পাদুকাপুরান
নিলয় বরণ সোম
II গোড়ার কথা II
মাঝে মাঝে নিজেকে খানিকটা অবিন্যস্ত রাখতে বেশ লাগে I
অবিন্যস্ত মানে অপরিষ্কার নয় কিন্তু I সাধারণ গার্হস্থ্য জীবনে তার সুযোগ কম – কিন্তু ট্যুরে বাইরে থাকলে ,সমগ্র আমিকে একটু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা যায় I বিছানার এককোনে ওল্টানো বই, আধভাঙা চাদর , একখানা হাফ শার্ট ওয়ার্ডরোবের ভেতর নয়, পাল্লা খুলে রাখা দরজার হ্যাঙ্গারে ঝোঝুল্যমান , ডাইনিং টেবিলের উপর ঘড়ি , এসির রিমোট , আধখাওয়া চানাচুরের ঠোঙা গার্টার দিয়ে বাঁধা I ড্রয়িং রুম কাম ক্যাম্প অফিস আর বেড রুমের মাঝামাঝি , ঝোলানো পর্দার ঠিক নীচে , দুপাটি জুতো, একটির সঙ্গে আরেকটি সমকোণে রাখা I এই যা বর্ণনা দিলাম, তাতে পাঠিকাকুলের চোখ কপালে ওঠার কথা I তবে সেই একজোড়া জুতোর দিকে তাকিয়েই কিন্তু আমার মাথায় পাদুকাপুরানের আইডিয়াখানি এলো I সুতরাং , অবিন্যাস থেকে বিন্যাসI
II স্মৃতির গলিখুঁজি – শৈশব থেকে হেমন্তবেলা II
আমাদের ছোটবেলা মানেই বাটার জুতো Iপুজোয় চাই নতুন জুতো , পাতা জোড়া বিজ্ঞাপন I দোকানে গেলে মুখোশ , -কলম- পেন্সিল, ক্লাসের রুটিন এসব দিত Iএকদম ছোটবেলা লিলিপুট জুতো পছন্দ হয়েছিল-বোধহয় পরেও ছিলাম পায়ে তবে ছোট বাচ্চাদের জন্য বাঁশি দেওয়া বা লাইট জ্বলা জুতো চালু হয়েছিল আরো পরে I I একটু বড় হতে এমনি স্কুল শ্যূ ছাড়াও কেট্স শ্যূ, ক্যাম্বিস শ্যূ এসব পাওয়া যেত I তবে আমাদের মফঃস্বলের স্কুলগুলোতে জুতো পরার চল ছিল না – নাগরিক বাবা মায়ের সন্তান হওয়াতে , আমার পায়েই শোভা পেত জুতো – বাকিরা খালি পায়েই আসত I
আমাদের কোয়ার্টসরের কম্পাউন্ডে এরকম একটি পরিবার থাকত – তিন চারটি ভাই বোন এদিক ওদিক দুস্টমি করে বেড়াত, খালি পায়ে, কখনও বা খালি গায়েও I এদিকে পুজোর বোনাসের টাকা হাতে পেলেই পরিবারের কর্তা , ছেলেমেয়েদের বাটার দোকানে নিয়ে যেতেন I পুজোর ক’দিন সারি সারি জুতো রোজ পালিশ করে,পায়ে পাউডার মেখে , জুতোর ভিতর তুলো দিয়ে ওদের পুজো পরিক্রমায় বেরোতে দেখতাম I পুজো হয়ে গেলে আবার যে কে সেই -ধূলি ধূসরিত পায়ে মগডাল থেকে মগডালে ! পাড়ার একটু বড় ছেলেরা ওদের সবচেয়ে বড়টিকে ত্রিপুরার চলতি বাংলায় জিজ্ঞেস করত , ” আই বাবুল, তো’গ পায়ে জুতা কন্ডাই ?( তোদের পায়ে জুতো কোথায় ?) উত্তর আসত , ” ট্রাঙ্কত !” -অর্থাৎ ট্রাংকবন্দী !
কলেজ জীবনে আমাদের অনেকেরই স্বচ্ছন্দের জুতো ছিল বেল্ট দেওয়া কাবলি জুতো I বিশেষ করে তখনকার আমার রোগ টিংটিঙে চেহারায় , ঝোলা কাঁধে ,গুঁজে না পরা শার্টের সঙ্গে কাবলি জুতোর কম্বিনেশনটাই ঠিক ছিল I তবে অনেকেই কেতাব দুরস্ত হয়ে স-বুট কলেজে আসত I এক সহপাঠী বুটজুতো পরার একটি অব্যর্থ্য কারণ দেখিয়েছিল – যদি কেউ ভিড় বাসে পায়ে পাড়া দেয় , তাকে যোগ্য জবাব দেবে বলে !
কলেজ ডিঙিয়ে ইনভার্সিটি I ততদিনে আমি রীতিমত শহুরে হয়ে গেছি I টি শার্ট বেল্টের সঙ্গে মানাসই জুতো I তবে হার্ডিঞ্জ বিল্ডিঙে ক্লাস করতে যাওয়ার সময় ইনভার্সিটি চত্বরে বসে থাকা মুচির ব্যবসাবুদ্ধির প্রশংসা না করে পারতাম না I ডিগ্রি সার্টিফিকেটের চক্করে পড়া দাদাবাবু ও দিদিমণিদের জুতো যে ছিঁড়বেই , এরকম দূরদৃষ্টি না থাকলে এরকম স্ট্র্যাটেজিক ডিসিশন কেউ নেয় ?
জুতো নিয়ে আমার জীবনে আরও কয়েকটি ঘটনা আছে , তা খানিকটা যৌবনোত্তর কালেই,, তার ঝাঁপি খুলি এবার I
চাকরিজীবনে ,আমাদের দপ্তরে প্রথম প্রমোশনে মফঃস্বলে পাঠানোর একটা প্রথা ছিল, এখনো আছে I তখন প্রথম পোস্টিং স্থল চুঁচুড়াতে সপ্তাহান্তে যাতায়ত করি I না, ঠিক কলকেতা, ডায়মণ্ডহারবার, রানাঘাট, তিব্বত রুট নয় , কিন্তু হাওড়া স্টেশন থেকে বালি,, রিষড়া, শ্ৰীৰামপুর এসব পেরিয়ে যেতে হত I
ভোর রাত্রে ওঠার জন্যই হোক,বা ট্রেনের দুলুনিতে হোক,একদিন মোটামুটি ফাঁকা ট্রেনে উঠে, সীটের উপর বাবুমত বসে , মহানন্দে ঢুলছিলাম I উল্টো দিকে খোঁচা খোঁচা চুলওয়ালা একটি লোক বসে ছিল , উঠেছিল বোধহয় রিষড়া থেকে I চোখের তন্দ্রা ভাবটি যেতেই , দেখি খোঁচাচুল হাওয়া , সঙ্গে আমার জুতো জোড়া I অগত্যা খালি পায়ে রিকশা উঠে চুঁচুড়া ঘড়ির মোড় থেকে জুতোবান হয়ে অফিস প্রবেশ I এর পর থেকে খোঁচাচুল কাউকে দেখলেইআমি কেমন খচে যাই I কার্য কারণ সম্বন্ধে বলে একটা কথা আছে না !
এর পরের অভিজ্ঞতাটি জুতো বদলের I গিয়েছিলাম পরিচিত এক উকিলের চেম্বারে I জুতো বাইরে খোলার হুলিয়া ছিল, তাই বেয়ার ফুটে ঢোকাটা বেয়ার করতে হল I মুশকিল হল বেরোনোর সময় I আধো অন্ধকারে এক জোড়া জুতোয় পা দিলাম, দেখি ঠিক হচ্ছে না I সৌভাগ্যবশত , আমার আগে একজনই ভদ্রলোক বেরিয়েছিলেন,বুঝলাম, উনি আমার জুতোজোড়া নিজের মনে করে পরে নিয়েছেন I উকিলের চেম্বারে বসে থাকা মেজ উকিল ছোট উকিল ফোন লাগালেন , ভদ্রলোক গাড়ি ঘুরিয়ে চলে এলেন I এসে মারাত্মক কথা বললেন , ‘ আমিও ভাবছি , এক ঘন্টায় আমার পা কি ছোট হয়ে গেল ? উকিলের চেম্বারে এসে জুতোর শুকতলা ক্ষয়ে যেতে পারে , জুতো ফেটে যেতে পারে, কিন্তু পা ছোট হয়ে যাওয়াটা বোধহয় উকিল কমুনিটির কাছেও বাড়াবাড়ি I যাই হোক, সরে চরণে শ্যূ চড়িয়ে বাড়ি ফেরা সম্ভব হল I
জুতো নিয়ে অন্যরকমের বিড়ম্বনায় পড়তাম আফ্রিকা বাসের সময় I আমার জুতোর সাইজ ছয় – কিন্তু আফ্রিকান পুরুষরা লম্বায় বহরে বেশ বড়োই হয়ে থাকেন I সুতরাং , ওখানে জুতো কিনতে হলে দোকানের ‘বয়েজ ‘ সেকশন ছাড়া আমার গত্যন্তর থাকত না I
জুতোর জন্যে হন্যে হওয়া , সেও ছিল ভাগ্যে I ২০১৮ জুলাই I অফিস ট্যুরের গন্তব্য চীন I নজরে এলো , এদিক ওদিক ঘোরার জন্য ক্যাজুয়াল জুতোর অবস্থা খুব একটা ভাল নয় I কলকাতায় স্পোর্টস এর দোকান কিছু কম নেই , এমনকী , মাসীর কাছে মায়ের গল্প শোনানোর মত গোটাকয় চাইনিজ দোকানও আছে বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটে I
কলকাতা থেকে কেনা আর হল না যখন, দিল্লি গিয়ে জুতো কেনা সাব্যস্ত হল I ইন্ডিয়ান এয়ার লাইনসের ফ্লাইট করল খানিকটা দেরী – ফলে দিল্লিতে রাতের বেলা একটার পর একটা মার্কেটে যাচ্ছি , আর দেখি সেগুলো বন্ধ হয়ে গেছে I পরদিন ভোরের উড়ান , সুতরাং এয়ারপোর্টের ডিউটি ফ্রি দোকান থেকে মহার্ঘ্য একটি জুতো কেনা হল , ব্যাপারটা আর shoestring বাজেটে থাকল না Iতবে এই ব্র্যান্ডেড জুতোটির দশাও আমার সেই ছোটবেলার সাথীদের মতোই হল – অর্থাৎ ট্রাঙ্কত!
II ঘটনা যখন দুর্ঘটনা II
এটিq হয়েছিল আমার এক প্রবাসী বন্ধুর জীবনে , সে নিজেই তার ফেসবুকের দেয়ালে ছবিশুদ্ধ পোস্ট করেছিল ঘটনাটি I কোন এক ব্যস্ত সকালে অফিস বেরোনোর সময় জুতোর তাকে থেকে জুতোজোড়া বের করতে এ বিপত্তি I নজরে যখন এলো, তখন দেরি হয়ে গেছে – সেদিন আবার রোজকার অফিস নয়, একটি কনফারেন্স এ ভাষণ দিতে হবে I পার্কিং লটে গাড়ি রেখে সে খুব দ্রুত হাঁটা দিল কনফারেন্স হলের দিকে I সেখানে বক্তৃতা চলাকালীন সারাক্ষন একবার এ পা, আরেকবার ও পা , অন্য পায়ের পিছনে রেখে ভাষণ দিয়ে গেল , দু পায়ে দুরকম জুতো যে ! লজ্জা পাওয়ার প্রসঙ্গ উঠলেই এক সময় ও বলত , লজ্জায় মুখ বেগুনী হয়ে গেছে – সেদিন ক’ পোঁচ বেগুনি হয়েছিল কে জানে !
II আপদমস্তক II
ভদ্রলোকের বিচার নাকি হয় জুতোর চাকচিক্যে I একেক জন জুতো এমন চকচকে করতে পারেন, তাদের সহধর্মিনী বা সঙ্গিনীরা কখনো আয়না সঙ্গে নিতে ভুলে গেলে তাদের নাকি বাধ্য করেন জুতো খুলে একটু দূরে একপাটি জুতো হাতে দাঁড়াতে I তাতেই নাকি নারীদের সাময়িক প্রসাধন হয়ে যায় I তবে ফর্মাল পোশাকের সঙ্গে স্নিকার পরে অনেককে বেশ অদ্ভুতুড়ে হয়ে নির্বিকার মুখে হাজির হতে দেখা যায় I বাংলা সিনেমায় ভিলেন মার্কা প্রোমোটার দেরও টিপিক্যাল ধরণ হল- চোখে সানগ্লাস, গলায় মোটা চেন ,ভুঁড়ি ঢাকা টি -শার্ট ,সঙ্গে স্নিকার্স !
তবে ক’ দশক আগে এক বিয়ে বাড়িতে মেয়েদের সম্মিলিত ‘বর এসেছে , বর এসেছে ‘ ধ্বনি নিমেষে মিলিয়ে গিয়েছিল একমাথা তেল জবজবে চুল , পাটভাঙা ধুতি পাঞ্জাবীর সঙ্গে কাঁধে শাল ও পায়ে কালো জুতো , গোলাপী মোজাওয়ালা বরকে দেখে I তবে পরবর্তী কালে ,পাঞ্জাবী পাজামার সঙ্গে স্নিকার্স বা স্পোর্টস শ্যু পড়ার চল বোধহয় সালমান খানের মত জবরদস্ত পুরুষ করে গেছেন – সুতরাং এই ড্রেস দেখলে মেয়েদের মুখে হাজার পাওয়ারের আলোই জ্বলে ওঠে I
জুতোর বাজারে বাটার কৌলিন্য গেছে বহুকাল I কলকাতার কথা বললে খাদিম , শ্রীলেদার্সের মত স্থানীয় ব্র্যান্ড জনপ্রিয় অনেকদিন I গ্লোবালাইজেশনের পরে উডল্যান্ড, মোচি , এমন আরো অনেক ব্রান্ডে বাজার ছেয়ে গেছে I এদের মধ্যে কয়েকটি ব্র্যান্ডের জুতো পরে আরাম -বেশ হালকা , পকেটটিকেও যথেষ্ট হালকা করে বটে !
তবে জুতোর বিচারে সমাজকে আড়াআড়ি ভাগ করা যায় I একদিকে বাটা, শ্রী লেদার্স, খাদিম, জুতোর সঙ্গে আর অন্যদিকে বহুজাতিক ব্রান্ডের দাপট I রিটেল স্তরের রামের পাশাপাশি আমাজন ফ্লিপকার্টের সুগ্রীব দোসর হওয়াতে ফ্যান্সি মার্কেট বা শিলিগুড়ির চোর মার্কেটের রমরমাও বোধহয় আর নেই Iমেয়েদের জুতোর ব্যাপারেও এমনি শ্রেণীভাগ- তবে মেয়ে মহলে ডক্টর স্ক্রলের জুতোর অবাধ গতিবিধি I তবে, ডাকব্যাকের বর্ষার জুতোর নামডাক অতটা আছে কি ?
II বন্দিত, ব্র্যান্ডিত II
জুতো নিয়ে ব্র্যান্ড বিল্ডিং ব্যাপারটা বোধহয় বিদ্যাসাগরই প্রথম করেন I বিদ্যাসাগরী চটি বলে যা চালু হয়েছিল , তার সাবেক ইতিহাস আমার জানা নেই I তবে সিংহাসনে রামের খড়ম রেখে রাজ্য চালনা করে ভরত ‘ Yours faithfully কথাটিকে ‘ Yours feetfully’ করে তুলে ছিলেন তাতে সন্দেহ নেই I সাবেক কালের রাজনীতিকদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী অবশ্যই হাওয়াই চটিকেও তাঁর ইমেজের বাহক করে তুলেছেন, তবে এই ব্যাপারে আর এগোচ্ছি না I
,
II আধুরা প্রেম কহানী,,আর বলিউডি প্রেম II
ছোট মফঃস্বল শহর , ততোধিক ছোট স্কুল I সিনেমায় যেমন হয় , শর্বরী , অফিসার কন্যা I কন্যার প্রেমে যে পাগল ,সে সহপাঠী হলেও বয়সে অনেকটাই বড় I দিনের পর দিন রাজমোহন তার যে পিছু নিচ্ছে, ক্লাসের ফাঁকে তাকিয়ে থাকছে অপলক , তার একেবারেই পছন্দ নয় I একদিন রাগের মাথায় , পায়ের চটি ঠিক করার অছিলায় সে চটিটিকে তুলেই ধরল রাজমোহনের দিকে I স্কুল ফেরার পথে প্রথমে শাসানি পরে অনুনয়- বিনয় ,সব I
শর্বরী ঘাবড়ে গিয়ে বাড়িতে মা’ কে বলে দিল সব I এর পর পুরোটাই পাওয়ার ইকুয়েশন I রাজমোহনের বাবা, যোগেশ্বর সামান্য কন্ট্রাক্টর , তার ডাক পড়ল ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের কোয়ার্টারে I ছেলের হয়ে বাবা মুচলেকা দিলেন, আর কখনো এরকম হবে না I ওঠার সময় ইঞ্জিনিয়ার গিন্নি বলে দিলেন, রাজমোহন এমনি আসুক না, এক ক্লাসে পড়ে , ভাই বোনের মত গল্প করে যাবে ! সদ্য শেষ হয় চা কি যোগেশ্বরের আরো তেতো লেগেছিল ?
কঠোর গদ্য থেকে রুপোলী পর্দা – ঝলসানো রুটি থেকে পূর্ণিমার চাঁদ I আমাদের বিয়েতে যেমন শয্যাতুলুনী , আর্যাবর্তের বিয়েতে তেমনি জুতো লুকিয়ে বরের থেকে পয়সা নেওয়ার একটা চল আছে I’হাম আপকে হ্যায় কৌন ‘ ছবিতে মাধুরী তার সখীদের নিয়ে এত কোমর দোলাচ্ছিল যে সেটা দেখার জন্য জুতোর শোক ভুলে কয়েক ক্রোশ হাঁটা যায় I বলিউডের চেনা ছকে সেই জুতো চুরি শেষ অব্দি মন চুরি অব্দি পৌঁছে যায়,- তার জন্য সালমানের অবশ্য গেঞ্জি খুলতে হয় নি !
II বিসংবাদে সংবাদে II
জুতো পায়ের শোভা বর্ধন করে বটে, তবে পা থেকে হাতে উঠলেই মুশকিল I জর্জ বুশ থেকে অরবিন্দ কেজরিওয়াল , এই কথাটি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন I তবে ভারতের ইতিহাসে সর্বপ্রথম রেকর্ডেড চপ্পল ছোড়াছুড়ি ১৯০৭ সালের সুরাট কংগ্রেসে I নরমপন্থী আর চরমপন্থিদের মধ্যে ব্যাপক চপ্পল ছোড়াছুড়ি হয় সেদিন I পরাধীন ভারতের সেই ট্র্যাডিশন অবশ্য স্বাধীন ভারতেও সমানে চলেছে -আইনসভাগুলিতে পেপার হেলিকপ্টার , মাইক্রফোনের ডাঁটির সঙ্গে জুতো চপ্পল ও মিসাইল হয়ে যায় দমাদ্দম I
II পাদুকা বৈভব II
বিতর্কিত ব্যক্তিত্বদের জুতো প্রীতি অনেকসময় বিলাসিতার পর্যায়ে দাঁড়িয়ে যায় I এ ব্যাপার ফিলিপিন্সের প্রাক্তন ফার্স্ট লেডি ইমেল্দা মার্কোসের নাম যদি বা এক নম্বরে থাকে , আমাদের পুরাচ্চি থালাইভি ( বিপ্লবী নেত্রী ) জয়রাম জয়ললিতার ৭৫০ জোড়া জুতো দেশের মধ্যে বুঝি বা একনম্বরে I তবে ইমেল্দা ম্যাডামের জুতোগুলো নিয়ে ওদেশে মিউজিয়াম হয়েছে , জয়রাম জয়ললিতার জুতোগুলো সম্ভবত রয়েছে কোর্টের মহাফেজখানায় I ভারতের প্রথম ট্যাবলয়েড ব্লিৎস পত্রিকার সম্পাদক রুশী করনজিয়ার তেমনি ছিল নানারকম জুতোর শখ I বৈভব না হলেও , নানারকম রংচঙে জুতো পরে বলিউডের প্রাক্তন তারকা গোবিন্দাও বোধকরি ‘ ‘তেরি নাননি মরি তো ম্যায় কেয়া কুরু’ র মত কালজয়ী গানের সঙ্গে নাচন কোঁদন যথেষ্টই করেছেন I
II মেরে জুতা হ্যায় জাপানী II
জাপানের সঙ্গে জুতোর কেমন একটা সম্পর্ক আছে -রাজকাপুর নিশ্চয়ই সেটা তৈরী করেন নি I না হলে ওই ফ্যাক্টরিতে শ্রমিকরা মজুরি বাড়ানোর দাবিতে এরকম আন্দোলন করেছিল কেন ? ব্যাপারটা হল – স্ট্রাইক হল না, পুরোদমে উৎপাদন চালু – কিন্তু মেশিন থেকে বেরোচ্ছে এক পায়ের জুতো ! কর্তৃপক্ষের মাথায় হাত I তাড়াতাড়ি শ্রমিক নেতাদের ডেকে সকলে মিলে স্যস দিয়ে কাঁচা মাছ খেতে খেতে ব্যাপারটার নিস্পত্তি করা আর কী I
তেমনি একদম হালে , জাপানে হলে শুরু হয়েছে মেয়েদের # Ku too আন্দোলন – উঁচু হিলে তারা আপত্তি জানাচ্ছে আজকাল I জাপানের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান গুলো সৌন্দর্যের যে রূপরেখা তৈরী করেছে, তাতে মেয়েদের উঁচু হিলের জুতো পরা বাধ্যতা মূলক I এই আন্দোলন সফল হলে, ফ্ল্যাট চটি পরেই জাপানি মেয়েরা মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন করবে সকলকে I তবে এ কথা শুনে অজন্তা হাওয়াই বা প্যারাগন শ্যুস কোনো ডেলিগেট দল বাজার যাচাই করতে জাপান পাঠিয়েছে এমন কোন খবর নেই I
II এখানেও রবীন্দ্রনাথ ! II
‘জুতা আবিষ্কার’ছোটবেলায় অভিনয় করেনি বা দেখে নি আমাদের প্রজন্মের এরকম বাঙালী কমই আছেন I তবে আমাকে অনেক বেশী টানে হাই হিল সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের রসিকতা Iশেষের কবিতায়, হাই সোসাইটির কিটি মিত্র হাই হিল পরে অভ্যস্ত , এটিকে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন ‘ছাগল জাতীয় জীব থেকে ধার করা I ” তবে এর থেকেও হাসির কথা আছে জীবন স্মৃতিতে, , ঘর ও বাহির প্রবন্ধে I উদ্ধিতিটি না দিলে অন্যায় হবে _
“আমাদের চটিজুতা একজোড়া থাকিত, কিন্তু পা দুটা যেখানে থাকিত সেখানে নহে। প্রতি-পদক্ষেপে তাহাদিগকে আগে আগে নিক্ষেপ করিয়া চলিতাম– তাহাতে যাতায়াতের সময় পদচালনা অপেক্ষা জুতাচালনা এত বাহুল্য পরিমাণে হইত যে পাদুকাসৃষ্টির উদ্দেশ্য পদে পদে ব্যর্থ হইয়া যাইত।“
তবে ‘চরণ ধরিতে দিও গো আমারে ‘ গানটি গাওয়া হলেই যে দাদার কীর্তি সিনেমার দৃশ্যটি ভেসে ওঠে , তার থেকেও , ঠিকঠাক এজেন্সির হাতে পড়লে এটি একটি জুতো কোম্পানির বিজ্ঞাপন হতে পারত I সেক্ষেত্রে , আমার পছন্দের মডেল সোনালী বিন্দ্রে বা সুস্মিতা সেন , আর পুরুষ মডেল টি , হে হে !
IIপ্রবাদে , কৌতুকে II
ইংরেজিতে বলে – “ The wearer knows where the shoe pinches” ! উকিল বাড়িতে এক সাইজ ছোট জুতো পরে এই প্রবাদের মর্ম আমি বুঝেছি I আর ম্যানেজমেন্টের ক্লাসে যে হরবখত বলা হয়, এমপ্যাথি মিন্স এন্টারিং ইন্টু দ্য শ্যু অব আদার্স – তার মানে অল্প বিস্তর সবাই বুঝতে পারি I যদি কেউ দ্বিমত পোষণ করে, সে ব্যাটা নিশ্চয় চোর, মন্দিরে বা অনুষ্ঠানবাড়িতে নিশ্চয়ই সে অন্যের জুতো গ্যাঁড়া মারার তালে থাকে I
এবার গেঁয়ো যোগী I বাংলায় জুতো নিয়ে যে তিনটে প্রবাদ চালু আছে ,সেগুলি হল , ‘গরু মেরে জুতো দান ,‘জুতো মেরে গরু দান আর জুতো সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ I
জুতো নিয়ে রসিকতাগুলো ছোটবেলায় শোনা – হোয়াটস্যাপে এখনো এগুলো জাতে ওঠে নি I
প্রথমটি দুই মাতালের গল্প I
মানব সভ্যতায় সবথেকে উপকারী জিনিস কী,তাই নিয়ে দুই মাতালের তর্ক I প্রথম মাতাল বলল, ” ছাতা সবথেকে উপকারী – রোদ থেকে বাঁচায়, বৃষ্টি থেকে রক্ষা করে I দ্বিতীয় মাতাল বলল – তুই কিচ্ছু জানিস না I সবথেকে উপকারী জুতোI” প্রথমজন কারণ জানতে চাইলে দ্বিতীয়জন বলতে থাকে –“ বাহ্ রে, জুতো পরতে পরতে ক্ষয় কি না বল ?” প্রথম জন মাথা নাড়তেই বক্তা বলে ,” তবে ? এই খরখরে রাস্তায় আমরা যে হাঁটি, জুতো না থাকলে কবে আমাদের শরীর ক্ষয়ে যেত – মাথায় ভর করে হাঁটতে হত জানিস ?”
দ্বিতীয় কৌতুক স্ট্রেস- ম্যানেজমেন্ট নিয়ে – মনরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে রোগী জানতে চাইলেন – আমার এত স্ট্রেস , দূর করব কী করে ? বিশেষজ্ঞ বলেন, সবসময় মনে রাখবেন , আপনি যেমনি স্ট্রেসে আছেন – আপনার থেকে হাজার গুন্ স্ট্রেসে আরো লোক থাকে I
পরের সেশনে রোগীকে বেশ টগবগে দেখাচ্ছিল I ডাক্তার বলেন – আমার ফর্মুলায় কাজ হল তো ? রোগী হেসে বলে, ” হাঁ , ঠিক তাই I তবে আপনি তো থিওরি বলেছিলেন -আমি হাতে কলমে করে থাকি I ডাক্তার বলেন , কি রকম ? রোগী বলেন , আমার বাড়াবাড়ি রকমের স্ট্রেস হলেই আমি কোনো না কোনো মন্দিরে চলে যাই – মন্দিরের সামনে ছাড়া জুটিগুলোকে পা দিয়ে শুধু এদিক ওদিক করে দেই -জোড়া জুতোর একটা খুঁজে বার করার কাছে কোথায় আমার স্ট্রেস !
তৃতীয়টি একটু মোটা দাগের I মর্নিং শিফট ছেলেদের, মেয়েদের ডে কলেজ I মেয়েরা ঢোকার সময় কিছু ছেলে সিঁড়িতে বসে থাকে I ফাস্ট ইয়ারের একটি মেয়ে ঢোকার সময় একটি ছেলে বলে বসে – ” তোমার জুতোটা খুব সুন্দর !” একটুও অপ্রতিভ না হয়ে মেয়েটি হেসে জবাব দেয় , খুলব নাকি ? এবার আরেক সিনিয়রের টিপ্পনি – তোমার স্কার্ট টা আরো সুন্দর !
জুতো নিয়ে আরো কিছু সাংঘাতিক সাংঘাতিক চুটকি আছে, ওপেন ফোরামে সেগুলো লিখলে জনগণ আমায় জুতো পেটা করবে ! গ্রামের যাত্রাপালায় অত্যাচারী দারোগার ভূমিকায় পাঠ করা অভিনেতার সেই জুতোর বাড়ি খাওয়ায় তবু গৌরব আছে ,আমার তো সেটাও রইবে না !
II মধুরেণ সমাপয়েৎ II
এসব গল্প গাছা শেষ হয় রূপকথা দিয়ে I সিনড্রেলার গল্প সবাই জানি I মা মরা মায়ের মেয়ে অপূর্ব সুন্দরী সিনড্রেলা, সৎ মায়ের সংসারে সারাদিন কাজ করে আর দুই সৎ বোন আর মায়ের অত্যাচার সহ্য করে I সেই রাজ্যের রাজকুমার একদিন এক বল পার্টির ঘোষণা করল -আর রাজ্যের সব যুবতী মেয়েকে আসতে বলে সেখানে I বলা হল, সুন্দরী শ্রেষ্ঠাকে বিয়ে করবে রাজকুমার I
সিনড্রেলাকে বাদ দিয়ে, সৎ মা দুই মেয়েকে নিয়ে গেল সেই পার্টিতে I সিনড্রেলার দুঃখে দয়াপরবশ হয়ে পরীর রানী তাকে বর দিলেন আর সুন্দর কাঁচের একজোড়া জুতো পরিয়ে পাঠিয়ে দিলেন রাজসভায় I
নতুন পোশাকে , রূপের ছটায় সিনড্রেলাকে কেউ চিনতে পারে নি Iএদিকে রাজকুমারের তো তাকেই পছন্দ – বল ডান্সের পার্টনার হয়ে গেল সে সিনড্ I কিন্তু পরী রানীর শর্ত ছিল , রাত্রি বারোটার আগে বাড়িতে না ফিরলে ,তার ভাগ্য ফিরবে না I নাচে বিভোর সিনড্রেলার যখন খেয়াল পড়ল , তখন বারোটা বেজে গেছে I ফলে আবার তাকে পড়তে হল সৎমায়ের সংসারে I
কিন্তু রাজকুমারের মনে তো সিনড্রেলা ছাড়া আর কাউকে ধরে নি I খোঁজ খোঁজ খোঁজ I এদিকে হয়েছে কী , তাড়াহুড়ায় আসবার সময় ,কাঁচের জুতোর একপাটি সিনড্রেলা ফেলে এসেছিল রাজবাড়িতে Iঅবশেষে জুতোর মাপ মিলিয়ে, সৎ মায়ের সব চক্রান্ত ব্যর্থ করে রাজকুমার আর সিনড্রেলার বিয়ে সুসম্পন্ন হয় -এন্ড দে লিভড হ্যাপিলি দেয়ারআফটার !
বাকিটা বলি I কলেজ লাইফে প্রেমে পড়ে এই জুতোর ফর্মুলাটাই কাজে লাগিয়েছিল প্রদীপ্ত Iনইলে , বীরেন রায় রোডে কোচিঙে পড়তে আসা তন্নিষ্ঠাকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে সে বের করল কী করে ? স্রেফ জুতোজোড়াকে নজর করে I প্রদীপ্তর ডিটেকটিভ চোখ সমীরণ স্যারের বাড়ি থেকে ঠিক তন্নিষ্ঠাকে স্পট করতে পারে ও এক শুভ দিনে সে প্রেম নিবেদন করেই ফেলে I তন্নিষ্ঠাও রাজি হয়ে যায় , ফলতঃ, দে অলসো, লিভড হ্যাপিলি দেয়ারআফটার !
তবে মন্দজনে বলে ,তন্নিষ্ঠা নাকি শাড়িস বা সালোয়ারের সঙ্গে রং ম্যাচ করে জুতো কিনতে চায়, এটা নিয়ে স্বামী স্ত্রীর মাঝে মাঝে নাকি বচসা হয় I
II টেল এন্ড বা এন্ড টেল II
সূর্যোদয় দেখার কথা I হিল স্টেশনে পাশাপাশি দুটি ঘর I সফরসঙ্গিনীকে তাড়া লাগানো হল I সাজুগুজু করে বেরিয়ে এসেই তার ঝাড় – তুই এতো তাড়াতাড়ি রেডি হলি কী করে ? তোকে তো বরাবর ফিতে ছাড়া জুতো পড়তে দেখি !রাত্রে শোবার আগে নিশ্চয়ই ফিতে বেঁধে রেখেছিলি , সকালে টুক করে পা গলিয়ে হাজির হয়েছিস !
মেয়েরা সবকিছু কেন এত চট করে বুঝে যায় !
রম্যরচনা
পাদুকাপুরান
নিলয় বরণ সোম
II গোড়ার কথা II
মাঝে মাঝে নিজেকে খানিকটা অবিন্যস্ত রাখতে বেশ লাগে I
অবিন্যস্ত মানে অপরিষ্কার নয় কিন্তু I সাধারণ গার্হস্থ্য জীবনে তার সুযোগ কম – কিন্তু ট্যুরে বাইরে থাকলে ,সমগ্র আমিকে একটু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা যায় I বিছানার এককোনে ওল্টানো বই, আধভাঙা চাদর , একখানা হাফ শার্ট ওয়ার্ডরোবের ভেতর নয়, পাল্লা খুলে রাখা দরজার হ্যাঙ্গারে ঝোঝুল্যমান , ডাইনিং টেবিলের উপর ঘড়ি , এসির রিমোট , আধখাওয়া চানাচুরের ঠোঙা গার্টার দিয়ে বাঁধা I ড্রয়িং রুম কাম ক্যাম্প অফিস আর বেড রুমের মাঝামাঝি , ঝোলানো পর্দার ঠিক নীচে , দুপাটি জুতো, একটির সঙ্গে আরেকটি সমকোণে রাখা I এই যা বর্ণনা দিলাম, তাতে পাঠিকাকুলের চোখ কপালে ওঠার কথা I তবে সেই একজোড়া জুতোর দিকে তাকিয়েই কিন্তু আমার মাথায় পাদুকাপুরানের আইডিয়াখানি এলো I সুতরাং , অবিন্যাস থেকে বিন্যাস I
II স্মৃতির গলিখুঁজি – শৈশব থেকে হেমন্তবেলা II
আমাদের ছোটবেলা মানেই বাটার জুতো Iপুজোয় চাই নতুন জুতো , পাতা জোড়া বিজ্ঞাপন I দোকানে গেলে মুখোশ , -কলম- পেন্সিল, ক্লাসের রুটিন এসব দিত Iএকদম ছোটবেলা লিলিপুট জুতো পছন্দ হয়েছিল-বোধহয় পরেও ছিলাম পায়ে তবে ছোট বাচ্চাদের জন্য বাঁশি দেওয়া বা লাইট জ্বলা জুতো চালু হয়েছিল আরো পরে I I একটু বড় হতে এমনি স্কুল শ্যূ ছাড়াও কেট্স শ্যূ, ক্যাম্বিস শ্যূ এসব পাওয়া যেত I তবে আমাদের মফঃস্বলের স্কুলগুলোতে জুতো পরার চল ছিল না – নাগরিক বাবা মায়ের সন্তান হওয়াতে , আমার পায়েই শোভা পেত জুতো – বাকিরা খালি পায়েই আসত I
আমাদের কোয়ার্টসরের কম্পাউন্ডে এরকম একটি পরিবার থাকত – তিন চারটি ভাই বোন এদিক ওদিক দুস্টমি করে বেড়াত, খালি পায়ে, কখনও বা খালি গায়েও I এদিকে পুজোর বোনাসের টাকা হাতে পেলেই পরিবারের কর্তা , ছেলেমেয়েদের বাটার দোকানে নিয়ে যেতেন I পুজোর ক’দিন সারি সারি জুতো রোজ পালিশ করে,পায়ে পাউডার মেখে , জুতোর ভিতর তুলো দিয়ে ওদের পুজো পরিক্রমায় বেরোতে দেখতাম I পুজো হয়ে গেলে আবার যে কে সেই -ধূলি ধূসরিত পায়ে মগডাল থেকে মগডালে ! পাড়ার একটু বড় ছেলেরা ওদের সবচেয়ে বড়টিকে ত্রিপুরার চলতি বাংলায় জিজ্ঞেস করত , ” আই বাবুল, তো’গ পায়ে জুতা কন্ডাই ?( তোদের পায়ে জুতো কোথায় ?) উত্তর আসত , ” ট্রাঙ্কত !” -অর্থাৎ ট্রাংকবন্দী !
কলেজ জীবনে আমাদের অনেকেরই স্বচ্ছন্দের জুতো ছিল বেল্ট দেওয়া কাবলি জুতো I বিশেষ করে তখনকার আমার রোগ টিংটিঙে চেহারায় , ঝোলা কাঁধে ,গুঁজে না পরা শার্টের সঙ্গে কাবলি জুতোর কম্বিনেশনটাই ঠিক ছিল I তবে অনেকেই কেতাব দুরস্ত হয়ে স-বুট কলেজে আসত I এক সহপাঠী বুটজুতো পরার একটি অব্যর্থ্য কারণ দেখিয়েছিল – যদি কেউ ভিড় বাসে পায়ে পাড়া দেয় , তাকে যোগ্য জবাব দেবে বলে !
কলেজ ডিঙিয়ে ইনভার্সিটি I ততদিনে আমি রীতিমত শহুরে হয়ে গেছি I টি শার্ট বেল্টের সঙ্গে মানাসই জুতো I তবে হার্ডিঞ্জ বিল্ডিঙে ক্লাস করতে যাওয়ার সময় ইনভার্সিটি চত্বরে বসে থাকা মুচির ব্যবসাবুদ্ধির প্রশংসা না করে পারতাম না I ডিগ্রি সার্টিফিকেটের চক্করে পড়া দাদাবাবু ও দিদিমণিদের জুতো যে ছিঁড়বেই , এরকম দূরদৃষ্টি না থাকলে এরকম স্ট্র্যাটেজিক ডিসিশন কেউ নেয় ?
জুতো নিয়ে আমার জীবনে আরও কয়েকটি ঘটনা আছে , তা খানিকটা যৌবনোত্তর কালেই,, তার ঝাঁপি খুলি এবার I
চাকরিজীবনে ,আমাদের দপ্তরে প্রথম প্রমোশনে মফঃস্বলে পাঠানোর একটা প্রথা ছিল, এখনো আছে I তখন প্রথম পোস্টিং স্থল চুঁচুড়াতে সপ্তাহান্তে যাতায়ত করি I না, ঠিক কলকেতা, ডায়মণ্ডহারবার, রানাঘাট, তিব্বত রুট নয় , কিন্তু হাওড়া স্টেশন থেকে বালি,, রিষড়া, শ্ৰীৰামপুর এসব পেরিয়ে যেতে হত I
ভোর রাত্রে ওঠার জন্যই হোক,বা ট্রেনের দুলুনিতে হোক,একদিন মোটামুটি ফাঁকা ট্রেনে উঠে, সীটের উপর বাবুমত বসে , মহানন্দে ঢুলছিলাম I উল্টো দিকে খোঁচা খোঁচা চুলওয়ালা একটি লোক বসে ছিল , উঠেছিল বোধহয় রিষড়া থেকে I চোখের তন্দ্রা ভাবটি যেতেই , দেখি খোঁচাচুল হাওয়া , সঙ্গে আমার জুতো জোড়া I অগত্যা খালি পায়ে রিকশা উঠে চুঁচুড়া ঘড়ির মোড় থেকে জুতোবান হয়ে অফিস প্রবেশ I এর পর থেকে খোঁচাচুল কাউকে দেখলেইআমি কেমন খচে যাই I কার্য কারণ সম্বন্ধে বলে একটা কথা আছে না !
এর পরের অভিজ্ঞতাটি জুতো বদলের I গিয়েছিলাম পরিচিত এক উকিলের চেম্বারে I জুতো বাইরে খোলার হুলিয়া ছিল, তাই বেয়ার ফুটে ঢোকাটা বেয়ার করতে হল I মুশকিল হল বেরোনোর সময় I আধো অন্ধকারে এক জোড়া জুতোয় পা দিলাম, দেখি ঠিক হচ্ছে না I সৌভাগ্যবশত , আমার আগে একজনই ভদ্রলোক বেরিয়েছিলেন,বুঝলাম, উনি আমার জুতোজোড়া নিজের মনে করে পরে নিয়েছেন I উকিলের চেম্বারে বসে থাকা মেজ উকিল ছোট উকিল ফোন লাগালেন , ভদ্রলোক গাড়ি ঘুরিয়ে চলে এলেন I এসে মারাত্মক কথা বললেন , ‘ আমিও ভাবছি , এক ঘন্টায় আমার পা কি ছোট হয়ে গেল ? উকিলের চেম্বারে এসে জুতোর শুকতলা ক্ষয়ে যেতে পারে , জুতো ফেটে যেতে পারে, কিন্তু পা ছোট হয়ে যাওয়াটা বোধহয় উকিল কমুনিটির কাছেও বাড়াবাড়ি I যাই হোক, সরে চরণে শ্যূ চড়িয়ে বাড়ি ফেরা সম্ভব হল I
জুতো নিয়ে অন্যরকমের বিড়ম্বনায় পড়তাম আফ্রিকা বাসের সময় I আমার জুতোর সাইজ ছয় – কিন্তু আফ্রিকান পুরুষরা লম্বায় বহরে বেশ বড়োই হয়ে থাকেন I সুতরাং , ওখানে জুতো কিনতে হলে দোকানের ‘বয়েজ ‘ সেকশন ছাড়া আমার গত্যন্তর থাকত না I
জুতোর জন্যে হন্যে হওয়া , সেও ছিল ভাগ্যে I ২০১৮ জুলাই I অফিস ট্যুরের গন্তব্য চীন I নজরে এলো , এদিক ওদিক ঘোরার জন্য ক্যাজুয়াল জুতোর অবস্থা খুব একটা ভাল নয় I কলকাতায় স্পোর্টস এর দোকান কিছু কম নেই , এমনকী , মাসীর কাছে মায়ের গল্প শোনানোর মত গোটাকয় চাইনিজ দোকানও আছে বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটে I
কলকাতা থেকে কেনা আর হল না যখন, দিল্লি গিয়ে জুতো কেনা সাব্যস্ত হল I ইন্ডিয়ান এয়ার লাইনসের ফ্লাইট করল খানিকটা দেরী – ফলে দিল্লিতে রাতের বেলা একটার পর একটা মার্কেটে যাচ্ছি , আর দেখি সেগুলো বন্ধ হয়ে গেছে I পরদিন ভোরের উড়ান , সুতরাং এয়ারপোর্টের ডিউটি ফ্রি দোকান থেকে মহার্ঘ্য একটি জুতো কেনা হল , ব্যাপারটা আর shoestring বাজেটে থাকল না Iতবে এই ব্র্যান্ডেড জুতোটির দশাও আমার সেই ছোটবেলার সাথীদের মতোই হল – অর্থাৎ ট্রাঙ্কত!
II ঘটনা যখন দুর্ঘটনা II
এটিq হয়েছিল আমার এক প্রবাসী বন্ধুর জীবনে , সে নিজেই তার ফেসবুকের দেয়ালে ছবিশুদ্ধ পোস্ট করেছিল ঘটনাটি I কোন এক ব্যস্ত সকালে অফিস বেরোনোর সময় জুতোর তাকে থেকে জুতোজোড়া বের করতে এ বিপত্তি I নজরে যখন এলো, তখন দেরি হয়ে গেছে – সেদিন আবার রোজকার অফিস নয়, একটি কনফারেন্স এ ভাষণ দিতে হবে I পার্কিং লটে গাড়ি রেখে সে খুব দ্রুত হাঁটা দিল কনফারেন্স হলের দিকে I সেখানে বক্তৃতা চলাকালীন সারাক্ষন একবার এ পা, আরেকবার ও পা , অন্য পায়ের পিছনে রেখে ভাষণ দিয়ে গেল , দু পায়ে দুরকম জুতো যে ! লজ্জা পাওয়ার প্রসঙ্গ উঠলেই এক সময় ও বলত , লজ্জায় মুখ বেগুনী হয়ে গেছে – সেদিন ক’ পোঁচ বেগুনি হয়েছিল কে জানে !
II আপদমস্তক II
ভদ্রলোকের বিচার নাকি হয় জুতোর চাকচিক্যে I একেক জন জুতো এমন চকচকে করতে পারেন, তাদের সহধর্মিনী বা সঙ্গিনীরা কখনো আয়না সঙ্গে নিতে ভুলে গেলে তাদের নাকি বাধ্য করেন জুতো খুলে একটু দূরে একপাটি জুতো হাতে দাঁড়াতে I তাতেই নাকি নারীদের সাময়িক প্রসাধন হয়ে যায় I তবে ফর্মাল পোশাকের সঙ্গে স্নিকার পরে অনেককে বেশ অদ্ভুতুড়ে হয়ে নির্বিকার মুখে হাজির হতে দেখা যায় I বাংলা সিনেমায় ভিলেন মার্কা প্রোমোটার দেরও টিপিক্যাল ধরণ হল- চোখে সানগ্লাস, গলায় মোটা চেন ,ভুঁড়ি ঢাকা টি -শার্ট ,সঙ্গে স্নিকার্স !
তবে ক’ দশক আগে এক বিয়ে বাড়িতে মেয়েদের সম্মিলিত ‘বর এসেছে , বর এসেছে ‘ ধ্বনি নিমেষে মিলিয়ে গিয়েছিল একমাথা তেল জবজবে চুল , পাটভাঙা ধুতি পাঞ্জাবীর সঙ্গে কাঁধে শাল ও পায়ে কালো জুতো , গোলাপী মোজাওয়ালা বরকে দেখে I তবে পরবর্তী কালে ,পাঞ্জাবী পাজামার সঙ্গে স্নিকার্স বা স্পোর্টস শ্যু পড়ার চল বোধহয় সালমান খানের মত জবরদস্ত পুরুষ করে গেছেন – সুতরাং এই ড্রেস দেখলে মেয়েদের মুখে হাজার পাওয়ারের আলোই জ্বলে ওঠে I
জুতোর বাজারে বাটার কৌলিন্য গেছে বহুকাল I কলকাতার কথা বললে খাদিম , শ্রীলেদার্সের মত স্থানীয় ব্র্যান্ড জনপ্রিয় অনেকদিন I গ্লোবালাইজেশনের পরে উডল্যান্ড, মোচি , এমন আরো অনেক ব্রান্ডে বাজার ছেয়ে গেছে I এদের মধ্যে কয়েকটি ব্র্যান্ডের জুতো পরে আরাম -বেশ হালকা , পকেটটিকেও যথেষ্ট হালকা করে বটে !
তবে জুতোর বিচারে সমাজকে আড়াআড়ি ভাগ করা যায় I একদিকে বাটা, শ্রী লেদার্স, খাদিম, জুতোর সঙ্গে আর অন্যদিকে বহুজাতিক ব্রান্ডের দাপট I রিটেল স্তরের রামের পাশাপাশি আমাজন ফ্লিপকার্টের সুগ্রীব দোসর হওয়াতে ফ্যান্সি মার্কেট বা শিলিগুড়ির চোর মার্কেটের রমরমাও বোধহয় আর নেই Iমেয়েদের জুতোর ব্যাপারেও এমনি শ্রেণীভাগ- তবে মেয়ে মহলে ডক্টর স্ক্রলের জুতোর অবাধ গতিবিধি I তবে, ডাকব্যাকের বর্ষার জুতোর নামডাক অতটা আছে কি ?
II বন্দিত, ব্র্যান্ডিত II
জুতো নিয়ে ব্র্যান্ড বিল্ডিং ব্যাপারটা বোধহয় বিদ্যাসাগরই প্রথম করেন I বিদ্যাসাগরী চটি বলে যা চালু হয়েছিল , তার সাবেক ইতিহাস আমার জানা নেই I তবে সিংহাসনে রামের খড়ম রেখে রাজ্য চালনা করে ভরত ‘ Yours faithfully কথাটিকে ‘ Yours feetfully’ করে তুলে ছিলেন তাতে সন্দেহ নেই I সাবেক কালের রাজনীতিকদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী অবশ্যই হাওয়াই চটিকেও তাঁর ইমেজের বাহক করে তুলেছেন, তবে এই ব্যাপারে আর এগোচ্ছি না I
,
II আধুরা প্রেম কহানী,,আর বলিউডি প্রেম II
ছোট মফঃস্বল শহর , ততোধিক ছোট স্কুল I সিনেমায় যেমন হয় , শর্বরী , অফিসার কন্যা I কন্যার প্রেমে যে পাগল ,সে সহপাঠী হলেও বয়সে অনেকটাই বড় I দিনের পর দিন রাজমোহন তার যে পিছু নিচ্ছে, ক্লাসের ফাঁকে তাকিয়ে থাকছে অপলক , তার একেবারেই পছন্দ নয় I একদিন রাগের মাথায় , পায়ের চটি ঠিক করার অছিলায় সে চটিটিকে তুলেই ধরল রাজমোহনের দিকে I স্কুল ফেরার পথে প্রথমে শাসানি পরে অনুনয়- বিনয় ,সব I
শর্বরী ঘাবড়ে গিয়ে বাড়িতে মা’ কে বলে দিল সব I এর পর পুরোটাই পাওয়ার ইকুয়েশন I রাজমোহনের বাবা, যোগেশ্বর সামান্য কন্ট্রাক্টর , তার ডাক পড়ল ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের কোয়ার্টারে I ছেলের হয়ে বাবা মুচলেকা দিলেন, আর কখনো এরকম হবে না I ওঠার সময় ইঞ্জিনিয়ার গিন্নি বলে দিলেন, রাজমোহন এমনি আসুক না, এক ক্লাসে পড়ে , ভাই বোনের মত গল্প করে যাবে ! সদ্য শেষ হয় চা কি যোগেশ্বরের আরো তেতো লেগেছিল ?
কঠোর গদ্য থেকে রুপোলী পর্দা – ঝলসানো রুটি থেকে পূর্ণিমার চাঁদ I আমাদের বিয়েতে যেমন শয্যাতুলুনী , আর্যাবর্তের বিয়েতে তেমনি জুতো লুকিয়ে বরের থেকে পয়সা নেওয়ার একটা চল আছে I’হাম আপকে হ্যায় কৌন ‘ ছবিতে মাধুরী তার সখীদের নিয়ে এত কোমর দোলাচ্ছিল যে সেটা দেখার জন্য জুতোর শোক ভুলে কয়েক ক্রোশ হাঁটা যায় I বলিউডের চেনা ছকে সেই জুতো চুরি শেষ অব্দি মন চুরি অব্দি পৌঁছে যায়,- তার জন্য সালমানের অবশ্য গেঞ্জি খুলতে হয় নি !
II বিসংবাদে সংবাদে II
জুতো পায়ের শোভা বর্ধন করে বটে, তবে পা থেকে হাতে উঠলেই মুশকিল I জর্জ বুশ থেকে অরবিন্দ কেজরিওয়াল , এই কথাটি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন I তবে ভারতের ইতিহাসে সর্বপ্রথম রেকর্ডেড চপ্পল ছোড়াছুড়ি ১৯০৭ সালের সুরাট কংগ্রেসে I নরমপন্থী আর চরমপন্থিদের মধ্যে ব্যাপক চপ্পল ছোড়াছুড়ি হয় সেদিন I পরাধীন ভারতের সেই ট্র্যাডিশন অবশ্য স্বাধীন ভারতেও সমানে চলেছে -আইনসভাগুলিতে পেপার হেলিকপ্টার , মাইক্রফোনের ডাঁটির সঙ্গে জুতো চপ্পল ও মিসাইল হয়ে যায় দমাদ্দম I
II পাদুকা বৈভব II
বিতর্কিত ব্যক্তিত্বদের জুতো প্রীতি অনেকসময় বিলাসিতার পর্যায়ে দাঁড়িয়ে যায় I এ ব্যাপার ফিলিপিন্সের প্রাক্তন ফার্স্ট লেডি ইমেল্দা মার্কোসের নাম যদি বা এক নম্বরে থাকে , আমাদের পুরাচ্চি থালাইভি ( বিপ্লবী নেত্রী ) জয়রাম জয়ললিতার ৭৫০ জোড়া জুতো দেশের মধ্যে বুঝি বা একনম্বরে I তবে ইমেল্দা ম্যাডামের জুতোগুলো নিয়ে ওদেশে মিউজিয়াম হয়েছে , জয়রাম জয়ললিতার জুতোগুলো সম্ভবত রয়েছে কোর্টের মহাফেজখানায় I ভারতের প্রথম ট্যাবলয়েড ব্লিৎস পত্রিকার সম্পাদক রুশী করনজিয়ার তেমনি ছিল নানারকম জুতোর শখ I বৈভব না হলেও , নানারকম রংচঙে জুতো পরে বলিউডের প্রাক্তন তারকা গোবিন্দাও বোধকরি ‘ ‘তেরি নাননি মরি তো ম্যায় কেয়া কুরু’ র মত কালজয়ী গানের সঙ্গে নাচন কোঁদন যথেষ্টই করেছেন I
II মেরে জুতা হ্যায় জাপানী II
জাপানের সঙ্গে জুতোর কেমন একটা সম্পর্ক আছে -রাজকাপুর নিশ্চয়ই সেটা তৈরী করেন নি I না হলে ওই ফ্যাক্টরিতে শ্রমিকরা মজুরি বাড়ানোর দাবিতে এরকম আন্দোলন করেছিল কেন ? ব্যাপারটা হল – স্ট্রাইক হল না, পুরোদমে উৎপাদন চালু – কিন্তু মেশিন থেকে বেরোচ্ছে এক পায়ের জুতো ! কর্তৃপক্ষের মাথায় হাত I তাড়াতাড়ি শ্রমিক নেতাদের ডেকে সকলে মিলে স্যস দিয়ে কাঁচা মাছ খেতে খেতে ব্যাপারটার নিস্পত্তি করা আর কী I
তেমনি একদম হালে , জাপানে হলে শুরু হয়েছে মেয়েদের # Ku too আন্দোলন – উঁচু হিলে তারা আপত্তি জানাচ্ছে আজকাল I জাপানের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান গুলো সৌন্দর্যের যে রূপরেখা তৈরী করেছে, তাতে মেয়েদের উঁচু হিলের জুতো পরা বাধ্যতা মূলক I এই আন্দোলন সফল হলে, ফ্ল্যাট চটি পরেই জাপানি মেয়েরা মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন করবে সকলকে I তবে এ কথা শুনে অজন্তা হাওয়াই বা প্যারাগন শ্যুস কোনো ডেলিগেট দল বাজার যাচাই করতে জাপান পাঠিয়েছে এমন কোন খবর নেই I
II এখানেও রবীন্দ্রনাথ ! II
‘জুতা আবিষ্কার’ছোটবেলায় অভিনয় করেনি বা দেখে নি আমাদের প্রজন্মের এরকম বাঙালী কমই আছেন I তবে আমাকে অনেক বেশী টানে হাই হিল সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের রসিকতা Iশেষের কবিতায়, হাই সোসাইটির কিটি মিত্র হাই হিল পরে অভ্যস্ত , এটিকে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন ‘ছাগল জাতীয় জীব থেকে ধার করা I ” তবে এর থেকেও হাসির কথা আছে জীবন স্মৃতিতে, , ঘর ও বাহির প্রবন্ধে I উদ্ধিতিটি না দিলে অন্যায় হবে _
“আমাদের চটিজুতা একজোড়া থাকিত, কিন্তু পা দুটা যেখানে থাকিত সেখানে নহে। প্রতি-পদক্ষেপে তাহাদিগকে আগে আগে নিক্ষেপ করিয়া চলিতাম– তাহাতে যাতায়াতের সময় পদচালনা অপেক্ষা জুতাচালনা এত বাহুল্য পরিমাণে হইত যে পাদুকাসৃষ্টির উদ্দেশ্য পদে পদে ব্যর্থ হইয়া যাইত।“
তবে ‘চরণ ধরিতে দিও গো আমারে ‘ গানটি গাওয়া হলেই যে দাদার কীর্তি সিনেমার দৃশ্যটি ভেসে ওঠে , তার থেকেও , ঠিকঠাক এজেন্সির হাতে পড়লে এটি একটি জুতো কোম্পানির বিজ্ঞাপন হতে পারত I সেক্ষেত্রে , আমার পছন্দের মডেল সোনালী বিন্দ্রে বা সুস্মিতা সেন , আর পুরুষ মডেল টি , হে হে !
IIপ্রবাদে , কৌতুকে II
ইংরেজিতে বলে – “ The wearer knows where the shoe pinches” ! উকিল বাড়িতে এক সাইজ ছোট জুতো পরে এই প্রবাদের মর্ম আমি বুঝেছি I আর ম্যানেজমেন্টের ক্লাসে যে হরবখত বলা হয়, এমপ্যাথি মিন্স এন্টারিং ইন্টু দ্য শ্যু অব আদার্স – তার মানে অল্প বিস্তর সবাই বুঝতে পারি I যদি কেউ দ্বিমত পোষণ করে, সে ব্যাটা নিশ্চয় চোর, মন্দিরে বা অনুষ্ঠানবাড়িতে নিশ্চয়ই সে অন্যের জুতো গ্যাঁড়া মারার তালে থাকে I
এবার গেঁয়ো যোগী I বাংলায় জুতো নিয়ে যে তিনটে প্রবাদ চালু আছে ,সেগুলি হল , ‘গরু মেরে জুতো দান ,‘জুতো মেরে গরু দান আর জুতো সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ I
জুতো নিয়ে রসিকতাগুলো ছোটবেলায় শোনা – হোয়াটস্যাপে এখনো এগুলো জাতে ওঠে নি I
প্রথমটি দুই মাতালের গল্প I
মানব সভ্যতায় সবথেকে উপকারী জিনিস কী,তাই নিয়ে দুই মাতালের তর্ক I প্রথম মাতাল বলল, ” ছাতা সবথেকে উপকারী – রোদ থেকে বাঁচায়, বৃষ্টি থেকে রক্ষা করে I দ্বিতীয় মাতাল বলল – তুই কিচ্ছু জানিস না I সবথেকে উপকারী জুতোI” প্রথমজন কারণ জানতে চাইলে দ্বিতীয়জন বলতে থাকে –“ বাহ্ রে, জুতো পরতে পরতে ক্ষয় কি না বল ?” প্রথম জন মাথা নাড়তেই বক্তা বলে ,” তবে ? এই খরখরে রাস্তায় আমরা যে হাঁটি, জুতো না থাকলে কবে আমাদের শরীর ক্ষয়ে যেত – মাথায় ভর করে হাঁটতে হত জানিস ?”
দ্বিতীয় কৌতুক স্ট্রেস- ম্যানেজমেন্ট নিয়ে – মনরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে রোগী জানতে চাইলেন – আমার এত স্ট্রেস , দূর করব কী করে ? বিশেষজ্ঞ বলেন, সবসময় মনে রাখবেন , আপনি যেমনি স্ট্রেসে আছেন – আপনার থেকে হাজার গুন্ স্ট্রেসে আরো লোক থাকে I
পরের সেশনে রোগীকে বেশ টগবগে দেখাচ্ছিল I ডাক্তার বলেন – আমার ফর্মুলায় কাজ হল তো ? রোগী হেসে বলে, ” হাঁ , ঠিক তাই I তবে আপনি তো থিওরি বলেছিলেন -আমি হাতে কলমে করে থাকি I ডাক্তার বলেন , কি রকম ? রোগী বলেন , আমার বাড়াবাড়ি রকমের স্ট্রেস হলেই আমি কোনো না কোনো মন্দিরে চলে যাই – মন্দিরের সামনে ছাড়া জুটিগুলোকে পা দিয়ে শুধু এদিক ওদিক করে দেই -জোড়া জুতোর একটা খুঁজে বার করার কাছে কোথায় আমার স্ট্রেস !
তৃতীয়টি একটু মোটা দাগের I মর্নিং শিফট ছেলেদের, মেয়েদের ডে কলেজ I মেয়েরা ঢোকার সময় কিছু ছেলে সিঁড়িতে বসে থাকে I ফাস্ট ইয়ারের একটি মেয়ে ঢোকার সময় একটি ছেলে বলে বসে – ” তোমার জুতোটা খুব সুন্দর !” একটুও অপ্রতিভ না হয়ে মেয়েটি হেসে জবাব দেয় , খুলব নাকি ? এবার আরেক সিনিয়রের টিপ্পনি – তোমার স্কার্ট টা আরো সুন্দর !
জুতো নিয়ে আরো কিছু সাংঘাতিক সাংঘাতিক চুটকি আছে, ওপেন ফোরামে সেগুলো লিখলে জনগণ আমায় জুতো পেটা করবে ! গ্রামের যাত্রাপালায় অত্যাচারী দারোগার ভূমিকায় পাঠ করা অভিনেতার সেই জুতোর বাড়ি খাওয়ায় তবু গৌরব আছে ,আমার তো সেটাও রইবে না !
II মধুরেণ সমাপয়েৎ II
এসব গল্প গাছা শেষ হয় রূপকথা দিয়ে I সিনড্রেলার গল্প সবাই জানি I মা মরা মায়ের মেয়ে অপূর্ব সুন্দরী সিনড্রেলা, সৎ মায়ের সংসারে সারাদিন কাজ করে আর দুই সৎ বোন আর মায়ের অত্যাচার সহ্য করে I সেই রাজ্যের রাজকুমার একদিন এক বল পার্টির ঘোষণা করল -আর রাজ্যের সব যুবতী মেয়েকে আসতে বলে সেখানে I বলা হল, সুন্দরী শ্রেষ্ঠাকে বিয়ে করবে রাজকুমার I
সিনড্রেলাকে বাদ দিয়ে, সৎ মা দুই মেয়েকে নিয়ে গেল সেই পার্টিতে I সিনড্রেলার দুঃখে দয়াপরবশ হয়ে পরীর রানী তাকে বর দিলেন আর সুন্দর কাঁচের একজোড়া জুতো পরিয়ে পাঠিয়ে দিলেন রাজসভায় I
নতুন পোশাকে , রূপের ছটায় সিনড্রেলাকে কেউ চিনতে পারে নি Iএদিকে রাজকুমারের তো তাকেই পছন্দ – বল ডান্সের পার্টনার হয়ে গেল সে সিনড্ I কিন্তু পরী রানীর শর্ত ছিল , রাত্রি বারোটার আগে বাড়িতে না ফিরলে ,তার ভাগ্য ফিরবে না I নাচে বিভোর সিনড্রেলার যখন খেয়াল পড়ল , তখন বারোটা বেজে গেছে I ফলে আবার তাকে পড়তে হল সৎমায়ের সংসারে I
কিন্তু রাজকুমারের মনে তো সিনড্রেলা ছাড়া আর কাউকে ধরে নি I খোঁজ খোঁজ খোঁজ I এদিকে হয়েছে কী , তাড়াহুড়ায় আসবার সময় ,কাঁচের জুতোর একপাটি সিনড্রেলা ফেলে এসেছিল রাজবাড়িতে Iঅবশেষে জুতোর মাপ মিলিয়ে, সৎ মায়ের সব চক্রান্ত ব্যর্থ করে রাজকুমার আর সিনড্রেলার বিয়ে সুসম্পন্ন হয় -এন্ড দে লিভড হ্যাপিলি দেয়ারআফটার !
বাকিটা বলি I কলেজ লাইফে প্রেমে পড়ে এই জুতোর ফর্মুলাটাই কাজে লাগিয়েছিল প্রদীপ্ত Iনইলে , বীরেন রায় রোডে কোচিঙে পড়তে আসা তন্নিষ্ঠাকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে সে বের করল কী করে ? স্রেফ জুতোজোড়াকে নজর করে I প্রদীপ্তর ডিটেকটিভ চোখ সমীরণ স্যারের বাড়ি থেকে ঠিক তন্নিষ্ঠাকে স্পট করতে পারে ও এক শুভ দিনে সে প্রেম নিবেদন করেই ফেলে I তন্নিষ্ঠাও রাজি হয়ে যায় , ফলতঃ, দে অলসো, লিভড হ্যাপিলি দেয়ারআফটার !
তবে মন্দজনে বলে ,তন্নিষ্ঠা নাকি শাড়িস বা সালোয়ারের সঙ্গে রং ম্যাচ করে জুতো কিনতে চায়, এটা নিয়ে স্বামী স্ত্রীর মাঝে মাঝে নাকি বচসা হয় I
II টেল এন্ড বা এন্ড টেল II
সূর্যোদয় দেখার কথা I হিল স্টেশনে পাশাপাশি দুটি ঘর I সফরসঙ্গিনীকে তাড়া লাগানো হল I সাজুগুজু করে বেরিয়ে এসেই তার ঝাড় – তুই এতো তাড়াতাড়ি রেডি হলি কী করে ? তোকে তো বরাবর ফিতে ছাড়া জুতো পড়তে দেখি !রাত্রে শোবার আগে নিশ্চয়ই ফিতে বেঁধে রেখেছিলি , সকালে টুক করে পা গলিয়ে হাজির হয়েছিস !
মেয়েরা সবকিছু কেন এত চট করে বুঝে যায় !
—oooXXooo—
![]()







