জঙ্গল ঘেরা রাজ বাড়ীতে ভূতের তান্ডব
বাসুদেব দাশ
রবিবার সন্ধ্যাবেলা হাবু বাড়ী থেকে বের হয়ে গবুদের বাড়ী যায় গবুকে ডাকতে। হাবু আর গবু হাঁটতে হাঁটতে তারা শঙ্কর দত্তের বাড়ী এসে কলিং বেল বাজায়। তারা শঙ্কর সন্ধ্যরতি করছিল। তারা শঙ্করের স্ত্রী মধুবালা এসে দরজা খুলে দেখে হাবু আর গবু দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। মধুবালা… আপনারা ভিতরে এসে বসুন। আপনাদের দাদা সন্ধ্যা দিচ্ছে। এক্ষুনি এসে পড়বে। হাবু… ঠিক আছে বৌদি। হাবু আর গবু ভিতরে ঢুকে সোফায় হেলান দিয়ে আরাম করে বসে। একটু বাদে তারা শঙ্কর এসে ইজি চেয়ারে বসে। মধুবালা তিন কাপ চা নিয়ে আসে। চা খেতে খেতে মুড়ি মেখে দিয়ে যায়। মুড়ি মাখা খেয়ে তারা শঙ্কর একটা বিড়ি ধরায়। আরাম করে বিড়িটা সেবন করে তারা শঙ্কর বলে আজ তোদের একটা রাজ বাড়ীর ভূতের গল্প বলবো। হাবু… হ্যাঁ তারা দা একদম জমিয়ে ভূতের গল্প বলো যাতে ভয়ে কাঁপুনি এসে যায়। তারা শঙ্কর শোন তাহলে…..
আজকাল খবরের কাগজ খুললেই চোখে পড়ে খুন আর ধর্ষণের খবর । রাজনৈতিক প্রভাব থাকায় সব অপরাধ থেকে বেকসুর খালাস পেয়ে যায় অপরাধীরা । তার ফলে এই ধরণের অপরাধ দিনের পর দিন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। সমাজটাকে অবক্ষয়ের চরম পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে রাজনৈতিক অন্ধতা । অপঘাতে মৃত্যু যত বাড়ছে অপদেবতার সংখ্যাও তত বাড়ছে। ডাকিনী-যোগিনীর মতো এই সব অপদেবতারা সমাজটাকে অস্থির করে তুলছে তাদের ভোগ লালসা মিটাতে গিয়ে। তাদের লেলিহান জিওভা সাধারণ মানুষের রক্ত চুষে হাড় হিম করে ছাড়ছে। এই সব অপদেবতা রুপি ভূতেদের একটা নিরাপদ আশ্রয়স্থল হচ্ছে পরান ডাঙ্গা জঙ্গলের রাজ বাড়ী। নকুর আর বকুর অনেক দিন ধরেই শুনে আসছে যে জঙ্গলে ঘেরা পরান ডাঙ্গা রাজ বাড়ীতে ভূতের তান্ডব চলছে। ওদের চার পুরুষ আগের বাড়ী আছে ঐ পরান ডাঙ্গা গ্রামে। ওদের ঠাকুরদা-র বাবা তৈরি করেছিল বাড়ীটা। এখন ওদের নিজেদের লোক বলতে কেউ আর থাকে না ঐ বাড়ীতে। দুঃসম্পর্কের এক আত্মীয় দেখাশোনা করে বাড়ীটা। বাবার পিসতত ভাইয়ের মাসতত দাদার শালার ছেলে “ভুতো “। ভুতো বেশি দূর পড়াশোনা করেনি। গ্রামের পাঠশালায় ক্লাস ফোর পাশ করে পড়াশুনা ছেড়ে দিয়েছে। সে তার খাওয়া পড়ার ব্যবস্থা করতে পারেনি। দিনের বেলা চাষের জমিতে টুকটাক নিরানীর কাজ করে। হাবরে গরু পড়লে সেই গরু তুলে দিয়ে সামান্য কিছু রোজগার করে। আর এই বাড়ীটা দেখাশোনা করে। ওদের এই পৈতৃক বাড়ীটা রাজ বাড়ী থেকে এক কিলোমিটার দূরে । শোনা যায় ভূতের আচ এখানেও পড়েছে । ওরা হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠে সারা রাত জার্নির পর ভোর বেলা হাবিব পুর স্টেশনে এসে নামে। সেখান থেকে দশ মিনিট পায়ে হেঁটে খেয়া ঘাটে এসে পৌঁছায় । নৌকায় করে বিরাম নদী পার হয়ে তবে পরান ডাঙ্গা গ্রামে যেতে হয় । লাইন দিয়ে নৌকায় উঠে বিরাম নদী পার হতে আধ ঘন্টা সময় লেগে যায় । মাঝি হামিদ মিয়া তার ছেলে ওসমানকে দেয় ওদের রাস্তা চিনিয়ে নিয়ে যাবার জন্য। বড় কর্তার ছেলে বলে হামিদ মিয়া ওদের একটু বাড়তি খাতির দেখায়। ওরা সেই এসেছিল বাইশ বছর আগে। এতো দিনে আমূল পরিবর্তন হয়ে গেছে গ্রামটার। তাই ওদের পক্ষে চিনে যাওয়া সম্ভব হবে না বলেই হামিদ মিয়ার মনে হয়েছে । রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও দ্রুত পাল্টে দিয়েছে গ্রামের পরিবেশকে । রাস্তা ঘাট দোকান পাট সব ঝাঁ চকচকে হয়েছে। বড় বড় বাড়ী ঘর হয়েছে অনেক। তবে সর্বত্রই গ্রামের পরিবেশের অবনতি ঘটেছে। কেমন একটা থম থমে ভাব সব সময়। মানুষ ভয়ে ভয়ে পথে হাঁটা চলা করে। সব গ্রামের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরান ডাঙ্গা গ্রামেরও অধোপতন ঘটেছে। গ্রামের পঞ্চায়েতের সদস্যরা গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে ব্যথিব্যস্ত করে তুলেছে। তাদের বাকশক্তি কেড়ে নিয়েছে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে বেদম মার মারে। বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। ওদের অন্যায়ের কথা বলে শেষ করা যাবে না। গ্রামের পথ দিয়ে নকুর হাঁটতে হাঁটতে আবেগে শৈশবে ফিরে যায়। তার স্মৃতির ক্যানভাসে একটু একটু করে ভেসে ওঠে শৈশবের ঠাকুরদাঁড় কাছে শোনা অনেক ঘটনা। যেগুলো তার স্মৃতি পটে চিত্রায়িত হয়ে আছে মঝাদার স্মৃতি হিসাবে।সে অনেক চিত্র। তার মধ্যে একটা অন্যতম হলো সেই সময় গ্রীষ্ম কালে ব্যাঙের বিয়ে দেওয়ার বিষয়টা। বৃষ্টি নামাবার জন্য তখন গ্রামের চাষিরা ব্যাঙের বিয়ে দিত । সেই সময় গ্রামে চাষবাসের কাজ পুরোটাই নির্ভর করতো বৃষ্টির জলের উপর। চাষীদের ধারণা ছিল ব্যাঙের বিয়ে দিলে বৃষ্টি হবে। এটাই তারা বাংশো পরম পরায় শুনে আসছে। তাই রেওয়াজ হয়ে গিয়েছিল ব্যাঙের বিয়ে দেবার। গ্রামের চাষীরা সমবেত হয়ে ব্যাঙের বিয়ে দিতো। তখন বট গাছের পাতায় শ্রীশ্রী দূর্গামাতা সহায় লিখে বা শ্রী শ্রী কালীমাতা সহায় লিখে ইছামতি নদীর জলে ভাসিয়ে দেওয়া হতো । এই রেওয়াজটাও ছিল বৃষ্টি নামাবার জন্য। বকুর হাঠাৎ বলে ওঠে… তোর সেই গরু চুরির গল্পটার কথা মনে আছে ? নকুর… মনে নেই আবার। খুব মনে আছে। তুই একটু বল তো, শুনি। বকুর… তখন গ্রামের প্রায় সব বাড়ীতেই গরু ছিল। আমাদের বাড়ীতে পাঁচটা হালের গুরু ছিল আর দুটো দুধের গরু ছিল। একটা হালের গরু আমাদের ঠাকুরদা বিক্রি করে দিয়েছিল । আমাদের বাড়ীর গরু গুলোকে প্রতি দিন নিয়ম করে সন্ধ্যা বেলা ছানার জল খায়ানো হতো । ওটা এক রকম নেশায় দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। ঠাকুরদার বিক্রি করা গরুটা নিয়ে ওর নতুন মালিক এক দিন আমাদের বাড়ীর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো। গরুটা আমাদের বাড়ীর কাছাকাছি আসতেই ছানার জলের গন্ধ পেয়ে দৌড়ে আমাদের গোয়াল ঘরে ঢুকে যায়। গরুটার পিছন পিছন গুরুর নতুন মালিকও গোয়াল ঘরে ঢুকে আসে। আমাদের ঠাকুরদারা ভেবেছিল গোয়াল ঘরে চোর ঢুকেছে। ওমনি ঠাকুরদারা লোকটাকে ধরে উত্তম মাধ্যম দেয়। পরে আলো আনলে দেখা যায় যে ওনি তো চোর না গরুর নতুন মালিক। তারপর ক্ষমা চেয়ে নেওয়া হয়েছিল । এই সব কথা বলতে বলতে ওরা অনেকটা পথ হেঁটে আসে।
নকুর….. “ভাই তুমি কি রাজ বাড়ী চেনো ?”
ওসমান…. ” চিনি কিন্তু ঐ বাড়ীর নাম তো কেউ করে না।”
বকুর…. “কিন্তু কেন নাম করে না ? ” ওসমান…” ও বাবাঃ আপনারা জানেন না ? ” কিছু শোনেন নি ? নকুর…”.না তো! কি শুনবো ? আসলে আমরা তো বাইশ বছর পরে এলাম এই গ্রামে।” ওসমান..” এর মধ্যে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে।” তারপর আর কিছু বলে না ওসমান, চুপ করে থাকে । আমতা আমতা করে । বকুর… ” “তারপর কি ? গঙ্গা দিয়ে জল বয়ে গেছে মানে কি ? ” ওসমান… ” আসলে এই গ্রাম থেকে আর আশেপাশের গ্রাম থাকে বেশ কিছু দিন ধরে লোক হারিয়ে যেতে থাকে । তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না আর তাদের দেহের সন্ধানও পাওয়া যায় না। সবাই বলা বলি করে কিছু একটা ভৌতিক কান্ড হবে। আর এই বিষয়ে ঐ রাজ বাড়ীর একটা বদনামও আছে বটে । অনেকেরই ধারণা বহু দিন যাবৎ ঐ রাজ বাড়ীতে ভূতের তান্ডব চলছে। তা তোমাদের ঐ বাড়ীর এত খোঁজ খবরের কি আছে ?” নকুর… ” কয়েক দিন আগে কর্ম ক্ষেত্র নামে একটা পত্রিকায় চাকরির বিজ্ঞাপন দেখেছিলাম। তাই জানতে চাইছি। ” ওসমান…” চাকরির খবরে তোমার কি ? ” নকুর..”.আমার কিছু না। ” ওসমান… তুমি কি চাকরির খোঁজ করছো নাকি ? ” নকুর… হ্যাঁ করছি তো ? ” ওসমান… তবে এই রাজ বাড়ীর চাকরি নিতে যেও না যেন। ? “
কথা বলতে বলতে ওরা পরান ডাঙ্গা গ্রামের বাড়ীর সামনে চলে আসে। ওসমান ওদের বাড়ী দেখিয়ে দিয়ে চলে যায়।
ভুতো বেরিয়ে এসে ওদের ঘরে নিয়ে বসায়। আগে থেকেই ভুতো ঘর গুলো সব পরিষ্কার করে গোছগাছ করে রেখেছে। ওদের বসতে বলে ভুতো কলতলায় গিয়ে দু বালতি জল ভরে রাখে ওদের হাত পা ধোঁয়ার জন্য। টিউবওয়েলটা থেকে এখন আর ভাল জল উঠে না। ভুতো…” দাদা বাবু আপনারা কলতলায় গিয়ে মুখ,হাত,পা ধুঁয়ে আসুন। আমি আপনাদের খাবারের ব্যবস্থা করি। সেই গতকাল খেয়ে বেরিয়েছেন খিদে পেয়ে গেছে এতক্ষনে। আমি দেশি মুরগির ঝোল আর গরম গরম ভাতের ব্যবস্থা করছি। খেয়ে একটু বিশ্রাম নেবেন। ” বকুর… “বাহ্ বেশ ভালো ব্যবস্থা তো ! সেই কত কাল আগে এক দিন দেশি মুরগি খেয়েছিলাম। আজ আবার খাবো। খুব আনন্দ হচ্ছে আমার। “
নকুর আর বকুর পোষাক চেঞ্জ করে কলতলা যায় মুখ হাত পা ধুতে। তার মধ্যে ভুতো মুরগি কেটে ছাল ছাড়িয়ে রান্না বসিয়ে দিয়েছে। মাংসটা হয়ে গেলেই ভাত বসিয়ে দেবে। চাল ধুঁয়ে গামলায় রেখে দিয়েছে। তারপর গরম গরম ভাত আর মাংস খেতে দেবে দাদা বাবুদের । রান্না হয়ে গেলে দেশি মুরগির ঝোল দিয়ে গরম ভাত বেশ তৃপ্তি করে খায় নকুর আর বকুর। খাওয়া হয়ে গেলে হাত মুখ ধুঁয়ে বিছানায় শুয়ে কিছুক্ষণ গড়িয়ে নেয় শরীরটা।
নকুর,…. “হ্যাঁরে ভুতো রাজবাড়ীতে না কি লোক নেবে ? তা তুই কি কিছু জানিস সে বিষয়ে ? ” ভুতো… লোক নেবে বলতে চাকরির কথা বলছো তুমি ? নকুর..”. হ্যাঁ। ” ভুতো..”.চাকরির খবর দিয়ে তুমি কি করবে ? তুমি কি রাজ বাড়ীতে চাকরি করতে যাবে ? “
নকুর,…. আমি তো চাকরির খোঁজ নিতেই এখানে এসেছি। ভুতো… “খবরদাঁড় ও ভুলটি এক বারের জন্যও করো না। ” নকুর…” কেনো
? কিসের ভয় ? ভুতো… ” জানি না। তবে কেউ যায় না ঐ বাড়ীতে। শোনা যায় ঐ বাড়ীতে যে যায় সে আর ফিরে আসতে পারে না। শোনা যায় কয়েক জন গিয়ে আর ফিরে আসেনি। তাদের কোন হদিসও পাওয়া যায় নি। ” প্রহর শেষের দিনের হাল্কা আলোতে ওরা হাঁটতে হাঁটতে রাজ বাড়ীর দিকে যেতে থাকে। ওরা যখন রজি বাড়ীর জঙ্গলের কাছে পৌঁছায় তখন সূর্যো দেব পাটে চলে যায় যায় অবস্থা। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে গাঢ় অন্ধকার নেমে আসে গ্রামের পথে ঘাটে। অন্ধকারের ঘনত্ব শহরের থেকে গ্রামে একটু বেশি হয়। এখানে রাতও হয় তাড়াতাড়ি। ওরা বনের ভিতরে ঢুকবো ঢুকবো করছে এমন সময় হঠাৎ শিয়াল ডেকে ওঠে। শিয়াল ডেকে ওঠায় ওরা ভয় পেয়ে যায়। নির্জন পথে শিয়ালের ডাক ভীষণ বিভীষিকাময় লাগে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর তার মধ্যে শিয়ালের ডাক শুনে ওদের হৃৎপিণ্ড কেঁপে ওঠে। শহরের লোকের কাছে এই পরিবেশ ভীষণ ভাবে অপ্রত্যাশিত। ওরা বাড়ী ফিরে আসে।
এই রাজ বাড়ীর যারা উত্তরাধিকারী তাদের মধ্যে কেউ আর এখন এই বাড়ীতে থাকে না। কলকাতা শহরের বিডন স্ট্রিটে কয়েক জন থাকে আর কেউ কেউ আবার বিদেশে থাকে। সব উত্তরাধিকারী মিলে ঠিক করেছে এই বাড়ীটার ঝোপ জঙ্গল পরিষ্কার করে নবিকরণ করে পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হবে। তাতে যেমন বাড়ীটার রক্ষনা বেক্ষণ হবে তেমনি কিছু রোজগারের ব্যবস্থাও হবে। তার জন্য এক জন কর্মচারী নিয়োগ করতে হবে যে এই কাজ গুলো দেখাশোনা করবে। হিসাব পত্তর ঠিকঠাক ভাবে রাখবে। তার জন্যই কর্ম ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। ইন্টারভিউ বিডন স্ট্রিটের বাড়ীতেই হবে। নকুর এখানে এসেছে বাড়ীটা দেখে যেতে। বাড়ীটা সম্মন্ধে অনেক রকম গল্প বাজারে চালু আছে। সেই গুলো কতটা সত্য আর কতটা অসত্যা সেটা জাজ করাই ওর উদ্দেশ্য। সেই বুঝে ও চাকরিতে জয়েন করার কথা ভাববে। ফিরে এসে দেখে ভুতো ওদের জন্য মোটরশুটি শসা পিয়াজ কেটে মুড়ি মাখিয়েছে। আর চায়ের জন্য জল গরম করতে বসিয়েছে। ওরা কলতলায় গিয়ে হাত পা ধুঁয়ে এসে মুড়ি খেতে বসে যায়। এর মধ্যে ভুতো গরম চা নিয়ে আসে। একদম জমিয়ে আড্ডা চলছে খাওয়ার সাথে সাথে। সেই অনেক দিন পরে গ্রামের আমেজ উপভোগ করা। নিকষ কালো অন্ধকারের দিকে তাকালে মনে হয় যেন কোন ছায়া মূর্তি ঘুরে ঘুরে জাল বিচ্ছোছে চারি দিকে শিকার ধরার জন্য। একটা গা ছম ছমে ভাব। ভুতো বলে রেখেছে যে রাতে যেন বাইরে বেরোনো না হয়। নিশি ডাকের ভয়ও আছে। পাড়া গায়ের ঝোপ ঝাড়ের মধ্যে থেকে কখন কি বেরিয়ে এসে আক্রমণ করবে তার ঠিক নেই। ওরা কিছুক্ষণ গল্প গুজপ করে রাতের খাওয়া খেয়ে শুয়ে পরে। টয়লেট ঘরের বাইরে। এটা একটা অসুবিধার বিষয় গ্রামে। রাতে যাতে টয়লেটে যেতে না হয় তার জন্য জল কম করে খাওয়ার পরমর্শ দিয়েছে ভুতো। চারি দিক সুনসান নিস্তব্ধ। রাত যত বাড়ে রাতের নিস্তব্ধতাও তত বাড়ে। মাঝে মাঝে কুকুরের তারস্বরে চিৎকার গভীর রাতের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে খান খান করে দেয়। তবে মনের মধ্যে একটা ভয় মিশ্রিত উচ্ছাস আছে। তাড়াতাড়ি করে শুয়ে পড়েছে তাই রাত কাটতে চায় না। নতুন জায়গায় ঘুম ভালো হয় না। শেষ রাতের দিকে ঘুম ভেঙে যায় কিন্তু উঠে বাইরে বের হতে পাড়া যাচ্ছিল না তাই বিছানায় শুয়ে গড়াগড়ি করতে থাকে। ভোর রাতে মোরগের ডাকে আরমোরা ভেঙে উঠে পরে দুজনেই। চা জল খাবার খেয়ে প্ল্যান করতে থাকে আজ কিভাবে ঢুকবে রাজ বাড়ী দর্শন করতে। ঠিক হয় তাড়াতাড়ি করে স্নান করে দুপুরের খাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়বে । এখন প্রশ্ন হলো কোন পথ দিয়ে গেলে রাজবাড়ী পৌঁছাতে পারবে ওরা। স্থানীয় লোকদের যাকেই রাজবাড়ীর কথা জিজ্ঞেস করা হয় সেই রাস্তা দেখিয়ে দেয় ঠিকই কিন্তু রাজ বাড়ী সম্মন্ধে এমন সব কথা বলে যে মনে ভয় ধরিয়ে দেয়। কেউ কেউ সাবধান করে বলে… “আপনাদের কি মরার শখ হয়েছে যে ঐ বাড়ীতে যাবেন ? ভালো চান তো বাড়ী ফিরে যান । ” নকুর…. “কেন কি আছে ঐ বাড়ীতে যে যাওয়া যাবে না ? ” জনৈক লোক… ” কি আছে সেটা গেলেই বুঝতে পারবেন ? আমি তার নাম বলতে পারবো না।” বকুর…. ” কি করবি ? সবাই তো একই রকম বলছে। ” নকুর… ঠিকই, কিন্তু এসেছি যখন তখন দেখেই যাবো। ” ওরা হাঁটতে হাঁটতে একটা জঙ্গলের কাছে গিয়ে পৌঁছায়। শুনেছে যে এই জঙ্গলের মধ্যেই রাজবাড়ী আছে। চারি দিকে এত গাছ পালা ঝোপ ঝড় তার মধ্যে দিয়ে বাড়ীর কোন চিহ্নই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। আর একটু এগোতেই কোন অল্প বয়সি এক মহিলা কণ্ঠের হাসি শুনতে পায় ওরা। খিল খিল করে হাসছে। সামনের দিক থেকেই যে হাসিটা আসছে সেটা ওরা পরিষ্কার বুঝতে পারে । কিন্তু সামনে পিছনে কারোকে দেখতে পায় না। হঠাৎ যেন গা ঠান্ডা হয়ে আসে ওদের । বুকের মধ্যে দুরুদুরু করে কাঁপতে থাকে । হাত পা কাঠের মত শক্ত হয়ে যায়। আরও একটু এগিয়ে যাবার পর ওরা একটা তিন তলা পোড়ো বাড়ী দেখতে পায়। প্রায় তিন বিঘা জমির উপর বাড়ীটা তৈরি হয়েছে বলে মনে হয় ওদের । গাছ পালায় ঘিরে ধরেছে বাড়ীটা। বাড়ীর কার্নিসে, ছাদে বড় বড় গাছ হয়েছে তার শিকড় সারা বাড়ীর দেওয়ালে ছড়িয়ে পড়েছে। খোলা জানলা দিয়ে অনেক গাছ ঘরের ভিতরে প্রবেশ করেছে। পুরো বাড়ীর দেওয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে। কোথায়ও কোথায়ও ইট খুলে পড়ে গেছে দেওয়াল থেকে। কার্নিশ ভেঙে পড়ে গেছে। দরজা জানলা সব ভেঙে চোরেরা নিয়ে গেছে। নোংরা আবর্জনায় ভরে গেছে দালানটা। প্রায় ভগ্ন স্তুপে পরিণত হয়েছে। বহু দিন ব্যবহার না হওয়ায় এই অবস্থা হয়েছে। ভয়ঙ্কর পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। সেই হাসিটা আর শুনতে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথায় মিলিয়ে গেছে। কিছুটা ভিতরে ঢোকার পরে নুপুরের ছন্দের আওয়াজ কানে আসে ওদের । যেন কোন নর্তুকী পায়ে ঘুঙুর পড়ে রাজ বাড়ীর নাচ মহলে নাচ করছে। এই আওয়াজ শুনে ওরা চমকে ওঠে। গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে ওদের। ভয়ে হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে । ভালো করে চারি দিকে তাকিয়ে দেখে কেউ কোত্থাও নেই। এই হাসিই বা কে হাসলো আর নুপুরের আওয়াজই বা কে করলো ভগবান জানেন। এতো অদ্ভুত সব ঘটনা যে এগুলোকে ভৌতিক কান্ড ছাড়া আর কিছু বলা যায় না । নকুর… “জানি না এরপর কি দেখবো ? ” জঙ্গল এতো গভীর যে সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারে না। এমন নিকষ কালো অন্ধকার যে এখন দিন না রাত বোঝার উপায় নেই। মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইটে পথ দেখে ওদের এগুতে হচ্ছে। বকুর… “চল আজ ফিরে যাই কাল আবার চেষ্টা করবো।” নকুর… “ঠিক আছে চল, চলে যাই। ” জঙ্গল থেকে বের হয়ে হাপ ছেড়ে বাঁচে ওরা । বাড়ী পৌঁছে হাত পা মুখ ভালো করে ঘষে ঘষে ধোঁয়। সাবান মেখে স্নান করে। তারপর ঘরে ঢোকে। ঐ নোংরা পরিবেশ থেকে এসে স্নান না করলে গা ঘিন ঘিন করতো। এরপর ঘরে বসে চা মুড়ি আর ফুল কপির চপ খায় সবাই মিলে। রাতে খিচুড়ি আর ডিম ভাজা করবে ভুতো। দিনের বেলা যা সব ভুতুড়ে কান্ড কারখানার সম্মুখীন হতে হয়েছে তাতে করে রাতে আর ঘুম ভালো হয় নি ওদের। থেকে থেকে হুড়মুড় করে লাফিয়ে উঠে বসেছে। বার বার মনে হয়েছে এই বুঝি কেউ হেসে উঠলো এই বুঝি কেউ কেঁদে উঠলো। নানা অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে মনের মধ্যে। এই সব অদ্ভুতুরে কান্ড কারখানা সইয়ে নিতে দু দিন বিশ্রাম দরকার। দু দিন বাদে আবার রাজবাড়ীতে যাওয়া ঠিক করতে হলো ওদের। দু দিন রেস্ট নিয়ে শারীরিক ধকল কাটিয়ে,মানসিক শক্তি বাড়িয়ে ওরা এডভেঞ্চারের লাস্ট দিনের জন্য বেরিয়ে পড়ে। জঙ্গল ঠেঙিয়ে ভিতরে ঢুকতেই সেই জমাট বাঁধা অন্ধকার ঘিরে ধরে ওদের। কিছুটা এগোতেই ভোমরা দুর্গন্ধে নাক জ্বালা করে ওঠে, শরীরটা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে । পঁচা গন্ধ রাজ বাড়ীর পিছন দিক থেকে ভারী হাওয়ায় ভেসে আসছে বলেই মনে হচ্ছে। বাড়ীর একটু ভিতরে ঢুকতেই কতগুলো বাদুড় আর চামচিকে পাখা ঝাপটাতে ঝাপটাতে উড়ে যায়। মোবাইলের টর্চের আলোতে পরিষ্কার দেখা যায় নি সংখ্যায় ওরা কতগুলো ছিল। বাড়ীর চিলে কোঠায় আলো পড়তেই চোখে পড়ে একটা প্যাঁচা শিকার ধরে নিয়ে বসে আছে। পায়ের ধারালো নখ দিয়ে একটা বিষাক্ত সাপকে চেপে ধরে রেখে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে। এই সব দেখে ওদের গোটা শরীর শিউরে ওঠে। একটা দমকা শীতল বাতাস শরীরটাকে হিম করে দিয়ে বেরিয়ে যায়। বকুর…. “নকুর চল বেরিয়ে যাই। আর ভিতরে ঢুকতে আমার ভয় করছে। সামনে কি বিপদ অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্য জানি না। শেষে বেঘোরে প্রাণটা চলে গেলে এসবের কোন মূল্য থাকবে না।” নকুর… “এতোটা যখন এসে পড়েছি তখন বাকি টুকু দেখেই যাবো। ” এমন সময় এক জন মেয়ে মানুষের কান্না ওরা শুনতে পায়। ওরা বুঝতে পারে না যে কান্নার শব্দটা কোথা থেকে আসছে। মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইট দিয়ে সারা বাড়ীটা তন্ন তন্ন করে খুঁজে কোন মেয়ে মানুষের সন্ধান পায় না। আর একটু ভিতরে ঢুকতে গিয়ে এক কাটুরিয়ার সাথে ওদের দেখা হয়। কাঠোরিয়া ভয়ে চিৎকার করে ওদের ডাকতে থাকে। ওরা বুঝে পায় না এই গভীর জঙ্গলে কাঠোরিয়া এলো কোন সাহসে। কাঠোরিয়া বলে…. “বাবু সাহেব সামনে একটা কুঁয়ো আছে আর তার মধ্যে দুটো তিনটে মানুষের লাশ পড়ে আছে। ” ওরা এগিয়ে গিয়ে দেখে হ্যাঁ লাশই তো!! লাশ গুলিতে পচন ধরেছে। ভয়ে আতঙ্কে ওদের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে । জিভ মোটা হয়ে গেছে। শিরদাঁড়া দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে যেতে থাকে । এই লাশ গুলো থেকেই হয়তো দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। তবে লাশ গুলোর সব কটাই খুব বেশি দিন আগের না বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু এই লাশ গুলো এখানে এলো কোথা থেকে ? সেটাই তো একটা বড় প্রশ্ন। আর কে বা কারা এনে ফেলেছে ? পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ এসে লাশ গুলোকে উদ্ধার করে বাইরে নিয়ে আসে। কুঁয়োর ভিতর অনেক গুলো লাশ পরে থেকে পঁচে গলে হাড় থেকে মাংস ছেড়ে গেছে। সব শুদ্ধ প্রায় গোটা সাত আটেক হবে। পুলিশ গ্রামের লোকদের ডেকে লাশ গুলো সনাক্ত করতে বলে। উপরের তিনটে লাশ গ্রামের মানুষ সনাক্ত করতে পারে। কিন্তু বাকি গুলো সনাক্ত করার মতো অবস্থায় নেই। এরপর পুলিশ গ্রামের নিখোঁজ লোকদের একটা তালিকা তৈরি করে। কুঁয়োর মধ্যে ডেড বডি এবং হাড়গোড় মিলিয়ে গুনতিতে যে কটা পাওয়া গেছে নিখোঁজ লোকের সংখ্যাও ততটাই হচ্ছে। এর থেকে প্রমান হয়ে যায় যে কোন অশরীরি শক্তি এই কাজ করেছে। রাজ বাড়ীতে যে ভূতের তান্ডবের কথা শোনা যায় সেটা তাহলে সত্য। সনাক্তকারীদের মধ্যে গ্রামের হারু কাকা নামে এক জন বলে… “আমার ছোট বেলায় শোনা একটা ঘটনা আজ এখানে বলা দরকার। পরান ডাঙ্গা গ্রামের শেষ রাজা বাবু ছিলেন খুব নারী আসক্ত মানুষ। এক দিন গ্রামের একটা সুন্দরী মেয়ে পুকুর ঘাট থেকে স্নান করে কলসিতে করে জল নিয়ে বাড়ী ফিরছিল। রাস্তায় রাজা বাবুর সঙ্গে সামনাসামনি দেখা হয়ে যায় তার।রাজা বাবু ঐ মেয়েটিকে দেখে লোভ সামলাতে না পেরে বল পূর্বক তুলে নিয়ে আসে ওনার কুঠি বাড়ীতে । দু দিন আটকে রেখে মেয়েটির উপর পাশবিক অত্যাচার চালায় । মেয়েটি ঐ নোংরামি সহ্য করতে না পেরে ঐ কুঠি বাড়ীতেই আত্মহত্যা করে। রাজা বাবু অপরাধ চাপা দেবার জন্য মেয়েটিকে রাজ বাড়ীর পিছন দিকে খবর দিয়ে দেয়। শোনা যায় এরপর থেকে ঐ মেয়েটির প্রেতাত্মা এই বাড়ীতে ঘুরে বেড়ায় আর সুযোগ পেলেই মানুষকে মেরে ঐ পরিত্যাক্ত কুঁয়োর মধ্যে ফেলে রাখে। এই কুঁয়োটা রাজাদের আমল থেকেই অব্যবহারিত অবস্থায় পড়ে আছে ।
ওরা এরপর রাজ বাড়ীর ঘর গুলো সব ঘুরে দেখার জন্য ঢোকে। একটা ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে এক ঝাক বুনো কবুতর পাখা ঝটপট করতে করতে উড়ে যায়। তাতে প্রচুর ধুলো বালি উড়ে এসে ওদের গায়ের উপর পড়ে। মাথা ভর্তি হয়ে যায়। ধুলোবালি ঝেড়ে সোজাসুজি তাকাতে দেখে পুব দিকের একটা ঘর থেকে একটা আলোর শিখা আসছে ওদের দিকে। ওরা ভয়ে কিছুটা পিছিয়ে যায়। সারা শরীর আরস্ট হয়ে আসে । চক্কু স্থির হয়ে যায়। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আলোটার দিকে। কিছুক্ষণ পর আলোটা নিভে যায়। ওরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বাঁচে। কয়েকটা ঘর বন্ধ করে রাখা আছে। সেই ঘর গুলোতে খাট বিছানা পত্র, ফার্নিচার সব ভেঙে চুরে ময়লা হয়ে পড়ে আছে। ঘর গুলোর মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ প্রচন্ড বেগে হাওয়া উঠছে আবার নানা রকম শব্দ হচ্ছে। ঐ গুলো অলৌক না বাস্তব সেটা বোঝা মুশকিল হয়ে পড়ে ওদের পক্ষে । ওরা রাজ বাড়ী থেকে বের হতে যাবে এমন সময় কয়েকটা কালো ছায়া মূর্তি ওদের ঘিরে ধরে। মুখ গুলো বীভৎস। সরু সরু হাত পায়ের নখ গুলো বিরাট বিরাট লম্বা। চোখ গুলো কোঠোরে ঢুকে গেছে। এই সব দেখে ওদের আত্মারাম খাঁচা হয়ে গেছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায় । কণ্ঠ দিয়ে স্বর বের হয় না। হাঁঠু থর থর করে কাঁপছে। কি ভাবে পালিয়ে আসবে তা বুঝতে পারে না। নকুর তখন বুদ্ধি করে দেশেলাই বের করে একটা কাঠি জ্বালিয়ে দেয়। ওমনি ভূত গুলো অদৃশ্য হয়ে যায়। ভূতেরা আগুনকে খুব ভয় পায়। ওরা প্রাণ হাতে করে পালিয়ে আসে। নকুর চাকরির আশা ছেড়ে দিয়ে কলকাতায় ফিরে আসে।
—oooXXooo—
![]()






