সংবাদ প্রতিবেদন, নিউজ ব্যুরো আমার আলো:
ডিজিটাল ইন্ডিয়ার দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশে ভয়ঙ্করভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে এক নতুন সাইবার অপরাধ— ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ স্ক্যাম। এই প্রতারণার শিকার হয়ে সম্প্রতি মুম্বাইয়ে এক উচ্চশিক্ষিত প্রবীণ দম্পতি হারিয়েছেন তাদের জীবনের সঞ্চয় ৫৮ কোটি টাকা। দেশের অন্যতম বৃহৎ এই সাইবার জালিয়াতির ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে মহারাষ্ট্র সাইবার পুলিশ, এবং এই কেসের সূত্র ধরে এখনও পর্যন্ত সাতজন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এই একটি ঘটনাই প্রমাণ করে যে কীভাবে সুচতুর সাইবার অপরাধীরা ‘মানি লন্ডারিং’ বা ‘অবৈধ লেনদেন’-এর মতো মিথ্যা অভিযোগে ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে, বিশেষত বয়স্ক নাগরিকদের, তাদের সমস্ত অর্থ তুলে দিতে বাধ্য করছে। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে স্বয়ং ভারতের সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court) সম্প্রতি এই ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ কেলেঙ্কারির উপর স্বতঃপ্রণোদিত (Suo Motu) মামলা গ্রহণ করে কড়া পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছে।
মুম্বাইয়ের ৫৮ কোটি টাকার প্রতারণা
প্রতারণার শিকার হন ৭২ বছর বয়সী এক অবসরপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী এবং তাঁর স্ত্রী, যিনি ব্যাঙ্কিং সেক্টরে উচ্চ পদে কর্মরত ছিলেন। শিক্ষা এবং পেশাগত অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও, অপরাধীদের নিখুঁত ফাঁদে পা দিতে বাধ্য হন তাঁরা।
- ফাঁদ পাতা: গত ১৯ আগস্ট, ২০২৩ তারিখে ভুক্তভোগী প্রথম একটি ভিডিও কল পান। সেখানে প্রতারকরা নিজেদের সিবিআই (CBI) বা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)-এর কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেয়।
- পদ্ধতি: তারা অভিযোগ করে যে ওই ব্যবসায়ীর অ্যাকাউন্ট এবং পরিচয়পত্র ব্যবহার করে বিপুল অঙ্কের (প্রায় ৫৮ কোটি টাকা) ‘মানি লন্ডারিং’ করা হয়েছে। ভিডিও কলে পুলিশ অফিসারের পোশাক পরা ব্যক্তিরা একটি সাজানো পুলিশ স্টেশন বা ভার্চুয়াল আদালতের সেটআপ দেখায়।
- মনস্তাত্ত্বিক চাপ: গ্রেপ্তার ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার হুমকি দিয়ে দম্পতিকে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ করা হয়েছে বলে জানানো হয়। প্রায় ৪০ দিন ধরে এই মনস্তাত্ত্বিক নির্যাতন চলতে থাকে। প্রতি দুই ঘণ্টা অন্তর তাদের তথ্য চাওয়া হয় এবং বলা হয়, মামলা এড়াতে হলে সমস্ত টাকা সরকারি নির্দেশিত ‘সেফ অ্যাকাউন্টে’ ট্রান্সফার করতে হবে।
- ফলাফল: টানা ৪০ দিনের মানসিক চাপে ওই দম্পতি কিস্তিতে কিস্তিতে মোট ৫৮.১৩ কোটি টাকা প্রতারকদের দেওয়া ১৮টি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করেন।
প্রতারণার নেপথ্যে sofisticated কৌশল
মহারাষ্ট্র সাইবার পুলিশের অতিরিক্ত ডিজি (ADG) যশস্বী যাদব জানিয়েছেন, এই প্রতারণার পিছনে অত্যন্ত সুসংগঠিত একটি চক্র কাজ করে।
- আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ছদ্মবেশ: প্রতারকরা সিবিআই, ইডি, দিল্লি পুলিশ বা আরবিআই (RBI)-এর কর্মকর্তা সেজে ফোন করে। তারা নকল ওয়ারেন্ট, এফআইআর বা আদালতের আদেশনামা WhatsApp-এর মাধ্যমে পাঠায়।
- প্রযুক্তির অপব্যবহার: নিজেদের অবস্থান গোপন রাখতে তারা ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (VPN), টোর (TOR) নেটওয়ার্ক এবং আন্তর্জাতিক আইপি ঠিকানা ব্যবহার করে।
- মানি মিউল (Money Mule) অ্যাকাউন্ট: লুঠ করা টাকা দ্রুত সরাতে তারা বিভিন্ন রাজ্যে ৬,৫০০টিরও বেশি ‘মানি মিউল’ বা ভুয়ো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে। এই অ্যাকাউন্টগুলি মূলত শেল কোম্পানিগুলির নামে খোলা হয় যাতে লেনদেন সহজে নজর এড়িয়ে যায়।
আতঙ্কজনক পরিসংখ্যান (জাতীয় প্রেক্ষাপট)
এই ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ জালিয়াতি এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি জাতীয় সঙ্কটে পরিণত হয়েছে:
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ঘটনা:
- গোয়ার একজন অবসরপ্রাপ্ত মেরিন বায়োটেকনোলজিস্ট (৮০ বছর বয়সী) একই প্রতারণায় ৯৭ লক্ষ টাকা হারান।
- হরিয়ানার এক দম্পতি সুপ্রিম কোর্টের ভুয়ো নির্দেশ দেখিয়ে ১.৫ কোটি টাকা খুইয়েছেন।
- ভর্দমান গ্রুপের চেয়ারম্যান এসপি ওসওয়ালকে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’-এর ভয় দেখিয়ে ৭ কোটি টাকা প্রতারণা করা হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞের সতর্কতা ও আইনি অবস্থান
এডিজি যশস্বী যাদব স্পষ্ট জানিয়েছেন, ভারতীয় আইনে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ নামে কোনো বিধান নেই। কোনো এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি বা পুলিশ এই নামে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে না। তিনি জনসাধারণকে সতর্ক থাকার এবং আতঙ্কিত না হওয়ার অনুরোধ করেছেন।
সাধারণ মানুষের জন্য জরুরি বার্তা
- সরকারি সংস্থা বা আধিকারিকের পরিচয় দিয়ে কেউ টাকা চাইলে বা অ্যাকাউন্ট ডিটেলস চাইলে সঙ্গে সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করুন।
- ভিডিও কলে পুলিশ বা আদালতের সেটআপ দেখলেও বিশ্বাস করবেন না, এগুলি সহজেই নকল করা যায়।
- কোনো প্রকার হুমকি বা প্রতারণার শিকার হলে তৎক্ষণাৎ স্থানীয় পুলিশ বা সাইবার ক্রাইম হেল্পলাইন ১৯৩০ (1930) নম্বরে যোগাযোগ করুন।
#ডিজিটালঅ্যারেস্ট #সাইবারক্রাইম #প্রতারণা #সাইবারসুরক্ষা #অনলাইনফ্রড #মুম্বাইস্ক্যাম #অর্থলুঠ #সতর্কতা
#DigitalArrest #CyberCrimeIndia #FraudAlert #OnlineScam #MumbaiFraud #CyberSecurity #FinancialCrime #SCAM #StaySafe
![]()






