দীপান্বিতার রাত
স্বপ্না নাথ
আমি তখন পঞ্চদশী।
বিয়ে হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। আমার জন্ম বাংলাদেশে। আমাদের বাড়িতে কালীপুজোর দিন লক্ষ্মীপুজো হতো। আমাদের ছোটদের কাছে সে পুজো ছিল বড়ই উপভোগ্য, বড়ই আনন্দের। সে ছিল বেশ সমারোহের পুজো। বিয়ের পর এখানে আমার প্রথম লক্ষ্মীপুজো, বলাবাহুল্য শ্বশুরবাড়িতেও এই একই পুজো।
তখন সদ্য বিবাহিতা, আমার কাছে সবই নতুন। আর যা কিছু নতুন ওই বয়সে সবই আকর্ষণীয়। মনের মাঝে এক ভালো লাগার অনুভূতি। তবে দাম্পত্যের ভাল লাগা নয়, তখন বরং খেলাধুলা, গল্প, পড়াশোনা, ছবি আঁকা নিয়ে থাকতে ভালবাসতাম। কিন্তু প্রথম শাড়ি পরা, গয়না, শাঁখা সিঁদুর, মাথায় কাপড় দিয়ে বউ সেজে থাকা, নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ বেশ মজার মনে হতো।
তখন আমাদের যৌথ পরিবার। ভাসুর, জা,দেওর, তাদের ছেলে মেয়েরা, কাছাকাছি শ্বশুরবাড়ি দুই বিবাহিতা ননদ, তাদের ছেলে মেয়েরা এই নিয়ে বেশ জমজমাট আত্মীয়-স্বজনের সংসার, ঠিক আমাদের বাংলাদেশের মতো।
আমাকে সবাই খুব ভালোবাসতো, বিশেষ করে ছোটরা।
ভাসুর, জায়েরা নিজের মেয়ের মতোই দেখতেন।
১৯৭৩ সাল।
সেদিন ছিল লক্ষ্মী পুজো। আমার স্বামী, দেওর মিলে ওপারে যাবে লক্ষী পূজার বাজার করতে।
আমরা ওপার বলতে বুঝতাম নদীর ওপার। বাংলাদেশ তো নদীবহুল, অধিকাংশ শহর, গ্রাম নদীর তীরে।
পরে বুঝলাম, ওপার মানে রেললাইনের ওপারে । এখানে নদী কোথায়!
পুজোর দুদিন আগে মাটির প্রদীপ তৈরির ধুম পড়ে যেত। তখন মোমের আলোর প্রচলন ছিল না। বাজারে এখনকার মত মাটির প্রদীপ কিনতে পাওয়া যেত না।
সেদিন সকাল থেকেই পুজোর তোড়জোড়। আমি আঁকতে পারতাম, তাই আলপনা দেওয়ার ভার আমার উপরেই বর্তালো। ঠাকুরের আসন থেকে শুরু করে, সারা বাড়ীর যত্রতত্র আলপনায় ভরে দিলাম। সবার প্রশংসায় উৎসাহিত হয়ে পাশের বাড়িতেও আলপনা দিয়ে দিলাম।
আমার স্বামী, দেওর, ভাসুরদের ছেলেমেয়েরা অনেক বাজি রোদে দিয়ে রেখেছে। পুজোর পরে সেগুলোর সদগতি হবে।
বিকালে আমার মেজো জা, একটা নতুন লাল শাড়ি আমাকে পড়তে দিলেন। সেজেগুজে পুজোর সামনে বসতে হবে। এর আগে বাড়ির পুজোতে ঠাকুরের সামনে কোনদিন বসেছি বলে মনে পড়ে না।
আমরা ছোটরা ঠাকুর ঘরের বাইরে হইচই করেই কাটিয়ে দিতাম।
সন্ধ্যাবেলায় পুরোহিত এসে গেল। বড়রা সবাই পুজোর সামনে বসে গেল। আমাকে ডাকল সেখানে যেতে, হঠাৎ আমার বড় ভাসুরের বড় মেয়ে আমার হাত ধরে বারান্দায় নিয়ে গেল। গিয়ে দেখি ছোটরা বাজি পোড়ানোয় মেতেছে। সেখানে আমার স্বামী ও উপস্থিত।
পুজো ভুলে আমিও ওদের সাথে মেতে উঠলাম।
তারাবাজি, রং মশলা, সাপ বাজি, কালি পটকার পর চরকি বাজির পালা এল।
আমার কোন হুশ নেই, ভুলে গেছি আমি এবারই নতুন বউ!
হঠাৎ একটা চরকি বাজি ঘুরতে ঘুরতে আমার পায়ের কাছে শাড়ির কুচির উপরে এসে আটকে গেল। কিছু বোঝার আগেই আগুন জ্বলে উঠলো। আমি তো দিশাহারা! লজ্জায় শাড়ি খুলতেও পারছিনা। ছোটরা আগুন আগুন বলে পরিত্রাহি চিৎকার জুড়ে দিল, সেই সাথে আমার স্বামী ও। কিন্তু সে ছুটে এসে আগুন নেভানোর কোন চেষ্টাই করলো না!
আমার দুই পায়ে পোড়ার জ্বালায় কাঁদতে শুরু করেছি, ঠিক তখনই আমার বড় ভাসুরের বড় ছেলে ছুটে এসে একটানে শাড়ির সামনে টা খুলে দিয়ে, দুই পা দিয়ে দপা দপ করে আগুনটা নিভিয়ে দিল।
আমি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে, ওই পোড়া শাড়ি কোনরকমে গুটিয়ে ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করলাম।
পুজোর মন্ত্র পাঠ মাথায় উঠলো। সবার উৎকণ্ঠিত ডাকাডাকিতে বাধ্য হয়ে দরজা খুললাম।
তারপর যা হয় আর কি, যতনা পুরার জ্বালা তার থেকে বেশি সবার উৎকণ্ঠায় আর তিরস্কারে নিজেকে অপরাধী মনে করা।
না, সেরকম সাংঘাতিক ভাবে পোড়েনি। তবে কতকগুলো বড় বড় ফোস্কা আমাকে অনেকদিন ভুগিয়ে ছিল।
সেদিনের সেই ঘটনা আজ হয়তো লিখতে পারতাম না, যদি না আমার থেকে পাঁচ বছরের ছোট, আমার বড় ভাসুরের বড় ছেলে সেদিন মরিয়া হয়ে তার সেজোকাকিকে না বাঁচাত।
ওইটুকু ছেলের উপস্থিত বুদ্ধিতে আমি বেঁচে গেলাম, যা ওখানে অন্যরা বা আমার স্বামীও করতে পারল না!
তার অনেক বছর পর, নিজের পৃথক সংসার হল, নিজের ঠাকুরের সিংহাসন হল, আলাদা পূজো হলো। কত আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, লোকসমাগম।
কত পুজো এলো, গেল, সে সব দিনের কথা আলাদা কোরে আর মনে পড়ে না।
কিন্তু আমার বিবাহিত জীবনের সেই প্রথম দীপান্বিতা আমার জীবনে চিরস্থায়ী দাগ রেখে গেল।
—oooXXooo—
![]()







