কলকাতা, নিউজ ব্যুরো আমার আলো, হিরণ ঘোষাল: সাংবাদিকদের স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের অধিকার নিয়ে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট এক যুগান্তকারী রায় প্রদান করেছে, যা দেশের চতুর্থ স্তম্ভের মর্যাদা ও দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিচারপতি ডি.ওয়াই. চন্দ্রচূড় এবং বিচারপতি এ.এস. বোপান্নার ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, সাংবাদিকদের মত প্রকাশের অধিকার অসীম নয় এবং এর উপর যুক্তিসঙ্গত সীমাবদ্ধতা আরোপ করা যেতে পারে। এই রায় এমন এক সময়ে এসেছে যখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাংবাদিকদের উপর হামলা, তাদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা এবং ভুয়ো খবরের প্রচার বৃদ্ধি পেয়েছে।
গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ এবং তার আইনি সুরক্ষা:
সাংবাদিকতা ভারতের মতো একটি বহুত্ববাদী গণতন্ত্রে মেরুদণ্ডস্বরূপ। সংবিধানের ১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সকল নাগরিকের মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে, যা সাংবাদিকদের জন্যও প্রযোজ্য। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট তার পর্যবেক্ষণে বলেছে যে, এই অধিকারের সঙ্গে ১৯(২) অনুচ্ছেদের অধীনে কিছু বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। এই বাধ্যবাধকতাগুলির মধ্যে দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, নৈতিকতা এবং আদালত অবমাননার মতো বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত।
রায়: স্বাধীনতা বনাম দায়বদ্ধতা
সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে খবর প্রকাশ করতে পারেন, তবে তা যেন সমাজের শান্তি, সম্প্রীতি এবং দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত না করে। বিশেষত, ভুয়ো খবর (fake news), বিদ্বেষমূলক বক্তব্য (hate speech) এবং মানহানিকর বিষয় প্রচারের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের দায়বদ্ধতা বহুগুণ বেড়ে যায়। কোর্ট উল্লেখ করেছে যে, শুধু খবর পরিবেশন করাই যথেষ্ট নয়, খবরের সত্যতা যাচাই করাও একজন সাংবাদিকের মৌলিক দায়িত্ব।
সাংবাদিকদের ওপর মামলার পরিসংখ্যান
সাংবাদিকদের উপর নিপীড়ন নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্টে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (CPJ) এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ভারতে অন্তত ৬৭ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে, তাদের উপর হামলা হয়েছে এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতার মতো গুরুতর ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এছাড়াও, প্রেস কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া (PCI) এর রিপোর্ট অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রায় ৫০০টি মানহানির মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার বেশিরভাগই রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের পক্ষ থেকে।
সীমাবদ্ধতা ও বিতর্ক – সুপ্রিম কোর্টের রায় কি সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করবে ?
সুপ্রিম কোর্টের এই রায় নিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একদল মনে করেন যে, এই রায় ভুয়ো খবর এবং বিদ্বেষমূলক সাংবাদিকতা রোধে সহায়ক হবে। কিন্তু আরেক দল আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, এই রায়কে ব্যবহার করে সরকার বা প্রভাবশালী মহল সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করতে পারে।
বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের বিস্তার:
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ভুয়ো খবর ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের বিস্তার মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে এই বিষয়টির উপর জোর দিয়েছে এবং বলেছে যে, এই ধরনের বিষয় প্রচার করলে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
দায়বদ্ধতার চ্যালেঞ্জ:
বিচারপতি চন্দ্রচূড় তার পর্যবেক্ষণে বলেছেন, “সাংবাদিকতা এখন আর কেবল পেশা নয়, এটি সমাজের প্রতি এক গভীর দায়বদ্ধতা।” তিনি বলেন, “তথ্য যাচাই না করে অথবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা তথ্য প্রচার করা পেশাগত নৈতিকতার লঙ্ঘন।”
এই রায়ের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট বার্তা দিয়েছে যে, গণতন্ত্রে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা অপরিহার্য, কিন্তু তার সঙ্গে পেশাগত নৈতিকতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন দেশের সাংবাদিকদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
#সাংবাদিকতার_স্বাধীনতা #গণতন্ত্রের_চতুর্থ_স্তম্ভ #সুপ্রিমকোর্টের_রায় #সাংবাদিকতা #মিডিয়া #ভারতের_গণমাধ্যম #সংবাদ_রিপোর্ট #সাংবাদিক_অধিকার #মিডিয়া_স্বাধীনতা #ডিওয়াই_চন্দ্রচূড়
#JournalismFreedom #FreedomOfPress #SupremeCourtOfIndia #IndianJournalism #MediaRights #FourthPillar #PressFreedom #JournalistRights #D
YChandrachud #IndianMedia #JournalismEthics
![]()






