গতকাল রাত থেকেই একভাবে বৃষ্টিটা পড়ে যাচ্ছে,বৃষ্টির তেজ যেভাবে বেড়ে চলেছে তাতে মনে হচ্ছে এবারও বন্যায় ভাসবে দ্বারকেশ্বর নদীর পার্শ্ববর্তী গ্রাম কিনঝাকুরা, আসে পাশের মানুষের কাছে কেঞ্জাকুরা নাম পরিচিত গ্রামটি। বাঁকুড়ার ছাতনা থেকেও আট কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই গ্রামটি।
গত রাতে তবু টিপটিপ করে বৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু আজ ভোর থেকেই বরুণ দেবতা যেনো এক অজানা কারণে রুষ্ট হয়েছেন।মুষলধারে বৃষ্টি, সাথে হওয়ার বেগটাও আস্তে আস্তে বাড়ছে। সব গাছ ছাড়িয়ে আকাশে উকি মেরে থাকা দূরের তাল গাছ টাও আজ মাথা নত করে বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে,এই বুঝি চিরতরে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, গাছের ডালে শালিক পাখিটা তার ছোট্ট বাসা টা উড়ে যাওয়ার দুঃখে বিহ্বল হয়ে অনবরত ডেকে যাচ্ছে আর নিজের ডানা দুটো দিয়ে তার ছানা গুলোকে আঁকড়ে ধরে ঝড়ের ঝামটা থেকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। শত ছিদ্র হাফ প্যান্ট পরা ছেলেটি খালি গায়ে বৃষ্টিতে চুপচুপে হয়ে সামনের আমগাছটার তলায় দৌড়ে বেড়াচ্ছে, মহানন্দে আম কুড়াতে ব্যস্ত সে। কর কর করে কান ফাটানো আওয়াজে ধারেই কোথাও একটা বাজ পড়ল, যেনো মনে হলো আকাশ চিরে বেরিয়ে আসা এক দানব পৃথিবীটাকে খান খান করে দেবে আজ।
অবিরাম বৃষ্টি হয়ে চলেছে, আজ যেনো আকাশ টাই ভেঙে পড়বে। আজ ভোরে অভির ঘুম ভেঙেছে বৃষ্টির জলের ঝাপটায়। তারপর থেকে তার আর বসার সময় নেই। নদীর বাঁধ পার্শ্ববর্তী এলাকায় ছোট্ট এক মাটির ঘর তাদের,শুধু মাটির বললে ভুল হবে,ঘরের মেঝেটা মাটির ,সুন্দর করে মাটি ও গোবর দিয়ে যেনো পালিশ করা।দেওয়াল গুলো কিছুটা মাটি দিয়ে গাঁথা,তার উপর গোবর লেপা। উপর দিকটায় বাঁশের বেড়া দেওয়া, তিন দেওয়ালে বাঁশের ফ্রেম দেওয়ায় ছোটো ছোট তিনটে জানালা আর সামনের দিকে দরজা। আর উপরে বাঁশ আর খর দিয়ে তৈরি ছাউনী। ঘর টার আয়তন খুব বেশি হলে লম্বায় বারো চোদ্দ ফুট আর দৈর্ধে দশ ফুট হবে। দরজা দিয়ে বেরোলেই সামনে একচিলতে মাটির বারান্দা। আর সামনে ছোট্ট একটা উঠোন, তার ঠিক মাঝখানে তুলসী গাছের বেদি। অভির ঠাকুর দা মারা যাওয়ার আগে এইটুকুই সম্বল দিয়ে গেছেন অভির বাবাকে।
সকাল থেকে বৃষ্টির তেজ যত বাড়ছে , অভির ব্যস্ততায়ও তত বাড়ছে। বহুদিন কার পুরানো খড়ের ছাউনী অনেক তাই নষ্ট হয়ে গেছে, চারিদিক থেকে চুইয়ে চুইয়ে জল পড়ে ঘরের মেঝে একেবারে কর্দমাক্ত হয়ে গেছে। অভি আর তার মা যথাসাধ্য চেষ্টা করে চলেছে। কোথাও বাটি রেখে তো কোথাও বালতি রেখে যাতে মেঝেতে না জল পড়ে, যাতে বিছানা বা জামাকাপড় ভিজে না যায়। অভির মা মৃণালিনী গজ গজ করে উঠছেন মাঝে মাঝে ” কবে থেকে বলছি যে নতুন করে খর টা ছাইয়ে নাও, কিন্তু আমার কথা শুনলে তো। আমারই পোঁড়া কপাল।” অভি জানে মা এরকম কেনো বলছে। অভির বাবার একটা হাত টানা ভ্যান আছে, ওটাই তার জীবিকা। সারাদিন ভাড়া খেটে যা উপার্জন হয় তার পুরোটুকুই প্রায় চলে যায় এই তিনটে মানুষের পেটের জ্বালা মেটাতে।
ঘর টা যে সারাতে হবে, তা অভির বাবা গৌরাঙ্গ বাবু খুব ভালো করেই জানেন। কিন্তু সামর্থে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। এমনিতেই বয়স হচ্ছে তাই আগের মতো আর বেশি মাল টানতে পারেন না, তার উপর আজকাল সব টোটো এসে যাওয়ায় মানুষজনও আগের মতো ভ্যানে যেতে চাননা। তাই সারাদিন খেতে যৎসামান্য যা আয় হয় তাতে বেঁচে থাকার জন্য দৈনন্দিন চাহিদা গুলো কোনো মতে মেটার পর ,আর হাতে কিছুই প্রায় থাকেনা । তবুও কিছু টাকা মৃণালিনী জমিয়ে রেখেছিলো। আর কিছুটা ধারদেনা করে এই বর্ষার আগে নতুন করে ছাদের খড় ছাইয়ে নেয়ার পরিকল্পনাও হয়েছিল কিন্তু বিধি বাম।মাস দুয়েক আগে হঠাৎ করেই মৃণালিনী অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। প্রথম প্রথম মৃণানিলী কাউকে কিছু না বললেও, যখন সাতদিন পরেও জ্বর টা নামলো না অভি একপ্রকার জোর করেই তার মাকে নিয়ে গিয়েছিল ছাতনায় বড় হাসপাতালে। নামে সুপারস্পেশালিটি হলেও আদৌ যে সেখানে খুব একটা চিকিৎসা হবেনা সেটা আশেপাশের গ্রামের মানুষ খুব ভালই জানেন, তাও আপদে বিপদে ভরসা ওটাই। নয়তো যেতে হবে বাঁকুড়া মেডিক্যাল কলেজে। যাইহোক মৃণালিনী কে দেখে ডাক্তার বাবু কিছু ওষুধ দিলেন ,হাসপাতাল থেকে দুদিনের ওষুধ দেওয়া হলো। কিন্তু জ্বর কমার নাম নেই। দুদিন পর হাসপাতালের বহির্বিভাগে দুঘন্টা লাইন দেওয়ার পর যে ডাক্তার বাবু দেখলেন, অবশ্য দেখলেন বলা ভুল হবে, কারণ মৃণালিনী কে ছুঁয়ে দেখার সময় বা সদিচ্ছা কোনোটাই তার নেই। তাই দুদিনে ওষুধ খেয়ে জ্বর কমেনি এইটুকু শুনেই খস খস করে লিখতে শুরু করলেন। “এই ওষুধ গুলো আজ থেকেই শুরু করো । আর এই পরীক্ষা গুলো করিয়ে নিয়ে আসো। নাহলে কিন্তু রুগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে।” বলেই তিনি পরের রুগী দেখতে শুরু করলেন। বাইরে এসে অভি মাকে বসিয়ে রেখে ওষুধের কাউন্টারে লাইন দিলো, দেড় ঘণ্টা পর যখন তার পালা এলো, ছোট্ট জানলার ফাঁক থেকে একজন মহিলা কর্কশ গলায় বললেন , “এই সব ওষুধ গুলো বাইরে থেকে কিনে নে। এখানে পাওয়া যাবে না।” একই অভিজ্ঞতা হলো রক্ত পরীক্ষার লাইনে দাঁড়িয়ে। অগত্যা সবকিছুই বাইরে থেকে করানো ছাড়া আর কোনো উপায় সে দেখলো না। কিন্তু সেতো মেলা খরচ।
মৃণালিনীর ওষুধ পত্র আর পরীক্ষা নিরীক্ষার খরচ যোগাতেই যা পুঁজি ছিল ,সব শেষ হয়ে গেল। মৃণালিনী এই কারণেই কোনো রকম পরীক্ষা করতে চাননি। কিন্তু বাবা ছেলের জোরাজুরিতে তার আর জোর খাটেনি। তবে ওষুধ শুরু করার দুদিন পর থেকেই মৃণালিনী সুস্থ্য হয়ে উঠলেন, তার গলার জোর ও বাড়তে থাকলো। “আমি বলেছিলাম , আমার রোগ এমনিই কমে যাবে, তার পরেও তোমরা এতগুলা টাকা খরচ করলে। “ অভিও পরে ভেবেছিল হয়তো অকারণে এত পরীক্ষা না করলেও চলতো। সেই ডাক্তার বাবুও তো রুগী ভালো আছে শুনে রিপোর্ট গুলো উল্টেও দেখলেন না।
ঘরের মেঝে ভিজে গিয়ে কাদা কাদা হয়ে আছে। আজ হয়তো আর হাড়ি চড়বে না,মাটির উনুন টা ভিজে চপচপে হয়ে আছে। দুপুরে মুড়ি বাতাসা ছাড়া আর উপায় নেই। বৃষ্টি কমার কোনো লক্ষণ নেই। আজও গৌরাঙ্গ ভ্যান নিয়ে বেরিয়েছে। সকালে বাজারে কিছু সবজি পৌঁছে দিয়ে অল্প কিছু পয়সা এসেছে। এতো বৃষ্টিতে রাস্তা ঘাট জনমানব শূন্য, আজ আর ভাড়া পাওয়ার উপায় নেই বুঝে গৌরাঙ্গ বাড়ির পথ ধরলেন। বৃষ্টিতে একেবারে স্নান করে গেছেন। কিন্তু পেটের জ্বালা যে বড় জ্বালা,তাই না বেরিয়ে উপায় নেই। মিত্তির বাড়ির ছোটো বাবু দোতলার বারান্দায় বসে গরম পেয়ালায় চুমুক দিয়ে বসে বসে বৃষ্টি উপভোগ করছেন। এমন সময় বৃষ্টিভেজা গৌরাঙ্গ কে ভ্যান নিয়ে রাস্তা দিয়ে যেতে দেখে হাক পারলেন। ” আরে ও গৌরাঙ্গ, আমাকে দেখে পালিয়ে যাচ্ছিস যে বড়।” গৌরাঙ্গ এমনিতেই ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছে। তাই তাড়াতাড়ি ভ্যান চালিয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছিল, দোতলার বারান্দায় ছোটবাবু কে সে খেয়াল করেনি। ভ্যান থামিয়ে খুব লজ্জিত হয়ে বলল , ” আজ্ঞে না কত্তা ,আপনাকে অমান্য করি সে সাদ্ধি আমার আছে নাকি।” “গত দু মাস আগে যে পায়ে ধরে দুশ টাকা ধার নিলি, সে খেয়াল আছে কি। শোধ দিবি নাকি অন্য ব্যবস্থা করব।” গৌরাঙ্গ লজ্জায় মাথা নোয়ালো। দুশো টাকা সে নিয়েছিল বটে , অভির উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফি টা দিতে হতো যে, নয়তো ছেলেটা তার পরীক্ষায় বসতেই পারত না। অভি কে নিয়ে তার বড় আশা, পড়াশুনায় খুব ভালো সে। একদিন তার ছেলে ঠিক বাবা মায়ের মুখ উজ্জ্বল করবে। ক্লাস ফোর পাস গৌরাঙ্গ সারাজীবন ভ্যান ঠেলে মুখ বুজে সংসার চালিয়ে যাচ্ছে আর মনে মনে স্বপ্ন দেখে ছেলে একদিন অনেক বড় অফিসার হবে। মাধ্যমিক পরীক্ষার পর হেড মাস্টার মশাই নিজে তাকে ডেকে বলেছেন, “গৌরাঙ্গ তোমার ছেলে একদিন অনেক বড় হবে , যত কষ্টই হোক না কেনো ছেলের পড়াশুনা টা বন্ধ করো না।”
অভি এবার উচ্চমাধ্যমিক দিয়েছে। ইচ্ছা ছিল সায়েন্স নিয়ে পড়বে, কিন্তু বাবার সামর্থ ছিল না পড়ানোর। বইপত্র কেনা বা মাসে মাসে টুইশনের যা খরচ তা যোগান দেওয়ার মত ক্ষমতা গৌরাঙ্গর নেই, সেটা অভিও খুব ভালো করেই জানে। তাই মাধ্যমিক পাস করার পর অভি নিজেই আর্টস নিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সে বইগুলোও একেওকে ধরে জোগাড় হয়েছে, বাকিটা কিন দিয়েছেন হেড স্যার নিজে।
ছোটবেলা থেকেই সব ছেলে মেয়ের মা বাবা স্বপ্ন দেখে ,ছেলে আমার অনেক বড় ডাক্তার হবে, নয়তো ইঞ্জিনিয়ার হবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন দেখার মতো সৎ সাহস অন্তত গৌরাঙ্গ বা মৃণালিনীর মত দিন আনা দিন খাওয়া হতদরিদ্র বাবা বা মায়ের কোনোদিনও ছিল না । ছেলে বড় হয়ে কিছু রোজগার করবে, দুবেলা পেট ভরে খেতে পারবে , মাথার উপর একটা ছাদ থাকবে, রাতে একটু নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাতে পারবে ,এটাই তাদের কাছে স্বপ্ন। কিন্তু অভি ছেলেটা একটু অন্য ধাতুতে গড়া।
অভি—এই নামটা শুধু একটা চরিত্রের পরিচয় নয়, বরং একটি নীরব বিপ্লবের প্রতীক। একজন সাধারণ ছেলেও কিভাবে অসাধারণ হয়ে ওঠে, অভি তার জীবন্ত উদাহরণ। সে গরিব, কিন্তু তার মন ধনী—মনুষ্যত্বে, সহানুভূতিতে, আর বিশ্বাসে।অভিকে দেখলে প্রথমে কেউ বুঝতেই পারবে না, ছেলেটা কত বড় স্বপ্ন বুকে বয়ে বেড়াচ্ছে। ময়লা জামা, চোখে ক্লান্তির রেখা—তবু সেই চোখের ভিতরটায় একটা আলাদা দীপ্তি, যেন বলছে: “আমি শুধু নিজের জন্য বাঁচি না… চারপাশের জন্যও লড়ি।” অভির জীবন সহজ ছিল না। চালের মাপে তার জীবনের গল্প বাঁধা ছিল, দিনের শেষ পাতে কতটুকু তরকারি পড়বে, কতটা ভাত জুটবে—সে হিসেবেই চলত সংসার। কিন্তু অভি শুধু নিজের খিদে নিয়ে বাঁচতে শেখেনি। সে শিখেছে—”পাশের জন খালি পেটে থাকলে, নিজে পেটভরে খাওয়া মানে অন্যায়।” একদিন এক বৃদ্ধা রাস্তার পাশে অসুস্থ হয়ে পড়ে ছিলেন, সবাই পাশ কাটিয়ে যাচ্ছিল। অভি দৌড়ে গিয়ে নিজের হাতে তাঁকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছিল,। কেউ গলা জড়িয়ে বললে—“তুই তো নিজেরই খাবার জোটাতে পারিস না, এত দায়িত্ব কেন নিস রে?” অভি তখন হেসে বলেছিল— “মানুষ হয়ে জন্মেছি, মানুষ হয়ে বাঁচতে চাই। শুধু চাকরি পেলে কাজ করব—এমনটা নয়। আমি যেখানেই থাকি, মানুষের পাশে দাঁড়ানোই আমার ধর্ম।” তার এই ভাবনা, এই সহমর্মিতা সবার চোখে তাকে ভিন্ন করে তুলেছিল। শিক্ষকরা বলতেন- “অভি শুধু ভালো ছাত্র না, ভালো মানুষ।জীবনে বড় কিছু করবেই। কিন্তু ওর বড়ত্ব হবে অন্যকে ছোট না করেই।” বন্যার সময় সে নৌকা ঠেলে খাবার পৌঁছে দিয়েছে; কারও মা অসুস্থ হলে ডাক্তার দেখানোর জন্য ভোরবেলা ছুটে গেছে।
ছোটো বেলা থেকে দারিদ্র্যের সাথে লড়তে লড়তে মনে মনে একটা আলাদা জগত তৈরি করে ফেলেছে সে। আধপেটা খেয়েও কোনোদিন নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দেয়নি। ও দেখেছে যে ওর বয়সের ছেলে গুলো দুটো পয়সার জন্য কিভাবে বিপথে চলে গেছে। অভি কিন্তু মাটি আঁকড়ে পড়ে আছে, না খেয়ে মরবে তবু পড়াশুনা ছাড়বে না। সত্যি কথা বলতে অভির জীবনেও কোনো লক্ষ্য ছিলনা। সে শুধু বুঝত পড়াশুনা করে একদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু লক্ষ্য টা হঠাৎ করেই স্থির হয়ে গেলো মাধ্যমিক পরীক্ষার পর। সেবার মাধ্যমিকে শুধু তার স্কুল নয় ওই এলাকার সমস্ত স্কুলের মধ্যে সব থেকে বেশি নম্বর পেয়েছে অভি। সরকারি এক অনুষ্ঠানে অভিকে পুরস্কৃত করা হবে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন স্বয়ং ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব। এলাহী আয়োজন। হেডমাস্টার মহাশয় বার বার বলে দিয়েছেন ,অভি যেনো বাবা মাকে নিয়ে ঠিক সময়ে চলে আসে। এতো বড় বড় মানুষ জন আসবেন, অভি কে নাকি পুরস্কার দেওয়া হবে সেখানে। গৌরাঙ্গ যাকেই দেখছে তাকেই বলে বেড়াচ্ছে সে কথা। অনুষ্ঠানের আগের দিন সন্ধেবেলা বাড়ি ফেরার পথে সে বাজার থেকে অভির জন্য একটা নতুন জামা নিয়ে এল। “দেখতো অভি এটা তোর হয় কিনা।” বাবার হাতে নতুন প্যাকেট টা দেখে অভি বলল, ” এটা কি এনেছো বাবা।” ” কাল আমার ছেলে পুরস্কার নেবে , কি পরে যাবে শুনি?” অভির, ঘরে পড়ার দু একটা জামা আছে বটে কিন্তু নতুন একটাও নেই। কিন্তু বাবার আর্থিক অবস্থা অভি উপলব্ধি করতে পারে , তাই মুখ ফুটে কোনোদিন সে বাবার কাছে কিছুই চায়নি। জামাটা কিনতে গিয়ে হয়তো বাবা কে কিছু টাকা ধার করতে হয়েছে। মৃণালিনী বলল,” বেশ করেছ , জামাটা এনেছো। দেখ বাবা তোকে খুব মানাবে।” “আচ্ছা মা ,আমি তো স্কুলের জামাটাই পড়ে যেতে পারতাম। এর জন্য কি খরচ করার খুব দরকার ছিল। নিজের শাড়ীটার দিকে একবার তাকিয়ে দেখেছো। আর বাবা তোমরা কি পড়বে শুনি।” “দেখো ছেলের কথা শোনো। তুই যখন বড় চাকরি করবি, তখন কি আমার শাড়ীর অভাব হবে বাবা। ” গলাটা যেনো একটু কেঁপে উঠলো মৃণালিনীর, চোখের কোনাটা জ্বালা করে উঠল। নিজের অজান্তেই আঁচল দিয়ে চোখ মুছলেন।
ওরা তিনজন মিলে একটু সকাল সকাল বেরিয়ে পড়েছিল , গৌরাঙ্গর ভ্যানে করে। চক বাজারের মোড়ে যে বড় খেলার মাঠটা আছে, সেখানেই বড় শা টাঙানো হয়েছে। চারিদিকে মানুষের ভিড় ,সবাই আজ ব্যস্ত। গৌরাঙ্গ ভ্যান টা একটা কোনায় রাখতে গেলো। “এই হারামজাদা ,এখানে ভ্যান রাখবি না। যা মাঠের পেছন দিকে কোথাও রেখে আয়।” একটা ছোকরা সিভিক পুলিশ চেঁচিয়ে উঠে ভ্যানের গায়ে একটা লাঠির বারি মারলো। বহুদিনের পুরানো ভ্যান টা ঝন ঝন করে কেঁপে উঠলো। পঞ্চাশোর্ধ গৌরাঙ্গ তার ছেলের বয়সী একজনের কাছে অহেতুক এরকম ব্যবহার টা আশা করতে পারেনি। অবশ্য তার মতো গরীব মানুষেরা প্রত্যেকদিনই তথাকথিত শিক্ষিত ,পয়সাওয়ালা বা ক্ষমতাবানদের কাছে এভাবেই পান থেকে চুন খসলেই এভাবেই অপমানিত হয়। তাই কথা না বাড়িয়ে সে ভ্যান টা নিয়ে পেছনের দিকে রেখে এলো। হেডমাস্টার মহাশয় বড় গেট টার কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলেন, অভির জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। “এই যে অভি এসে গেছিস। আমার সাথে আয়। আর তোমরা দুজন ,ওইদিকের চেয়ার গুলোতে গিয়ে বসো। “ সার সার চেয়ার পাতা আছে, সামনের দিকের আসন গুলো ঘেরা আছে। ওদের জায়গা একেবারে পেছনের সারিতে। অভি মাস্টার মশায়ের সাথে এগিয়ে চলল। ওর হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে, সব কেমন যেনো ভয়ে অসার হয়ে যাচ্ছে। এতো মানুষ একসাথে অভি কোনোদিনও দেখেনি।
“স্যার চারিদিকে এত পুলিশ কেনো।” সাহস করে মুখ খুলল অভি। ” পুলিশ থাকবে না রে, আজ যে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব আসবেন, এই জেলার দণ্ডমুন্ডের কর্তা উনি।” ” ওনার কি খুব ক্ষমতা স্যার।” আগ্রহের সাথে জিজ্ঞাসা করলো অভি। “জেলা কি ভাবে চলবে না চলবে। মানুষের সব সুযোগ সুবিধা, ভালোমন্দ সব সব কিছুর দায়দায়িত্ব ওনার।” “তাহলে স্যার আমাদের ঘর সারিয়ে দেওয়ার দায়িত্বও কি ওনার।” “হ্যাঁ রে পাগল ছেলে হ্যাঁ।” হেড স্যার হেসে উঠলেন। “তাহলে স্যার গতবছর যখন খুব বৃষ্টি হলো তখন তো একটা ত্রিপল পাওয়ার জন্য পাড়ার নান্টু দা বলে দিয়েছিল তার যাকে ইচ্ছা হবে তাকেই সে ত্রিপল দেবে। বাবা তো হাতজোড় করে অনুরোধ করেছিল, খড়ের চালে ত্রিপল দেবে বলে। তাও নান্টু দা দেয়নি স্যার।” ” জানি রে জানি, আমাদের গরীব মানুষের জন্য সরকার কত কিছু দেয়। সেগুলো যাতে অসহায়, প্রান্তিক মানুষগুলো ঠিকমতো পায় সেটা দেখার দায়িত্বই তো ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের। কিন্তু সে কি আর হতে দিচ্ছে রে,এই দুর্নীতি গ্রস্থ নেতা আর অফিসার গুলো।” অভি বুঝতে পারলো স্যার তার জমা ক্ষোভ টা উগরে দিলেন। “তবে কি জানিস তো, এই ঘুন ধরা সমাজ কে শোধরাতে গেলে চাই কিছু সৎ,কর্তব্য পরায়ন অফিসার। শুনেছি আমাদের এই ডিএম সাহেব নাকি খুব কড়া ধাঁচের। শক্ত হাতে ধরেছেন, কোনো দুর্নীতি বরদাস্ত করেন না।”
কথা বলতে বলতে ওরা মঞ্চের ঠিক সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এলাহী আয়োজন। মঞ্চের উপরে অনেকগুলো চেয়ার সাজানো হয়েছে। একজন সঞ্চালক আজকের অনুষ্ঠান সূচি বলে চলেছেন। অভি এখান থেকে পিছন ফিরে একবার মা বাবা কে দেখার চেষ্টা করলো, কিন্তু শুধুই কালো মাথার জঙ্গল ছাড়া আর কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। হেড স্যার অভি কে একটা চেয়ারে বসিয়ে, নিজে পাশে বসলেন। আজ অভির মত আরো কিছু কৃতি ছাত্রদের স্বয়ং ডিএম সাহেব নিজের হাতে সম্বর্ধনা দেবেন। “আচ্ছা স্যার ডিএম হতে গেলে কি অনেক পড়াশুনা করতে হয়।” অভি খুব উৎসুক হয়ে জিজ্ঞাসা করলো। স্যার একমনে মঞ্চের উপরের নেতা ও অফিসারদের কার্যকলাপ লক্ষ্য করছিলেন। হঠাৎ অভির প্রশ্ন না শুনে একটু অন্যমনস্ক হয়ে বললেন, ” হ্যাঁ রে বাবা সর্বভারতীয় সিভিল সার্ভিসের পরীক্ষা দিতে হয়।”
হঠাৎ করেই সবার ব্যস্ততা বেড়ে গেলো। বাইরে গেটের কাছে সমস্ত আধিকারিকরা ছুটে গেলেন। নীল বাতি লাগানো গাড়িটা গেটের ঠিক সামনে এসে দাড়ালো। একজন পুলিশ গাড়ির সামনের দরজা দিয়ে নেমে ,পেছনের গেট টা খুলে দিলো। নেমে এলেন ধবধবে সাদা জামা পরা মধ্যবয়সী একজন সুদর্শন ভদ্রলোক। সবাই তাকে স্যালুট ঠুকল। অভি যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকে খুব ভালো দেখা যাচ্ছে না বটে তবে সে এইটুকু বুঝতে পারছে যে ,ওই লোক টাকে খুশি করার জন্য সমস্ত নেতা ও আধিকারিক দের মধ্যে যেনো এক সুস্থ্য প্রতিযোগিতা চলছে। তাকে দেখবার জন্য অভিও কিছুটা এগিয়ে গেলো। সবাই কে উপেক্ষা করে উনি সোজা চলে গেলেন গেটের বাইরে ভিড় করে থাকা গরীব ,অসহায় মানুষ গুলোর দিকে —চাহনিতে নির্ভরতা, গলায় দৃঢ়তা। এক বয়সের ভারে নুয়ে যাওয়া বুড়ি মায়ের হাত ধরে বললেন, “মা ভালো আছেন?” গরিবদের প্রতি তাঁর সম্মান, তার আন্তরিকতা—সব মিলিয়ে এক মূর্ত আদর্শ যেন অভির সামনে এসে দাঁড়াল। লোকটা কোনও রাজনীতি করলেন না, দম্ভ করলেন না। বৃদ্ধা যখন এগিয়ে এসে কাঁদতে কাঁদতে বলল—“বাবু, তিন মাস চাল পাইনি…” তখন তিনি শান্ত গলায় বলেছিলেন— “এই সরকারের চাল আপনার হক। এটা কেউ ‘দয়া’ করে দিচ্ছে না। আপনি পাবেন। আমি নিশ্চিত করবো।” পাশে দাঁড়ানো আধিকারিক কে উনি কিছু একটা বললেন। সাথে সাথে স্থানীয় রেশন ডিলার কে ডেকে সাসপেন্ড করা হলো। অভি স্তব্ধ হয়ে শুনছিল। কোনো নেতার মতো ভাষণ নয়, এটা ছিল কর্মের প্রতিশ্রুতি, ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার দৃপ্ত পদক্ষেপ। তাঁর চোখে প্রথমবার কোনো সরকারি অফিসারের মধ্যে দেখল সে। মানুষটার প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে গেল শতগুণ—না, শুধু পোশাক নয়, মানুষটার ভেতরের আলোটা দেখতে পেল অভি। এবার ভিড় ঠেলে আস্তে আস্তে এদিকেই এগিয়ে আসছেন সেই ভদ্রলোক। পিছনে বাকি সবাই। মঞ্চের কাছাকাছি আসতেই অভি ওনাকে স্পষ্ট দেখতে পেলো। তার স্মার্টনেস, তার ব্যক্তিত্ব, তার চলন ধরনের মধ্যে দিয়ে সে সবার সমীহ আদায় করে নিচ্ছে। অভি মুগ্ধ হয়ে দেখছে তাকে। মানুষটাকে দেখার পর থেকেই কেনো জানিনা অভির সরল নিষ্পাপ মন, এই মানুষ টাকেই নিজের রোল মডেল হিসাবে ভাবতে শুরু করলো। মঞ্চের পাস থেকে সিড়ি দিয়ে উঠে তিনি আসন গ্রহণ করলেন। তাকে ফুলের স্তবক দিয়ে সম্বর্ধনা দেওয়া হলো। তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা করলেন তিনি। বেশ কিছুক্ষণ অনুষ্ঠান চলে পর ডিএম সাহেব যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। স্থানীয় বিডিও সাহেব সঞ্চালক কে ইশারায় কি যেন বললেন। সঞ্চালক মাইক নিয়ে বলতে থাকলেন, ” আমাদের ডিএম সাহেব এক জরুরি কাজে বেরিয়ে যাবেন তাই কৃতি ছাত্র ও ছাত্রীদের সম্বর্ধনা এখুনি শুরু হবে।” একে একে সবার নাম ডাকা হচ্ছে। সবাই মঞ্চে যাচ্ছে , ডিএম সাহেব তাদের পুরস্কৃত করছেন আর সবাই নেমে আসছেন। সবার শেষে এলো অভির পালা। সঞ্চালক বললেন, ” এবার মঞ্চে ডেকে নেবো এবছর মাধ্যমিকে এই এলাকার মধ্যে সর্বাধিক নাম্বার প্রাপক বটকৃষ্ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র অভিরুপ দে কে।” হাততালিতে চারিদিক মুখরিত, হেডমাস্টার মহাশয়ের মুখে চওড়া হাসি, অভির কোনোদিকে খেয়াল নেই, হাত পা সব ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। মঞ্চে উঠে সামনের দিকে তাকালো সে, যেনো মানুষের ঢল নেমেছে।কই মা বাবা কে তো দেখা যাচ্ছে না। তবে সে তাদের খুঁজে না পেলেও দুজোড়া ঝাপসা হয়ে আসে চোখ প্রাণ ভরে তাদের ছেলেকে দেখছেন আর শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে অনবরত হাত তালি দিয়ে চলেছেন। ডিএম সাহেব অভিকে পুরস্কৃত করলেন। অভি ঝপ করে ওনাকে প্রণাম করলো। ডিএম সাহেব ওর মাথায় হাত দিলেন। স্নেহ মাখা চোখে জিজ্ঞাসা করলেন, ” বড় হয়ে কি হতে চাও তুমি।” অভি কিছু না ভেবেই এক নিমেষে উত্তর দিলো , “ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট।”
সেই দিন সন্ধ্যায় সে বাড়ি ফিরে, নিজের পড়ার খাতা খুলে একেবারে প্রথম পাতায় লিখেছিল – “আমি একদিন ডিএম হবো।আমি সেই সিদ্ধান্ত নেবো, যা মানুষকে তাদের ন্যায্যতা এনে দেবে। আমি বদল আনবো—ভিতর থেকে, নীতির ভিতর দিয়ে।”
সেইদিন থেকে, অন্যদের কাছে সে ‘বিচিত্র ছেলেটা’ হয়ে উঠল—যে খেলাধুলা ফেলে পড়াশুনায় মনোনিবেশ করলো। সে নিজে দেখেছে কিভাবে একজন সৎ মানুষ, একটা প্রশাসনিক পদে থেকেও সততা ধরে রাখতে পারেন, এবং কীভাবে একটি সিস্টেম বদলাতে পারেন শুধুমাত্র একটা সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সাহসিকতার মাধ্যমে। তারপর থেকে অভির লক্ষ্যে কোনো দোলাচল ছিল না। তাকে কেউ বললে—“তোর দ্বারা হবে না, তোর ঘরে তো খাবারই জোটে না”— সে শুধু হেসে মনে মনে বলত,- “একদিন তোমারাই আমার দপ্তরের বাইরে লাইন দেবে… তবে তখন আমি রেশন দিতে আসবো, অপমান না।” অভি বুঝেছিল, ডিএম মানে শুধু চেয়ার না, ক্ষমতা না— ডিএম মানে জনতার প্রতি একটা প্রতিজ্ঞা রক্ষা করার জায়গা।আর সেই প্রতিজ্ঞার ভার নিতে সে তৈরি হবে আগুনে পুড়ে—কিন্তু পিছিয়ে যাবে না।
স্কুলের হেড মাস্টার মশাই অভির পাশে বট গাছ হয়ে দাঁড়ালেন। তিনি নিজে ইতিহাসের শিক্ষক তবু চেয়েছিলেন অভি সায়েন্স নিয়ে পড়ুক ,একদিন বড় ডাক্তার হয়ে ফিরে আসুক। কিন্তু তার দরিদ্র অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে, অভি আর্টস নিয়েছে। কিন্তু অভি তার লক্ষ্য স্থির করেছে, এবার আর ফিরে তাকালে চলবে না, এগিয়ে যেতে হবে। তিনি নিজের হাতে অভিকে তৈরি করবেন বলে মনস্থির করলেন। লক্ষ্যে পৌঁছানো কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়। অভির মত একজন মেধাবী ছাত্রের পক্ষে সেটাও সম্ভব। সামনে শুধু একটাই চ্যালেঞ্জ, দারিদ্রকে জয় করে এগিয়ে যেতে হবে।
অভি ছোটবেলা থেকেই শুনেছে—“সরকার রেশন দেয়”, “সরকার ঘর বানিয়ে দেয়”, “সরকার ভাতা দেয়”… কিন্তু বাস্তবে কী দেখে সে? সে দেখেছে দিনের পর দিন ,রাতের পর রাত তারা ওই খড়ের ঘরে অতি কষ্টে জীবন অতিবাহিত করছে, মাথার ছাদ টাই না কোনোদিন ভেঙে পড়ে।বছরের পর বছর শুধুই আশ্বাস পেয়েছে, সরকার ঘর বানিয়ে দেবে, আর চোখের সামনে দেখে গরীব মানুষের পাওনা টাকায় ওই নেতাদের পকেট ভরেছে। তার চোখের সামনে গ্রামের বুড়ো রমজান কাকার চালের থলে ফাঁকা পড়ে থাকে দিনের পর দিন। মেঘনাদ মাস্টারের বিধবা বোন বিগত পাঁচ বছর ধরে বিধবা ভাতা পাওয়ার অপেক্ষায়, শুধু ‘সই’ দিতে দিতে একদিন অসুস্থ হয়ে পড়েন। আর ঐ পঞ্চায়েত অফিসের লোকগুলো? তারা ফাইল ঘোরায়, কাগজে কালি মাখায়, আর তার বদলে ঘুষে পকেট ফোলায়। অভি বারবার দেখেছে, কীভাবে অর্ধভূক্ত পেটে থাকা মানুষগুলোর কাছে ঘুষ চাওয়া হয়।ক্ষুধার্ত মানুষদের বলা হয়—‘ফর্ম পূরণ ঠিক নাই, আবার আসেন’। আর এইভাবে ‘অধিকার’ একদিন হয়ে যায় ‘ভিক্ষা’। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে সে দেখেছিল, প্রতিবেশী সুভাষ কাকা তিনদিন ঘুরে ত্রাণ পাননি। রেশন দোকানে বলা হয়েছে, — “আপনার নাম লিস্টে নাই!” কিন্তু অভি জানে—তাঁর নাম ছিল।শুধু তিনি কারও পা ধরেননি, তাই লিস্ট থেকে উধাও! গ্রামের এক বাচ্চা, রাহুল, স্কুলে খেতে গিয়ে কাঁদছিল— খাবার ছিল পঁচা, কিন্তু শিক্ষক বলেছিলেন— “এটাই বরাদ্দ। খেতে হলে খাও, না হলে বাড়ি যাও।” অভির বুকের ভেতর তাতে আগুন জ্বলে উঠেছিল।সেই আগুনই ধীরে ধীরে তাকে মানুষ করেছিল—শুধু একরাশ ক্ষোভ নয়, একটি বদল আনার সংকল্প। সে প্রতিদিনই ভাবত—“যারা মানুষকে না খাইয়ে রেখে টাকার পাহাড় গড়ে, তারা আসলে শুধু দুর্নীতিবাজ না, তারা খুনী—ক্ষুধার খুনী।” তার এই দেখা অন্যায়, এই নিরব কান্নাগুলোই ধীরে ধীরে তার মনকে কঠিন করে তুলছিল। একদিন সে চুপিচুপি নিজের ডায়েরিতে লিখেছিল—”নেতাদের ভাষণ নয়,আমি ন্যায়ের কণ্ঠ হতে চাই। আমি এমন জায়গায় থাকতে চাই,যেখান থেকে মানুষের অধিকার ছিনিয়ে নয়, তুলে দিতে পারি।”
নেতাদের অতি মাত্রায় দুর্নীতি আধপেটা খাওয়া মানুষের না পাওয়ার যন্ত্রণা গুলো যেনো আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। অভি দিনের পর দিন দেখেছে তাদের মতো না খেতে পাওয়া মানুষ কিভাবে বঞ্চিত হয়েছে।অভির স্বপ্নের পেছনে লুকিয়ে থাকা গভীর যন্ত্রণা ও ক্ষোভ আস্তে আস্তে স্ফুলিঙ্গের আকার নিয়ে তার মানসিক দৃঢ়তা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছিল। স্যারের সংস্পর্শে এসে আস্তে আস্তে অভি বুঝতে পারছিল সরকার খারাপ নয়, গ্রামগঞ্জের প্রান্তিক মানুষদের জন্য খাদ্য ,বস্ত্র , বাসস্থানের সংস্থানের জন্য সরকারের অনেক প্রকল্প আছে। কিন্তু সেগুলোকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য যে মানুষ গুলো চেয়ারে বসে আছেন ,খারাপ তারা। তাই সিস্টেমের মধ্যে থেকেই খারাপ মানুষ গুলোকে সিস্টেমের বাইরে বের করে দিতে হবে।
রাত তখন গভীর। গোটা গ্রাম নিস্তব্ধ। শুধুমাত্র কেরোসিনের ক্ষীণ আলোয় জ্বলছিল অভির ঘরে। ছোটো চৌকি তে মা বাবা ঘুমাচ্ছেন, আর মেঝের এককোনে অভির পড়ার ঠিকানা। সে জানে বাবা ঘুমিয়ে পড়লেও মা ঠিক জেগে আছেন, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, ঠোঁটে একরাশ জেদ—এই রাত, এই ক্ষুধা, এই ক্লান্তি কিছুই তাকে আটকাতে পারছিল না। অভি জানত, সামনে রাস্তা মসৃণ নয়।জানত—সামনে দিনে দিনে বই কেনার টাকা জোটানোই বড় যুদ্ধ হবে।তবু তির্যক হাসি ফুটে উঠত তার মুখে যখন নিজেকে বলত, “আমার দারিদ্র্য আমার সীমা না… এটাই হবে আমার শক্তি।” সেই থেকে দিন শুরু হতো ভোর পাঁচটায়। মায়ের কাজে সাহায্য করত, তারপর হাতে তুলে নিত রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস, সংবিধান আর সংবাদপত্র। পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকান থেকে পুরোনো খবরের কাগজ সংগ্রহ করে যেসব জেলা প্রশাসককে নিয়ে প্রতিবেদন ছাপা হতো, সেগুলো সে কেটে রাখত। পুরোনো কৌটায় জমতে থাকল মুড়ি আর শুকনো বিস্কুট—সেই ছিল তার মধ্যরাতের সঙ্গী। হেড স্যার তাকে কিছু বই জোগাড় করে দিয়েছিলেন। অন্যরা যখন ঘুমাতো, সে তখন “ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস” সম্পর্কে পড়ে বোঝার চেষ্টা করত—এইটাই তার যুদ্ধক্ষেত্র। কেউ তাকে বলত,“আরে, গ্রাম থেকে কেউ আইএএস হয় নাকি?” কেউ হাসত, কেউ তাচ্ছিল্য করত।কিন্তু অভি জানত, তারা তার স্বপ্ন নয়, তারা বাস্তবের মুখোশধারী ভয়। যারা তার দরিদ্র কে উপহাস করছে মাত্র। আর সে ঠিক করেছিল—ভয়কে না, স্বপ্নকে জয় করবে। এভাবে প্রতিদিন, প্রতিরাতে, সে নিজেকে গড়ে তুলতে লাগল। মাটির ঘরের মাঝে দাঁড়িয়ে, অভি প্রতিদিন আকাশে চোখ রাখত।তার দৃষ্টি ছুঁতে চাইত সেই চেয়ার, যেখানে বসে সে বলবে— “আজ থেকে আর কোনও মায়ের ছেলেকে ঘুষ দিয়ে জন্মসনদ তুলতে হবে না।” “আজ থেকে শিক্ষাই হবে শ্রেষ্ঠ পরিচয়।” তাকে কেউ চেনে না, সে জানে।তবু প্রতিদিন সে তৈরি হতে লাগল—অদৃশ্য এক পরীক্ষার জন্য।তার যুদ্ধ ছিল নিরবে, কিন্তু একেবারে ভিতর থেকে—দারিদ্র্য, অবজ্ঞা, ক্লান্তি, অপমান সবকিছুর বিরুদ্ধে। গ্রামের এক না খেতে পাওয়া ভ্যান চালকের ছেলের জীবন দর্শন টাই বদলে যেতে থাকলো।
আজ অভির উচ্চমাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরোবে।গত কয়েকদিন ধরে অনবরত বৃষ্টিতে অভিদের ঘর একেবারে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কোনক্রমে মাথা গুঁজে পড়ে আছে তারা। আজ সকাল থেকে বরুণ দেবতা যেনো একটু শান্ত হয়েছেন। তারা তিনজন মিলে ঘর সারাতে ব্যস্ত, মাটির দেওয়াল গুলো প্রায় ধসে পড়ার মতো অবস্থা। অভি নতুন করে মাটি দিচ্ছে আর মৃণালিনী সেগুলো লেপে ঠিক করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। সকাল প্রায় দশটা।অভির বন্ধু কালু ছুটতে ছুটতে এলো। “অভি তাড়াতাড়ি চল।” ” কোথায় যাব রে?” ” হেড স্যার স্কুল যাওয়ার পথে আমাকে বলে গেলেন, আজ রেজাল্ট বেরোবে। আমি যেনো সবাই কে খবর টা দিয়ে দেই।” “তুই যা আমি যাচ্ছি।” বলে অভি বাকি মাটি টা দেওয়ালে দিয়ে, মাকে বলল, ” মা আমি স্নান টা করে নি।” মা বললেন, ” যা বাবা আর দেরি করিস না। ” অভি স্নান টা করেই স্কুল জমা টা পড়েই ছুটলো স্কুলের পথে। মনে অজানা আশঙ্কা আর চোখে স্বপ্ন নিয়ে ছুটে চলেছে তথাকথিত না খেতে পাওয়া, সর্বহারাদের এক তরুণ প্রতিনিধি। পিছনে দাঁড়িয়ে অদৃষ্টের প্রতি একটা প্রণাম ঠুকে ছেলের মঙ্গল কামনায় ব্যস্ত , ছেড়া সারী পরে দাঁড়িয়ে তার মা। অভি স্কুলে যখন পৌঁছালো, রেজাল্ট বেরিয়ে গেছে। কারো চোখে কান্না তো কেউ আনন্দে আত্মহারা। অভি কি করবে বুঝে উঠতে পারছে না। সামনের ছাত্রদের ঝটলা থেকে মৃনাল ছিটকে বেরিয়ে এলো। ” এই অভি এখানে কি করছিস। তোকে যে হেড স্যার ডাকছে। কতবার তোর নাম ধরে ডেকেছে জানিস। “ অভি আর এক মুহুর্ত দেরি না করে ছুটলো স্যারের ঘরের দিকে। “আসবো স্যার।” ভয় মিশ্রিত গলায় বলল অভি। “এসো..” ছোট্ট উত্তর দিলেন স্যার। অভি ঢুকে দেখল হেড স্যার কে ঘিরে আরও কয়েকজন স্যার বসে আছেন।সামনে রাখা রেজাল্টের কাগজ। অভি কে দেখেই দর্শনের রতন স্যার চেয়ার ছেড়ে প্রায় লাফিয়ে এসে অভি কে জড়িয়ে ধরলেন। ” তুই তো তাক লাগিয়ে দিয়েছিস অভি।” হেড স্যার মুচকি হাসছেন। ফলাফল—উচ্চমাধ্যমিকে ৯৪ শতাংশের ওপরে নম্বর। উচ্চমাধ্যমিকে প্রথম কেউ তাদের স্কল থেকে ৯০ শতাংশের উপর নাম্বার পেয়েছে, তাও আর্টস নিয়ে। একে একে সব স্যাররা উঠে এলেন। অভিকে জড়িয়ে ধরলেন ,অভি সবাই কে প্রণাম করলো।গোটা স্কুল অভিকে নিয়ে গর্বিত। শিক্ষকরা এসে কাঁধে চাপড়ে বলেছে— “তুই আমাদের গর্ব অভি! কলকাতায় পড়বি, আইএএস হবি, আমরা তোদের গাঁয়ের নাম শুনব রেডিওতে!” অভি আর দেরি করলো না।চারিদিকে সবার প্রশংসা সুলভ কথা গুলো তখন আর তার কানে ঢুকছে না,ছুটে চলল বাড়ীর দিকে। মা বাবাকে খবর টা না দেওয়া পর্যন্ত তার শান্তি নেই। মৃণালিনী রান্নার জোগাড় করছিলেন, গৌরাঙ্গ ভ্যান নিয়ে বেরোনোর তোড়জোড় করছিল। হঠাৎ করে অভি এসে মাকে জড়িয়ে ধরলো। ” মা আমি পাস করেছি। বাবা আমি স্কুলে সব থেকে বেশি নম্বর পেয়েছি।” মৃণালিনী কাঁদছেন। গৌরাঙ্গ আনন্দে আত্মহারা। কি করবেন বুঝে উঠতে না পেরে অভিকে প্রায় কোলে তুলে নিলেন।
মাটির বারান্দার কোণে বাঁশের খুঁটির গায়ে হেলান দিয়ে বসে আছে অভি। সন্ধ্যা নেমে এসেছে, দূরে মন্দিরে সন্ধ্যারতি শুরু হয়েছে, শঙ্খ ধ্বনি তে চারিদিক মুখরিত, আজ তো আনন্দের দিন, তার স্বপ্নের উড়ানের পালে যে হাওয়া লেগেছে। তবু অভির চোখে জল। খুশির নয়—দুঃখের, দ্বিধার, অস্থিরতার জল। পশ্চিমে অস্তগত সূর্যের দিকে তাকিয়ে অভি শঙ্কিত হলো। তার স্বপ্ন গুলোও এভাবে অস্ত যাবে না তো এবার।সে জানে, এত নম্বর থাকলেও কলকাতায় ভর্তি হতে গেলে টাকা লাগবে—ভর্তি ফি, হোস্টেলের খরচ, জামাকাপড়, যাতায়াত… মা সকালে আজকাল জমিতে ক্ষেতমজুর খাটতে যায়। বাবার শরীরটাও আর ভালো যাচ্ছে না,আগের মতো আর ভ্যান টানতে পারে না।মাথার ছাউনি থেকে যখন জল পড়ে,ভাঙা হাঁড়ি রেখে সামাল দিতে হয়। সেই ঘর থেকেই আইএএস হওয়ার স্বপ্নটা কী আদৌ বাস্তব? বাবা রাতে ভাঙা পাখার নিচে বসে বলেছিল, “আমার তোকে দেবার মতো কিছু নাই রে বাপ।শুধু এই বুকটা আছে, তুই চাইলেই আমি রক্ত বেচে দেব। শুধু তুই পড়। অভি আবেগ লুকিয়ে বলেছিল, “তুমি একি বলছ বাবা।” গৌরাঙ্গ বলেছিলেন – “তোকে দুনিয়ার কাছে হাত পাততে হবে না রে বাপ ,আমি আগে হাত পাতব।” অভি কিছু বলতে পারেনি, চুপচাপ বারান্দায় গিয়ে মুখ লুকিয়েছিল। মায়ের চোখে জল, বার বার শুধু আঁচল দিয়ে চোখ মুছছে সে। সে চুপচাপ রান্নার হাঁড়ি চেক করছিল—আজ একটু বেশি চাল ফেলেছে।কারণ—আজ তার ছেলে খুব খুশি, আজ একটু পেট ভরে খাক। পরদিন সকালে অভি গেল স্কুলের হেডস্যার-এর কাছে। কাঁপা কণ্ঠে বলল, “স্যার, আমি কলকাতায় কলেজে পড়তে যাবো না।” স্যার অবাক হয়ে অভিকে দেখছেন। তিনি যেনো বিশ্বাস করতেই পারছেন না। ” তুই কি বলছিস তা কি জানিস।এত ভালো রেজাল্ট করেছিস। ভালো কলেজে ভর্তি হবি। স্বপ্ন সফল তোকে করতেই হবে। আমার বন্ধু ওখানে আছে , আমি গতকালই তাকে জানিয়েছি যাতে একটা ভালো কলেজে তোর এডমিশান এর ব্যবস্থা টা করে। “ ” কিন্তু স্যার কলকাতায় একটা ভালো কলেজে পড়তে যাবো,সে যে অনেক টাকা লাগবে স্যার, সেটা তো দিতে পারব না।” স্যার তাকে ভালোবাসতেন, পাশে দাঁড়ালেন।বুঝলেন অভির কষ্ট টা কোথায়। তিনি বললেন— “তুই মন খারাপ করিস না। তোকে আমি নিয়ে যাব ব্লকে। আবেদন করব সরকারি স্কলারশিপের জন্য। আর তোর রেজাল্ট দেখলে অনেকেই তোকে সাহায্য করবে।” আর সেই সন্ধ্যায়, গ্রাম্য ক্লাবের কয়েকজন তরুণ ছেলেও এগিয়ে এল। একজন বলল, “তুই যদি আইএএস হোস, তুই শুধু তোর নয়—আমাদের স্বপ্নও পূরণ করবি।তুই শহরে যা, পড়। আমরা মিলেই তোর খরচের কিছুটা তুলে দেব।” অভির চোখ ছলছল করছিল। সে তখন মাথা নিচু করে বলেছিল—“আমি যদি কিছু হই, এই গ্রামের নামে হব। আপনাদের মুখ উঁচু করাব, কথা দিলাম। কিন্তু কারোর কাছে টাকা আমি নিতে পারবো না। আমাকে ক্ষমা করো তোমরা।”
রেজাল্টের দিন দশেক পর অভি পোস্ট অফিসে গিয়ে কলকাতা থেকে আসা একটি চিঠিটা হাতে পেয়েছিল। হাতে ধরার সময় কাঁপছিল তার আঙুল। খামে বড় বড় করে লেখা ছিল— “কলকাতা রামানন্দ কলেজ, দর্শন বিভাগে ভর্তি হওয়ার জন্য নির্বাচিত।” সব ব্যবস্থা হেড স্যারের বন্ধুই করে দিয়েছিলেন। সে চুপচাপ বসে ছিল পুকুরঘাটে, ডালিম গাছটার নিচে। একবার মনে হচ্ছিল—সত্যি কি এই চিঠি ওর? গ্রামের স্কুল, খালি পেটে টিউশন না পরে ,সন্ধ্যায় কুপি জ্বেলে বই দেখা ছেলেটা শহরের কলেজে ভর্তি হবে? ও কি স্বপ্ন দেখছে ? চিঠির নিচে ছোট করে লেখা ছিল— ভর্তি ফি: ৩,৮৫০ টাকা | ভর্তি হওয়ার শেষ তারিখ: ২০শে জুন।আজ ১০ ই জুন। হাতে মাত্র দশ দিন আছে। এবার যেনো সে বাস্তবের মাটিতে আছড়ে পড়ল, কোথায় পাবে সে এত টাকা। আর লেখা ছিলনা আরও যে সব খরচের কথা— থাকার জন্য হোস্টেল বা ঘর ভাড়া, খাওয়া দাওয়া , বইপত্র, গাড়িভাড়া…… এত টাকা! তার ঘরে তখন চাল মাত্র আধা কেজি। বাবার সম্বল শুধু ওই ভ্যান টা। বাবা একবার বলেছিল, “ভাবছি এই ভ্যান টা বেচে দেব।” তাহলে ওরা খাবে কি? সকালে অন্যের মাঠে কাজ করে মা মাত্র ৫০ টাকা পায় দিনে। রাতভর অভি শুয়ে ছিল খোলা বারান্দায়। চোখে ঘুম না আসা সেই রাতে, আকাশের দিকে তাকিয়ে কেবল একটা কথাই কানে বাজছিল— “মেধা থাকলেই হবে না অভি, মেধার পেছনে দাঁড়াবার কেউ না থাকলে স্বপ্ন শুধু কাগজে থাকে।” চাঁদ টাকে যেনো বড্ড ম্লান লাগছে আজ। তারা গুলোও রাত বারার সাথে সাথে একটা একটা করে কোথায় যেনো উধাও হয়ে যাচ্ছিল। পরদিন সকালে সে স্কুলের হেডস্যার-এর কাছে গিয়েছিল চিঠি নিয়ে। স্যার চুপ করে সব পড়ে অভিকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। “তুই রত্ন রে… এই রত্নকে নষ্ট হতে দেব না। চল, ব্লক অফিসে আমার পরিচিত আছে, ওখানে স্কলারশিপের জন্য তোর আবেদন করাব।” হেডস্যার তার কাগজ তৈরি করে নিয়ে গিয়েছিলেন ব্লকে। অভির পড়াশোনার ফলাফল দেখে সরকার মাইনরিটি স্কলারশিপ এবং পশ্চিমবঙ্গের কন্যাশ্রী-র সমতুল্য মেধাবৃত্তি অনুমোদন হয়, বছরে প্রায় ছয় হাজার টাকা। বিডিও সাহেব ওর রেজাল্ট দেখে বলেছিলেন, ” বাহহ সুন্দর রেজাল্ট করেছ তো।” তারপর হেড স্যারের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ” দেখুন মাস্টার মশায় ,এরকম ভালো রেজাল্ট আজকাল অনেকেই করছে। কিন্তু সরকার তো আর সবাই কে স্কলারশিপ দিয়ে বেড়াবে না তাইনা।” অভির চোয়াল শক্ত হলো , সে ভাবছিল – এই কি সেই বিডিও যে ঠিক দুবছর আগে অভি যখন ডিএম সাহেবের কাছে সেরার সম্মান টা নিয়েছিল, তখন এই বিডিও সাহেবই এমন গদ গদ মুখে, ছাতি ফুলিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন , ভাবটা এমন যেন তার ব্লকের ছেলে সম্মান পাওয়ার সব কৃতিত্ব টাই যেনো তার। আর আজ কিনা বলছেন, এরকম রেজাল্ট অনেকেই করে। বিডিও আবার বললেন,” তাও আপনাদের দরখাস্ত টা আমি সংশ্লিষ্ট অফিসারের কাছে পাঠাচ্ছি। আপনারা ওনার সাথে কথা বলুন।” ওনার পিএ ওদের কে বের করে নিয়ে এলেন। দরখাস্ত টা হাতে দিয়ে বললেন “ওই পাশের ঘরে অবনী বাবুর সাথে দেখা করুন।” অবনী বাবু ফোনে কারোর সাথে কথা বলছিলেন, ইশারায় বাইরে দাঁড়াতে বললেন। প্রায় আধ ঘন্টা চললো তার ফোনালাপ। তারপর আসতে বললেন। সমস্ত কাগজ অন্যমনস্ক হয়ে ওল্টাতে থাকলেন, পাশের টেবিলের একজনের সাথে কথা বলতে বলতে। হাতে দরখাস্ত নিয়ে উনি কথা বলে যাচ্ছেন আর সামনে অসহায়ের মত দাড়িয়ে আছে অভি আর তার স্কুলের হেড স্যার । কিছুক্ষণ পর যেনো বাবুর সম্বিৎ ফিরল, “হ্যাঁ কি যেন বলছিলেন? “ ও আচ্ছা স্কলারশিপ। “ একটু থেমে বললেন, “দিয়ে যান আমাকে, দেখছি। মাস ছয়েক পর এসে খোঁজ নেবেন।” হেড স্যার বললেন,” কিন্তু আমাদের যে একটু তাড়াতাড়িই লাগবে।” ” দেখুন মশায় ওরকম তারা সবার থাকে। ফাইল রেডি করতে হবে, পঞ্চায়েত কে দিয়ে ভেরিফিকেশন করতে হবে , আদৌ আপনারা ওখানে থাকেন কিনা , পুলিশ গিয়ে দেখবে। তারপর বিডিও স্যার যদি অ্যাপ্রুভাল দেন তো ফাইল যাবে। এসব করতে ছ মাস তো লাগবেই। তবে হবেই সে কথা দিতে পারছি না। অনেকে লাইনে আছে।” অভির মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়ল। হেড স্যার বললেন , কোনো কি উপায় নেই।” ভদ্রলোক একটু ছদ্ম মায়া দেখালেন, ” আপনি যখন এত করে বলছেন তখন চেষ্টা করে দেখতে পারি। তবে ওই আরকি … সব কিছু লোক দিয়ে তাড়াতাড়ি করাতে হবে ,বুঝতেই তো পারছেন ।” একটু থেমে বললেন, “কিছু খরচা পাতি আছে বৈকি।” বাইরে যে চাপরাসি টা দাঁড়িয়ে ছিল তাকে ডেকে বলল , “এই বাবুরা কি বলছে দেখ।” চলে আসুন,চলে আসুন, ভিতরে ভিড় করবেন।” সে একপ্রকার ধমক দিয়েই ওদের বাইরে নিয়ে এলো। ” স্কলারশিপ তো। হাজার তিনেক টাকা দিয়ে যান। কথা দিচ্ছি তিন মাসে রেডি করিয়ে দেবো।” মাস্টার মশায় বললেন, “কিন্তু এখন তো এতো টাকা..” ওনাকে শেষ করতে না দিয়েই, চাপরাসী বললেন, ” দেখুন স্যার হেভি খাটনি আছে, এর নিচে হবেনা। যদি রাজি থাকেন তো কাল পরশুর মধ্যে দিয়ে যান। “ ” তবে দেরি করবেন না কিন্তু , আরও একজন সাড়ে তিন দেবে বলেছে।” হেড স্যার লজ্জায় মাথা নোয়ালেন। অভির হাত টা শক্ত করে ধরে বিডিও অফিস থেকে বেরিয়ে এলেন। অভি বুঝে গেছিল ,ওর স্বপ্নের সলিল সমাধি হয়তো আজই হয়ে গেলো। কিন্তু বিধাতা হয়তো একটু অন্যরকম লিখে রেখেছিলেন তার জন্য।
এই সময়ে সারা গ্রাম যেন জেগে উঠল অভির জন্য। গ্রামের যুবকরা ক্লাব মিটিংয়ে সবাই মিলে ঠিক করল— “অভি আমাদের গর্ব। যদি আমরা একটা নাটক করে কিছু টাকা তুলতে পারি, তার ভর্তির ফি অন্তত উঠে যাবে।” যা ভাবা তেমন কাজ। পাঁচ দিনের মধ্যে সব আয়োজন সারা। সবাই হাত লাগিয়েছে। তারা অভিনয় করল “স্বপ্নের অভি”, গ্রামের মাঠে। লোক জমল প্রচুর। আসে পাশের পাঁচ গ্রামের লোক এলো পালা দেখতে। উঠল ৩,০০০ টাকা। এক মুদি দোকানদার নিজের খরচ বাঁচিয়ে একটা ব্যাগ কিনে দিল। অভির বন্ধু রজত, এবার কোনমতে পাস করেছে, তার মা ৫০০ টাকা তুলে দিলেন আর বললেন— “ ভেবেছিলাম আমার ছেলেটা যদি একটু ভালো রেজাল্ট করতে পারে টা ওর পড়ার জন্য লাগবে। কিন্তু সে আর হলো কই, তুইও তো আমার ছেলেই, গ্রামের গর্ব , পড়া থামাবি না বাবা।” মা নিজের একমাত্র সম্বল সোনার নাকফুলটা খুলে রেখেছিল একটা চালান খাতায়। সে বলল, “এই নাকফুলটা তোর ঠাকুমা আমার বিয়েতে দিয়েছিল। এবার আমি দিচ্ছি তোর ভবিষ্যতের জন্য।” সব মিলিয়ে প্রায় ৫,০০০ টাকার মতো জোগাড় হলো। বাকি অংশটা হেডস্যার নিজে দেবেন বলেছেন, আর বললেন, “এখন থেকে তুই শুধু পড়বি। আমার বন্ধুর মেসে তুই থাকবি। আস্তে আস্তে সে তোর জন্য কয়েকটা টিউশন ব্যবস্থা করে দেবে বলেছে,যাতে তুই নিজের খরচ নিজেই চালাতে পারিস।ততদিন আমি তোর মাসিক খাওয়া পড়ার খরচ আপাতত আমি দেবো।” ভর্তি নিশ্চিত হল। ফর্ম পূরণ হল। হেড স্যার অভিকে একটা চিরকুট দিলেন একটি নতুন ঠিকানা লেখা কাগজে— “ মেসবাড়ি: ১৪৩বি, কলেজ স্ট্রিট, কলকাতা – ৭০০০০৬”
অভি সেই ঠিকানাটার দিকে তাকিয়ে ভাবছিল— “এটা এখন থেকে আমার ভবিষ্যতের ঠিকানা… আমি আসছি, শহর… তুমি তৈরি তো?”
অভির জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে—কলকাতায় যাত্রা। এই যাত্রা শুধু শহরে যাওয়া নয়, এটি হলো তার স্বপ্নের পথে প্রথম পদক্ষেপ, যেখানে সে অজানা ভবিষ্যতের মুখোমুখি হবে, একা লড়বে, গড়ে তুলবে নিজেকে। অভি সেই সকালটা আজও ভুলতে পারবে না।ভোরের আলো ঠিকমতো উঠেনি, মায়ের আঁচল ভিজে ছিল রাতের কান্নায়। বাবা চুপচাপ বসে ছিলেন—সেই মানুষটার চোখেও একধরনের ভয়, আবার গর্বের মিশেল। খড়ের চালা থেকে ধীরে ধীরে রোদের ফোঁটা পড়ছিল মাটিতে। সেই আলোয় অভি তার ছোট্ট ব্যাগ গোছাচ্ছিল— একজোড়া জামা, কিছু খাতা, বই, একজোড়া স্যান্ডেল আর মা-র আঁচলে বেঁধে দেওয়া একটা ছোট ঠাকুরের ছবি। এই তার সম্বল। মা ধীরে এসে বলল, “খুব কষ্ট হবে রে… ওখানে ভালো করে খেতে পারবি না..ভালো করে ঘুমাতে পারবি না। কিন্তু হেরে যাস না বাবা। তোর মা-র মুখটা মনে করিস, আর বলবি—‘আমি পারব।’” বাবা একটা চিরকুট ধরিয়ে দিল—একজনের নাম ও ঠিকানা। “কলকাতায় গিয়ে আগে এনার কাছে যাস। তোর মাস্টারমশাইয়ের বন্ধু। উনিই তোর সব ব্যবস্থা করে রেখেছেন।খুব ভালো মানুষ।” গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ছুটে এসে বলল , ” অভি দা, আইএএস হয়ে কিন্তু আমাদের স্কুলে এসো!” অভিও জানে ওটা তার নিজের স্কুল , অভির লড়াইয়ের সাক্ষী যে সে। একটা পুরনো ঝোলা কাঁধে ঝুলিয়ে, চোখে স্বপ্নের আলোর মতো একরাশ দৃঢ়তা নিয়ে অভি হাঁটল বাসস্ট্যান্ডের দিকে। তাকে দেখতে দেখতে মায়ের চোখ জলে ভেসে যাচ্ছিল। পেছন থেকে শুধু একটা কথা বললেন বাবা— “তুই গরিবের ছেলে, কিন্তু গরিব স্বপ্ন নিয়ে যাস না রে। বড় স্বপ্ন নিয়ে যা!” এতো সকালেও গ্রামের সবাই অভিকে বিদায় জানাতে এসেছে। অভি বাসে উঠে জানালার পাশে বসে পড়ল। রাস্তা পেছনে ছুটে যেতে লাগল, কিন্তু তার চোখ সামনে—শুধু সামনে। সে জানে, কলকাতা শহর বড়, কঠিন, নির্দয়। তবু সে মনে মনে বলল, “এই শহরই হবে আমার যুদ্ধক্ষেত্র, এখানেই আমি নিজেকে গড়ব। আমি হারব না… আমি হব, আমি হব ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট!”