ছিদ্রপুরাণ
সুবর্ণ রুদ্র
**যেখানে ফোঁটা, সেখানেই সিঁড়ি**
গোবিন্দ পোদ্দারের জীবনের সবচেয়ে বড় ধ্রুবক ছিল মাথার ওপরের ছাদ থেকে টুপ…টুপ… করে জল পড়া। সেঁকরা পাড়া লেনের এই দেড় কামরার ভাড়াবাড়িতে গত সাত বছর ধরে এই একটাই জিনিস অপরিবর্তিত। ঋতু বদলায়, সরকার বদলায়, পাড়ার রকবাজ ছোকরাদের চুলের ছাঁট আর প্রেমিকা বদলায়, কিন্তু গোবিন্দর মাথার ঠিক আড়াই হাত ওপরে, ছাদের কোণ ঘেঁষা ফাটলটা থেকে জলের ফোঁটা পড়ার ছন্দ বদলায় না। বর্ষায় সে ফোঁটা হয়ে ওঠে জলধারা, গ্রীষ্মে করুণ কান্না, আর শীতে দীর্ঘশ্বাস।
গোবিন্দ চাকরি করে জলসম্পদ দপ্তরের এক প্রায়-বিলুপ্তপ্রায় বিভাগে, যার নাম ‘পুষ্করিণী ও ডোবা সংস্কার শাখা’। কাজ বলতে কিছুই না। সারাদিন ফাইলে ধুলো ঝাড়া, চায়ের ভাঁড়ে ফুঁ দেওয়া, আর সহকর্মী বটব্যালদার সঙ্গে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা করা। বটব্যালদা মনে করেন, দেশের আসল সমস্যা জনসংখ্যা। গোবিন্দ মনে করে, দেশের আসল সমস্যা হল টুপ…টুপ… জল পড়া। কারণ সব সমস্যার শুরু তো একটা ফোঁটা দিয়েই।
সেদিন অফিস থেকে ফিরে ভেজা জামা ছাড়তে ছাড়তে গোবিন্দ দেখল, তার স্ত্রী মঞ্জু একটা অ্যালুমিনিয়ামের গামলা পেতে রেখেছে ঠিক ফোঁটাটার নিচে। গামলার কানায় কানায় জল।
মঞ্জু রুটি বেলতে বেলতে বলল, “শোনো, বাড়িওলাকে আজ ফোন করেছিলাম। বলল, সামনের মাসে দেখব। গত তিন বছর ধরে তো সামনের মাসেই দেখে যাচ্ছে লোকটা।”
গোবিন্দ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “কি আর করবে, বলো? নিজের বাড়ি নয়। সব সহ্য করতে হবে।”
“সহ্য তো আমি করছি। তোমার তো সারাদিন অফিসে গিয়ে বটব্যালদার সঙ্গে দেশের উদ্ধার! এদিকে আমার রান্নাঘরে ঝোল, শোবার ঘরে জল। জীবনটা একটা ওয়াটারপার্ক হয়ে গেল।”
গোবিন্দর এই কথাটা গায়ে লাগল। সত্যিই তো। সে একটা আস্ত অপদার্থ। না পারে অফিসের কাজে মন দিতে, না পারে বাড়ির ছাদ সারাতে। তার জীবনটাও ওই ফাটলের মতো, যেখান থেকে সুখ-শান্তি সব চুঁইয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। রাতে খেতে বসে গোবিন্দ বলল, “ভাবছি, চাকরিটা ছেড়ে দেব।”
মঞ্জু ভুরু কুঁচকে তাকাল। তার তাকানোর মধ্যে এমন একটা কিছু ছিল, যা দেখে গোবিন্দর মনে হল, সে চাকরি ছাড়ার কথা নয়, বরং হিমালয়ে সাধু হতে যাওয়ার কথা বলেছে।
“ছেড়ে দিয়ে কি করবে? পাড়ার মোড়ে চপ ভাজবে?”
“আরে না! মানে, এই চাকরিতে কোনও ভবিষ্যৎ নেই। তার চেয়ে অন্য কিছু…”
“অন্য কিছুটা কি?” মঞ্জুর গলায় ঝাঁঝ।
গোবিন্দ চুপ করে গেল। সত্যিই তো, অন্য কিছুটা কি, সে নিজেও জানে না। তার জীবনটা যেন একটা দিশাহীন নৌকা, শুধু টুপ…টুপ… শব্দ টা তার বৈঠার মতো ছপছপ শব্দ করে চলেছে।
এর ঠিক দু’দিন পরেই বিনা মেঘে বজ্রাঘাত হল। সরকার বাহাদুর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ‘পুষ্করিণী ও ডোবা সংস্কার শাখা’-র মতো অবান্তর বিভাগগুলো বন্ধ করে দেওয়া হবে। সবাইকে তিন মাসের মাইনে দিয়ে গোল্ডেন হ্যান্ডশেক। বটব্যালদা খবরটা শুনেই চেয়ারে ঢলে পড়লেন। গোবিন্দ পাথর। তার মনে হল, ছাদের ফাটলটা এবার তার মাথায় নয়, কপালে এসে পড়েছে।
পরের কয়েকটা দিন দুঃস্বপ্নের মতো কাটল। মঞ্জু প্রথমে খুব কাঁদাকাটি করল, তারপর শাশুড়ির দেওয়া পুরনো সোনার বালা দুটো বের করে বলল, “এটা দিয়ে কিছু একটা শুরু করো।” গোবিন্দর বুকটা ফেটে গেল। সে একজন পুরুষমানুষ, অথচ স্ত্রীর গয়নার ওপর ভরসা করে তাকে বাঁচতে হবে? ছিঃ!
মাথায় হাজারটা চিন্তা নিয়ে গোবিন্দ সেদিন সন্ধ্যায় গঙ্গার ঘাটের দিকে হাঁটতে লাগল। জীবনের সব রাস্তা যখন বন্ধ মনে হয়, কলকাতার মানুষেরা কেন যেন গঙ্গার কাছেই ছুটে যায়। হয়তো ওই বিশাল জলরাশির কাছে নিজের সমস্যাগুলোকে খুব তুচ্ছ মনে হয়। ঘাটের এক পাশে এক জটাজুটধারী সাধুবাবা বসেছিলেন। পরনে এক চিলতে কাপড়, সারা গায়ে ছাই মাখা। সামনে একটা ত্রিশূল পোঁতা। লোকটা কেমন যেন অদ্ভুত চোখে গোবিন্দর দিকে তাকিয়ে হাসল।
গোবিন্দ পাশ কাটাতে যেতেই সাধুবাবা বলে উঠল, “ওহে বাবু, সমস্যা কিসের? ফোঁটাতে তো ফোকর।”
গোবিন্দ চমকে দাঁড়াল। লোকটা তার বাড়ির জল পড়ার কথা জানল কি করে? নাকি এটা নিছকই কথার কথা?
সে আমতা আমতা করে বলল, “কিছু না বাবা। এমনি…”
“সবই এমনি। জীবনটাও এমনি, মরণটাও এমনি। কিন্তু যেখানে ফোঁটা পড়ে, সেখানেই মাটি নরম হয়। সেখানেই শিকড় ঢোকানোর সুযোগ। যা, ফোঁকরটা খুঁজে বার কর।” সাধুবাবা আবার খ্যাকখ্যাক করে হাসতে লাগল।
গোবিন্দর মাথায় কথাটা ঢুকে গেল। ‘যেখানে ফোঁটা, সেখানেই ফোকর’। এর মানে কি? সে সারা রাত ঘুমাতে পারল না। মাথার উপরে টুপ…টুপ… শব্দটা যেন আজ আর বিরক্তিকর নয়, বরং রহস্যময় মনে হচ্ছে। যেন কোনও সংকেত।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে গোবিন্দ একটা মই জোগাড় করল। সে ঠিক করল, আজ ছাদের ফাটলের উৎস সে খুঁজে বের করবেই। বাড়িওয়ালা হারাধন কাকু নিচের তলায় থাকেন। খিটখিটে, কৃপণ লোক। গোবিন্দকে মই নিয়ে ছাদে উঠতে দেখে তেড়ে এলেন।
“এ কি হচ্ছে? ছাদে কি? আমার পারিজাত গাছের টব ভাঙবে নাকি?”
গোবিন্দ মিনতি করে বলল, “কাকু, শুধু একবার দেখব জলটা আসছে কোথা থেকে। আপনারই তো বাড়ি।”
হারাদন কাকু গরগর করতে করতে চাবি দিলেন। ছাদটা বহুদিনের অব্যবহারে নোংরা। এক কোণে একটা ছোট চিলেকোঠার ঘর, সেটা তালাবন্ধ। গোবিন্দ দেখল, জলটা ওই ঘরের দেওয়াল বেয়েই নামছে। তার মানে, উৎস ওই ঘরের ভেতরে।
“কাকু, এই ঘরটা একবার খুলতে হবে।”
“অসম্ভব! ও ঘরে আমার জরুরি জিনিসপত্র আছে। ওটা খোলা যাবে না।”
গোবিন্দর জেদ চেপে গেল। সে ঠিক করল, এর শেষ দেখে ছাড়বে। সেদিন বিকেলে সে পাড়ার চায়ের দোকানে গেল। মন ভালো না থাকলে কানাইদার চায়ের দোকানের মতো ওষুধ আর হয় না। সেখানে গিয়ে শুনল, পাড়ার আর এক সমস্যা। ননীগোপাল জ্যেঠুর পোষা বেড়াল ‘নিউটন’ তিন দিন ধরে নিখোঁজ।
জ্যেঠিমা খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। গোবিন্দর হঠাৎ কি মনে হল, সে জ্যেঠুর বাড়ি গেল। সব শুনেটুনে সে শুধু জিজ্ঞেস করল, “নিউটন মাছের কাঁটা ছাড়া আর কি খেতে ভালোবাসত?”
জ্যেঠিমা বললেন, “আইসক্রিম। ভ্যানিলা আইসক্রিম পেলে ও আর কিছু চাইত না।”
গোবিন্দ সোজা পাড়ার আইসক্রিমওলার কাছে গেল। তাকে দশটা টাকা দিয়ে বলল, “তোমার ঘণ্টাটা একবার আমাকে আধ ঘণ্টার জন্য ধার দেবে?”
আইসক্রিমওলা অবাক হলেও রাজি হল। গোবিন্দ সেই ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে পাড়ার অলিগলিতে ঘুরতে লাগল, ঠিক যেমন আইসক্রিমওলা করে। পাঁচ নম্বর গলির মুখে একটা বাড়ির পেছন থেকে ‘মিঁয়াও’ করে একটা করুণ ডাক ভেসে এল। সবাই ছুটে গিয়ে দেখল, নিউটন একটা নর্দমার পাইপে আটকে আছে। তাকে উদ্ধার করার পর ননীগোপাল জ্যেঠু গোবিন্দকে জড়িয়ে ধরে যা আশীর্বাদ করলেন, তাতে গোবিন্দর মনে হল, তার তিন মাসের মাইনে উশুল হয়ে গেছে।
এই ঘটনার পর পাড়ায় গোবিন্দর একটা নাম হয়ে গেল। ‘গোবিন্দদা, দ্য প্রবলেম সলভার’। কেউ তাকে সিরিয়াসলি নিল না, কিন্তু ছোটখাটো সমস্যায় মানুষ তার কাছে আসতে শুরু করল। যেমন, শান্তি মাসিমার প্রেসার কুকারের সিটি বাজে কিন্তু হাওয়া বেরোয় না। গোবিন্দ গিয়ে দেখল, ভালভের মুখে একটা চাল আটকে আছে। দু মিনিটে সমস্যা শেষ।
কিন্তু তার নিজের সমস্যা— চাকরি নেই, বাড়ির ছাদ দিয়ে জল পড়ে, বাড়িওয়ালা খিটখিটে— সেগুলোর কি হবে? সে আবার গেল সেই সাধুবাবার কাছে। বাবা তাকে দেখেই বললেন, “কিরে? ফোকর পেলি?”
গোবিন্দ হতাশ গলায় বলল, “নিজের ফোকর তো পেলাম না। অন্যের ফুটো সারাচ্ছি।”
সাধুবাবা হো হো করে হেসে উঠলেন। “আরে বোকা! অন্যের ফুটো সারাতে সারাতেই নিজের জাহাজ তৈরির মালমশলা জোগাড় হয়। তোর বাড়িওয়ালার ঘরে কি আছে রে?”
“জানি না তো। তালা দেওয়া।”
“তালাতেই তো চাবি থাকে। যা, খুঁজে বার কর।”
গোবিন্দর মাথায় আইডিয়াটা খেলে গেল। হারাদন কাকুর সবচেয়ে দুর্বল জায়গা কোনটা? তার একমাত্র ছেলে বিদেশে থাকে, বছরে একবার ফোনও করে না। আর তার স্ত্রী, অর্থাৎ কাকিমা, ঘোরতর আস্তিক। গোবিন্দ সোজা কাকিমার কাছে গেল।
গিয়ে বলল, “কাকিমা, একটা কথা ছিল। আপনাদের চিলেকোঠার ঘরটা থেকে জল চুঁইয়ে আমাদের ঘরে পড়ছে। ওটা যদি একটু…”
কাকিমা বললেন, “ও কথা আর বোলো না বাবা। তোমার কাকার ওটা পায়রার ঘর। আমাকে লুকিয়ে গোটা পঞ্চাশেক গিরিবাজ পুষেছে। আমি জানতে পারলে নাকি তুলকালাম করব, তাই তালা দিয়ে রাখে।”
গোবিন্দর মাথায় সব পরিষ্কার হয়ে গেল। পায়রার জলখাবারের পাত্র থেকেই জল উপচে দেওয়াল বেয়ে নামছে।
সেদিন রাতে হারাদন কাকু যখন বাড়ি ফিরলেন, গোবিন্দ তার পথ আটকাল।
“কাকু, একটা কথা ছিল।”
“ভাড়া বাকি নাকি? সামনের মাসে কিন্তু এক টাকাও ছাড়ব না।”
গোবিন্দ মুচকি হেসে বলল, “ভাড়ার কথা নয়। আপনার ‘বাজিরাও’, ‘মস্তানি’, ‘সুলতান’-রা সব ভালো আছে তো?”
হারাদন কাকুর মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। যেন সি.বি.আই রেড হয়েছে।
“তুমি… তুমি কি করে জানলে?”
“যেখান থেকে ফোঁটা পড়ে, সেখান থেকেই খবর আসে, কাকু।” গোবিন্দ সাধুবাবার মতো করে বলল। “ভাববেন না, কাকিমাকে আমি কিছু বলব না। বরং চলুন, আমি আপনার পায়রাদের জন্য একটা অটোমেটিক জলের সিস্টেম বানিয়ে দিচ্ছি। জলও নষ্ট হবে না, ছাদও ভিজবে না।”
পরের এক ঘণ্টায় যা হল, তা সেঁকরা পাড়া লেনের ইতিহাসে কেউ দেখেনি। হারাদন কাকু আর গোবিন্দ— দুই পরম শত্রু মিলে চিলেকোঠার ঘরে পায়রাদের যত্ন নিচ্ছে। গোবিন্দ তার পুরনো ইঞ্জিনিয়ারিং বই ঘেঁটে প্লাস্টিকের বোতল আর নল দিয়ে এমন একটা সুন্দর ব্যবস্থা করে দিল, যাতে জল উপচানোর কোনও সম্ভাবনাই রইল না।
কাজ শেষে হারাদন কাকু গোবিন্দর কাঁধে হাত রেখে ভেজা গলায় বললেন, “তুমি তো আচ্ছা ছেলে হে! আমার নিজের ছেলেও আমার এই শখের দাম দেয়নি। শোনো, তোমার তো চাকরি নেই শুনলাম।”
গোবিন্দ মাথা নাড়ল।
“আমার বউবাজারের সোনার দোকানের পাশে একটা পুরনো স্টেশনারি দোকান আছে। ধুঁকছে। মাথায় হাজারটা সমস্যা। তুমি ওটার দায়িত্ব নেবে? আমি যা পারি মাইনে দেব। লাভ হলে তোমার ভাগ থাকবে।”
গোবিন্দর মনে হল, সাধুবাবা যেন তার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলছেন, “পেয়েছিস ফোকর?”
সেদিন রাতে, বহুদিন পর, গোবিন্দ পোদ্দার শান্তিতে ঘুমালো। মাথার উপরে আর কোন টুপ…টুপ…শব্দ নেই। তার বদলে চিলেকোঠার ঘর থেকে ভেসে আসছে পায়রাদের বকম বকম ডাক। সেই ডাকের মধ্যে যেন একরাশ ভরসা। মঞ্জু পাশে শুয়ে অবিশ্বাসের গলায় বলল, “তুমি লোকটা একটা আস্ত জিনিয়াস! কি করে করলে এসব?”
গোবিন্দ হাসল। সে কোনও জিনিয়াস নয়। সে শুধু একজন সাধারণ মানুষ, যে বুঝেছে, জীবনের ফাটলগুলো আসলে ভয় পাওয়ার জন্য নয়। ওই ফাটল দিয়েই তো আলো ঢোকে। সমস্যাগুলো আসলে বন্ধ দরজা নয়, বরং সিঁড়ির প্রথম ধাপ। ওই সিঁড়ি বেয়ে উঠতে পারলেই দেখা যায়, ওপরে একটা নতুন আকাশ অপেক্ষা করে আছে। যে আকাশে কোনও ছাদ থাকে না, আর টুপ…টুপ… করে জল পড়ার ভয়ও থাকে না।
শেষ
![]()







