নদীপাড়ের মেছ ভূত
সলিল চক্রবর্ত্তী
উড়িষ্যার দেবীনদীটি জগৎসিংহপুর জেলার শল্য বেলপুর গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গিয়ে সমুদ্রে পড়েছে। সমুদ্রের জোয়ার ভাটার সাথে তার নিবিড় সম্পর্ক। জোয়ারের সময় সমুদ্রের নোনা জলের মাছ প্রচুর পরিমানে ঢুকে পড়ে দেবীনদীতে। ফলে নদী সংলগ্ন গ্রাম গুলোর মানুষেরা মূলত মৎস্যজীবী, এবং কৃষিজীবী । জোয়ারের জলে নদী যখন টইটম্বুর, মৎসজীবীরা দল বেধে বেরিয়ে পড়ে নৌকা নিয়ে। সাথে থাকে গ্রামের সাধারণ মানুষ।
বিজু দাশের পরিবার উড়িষ্যার এই গ্রামে থাকে, তবে সে জীবিকা নির্বাহের জন্যে কোলকাতার একটা বেকারি কোম্পানিতে কাজ করে। বছরে দুই তিনবার বাড়িতে যায়।
বিজু দাশের মাছ ধরার নেশা। বাড়িতে এলে জমিজমার কাজের ফাঁকে মাছ ধরতে সে যাবেই যাবে। নাওয়াখাওয়া নেই, সময় জ্ঞান নেই, নদীতে মাছ উঠলেই হল।
সেবার ফাল্গুন মাসের ভরা পূর্ণিমায় বিজু দাশ বাড়িতে গেছে। এই সময় পলাশ গাছ তার লাল টুকটুকে ফুলের শোভায় সজ্জিত হয়ে থাকে। পর্ণমোচী বৃক্ষের বৃদ্ধ পাতাগুলো ঢাকা পড়ে যায় পলাশ ফুলের রক্তিম বর্ণের কাছে। দূর থেকে মনে হয় যেন,গাছে আগুন লেগেছে। বাংলা, উড়িষ্যার আম জনতা একটা প্রবাদে বিশ্বাসী, পলাশ ফুল যত ফোটে, নদীর কাঁকড়ার ঘিলু ততো বাড়ে। প্রবাদটি বিজুও জানে।
ভরা পূর্ণিমার গোন মুখ, রাতে হালকা টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। বিজুর ঘুম ভেঙে গেল। বুঝল কাঁকড়া ধরার এটাই মোক্ষম সময়। বৃষ্টি হচ্ছে, ফলে লোক কম হওয়ায় মাছ ধরতে সুবিধা হবে। পাশে শোওয়া স্ত্রীকে ডেকে তুলে ইচ্ছেটা প্রকাশ করতেই, সে তো রে রে করে পড়ল। এত রাতে একলা একলা, তাও আবার বৃষ্টি পড়ছে। বিজু স্ত্রীকে বোঝাল তার এক পছন্দের দোকানদার আছে, যে কিনা কাঁকড়া খেতে খুব ভালবাসে। সে যেন বাধা না দেয়। ঘন্টা খানেকের মধ্যে আলো ফুটে উঠবে। কোন অসুবিধা হবে না।
বিজু স্ত্রীকে বুঝিয়ে জাল আর মাছ রাখা ‘খারাটা’ নিয়ে অন্ধকারেই বেরিয়ে পড়ল। নদী পাড়ে যেতে মিনিট বারো, তেরো লাগে। প্রথমে বাড়ির পিছনের কলা বাগান, তারপর ধানখেত, সেটা পার হলেই নদী। বিজুর সাহস আছে তবে দুঃসাহস নেই। কলা বাগান পার হয়ে যখন ধান খেত পার হচ্ছে তখন সে বুঝতে পারল এই টিপটিপে বৃষ্টিতে কে যেন তার পিছু পিছু আসছে। বিজুর শরীর ভার হয়ে গেল। কিছু একটা ভেবে পেছন ফিরে তাকাতেই চমকে উঠল, গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। দেখে কলা বাগানের ভিতরে কে যেন দাড়িয়ে তাকে হাতছানি দিচ্ছে। বিজু চুপ করে খানিকক্ষণ সেই দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর কেউ ভয় দেখাতে চাইছে কিনা প্রমাণ করতে কলা বাগানের দিকে এগিয়ে গিয়ে নিজে নিজেই হো হো করে হেসে উঠল। একটা শুকনো কলা গাছকে দেখে সে মানুষ ভাবছিল। যাক বাবা যে টুকু ভয় মনে বাসা বেঁধেছিল এখন সব ধুয়ে মুছে সাফ। আর একটু পরেই ভোরের আলো ফুটে যাবে, ভূত পালানোর পথ পাবেনা।” জাল আর খারাটা ঘাড়ে তুলে বিজু মাঠে নেমে পড়ল।
—- ও বৌদি, বৌদি।
— কে?
—- আমি টুকুনা, বিজু ওঠেনি!
—- সে তো অনেক আগেই চলে গেছে।
— বল কি? এখনো তো সাড়ে তিনটেই বাজেনি।
বিজুর স্ত্রীর ঘুম ছুটে গেল ধড়ফড় করে বিছানা থেকে উঠে বলল-” সে-কি! আমার গা হাত পা কাঁপছে। মাঝরাতে নদীর পাড়ে!! যদি কি-ছু হ-য়ে—–!!
— একা একা, নিশীথ রাতে নদী পাড়ে যাওয়া একদম উচিত হয়নি। টুকুনা একটু রেগেই কথাটা বলল।
— আমার বড় ভয় করছে। চলনা ভাই একটু আমার সাথে।
— নিশ্চই যাব, কিন্তু নদীপাড় তো একটুখানি জায়গা নয়। হালকা জ্যোৎস্নায় কোথায় খুজব বলত?
—- দাঁড়াও দেওরকে ডাকি।
বাড়ির দু’জনকে ডেকে তুলে টুকুনাকে নিয়ে বিজুর স্ত্রী হনহনিয়ে চলল নদীর পাড়ে। জোর কদমে হেঁটে মিনিট দশেকের মধ্যে তারা নদীপাড়ে এসে পৌঁছুল। কিন্তু নদীপাড় শুনশান, বিজু তো দুরের কথা একটি প্রণীকেও দেখা যাচ্ছে না। বিজুর ভাই ‘দাদা’, ‘দাদা’ বলে বেশ কয়েকবার উচ্চ স্বরে হাঁক পাড়ল। উত্তর তো পেলই না, বরং তার চিৎকার তাদের কানেই প্রতিধ্বনিত হতে থাকল। যেন তারা এক অন্য জগতে এসে পড়েছে। তাড়াহুড়ো করে বেরোবার সময় টর্চটাও নিতে ভুলেগেছে। টুকুনা পকেট থেকে বোতাম মোবাইলটা বার করে বিজুকে কল করতেই দুরে ভেসে আসা বাতাসের মধ্যে মনে হল যেন মোবাইলের রিংটোনটা শুনতে পেল। বেশ কয়েকবার রিং করতই বুঝতে পারল, দৈত্যের মতো রাতের অন্ধকারে সারিসারি দণ্ডায়মান তালগাছ গুলোর ওদিক থেকে আওয়াজটা ভেসে আসছে। গাছগুলো এতদূর যে অনুকুলে বাতাস না বইলে, রিংটোনের শব্দ শোনা দুস্কর হয়ে উঠত। যাইহোক শব্দের উৎস সন্ধানে ছুটল চারজন।
তালগাছের গোড়ায় গিয়ে আবার ফোনে রিং করতেই শুনতে পেল, চরের দিক থেকে শব্দটা আসছে। আকাশ হালকা পরিষ্কার হয়েছে, সেই অবস্থায় মোবাইলের হালকা আলোয় খুঁজতে খুঁজতে তারা দেখতে পায়, বিজু নদীর চরে চিত হয়ে পড়ে আছে। পাড়ে কাত হয়ে পড়ে আছে মাছের খারাটা, এক হাতে জড়িয়ে আছে মাছ ধরা জাল। বিজুর ভাই দাদা, দাদা বলে শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে ডাকলেও কোনো সাড়া দিল না।
সকলে মিলে কোনোরকমে ধরাধরি করে বিজুকে বাড়ি নিয়ে এল। ডাক্তার এসে চেকআপ করে বললেন যে, অতিরিক্ত আতঙ্কে সাময়িক ভাবে জ্ঞান হারিয়েছে। ভয়ের কিছু নেই, হার্টের কন্ডিশন তুলনামূলক ভাবে ভাল। ঘন্টা খানিকের মধ্যে জ্ঞান ফিরবে, তখন এক গ্লাস গরম দুধ খাইয়ে দেবেন।
ডাক্তার চলে যাওয়ার ঘন্টা দুই পরে বিজু আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠল। চোখ খুলতেই দেখা গেল, ওর চোখে মুখে তখনো আতঙ্কের ছাপ। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে সকলের দিকে তাকাচ্ছে, ভাবখানা যেন, আমি এখানে এলাম কি করে!! টুকুনা বিজুকে জিজ্ঞেস করে, মাঝরাতে এই ভাবে মাছ ধরতে গেলি, তারপর নদীর চরে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলি, তোর কি হয়েছিল বলত? বিজুর স্ত্রী এক গ্লাস ঊষ্ণ দুধ হাতে দিয়ে বলল- ” বৃষ্টি মাথায় বেরুবে বার হও, ঘড়িটা দেখে তো বার হবে।” বিজু এবার একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলল- “ওটাই ভুল হয়েছিল।” টুকুনা আবার জিজ্ঞেস করল-” তোর কি কিছুই মনে পড়ছে না?”
— সব মনে আছে, ভাবছি—–।
—- ভাববি পরে, আগে আমাদের বলতো কি হয়েছিল?
এক গ্লাস দুধ খেয়ে বিজু ভোর রাতে ঘটে যাওয়া ঘটনা বলা শুরু করল—-
চাঁদনি রাতে কলা বাগান পার হওয়ার সময় কেউ আমার পিছু নিয়েছে মনে হচ্ছিল। পরে ভুলটা ভাঙে। কিন্তু যখন মাঠ পার হচ্ছিলাম, তখন আবার আমার মনে হচ্ছিল, কেউ আমার পিছু নিয়েছে। আমি আবার দাঁড়িয়ে পড়ি। কিছু না দেখতে পেয়ে পকেট থেকে মোবাইলটা বার করতেই দেখি আপনাআপনি মোবাইলটা অন হয়ে গেল। ভাবলাম, সুইচে হয়ত হাত লেগে গেছে, তবুও কেমন যেন গা-টা ঝাড়া দিয়ে উঠল। নদীর দিক থেকে বয়ে আসা বাতাসের তীব্র শোঁশোঁ আওয়াজ শরীরটাকে আরো ভারি করে তুলল। মোবাইলে দেখি রাত সবে সাড়ে তিনটে বাজে। কি করব বুঝতে পারছি না। বাড়ি ফিরে গেলে তো আবার আসার সময় হয়ে যাবে। আধঘন্টা খানিক পরে আকাশ ফরসা হবে ভেবে, দ্রুত পায়ে হেঁটে পৌঁছে গেলাম নদীর পাড়ে।
শুনশান নদীপাড়, আমি ছাড়া এখনো কেউ মাছ ধরতে আসেনি। বৃষ্টির টিপটিপে ফোটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, সময় নষ্ট না করে লুঙ্গিতে মালকোঁচা মেরে খারা আর জুতো জোড়া পাড়ে খুলে রেখে জালটা সাইজ করে ধরে হাঁটু সমান কাদা মাড়িয়ে জলে নেমে এক ক্ষেপ জাল ফেললাম। এবার আস্তে-আস্তে জাল গোটানো সময় বুঝতে পারলাম প্রচুর মাছ পড়েছে। আগেও মাছ ধরেছি জালে এত ঘাই মারতে দেখিনি। যাইহোক জাল টেনে উপরে তুলতে আমার কোমর ব্যথা হয়ে গেল। মাছ আর কাঁকড়ায় জাল ভর্তি। হালকা অন্ধকারে পার্শে মাছ গুলো রূপোর মতো চকচক করছে। এত মাছ পেয়ে খুব ভাল লাগছিল। অন্য কিছু আর মাথায় ছিল না। জাল থেকে মাছ ছাড়িয়ে খারায় রেখে আবার জাল ফেলতে তৈরি হলাম। এই রকম মাছ হলে চার ক্ষেপেই খারা ভর্তি হয়ে যাবে, তখন বয়ে বাড়ি নিয়ে যাওয়াই কষ্টকর হয়ে যাবে। ততক্ষণে হয়ত টুকুনা এসে যাবে। এই ভেবে আবার ক্ষেপ ফেললাম। তারপর সাবধানে আস্তেআস্তে জাল গুটাচ্ছি, হঠাৎ কে যেন পেছন থেকে খিলখিল করে হেসে বলল- “আঁমাকে দুঁটো মাঁছ দিঁবি?” আমি চমকে উঠে পিছন ফিরে দেখি কেউ নেই। শুধু মাত্র তালগাছ গুলো রাতে অন্ধকারে প্রেত লোকের প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে। শরীরটা ভার হয়ে গেল, ভয় কাটাতে চেঁচিয়ে বললাম, কে টুকুনা? কোন উত্তর এলনা। শুধু তালগাছে বসা শকুনটা ডেকে উঠল। এমন তার বিকট আওয়াজ, শকুনের ডাক না জানলে ভীষণ ভয় পেয়ে যেতাম। যাইহোক কাদা ঠেঙিয়ে জাল নিয়ে উপরে উঠে খারা দেখে আমি চমকে উঠি, খারাটা কাত হয়ে পড়ে আছে। এতো মাছ রেখে গেলাম সেগুলো গেল কোথায়!!!! কাঁকড়া না হয় পায়ে হেঁটে চলে গেছে, কিন্তু মাছ গুলো!! তবে কি——-, মনটা খারাপ হয়ে গেল। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে জাল থেকে মাছ ছাড়িয়ে খারাতে রাখছি। হঠাৎ আলো আঁধারেতে নজরে পড়ল, খারাটা আমার থেকে সরেসরে যাচ্ছে, একটা কাল থাবা খারাটাকে টানার চেষ্টা করছে। আমি মাজা সোজা করে দাঁড়াতেই দেখি একটা বিড়ালের মতো দেখতে কিন্তু কুকুরের মতো বড় জন্তু এক লাফে একটু দূরে সরে আমার দিকে হিংস্র মুখ করে তাকিয়ে আছে। অন্ধকারে চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে জ্বলছে। সম্ভবত মেছোবিড়াল, ভয়ে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। ও যদি আক্রমণ করে, তাহলে সামলাতে পারব না। আবার মাছের খারা রেখে সরতে পারছি নে। হঠাৎ সেখানে একই রকম আর একটা প্রাণী এসে হাজির হল। আমি ভয়ে ভয়ে কিছু মাছ খারার পাশে ছড়িয়ে দিয়ে আবার জাল ফেলতে গেলাম। কাদায় নেমে কি মনে হল পিছন ফিরে তাকাতেই দেখি সেই প্রাণী দুটো আমার খারা থেকে মাছ মুখে করে তাল গাছে উঠছে উল্টো ভাবে পিছনের পা উপর দিকে সামনের পা নিচের দিকে, অর্থাৎ মাথা নিচের দিকে রেখে উপরে উঠছে। আমার বুঝতে কিছু বাকি থাকল না। মনে সাহস বাড়িয়ে কাদা থেকে ওঠার উদ্যোগ নিতেই দেখি নদীর পাড় ধরে কে যেন আসছে। ভাবলাম, হয় টুকুনা,নয়তো আমার মতো কেউ হবে। কাছে আসতেই অন্ধকারে মনে হল, বৈরাগী খুড়ো। মনে সাহস পেয়ে বললাম, আরে খুড়ো তুমি এতো ভোরে!!! মাছ তো খাওনা, তবে ধরতে এসেছ!! বৈরাগী খুড়ো মাছের খারার সামনে এসে দাঁড়াল, কিন্তু আমার কোনো কথার উত্তর দিল না। আমি বললাম, মাছ ধরবে তা জাল কই? খুড়ো শুধু দু’বার “হুঁ” ছাড়া কোনো জবাব দিলনা। আমার মনে কিছুটা সাহস সঞ্চয় হওয়ায় বললাম-” জান খুড়ো, তুমি না এসে পড়লে আমি হয়ত মারাই যেতাম।” তবুও খুড়ো হুঁ ছাড়া কোনো কথা বলল না। আস্তে আস্তে তালগাছ গুলোর দিকে এগিয়ে গেল। আমি চেঁচিয়ে বলি খুড়ো ওদিকে যেও না, ওদিকটা—–, কথাটা শেষ করতে পারিনি দেখি বৈরাগী খুড়ো পা দু’টো উপরের দিকে রেখে মাথা নিচে ঠিক আগের প্রাণী দুটোর মতো সরসর করে তালগাছে উঠে গেল। আমি ভয়ে কথা বলতে পারছিলাম না, গোঁগোঁ শব্দ করে পালাতে গিয়ে দেখি কাদা থেকে পা তুলতে পারছি না, কে যেন আমাকে পিছন থেকে টেনে ধরে রেখেছে। শুনতে পাচ্ছি তালগাছ থেকে ভেসে আসা বিকট অট্টহাসি,আর মাংস খেকো শকুনের ডাক। তারপর আর কিছু মনে নেই।
বিজুর স্ত্রী মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে। তুমি কার খপ্পরে পড়েছিলে? বৈরাগী খুড়ো তো সদ্য মারা গেছেন, এখনো শ্রাদ্ধ হয়নি।
★★★★★★
![]()







