুদেবপুর শ্যামনগর। পুলিশ…. কয় জন প্যাসেঞ্জার ছিল তোর গাড়িতে ? পরমজিৎ…. স্যার এক জন মহিলা। পুলিশ…. ঐ মহিলাকে দেখলে চিনতে পারবি ? পরমজিৎ… স্যার চেষ্টা করবো। পুলিশ… তুই খুন করেছিস না ঐ মহিলা খুন করেছে ? পরমজিৎ… স্যার আমি খুন করিনি। আর উনি খুনি করেছেন কিনা সেটাও আমি জানি না। পুলিশ… ঐ মহিলাকে দেখে তোর কি মনে হয়েছিল ? পরমজিৎ… স্যার খারাপ কিছু মনে হয় নি। পুলিশ…. এতো রাতে একজন মহিলা একা যাচ্ছে তাতে তোর কিছু সন্দেহ হয় নি ? পরমজিৎ… ওনি বললেন যে ওনার বাবা খুব অসুস্থ তাই যেতে হচ্ছে। আমি আর কিছু চিন্তা করিনি। পুলিশ… আমাদের ঐ বাড়ীতে নিয়ে যেতে হবে তোকে। পরমজিৎ… ঠিক আছে স্যার।
পরের দিন বিকেল বেলা পুলিশ পরমজিৎকে নিয়ে বাসুদেবপুর রওনা হয়ে যায়। সন্ধ্যার পর ঐ প্যাসেঞ্জারের বাড়ী গিয়ে পৌঁছায়। পুলিশের গাড়ি দেখে ওরা হকচকিয়ে যায়। কি করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। ঈশিকা বুঝে ফেলে যে পুলিশ কেন এসেছে ? নিশ্চিত অহর্নিশের খুনের তদন্ত করতে। তাহলে তো তাকে এবার ধরা পরে যেতে হবে। ঈশিকা চিন্তা করতে থাকে কি করে বাঁচবে সে। পুলিশ ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে সে পিছনের দরজা দিয়ে ছাদে উঠে কার্নিসের উপর নেমে লুকিয়ে থাকবে । ঈশিকার বাবা নিরাকার বর্মন…আপনারা ? পুলিশ…. হ্যাঁ, আমরা একটা খুনের তদন্ত করতে এসেছি। নিরাকার… কিন্তু খুনের তদন্ত করতে আমাদের বাড়ী কেনো ? পুলিশ…. এই বাড়ীর এক জন অহর্নিশ বাবুর খুনের সঙ্গে জড়িত আছেন। আমরা তার খোঁজ করতে এসেছি। নিরাকার … কি নাম তার ? পুলিশ…জানি না। নিরাকার… মানে কি ? তাহলে কি করে আপনারা নিশ্চিত হলেন যে এই বাড়ীতে খুনি আছে ? পুলিশ… খুনি খুন করে এই বাড়ীতে এসে আশ্রয় নিয়েছে। নিরাকার… খুনির নামই তো আপনারা জানেন না তাহলে কি করে বুঝলেন যে খুনি এই বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছে ? আপনারা কোথাও ভুল করছেন। এই বাড়ীতে কোন খুনি নেই। আপনারা অন্য কোথাও দেখুন। পুলিশ… আপনি আমাদের ভিতরে ঢুকতে দিন। আমরা সার্চ ওয়ারেন্ট নিয়ে এসেছি। আমরা সার্চ করে দেখবো। অতঃপর পুলিশ ভিতরে ঢুকে খুঁজতে থাকে। সব কটা ঘর তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সেই মহিলাকে পায় না। ছাদেও পায় না। পুলিশ তল্লাশি শেষ করে বাইরে বেরিয়ে আসে। নিরাকার বাবুরা একটু স্বস্তি পায়। ঈশিকা ভেবে নেয় এবারকার মতো বেঁচে গেছে। পুলিশ প্ল্যান করে বেরিয়ে এসে হঠাৎ করে অতর্কিতে ভিতরে ঢুকে ঈশিকাকে সামনে পেয়ে যায় আর ড্রাইভার তাকে চিনতে পেরে যায়। পুলিশ…আপনি দশ দিন আগে হরিহরপাড়া লেনে আহর্নিশ বাবুর বাড়ী থেকে গভীর রাতে বেরিয়ে এসেছিলেন। আপনার মাথার চুল পাওয়া গেছে আহর্নিশ বাবুর বেড রুমে। আপনি যে নাইটি টা পড়ে ছিলেন সেটা পাওয়া গেছে। আপনি অহর্নিশ বাবুকে আগুণ দিয়ে পুড়িয়ে মেরে ঘরের দরজা ও গেট তালা দিয়ে আটকে বেরিয়ে এসে একটা ভাড়ার গাড়ি করে পালিয়ে যান । তালায় আপনার হাতের ছাপ রাখা আছে। আপনার পায়ের ছাপের রেকর্ড করা আছে। সেগুলো আপনার সাথে আমরা মিলিয়ে দেখবো। আমাদের ধারণা আপনি কোন প্রতিশোধ নেবার জন্য এই কাজ করেছেন। পুলিশ…. আচ্ছা ঈশিকা দেবী আপনি কি সব সত্য কাহিনী বলবেন নাকি আমরা আপনাকে দিয়ে বলাবো ? ঈশিকা…. দেখুন সে অনেক কথা। আপনাদের ধর্য্য থাকবে না। পুলিশ… খুব থাকবে। আপনি বলুন।
ঈশিকা…. আমার বিয়ের পর শ্বশুর বাড়ী এসে আমি চরম দুর্ব্যবহারের মধ্যে পরি। আমার বাবার আর্থিক অবস্থা আমার শ্বশুর মশাইয়ের তুলনায় খুবই খারাপ ছিল। আমার বাবা ওনাদের কাঙ্খিত হাই ফাই জিনিস পত্তর দিতে পারেন নি। সেটা নিয়ে ওনাদের মনের মধ্যে অভিযোগের পাহাড় তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সেই রাগের বাহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন আমার উপর দিয়ে। আমার সুন্দর চেহারা দেখে ওনারা আমার সঙ্গে ছেলের বিয়ে ঠিক করেন। তখন আমার স্বামী ভালো কিছু করতো না। প্রাইভেট ফার্মে সামান্য মাইনের চাকরি করতো। সেই কারণে উনিও আমাকে বিয়ে করতে আপত্তি করেন নি। শ্বশুর বাড়ীর সবাই আমাকে গরিব বলে অকথ্য বাজে ভাষায় গালিগালাজ করতো। অপমান ছিল আমার নিত্য দিনের সঙ্গী । একটা দিনও নির্যাতনের হাত থেকে আমি রেহাই পাইনি। আমি এই বাড়ীতে আসার পর বাড়ীর সব কাজের লোক ছাড়িয়ে দিওয়া হয়েছিল । সব কাজ আমাকে করতে হতো। তাতেও আমি অত্যাচারের হাত থেকে মুক্তি পেতাম না। শেষমেশ শ্বশুর মশাই আমাকে আর আমার স্বামীকে হরিহরপাড়া লেনের এই বাড়ীতে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। আমি ভাবলাম এবার বুঝি একটু ভালো থাকবো। কিন্তু সেটা হলো না। এখানে এসে আমি আমার স্বামীর অত্যাচারের স্বীকার হতে শুরু করলাম। আমার স্বামী প্রায় দিনই আমাকে মারধর করতো। মাঝে মাঝে বাইরে থেকে মেয়ে নিয়ে আসতো। একেক দিন একেক টা। আমার সামনেই তাদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক করতো। এই সব চলতে চলতে আমার স্বামী একটা মোটা টাকা মাইনের চাকরি পেয়ে যায় । তারপর থেকে আমাকে আর উনি সহ্য করতে চাইলেন না। আমি তখন ওনার যন্ত্রনা হয়ে দাঁড়িয়েছি। তারপর থেকে সম্পর্ক ছেড়ে দিয়ে আমাকে চলে যেতে বলতেন বার বার । হামেশাই আমাকে রাতের বেলা ঘর থেকে বাইরে বের করে দিয়ে ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে দিতেন । আমি জড়োসড়ো হয়ে বাড়ীর এক কোনে কুকুরের মতো বসে থাকতাম। আশেপাশের কেউ দেখে ফেললে ওনার সম্নান হানি হবে সেটাও আমাকে ভাবতে হতো। তাতেও যখন আমি ছেড়ে যাই নি তখন এক দিন দু জন লোক নিয়ে এসে রাত্রি বেলা আমার হাত বেঁধে মুখে লিউকো প্লাস্টার সেটে দিয়ে মারধর করে গলায় ফাঁস দিয়ে দেয়। এক সময় আমি শক্তি শূন্য হয়ে পরি। আমার দেহটা নিস্তেজ হয়ে যায়। নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়। ওরা ভেবে নেয় যে আমি মরে গেছি। ওরা আমাকে টেনে নিয়ে গিয়ে একটা পঁচা খালের কাঁদা জলে ফেলে দিয়ে চলে যায়। লোককে বলে বেড়ায় আমি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মরে গেছি কিন্তু কোন মেডিক্যাল রিপোর্ট নেই ওনার কাছে। কাঁদা জলে মাখামাখি হয়ে দু দিন ঐ অবস্থায় পড়ে থাকার পর আমার হুঁশ ফিরে আসে। নাক পাঁকের পঁচা গন্ধ লাগে তারপর আমি উঠে বসি। আস্তে আস্তে পা টান করে সোজা হয়ে দাঁড়াই। পঁচা খাল থেকে উঠে রাস্তার টাইম কলের জল দিয়ে গায়ের সব পাঁক ধুঁয়ে পরিষ্কার করে ভিজে কাপড়ে আমার বাবার কাছে চলে যাই। বাবাকে সব খুলে বলি। বাবা আমাকে আর ঐ নরকে পাঠান নি। নিন্দা মন্দের ভয়ে বাবা মানকুন্ডুর ফ্ল্যাট বিক্রি করে দিয়ে বাসুদেবপুর শ্যাম নগর জমি কিনে বাড়ী তৈরি করেন । আমরা বাসুদেবপুর চলে যাই। আমি সব মেনে নিয়ে চুপচাপ ভিতরে ভিতরে প্রস্তুত হচ্ছিলাম প্রতিশোধ নেবার জন্য। সাত বছর বাবার কাছে থাকতে থাকতে আমার শরীরের আমূল পরিবর্তন হয়ে যায় । আমি অনেকটা স্থূল হয়ে যাই। আমার আগের চেহারা হারিয়ে যায়। পুরানো লোকেরা আমাকে দেখে একদম চিনতে পারে না।
এরপর আমি অহর্নিশের খোঁজ খবর নিতে থাকি। ওনি আগের মতোই আছেন। মাঝে মাঝে সুন্দরী মেয়ে নিয়ে এদিক ওদিক চলে যান ছুটির দিন। বিয়ে করেন নি। আমি প্রতিশোধ নেবার জন্য ওনাকে হত্যার ছক কষি। সেকো বিষ নামে এক প্রকার মারাত্মক বিষ সংগ্রহ করি। ঐ বিষ তিন থেকে চার ন্যানো গ্রাম পেটে গেলে মৃত্যু অবধারিত। সুযোগ বুঝে এক দিন বর্ষার মধ্যে ভিজতে ভিজতে ওনার বাড়ীর গেটে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। তারপর কলিং বেল বাজাই। ওনি এসে দরজা খুলে দেখেন আমি দাঁড়িয়ে আছি। আমাকে চিনতে পারেনি একদম। আমি মুখে একটা স্কিন টাইট মুখোশ পরে নিয়েছিলাম। আমি ওনার সিমপ্যাথি চাইলে ওনি আমাকে ভিতরে আশ্রয় দেন। হয়তো সুন্দরী নেয়ে বলেও হতে পারে। আমি ভিতরে ঢুকে ওনার বিশ্বাস অর্জন করার জন্য খাতির দেখাতে থাকি। তাতে ওনি আমাকে ঘনিষ্ঠ হবার সুযোগ করে দেন। আমি সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাতের খাবার রান্না করতে থাকি। রান্না হয়ে গেল খাবারটা ভাগ করে দুটো থালায় নিয়ে নি। ওনার ভাগের থালায় সাবধানে সেকো বিষ মিশিয়ে দি। ওনি আর আমি দুজনেই যে যার ভাগের খাবার খেয়ে নি। আমি জানতাম আদ ঘন্টার মধ্যে বিষক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে। তার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। একটা সময়ে ওনি নিস্তেজ হয়ে পড়লে আমি সোফার চারি দিকে আগুন লাগিয়ে দি। একটা সিগারেট অর্ধেকটা পুড়িয়ে পাশে রেখে দি যেতে মনে হয় যে সিগারেটের আগুন থেকে আগুন লেগে গেছে। তারপর দরজা এবং গেটে তালা দিয়ে চলে যাই। গাড়িটা আগে থেকেই বুক করে রেখে ছিলাম। পুলিশ… ধরা পড়তে হবেই এটাও তো আপনি জানতেন। ঈশিকা… হ্যাঁ, জানতাম। আমার ফাঁসি কিম্বা যাবাজ্জীবন জেল হবে সেটাও জানতাম । তাতে আমি ভয় পাইনি। কারণ আমি তো মরেই গেছি। শুধু প্রাণটা ধরের মধ্যে আটকে আছে এই যা।
পোস্টমর্টেমের রিপোর্টে বিষ ক্রিয়ায় মারা যাবার উল্লেখ আছে। সংগৃহিত চুল দুটো ঈশিকার মাথার বলে প্রমান হয়। তালায় আঙুলের ছাপ ঈশিকার আঙুলের সঙ্গে ম্যাচ করে যায়। ঘরের মেঝেতে পায়ের ছাপও ঈশিকার পায়ের ছাপের সঙ্গে মিলে যায়। এই সব সাক্ষ্য ও তত্ত প্রমান ঈশিকার বিপক্ষে যায়। আদালত এই সব সাক্ষ্য প্রমান সাপেক্ষে ঈশিকাকে বারো বছরের কারা বাসের সাজা দেয়।
সমাপ্ত
![]()







