একটি প্রেমের গল্প
রতন চক্রবর্ত্তী
“””””‘””” ‘””””””””
প্রকৃতির নিয়মে যৌবন কালে মানুষের মন ক্ষেত্রে যেমন ঈশ্বরের দান করা প্রেমের বীজ অংকুরিত হয়ে ওঠে ঠিক তেমনি এক সময় , বছর পচিশের একটি ছেলে দেবদাস মজুমদারের সাথে বছর আঠারো একটি মেয়ে নৃত্যশিল্পী দেবিকা দাসের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে | সেই সুবাদে তারা দীর্ঘ দিন একসাথে মেলামেশা করবার পর একদিন দুজনেই তাদের বাবা মায়ের কাছে বিষয়টা মুখ ফুটে বললে তাদের বাবা মায়েরা আধুনিক যুগে ঘরে ঘরে এমনটা হয়েই থাকে চিন্তা করে কোনরূপ রাগ , অভিমান বা সন্তানদের প্রতি শাসনের পথে না গিয়ে উভয়ে উভয়ের পরিবারের অভিবাবকদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সন্তানদের বিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নেন | এবং পরবর্তী কালে মাঘের এক শুভ দিন দেখে সাধ্য অনুসারে বিবাহ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবদাস ও দেবিকার দুই হাত তারা এক করে দেন |
নিয়ম অনুসারে তারপর দেবদাস ও দেবিকা দ্বিরাগমন থেকে ফিরে এসে দু দিন বাদেই দিন তিনেকের জন্য হানিমুনে বেরিয়ে পড়লো দার্জিলিয়ের উদ্দেশ্যে | তারপর ঈশ্বর সৃষ্ট প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভরপুর দার্জিলিঙে তিনদিন উল্লাসে কাটিয়ে চথুর্ত দিন বাড়িতে এসে সংসার চক্রের ধারায় ধীরে ধীরে যে যার মতো নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো | দেবদাস সকাল নয়টা বাজলেই অফিসে বেরিয়ে পড়তো | দেবিকা শ্বাশুড়ির সাথে সংসারের নানা কাজে সহযোগিতা করে যতটুকু সময় পেতো তারই ফাঁকে ফাঁকে বাড়িতে নিজের নাচের প্র্যাটটিস করে নিতো | আবার বিকেল পাঁচটা বাচঁলেই নাচের স্কুলে গিয়েও নাচের ক্লাস করে প্রায় সন্ধ্যা সাতটার নাগাদ বাড়ি ফিরত | এদিকে দেবদাসও প্রায় প্রতি সপ্তাহের রবিবারের ছুটির দিনগুলোতে স্ত্রী দেবিকাকে নিয়ে কোথাও না কোথাও ঘুরতে যেত | এমত অবস্থায় বেশ আনন্দ উল্লাস খুশিতেই তাদের দাম্পত্য জীবন কাটছিলো |
অবশেষে বছর দুই কাটলে তাদের ঘরে এক কন্যা সন্তান জন্ম নিলো | এই কন্যা সন্তান জন্ম নেবার জন্য পরিবারে কারো কোন ক্ষোভ ছিল না | বরং পরিবারে নাতনি হিসাবে প্রথম কেউ আসায় দেবদাসের বাবা মা যথেষ্ট আনন্দিতই হয়ে ছিলেন | তারা আদরে যতনে নাতনিকে বড়ো করে তুলতে থাকলেন | কিন্তু দুঃখের বিষয় , তাদের নাতনির যখন বছর ছয়েক তখন সংসারে নেমে এল এক অশান্তির ছায়া ! দীপিকা চাইলো সে একটি নাচের স্কুল চালু করে সেখানে ছাত্র ছাত্রী সংগ্রহ করে তাদেরকে নাচ শেখাবে | কিন্তু দেবদাস তৎক্ষণাৎ সেই প্রস্তাবে সায় না দিয়ে কিছু দিন দীপিকাকে অপেক্ষা করতে বললো | কিন্তু দীপিকার তর সইছিলো না | তাই সে নিজের উদ্যোগেই মাস দুইয়েকের মধ্যে শ্বশুর বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে তার নিজের মায়ের অর্থের আনুকূল্যে একটি ঘর ভাড়া করে নাচের স্কুল চালু করে দিলো | অবশেষে দীপিকার স্মামী শ্বশুর , শ্বাশুড়ি সব জানতে পারলেও নিজেদের চিন্তাভাবনার পরিবর্তন ঘটিয়ে দীপিকার ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিয়ে যতটা সম্ভব সহযোগিতা করতে থাকলেন | এখন দীপিকা প্রতিদিন বিকেল পাঁচটায় বের হয়ে বাড়িতে আসে কখনো রাত নয়টায় , কখনো রাত দশটায় | বাড়ির অভিবাবকের প্রথম প্রথম খুব একটা কিছু না বললেও মাস কয়েক বাদে দীপিকাকে বর্তমান দিনকালের অবস্থা বুঝে একটু তাড়াতাড়ি করে ঘরে ফেরার পরামর্শ দেন | কিন্তু দীপিকা সেই পরামর্শকে অগ্রাহ্য করে চলতেই থাকে | তাই একসময় তিক্ততা বৃদ্ধি হতে হতে এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে , দীপিকা একদিন শ্বশুর বাড়ির কাউকে কিছু না জানিয়ে বাপের বাড়ি গিয়ে আশ্রয় নেয় | প্রথমটায় দীপিকার স্মামী দেবদাস এবং তার বাবা মায়েরা মনে করে ছিলেন , রাগ অভিমানে বাপের বাড়ি গেলেও দুদিন বাদে রাগ কমে গেলে নিশ্চই বাড়ি ফিরে আসবে | কিন্তু না , দীপিকা আর ফিরে আসলো না | জেদাজেদি করে সে তার বাপের বাড়িতেই রয়ে গেলো | তখন দীপিকার শ্বশুর , শ্বাশুড়ি বেশ কয়েকবার তাদের বেয়াই বাড়ি গিয়ে বৌমাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলেও সেই চেষ্টাকে বৌমা দীপিকা গুরুত্ব দিলো না | তারপর থেকে তারা আর কোনোদিন পুনরায় চেষ্টার পথে হাঁটেননি |
এমনি করে চলতে চলতে এক সময় দেবদাসের কন্যা সন্তান দিপ্সিতা যেহেতু মায়ের কাছে ছিল তাই সে সেখান থেকেই লেখাপড়া করতে করতে
যখন মাধ্যমিক দেবে তখন সে তার দাদু, দিদা, মাকে না জানিয়েই হটাৎ একদিন বাবা দেবদাসের কাছে চলে এলো | সেই সময় দীপ্সিতার বাবা , দাদু , দিদা তাকে দেখে খুশি হলেন ঠিকই | কিন্তু একা একা চলে আসার জন্য কিছুটা বকাবাজ্জিও করলেন | তখন দিপ্সিতা বললো সে আর মায়ের কাছে ফিরে যাবে না | শুনে কেন প্রশ্ন করতে দীপ্সিতা আর কোন উত্তর দিলো না | চুপ করে রইলো | তখন সকলে ভাবলেন , বোধহয় স্নেহ ভালোবাসার অভাব হওয়ার জন্য সে চলে এসেছে | যাইহোক তারপর থেকে দিপ্সিতা তার ঠাকুর দা , ঠাকুর মা , বাবার কাছেই থেকে গেলো | তাদের সকলের স্নেহ ভালোবাসায় দিপ্সিতার লেখাপড়ার জীবন বেশ ভালোভাবেই কাটছে |
এমতো অবস্থায় হটাৎ দেবদাস কোন এক কাজের প্রয়োজনে গণেশ চথুর্তির উৎসবের দিন তার শ্বশুর বাড়ির কাছাকাছি একটি পথ ধরে হাটতে হাটতে অকল্পনীয় একটি দৃশ্য দেখে চমকে উঠলো | দেবদাস দেখলো , তার স্ত্রী দেবিকা একটি যুবকের হাত ধরে রাস্তার ফুটপাথ ধরে হেটে চলেছে| তৎক্ষণাৎ দেবদাস যতটা সম্ভব নিজেকে একটু আড়ালে আড়ালে রেখে তাদের পেছন পেছন এগিয়ে যেতে লাগলো | খানিকটা যাবার পর দেখলো দুজনকে রেস্টুরেন্টে ঢুকতে | তখন দেবদাসের মনটা অনেকটাই বিষন্ন হয়ে উঠলো | তৎক্ষণাৎ সে নিজের কাজের জন্য আর না এগিয়ে বাড়িতে এসে খুব ঠান্ডা মাথায় তার মেয়ে দিপ্সিতা কে ডেকে তার মায়ের সংগে থাকা ব্যক্তিটি সম্পর্কে জানতে চাইলে দিপ্সিতা প্রথমে কিছুই বলতে না চাইলেও বাবার চাপে পরে ব্যক্তিটি কে বলতে বাধ্য হলো | দীপ্সিতা বললো, ব্যক্তিটি মা যে বাড়িতে নাচের জন্য ইস্কুল ঘর ভাড়া নিয়েছে সেই বাড়ির বাড়িওয়ালার ছেলে আকাশ | দীর্ঘদিন ধরেই মা ঐ ব্যক্তিটির সংগে সম্পর্কে জড়িয়ে আছে | সেই কারণেই আমি মায়ের কাছ থেকে চলে এসেছি | মেয়ের মুখ থেকে সব সত্যটা জানতে পেরে দেবদাসের মাথায় সেই মুহূর্তে যেন বাজ পড়লো | তারপর খানিক বাদে কি করবে , কিনা করবে ভাবতে ভাবতে নিজের ঘরে গিয়ে চুপটি করে একলা বসে রইলো | আর মনে মনে ভাবতে লাগলো , খুব দুর্ভাগ্য আমার , এক সময় কাটার খোঁচা খেয়েও যে গোলাপটিকে বুকের উপর যত্ন করে রেখে ছিলাম সেই গোলাপটি আজ সত্যি সত্যিই হারিয়ে গেলো আমার বুক থেকে |
—oooXXooo—
![]()







