21শে জুলাই, 2025, কলকাতা, News আমার আলো: আজ ধর্মতলার মোড়ে তৃণমূল কংগ্রেসের বার্ষিক শহীদ দিবস সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এই সমাবেশ, যা দলের শক্তি প্রদর্শন এবং রাজনৈতিক দিশা নির্ধারণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে এক জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল।

প্রতি বছর ২১শে জুলাই এই সমাবেশ আয়োজিত হয় ১৯৯৩ সালের ২১শে জুলাই পুলিশের গুলিতে নিহত ১৩ জন যুব কংগ্রেস কর্মীর স্মরণে, যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৎকালীন যুব কংগ্রেস নেত্রী হিসেবে ভোটার আইডি কার্ড বাধ্যতামূলক করার দাবিতে মহাকরণ অভিযান করছিলেন। এই বছরের সমাবেশটি ছিল ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে তৃণমূল কংগ্রেসের শেষ শহীদ দিবস সমাবেশ, যা এর গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলেছিল।
সমাবেশের পূর্বে কলকাতা হাইকোর্ট যানজট এড়াতে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। আদালত নির্দেশ দেয় যে সকাল ৯টা থেকে ১১টার মধ্যে কেন্দ্রীয় কলকাতায় কোনো মিছিল করা যাবে না, যাতে অফিসযাত্রীদের অসুবিধা না হয়। তৃণমূল কংগ্রেসকে আগামী বছর থেকে শহীদ মিনার, ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড বা সল্টলেক স্টেডিয়ামের মতো অন্য কোনো স্থানে সমাবেশ করার কথা বিবেচনা করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল। এই নির্দেশিকা মেনে, কলকাতা পুলিশ ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। প্রায় ৫,৫০০ পুলিশ কর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল, যার মধ্যে ৩০ জন ডেপুটি কমিশনার, ৮ জন জয়েন্ট কমিশনার এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ছিলেন। সিসিটিভি ক্যামেরা, ড্রোন এবং মেটাল ডিটেক্টর ব্যবহার করে সমগ্র এলাকা নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলা হয়েছিল। শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত জনতাকে সুশৃঙ্খলভাবে ধর্মতলার মোড়ে পৌঁছানোর জন্য বিশেষ ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনা করা হয়েছিল।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ভাষণে মূলত ‘বাঙালি আত্মমর্যাদা’ এবং বিজেপির ‘ভাষাগত সন্ত্রাস’-এর বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানান। তিনি অভিযোগ করেন যে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে বাঙালিভাষী অভিবাসীদের উপর হয়রানি করা হচ্ছে এবং তাদের ‘বাংলাদেশী’ বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ধরনের পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা করে বলেন, “যদি এই ভাষাগত বিভাজন বন্ধ না হয়, তাহলে আমাদের প্রতিরোধ আন্দোলন নতুন দিল্লি পর্যন্ত পৌঁছাবে।” তিনি ২১শে জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে বলেন যে এটি কেবল একটি স্মরণসভা নয়, এটি অন্যায় ও অপমানের বিরুদ্ধে এবং বাংলার আত্মমর্যাদার জন্য যুদ্ধের ঘোষণা।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আরও বেশি আসন জয়ের আহ্বান জানান এবং কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য দিল্লি অভিমুখে যাত্রার ডাক দেন। তিনি নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিজেপির মদদে কাজ করার অভিযোগ আনেন এবং হুঁশিয়ারি দেন যে পশ্চিমবঙ্গে যদি ভোটার তালিকা থেকে বাঙালিদের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তাহলে তীব্র আন্দোলন করা হবে। তিনি ২৬শে জুলাই থেকে ‘দ্বিতীয় ভাষা আন্দোলন’ শুরু করার কথা ঘোষণা করেন, যা বাঙালি পরিচয় এবং ভাষার উপর আক্রমণের বিরুদ্ধে পরিচালিত হবে।
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ তৃণমূল কর্মী ও সমর্থক ধর্মতলার মোড়ে সমবেত হয়েছিলেন। স্যান্ডেল, সাদা এবং সবুজ রঙের পোশাকে সজ্জিত জনতা ‘জয় বাংলা’ এবং ‘টিএমসি জিন্দাবাদ’ স্লোগানে গোটা এলাকা মুখরিত করে তুলেছিল। অনেকেই দলের বিভিন্ন প্রকল্পের প্রতীকী কাটআউট নিয়ে এসেছিলেন। সমাবেশস্থলে বিশাল আকারের ১১টি স্ক্রিনে সরাসরি অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার করা হচ্ছিল।
এই সমাবেশটি ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের জন্য তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রচারণার সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ভাষণে ‘বাঙালি আত্মমর্যাদা’ এবং কেন্দ্রের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে সামনে রেখে ভোটারদের সাথে আবেগপূর্ণ সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেছেন। এই সমাবেশ তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তি এবং জনগণের মধ্যে তাদের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে।
![]()






