তোমাতে আমার ঠিকানা (দ্বিতীয় পর্ব)
ডাঃ রঞ্জন কুমার দে (বারিত বরণ)
।।সুচরিতার গল্প।।
কলকাতার ব্যস্ত শহরের এক প্রান্তে, যেখানে আকাশ ছোঁয়া বিল্ডিং আর চকচকে শপিং মল, সেখানেই পুরনো এক বাড়ি—সেন পরিবারের আদি বাসভবন। সাদা দেয়ালে রোদ ঝলমলে দুপুর, জানালায় গাছের ছায়া।
চুন্নি-ফিটেড গাড়ি, মসৃণ মার্বেল পাথর, সিসিটিভি-জড়ানো নিরাপত্তার পাঁচিল – বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে কোনো শিল্পপতির দুর্গ।
আর সেই দুর্গের ঠিক পেছনে, কিছুটা লুকিয়ে থাকা — একটা নামহীন বস্তি। টিনের চাল, প্লাস্টিক ঢাকা, ফাঁকা চোখে তাকানো শত মুখ, যার একটা মুখও হয়তো সকালে পাউরুটি খায় না।
বাড়িটার নাম সবাই জানে—”সেন ভিলা”। এখানেই বাস করেন শহরের নামজাদা স্বর্ণব্যবসায়ী, বিমল সেন। হীরে-জহরতের এই রাজ্যের উত্তরাধিকারিণী মাত্র একজন—সুচরিতা সেন, এই বাড়িরই একমাত্র কন্যা। তার পরিচয় দিতে গেলে প্রথমেই সবাই বলে—”সেন জুয়েলার্সের মালিকের মেয়ে। অগাধ সম্পত্তির অধিকারিণী।”চাইলে এখনই বিদেশ চলে যেতে পারে, কিংবা বাবা যেভাবে বলে — এমবিএ করে ফিরে এসে ‘সেন কর্প’ চালাতে পারে। কিন্তু সত্যি বলতে, সে পরিচয়টা সুচরিতার গায়ে একটুও মানায় না।
সুচরিতার রূপ আলাদা করে চোখে পড়ার মতো নয়, তবু তার চোখদুটো যেন নিজের ভাষায় কথা বলে। গভীর কালো চোখ, যেখানে ঝিকিমিকি আলো নেই, আছে শান্ত, গভীর উপলব্ধি। মুখে একধরনের প্রশান্তি, যা কসমেটিক বিউটির থেকে আলাদা — যেন ভেতর থেকে আলোর ঝলক।
তার গায়ের রঙ গমরঙা, নিখুঁত নয়, কিন্তু তাতে নিজস্ব সৌন্দর্য আছে। চুল লম্বা, সবসময় বিনুনি করে বাঁধা — সাজগোজে তার আগ্রহ নেই। সালোয়ার-কামিজ, কাঁধে একটা তুলোর ব্যাগ, আর মুখে সদা হাসি — এটাই তার রোজকার সাজ।
লোকের চোখে সে সাধারণ, কিন্তু যার চোখে হৃদয় আছে, সে দেখবে — এই মেয়েটা খুবই বিশেষ। তার চলনে একধরনের আত্মবিশ্বাস আছে, চোখে একরাশ স্বপ্ন, আর মুখে একধরনের মায়া, যেটা সহজে ভুলে যাওয়া যায় না।
সুচরিতা একজন নিঃস্বার্থ, উদারমনা এবং আদর্শবাদী মেয়ে। পৈতৃক সম্পত্তি, বিলাসবহুল জীবন, গাড়ি-বাংলো—এসবের প্রতি তার একফোঁটা মোহ নেই। তার কাছে জীবনের মানে শুধু নিজের আরাম নয়, অন্যকে কিছু দেওয়া।
সে সংবেদনশীল, সহানুভূতিশীল ও দায়িত্ববান। তার হৃদয়ে গরীব বস্তির বাচ্চাদের জন্য গভীর ভালোবাসা। তাদের জীবনে আলো এনে দেওয়ার জন্য নিজের জীবনটাকে সে উৎসর্গ করেছে।সে আত্মপ্রত্যয়ী—সামাজিক চাপ, পারিবারিক আপত্তি কিছুই তাকে দমিয়ে রাখতে পারে না।
তার বিশ্বাস,
—”যদি মন থেকে কিছু চাওয়া যায়, তাহলে সমাজ বদলানোও অসম্ভব নয়।”
ছোটবেলা থেকেই সে ছিল অন্যরকম। তার বন্ধু ছিল বাড়ির কাজের মাসির ছেলে-বাচ্চারা, আর স্কুল ছুটির পরে সে হারিয়ে যেত পাশের বস্তির ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের সঙ্গে খেলায় আর গল্পে। তার চোখে কখনও হীরে-সোনার আলো ঝলমলে জগৎ আকর্ষণ করেনি।
বরং তার মন টানত ভাঙা স্লেট, ছেঁড়া বই আর পড়তে চাওয়া নিষ্পাপ চোখের দিকে।
সুচরিতা আজকের দিনের সস্তা চরিত্রের মেয়েদের মত নিজেকে ফেসবুক, টুইটারে জাহির করতে পছন্দ করে না।এটা সুচরিতার চরিত্রের একটা গভীর ও চিন্তাশীল দিক—যেখানে সে নিজের মূল্যবোধকে সময়ের স্রোতের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দেয়।আজকের সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই যখন নিজেকে ‘প্রডাক্ট’-এর মতো প্রদর্শন করে, তখন সুচির “নিজেকে জাহির না করে, নিজেকে গড়ার” চেষ্টা, এই বোধটাই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে।
সেন বাড়ির উল্টো দিকে এক খোলা মাঠে, কাঁঠাল গাছের নিচে বসে সে একটা ছোট্ট শ্রেণিকক্ষ চালায়—কোনো বেঞ্চ নেই, নেই স্লেট বা ঘন্টা। আছে শুধু কিছু ছেঁড়া খাতা, বিস্ময়ভরা চোখ, আর একটুখানি স্বপ্ন।
সে রোজ দুপুরে স্কুল থেকে ফিরে বেরোয় এক ব্যাগ খাতা-কলম নিয়ে, আর বসে পড়ে সেই গাছ তলায়,ওখানেই চলে তার স্কুল, যেটার কোনো দেওয়াল নেই, নেই কোনো সরকারী স্বীকৃতি—তবু সেই ছোট্ট জায়গাটাই তার স্বপ্নের বীজতলা।
লোকে তাকে বলে “হীরের মেয়ে”, কিন্তু সে নিজের পরিচয় দেয় অন্যভাবে—
“আমি শুধু এক দিদি, যারা পড়তে চায় তাদের পাশে দাঁড়ানোর দিদি।”
অট্টালিকার দোতলার দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের বারান্দা — এখানেই প্রতিদিন সকালে সে বসে পড়ে, একটা মাটির কাপ হাতে, তাজা লাল চায়ের গন্ধে মুখ ডুবিয়ে। চোখ চলে যায় সেই বস্তির দিকেই, যেখান থেকে সবে ভেসে আসে হাঁড়ির ধোঁয়া, বাচ্চাদের কান্না, খিস্তির শব্দ, আবার তার মধ্যেও — একটা বেঁচে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা।
“ওরা মানুষ, অথচ ওদের জন্য জীবনটা একটা যুদ্ধ,” ভাবে সুচরিতা।
বস্তির ছোট্ট একটা মেয়ের নাম পিংকি। সে একদিন বলে, — “দিদি, তুমি বড় হয়ে কি হবে?”
সুচরিতা হেসে বলে,
— “আমি? আমি বড় হয়ে হবো তোমাদের স্কুল মিস্ট্রেস। স্কুল হবে না? নাম হবে ‘স্বপ্নের পাঠশালা’।”
পিঙ্কির গাল টিপে ধরে সুচি বলে,
” আর তুমিই হবে আমার প্রথম ক্লাসের মনিটর!”
বাবা অনেকবার চেয়েছেন মেয়েকে বিদেশে পাঠিয়ে উচ্চশিক্ষা দিতে, কিংবা পরিবার ব্যবসায় যুক্ত করতে। সুচরিতা কিন্তু মাথা নাড়ে, হেসে বলে,
— “বাবা, আমি হীরে চিনিনা, আমি মানুষ চিনতে চাই। ওদের পড়াতে চাই, যাতে ওরাও মানুষ চিনতে শেখে।”
এই বস্তির ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ও অনেক আগেই চিনে নিয়েছে। নাম ধরে ডাকে তারা তাকে – “সুচি দি”, “দিদিমণি”। কেউ স্কুল যেতে চায়, কেউ যেতে চায় না। কেউ পড়তে চায়, কেউ বলে – “মা বলে কাজে যেতে হবে।” তবুও সুচরিতা জানে, একটু ভালোবাসা, একটু বই, একটা খোলা জানালা – ওদের জীবন বদলে দিতে পারে।
সুচরিতার চোখে তখন স্বপ্ন খেলে যায়—যেখানে একঝাঁক খুদে হাত লেখা শেখে, গান শেখে, ভালোবাসতে শেখে। হ্যাঁ, সে হয়তো হীরে-জহরত বেচবে না, কিন্তু সে বেচবে আলো। এমন আলো, যা একদিন অন্ধকার ঘরেও আলো ছড়াবে।
সমাজ হয়তো তাকে ‘সেন জুয়েলার্সের মেয়ে’ বলেই চিনবে, কিন্তু একদিন সবাই জানবে—সে ছিল স্বপ্নর ফেরিওয়ালা, যে স্বপ্ন সে দেখিয়েছিল পড়ে থাকা শিশুদের।
সুচরিতা একাধারে আদর্শ কন্যা, এক স্নেহশীলা দিদি, এক স্বপ্নবাজ শিক্ষক, এবং একজন সত্যিকারের মানবিক মানুষ। তার চরিত্রে কোনো নাটকীয়তা নেই, কিন্তু আছে এক অনন্য সত্য—
“সে নিজে কিছু না হয়েও অনেক কিছু হতে চায়, শুধু অন্যদের জন্য।”
এককথায় বলতে গেলে , সুচরিতা এমন এক মেয়ে—
যার সৌন্দর্য তার হৃদয়ে, আর পরিচয় তার কৃতিত্বে, তার কাছে এটা গুরুত্বপূর্ণ নয় যে সে কার মেয়ে, বরং সে কি করতে চায় এটাই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সুচরিতা এবার উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছে আর্টস নিয়ে, লোরেটো স্কুল থেকে ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছে সে। সে কোনোদিনই খুব মেধাবী ছাত্রী ছিলনা কিন্তু পড়াশুনার প্রতি তার আগ্রহ, তার অধ্যবসয় দিয়ে সবার মনেই সে ভালো ছাত্রী হিসাবে জায়গা করে নিয়েছে।
স্কুলের দিদিমনিদের কাছে সুচরিতা এক আদর্শ ছাত্রী। তার ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে সে প্রত্যেক টা দিদির নয়নের মণি হয়ে উঠেছে। তার ইচ্ছা এবার সে ইতিহাস নিয়ে অনার্স করবে, ভবিষ্যতে স্কুল মিষ্ট্রেস হবে সে।
কিন্তু বাবা বিমল সেনের চোখে স্বপ্ন ছিল,
— “আমার মেয়ে হার্ভার্ডে পড়বে, এমবিএ করবে। ফিরে এসে সেন জুয়েলার্স সামলাবে। নতুন শাখা খুলবে দুবাই, লন্ডনে। সে-ই হবে আমার উত্তরাধিকারী।”
কিন্তু সুচরিতা একদিন খুব শান্ত গলায় বলেছিল,
— “বাবা, আমি হীরে-জহরত চিনিনা। আমি মানুষ চিনতে চাই। আমি চাই একটা মানুষ গড়ার কারখানা তৈরি করতে—একটা স্কুল, যেখানে শুধু বই নয়, শেখানো হবে স্বপ্ন দেখা, ভালোবাসা, আর আত্মসম্মান।”
বিমল সেন বিস্ময়ে তাকিয়েছিলেন মেয়ের দিকে।
— “তুই কি বলছিস সুচি ? তোর এই প্রতিভা, এই সম্ভাবনা, সব ফেলে রেখে তুই ওই বস্তির ছেলেমেয়েদের পড়াতে চাস?”
সুচরিতা হেসে বলেছিল,
— “তাদের চোখের জ্যোতিটাই তো আসল হীরে, বাবা। তুমি যেটা বিক্রি করো, সেটা বহুমূল্য। কিন্তু আমি যা গড়তে চাই, সেটা অমূল্য।”
সুচরিতা নিজের ঘরের দিকে চলে গেলো।
বিমল সেন অবাক হয়ে মেয়ের দিকে অপলক মেয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন মাত্র। কোনো কথা বলতে পারেননি।
বিমল বাবু আস্তে করে চশমা টা খুলে টেবিলের উপর রাখলেন।
স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর ভাবে বললেন,
–” দেখেছো মালবিকা তোমার মেয়ে কি বলছে। সে নাকি মাস্টারনি হবে। আমি কিনা তাকে বিদেশ পাঠানোর সব বন্দোবস্ত করছি আর সে কিনা বলছে, বস্তির বাচ্ছা পড়াবে। “
একটু থেমে আবার বললেন, “আমাদের এতবড় ব্যবসা, এত সম্পত্তি, সব তো ওকেই দেখতে হবে। সে তোর সখ হয়েছে মাঝে সাজে একটু চ্যারিটি করনা, কেউ তো তোকে বারণ করেনি। ঠাকুরের আশীর্বাদে পয়সার তো অভাব নেই আমার। তাবলে স্কুল টিচার!!”
অনুপমা স্বামীর কথা শুনছিলেন , কিন্তু এইমুহুর্তে কিছু বলতে ইচ্ছা করলো না।
মালবিকা কখনো উচ্চস্বরে কথা বলেননি, কখনো প্রতিবাদ করেননি প্রকাশ্যে। কিন্তু তার নীরবতা কোনোদিনই দুর্বলতা ছিল না — তা ছিল সমঝোতার শিল্প। তিনি জানতেন সংসারটা দাঁড়িয়ে আছে একটা ভারসাম্যের উপর, এবং সেই ভারসাম্য রক্ষার জন্য নিজের অনেকটা তিনি নিঃশব্দে বিসর্জন দিয়েছেন।
তিনি চুপচাপ সংসার চালান, বিমল সেনের রাগ বা যুক্তির উত্তরে কখনো গলা তোলেন না।
তবে সূক্ষ্মভাবে, ধীরে ধীরে, তিনি নিজের মত প্রকাশ করেন। কখনো এক কাপ চায়ের মাঝে, কখনো রাতের খাওয়ার পর বাটিগুলো ধুতে ধুতে।
তিনি জানেন, সব লড়াই হইচই করে জেতা যায় না। কিছু লড়াই চুপচাপ জিতে নিতে হয় — ভালোবাসা, ধৈর্য আর প্রজ্ঞা দিয়ে।
তিনি চুপচাপ সংসার চালান, বিমল সেনের রাগ বা যুক্তির উত্তরে কখনো গলা তোলেন না।
তবে সূক্ষ্মভাবে, ধীরে ধীরে, তিনি নিজের মত প্রকাশ করেন। কখনো এক কাপ চায়ের মাঝে, কখনো রাতের খাওয়ার পর বাটিগুলো ধুতে ধুতে।
মালবিকা সেন একজন শিক্ষিতা নারী। কলেজের দিনগুলোতে সাহিত্যের ছাত্রী ছিলেন, রবীন্দ্রনাথ আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা মুখস্থ বলে দিতে পারতেন। তিনি গান জানতেন, বক্তৃতা দিতে পারতেন, প্রশ্ন করতে পারতেন—তবু জীবনের একটা মোড়ে এসে সব চাওয়া যেন সযত্নে তুলে রেখেছিলেন ভাঁজ করা শাড়ির পাশে।
সুচরিতা তার চোখের মণি। তিনি জানেন মেয়েটি তার মতো নয় — সে প্রশ্ন করে, সিদ্ধান্ত নেয়, ভয় পায় না। একদিকে এই সাহস দেখে গর্ব হয়, অন্যদিকে মায়ের মন কেঁপে ওঠে
— “এ সমাজ কি মেয়েটার স্বপ্নটাকে ভেঙে দেবে না?”
তবু তিনি সুচরিতাকে থামান না। কারণ, নিজের ভাঙা স্বপ্নের ভেতরেই তিনি আশ্রয় খুঁজে পান মেয়ের পূর্ণতার সম্ভাবনায়।
তবে সুচারিতা তার মায়ের একটা গুণ পেয়েছে। সে খুব ভালো রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়। ছোটো বেলা থেকেই মা ও ঠাকুমার সংস্পর্শে এসে রবীন্দ্রনাথ যেনো তার রক্তে মিশে গেছে।
সকালবেলা ঘুম ভাঙলেই সুচরিতা দোতলার বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। মাথার উপরে আলো ফুটে ওঠে যেমন, ঠিক তেমনই তার চোখ যায় অট্টালিকার পেছনের সেই বস্তির দিকে।
প্রতিদিনের মতো আজও সে দেখে—একটা টিনের চালা থেকে কালো ধোঁয়া উঠে আসছে। সকালের ফুরফুরে হাওয়ায় সেই ধোঁয়ার সোদা গন্ধ নাকে আসে তার।চায়ের হাঁড়ি চড়েছে বোধহয়। পাশের ছোট্ট উঠোনে এক মা জলে ভেজানো ভাত চিপে দিচ্ছেন একবছরের ছেলেটার মুখে। আর একটু দূরে—এক বাচ্চা মেয়ে এক হাতে বই, আরেক হাতে ডাঁটা কুটছে।
সুচরিতা ভাবে:
“এ জীবন তো কেবলই বেঁচে থাকার লড়াই, এখানে স্বপ্ন দেখার অবকাশ কোথায়?”
চোখ পড়ে একটা ছেলেকে — পায়ে ছেঁড়া চপ্পল, মুখে গামছা, হাতে পুরনো ব্যাগ। স্কুলে যাচ্ছে, কিন্তু মুখে টান — যেন সারারাত ঘুমোনো হয়নি। আবার দেখল একটা বাচ্চা, বয়স পাঁচ কি ছয়, নর্দমার পাশে বসে কাগজ কুড়োচ্ছে। পাশে তার বাবা মাটিতে ডিগবাজি খাচ্ছে — গলা থেকে শব্দ উঠছে না,হয়তো শুধু গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে সস্তা মদের।
তবুও, আশ্চর্য…
এই বস্তি কান্নার জায়গা, অথচ এখানে রোজ হাসি শোনা যায়।এই বস্তিতে অভাব, কিন্তু লুকিয়ে আছে সহানুভূতি, ছোট ছোট স্বপ্ন, সস্তা শাড়ির পাড়ে সোনালি দিন গড়ার ইচ্ছে।
সুচরিতা ভাবে,
“এই মানুষগুলো পাথরের নিচে চাপা পড়া ফুলের মতো… একটু আলো পেলে, একটু মাটি পেলে, এরা ফুটে উঠবে, সুবাস ছড়াবে।”
এই বস্তিই তার বিশ্ববিদ্যালয়। এখানকার প্রতিটি মুখ, প্রতিটি গন্ধ, প্রতিটি শব্দ — ওর শিক্ষক। ও শেখে সহানুভূতি, শেখে প্রত্যয়ের সংজ্ঞা। বড়লোকের চশমা ফেলে দিয়ে ও এই চোখেই দেখেছে ‘মানুষ’। না, করুণা নয় — সম্মান।
ওর চোখে বস্তি মানে আর্তনাদ নয় — অসীম সম্ভাবনা।
আর এই সম্ভাবনাকেই ও রূপ দিতে চায় — স্কুল বানিয়ে, খাতা-কলমের আলো ছড়িয়ে। এই বস্তিই হবে ওর প্রথম শ্রেণির ক্লাসরুম।
আকাশ টা আজ মেঘলা করেছে বৃষ্টি নামবে।
সুচরিতা গুণ গুণ করে রবীন্দ্র সঙ্গীত ধরলো,
“আমার রাত পোহালো শারদ প্রাতে
আমার রাত পোহালো,
বাঁশি বাঁশি তোমায় দিয়ে যাবো কাহার হাতে
আমার রাত পোহালো।……”
ঝুম ঝুম করে বৃষ্টি টা নেমে গেলো। সুচরিতার চোখেমুখে বৃষ্টির ছাঁট এসে লাগতে থাকলো। আর ওদিকে টিনের চালা চুইয়ে চুইয়ে জল পড়ছে, লোকজন ছাতা না পেয়ে প্লাস্টিক মুড়ি দিয়ে নিজেকে ঢেকেছে।
সুচরিতা বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখে — হঠাৎ একটা ছোট মেয়ে, ছাতা হাতে না থাকলেও, দুই হাত মেলে বৃষ্টিতে নাচছে।
সে এক সুর।বস্তির সব ক্লান্তি মুছে ফেলে সে যেন জানান দিচ্ছে —
“আমরা এখনও বাঁচি। আমরা এখনও স্বপ্ন দেখি।”
সেই মুহূর্তে সুচরিতা ভেতর থেকে কেঁপে ওঠে।
ও ভাবে:
“এই রকম শিশুগুলোর জন্যই তো চাই — একটা নিজের স্কুল, একটা মুক্ত সকাল, একটা জানালা — যেখান দিয়ে তারা শুধু চায় না, পেয়ে যায় আকাশটুকু।”
এইভাবেই প্রতিদিন সে দেখে:
বস্তি শুধু অভাবের গল্প নয়, এটা মানবতার এক নগ্ন অথচ গর্বিত ক্যানভাস —
যেখানে কেউ পেট ভরে না খেয়ে হাসে, কেউ জানে না ‘A for Apple’, তবু জেনে গেছে A for আশার শেষ আলো।
বেলার দিকে বৃষ্টিটা ধরে এলো। সুচরিতা একটু বেরোবে এবার।স্নান করে রেডি হয়ে নিলো। নিচে নামার আগে একটু ঠাম্মির ঘরে উঁকি মারলো। ঠাম্মী একমনে তার রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছে মুখ ডুবিয়ে বসে আছেন তার খাটে। মা এখন রান্নাঘরে তদারকী করছেন।
“মা আমি একটু বেরোচ্ছি।”সুচরিতা চেঁচিয়ে বলল ।
“কিছু না খেয়েই কোথায় চললি মা।” মা দৌড়ে এলেন রান্নাঘর থেকে।
“ওমা অনেক দেরি হয়ে গেছে গো, অনেক কাজ আছে আজ আমার। আমি বাইরে কিছু খেয়ে নেবক্ষণ।”
মায়ের গালে আলতো একটা চুমু খেয়েই বাইরে বেরিয়ে গেলো সে।
ড্রাইভার অপেক্ষা করছিল। কিন্তু সুচরিতা গাড়ির দিকে গেলনা। হেঁটে , বাসে,ট্রেনে যেতেই সে বেশি ভালবাসে।
আজ দু তিনটে কলেজ থেকে সে গ্র্যাজুয়েশনের জন্য ফরম তুলল। এটিএম থেকে কিছু টাকা সে তুলল। তার বাবার অগাধ টাকা ,তাই তিনি মেয়ের একাউন্টে হিসাবের বাইরে প্রচুর টাকা জমা রাখেন, যাতে মেয়ের কখনও টাকার প্রয়োজন হলে সে এখন থেকেই খরচ করতে পারে।বেলা প্রায় দুটো, পেটে এবার ছুঁচো নেত্তো করছে। কিছু একটা না খেলেই নয়।
সে এগিয়ে চললো তার সেই বহু পরিচিত বস্তির দিকে।
দুপুরবেলা। রোদে কাঁপছে টিনের ছাদ। ঘামতে ঘামতে সুচরিতা ঢুকছে বস্তির গলিতে — তার পরনে সাদা সালোয়ার কামিজ, হাতে ফাইল আর একটা ছোট্ট ব্যাগ। চারপাশের মানুষ একসময় অবাক হয়ে তাকালেও এখন তাকে দেখে হাসে — “দিদি” বলে চেনে সবাই।
দুপুর গড়িয়ে এলে অট্টালিকার ছায়া পড়ে বস্তির গায়ে — যেন বড়লোকি দম্ভের এক নিঃশব্দ পর্দা নামছে।
সেই ছায়ার নিচে বসে থাকে লোকজন — কেউ কষ্টের বোঝা নিয়ে, কেউ আরেকদিনের অপেক্ষায়।
সুচরিতা জানে,
এই বস্তির কেউ কেউ তার বাবার দোকানে কাজ করে, কেউ সোনার গয়না বানায় অথচ নিজেদের মেয়ের কানে কোনও দিন একটা সস্তা টিকলিও পরে না।
এই দুপুরেও সে দেখে বসে আছে এক মহিলা – পরনে ছেঁড়া শাড়ি, কোলে অসুস্থ শিশু। মুখে আতঙ্ক, কিন্তু চোখে ভয় নয়, একরকম চেনা ধৈর্য।
আরেকদিকে তিনটে কিশোর – স্কুলড্রেসে না, কিন্তু কাঁধে ব্যাগ, রাস্তার ধারে বসে বই পড়ছে। পাশে ইটের ওপর রাখা এক গ্লাস জল।
সুচরিতা ভাবে:
“জলটাই হয়তো একমাত্র ‘টিফিন’ — তবু পাতা ওল্টানো বন্ধ হচ্ছে না!”
বস্তির গলির ভিতর থেকে ভেসে আসে হাঁসফাঁস করা নিঃশ্বাস — যেটা গরমে ক্লান্ত শরীরের নয়, বরং পেট চালানোর সংগ্রামের।
একটু এগিয়ে গেলেই চোখে পড়ে – এক পুরনো চারকোনা চৌকি, যেটার ওপর বসে একটা ছেলে চক দিয়ে নিজের নাম লিখছে।
সুচরিতা দাঁড়িয়ে পড়ে।
ওর মনে হয়, “এই একটা নাম— হয়তো একদিন সব বদলে দেবে। এই শিশুটার নাম হোক ‘আলোকের প্রতীক’। আজ না হোক, কাল।”
আজ সে এসেছে ঠিক একটা উদ্দেশ্য নিয়ে — গোপনে কিছু কাজ শুরু করার জন্য।
বস্তির রত্না মাসিমার বর বেশ কিছুদিন ধরেই খুব অসুস্থ, অথচ হাসপাতালে ভর্তি হবার সামর্থ্য নেই।
“ও মাসি ঘরে আছ?”
টিনের দরজাটা সামান্য ঠেললো সুচরিতা।
রত্না মাসি স্বামীর পাশে বসে ছিলেন। ছুটে এলেন, “ওমা দিদিভাই, তুমি ভালো আছো তো।”
” হ্যাঁ হ্যাঁ ভালো আছি গো কিন্তু আর কিছুক্ষণ না খেয়ে থাকলে আর ভালো থাকবো না গো। দেখি কি রান্না করেছো আজ।”
রত্না মাসির অপেক্ষা না করে সুচরিতা নিজেই ঢাকনা উল্টে দেখতে গেলো।
রত্না মাসি লজ্জায় মাথা নোয়ালেন–” শুধু শাগ আর ভাত গো মা।”
” ও তাতেই হবে গো মাসি।”
একটা থালায় অল্প একটু ভাত আর শাগ্ তুলে নিলো সে।
এতবড় ঘরের মেয়ে ,তার পাশে বসে শাগ দিয়ে ভাত খাচ্ছে, একটুও অহংকারের লেশ মাত্র নেই। এটা ভেবেই রত্না মাসির চোখে জল চলে এল।
খাওয়া শেষ করে সে রত্না মাসির হাতে কিছু টাকা দিল।
মাসি তুমি কালকেই মেসোকে “ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করো। “
শিশুদের স্কুলে ভর্তি নিয়ে সমস্যাও চলছে — আধার নেই, জন্মসনদ নেই। আর একটা পরিবার আগুনে ঘর হারিয়ে এখন খোলা আকাশের নিচে।
তাই আরো কিছু জিনিসের ব্যবস্থা সে আজকেই করবে বলে এসেছে।
৮ জন শিশুর জন্য প্রাইভেট স্কুলের অগ্রিম ভর্তি ফি, এক ভাঙা ছাউনির জন্য ত্রিপল আর বাঁশ,আর কিছু চাল, ডাল, ওষুধ — কিছুদিন চলার মতো।
দুটো পুরনো কম্পিউটার, যেগুলো বাবার শোরুম থেকে বাতিল হওয়ার কথা ছিল, সেগুলোও নিয়ে আসবে বলে মনস্থির করলো।
সুচরিতা অফিসার নয়, সমাজকর্মীও নয়। সে জানে, এইসব কাজ বড় বড় প্রকল্পে ‘ফাইল’ হয়ে যায় — মানুষ হয় না।
যখন কেউ বলল, “আপনি তো আমাদের জন্য দেবদূত দিদি!”
তখন সে মুচকি হেসে বলল—
“আমি কাউকে কিছু দিচ্ছি না, শুধু আমার প্রাপ্যটা তোমাদের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছি।
এই শহরের বাতাস যেমন তোমার, তেমনি আমারও।”
বাড়ি ফিরেই বিছানায় গা এলিয়ে দিলো সুচরিতা। সারাদিন খুব ধকল গেছে আজ। কলেজের ফর্মগুলো দুয়েকদিনের মধ্যেই আবার জমা দিয়ে আসতে হবে। আজ রাতেই লিখে ফেলতে হবে।
কাজের মেয়েটা চা নিয়ে এলো।
“দিদিমনি তোমার চা রইলো।”
চায়ের কাপ টা নিয়ে সুচরিতা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো।
সূর্য ডুবছে, আকাশে মিশে আছে সোনালি-কমলl আলোয় চারিদিক লাল আভা ছড়িয়েছে।
বিমল সেন হাতে এক কাপ চা নিয়ে ঢুকলেন সুচরিতার ঘরে।
চুপচাপ মেয়ের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।
“বাবা কিছু বলবে?” উৎসুক হয়ে তাকালো সুচরিতা।
বিমল সেন চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন,
“তোর পাসপোর্ট আর ভিসার কাগজপত্র সব রেডি। এক সপ্তাহ পরেই ফ্লাইট। ইউএস-এডুকেশনের সঙ্গে এমন সুযোগ সব সময় আসে না, সুচি।”
সুচরিতা বাবার দিকে মাথা তুলে তাকালো, নরম স্বরে বলল
“বাবা, একটা কথা বলব, রাগ করবা না তো?”
বিমল চোখ তুলে তাকিয়ে বললেন,
“রাগ করব কেন? তুই তো আমার গর্ব। বল।”
ধীরে ধীরে সুচরিতা বলল,
“আমি যেতে চাই না।”
বিমল হতবাক,–
“কি বললি? বিদেশ যেতে চাস না? এত কষ্ট করে সব সেট করলাম, হাই প্রোফাইল স্কলারশিপের ব্যবস্থা করলাম… আর এখন বলছিস যাবি না?”
সুচরিতা চোখ নিচু করে আছে,
“আমি জানি তুমি আমার জন্য অনেক কিছু করেছো। কিন্তু আমি যদি বলি, আমি আরেকটা স্বপ্ন দেখি—যেটা হার্ভার্ডের ডিগ্রির থেকেও বড় আমার কাছে?”
বিমল ভ্রু কুঁচকে রইলেন।
সুচরিতা চোখ তুলে নির্ভীকভাবে বলল :
“আমি স্কুল মিসট্রেস হতে চাই বাবা। সেই বাচ্চাগুলোর জন্য– যাদের কোনো জন্মসনদ নেই, ইউনিফর্ম নেই, কিন্তু চোখে আলো আছে। আমি চাই, ওদের জীবন বদলাতে। আমি চাই, ওদের মানুষ করে তুলতে।”
বিমল অবাক, কন্ঠ কঠিন,
“তুই আমার ঘরের মেয়ে, হীরে-জহরত নিয়ে খেলা শেখার কথা, ব্যবসার হিসাব বুঝে নেওয়ার কথা! এই সব পড়ানো-শেখানোর খেলা তোর জন্য নয়।”
সুচরিতা স্থির গলায় বলল,
“এই খেলাটাই আমার জীবন, বাবা। তুমি সোনার গহনা গড়ো, আমি গড়তে চাই সোনার মন। তুমি যা করো, সেটাও মহান, কিন্তু আমি চাই অন্য পথে হাঁটতে—মানুষ গড়ার পথে।”
বিমল কিছুক্ষণ চুপ থেকে, চাপা কণ্ঠে বলেন,
“তুই জানিস এই পথ কত কঠিন?”
“হ্যাঁ, বাবা। জানি। কিন্তু যারা অন্ধকারে জন্মায়, তারা আলো বানাতে শিখে যায়। আমি ওদের সেই আলো দিতে চাই। আমি বড় অফিসার হতে চাই না, বড় মানুষ হতে চাই।”
বিমল দীর্ঘশ্বাস ফেললেন,
“তুই আমার মেয়ে, তাই বুঝি এমন একগুঁয়ে!”
সুচরিতা হেসে বলল,
“তোমার মেয়ে বলেই তো সাহস করেছি নিজের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরতে।”
একটু নীরবতা। বিমল তাকিয়ে থাকেন মেয়ের মুখের দিকে, চায়ের কাপে ঠান্ডা হয়ে আসা চা। সূর্য ডুবে গেছে, অন্ধকার ধীরে ধীরে ছেয়ে যাচ্ছে বারান্দা। কিন্তু সুচরিতার চোখে আলো।
বাবা চলে যাওয়ার পর সুচরিতার এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে, ঠাম্মীর ঘরে গেলো।পুরনো কাঠের দোতলা ঘরের খোলা বারান্দা। সন্ধ্যার আলোয় ঝিম ধরা পরিবেশ। এক কোণে কাঠের বেনারসি আলমারির পাশে বসে আছেন সুচরিতার ঠাকুমা, বয়স আশির কোঠায়, চোখে মোটা চশমা, মুখে চিরচেনা শান্তি।
সুচরিতা এসে চুপচাপ তার পায়ে বসে।
ঠাকুমা হালকা হাসি দিয়ে বলেন,
“কি গো মা, মনটা খুব ভারী লাগছে বুঝি?”
সুচরিতার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে,
“সবাই আমাকে বোঝে না ঠাম্মি। সবাই ভাবে, আমি পাগল। টাকা ছেড়ে, বিদেশ ছেড়ে, এভাবে কেউ নিজের জীবন নষ্ট করে?”
ঠাকুমা হেসে বলেন,
“পাগল তো ঈশ্বরও ছিল, মা। বুদ্ধদেব, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ — সবাই ছিল একেক সময়ের ‘পাগল’। কারণ ওরা নিজের মতো করে ভাবত। তোর ভেতরেও আমি সেই আলোটা দেখতে পাই।”
সুচরিতা, চোখে জল,
“তুমি বোঝো বলেই তো একটু ভরসা পাই… বাবা রেগে গেছে। মা কিছু বলছে না। তুমি পাশে আছো তো?”
ঠাকুমা তার হাতদুটো মাথায় রেখে আশীর্বাদ করেন,
“তুই যা ভাবছিস, সেটাই ঠিক। সোনার গয়না অনেকেই বানাতে পারে, কিন্তু সোনার মন বানাতে পারে খুব কম মানুষ। আমি গর্বিত যে আমার নাতনি সেই কাজটা করতে চায়। তোর এই পথ কঠিন, কিন্তু আমি জানি—তুই পারবি।”
সুচরিতা মাথা রাখে ঠাকুমার কোলে,
“তুমি থাকলে আমি কিছুতেই ভয় পাব না ঠাম্মি।”
ঠাকুমা ,হালকা ঠাণ্ডা কণ্ঠে বলেন,
“ভয় পাস না মা। স্বপ্ন কখনও একলা থাকে না। ঠিক সময়ে মানুষ, পথ আর আশীর্বাদ সব এসে পাশে দাঁড়াবে। আর যতদিন আমি বাঁচি, তোর পাশেই থাকব।”
ঠাকুমা এমন এক প্রজন্মের নারী, যাঁরা কখনও উচ্চস্বরে কথা বলেননি, কিন্তু তাঁদের নীরবতা ছিল প্রতিবাদের মতো দৃঢ়। তাঁর নিজের জীবনে বহু ত্যাগ করেছেন।ছোটবেলায় স্কুলে পড়ানোর স্বপ্ন ছিল, কিন্তু সমাজ-পরিবারের চাপে সে স্বপ্ন ত্যাগ করেছিলেন। তাই তিনি জানেন কীভাবে নীরবে চোখের সামনে স্বপ্ন ভেঙে যায়।
সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি সুচরিতার মনে এক অদৃশ্য ঢাল হয়ে দাঁড়ান।
বাবা যখন সুচরিতার উপর রেগে যান, ঠাকুমা বুঝতে পারেন — রাগটা ভালোবাসা থেকে আসছে, কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গিটা সংকীর্ণ। তাই তিনি কখনোই বাবাকে প্রকাশ্যে অপমান বা বিরোধিতা করেন না, বরং রাতের নিঃশব্দ সময়ে, এক কাপ চায়ের পাশে, ধীরে ধীরে তাঁর ছেলেকে বোঝান,
“বিমল, তোকে বড় করতে আমি অনেক কিছু ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু সেই একই ছায়ায় যদি তোর মেয়েও বন্দি থাকে, তবে আমার সমস্ত ত্যাগ বৃথা যাবে।”
বিমল সেন নিজের মায়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল, যদিও প্রায়শই তাঁর মতামত উপেক্ষা করেন। কিন্তু ঠাকুমা কখনো রাগান্বিত হন না — তিনি জানেন, প্রেম দিয়ে পরিবর্তন আনা যায়, জোর দিয়ে নয়।
আবার সুচরিতাকেও তিনি বোঝান,
“তোর বাবা তো খারাপ নয়, মা। ও শুধু ভয় পায় — তোকে হারাবার, তোকে কষ্ট পেতে দেখার। তুই ওকে বোঝার সময়টা দে।”
ঠাকুমা যেন দুটি প্রজন্মের ভাষা বুঝতে পারেন এবং একে অপরের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন।
পূর্ব কলকাতার একটি মধ্যবিত্ত বনেদি পরিবারের মেয়ে ছিলেন সুচরিতার ঠাকুমা, সরস্বতী সেন।সদ্য কলেজ পাস, স্বপ্ন তার চোখে — শিক্ষিকা হবেন।সেটা ১৯৬৫ সালের জুলাই মাস , ডাকবাবু এসে দিয়ে গেলেন একটা নিয়োগপত্র।সরস্বতী কাঁপা হাতে খামে ভরা চিঠিটা খুলে পড়লেন।
“কলকাতা মিউনিসিপ্যাল গার্লস স্কুলে আপনাকে সহকারী শিক্ষিকা পদে নিযুক্ত করা হলো। কর্মস্থলে যোগদানের তারিখ: ১৫ জুলাই, ১৯৬৫।”
চিঠিটা পড়ে তাঁর চোখে জল চলে আসে— আনন্দে, উত্তেজনায়।
সেই মুহূর্তে ঘরে ঢোকেন তাঁর বাবা, মুখ গম্ভীর।
বাবা কড়া গলায় বললেন,
“কি চিঠি ওটা?”
সরস্বতী লাজুক গলায় বলল,
“স্কুলে চাকরির জন্য দিয়েছিলাম …হয়ে গেছে বাবা।”
বাবা রাগী কণ্ঠে বললেন,
“চাকরি? সেটা আবার মেয়েমানুষের কাজ হল? তুই কি গৃহিণী হবি না, প্যান্ডেল বেঁধে ঘুরবি?”
ধীরে ধীরে সরস্বতী বললেন,
“কিন্তু বাবা, আমি তো পড়াতে চাই… ছোট ছোট মেয়েগুলোকে, আমি ওদের দিদিমণি হতে চাই।”
বাবা ঠাণ্ডা কিন্তু নির্মম গলায় বললেন,
“তোর বিয়ের কথা চলছে। এধরনের ‘দিদিমণি’ ভাবনা নিয়ে এ বাড়ির সম্মান ডোবাবি না। কালই ওই চিঠিটা পুড়িয়ে ফেলবি।”
চোখে জল, ঠোঁট কাপছে — কিন্তু মুখে নেই কোনো প্রতিবাদ।
চিঠিটা তিনি পুড়িয়ে ফেলেন নি, লুকিয়ে রাখেন একটা পুরনো সুটকেসে।
একটু অন্যমনস্ক হয়ে নিজের অতীতে ডুবে গিয়েছিলেন সরস্বতী দেবী। সুচরিতার কান্নায় সম্বিৎ ফিরল।
সুচরিতা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“তোমরা সবাই চাইছ আমি যেন স্বপ্নটা ভুলে যাই ঠাম্মি… আমি তো কিছু খারাপ চাইনি। শুধু চাই বস্তির বাচ্চাগুলো স্কুলে যাক,বইয়ের পাতায় হাত রাখুক… এত বড় ভুল করছি আমি?”
ঠাকুমা চুপচাপ তার মাথায় হাত বুলিয়ে চলেছেন,
“না মা, তুই ভুল করিসনি। ভুল করেছিলাম আমি… অনেক বছর আগে।”
সুচরিতা আশ্চর্য হলো,
“তুমি? তুমি কী ভুল করলে?”
ঠাকুমা আলমারির নিচের তাকে রাখা একটা পুরনো সুটকেস বের করলেন। ধুলোর আস্তরণ সরিয়ে খুলে দেখালেন একটা বাদামী খাম।ভেতরে সেই চাকরির নিয়োগপত্র।
সুচরিতা অবাক হয়ে চিঠিটা বার বার পড়তে থাকে।ঠাকুমার দিকে তাকিয়ে বলে,
“তুমি… স্কুলে চাকরি পেয়েছিলে?”
“তুমি তাহলে এতদিন ধরে নিজের একটা স্কুল বয়ে বেড়াচ্ছিলে, ঠাম্মি? নীরবে?”
ঠাকুমা মৃদু হাসলেন,
“হ্যাঁ মা।”
সুচরিতার চোখে জল,
“তাহলে পড়াতে গেলে না কেন?”
ঠাকুমা নীরব হয়ে একটু থেমে বললেন,
“তোর পরদাদু বললেন — ‘মেয়েমানুষ বই পড়তে পারে, কিন্তু অন্যের মেয়েকে পড়াবে না।’ আমি প্রতিবাদ করতে পারিনি। মুখ নিচু করে চিঠিটা পুড়িয়ে ফেলতে বলেছিল… আমি পোড়াইনি, রেখে দিয়েছিলাম… শুধু মনে রেখেছিলাম।”
“তুমি চাইলেই তো করতে পারতে ঠামি! তুমি কেন…?”
ঠাকুমা কান্না চেপে বললেন,
“তখনকার দিনে ‘চাওয়া’ মানেই ছিল চুপ করে থাকা। তোর মতো করে কথা বলার সাহস আমার ছিল না মা। আজ তোকে দেখে মনে হয়, আমি হয়তো পারতাম… যদি একটু সাহস থাকত, যদি কেউ থাকত পাশে দাঁড়ানোর মতো।”
সুচরিতা ঠাকুমার হাত ধরে বলল,
“আমি তোমার হয়ে সেই স্কুলটা বানাব ঠাম্মি। শুধু বাচ্চাদের জন্য না, তোমার জন্যও। যেন তুমি জানো—তোমার স্বপ্নটা মরেনি। আমি বহন করছি সেটা। আমি শেষ করব।”
ঠাকুমা শুধু মাথা হেঁট করে বলেন:
“ হ্যা মা। তুই লড়ে যা,শুধু নিজের জন্য নয় — আমার জন্যও দাঁড়িয়ে আছিস। তুই শুধু আমার নাতনি না, তুই আমার অতীতের প্রায়শ্চিত্ত।”
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত। ডাইনিং টেবিল পরিষ্কার। জানালার ফাঁকে হালকা বাতাস ঢুকছে। সুচরিতা তার ঘরে দরজা বন্ধ করে বই পড়ছে। ঠাকুমার কথায় যেনো মনটা একটু শান্ত হয়েছে তার।
সুচরিতার বাবা বিমল বাবু, এক কাপ কফি হাতে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। তার মুখ গম্ভীর, কিন্তু চোখে চিন্তার ছাপ।
মা, মালবিকা সেন, আস্তে আস্তে এসে দাঁড়ালেন পাশে।
“কি ভাবছো এতক্ষণ ধরে?”
বিমল বাবু কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
“সুচির কি হচ্ছে? বাবা একটা সাম্রাজ্য রেখে যাবে — আর মেয়ে তা ছুঁয়েও দেখবে না?”
মালবিকা শুধু হালকা হাসলেন
“তোমার সাম্রাজ্য গয়নার, আর ওর স্বপ্ন বই-খাতা। তোমার সোনায় গাঁথা, ওর চোখে আলোয় গাঁথা।”
বিমল বাবু অসন্তুষ্ট হলেন,
“তাহলে আমি কি ভুল করলাম? এতদিন ধরে দিনরাত এক করে সব দাঁড় করালাম কার জন্য?
বলে দাও, তাহলে দোকানটা বিক্রি করে ফেলি।”
মালবিকা নরম কণ্ঠে বললেন,
” না তুমি ভুল করোনি। তুমি যা করেছো, সেটা তোমার ভালোবাসা থেকে।
কিন্তু ওর স্বপ্নকে তুমি ‘না’ বলে দিলে, ও কী পাবে?”
বিমল বাবু কিছুটা কষ্টের গলায় বললেন,
“আমি শুধু চাই ও স্বচ্ছল থাকুক, নিরাপদ থাকুক। এই সমাজের আসল রূপ তুমি জানো না মালবিকা, গরিবের জন্য দরজা থাকে না। আর ও বস্তির বাচ্চাদের নিয়ে পড়ে আছে! ওকে আমি আমেরিকায় পাঠাতে চাই — এমবিএ করুক, মানুষ হোক!”
মালবিকা চোখ নামিয়ে, মৃদু হেসে বললেন,
“মানুষ তো ও এখনই। তুমি শুধু নাম-ডিগ্রি খুঁজছো, আমি দেখছি চোখে আগুন।
ও যেন ছোটবেলায় আমার দেখা এক মেয়ের মতো — যে নিজের গয়নার মায়া না করে, অন্যের কাঁধে হাত রেখেছিল।”
বিমল বাবু চমকে উঠলেন,
“তুমি বলছো তোমার নিজের কথা?”
মালবিকা হাসলেন,
“হ্যাঁ, আমিও একদিন গান গাইতে চেয়েছিলাম, রেডিওতে। কিন্তু বাবার ইচ্ছার সামনে আমার স্বপ্ন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি।
আজ আমার মেয়ে যদি পারে দাঁড়াতে — আমি ওকে বাঁধা দেব কেন?”
এক মুহূর্ত স্তব্ধতা
বিমল বাবু স্বর নরম করলেন,
“তাহলে তুমি বলছো আমি দুঃস্বপ্ন হব ওর জীবনে?”
মালবিকা ধীরে বলে,
“তুমি যদি ভালোবাসো, তাহলে ওকে ওর পথে যেতে দাও। তবেই একদিন, যখন ওর বানানো স্কুলের সামনে দাঁড়াবে— তখন তুমি বুঝবে, ও তোমার ব্যবসার উত্তরাধিকারী হয়নি ঠিকই…
কিন্তু তোমার নাম অমর করে দিয়েছে।”
বিমল বাবু আর কথা বাড়ালেন না। শুধু একটা চাঁপা কষ্টের দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
সকালের রোদটা যেন একটু বেশি উজ্জ্বল লাগছে আজ। সুচরিতার মুখে চাপা উত্তেজনা —
ইনবক্সে একটা মেল এসেছে:
“Congratulations! You have been selected for admission to Ramananda College, Department of History (Hons).”
সে থমকে যায়।
আচমকা চারপাশের শব্দ যেন কেমন নিঃস্তব্ধ হয়ে যায়।
তার বুকের মধ্যে তীব্র ধ্বনি —
“আমি পেরেছি! আমি আমার স্বপ্নের পথেই হাঁটছি!”
সে প্রথমেই দৌড়ে ঠাকুমার ঘরে যায়, জড়িয়ে ধরে ঠাকুমাকে।
ঠাকুমা তাকে কপালে চুমু দিয়ে বলেন:
“ইতিহাস তোরা বানাবি মা… ঠিক যেমন আমি স্বপ্ন দেখতাম, তুই সেটা পূরণ করিস।”
বিমল বাবু খবরটা জানলেন দুপুরে।টেবিলে তখন লাঞ্চ, কিন্তু তার চামচ থেমে গেল।
বিমল বাবু ঠাণ্ডা গলায় বললেন,
“ইতিহাস? কী হবে ইতিহাস পড়ে? আমাদের দোকানে চাকরি মিলবে ইতিহাসে মাস্টার্স করলে?”
সুচরিতা ধীরে কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
“বাবা, আমি তোমার দোকানে বসার জন্য জন্মাইনি। আমি মানুষ গড়ার জন্য পড়তে চাই। ইতিহাস আমার ভালো লাগে। আমার ভবিষ্যৎ আমি নিজে বানাতে চাই।”
বিমল বাবু এবার রেগে গলা চড়ান,
“ভবিষ্যৎ বানাতে গেলে টাকা লাগে! এই স্বপ্নে ভাত জুটবে না। রামানন্দ কলেজে পড়ে কি কেউ জীবন গড়ে?”
মালবিকা চুপচাপ কাঁটা চামচ থামিয়ে বসে থাকেন। চোখের কোণে জল, কিন্তু মুখে কোনও কথা নেই।
মালবিকা চোখে চোখ রেখে কথা বলেন না, কিন্তু মেয়ের দিকে তাকিয়ে শুধু একবার হাসলেন।
সুচরিতা বুঝে যায় — “মা আছেন আমার পাশে।”
স্বামীর গলার আওয়াজ চড়া হলেও, তিনি ভাঙেন না — কারণ তিনি জানেন, সংসারের শান্তি নষ্ট হলে সন্তান ভেঙে যায়।
তবে যখন প্রয়োজন হয় — যেমন সুচির স্বপ্ন রক্ষা করতে — তখন তিনি শব্দচয়নের সূক্ষ্ম ভারসাম্যে স্বামীর মনে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন।
না, তিনি মুখের ওপর ‘না’ বলেন না, কিন্তু এমনভাবে বলেন — যে ‘না’টা নিজেই ‘হ্যাঁ’ হয়ে যায়।
সুচরিতা রাতের বেলা একা বারান্দায় বসে — চোখে জল, হাতে রামানন্দ কলেজের ভর্তির চিঠি।
তার পাশে এসে ঠাকুমা বসেন।
ঠাকুমা ধীরে বলেন,
“তোর বাবা ভালো মানুষ রে, কিন্তু ভয় পায়। ও জানে না সাহস কাকে বলে।
তুই আগুন — তোকে কেউ আটকে রাখতে পারবে না। কলেজে যা মা, বই হাতে এগিয়ে যা।”
“আমি তোর বাবার সাথে কথা বলব। দেখবি ঠিক সে রাজি হয়ে যাবে ।”
রাতে খাওয়ার পর সেন বাবু একা বসে আছেন তাঁর পড়ার ঘরে। সামনে ডেস্কে গয়নার ডিজাইন আর হিসেবপত্র ছড়ানো, কিন্তু তার চোখ সেখানে নেই।
মনটা উসখুশ করছে—মেয়েটা মাথা নষ্ট করে ফেলছে! ইতিহাস পড়বে!
ঠিক তখনই দরজায় ঠকঠক শব্দ।
ঠাকুমা আসেন। শাড়ির আঁচল কোমরে গোঁজা, মুখে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা।
ঠাকুমা চুপচাপ এসে বসেন তার ছেলের পাশে,
“একটু কথা বলবো রে?”
বিমল বাবু বিরক্ত স্বরে বললেন,
কথা তো সকাল থেকেই হচ্ছে মা, নতুন করে কি আর বলবে শুনি??”
একটু থেমে বললেন,
“আবার সুচির ব্যাপারে না তো?”
ঠাকুমা ধীরস্বরে বললেন,
” হ্যাঁ, ওর কথাই বলবো। কারণ আমি ওর মধ্যে আমার স্বপ্ন দেখছি, যেটা আমি কোনোদিন পূরণ করতে পারিনি।”
বিমল বাবু একটু নরম হলেন,
“মা, তুমি জানো তো, আমি ওর ভালো চাই। কিন্তু ইতিহাস পড়ে কি আজকাল কিছু হয়?
আমার দোকানটা আছে, ব্যবসাটা আছে, সেটা তো ওর ভবিষ্যৎ।”
ঠাকুমা এবার একটু জোর গলায় বলেন,
“ব্যবসার উত্তরাধিকার দিলেই কি জীবন হয়?সোনা গলে যা বানাস, সেটা গয়না হতে পারে, কিন্তু মানুষ গড়া তো আরও বড় শিল্প।সুচি যে মানুষ গড়ার কারখানা বানাতে চায়, সেটা কি তুই বুঝতে পারিস না?
ঠাকুমা এবার গলার স্বর নরম করলেন,
“তুই জানিস, আমিও কলেজে পড়েছি। ইতিহাস আমার প্রাণ ছিল। রবীন্দ্রনাথ থেকে রাণী লক্ষ্মীবাই পর্যন্ত—সব ছিল মুখস্থ।”
একটু থামলেন, ভিতরে একটা যন্ত্রণা অনুভব করলেন।
“কিন্তু সেই সব ফেলে বিয়ে হয়ে গেল। গয়নার বাক্স পেলাম, কিন্তু বইয়ের বাক্স হারালাম।
আর যেদিন তুই জন্মালিরে, আমি ঠিক করেছিলাম—আমার ছেলেকে আমি কোনো বাধা দেবো না।
তোর বাবা যেমন বলতো, ‘মেয়েরা লেখাপড়া করলে মাথা উঁচু হয়’, স্বামী কে সম্মান করেনা।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“ভুল ভাবতেন তিনি। আজ ঠাকুর জানেন, আমার বুকের রক্ত দিয়ে হলেও সুচিকে আমি থামাবো না।”
“শোন বাবা সুচির চোখে আমি সেই আলো দেখি — যেটা আমি নিজের চোখে কোনোদিন আনতে পারিনি।
তুই ওকে বাঁধলে — ও ছিন্ন হবে, ফিরে আসবে না।”
বিমল বাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন, তার মধ্যে পিতৃস্নেহা জেগে উঠল,
“আমি তো শুধু ওকে সুরক্ষিত রাখতে চেয়েছিলাম মা। এই বাইরে কত লড়াই… সমাজ, নিরাপত্তা, সম্মান…”
সরস্বতী দেবী সোজা হয়ে বসলেন,
“সম্মান যদি ছাদে গিয়ে বসে, তাহলে মেয়েরা জানালার বাইরে তাকাবে না?”
“তুই কি ওর জন্য একটা সোনার খাঁচা বানাতে চাস? যেখানে আকাশ আছে, পাখি নেই?”
বিমল বাবু গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,
“তুমি বলছ বলেই শুনছি।
তবে একটা কথা বলত মা,তুমি যদি ইতিহাস পড়ে যেতে তাহলে কী হতে চাইতে?”
ঠাকুমা হেসে উঠলেন,
“আমি? আমি হয়ত স্কুলের মাস্টারনি হতাম। নয়ত কলেজে পড়াতাম।
কিংবা, সুচির মতো একটা মেয়ে তৈরি করতাম, যে একদিন আমায় ইতিহাসের পাতায় এনে দিত।”
সেন বাবু ধীরে উঠে দাঁড়ান।নিরাশ হলেন,
” ঠিক আছে মা ও পড়ুক ইতিহাস,শুধু তোমার মুখের দিকে চেয়ে আমি মত দিলাম। ”
“তবে আমিও তোমাকে বলে রাখলাম মা, এই সেন বংশের একমাত্র উত্তরাধিকারী সে,ভবিষ্যতে এই সাম্রাজ্য কিন্তু তাকেই রক্ষা করতে হবে। ওসব মাস্টারনি হওয়ার স্বপ্ন দেখা যেনো ত্যাগ করে।”
ঠাকুমা হেসে ফেলেন। চোখে জল, মুখে গর্ব।
“ও শুধু স্বপ্ন দেখবে না, স্বপ্ন বানাবে। তুই দেখিস।”
সকালের আলো আজ যেন একটু বেশি কোমল।
রোদ বারান্দায় এসে পড়েছে যেমন ভাবে কেউ আদর করে কারো কপালে হাত রাখে।
সুচরিতা আয়নায় নিজেকে একবার দেখে নেয়।
সাদা-কালো একটা সুতির সালোয়ার, মাথায় বিনুনি করে বাঁধা চুল, গলায় একফালি সুগন্ধি চাদর।
তেমন সাজগোজ নেই—কিন্তু তার মুখে আজ এক অদ্ভুত দীপ্তি। আজ সকালে সেন বাড়িতে এক আলাদা রকম ব্যস্ততা
ঠাকুমা হাঁক দিচ্ছেন—
“চা খেয়ে যা মা, খালি পেটে ইতিহাস পড়লে পেট-ইতিহাস এক হয়ে যাবে!”
মা হালকা হাসি দিয়ে বললেন,
“সাদা চাদরটাও বের করে দিয়েছি, ওটাই পরে যাক। স্নিগ্ধ লাগবে।”
সুচি মায়ের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকালো,
“মা, আজ শুধু কাপড় না, মনে হচ্ছে নিজের ভিতরটাও গুছিয়ে নিচ্ছি।”
ঠাকুমা উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন,
“এই তো চাই! ভিতরটা যদি শক্ত হয়, বাইরের কাপড় তো শুধু খোলস!”
মা রান্নাঘরে চলে গেলেন। সুচরিতাও নিঃশব্দে মায়ের পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো।মাকে পেছন থেকে আবেগে জড়িয়ে ধরলো সে।
“তোমাদের জন্যই আজ আমি আমার স্বপ্ন পূরণের পথে এগোতে পারছি না।”
“আমি আর কি করেছি । পুরো ক্রেডিট টাই তোর ঠাকুমার।”
” না মা আমি জানি তুমি চুপ করে থেকেও আমার পাশেই ছিলে, সেটা বাবা বুঝেছে।”
মায়ের চোখে জল,
“তুই তো আমাদের অসমাপ্ত গল্পের পরের অধ্যায়।”
ঠাকুমা দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন,
“একটা খাতা নিয়ে যা, যেখানে আজ থেকে নিজের কথাগুলো লিখবি।
ইতিহাস শুধু পড়লে চলে না—বাঁচতে হয়, গড়তে হয়। তুই পারবি মা।”
সুচি হাঁটু গেড়ে ঠাকুমার পা ছুঁয়ে দিল।
ঠাকুমা আশীর্বাদ করলেন,
“মনুষ্যত্ব ভুলিস না মা। কলেজে বই শেখাবেই, কিন্তু জীবন তুই নিজেই শিখবি।”
সুচরিতা আর দেরি করলো না। বাবার দেওয়া গাড়িটা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলো একপাশে। সুচি রিকশায় উঠল।
ব্যাগে ভর্তি দরখাস্তপত্র, কলম, এক চাঁপা উত্তেজনা আর বুকভরা স্বপ্ন।
রিকশা যখন অনেকটা দূরে বড় রাস্তার বাঁকে,সুচি পেছনে তাকিয়ে দেখে, তার মা-ঠাকুমা বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছেন।
মায়ের চোখে জল, ঠাকুমার মুখে গর্ব—
আজ যেন শুধু একটা মেয়ে কলেজে যাচ্ছে না—
তিন প্রজন্মের নারীর নীরব প্রতিবাদ, সাহস আর আত্মমর্যাদার যাত্রা শুরু হলো।
সুচি এগিয়ে চললো।
গন্তব্য, রামানন্দ কলেজ,
২১ডি কলেজ স্ট্রিট,কলকাতা -৭০০০০৬
কেউ কেউ ইতিহাস পড়ে, আবার কেউ কেউ ইতিহাস বানায়। কিন্তু সুচি জানে, সে দ্বিতীয়জন হতে চায়।
—oooXXooo—
![]()







