ছোট বেলার বান্ধবী
বাসুদেব দাশ
==============
আরোহী জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষায় বসে কিন্তু ওর রাঙ্ক চল্লিশ হাজারের বেশি হয়ে যাওয়ায় ও হুগলীর একটা টেকনিক্যাল কলেজে, হুগলি একাডেমি অফ টেকনিক্যাল ইস্টিটিউটে ভর্তি হয় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ। ওর ধারণা ছিল যে স্কুল পেরিয়ে কলেজে এসেছে এবার হয়তো প্রেম করার জন্য একটা পছন্দ সই মেয়ে ও নিশ্চই পেয়ে যাবে। সেই আশায় আশায় রোজ কলেজে আসে। পড়াশোনা হোক বা না হোক প্রেম একটা করতেই হবে। যেন প্রেম করার জন্যই আরোহীর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হওয়া। গার্ল ফ্রেন্ড খুঁজতে গিয়ে পড়াশোনা যে গোল্লায় যাচ্ছে সে দিকে কোন হুঁশ নেই । কলেজের প্রায় সব ছেলে মেয়েই তাদের ফ্রেন্ড জুটিয়ে নিয়েছে । এক মাত্র পারেনি আরোহী। ও নানা ভাবে চেষ্টা করেছে কিন্তু প্রতি বারই বিফল হয়েছে । কেনো ওর গার্ল ফ্রেন্ড জুটলো না সেটা নিয়েও ও অনেক চিন্তা ভাবনা করেছে কিন্তু সেরকম কোন কারণ ও খুঁজে পায় নি। হতাশা যেমন বেড়েছে য়ন্ত্রনাও তেমন বেড়েছে। কি করবে তা ও বুজে পায় না। একটা মাত্র কারণ ও ধরতে পেরেছে সেটা হলো ও একটু বেশি মাত্রায় ভীতু। প্রেম ট্রেম করতে গেলে একটু সাহসী হওয়া প্রয়োজন আর লজ্জা ত্যাগ করা প্রয়োজন আছে । কে কি বললো না বললো সেটা দেখলে প্রেম হবে না। সবকটা সেমিস্টার পাশ করে ও কলেজ থেকে বেরিয়ে আসে। রেজাল্ট ভালো না হওয়ায় ও ক্যাম্পাসিং এ চাকরি পায় নি । কোডিং গুলো শেখেনি তাই ও সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে নি। তার ফলে ওর চাকরি হয় নি ।
অতঃপর আরোহী একটা দোকান খুলে বসে। পাড়ার মধ্যে বাবার পরিচিত এক জনের একটা দোকান বহু ধরে বন্ধ পড়ে ছিল সেই দোকানটা বাবা ওকে কিনে দেয়। ওর দোকানে ট্রেনের টিকিট, এয়ার টিকিট, ভলভো বাসের টিকিট কাটা হয়। হোটেল বুকিং, সাইট সিনের গাড়ি বুকিং করা হয়। টেলিফোন বিল, এলেস্ট্রিক বিল, মিউনিসিপালিটির ট্যাক্স, খাজনা পেমেন্ট হয়। জমি বাড়ী ফ্ল্যাটের মেউটেশন ফিস পেমেন্ট,পেনশনারদের ডিজিটাল লাইফ সার্টিফিকেট, পেনশনারদের সি জি এইচ এস এর লাইফ কার্ড করা ও এর ফিস জমা করা হয়। এছাড়া যে কোন অন লাইন পেমেট করার কাজ হয়। স্কুল কলেজের ফিস জমা করা হয়। ব্যাঙ্কের টাকা জমা তোলা করা যায়। নতুন দোকান তাই পসার জমাতে একটু সময় লাগবে। তবে এই সব কাজের ভাবিষ্যৎ আছে। মানুষ এখন সব কিছু হাতের কাছে খোঁজে। দোকানটা পুরোপুরি চালু হলে রোজগার মোটামুটি ভালই হবে । একদিন সন্ধ্যা বেলা আরোহী দোকানে বসে এক জন গ্রাহকের একটা ইলেকট্রিক বিলের টাকা পেমেন্ট করছে এমন সময় ওরই বয়সি একটি মেয়ে আসে ওর দোকানে। মেয়েটিকে দেখে ওর চেনা চেনা লাগে। কিন্তু ঠিক চিনতে পারে না। মেয়েটিও ওর দিকে তাকিয়ে উসখুস করতে থাকে। দুজনে দুজনের মুখের দিকে চাওয়া চাওয়ি করতে করতে মেয়েটা হঠাৎ বলে…ইউ আরোহী, রাইট ? আরোহী… ইয়েস। বাট ইউ ? মেয়েটি…চিনতে পারলি না ? রিমেম্বার মি প্লিজ। এত তাড়াতাড়ি বেমালুম ভুলে গেলি মাইরি ? আমি জাস্ট ভাবতে পারছি না। তুই কি ছেলে রে ? নো কমেন্ট। ডু ইউ রিমেম্বার তুরাবী ? আরোহী…. ইয়েস, ইয়েস। রাইট, ইউ আর তুরাবী। বাট হোয়াট এ সারপ্রাইস। আই নো তুরাবী। প্লিজ ডো’ন্ট টেক ইট আদার ওয়েজ। আসলে বিষয়টা আউট অফ সাইট আউট অফ মাইন্ড হয়ে গেছে । তুরাবী…ওকে, ঠিক হ্যায়। নো প্রবলেম। আচ্ছা এবার কাজের কথা বল। আরোহী… হ্যাঁ বল তুই কি জন্য এসেছিস। তুরাবী….আমরা দার্জিলিং বেড়াতে যাবো, তুই কি আমাদের ট্রেনের টিকিট কেটে দিতে পারবি ? আরোহী… হোয়াই নট , অবশ্যই পারবো। এটাই তো আমার জব । তুরাবী… আমি কাল সকালে নাম আর বয়সের তালিকা আর টাকা নিয়ে আসবো। আই হোপ দ্যাট, ইউ মাস্ট ট্রাই। আরোহী… বোস, চা খা। কাজের সময় কাজ ঠিক হয়ে যাবে। এখন চা খা। তুরাবী… চা খাওয়াতে মন চাইছে তোর ? আরোহী… ইয়েস। হোয়াই নট। প্লিজ বোস। তুরাবী… ওকে। তুই কি আমার প্রেমে পড়ে গেলি নাকি ? আরোহী… কি জানি হতেও পারে। তুরাবী…তোর তো সাহস কম না। আরোহী… প্রেমে পড়তে আবার সাহস লাগে নাকি ? প্রেম তো আপনা আপনি হয়। সেখানে সাহস আর দুঃসাহসের প্রশ্ন নেই ম্যাডাম। তুই সেই একই রকম রয়ে গেলি আজও। আরোহী তুরাবীকে দোকানে বসিয়ে চায়ের দোকানে গিয়ে দু কাপ চা দিয়ে যেতে বলে আসে। চা খেয়ে তুরাবী বলে…. থাঙ্কস এ লট ফর টি। ডো’ন্ট মাইন্ড আই এম জাস্ট জোকিং। আফটার হাউ লং আমাদের দেখা হলো বল ? এই নে সিগারেট ধরা। আরোহী.. নো থাঙ্কস। আমার চলে না রে। তুরাবী… তুই আদিম যুগেই রয়ে গেলি মাইরি। ঠিক আছে আমি ধরাচ্ছি, হ্যাঁ। আরোহী… ওকে, নো প্রবলেম, ইউ টেক। তুরাবী…. একটু মডার্ন হয়, সোশ্যাল হয়। না হলে কি করে চিক্কি চামিলিরা তোর কাছে এসে ভিড় করবে। আরোহী.. এই পর্যন্ত এক জানেরও তো দেখা পেলাম না। অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু কিছুই হলো না। এই নে এটার মধ্যে ছাই ফ্যাল। তোর কি হুইস্কি চলে ? তুরাবী….হ্যাঁ, আমি তো প্রায় প্রতি দিনই একটা করে নিপ কিনে নিয়ে আসি বাড়ী ফেরার পথে। রাত্রি বেলা শোবার আগে খেয়ে নি। আরোহী…ওকে আই শ্যাল ট্রাই। ঠিক আছে তুই কাল আয়। তুরাবী…আচ্ছা তুই কটা ছ্যাকা খেয়েছিস বললি না তো। আরোহী… আরে চিক্কি চামেলীরই তো দেখা পেলাম না ছ্যাকা দেবে কে ?
পরের দিন তুরাবী ছয় জনের নামের একটা লিস্ট নিয়ে আসে আরোহীর দোকানে।
আরোহী…আচ্ছা তুরাবী তুই কি করে জানলি যে আমি এখানে দোকান করেছি ? তুরাবী…. আমি জানতাম না আই এম জাস্ট লুকিং ফর। এখানে এসে দেখি তুই। আরোহী…এই যোগাযোগটা কেমন কাকতালীয় । তাই না ? তুই এখানে কোথায় থাকিস ? তুরাবী… আমি পিসির বাড়ী এসেছি। জপুর রামকৃষ্ণ পার্ক। আরোহী…এই নাম গুলো কার কার ? তুরাবী…আমাদের ফ্যামিলির তিন জন আর পিসির ফ্যামিলির তিন জন। আরোহী…. তোরা এখন কোথায় থাকিস ? তুরাবী…বাবা রিটায়ার করে বারাসাত বিবেকানন্দ রোডে ফ্ল্যাট কিনেছে। চাঁপাডালি মোড়ে। তুই কোথায় থাকিস ? আরোহী…. আমরা তো এই পাড়ায় ফ্ল্যাট কিনেছি। ইফ ইউ ডো’ন্ট মাইন্ড তুই কি করছিস ? তুরাবী…. আমি হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে সেক্টর ফাইভ এ একটা বেসরকারি কলেজ থেকে B C A পাশ করি তারপর ঐ কলেজ থেকেই M C A পাশ করি। এখন একটা জব করছি। তবে আমি কানাডা যাবার চেষ্টায় আছি। কানাডা ইস মাই ফেভারিট কান্ট্রি। আরোহী… তোর বয় ফ্রেন্ড আছে ? তুরাবী… কেনো রে তুই ট্রাই করবি নাকি ? আরোহী… আরে না না আমি তো জাস্ট লেগ পুল করছিলাম। তুরাবী… তবে চেষ্টা করে দেখতে পারিস। আরোহী…. ওঃ সিওর। আচ্ছা তোর সেই আমাদের ছোট বেলার কথা মনে আছে ? তুরাবী… মনে নেই আবার। তুই কি একটা গোবর গনেশ ছিলি মাইরি। আমি তো আমার অনেক B B F কে বলেছি তোর কথা। আরোহী… তুই যে বল্লি তোর বেস্ট বয় ফ্রেন্ড নেই। তুরাবী… আরে হাদা B B F মানে বেস্ট বয় ফ্রেন্ড ফর এভার। তুই কি ভয় পেয়ে গেলি নাকি ? আরোহী… নো নো আই এম নট টকিং লাইক দ্যাট।
সেই ছোট বেলায় তুরাবীরা আর আরোহীরা বরিশাল কলোনিতে পাশাপাশি দুটো বাড়ীতে ভাড়া থাকতো। তুরাবীর বাবা ও আরোহীর বাবার অফিস পোস্টিং এই দিকে ছিল। তাই ওরা এই পাড়ায় ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতো। তখন ওরা দুজনেই নার্সারিতে পড়তো। ঐ স্কুল থেকে ক্লাস ফোর পাশ করে। একই হাই স্কুলে দু জনে ক্লাস ফাইভে ভর্তি হয়। সকাল বেলা তুরাবীর মা দু জনকে এক সঙ্গে স্কুলে দিয়ে আসতো। আর বিকেল বেলা স্কুল ছুটির পর আরোহীর মা দুজনকে এক সঙ্গে বাড়ী নিয়ে আসতো। বাড়ি থেকে স্কুলে হেঁটেই যাওয়া আসা করতো। বাড়ী ফিরে টিফিন খেয়ে আবার স্যারের কোচিং ক্লাসে যেতে হতো। সেখানেও এক সঙ্গে যেত আবার এক সঙ্গে ফিরতো। বাড়ীর কাছাকাছি বলে ওরা দুজনেই হেঁটে আসা যাওয়া করতে পারতো। ক্লাস ওয়ান থেকে এইট পর্যন্ত এক সঙ্গে পড়াশোনা করেছে ওরা। এক জায়গায় থাকতে থাকতে ওদের দুটো পরিবারের মধ্যে একটা আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সবার সঙ্গে সবার ভাব বসলোবাসা ছিল। একটা সময়ের পর ওদের দু জনের বাবার অফিস পোস্টিং এখান থেকে অন্য জায়গায় হয়ে যায় তখন ওদের দুটো পরিবার দুই দিকে ছিটকে যায়। ওরা এখানকার ভাড়া পাল্টে অন্য জায়গায় চলে যায়। তারপর দেখা সাক্ষাৎ, যোগাযোগ আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে যায় ব্যস্ত,গতি শীল জীবনের চাপে পড়ে। সেই সঙ্গে স্মৃতি গুলোও কালের ভারে চাপা পড়ে যায়। আলো বাতাসের অভাবে মরচে ধরে যায়।
আজ প্রায় দশ বছর পর আবার দেখা হলো দু জনের। কি ভালো ছিল ওরা ছোট বেলায়। খুব ভাব ছিল আরোহী আর তুরাবীর মধ্যে। এক দিন আরোহীর জ্বর হয়েছিল। তুরাবী সারা দিন ওর পাশে বসে ছিল। মাঝে মাঝে কপালে হাত দিয়ে দেখছিল জ্বরের তেজ একটু কমলো কিনা। এক সঙ্গে খেলা করা, দৌড়ো দৌড়ি হুড়োহুড়ি করা কি মজার জীবনই না ছিল ওদের। দোলের সময়ে রং খেলে খুব আনন্দ করতো ওরা। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে বালতিতে রং গুলে বেলুনে ভরে পথ চলতি মানুষের গায়ে সেই বেলুন ছুঁড়ে মারতো। যদি গায়ে লেগে বেলুন ফেটে যেত তাতে যে কি আনন্দ হতো ওদের তা বলে বোঝানো যাবে না। আর পিচকারী দিয়ে বালতি থেকে রং টেনে ফুচ করে দিয়ে দিত যাকে কাছে পেতো তার গায়ে। এক বার দোলের সময় তুরাবী দুষ্টামি করে আরোহীকে রং ছুঁড়ে মেরে ছিল। ঐ রং আরোহীর চোখে লেগে গিয়েছিল। আরোহীর সে কি কান্না ! আরোহী দৌড়ে গিয়ে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। আর এক বার দোলের সময় যেবার ওরা ক্লাস সেভেনে পড়ে সেবার আরোহী আবির দেবার নাম করে সিঁদুর ঘষে দিয়েছিল তুরাবীর সিঁথিতে। তুরাবী লজ্জা পেয়ে দৌড়ে বাথ রুমে ঢুকে জল দিয়ে ধুঁয়ে ফ্যালে যাতে কেউ দেখতে না পায়। তুরাবী একটু বেশি চঞ্চল ছিল। আরোহী ছিল অনেক টা লাজুক। ওদের জীবনের অনেক গুলো ব্যক্তিগত মুহূর্ত ওরা মোবাইলে ধরে রেখেছিল স্মৃতিকে অক্ষয় করে রাখার জন্য। সেগুলো মাঝে মাঝে দেখে সুখ অনুভব করতো। স্মৃতির পাতা উল্টাতে উল্টাতে অনেক কিছু ভালো লাগার মুহূর্ত আবছা থেকে প্রাণবন্ত হয়ে উঠতো আস্তে আস্তে ওদের চোখের সামনে। কি সেই সুখের অনুভূতি ! তা বলে বোঝানো যাবে না। আরোহী… ইফ ইউ ডো’ন্ট মাইন্ড আমরা কি এক দিন লাঞ্চে মিট করতে পারি। তুরাবী… অবভিয়াসলি। লেট্ উই শ্যাল স্টার্ট টু মেক এ প্ল্যান ফর লাঞ্চ। আরোহী… ওকে, উই শ্যাল মিট টুমোরো এট ওয়ান থার্টি পি এম এট চায়না টাউন। চায়না টাউন রেস্টুরেন্টে খাবার খেতে খেতে ফেলে আসা জীবনের সুখের দেশে ফিরে গিয়েছিল ওরা। ওরা ফুড খায় সঙ্গে হুইস্কি নেয়, আরোহী দু পেগ আর তুরাবী চার পেগ । এক সিপ্ এক সিপ্ করে হুইস্কি খেতে খেতে ওরা ভেসে যায় দূরে বহু দূরে। ওরা প্রবেশ করে বাস্তবের সীমানা ছাড়িয়ে মায়াময় রঙিন স্বপ্ন লোকে। আরোহী… তুই আন কমফোর্টেবল ফিল করছিস না তো ? তুরাবী… নো, নট এট অল।আজকাল মেয়েরা এতো বেশি সিগারেট খাচ্ছে, মদ খাচ্ছে তাতে এক সময় ওদের প্রজনন সিস্টেমে প্রবলেম হবার একটা ভয় থাকলেও থাকতে পারে । জন্মের হার কমে যাবে মৃত্যুর হারের থেকে। তাতে জন্ম মৃত্যুর হারের ব্যালান্সটা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। অথচ মেয়েদের কোন পরিচয় নেই, ঠিকানা নেই, দেশ নেই সেই সব নিয়ে ওদের মাথায় কোন জিজ্ঞাসাও নেই সমাজের কাছে। ছোট বেলায় বাবার পরিচয়ে বাবার ঠিকানায় আর ইয়ং এজে স্বামীর পরিচয়ে স্বামীর ঠিকানায় আর বয়স কালে স্বামী কিম্বা ছেলের কাছে আশ্রয় নিয়ে জীবন কাটানো। যদি শ্বশুর বাড়ীতে গন্ডগোল বাঁধে তখন না জায়গা থাকে শ্বশুর বাড়ীতে না জায়গা থাকে বাপের বাড়ীতে। পুরোপুরি ভাসমান একটা জীবন। এই সব বিষয় গুলো নিয়ে চিন্তা না করে আমেরিকান সভ্যতার খারাপ দিক গুলোর মধ্যে মজে থেকে জীবন কাটানোই ওদের এক মাত্র অভিলাষ। আমাদের ভারতীয় সভ্যতার অনেক ভালো ভালো দিক আছে সেই গুলোতে ওরা আকৃষ্ট হয় না। এর জন্যই হয়তো এক সময় অনেক স্ত্রীকে অকালে চলে যেতে হতো স্বামীর সঙ্গে সহমরণে। আর মানব জাতীর অস্তিত্বকে ধরে রাখার জন্য এবং নতুন প্রজন্মকে পৃথিবীতে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে ওদের অবদান সব থেকে বেশি। ওরা যদি এই নিয়মের বিরোধিতা করে তবে সৃষ্টির ধারা বন্ধ হয়ে যাবে। সৃষ্টির ধারাকে অব্যহত রাখার ক্ষেত্রে সমাজ নারীদের কাছে ভীষণ ভাবে কৃতজ্ঞ । এক কথায় পুরুষ বা নারী সবাই নারীর সন্তান। এক জন পুরুষ যে কিনা কোন নারীর স্বামী সেই পুরুষই আবার কোন না কোন নারীর সন্তান। একজন নারী তার স্বামীকে সন্তান হিসাবেও প্রতি পালন করে। বয়স কালে এক জন পুরুষের এক জন নারীর সাহায্যের খুব প্রয়োজন হয় কিন্তু এক জন নারী কোন পুরুষের সাহায্য ছাড়াই চলতে পারে। তাই নারীই সমাজের মূল ভিত্তি বা নারীই গুরু যে কিনা মানুষকে তার প্রয়োজনীয় সব দান করে। পুরুষ সব কিছুই নারীর কাছ থেকে পায়। তাই সে নারীর কাছ ঋণী। দার্জিলিং থেকে ঘুরে এসে তুরাবী চলে যাবে কানাডা। আরোহী….কানাডা গিয়ে ফোন করিস আর ভিডিও কলিং করবি । ভুলে যাবি নাতো ? তুরাবী… ওকে আই শ্যাল ট্রাই। বাট ইউ অলসো শুড টেক সাম রেসপন্সবিলিটি টু কীপ ক্লোস ইন কন্টাক্ট। আরোহী… ঠিক হ্যায় মাডামজি। আই শ্যাল ট্রাই।
দার্জিলিং থেকে বেড়িয়ে আসার কিছু দিন পর তুরাবী কানাডা চলে যায় ওর কর্মস্থলে। দার্জিলিং যে দিন ওরা পৌঁছায় সে দিন বিকালে ম্যালে বসে চা খাচ্ছিলো সবাই মিলে শীতের আমেজ নিতে নিতে। একটা অবাঙালি ছেলে তুরাবীকে বার বার ট্যাংকি মারছিলো। তুরোবি বুঝতে পেরেও চুপ করে বসে ছিল। ভিতরে ভিতরে রাগ হচ্ছিলো কিন্তু কিছু বলতে পারছিলো না অচেনা অজানা জায়গা বলে। কোথার থেকে কি হয়ে গিয়ে ট্যুরটা ভেস্তে যাবে সেই ভয়ে। সাইট সিনের কয়েকটা পয়েন্টেও ঐ ছেলেটির সঙ্গে দেখা হয়েছিল। ছেলেটি বার বারই ওকে ট্যাংকি মারছিলো। ওর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল যদি একটা সুযোগ মেলে। কিন্তু বিড়ালের ভাগ্যে শিখে ছিড়লো না। তুরাবী কোন পাত্তা দেয় নি। শেষমেশ তুরাবী রেগে গিয়ে ছেলেটার গালে ঠাস করে একটা চর মেরে দেয়। ব্যাস ছেলেটি ওর পরিচিত কত গুলো ছেলেকে ডেকে নিয়ে আসে। প্রচন্ড ঝামেলা বেঁধে যায়। তুরাবীর বাবা তুরাবীকে নিয়ে গিয়ে থানায় রিপোর্ট করে। পুলিশ এসে ঐ ছেলেটিকে ইফটেচিং এর অপরাধে গ্রেফতার করে। তারপর ঝামেলা মেটে। বিপদের ভয়ে ওরা তাড়াতাড়ি করে দার্জিলিং ট্যুর কমপ্লিট করে কলকাতায়া ফিরে আসে। আসলে তুরাবীর মনটা তো পড়েছিল জপুরের রামকৃষ্ণ পার্কে ছোট বেলার বন্ধুর কাছে। তুরাবী আরোহীকে ছাড়া অন্য কারোকে সহ্য করতে পারে না।
কলকাতা থেকে মুম্বাই আবার মুম্বাই থেকে দুবাই হয়ে কানাডা পৌঁছে যায় তুরাবী। কানাডা দেশটা এতো ভালো একটা দেশ যে,যে একবার এই দেশে যায় সে আর ওদেশ থেকে ফিরে আসতে চায় না। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ কানাডা। এই দেশকে ভালো লাগার অনেক গুলো কারণ আছে। এই দেশের মানুষের আচার ব্যবহার খুব ভালো। ওরা বিদেশীদের খুব সমাদর করে। কানাডা নামটা সম্ভবত এসেছে গ্রাম কথা থেকে। কানাডার বেশির ভাগ অংশটাই গ্রাম। কানাডার রাজধানী টরেন্ট। টরেন্ট এই দেশের সব থেকে বড় শহর। এই দেশের আয়তন ৯৮৮৪৬৭০ বর্গ কিলোমিটার। এই দেশের জন সংখ্যা তিন কোটি ছাপান্ন লক্ষ পঁচাত্তর হাজার আটশো চৌত্রিশ জন। প্রতি বর্গ কিলোমিটারে গড়ে ৩.৯২ জন লোক বাস করে। কানাডা দেশটা পৃথিবীর ধনী দেশ গুলোর মধ্যে একটা। কানাডা বিশ্বের শীতল তম দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয়। বছরে প্রায় চার মাস বরফে ঢাকা থাকে। কানাডা শিক্ষায় বিশ্বে প্রথম দেশ। এই দেশের শিক্ষার হার শতকরা একশো। আঠেরো শাতাংশের মত মানুষ গ্রামে বাস করে। বিরাশি শাতাংশের মত মানুষ শহরে বাস করে। কানাডায় ইংরেজি ও ফ্রাঞ্চ এই দুটো ভাষা প্রচলিত আছে। কানাডায় প্রায় তিন হাজার হৃদ আছে। অসংখ্য পাহাড়, পর্বত ও নদী আছে। সবুজ গাছ পালা আছে প্রচুর। পুরো দেশটা সবুজে মোরা। প্রাকৃতিক পরিবেশ বেশ মনোরম। ওদেশের সবাই চিজ ও পাস্তা খায়। পাস্তা ওদেশের জনপ্রিয় খাবার। প্রচুর গুজরাটি ও পাঞ্জাবী বাস করে কানাডাতে। ট্যাক্সি ড্রাইভার দের বেশির ভাগই পাঞ্জাবী। আইচ হোকি ওদেশের প্রিয় খেলা।
তুরাবী কানাডা যাবার বেশ কিছু দিন পর এক দিন আরোহীকে ফোন করে। ফোনটা ধরে আরোহী বলে… কি রে ফোন করলি যে, আমার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করছিল, বল ? তুরাবী.. নো স্যার, আই হ্যাভ নো এনি ইন্টারেস্ট এবাউট ইউ। আরোহী…দেন ? আমাকে মিস করছিলি বুঝি ? তুরাবী…ওকে রাইট,ফোন কেটে দিচ্ছি। আরোহী… আরে না না বলতে বলতে ফোন কেটে দেয় তুরাবী। আরোহী সঙ্গে সঙ্গে ভিডিও কলিং করে। তুরাবী… কি রে আমাকে দেখতে ইচ্ছা করছে তো ? আরে শোন শোন আমিও একটু আধটু বুঝি। আমাকে খুব মিস করছিস তাই না ? আরোহী… নো নো। নট লাইক দ্যাট। তুরাবী…আসলে তুই আমার প্রেমে পড়ে গেছিস। আরোহী…. আমি! তোর প্রেমে ? একদমই না। আমার মনে হয় তুই আমাকে ভালোবেসে ফেলেছিস। তুরাবী…আরে তোর কি মাথা খারাপ ? আমি পড়বো তোর প্রেমে ? আরোহী… আমার কাছে খবর আছে যে তুই আমাকে খুব ভালোবাসিস। তুরাবী… কি করে বুঝলি ? আরোহী… আমার কাছে মোবাইলে খবর এসেছে। তুরাবী… দেখি,তোর মোবাইলের ম্যাসেজ দেখা আমাকে । আরোহী… তুই ফিরে আয় তারপর দেখাবো। তুরাবী ভাবছে নিজের তৈরি খেলায় নিজেই হেরে যাবে এবার। তুরাবী নিজেই প্রসঙ্গ পাল্টে চলে যায় কানাডায় । তুরাবী…. আরে এই দেশটা না পুরো স্বপ্নের মত একটা দেশ। ভাবছি এখানকার সিটিজেনশিপ নিয়ে এখানে থেকে যাবো সারা জীবন। আরোহী… ঐ সব করতে যাস না। কোথায় কি বিপদে পড়ে যাবি তখন দেখবে কে ? তুই তাড়াতাড়ি দেশে চলে আয়। তুরাবী… বাট হোয়াই। কি আছে ওখানে ? কার জন্য যাবো ? আরোহী…আমি আছি। আমার জন্য আসবি। আমার ব্যবসার কিছুটা ডেভেলপমেন্ট হয়েছে। নতুন কিছু কাজ এড হয়েছে। আমি এক জন অ্যাসিস্ট্যান্ট রেখেছি। আমার আগের কাজ গুলো ও করছে আর আমি ইনভেস্টমেন্ট এডভাইসারের কাজ করছি। আমি মিউচুয়াল ফান্ডের কাজ করছি। এর মার্কেটটা ভালো আছে। প্রচুর মানুষ এই দিকে ঝুঁকছে। কিন্তু মিউচুয়াল ফান্ড সম্মন্ধে মানুষ বলতে গেলে কিছুই জানে না। তাই ভালই লোক জন আসছে আমার কাছে। এরপর ভাবছি শেয়ার মার্কেটিং টা শিখে নেবো। তুরাবী…ক্যান আই আস্ক ইউ সামথিঙ্ক ? আরোহী…. হোয়াই নট, অফকোর্স। তুরাবী… ডু ইউ বিলিভ ইন ডেস্টিনি ? আরোহী..বাট আই হ্যাভ নো এনি আইডিয়া এবাউট ডেস্টিনি। তুরাবী….ওকে, চালিয়ে যা। তোর হবে হাদারাম। পারলে আমাকেও তোর অ্যাসিস্ট্যান্ট করে নিস। আরোহী…ওঃ রিয়েলি ! কবে আসছিস কলকাতায় ? আসলে আমার সঙ্গে দেখা করবি তো ? তুরাবী…জানি না কবে যাবো। গেলে গোবর গনেশের সাথে অবশ্যই দেখা করবো। আরোহী… শুনে খুশি হলাম। তুরাবী…ডো’ন্ট বি ওরিড হাদারাম। আই এম অলোয়েস বিসাইড ইউ। আরোহী…. আর একটা কথা জানতে ইচ্ছা করছে। তুরাবী… বলে ফ্যাল। আরোহী….আমার সঙ্গে প্রেম করবি ?
তুরাবী… তুই কারোকে আই লাভ ইউ বলতে পেরেছিস ? আরোহী…. কাকে বলবো আমার তো গার্ল ফ্রেন্ড নেই। তুরাবী… খুঁজে দেখেছিস ? ডেটিং করেছিস ? আরোহী…হ্যাঁ অনেক চেষ্টা করেছি ট্যাংকিও মেরেছি কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। তুরাবী… প্রপোজ করার মত কারোকে খুঁজে পাসনি ? আরোহী… তুই কি কারোকে ভালোবাসিস ? তুরাবী… আমি এক জনকে ভালোবাসি কিন্তু সে আমাকে ভালোবাসে কিনা জানি না। আরোহী…. আমাকে তার নাম ঠিকানা দে, আমি তাকে জিজ্ঞেস করবো ? তুরাবী… আমি ইন্ডিয়াতে এসে তোকে নিয়ে যাবো ওর কাছে ।আরোহী….. তুই তাহলে তাড়াতাড়ি করে ফিরে আয়। তারপর আমি ওকে ধরবো। তুরাবী …ওকে ধরতে গিয়ে শেষে নিজেকে ধরে ফেলবি না তো ?
এরপর আরোহীর সঙ্গে তুরাবীর আর কোন কথা হয় নি। মাঝে মাঝে মোবাইলে ম্যাসেজ পাঠায়। কথা বার্তা একদম কমে গেছে। আজকালকার ছেলে মেয়েদের এই হচ্ছে একটা দোষ। ওরা মোবাইলটা হাত থেকে রাখতে পারে না। সব সময় যা কিছু করতে ইচ্ছা করবে সব ঐ মোবাইল দিয়ে করবে। কথা বলা,দেখা করার একটা গুরুত্ব যে আছে সেটা এরা মানতে চায় না । টেকনোলজির যুগ হলেও কথা বলার গুরুত্বকে অস্বীকার করা যাবে না । দেখা না হতে হতে একটা সময়ের পর সুন্দর সম্পর্কটা বন্ধ হয়ে যাবে। কবে কোথায় কার বাড়ীতে একটা অনুষ্ঠান হবে তখন দেখা হবে তারপর আর সব মোবাইলে সেরে নেওয়া হবে। এভাবে সম্পর্ক টিকে থাকতে পারে না। দেখা সাক্ষাতের মাধ্যমে যোগাযোগ হওয়াটা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে একটা গুরুত্ব পূর্ণ বিষয়। আর একটা কথা হলো মোবাইলে ম্যাসেজ আদান প্রদানের জন্য কথা বার্তা বলার পরিমান একদম কমে যাচ্ছে দিন কে দিন। এর ফলে কথাবার্তা বলতে আর ইচ্ছা করবে না। ইচ্ছেটা মরে যাবে। কথা বলাটাও যে একটা আর্ট সেটা নষ্ট হয়ে যাবে। কথা বলার জন্য জিওভা, বাক যন্ত্র ব্যবহার হয়। সেটা সচল রাখার জন্য কথা বলা দরকার। কথা না বলে বলে অব্যবহারে বাক যন্ত্রের কার্য ক্ষমতা হ্রাস পেয়ে যেতে পারে। মানুষের কথা বলার সময় জিভে একটা আরস্ট ভাব এসে যেতে পারে। দুটো রক্ত মাংসের শরীর পাশাপাশি বসে কথা বললে শরীরে, মনে যে অনুভূতি আসে তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে শরীরের মধ্যে যে অনুভূতি জাগে মোবাইলে ম্যাসেজ পাঠিয়ে সেই অনুভূতি আসে না। তাই যতই গতির যুগ হোক আর ডিজিটাল এজ হোক কথা বলা দেখা করার গুরুত্ব আছে। গতির সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে যদি সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায় তবে তাতে মানব সভ্যতার উপর একটা ধাক্কা আসবে। সব যান্ত্রিক হয়ে গেলে সমাজ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা মুশকিল হয়ে যাবে , সভ্যতা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যাবে। এতো দিন পর্যন্ত মানুষ যন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতো আর আজ যেন যন্ত্র মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এটা একটা ভয়ঙ্কর বিষয় হয়ে যাচ্ছে। শেষ কালে মানুষ না পূর্বের জায়গায় ফিরে যায়। প্রাগ ঐতিহাসিক পর্বটা পিছন দিক থেকে আর হয়তো বেশি দূরে নেই ।
তিন বছর পর এক মাসের ছুটি নিয়ে তুরাবী দেশে ফিরে আসে। বাড়ী আসার পর বাবা মা মেয়ের বিয়ে নিয়ে তোড়জোড় শুরু করে দেন। পরিচিত মহলের সবাইকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে সুপাত্রর সন্ধান পেলে তা জানাবার জন্য। মেয়ে অনেক পড়াশোনা করেছে বিদেশে বড় চাকরি করে প্রচুর টাকা রোজগার করে। সেই রূপ যোগ্য পাত্রই তো চাই তার জন্য। একটা সম্মন্ধ আসে পাত্র চ্যাটার্ড একাউন্টান্ট। মা বাবা ছেলে আর ছেলের দিদি আসে মেয়ে দেখতে। পাত্রকে দেখতে শুনতে বেশ ভালো। নম্র ভদ্র শিষ্ট বলেই মনে হয়েছে। পাত্রীকে দেখে এবং তার বাড়ী ঘর দেখে পছন্দ হয়েছে পাত্র পক্ষের। ছেলের মা… তোমার নাম কি মা ? তুরাবী… তুরাবী মহালনবিস। ছেলের মা… তুমি রান্না বান্না ঘরের সব কাজকর্ম পার তো ?
তুরাবী… না, আমি ঐ সব করি নি কোন দিন।
পাত্র….মা আমি জীবন সঙ্গিনী পছন্দ করতে এসেছি, বাড়ীর জন্য ঝিঁ নিয়ে যেতে আসিনি। পাত্রর দিদি… ঠিক আছে এতে দোষের কিছু নেই। দিন কাল পাল্টিয়েছে এটা মনে থাকে না আমাদের। তবে কন্যা সন্তান মানেই তাকে গৃহ কর্মে নিপুনা হতে হবে এই ধারণাটা আস্তে আস্তে ছাড়তে হবে আমাদের। সংসারের কাজ কে কি করবে সেটা যারা সংসার করবে তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে নিতে পারলেই ভালো। মেয়ের মা…কন্যা সন্তান জন্মালে শ্বশুর বাড়ী গিয়ে অ্যাডজাস্টমেন্ট করার জন্য নিজের মনটাকে মেরে ফেলতে হতো আমাদের সময়ে। এখন দিন কাল পাল্টিয়েছে ভালো হয়েছে। এখন আর নিজের মনকে ভেঙে ফেলে অন্যের মনকে খুশি করতে হয় না। যাবার সময় পাত্রী পছন্দ হয়েছে এই সুসংবাদটা জানিয়ে যায় পাত্র পক্ষ । এরপর একটা ছুটির দিন দেখে পাত্রী পক্ষকে পাত্রর বাড়ী ঘর দেখার জন্য নিমন্ত্রণ করে যান ওনারা । তুরাবীর বাবা মায়েরও পাত্র এবং তার পরিবারের মেম্বারদের ভালো লেগেছে। এই সংবাদে একটু চিন্তায় পড়ে যায় তুরাবী। সে এক দিন আরোহীর দোকানে যায় তার সঙ্গে দেখা করে এই সব নিয়ে কথা বলতে। সেই দোকানে গিয়ে দেখে সেখানে একটা দর্জির দোকান হয়েছে। লোকের কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে আরোহীর নতুন ঠিকানায় গিয়ে ওর চক্কু ছানাবড়া হয়ে যায়। সাইন বোর্ডে লেখা আছে “INVESTMENT PLANNER AND ADVISOR Pvt Ltd,” ভিতরে ঢুকে দেখে দশ জন লোক কাজ করছে। আরোহীর কথা জিজ্ঞেস করায় এক জন বলে… এম ডি সাহেব ভিতরের ঘরে আছেন। পুরো অফিসটাই সেন্ট্রাল্লি AC করা। তুরাবী… আমি একটু স্যারের সঙ্গে দেখা করতে চাই। কর্মচারী… কি জন্য। তুরাবী… পার্সোনাল। ঐ কর্মচারী ভিতরে গিয়ে সাহেবকে বলে… স্যার তুরাবী নামে এক জন ম্যাডাম আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান। আরোহী…পাঠাও। তুরাবী… ওরে গোবর গনেশ,কি করেছিস রে ? আরোহী… বাহ্ তুই তো খুব সুন্দরী হয়েছিস। কি জেল্লা মারছে রে তোর চেহারায়। বোস বোস। তুরাবী…আমার মত একটা সুন্দরী মেয়েকে তোর একটু জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করছে না ? আরোহী… লজ্জা করে। তুরাবী… নজ্জা করে!! তুই কি আমার সঙ্গে প্রেম করিস না কি করিস তুই জানিস ? তুই আমাকে ভালোবাসিস তো ? আরোহী…. হ্যাঁ বাসি। তুরাবী….এক বার আই লাভ ইউ ও তো বলিস নি। আরোহী….আমার একটু ভয় করে তাই বলতে পারিনি। তবে বলবো। তুরাবী….কবে ? অন্য কেউ যখন আমাকে বিয়ে করে নিয়ে চলে যাবে তার পর ? আরোহী… না না , তার আগেই । তুরাবী…ঠিক আছে। এক দু দিনের মধ্যে যদি না বলিস তো তোর কপালে শনি আছে। আরোহী… এক দু দিনের মধ্যেই বলবো। তুরাবী… তার জন্য অনেক মহড়া দিতে হবে বল ? আরোহী… না না তুই আমাকে এতটা ক্যাবলা ভাবিস না প্লিজ। তুরাবী… ক্যাবলাই তো। আরোহী… ঠিক আছে লড়ে দেখিয়ে দেবো। তুরাবী…এতো উন্নতি করলি কবে ? বলিস নি তো। আরোহী… আসলে তোকে সারপ্রাইস দেবো বলেই বলিনি। তুরাবী… দ্যাখো দ্যাখো হাদা রামের মাথায় কত বুদ্ধি কিলবিল করছে । যাক ভালো হয়েছে। মাসে কত আসে ? আরোহী…আর্নিং সাম থিং মোর ওর লেস দ্যান ওয়ান লাখ পার মান্থ। তুরাবী… ওকে ফাইন। আই এম ভেরি ভেরি হ্যাপি ফর ইওর ইমপ্রুভপমেন্ট। কংগ্রাচুলেশন মাই ডিয়ার….।
আরোহী…বাট চাকরির একটা মোহ সবারই থাকে । আমারও ছিল। তুরাবী… না হয়ে তো ভালই হয়েছে। ইওর পসিশন ইস নাও বেটার দ্যান সার্ভিস। আরোহী..এস ইউ থিঙ্ক বেটার। আরোহী… হ্যাভ ইউ এনি নিউজ ফর মি ? তুরাবী…ইয়েস,বাট ভেরি ভেরি সিরিয়াস। আরোহী… ওকে, ডোন্ট বি অরিড। ম্যায় হু না। আচ্ছা তার আগে তুই বল তো তুই ঐ দেশ থেকে চলে এলি কেনো ? তুরাবী… তুই নেই বলে। আরোহী… হেয়ালি করিস না। তুরাবী… ডোন্ট বি সিল্লি। আই এম টকিং সিরিয়াসলি। আরোহী… এখন বল তুই কি সিরিয়াস খবর নিয়ে এসেছিস। তুরাবী… আমার বাবা আমার বিয়ের জন্য পাত্র দেখছে। এর মধ্যে একটা পাত্র এসেছিল। ছেলেটি CA, আমার বাবা এবং মায়ের খুব পছন্দ। পাত্র পক্ষও আমাকে পছন্দ করেছে। এবার কি হবে ? আরোহী… কি হবে ? তুরাবী…সেটা তুই বলবি। আরোহী… আমি বলবো ? তুরাবী… হ্যাঁ, তুই। ছ্যাবলামো করবি না। তাহলে তোকে আমি মেরে ফেলবো একদম। আরোহী… কিন্তু আমি কি বলবো ?
তুরাবী… একদম ফাজলামো করবি না বলে দিলাম। তাহলে তোর খবর আছে। আরোহী… আমাকে কি বলতে হবে ? তুরাবী… তুই কি একটা ন্যাকা চৈতন্য ? জানিস না এই সময় কি বলতে হয়। আরোহী… কিন্তু তুই এত বড় শিক্ষিত, এত বড় বিদেশী চাকরি তোর!! তুরাবী… তুই বা কম কিসে ? তোর মত একটা প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি আছে আমার বা ঐ ছেলের। তুই অনেক যোগ্য একটা ছেলে। তোর একটাই দোষ তুই একটা ভীতুর ডিম । এই জন্য তোর গার্ল ফ্রেন্ড জোটেনি। জোটেনি বলে আমি খুশি। আমি সেই জায়গাটা ফাঁকা পেয়ে গেছি।
আরোহী… এখন আমাকে কি করতে হবে তুই বলে দে মাইরি । তুরাবী… শোন তুই একদম নার্ভাস হবি না । তুই আমার বাবার কাছে যাবি। গিয়ে বলবি কাকু আমি তুরাবীকে ভালোবাসি এবং ওকে বিয়ে করতে চাই। আরোহী… কিন্তু আমি কি পারবো বলতে ? তুরাবী… এই ছেলে এই,তোকে পারতে হবে হাদারাম। নাহলে তুই আমার হাতে মরবি। কেনো আমাকে তোর পছন্দ না ? আমি দেখতে সুন্দরী না ? আরোহী… ভীষণ সুন্দর তুই,আর আমি তোকে ভীষণ পচিন্দ করি । আমি তোকে খুব ভালোবাসি রে । তুরাবী… যাকে তুই ভালোবাসিস তার জন্য এটুকু করতে পারবি না ? তোর ভালোবাসার মানুষটাকে যখন তোর চোখের সামনে দিয়ে অন্য একজন বিয়ে করে নিয়ে চলে যাবে সেটা তুই দেখতে পারবি ? বল পারবি ? আর আমি যখন অন্য এক জনের সন্তানের মা হবো তখন কেমন হবে ? আরোহী…কাকু যদি রেগে যান । তুরাবী… যাবে যাবে,তাতে তোর কি। তুই তোর ভালোবাসার অধিকার নিয়ে গেছিস। ডো’ন্ট ওরি আই এম উইথ ইউ। তুই একদম ঘাবরাবি না। সেরকম হলে আমরা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করবো। কি পারবি না আমাকে নিয়ে পালিয়ে যেতে ? আরোহী… হ্যাঁ পারবো। তোর জন্য আমি সব কিছু করতে পারবো। তুরাবী…তবে, এই কথা গুলো মনের মধ্যে চেপে চুপ করে বসে ছিলি। আর আমার বাবা রেগে যাবেন না। তুই যথেষ্ট যোগ্য ছেলে।
তাছাড়া আমি আমার বাবাকে বুঝিয়ে বলবো তোর কথা। আরোহী… আমি তো তোর বাড়ী চিনি না। তুরাবী… তুই BMW গাড়ি নিয়ে যাবি। বারাসাত চাঁপাডালি মোরে পৌঁছে আমাকে ফোন করবি। আমি গিয়ে তোকে নিয়ে এসে বাবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবো। চা বিস্কুট খেয়ে আস্তে ধীরে গুছিয়ে সব বলবি বাবাকে। আমি তোর পাশে বসে থাকবো। তুই ছিলি বিড়াল হয়েছিস বাঘ । এখনো যদি ভয় পাস তো কবে সাহসী হবি ? আরোহী…আমি পারবো ঠিক পারবো। তুরাবী…
তোতলাচ্ছিস কেনো ? তুই কি আমাকে ভয় পাস ? আরোহী… না ভয় পাই না। নার্ভাসে ও রকম হয়। তুরাবী….এই ছেলে এই তুই কি আমাকে ভয় পাস ? আমাকে ভালোবাসিস অথচ আই লাভ ইউ এই কথাটা বলতে পারলি না । বল আই লাভ ইউ। আরোহী… বলবো পরে বলবো। তুরাবী… না,এখনোই বল। আমি শুনতে চাই। ফোনে তো সোনা, মনা কত কি বলতিস আর এখন প্রেম করতে বলছি, আই লাভ ইউ বলতে বলছি আর ওমনি বেলুন ফেটে ফুস করে সব হওয়া হয়ে বেরিয়ে গেলো। আরোহী, এক জন কর্মচারীকে ডাক দিয়ে এক তোরা ফুল নিয়ে আসতে বলে। আরোহী, হাঁটু গেড়ে বসে দুই হাতে ফুলের তোরা তুরাবীর দিকে এগিয়ে ধরে বলে… তুরাবী আই লাভ ইউ। তুরাবী… বাহ্ ফাইন। আমার গোবর গনেশ মানুষ হয়ে গেছে। আর কোন কষ্ট নেই আমার। থ্যাংক ইউ। আরোহী… তুই কি খাবি বল। তুরাবী…এখানে না, রেস্টুরেন্টে চল। আরোহী…. চল। ওরা গাড়ি করে দুজনে রেস্টুরেন্টে যায়। তুরাবী…. আমাকে একটু জড়িয়ে ধর না। আরোহী…আমার লজ্জা করে। কেউ যদি দেখে ফেলে। তুরাবী… আরে আমি তোর হবু বৌ। বৌকে জড়িয়ে ধরবি তো লজ্জা কিসের। আর কেউ যদি দ্যাখে তো দেখবে তাতে আমাদের কি। তাছাড়া গাড়ির তো কাচ
তোলা আছে। আজকাল অল্প বয়সি মেযেরা বিয়ের আগে প্রচুর বার্থ কন্ট্রোল পিল খাচ্ছে এলোপাথাড়ি । এই ভাবে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত পিল খাবার জন্য বা অতিরিক্ত স্মোকিং করার জন্য পরবর্তী কালে ঐ সব মেয়েদের শরীরে নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। এমন কি ব্রেস্ট ক্যান্সারের মত মারাত্মক রোগও দেখা দিতে পারে। গায়ে ৱ্যাস বের হতে পারে বা অন্যান্য অনেক সমস্যাই হতে পারে।
এক রবিবার বিকেল বেলা আরোহী BMW গাড়ি নিয়ে বারাসাত চাঁপাডালি মোরে যায়। লোকের কাছে জিজ্ঞেস করে চাপাডালি মোর থেকে একটু এগিয়ে ডান দিকে ঘুরে বিবেকানন্দ রোডে ওর গাড়ি ঢুকে যায়। কিছুটা গিয়ে তুরাবীর বাবার নাম বলতেই লোকে বাড়ীটা দেখিয়ে দেয়। বাড়ীর গেটে দাঁড়িয়ে কলিং বেল বাজায় আরোহী। তুরাবীর বাবা এসে দরজা খুলে দ্যাখে এক জন দাঁড়িয়ে আছে। কোট,প্যান্ট,টাই পড়া একটা স্মার্ট ঝকঝকে ছেলে। চেহারার মধ্যে একটা উচ্চ মার্গের ছাপ আছে, বৈভবের পরিচয় আছে। দেখে সম্ভ্রম জাগে মনে । তুরাবীর বাবা…আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না ? আরোহী… আমি আরোহী, তুরাবীর বন্ধু। ও আছে ? বাবা… হ্যাঁ আছে। এসো ভিতরে এসো। আমি তুরাবীকে ডেকে দিচ্ছি। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তুরাবী এসে পরে। তুরাবী..আরে হাদারাম তুই চিনে চলে আসলি একা একা । বাবা এই যে আরোহী আমরা ছোট বেলায় যেখানে ভাড়া থাকতাম তার পাশের বাড়ীতে ওরা ভাড়া থাকতো। ও আর আমি এক সঙ্গে পড়তাম। তারপর ওখান থেকে চলে আসার পর আর তো কোন যোগাযোগ ছিল না। মাঝ খানে আমি পিসির বাড়ী গিয়েছিলাম তখন ওর সঙ্গে আমার দেখা হয়। ও একটা প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির মালিক। ওর অফিসে দশ জন কর্মচারী কাজ করে। ও বি টেক পাশ করে এই ব্যবসা শুরু করে ছিল একা একা। এখন বিরাট সাকসেস পেয়েছে। বাবা…. ও আচ্ছা আচ্ছা। ভালো খুব ভালো। মা বাবা কেমন আছেন ? আরোহী… ভালো আছেন। তুরাবী… তুই বোস আমি চা নিয়ে আসছি। বাবা তুমি চা খাবে ? বাবা.. দিস একটু। চা খাওয়া হয়ে গেলে আরোহী বলে… কাকা বাবু আমি একটা অনুরোধ নিয়ে এসেছি আপনার কাছে। কাকা বাবু… আচ্ছা বলো। তুমি কি বলতে চাও। আরোহী… কাকা বাবু আমি তুরাবীকে ভালোবাসি। ওকে বিয়ে করার অনুরোধ নিয়ে আপনার কাছে এসেছি। কাকা বাবু… কিন্তু আমি তো বিষয়টা জানতাম না। এই মুহূর্তে আমি কিছু বলতে পারবো না। আমি ভালো করে শুনবো জানবো তারপর যা বলার বলবো। আরোহী… আমি তাহলে আসি। তুরাবী..বেশ ভালই তো বল্লি। পারবো না পারবো না করছিলিস। আমি রাতে খেতে বসে বাবাকে বুঝিয়ে বলবো। তোকে দেখে তো বাবা ভড়কে গেছে। তোর মত জামাই বাবা পাবে নাকি। ঠিক আছে সাবধানে যাস। আরোহী… ওকে বাই।
রাত এগারোটার সময় আরোহী ফোন করে তুরাবীকে। তুরাবী… কি রে,কি ব্যাপার। খুব খুশি মনে হচ্ছে। আমার মত একটা সুন্দরী বৌ পাবি তাই খুব খুশি বল। আর আমাকে ভয় পাবি না তো ? আরে বৌকে কেউ ভয় পায় নাকি হাদা। আরোহী… আসলে তোর কাছে আসলেই আমি কেমন অবধ শিশু হয়ে যাই। আমার সব তালগোল পাকিয়ে যায়। তুরাবী….আমি কলকাতায় যে কোম্পানিতে চাকরি করতাম সেই কোম্পানির এম ডি র সঙ্গে আমার একটা ঝামেলা হয়েছিল। সেটা তোকে বল হয় নি। এক দিন অফিস ছুটির সময় এম ডি আমাকে একটা কাজ দিয়ে বলে এই কাজটা আর্জেন্ট আছে একটু করে দিয়ে যান প্লিজ। নাহলে অর্ডারটা হাত ছাড়া হয়ে যাবে। আমি সিম্পপ্যাথি দেখিয়ে কাজটা করে দেই। তখন সবাই অফিস থেকে বেরিয়ে গেছে। আমি আছি আর এম ডি সাহেব আছেন। কাজটা হয়ে গেলে এম ডি সাহেব কিছু ফুড আর ড্রিঙ্কস অফার করে আমাকে। আমি তো কিছুতেই ফুড আর ড্রিঙ্কস নেবো না। শেষে জোরাজুরি শুরু করে দেয়। আমি বুঝতে পেরে যাই ওনার উদ্দেশ্য। তখন আমি আপ্রাণ চেষ্টা করি ওর হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে। আমি উপায় না পেয়ে মদের বোতল দিয়ে ওর মাথায় আঘাত করি। ও পরে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। আমি অফিস থেকে বেরিয়ে বাড়ী চলে আসি। আমি আর ঐ অফিসে যাই নি। পরে শুনেছি ঐ শয়তানটা কয়েক দিন হসপিটালে ভর্তি থেকে ভালো হয়ে বাড়ী ফিরে গেছে। মেয়েদের কোথাও নিরাপত্তা নেই। আরোহী… তুই ঐ শয়তানটাকে জেল খাটালি না কেনো। তুরাবী…. আমি জেল খাটাতে চেয়েছিলাম কিন্তু বাবা বললো ঐ সব ঝামেলা আমরা পোহাতে পারবো না। তুই ছেড়ে দে। ঐ চাকরিতে আর যাস না। C C TV র ফুটেজ কোর্টে দাখিল করলে ওর জেল হয়ে যেত। কিন্তু বাবা ছেড়ে দিলো। আরোহী…
কাকু আমাদের বিষয়ে কি বললেন সেটা তো বল। তুরাবী… সেটা সাসপেন্স এ থাক। কাল বলবো। ফার্স্ট ইন্টারভিউ এর এক্সপেরিয়েন্সটা কেমন লাগলো একটু বল শুনি। আরোহী… আমার ভাবতে খুব ভয় লাগে। আমার ভালো কিছু হবে এটা আমি ডিজার্ভ করতে পারি না। সেই দিক থেকে ভালই বলতে হবে কারণ বিপদে পড়তে হয় নি আর মান সম্মান খোয়াতে হয় নি তার জন্য। তুরাবী…. রেজাল্ট এখন বলবো না। আরোহী… বুঝতে পেরেছি। তার মানে সিওর ফেল। তুরাবী…সব ঠিক হ্যায় স্যার, আপ চিন্তা মত কিজিয়ে জনাব । মুঝে নিদ্ আগিয়া, আপকো ভী আনা চাহিয়ে, হ্যায় না ? লেট্ আস সি টুমোরো , বাই । আরোহী…. ওকে বাই। বি হ্যাপি।
পরের দিন তুরাবী আরোহীর অফিসে যায় নির্ধারিত ডেট সেডুউলের টাইম অনুযায়ী আড্ডা মারতে। তুরাবী…, গুড আফটার নূন স্যার। আরোহী… ওকে ম্যাম। মোস্ট ওয়েলকাম। তুরাবী… কি সাহেবের ঘুম হয় নি তো ? আরে আমাকে পাবার জন্য তো একটা দুটো রাত জাগতে হতেই পারে তাই না ? আর তাছাড়া বিনা কষ্টে বিনা সাধনায় কিছু পেলে তার আনন্দ ম্যারমেরে হয়ে যায়। তাই একটু কষ্ট করে পাওয়া উচিৎ । সহজ লভ্য কোন কিছুর আমরা মূল্য দিতে চাই না। বাবার ডিসিশনটা শোনার জন্য হাঁপিয়ে উঠেছেন তো স্যার। আরোহী… হ্যাঁ বলুন প্লিজ। দেখি আমার ভাগ্য দেবতা কি লিখে রেখেছেন আমার ললাটে। তুরাবী… বাবা বলেছে যে শুধু আমার মত থাকলেই তো আর বিয়ে হয়ে যাবে না আরোহীর মা বাবারও তো মত থাকা চাই এই বিয়েতে। ওনাদের যদি মত থাকে তবে আমার আপত্তি থাকবে না। ক্লিয়ার, সমাজ গয়া সব। আরোহী… ইয়েস, মাই উড বি। আই এম ক্লিয়ার। ব্রিলিয়ান্ট ডিসিশন ওনার। ওনাকে সেলুট। তুরাবী… আচ্ছা এবার তাহলে তোর কাজ কি ? আরোহী… বল আমার কি কাজ। তুরাবী… ওরে হাদারাম এটাও আমাকে বাতলে দিতে হবে। ঠিক হ্যায়, লেকিন থোৱা ইনাম লাগেগা জাহাঁপনা । আরোহী… ঠিক হ্যায় মিল জায়গা। পহেলে তো আপ মেরা কাম বাতলাইয়ে । তুরাবী… তুই বাড়ী যাবার সময় ভালো খাবার কিনে নিয়ে যাবি। মা কে বলবি একটা ভালো খবর আছে। তারপর খাওয়া দাওয়া হয়ে গেলে মাকে বলবি মা তোমার সেই তুরাবীর কথা মনে আছে ? মা তখন আমার খবর জানার জন্য খুব উৎসুখ হয়ে উঠবে । তখন তুই আস্তে আস্তে ধীরে ধীরে মগস ধোলাই করবি। ব্যাস, কাম হো জায়েগা। মা নিজে রাজি হবে এরপর মা বাবাকে রাজি করাবে। তারপর দেখবি সানাই বেজে গেছে প্যা প্যা করে। আরোহী… বাপরে তুই এক্কেবারে পাঁকা বুড়ি। বুড়ি মা আপনার সাজেশনের জন্য বহুত বহুত শুক্রিয়া।
তুরাবী… তুই তাহলে কাজটা সেরে আমাকে জানাবি। আমি এখন উঠছি। অন্য একটা জায়গায় যাবো। অনেক জায়গায় আমাকে দেখা করতে হচ্ছে । দেখছিস তো অনেক দিন পর বাড়ী আসার পর আমি কেমন সেলিব্রিটির মত সম্মান পাচ্ছি। আমার কেমন দাম বেড়ে গেছে। এটাই তো মজার। বুঝলি হাদারাম।
আরোহী তুরাবীর প্ল্যান মত কাজটা করে মাকে পটিয়ে ফ্যালে। মা রাজি হয়ে যায়। তবে মা তুরাবীকে দেখতে চেয়েছে। তুরাবীকে এক দিন বাড়ী নিয়ে যেতে হবে। মা কথা দিয়েছে যদি তুরাবীকে দেখে মায়ের পছন্দ হয়ে যায় তবে মা বাবাকে রাজি করাতে পারবে। আরোহী… হ্যালো তুরাবী মা রাজি তবে তোকে দেখতে চেয়েছে। আর যদি তোকে দেখে মায়ের পছন্দ হয়ে যায় তবে মা বাবাকে রাজি করাবার দায়িত্ব নেবে। তুই তাহলে এক দিন আয় আমাদের বাড়ী । তুরাবী… ওকে নো প্রবলেম। কবে যেতে হবে বলে দিস আমি চলে যাবো। কাল বললে কালই যেতে পারি। আরোহী.. কাল না তুই পরশু দিন আয়। আমি মাকে বলে রাখবো তোর আসার কথা। তুরাবী.. ওকে, রাইট। আমি পাশ করে গেছি হাদারাম। তুরাবী, সুন্দরী অভিসারিকার মত সেজে গুজে আরোহীদের বাড়ী যেন অভিসারে যায়। দেখে চোখ ফেরানো মুশকিল। আরোহী… মা এই যে তুরাবী। মা… বাপরে বাপ কি সুন্দরী হয়েছিস রে মা তুই। তুইই আমার ছেলের বৌ, আমার ঘরের লক্ষ্মী। কপাল বটে আরোহীর। কেমন আছিস মা। সেই কত যুগ পরে দেখা হলো। মা কেমন আছেন ? বাবা কেমন আছেন ? তুরাবী… সবাই ভালো আছেন। কাকিমা আমি পাশ তো ? মানে আমাকে আপনার পছন্দ হয়েছে তো। না হলে আমি আপনার পায়ে পরে যাবো। মা.. তোকে পছন্দ না হয়ে পারে ? আমাদের পরম সৌভাগ্য তোর মত মেয়ে বৌ হয়ে আমাদের বাড়ীতে আসবে। তুরাবী… কাকি মা আরোহীই বা কম কিসে। ও যথেষ্ট যোগ্য ছেলে। আমার বাবা ওকে পছন্দ করেছে। মা… তুমি আরোহীর ঘরে গিয়ে বসো আমি তোমাদের জন্য চা জল খাবার নিয়ে আসছি। তুরাবী…কাকি মা আমি কি একটু সাহায্য করবো আপনাকে ? মা.. না না তার দরকার হবে না। তুমি গিয়ে বসো। তুরাবী… কি রে হাদারাম। পাশ সব জায়গায় পাশ। সানাই তো বেজে গেছে কি বলিস। আরোহী… ঠিক বলেছিস। সব তোর জন্য হলো। থাঙ্কস সোনা। তুরাবী… আজকে একটা কথা বলছি তোকে। সেই ছোট বেলাকার কথা। তুই,আমি,আমরা সবাই তো দোলের দিন রং খেলে খুব আনন্দ করতাম, মজা করতাম। নিশ্চয়ই তোর মনে আছে আমাদের সেই সব দিনের কথা। তাই না ? একবার দোলে তুই আমার মাথার সিঁথিতে আবির দেবার নাম করে সিঁদুর ঘষে দিয়েছিলিস। লজ্জায় আমার মুখটা লাল হয়ে গিয়েছিল। আমি চট করে বাথ রুমে গিয়ে জল দিয়ে ধুঁয়ে ফেলেছিলাম কেউ দেখে ফেলার আগে। কেউ দেখে ফেললে কি কেলেঙ্কারিটাই না হতো সে দিন। আমি সমাজে মুখ দেখাতে পারতাম না। আমি সেই দিন থেকে তোকে আমার স্বামী বলে মনে মনে ভেবে এসেছি। আজ সেটা সফল হলো। তাই আমার মনে এখন বাঁধ ভাঙা আনন্দ। কি করবো ভেবে পাচ্ছি না। দিশাহারা হয়ে যাচ্ছি। তুই হাদারাম চুপচাপ থাকসিস কেমন করে ? বৌয়ের আনন্দে তোর আনন্দ হওয়া উচিৎ। এই ছেলে এই,চল আমরা একটা পার্টি থ্রো করি। তুই যদি ব্যাগরবাই করিস না তোর খবর আছে। আরোহী….প্লিজ কুল ডাউন তুরাবী। উই শ্যাল মাস্ট থ্রো এ পার্টি। বাট নট নাউ। আফটার টু ডে’স। তুরাবী… এই ছেলে এই, প্রেমের মজা নিবি আর ঝিমিয়ে থাকবি এটা তো হবে না। চল আমরা এখনই বিয়ে করবো। ম্যারেজ অফিসারের বাড়ী চল,আমরা এখনই বিয়ে করবো। তাহলে তুই বল যে আমি তোর বৌ ? তোর কিসের ভয় কিসের লজ্জা ? আরোহী… বিফোর মেকিং অর্র্যাঞ্জমেন্ট উই হ্যাভ টু সেডুউল এ ডেট এন্ড প্রিপেয়ার এ লিস্ট অফ ক্যান্ডিডেট। দেন উই শ্যাল স্টার্ট এ পার্টি। তুরাবী…ওকে ইউ শুড টেক দ্যা হোল রেসপোনসিবিলিটি ফর দ্যা পার্টি।
দু দিন পর আরোহী ফোন করে তুরাবীকে বলে হ্যালো তুরাবী মা ডিক্লেয়ার করে দিয়েছে। আমাদের বিয়ের সানাই বেজে গেছে। তুই শুনতে পাচ্ছিস ? পাচ্ছিস তো ?এবার আমরা পার্টি দেবো। মা আর বাবা এর মধ্যে তোদের বাড়ী যাবে আর ঐ দিনই বিয়ের আংটি তোর আঙুলে পড়িয়ে দিয়ে আসবে । কি খুশির খবর না ? বল ? তুরাবী… হ্যাঁ, ভীষণ খুশির খবর। আমার তো নাচতে ইচ্ছা করছে। অনেক দিন কোন অনুষ্ঠানে নাচা হয় না। চল আজ আমারা পার্টিতে নাচবো ।
ওরা একটা পার্টি অরেঞ্জ করে দশ বারো জন বন্ধু বান্ধব মিলে। সেখানে প্রচুর ফুড থাকে থাকে সফ্ট ড্রিঙ্কস। হই হুল্লোড় মজার মাত্ৰা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। পার্টি এন্ড করে বাড়ী ফিরতে গিয়ে আরোহীদের গাড়ি এক্সিডেন্ট করে। আরোহীর মাথায়,হাতে, কপালে আঘাত লাগে। গাড়ির সামনেটা দুমড়ে যায়। এই ঘটনায় তুরাবী খুব কষ্ট পায়। অনুশোচনায় সে কেঁদে ফেলে ঝড় ঝড় করে। আরোহীকে ও নিজের থেকেও বেশি ভালো বাসে। সরকারি হসপিটালে নিতে গিয়ে মনে পরে যায় যে সরকারি হসপিটালে গেলে জাল ওষুধ বা ডেট এক্সপেয়ারি হওয়া ওষুধ ব্যবহার করা হতে পারে। তাই ওরা সরকারি হসপিটালে না গিয়ে সল্টলেকের বাইপাশে একটা বেসরকারি হসপিটালে যায়। তুরাবী বাবাকে ফোন করে সব বলে দেয় এবং টাকা নিয়ে তাড়াতাড়ি চলে আসতে বলে। বাবা খবরটা শোনা মাত্র নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে এসে পড়েন । বাবা তাড়াতাড়ি চলে আসাতে তুরাবীর একটু সাহস বারে। একটু হলেও মনে বল পায়। ওনি এসে আরোহীর মা বাবাকে খবর দেন। অতিরিক্ত রক্ত খরণের ফলে বাইরে থেকে রক্ত দেবার প্রয়োজন হয়। তিন বোতল রক্ত লাগবে বলে হসপিটালের ডাক্তার বাবুরা জানান। তুরাবীর বাবা তাড়াতাড়ি করে গাড়ি চালিয়ে ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে রক্ত কিনে নিয়ে আসেন যুদ্ধ কালীন তৎপরতায় । তুরাবী ডাক্তার বাবুকে বলে যত টাকা লাগে আমরা দেবো আপনি আরোহীকে বাঁচান। প্লিজ ডু এস ইউ থিঙ্ক বেটার ফর রেস্টেরেশন অফ হিস্ হেলথ । আস্তে আস্তে আরোহী চিকিৎসায় সারা দেয়। চিকুৎসার দায়িত্বে থাকা ডাক্তার বাবুরাও স্বস্তি বোধ করেন। ডাকরার বাবু জানিয়ে দেন যে আর ভয় নেই। ওনি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবেন। সেখানে পনেরো দিন ভর্তি থাকতে হয় আরোহীকে । মাথায়, কপালে হাতে চোট লেগেছিল ভলোই । প্রত্যেক দিন দুবেলা তুরাবী হসপিটালে গিয়ে দেখা করে এবং সাহস যোগায় আরোহীকে । আরোহী তুরাবীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে কিন্তু কিছু বলে না । তুরাবী…. ডু ইউ রিকোগনাইস মি ? ক্যা’ন্ট রিকোগনাইস মি ? ওঃ মাই গড ! প্লিজ ট্রাই টু রিকোগনাইস মি আরোহী। আই এম তুরাবী। আরোহী…খুব ভয় গেছিস তো ? বেশ ভালোই তো আছি রোজ রোজ তোর সেবা যত্ন পাচ্ছি। এর থেকে আবার ভালো জীবন হয় নাকি ? আমার তো মনে হচ্ছে সারা জীবন যদি হসপিটালে থেকে যেতে পারতাম তাহলে খুব ভালো হতো। অসুস্থ হলে তো আশেপাশে লোকজন দেখতে পাওয়া যায়। তাতে বেশ ভালই লাগে। সুস্থ হয়ে গেলেই তো আবার একা হয়ে যাবো। তুরাবী… না একদমই না। ওরকম বলিস না। তুই তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে বাড়ী চল। আমি একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। আমি খুব ভয়ে ভয়ে আছি। এরপর তুই বাড়ী গিয়ে আমার সেবা করবি। আমি আর কোন দিন পার্টির জন্য তোকে চাপ দেবো না। যন্ত্রনা দেবো না জ্বালাবো না। আমি খুব শান্ত হয়ে যাবো। আমার সঙ্গে লড়াই করে আমাকে হারাতে পারবি তো ? আরোহী…আমি কি লড়াই করবো ? তুরাবী… যে লড়াই সবাই করে বৌয়ের সঙ্গে । আরোহী…. জানি না আমি কি পারবো আর কি না পারবো ? তুরাবী… তবে কি আমাকে শোকেসে সাজিয়ে রাখবি নাকি ? বলোদ একটা। পনেরো দিন পর সুস্থ হয়ে আরোহী বাড়ী ফিরে আসে। তুরাবীকে ফার্স্ট এইড করে সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। তারপর তুরাবী কল সিডুউল করে সার্ফ রাত দশটা চল্লিশ মিনিটে ঠিক টাইমে ফোন কল করে। আরোহী হ্যালো বলার সঙ্গে সঙ্গে তুরাবী আবার কেঁদে ফেলে। আর কোন দিন হই, হুল্লোড়,উল্লাস করবে না বলে তুরাবী প্রমিস করে। একটা বড় ভুল হয়ে গেছে প্লিজ ফরগিভ মি।
এর অল্প কিছু দিনের মধ্যে ওদের বিয়ে হয়ে যায়। তুরাবী আরোহীর কোম্পানিতে জয়েন করে এস এ পার্টনার। আরোহী… তুই কানাডা যাবি না ? তুরাবী… ওখানে তো তুই নেই।
আরোহী বহু দিন বহু চেষ্টা করেও এক জন গার্ল ফ্রেন্ড জোগাড় করতে পারে নি। ওর ছোট বেলার বান্ধবী যে ওর গার্ল ফ্রেন্ড হয়ে ওকে খুঁজে বেড়াচ্ছে সেটা ও জানতেও পারেনি আর বুঝতেও পারেনি। জানতে পেরে বিষয়টা ওর কাছে কাকতালীয় বলে মনে হয়েছে। ঘটনাটা কাকতালীয় হোলেও বাস্তবে রূপ পেয়েছে । তুরাবীর জেদের জয় হয় আর ওদের ভালোবাসা সফল হয় ।
সমাপ্ত
![]()







