ঘোড়ার ডিএনএ টেস্ট
বাসুদেব চন্দ
লাগামছাড়া একটা ঘোড়ার নাগাল পাওয়া দুঃসাধ্য ব্যাপার, সেখানে এটা তো আস্ত একটা উন্মাদ!
দৌড় যখন শুরু করে তখন সামনে-পিছনে তাকায় না, সব ভেঙ্গেচুরে দিয়ে চলে যায়!
ওর পিঠে যারা চেপেছিল, তাদের চানধান থেকে খাওয়া-দাওয়া, সবই এখন লাটে উঠেছে!
সে-টা না-হয় মেনে নেওয়া গেল, কারণ ওর সওয়ারীরা হলো মতলববাজ, তাই ওদের নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই!
যত লোকসান গ্রামবাসীদের!
দিনদিন দুর্দশা বেড়েই চলেছে!
শেষে একদিন সবাইমিলে ঠিক করল- ‘এই উন্মাদ ঘোড়াটাকে থামাতেই হবে’!
কিন্তু থামাবেটা কে!
অনেক ভেবেচিন্তে দেখা গেল- একমাত্র ‘দাশুকাকা’ই পারে এ-কাজ করতে। কারণ পাগলামোতে দাশুকাকাও বেশ নামডাক করেছে!
দাশু’পাগলের পনেরো বছরের পুরনো একটা মটর’সাইকেল আছে যেটা রাস্তায় মোটেই চলতে না, কিন্তু ধানখেতে পড়লেই সাঁই সাঁই করে ছুটতে থাকে!
তাই একদিন দিনক্ষণ দেখে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে বলা হলো-
“কাল সকাল দশটায় বৈদ্যবাড়ির ধানখেতে ‘উন্মাদ’ঘোড়া আর ‘উন্মাদ মটরসাইকেলের’ মধ্যে রেস হবে। যারা এই পাগলামোর সাক্ষী হতে চান, তারা সকাল সকাল এসে যে-যার মতো জায়গা দখল করে বসে পড়বেন। তবে ভুলেও কেউ বউ-বাচ্চা আনবেন না, যেকোনও সময় যেকোনও রকমের বিপদ ঘটতে পারে…..!
ডুম ডুম ডুম ডুম……..”
বীরেন বুড়ো মুখ বেঁকিয়ে বলল-
“বললেই হলো? ছানাপোনা আর বউখানা যেন আকাশ থেকে আনা হয়েছে, তাদের বুঝি আর পাগলামি দেখতে ইচ্ছে করে না!”
শুধু বীরেন নয়, গ্রামের বেবাক লোকজন নেমন্তন্নবাড়ির মতো সপরিবারে এসে হাজির হলো বৈদ্যবাড়ির ‘ধান খেতে’!
তবে তারা কেউ মাটিতে নয়, চড়ে বসল আম-খেতে। মদ্দা’রাই ঠেলেঠুলে তাদের তুলেছে আমগাছের মগডালে।
“এ-সুযোগ কি আর বারবার আসবে রে পাগলা!” – বীরেন একখানা বিড়ি ধরিয়ে বলল!
★★★
দাশুপাগল নিজের বুকে আর চাকার পেটে ভরতি করে হাওয়া গিলে বসে রইল, উন্মাদ ঘোড়াটাকে আসতে দেখলেই নিজের পিছনে আগুন লাগিয়ে ছুটতে শুরু করবে।
পাগল-রেসের সবরকম প্রস্তুতি সারা হয়ে গেল।
উপস্থিত সকলের বুকের ভিতর অদ্ভুত রকমের একটা ‘কী হয় কী হয়’ ভাব!
সব মিলিয়ে বৈদ্যবাড়ির ধানখেতে তখন ‘ধানধান’ উত্তেজনা!
মাঝখান থেকে ঝামেলায় পড়ল ধানখেত লাগোয়া আমগাছগুলো!
বলা নেই, কওয়া নেই কতগুলো মানুষ বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে ঘাড়ের উপর উঠে এসে হনুমানের মতো লাফাতে শুরু করল।
গাছ বলে যেন তাদের সংসারে কোনও কাজ নেই। এমনি এমনিই রান্নাবান্না হয়ে যায়।
মাটি থেকে জল তোলা, সূর্য থেকে আগুন আনা- এসব যেন কাজ না!
কী আর করা, নাক্কান বুঝে কটাদিন সহ্য করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই!
★★★
হঠাৎ নজরে পড়ল-
কতগুলো ইঁদুর উত্তর দিক থেকে দক্ষিণ দিকে প্রাণপনে দৌড়তে শুরু করেছে!
বোঝা গেল- সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে ওই উন্মাদ ঘোড়াটা এ-দিকেই আসছে…..!
দাশুপাগলও এক্সেলেরটর ঘোরাতে ঘোরাতে পেছন থেকে ধোঁয়া ছাড়তে শুরু করল……..
শুরু হলো দুই পাগলের পাগলামি…..
অনেক্ষণ দৌড়বার পর দাশুপাগল ঘোরসওয়ারীদের নাগাল পেল-
“তোমরা বসে বসে শুধু হাওয়াই খেয়ে যাচ্ছ! আপদটাকে থামাচ্ছ না কেন? দেখতে পাচ্ছ না, খেতের পর খেত কীভাবে নষ্ট করে দিচ্ছে!”
“আমরা কি ছাই বুঝেছি- এমন একটা পাগলের পাল্লায় পড়ব! এখন আর কিছু করার নেই কাকা! ওর পিঠ থেকে নেমে যেইনা মাটিতে পা রাখব অমনি ইঁদুরগুলো আমাদের খাবলে খেয়ে নেবে!”
“তা বলে দিনের পর দিন এ-ভাবে চলতে থাকবে!”
একজন বলল-
“বিশ্বাস করো কাকা, একবার ওকে থামাবার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু কে যে পিছন থেকে ওর লেজটাকে ঘুরিয়ে দেয় বুঝতেই পারি না! এটাও তখন গ্যাস খেয়ে দিক্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে পাগলের মতো দৌড়তে শুরু করে!”
দাশুকাকা ভাবল- এগুলোর সঙ্গে কথা বলে সময় নষ্ট করে লাভ নেই, আসলটাকেই ধরতে হবে।
মোটরসাইকেলের গতি বাড়িয়ে ঘোড়াটার কানের কাছে গিয়ে পৌঁছল-
“তোমার কি খিদেঠিদে কিছু পায় না? সারাদিন অত দৌড়ও কেন?”
“খিদে পায় বলেই তো দাঁড়িয়ে পড়ি। আর যেই দাঁড়িয়ে পড়ি অমনি ওরা বস্তা বস্তা ঘাস এনে আমার মুখের সামনে তুলে ধরে!”
“বেশ তো, খাওয়া হয়ে গেলে বিশ্রাম করো না কেন?”
“ওরা যে বলে- না-দৌড়লে ঘাস দেওয়া বন্ধ করে দেবে! না-খেলে বাঁচবটা কী করে!”
“তোমার বাঁচাটা কি খুব জরুরি?”
“আমার কাছে না-হলেও ওদের কাছে জরুরি!”
দাশুকাকা চারদিক দেখেশুনে জিজ্ঞেস করল-
‘ওরা’ বলতে তুমি কাদের কথা বলছো, একটু খোলসা করে বলো দেখি?”
এবার ঘোড়াটা রেগে গিয়ে বলল-
“অত কথা তোমায় বলতে যাব কেন হে শুনি!”
ঘোড়াটা এবার জোরে দৌড়তে শুরু করল!
দাশুকাকা হাঁপাতে হাঁপাতে ওর পিছু নিল ঠিকই, কিন্তু আর বোধহয় পেরে উঠবে না! তবুও চেষ্টা করতে লাগল!
এ-ভাবে বেশ কিছুক্ষণ দাপাদাপি আর হাঁপাহাপির পর দুজনে কোথায় যে মিলিয়ে গেল আর দেখা গেল না!
সবাই যখন দাশুপাগলকে ব্যাকুল হয়ে খুঁজে যাচ্ছে তখন কতগুলো জানোয়ার দাঁতনখ বের করে এ-দিকেই ছুটে আসছে!
তাই দেখে যারা ধানখেতের আল ধরে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে ছিল পড়িমরি করে তারা আমবাগানের দিকে দৌড় লাগল!
যারা পারল না, তাদের বেঘোরে প্রাণ গেল!
★★★
আজ পুরো গ্রামজুড়ে সেই জন্তুগুলো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, আর
সারা মানুষগুলো গাছে গাছে ঝুলছে!
ওদের সাথে আছে পাখি, পাশে আছে পোকামাকড় আর সাপকোপ!
তবুও মানুষগুলো নিরাপদে আছে।
কিছুদিন এ-ভাবেই চলল-
আমগাছ আম পাড়ে, পাখিরা ডিম পাড়ে এবং মানুষ পাড়ে বাচ্চা।
★★★
এদিকে ঘোড়াটার সঙ্গী-জানোয়ারগুলো পড়েছে খাদ্যসংকটে! মানুষের মাংস না-পেয়ে দিনদিন ওরা আরও হিংস্র হয়ে উঠতে লাগল!
খিদের জ্বালা সহ্য করতে না-পেরে শেষে একে অপরের মাংস খেতে শুরু করল!
এ-ভাবেই ওরা একদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল!
নিবারণ’কাকা বলল-
“এদ্দিনে হরি মুক তুলে চাইল!”
দিনু বলল-
“তালি ঘরকে ফিরে যাই না-কেনে কাকা?”
“আজই লয় রে দিনু, আরও কটা দিন দেখতি হবে। একন কিচুদিন আমাদের ধজ্জি ধরি থাকতি হবে, কাস্তে’গুলানরে ভালো করি শান দিতি হবে! কাজে নাগতে পারে।”
নিবারণকাকার কথা মতো ওরা গাছে গাছেই দিন কাটাতে লাগল!
★★★
একদিন ভোরের দিকে যেইনা চোখের পাতাদুটো লেগে এল অমনি মনে হলো- গাছগুলো যেন নড়ছে! অথচ কোথাও কোনও হওয়া-বাতাস নেই!
চোখ খুলে নিচে তাকাতেই নিবারণকাকা আঁতকে উঠল!
“কয়েকটা জন্তু কামড়ে কামড়ে গাছের গোড়ার ছাল-বাকল তুলে ফেলার চেষ্টা করছে!
এবার নিবারণকাকা তেড়ে ফুঁড়ে উঠে দাঁড়াল! দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া বাঘের মতো গর্জে উঠে সবাইকে হেঁকে বলল-
“কাস্তেগুলান সঙ্গে নে তোমরা সক্কলে একসঙ্গে নাফিয়ে পড়ো! সবকটাকে আজ নিকেশ করি দিতি হবে!
‘রে-রে’ করে সবাই একলাফে লাফিয়ে পড়েই এলোপাথাড়ি কাস্তে চালাতে শুরু করল! ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরল বৈদ্যবাড়ির আমখেতে!
★★★
সে-দিন দাশুপাগল শূন্যহাতে ফিরে এসেছিল! কিন্তু উন্মাদ ঘোড়াটা ছিল সম্পূর্ণ সুস্থ! তবে সঙ্গীসাথীদের হারিয়ে আজ কিছুটা মুষড়ে পড়েছে!
“এমন একটা হিংস্র সাদা ঘোড়া পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল”- এই খবরটা ছড়িয়ে পড়া মাত্রই দেশ-বিদেশ থেকে তাবর তাবর বিশেষজ্ঞরা ছুটে এলেন ঘোড়াটাকে পরীক্ষা করতে!
জ্যোতিষীরাও বা পিছিয়ে থাকেন কেন, তাঁরাও এলেন ‘শনি আর রাহুর’ অবস্থানের বিচার-বিশ্লেষণ করতে!
সব শুনেঠুনে নিবারণকাকা বলল-
“এট্টা রাক্কসরে নে এত আদিক্কেতা আর চোকে দেকা যাচ্চে না রে দিনু, ইচ্চে করে হিরহির করে টেনে নে গে হাড়িকাটে ওর গলাটারে ঢুইকে দে দিই এককোপে নাইমে!”
“তাতেও কিচু হবে না গো কাকা, কাটা মুণ্ডু নেও ও আমাদের জ্বালাবে! এটার মদ্দ্যি যে এট্টা শয়তানের বাস গো!”
“তালি আর কী, মাথায় নে নেত্য কর!
আমি যাই রে দিনু, তোর কাকির আজ বেপদতারিণী পুজো আচে!”
—oooXXooo—
![]()







