রূপনগরের রূপসী
—সুবর্ণ রুদ্র
জগাই চক্রবর্তীর গাঁটছড়া বাঁধার সময় হয়েছিল দুপুর বারোটায়, আর সর্বনাশটা শুরু হয়েছিল দুপুর দেড়টার মধ্যে। তবে তার আগেও যে হালকা ঝড়ো হাওয়া বইছিল না, তা বললে সত্যকে অপমান করা হবে। ছেলেটার বয়স বাইশ, আর বুদ্ধি ছিল গড়পড়তা আট কি দশ। তবে সাহেবি চুলচেরা চেহারায় ভর করে বিয়ে সে করল বটে, কিন্তু কিসের ভিত্তিতে জানেন? রূপ! রূপ দেখে বিয়ে! যেন বিয়েটা নয়, ফ্যাশন শো থেকে ফার্স্ট প্রাইজ জিতে মডেল নিয়ে এসেছে!
জগাইয়ের মা সরলা দেবী তখন থেকেই চোখ গোল করে বলতে শুরু করলেন,
“রূপই সব না বাবা, রান্না জানে তো? পাঁচটা লোকের ভেতর কথা বলতে পারে তো? আয়নার দিকে তাকিয়ে মেয়েটা সারাদিন কাচ মুছবে, না সংসার করবে?”
জগাই অবশ্য তখন প্রেমের চশমা চোখে লাগিয়ে বলত,
“মা, ওর হাসি দেখেছো? রোদে সোনালী হয়ে ওঠে! রান্না আমি শিখে নেব, ও হাসলেই আমার পেট ভরে যায়!”
এই শুনে ওলাউঠান গ্রামে এমন রটে গেল, “জগাই চক্রবর্তী বউয়ের হাসি খেয়ে বাঁচবে।”
বিয়ের দিন কনে এসে ঘরে ঢুকল—চোখে চশমা, মুখে বিউটি পার্লারের সাত দিনের মেকআপ, আর হাতে মোবাইল। পাঁচ পা বাড়ির ভেতর পা রাখতে না রাখতে বলল,
“এই ঘরটা কি আমার ড্রেসিংরুম হবে?”
সরলা দেবী তখনই চট করে বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফেললেন। চুপিসারে বললেন,
“বউ না কি বিয়ের প্যাকেজ সফটওয়্যার!”
বৌয়ের নাম ছিল “পিঙ্কি ঘোষ।” তবে বিয়ের পরে কাগজে কলমে “পিঙ্কি চক্রবর্তী” হলেও তার ভেতরটা “ইনস্টা-পিঙ্কি” রয়ে গেল।
প্রথম দিনেই দেখা গেল, সকাল বেলা সে নাস্তা খায় না—কারণ ‘ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং।’ দুপুরে ভাত খায় না—কারণ ‘কার্বস কিল।’ রাতে রাঁধে না—কারণ ‘কুকিং ইজ ফোর লোয়ার ক্লাস।’
দ্বিতীয় দিন থেকেই জগাইয়ের বাবা রামসুন্দরবাবু ধোঁয়া ছাড়তে লাগলেন। বললেন,
“এইটা কি বউ না ডিজিটাল ফটোকপি? সারাদিন শুধু ফোন ফোন ফোন! কেবল সেলফি তোলে, রাঁধে না, খায় না, হাঁড়ি-পাতিল চেনে না—আমার মগের মুখ চেনে না, অথচ ইনস্টায় দশ হাজার ফলোয়ার!”
তৃতীয় দিন এক নতুন বিপদ দেখা দিল। পিঙ্কি বাড়ির পেছনের উঠোনে একখানা গোলাপগাছ দেখে রীতিমতো চেঁচিয়ে উঠল,
“এই গাছটা তুলে ফেলুন! রোজ মোর্নিং রিল করব, ওটা ব্যাকগ্রাউন্ডে যায় না।”
জগাইয়ের কাকা, গণেশ কাকা, যিনি মূলত উঠোনে খড়কুটো কুড়োনো পার্টির সভাপতি, কপালে হাত দিয়ে বললেন,
“এ বাড়িতে বউ নয়, এসেছে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর।”
চতুর্থ দিন শুরু হল এক চূড়ান্ত সাংস্কৃতিক লড়াই। সকালবেলা পিঙ্কি উঠে শঙ্খ বাজানো ও মন্ত্র জপ শুনে গলা কাঁপিয়ে বলল,
“প্লিজ স্টপ ইট, ইট ইজ টু লাউড! আই হ্যাভ হেডেক!”
আর পাশের ঘরে পিসিমা মন্ত্র কাটতে কাটতে চিৎকার দিয়ে বললেন,
“এই বউ তো পিশাচ! ওমা, গীতাগুলোই যদি মাথা ধরায়, তবে ঘরে লক্ষ্মী থাকবে কি করে?”
এদিকে জগাই পড়ে গেল বেজায় ফাঁপরে। বউকে সামলাও, মা-পিসি-ঠাকুমাকে বোঝাও। মায়ের সামনে মুখ খুললে মা বলত,
“এই তো করেছো রূপ দেখে বিয়ে! এখন হাসো, ইনস্টাগ্রামে গিয়ে লাইভে গিয়ে বলো—’মা ভাত চায়, বউ বলছে লো কার্ব।’”
একদিন এমন হল, সন্ধেবেলা পিঙ্কি একখানা টাইট জিন্স পরে ঠোঁটে লাল লিপস্টিক মেখে বেরিয়ে পড়ল—বলল,
“আমি ক্যাফেতে যাচ্ছি, নীলু আর তিথির সঙ্গে। ট্রেন্ডিং রিল বানাতে হবে, পজ পোজ দিতে হবে।”
জগাই তখন বসল চুপ করে, ঠাকুর ঘরের ঘণ্টা হাতে নিয়ে বলল,
“হে ভগবান, আমার প্রেমে কি ফায়ারওয়াল ছিল না?”
এরপর এলো সেই মহা সপ্তাহ, যেদিন হরিণমার মত ঘটনা ঘটে গেল।
এক সন্ধেবেলা পিঙ্কি মুখে প্যাক মেখে বারান্দায় বসে আছে। ওর হাতে তখন শশার রস আর কানে হেডফোন। ঠিক সেই সময় পাড়ার মহিলা সমিতির সভানেত্রী বীণাদি এলেন—সঙ্গে সাদামাটা শাড়ি, একতারা কণ্ঠে।
বীণাদি এসে নম্র গলায় বললেন,
“বউমা, একটু হরিনাম সংঘের দানে কিছু দেবেন?”
পিঙ্কি চমকে উঠে বলল,
“নট আভেইলেবল! আই ডোনেট অনলি ডিজিটালি! গুগল পে করেন?”
বীণাদি ব্যাগ থেকে পুরনো খাতা বার করে বললেন,
“গুগল পে কি? ও তো গোবিন্দ পে না!”
তারপর সে খবর ছড়িয়ে পড়ল বটতলার চায়ের দোকানে, সেখানে মাষ্টার মশাই থেকে শুরু করে বাবলু চপওয়ালা পর্যন্ত বলে উঠল,
“রূপ দেখে বিয়ে করলে এসব তো হবেই! হাসি দিয়ে ভাত রান্না হয় না, কৌটো খুঁজে পাওয়া যায় না। রূপ তো সাতদিনের কসমেটিক্স, আর সংসার হল সাত পুরুষের ধৈর্য!”
এদিকে জগাই তখন বৌয়ের ডায়েট চার্ট আর মায়ের পান্তা ভাতের চাহিদার মাঝে পড়ে গিয়ে চিঁড়ে ফেঁপে একদম লুচি হয়ে গেছে। অফিসে বসে বলে,
“আমার বিয়ে হয়েছে না আমি কাস্টমার কেয়ারে ফোন করেছি?”
জগাইয়ের এক বন্ধু, শ্যামল, বলল,
“ভাই, বিয়ে মানে তো প্যাকেজ ডিল! রূপের সঙ্গে ইনস্টাগ্রাম, ক্যাফে, ম্যাটচা-লাতে, আর ভেগান পিৎজা—সব ফ্রি আসে। ঝুঁকি ফ্রি জীবন চাইলে গঙ্গাজল খেয়ে সন্ন্যাস নাও!”
সপ্তাহখানেকের মধ্যেই পিঙ্কির মেকআপের জিনিসপত্র বাড়ির গোয়ালঘরেও জায়গা পেয়ে গেল। ঠাকুমা চশমা পরে তাকিয়ে বললেন,
“আমার বিয়ের সময় তো শুধু সিঁদুর আর সাবান ছিল, এখনকার মেয়েদের একেকজন একেকটা রঙধনু!”
তারপর একদিন যা হবার তাই হলো। পিঙ্কি ঘোষণা করল,
“আমি ইনফ্লুয়েন্সার হব। ঘরসংসার নয়, আমার ডেস্টিনি হল স্টারডম!”
জগাই থতমত খেয়ে জিজ্ঞাসা করল,
“মানে?”
পিঙ্কি বলল,
“মানে আমি ইউটিউব খুলবো, টিউটোরিয়াল দেবো, রিল বানাবো। ঘরের কাজের জন্য আমি কাজের লোক নেব।”
মা তখন জগাইকে কান ধরে বারান্দায় নিয়ে বললেন,
“এই দেখ! হাসির জন্য বিয়ে করেছিলি, এখন কাঁদবি কনটেন্ট দেখে! সংসার তো ভিডিও না, রিল না, সংসার হল দায়িত্ব!”
অবশেষে এল সেই ঐতিহাসিক দিন—পিঙ্কির প্রথম ইউটিউব ভিডিও আপলোড হল, নাম “How to be a Glam Wife in a Non-Glam House!”
পুরো গ্রাম হেসে গড়াগড়ি খেতে লাগল। সুভাষদা বললেন,
“এই জন্যই বলেছিলাম, সুন্দরী বউ চাইলে সঙ্গে ব্যাটারি লাগাও—তবেই সংসার চালবে!”
শেষমেষ জগাই সিদ্ধান্ত নিল—না, আর নয়। সে বসে রীতিমতো তালিকা করল—বউয়ের রূপ ১০০, রান্না ০, ব্যবহার ২০, দায়িত্ব ১০, ইনস্টাগ্রাম রিল ৯৯৯।
মা বললেন,
“ছেলেটা রূপ দেখে বিয়ে করেছিল, এখন মেকআপের তলায় চোখে জল জমে গেছে।”
জগাই বসল পিঙ্কির সামনে, বলল,
“পিঙ্কি, তুমি সুন্দর, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই বাড়িতে একটা ড্রেসিং টেবল না, একটা সংসার আছে। তুমি যদি সেটাকে সাজাতে না চাও, তাহলে আমরা দুজনেই ভুল করছি। তুমি তোমার রাস্তায় যাও, আমি আমার!”
পিঙ্কি অবাক, প্রথমবার জগাইকে এত স্পষ্ট কথা বলতে শুনল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“তোমার মা কি আজও পান্তা ভাত খেতে ভালোবাসেন?”
জগাই বলল,
“হ্যাঁ।”
পিঙ্কি হেসে বলল,
“তাহলে আজ রাতটা আমি রান্নাঘরে থাকি। ইনস্টাগ্রাম কাল আপলোড হবে।”
উপসংহার:
রূপে প্রেম হয়, সংসার নয়। মেকআপ মুখে লাগে, মন আর মগজে নয়। আর সংসার? সেটা রিলের বিষয় নয়, রিলেশনশিপের বিষয়!
তো পাঠক, যদি আপনার বাড়ির পেছনের উঠোনে গোলাপগাছ থাকে, রূপ দেখে বিয়ে করতে গেলে দেখে নিন—সেই গোলাপগাছে কেউ হ্যাশট্যাগ লাগিয়ে সেলফি তুলবে না তো?
হাসুন, ভাবুন, আর সাবধানে বিয়ে করুন! 
—oooXXooo—
![]()







