বিশু
ইন্দ্রাণী ব্যানার্জী
টক পাড়ার বিশু পালিয়ে বিয়ে করেছে। সকাল বেলা ওদের পাড়ার নামটা করতে নেই কিনা। তবে দলিল দস্তাবেজে কাসুন্দি পাড়া নামে পরিচিত।
বিশুর মতো ছেলে পালিয়ে বিয়ে করেছে এটা মানতে পারছে না বিশুর সতমা সরমা। এমনিতেই পেটের ছেলেরা সরমাকে দেখে না। যে যার বউ নিয়ে আলাদা হেঁসেল। অথচ যাকে সরমা অবছেদ্দা করেছিল সেই বিশু মাকে দেখভাল করত।.কত পিছনে লাগত সরমা। কর্তার কানভারী করত খুব। কর্তা দেবু অবশ্য বলত “গিন্নি। মহা ভুল করছ। হীরে ফেলে কাচের কদর কোরো না।
রাগ হোতো সরমার। কর্তার ওই সতের গুষ্টি ওর শান্তি কেড়ে নিল। বিশুর জন্ম দিতে গিয়ে ওর মা গেল। বছর ঘুরলো না বউ মোলো। কোন পুরুষের মন থাকে সংসারে। বারো শতক জমির উপর তিন মহলা বাড়ি। পাশেই পুকুর। যেন মাছে জলে। গোয়ালে দুধেলা গাই। আগের বউ ঘটমপুরের ঘোষেদের মেয়ে।
দেবু মণ্ডল বিশুর মাকে বলত নতুন বউ। ভারী মিষ্টি ছিল স্বভাবটা। ঘরের বউ এমন না হলে চলে। দেবুর মন প্রাণ ছিল ওই বউ। যখন বউ পোয়াতি হল তখন দুজন কত পরিকল্পনা করত। দেবু বলেছিল “নতুন বউ আমাদের মেয়ে হবে দেখিস। আর তাকে তোর মতো মিষ্টি দেখতে হবে”।
মাকড়ি নেড়ে বউ অভিমান করত। বলত “আমি কাশীর বিশ্বনাথ কে মানত করিচি। আমার ছেলে হবে। আর আমি মলে আমার মুখে আগুন দেবে। বামুন গিন্নি বলছিল “পুত নামক নরক থেকে উদ্ধার করবে পুত্র। “
দেবু বউএর কথাতে হা হা করে হাসতো। সত্যিই। আচ্ছা সহজ সরল একটা মেয়ে ওর বউ হয়েছে।
যখন বউ খুব ভারী হল তখন ওকে বাপের বাড়িতে পাঠাতে দেবুর মন সায় দিল না। কে জানে কোন অযত্ন হবে। শাশুড়ি বললে “সরমাকে পাঠাচ্ছি। ও সংসার সামলাবে। “
সরমাকে বিয়ের রাতে দেখেছিল দেবু।বউ এর খুড়তুতো বোন। মেয়েটা টেন পর্যন্ত পড়েছে। তবে একটা পা অকেজো। যেদিন সরমা এল সেদিন বউ বললে “আমার দিদি এয়েচে। ওরজন্য মাংস আনো। ওর বাবা খুব গরীব। আর সরমা মাংস খেতে ভালোবাসে।
দেবুর মনে খুব চিন্তা দেখা দিল। বউ তার ভীষণ প্রিয়। প্রবাদ আছে প্রিয় মানুষ কখনও নিজের থাকে না। ফাঁকি দিয়ে পালায়। আটমাস হল বউ এখন ও বমি করছে। মাংস আনলে খাবে না। তাহলে এনে কী করবে সে!
সরমার আনন্দ আর ধরে না। তার বোনের সংসারে বেশ খেতে পাবে ভালোমন্দ।
শরীর খুব দুর্বল। এদিকে সরমার চব্য চোষ্য লেহ্য পেয় চলছে। দেবুর একটুও ভালো লাগছে না। এই মেয়েটা ওদের আপদ। এদিকে বউ মনখারাপ করবে ভেবে কিছুই বলতে পারে না দেবু।
সেদিন খুব ভয় পেয়েছিল দেবুর বউ। বললে “শুনছো। আমি আজ সরমার কাছেই শোবো”।
দেবু বললে “এসবের কী দরকার। সরমার পায়ের সমস্যা। ঘুমের ঘোরে কখন লেগে যাবে । এইসময় সাবধান থাকা দরকার “।
বউ মুখভার করলে। ইদানিং তার জেদ বেড়েছে। দেবু গররাজি ।
সরমার ঘুম আর কুম্ভকর্ণের ঘুমের মধ্যে প্রচুর মিল। সবাই বলে ওর ডান পায়ে হাড় নেই। কিছুক্ষণ দুই বোন গল্প করে ঘুমিয়ে গেল। ঘরের মধ্যে একটা হালকা আলো। দেবুর নির্দেশ “দরজা খোলা রেখে শুতে। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল বউ এর। দেখলে বিছানার মধ্যেই কে দাঁড়িয়ে। এত সরু কোনও মানুষ সে দেখেনি। কী ওটা। মাঝে মাঝে নড়ছে।
দেবুর বউ ভয়ে চিৎকার করে উঠল। চোখ উল্টে গেছে ভয়ে। পাশের ঘরে দেবুর কানে গেল আর্তনাদ। পরিস্কার নতুন বউ এর গলা। একটা আশঙ্কা নিয়েই ছিল সে। দরজার কাছে গিয়ে ডাক দিল “নতুন বউ। কী হল”?
না কোনও শব্দ নেই। আরও ভয় চেপে বসল দেবুর মনে। ডাক দিল “সরমা। কী হয়েছে “!
কোনও সাড়া নেই। ঘরে সোমত্ত শালি। এই অবস্থার মধ্যে ঘরে ঢুকে পড়া কি ঠিক হবে? বারবার ডাকেও কোনও সাড়া নেই। একটা গোঙানির আওয়াজ কানে আসতেই আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারলে না দেবু।
ঘরে ঢুকল দেবু। বিছানার মধ্যে সরু লাঠির মতো ওটা আবার কি!
এগিয়ে এল। খাটের নীচে লুটিয়ে আছে নতুন বউ । ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি। আলো জ্বেলে যা দেখলে তাতে চক্ষু চড়কগাছ। সরমার অকেজো হাড়বিহীন পা টা স্প্রিং এর মতো সোজা হয়ে আছে। আর নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। দুনিয়া রসাতলে গেলে ও এ ঘুম ভাঙবে না।আর দেরী নয়। নতুন বউকে কোলে তুলে নিজের ঘরে আনলে দেবু।
উত্কণ্ঠা উদ্বেগ গর্ভাবস্থাতে কতটা মারাত্মক সেটা দেবুর জানা। জ্ঞান ফিরলে গরম দুধ এনে নতুন বউ কে খাওয়ালে দেবু। আচ্ছা আপদ এসে জুটেছে কপালে। হোমে লাগে না,যজ্ঞে লাগেনা। এই সরমাকে সে জীবন থেকেই দূর করবে। কোনও ওজর আপত্তি চলবে না আর।
তাই কী হয়! কথাতে আছে কপাল তোলা। এত প্রেম, এত সুখ বিধাতাপুরুষের সহ্য হল না। দিন কয়েক পরে ডাক্তার জানালে “দেবু বাবু। আপনার বউ ফোবিযা তে আক্রান্ত। শরীর ভীষণ দুর্বল। অবস্থা ভালো বুঝছি না”।
রাতে নতুন বউ বললে “মহাদেব এর দুয়ার ধরা ছেলে হবে আমার। নাম দিও বিশ্বনাথ “।
দেবুর ভেতরটা দুঃখের সাগরে ভাসে। বউকে বলে বেশ তো। তাই হবে”।
জীবন মানেই সংগ্রাম। যতদিন মানুষ বাঁচে তার সাথে মিশে থাকে কর্তব্য। কত টানাপোড়েন মানুষ কে ক্ষত বিক্ষত করতে করতে এগিয়ে নিয়ে যায়। দেবুর জীবনে তেমন দিন এসে পড়ল। টাকার তাগাদাতে বেরিয়েছিল দেবু। ঠিক তখনই খবর এল নতুন বউকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে পাড়ার ছেলেরা। দ্রুত চলে এল দেবু। গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠছে যেন। নতুন বউ এর চোখদুটো আজ ভীষণ স্নিগ্ধ। এত স্নিগ্ধতা হয়ত মাতৃস্নেহের বহিঃপ্রকাশ। দেবু বলেছিল “নতুন বউ। তোকে বড্ড ভালোবাসি। অপেক্ষা করছি। আমার সন্তান নিয়ে তাড়াতাড়ি ফিরে আয়।”
নতুন বউ কথা রাখেনি। সন্তান এলো কিন্তু সে এলো না। বিরহী যক্ষের মতো দেবুর অবস্থা। একমাথা সিঁদুর পরে রাজরাণী হয়ে দেবু মণ্ডল এর বউ চলে গেল মহাপ্রস্থানের পথে।
বিশ্বনাথ জন্মালে। সদ্যোজাত কে নিয়ে দেবু পড়ল মহাবিপদে। সবাই বললে “বে কর দেবু। এই দুধেবালক কে কে লালন করবে”?
নতুন বউ কে ভুলে আবার দারগ্রহণ। অসম্ভব যন্ত্রণার মধ্যেই কাটছিল দেবুর। তার মাথাটা কাজ করছে না। শ্বশুর মশাই বললে “তুমি সরমাকে বে করো বাবা। কথাতেই আছে মাসীর দরদ বেশি। আর সরমার একটা গতি হবে”।
শুরু হল একটা সেলাই করা সংসারের। বিশুর মা হয়েগেল সরমা। সরমা প্রথম প্রথম খুব খেয়াল রাখতো বিশুর। পরে নিজের দুটো ছেলের ব্যাপারে বেশি যত্নবান হয়ে গেল। বিশুর প্রতি দেবুর অতিরিক্ত পক্ষপাতিত্ব সরমাকে কিছুটা হিংস্র করে তুলল। যত বড়ো হতে লাগল তত গাঁয়ের সবাই বললে “বিশু হীরের টুকরো। ওর মায়ের মতোই সুন্দর ” ।
রাগে রী রী করত সরমা। তুমুল অশান্তি করতে লাগল দেবুর সাথে। এদিকে ছেলেরা সাবালক। দেবু একটার পর একটা জমি কিনছিল। সারাদিন উপার্জন কাজে ব্যস্ত রাখতো দেবু। সরমার বাক্যবাণ থেকে দূরে থাকার চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। বিশু তার হৃদয়ের টুকরো।
সেদিন সকাল থেকেই খুব বৃষ্টি পড়ছিল। দুপুরের সময় ঠান্ডার মধ্যে সবাই ঘুম দিচ্ছিল। বিশু খড় কাটবে বলে গোয়াল ঘরের দিকে যাচ্ছিল তালপাতার পেকে মাথায় দিয়ে।
হঠাৎই দেবু হাতছানি দিয়ে ডাকলে । বললে “তোর সাথে কিছু কথা আছে বাপ। যা বলব সব গোপন রাখবি। “
বাবার ডাকে ঘরে এলো বিশু। তার হাতে কাগজের বান্ডিল। সব বিশুর হাতে দিয়ে কী যেন বললে। বাড়ির কেউ সেকথা শুনতে পেলো না।বিশুর বাপের ঘর থেকে বের হওয়া চোখে পড়ল সরমার। চোখ দুটো সরু হয়ে উঠল। তাদের অজান্তে বাপ ছেলের কী গোপন কথা হল সেটা তাকে জানতেই হবে। মনে মনে বললে “আজ বুড়োর একদিন কি আমার একদিন। সাপের বিষ ঝাড়ব আজ।
দেবু মন্ডল এর তৃষিত মরুভূমির জীবনে বিশু একমাত্র মরুদ্যান।.পিতৃত্বের গৌরব। অবহেলার কত শক্তি। ফ্যানভাত আলুসিদ্ধ খেয়ে, কতদিন লক্ষ্মীর কোলে অলক্ষী না জোটা দুপুরে কান পর্যন্ত হাসি নিয়ে কেমন পুরুষ সিংহ হয়ে উঠেছিল বিশু। দেবু আশ্চর্য হোতো যখন দেখতো সরমার গর্ভের সন্তান তাকে আমল দিতো না আর বিশু সরমার কথাকে বেদবাক্য মনে করে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে যেত।.সরমার কূটবুদ্ধি ছিল নিজের ছেলেদের লেখাপড়া শেখাবে। আর সংসারের কাজ করিয়ে বিশুকে অন্ধকারে রেখে দেবে। বিধাতা পুরুষ অলক্ষ্যে হাসলেন।
দেবুর জমিতে ধান কাটা চলছে। প্রচুর ধান হয়েছে এবছর। আর হবে নাই বা কেন। কোন ভোরের ঘুম থেকে উঠে গরুর জাবনা কাটা । তারপর গোয়াল পরিস্কার করে গরুর পাল নিয়ে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠে চরানো। বর্ষার শুরুতেই কাঁধে কোদাল নিয়ে ভিতে কাটে। তিন বিঘা জমির ভিতে একদিনে কেটে ফেলে। বাড়িতে এসে যখন গায়ে জল ঢালে তখন সরমা ঘুম থেকে ওঠে। ছেলেদের তখন ও ঘুম। সরমা বলে “অ বাবা বিশু। চান করিচিস যখন ঘরের পুজোটা করে দে বাপ”।
মায়ের একটা পা অকেজো। কষ্ট পায় বিশু। পুজো সেরে চনমনে খিদে পায়।
বিশু চলে যায় সেই ভূবনকাকার দোকানে। ওদের বাড়ির সাথেই ছোট্ট দোকান। ভূবনকাকার মেয়ে ঊর্মি চা বানিয়ে দেয়। ওর বাবা ভূবন বিক্রি করে। সাথে পাঁউরুটি। একটা পাঁউরুটিতে সানে না বিশুর। পেটে তার আগুন জ্বলে। উর্মি থালা ভরে মুড়ি ঘুগনি দেয়। এমন তো রোজের ব্যাপার।
এবার যখন ধান রোয়াগাড়া চলছিল তখন বিশু বলেছিল “এত জমির ধান পাটাতে ঝাড়া খুব হ্যাপা। নতুন ধান ঝাড়ার মেশিন কিনব। কত সুবিধে। অন্যের ধান ঝেড়ে দিলে নগদ টাকা হাতে আসবে। উপার্জন বাড়বে।”
দেবু খুব খুশি হয়েছিল ছেলের কথায়। এ ছেলে বেশ বড়ো চাষী হয়ে উঠেছে। বললে “আগের বছরের সব ধান বেচে মেশিন কিনে নে। এবছর এর ধান গোলা ভরে থাক।”
গর্জে উঠলে সরমা।”বলি তোমার আক্কেল কী বলো দেখি। তোমার কী একটাই ছেলে নাকি? গোলার সব ধান বেচে একজন কে দিলেই হল?”
বিশু বলল “তা কেনে। আমার তোমার আবার কীসের? আমরা তো এক সংসারের মানুষ। মেশিন কেনা হলে তা সংসারের হবে।”
সরমা বলে “এখন থেকে সব তিনভাগ হবে। “
দেবু বিরক্ত হয়ে বলে “তাদের বলো সংসারে খাটতে। নিষ্কর্মা ঢেঁকি। ওদের আবার কীসের ভাগ। আমি কি মরে গেছি যে ভাগ হবে”?
সারাদিন কাজের পর বিশুর গন্তব্য ভূবনকাকার দোকান। ঊর্মি বিশুকে যত্ন করে খেতে দেয়। সরমার কোনও খেয়াল থাকে না বিশুর ব্যাপারে।
সেদিন ও বিশু সন্ধ্যার সময় ভূবনকাকার দোকানে বসেছিল। এইসময়ই গাঁয়ের সব চাষী এখানে চা খেতে আসে। কত আলোচনা হয়। শুধুই কি চাষের গল্প, কার বাড়িতে কী হচ্ছে,বর্তমান সরকারের হাল কিছুই বাদ যায় না
বিভিন্ন কথার মাঝে বাগদিদের বাসুদেব বললে “কী হে বিশু? শুনলাম তুমি নাকি ধান ঝাড়ার মেশিন কিনছ। আমাদের খুব উপকার হবে। তা ধানের দাম তো আকাশ ছোঁয়া। কার কাছে বেচবে শুনি? অবশ্যি তোমার মাকে দেখলাম সামন্তদের আড়তে। তখনই সন্দেহ হল। বললাম “ধান বেচবেন মা ঠাকরুণ “?
তিনি একটু থতমত খেলেন বটে তবে পরে বললেন তোমার মেশিন কেনার কথা”।
বিশু বললে “তোমার কী মাথা খারাপ হয়ে গেছে। মা যাবে আড়তে! সেটা কী করে হবে? আর আমরা তো ধান পালেদের বিক্রি করি। সামন্ত দের আড়তে বস্তাতে দুকেজি বেশি নেয়। আমাদের শুকনো আগের বছরের ধান। আর ধান বিক্রির ব্যাপার মা কিছুই জানে না।তুমি কাকে দেখতে কাকে দেখেছ।
বাসুদেব রেগে গেল। বললে “তুমি তো দিনকে রাত করে দিচ্ছ। তোমার মাকে কী নতুন করে চিনতে হবে? কী ব্যাপার বলোতো। কোনও অশান্তির আঁচ পাচ্ছি যেন!”বিশুর মনটা বিরক্তিতে ভরে ওঠে। সংসারের কোনও ব্যাপার জনসমক্ষে আলোচনা তার অপছন্দ।
বাসুদেব কোনও ক্যাচালের গন্ধ পেলে অল্পে ছাড়ে না। নাকে নস্যি দিয়ে অদ্ভুত আওয়াজ করে। বিশুর উন্নতি ওর জ্বলন ধরায়। ব্যঙ্গ করে বলে “বিশু আমাদের বিরাট চাষী। অনেক টাকার মালিক। বাপের নয়নের মণি”!
পারিবারিক আলোচনা বিশুর সহ্য হয় না। বললে “আমি আসছি”।
ভূবনকাকার কপাল কুঁচকে ওঠে। বিশুর মতো খদ্দের উঠে গেলে দোকানের ক্ষতি। এসব ব্যাপারে ভূবনকাকার খুব টনটনে জ্ঞান। খদ্দের হল লক্ষ্মী। আর ভূবন সুদে টাকা খাটায় । একশ টাকাতে দশটাকা সুদ। টাকার সংকুলান না হলে বিশুর থেকেই নিয়ে লোককে ধার দেয়। একপয়সার মা বাপ এই ভূবনকাকা। সোমত্ত মেয়েটার কত সম্বন্ধ এল।বিয়ে দেবার নামগন্ধ করে না।
উর্মি বুঝতে পারল বিশুর রাগ হয়েছে। এসে থেকে কিছুই খাওয়া হয় নি মানুষ টার। ও জানে আজ সারারাত খাওয়া জুটবে না। খুব কষ্ট হয় উর্মির। ছুটে দোকান এর বাইরে বড়ো আশুত গাছের আড়ালে দাঁড়ায়। বিশু চলে যাবার পথে ডাক শুনতে পায় “না খেলে শরীর খারাপ হবে না বুঝি”?
বিশু একবার মুচকি হাসলো। আর কথা বলল না। উর্মির চোখ দুটো জলে ভরে গেল। ছুটে ঘরের দিকে চলে গেল সে। বিশু বাড়ির মধ্যে ঢুকলো । আজ বাড়ির চিত্র টা আলাদা। বিশুর দিকে তাকিয়ে সরমা গদগদ স্বরে বললে “কোথায় ছিলি বাবা। চা করেছি। আমতেল মাখা মুড়ি দিয়ে খেয়ে নে। আজ বাজার থেকে ভেটকি মাছ এনিচি। আর এই দ্যাখ ফুলকপি। ঝোল রাঁদবো।”
আজকের এই সরমাকে বিশুর অচেনা লাগল। বাসুদেব এর কথাটা তবে কি ঠিক। বাজার গিয়েছিল মা। ওখানেই তো সামন্তদের আড়ত। ছোট্ট থেকেই বিশু জানে “কুপুত্র হলেও কুমাতা কখনও হয় না”।
বিশু চা মুড়ি খেয়ে নিজের ঘরে ঢুকল। এটা সেই সাবেক আমলের ঘর। নতুন ঘরে ওরা থাকে। হঠাৎই একটা চেঁচামেচি শুনতে পেল বিশু। এ অশান্তি সেই ছোট্ট বেলা থেকেই দেখে আসছে।
আজ যেন অন্য মাত্রা পেল। দেবু মণ্ডল বলছে “বড়ো ছেলের বিয়ে হল না। এখন তার ছোটভাই কীভাবে বিয়ের আসর বসাবে। তোমার শয়তানির মুখোশ খুলে গেছে। নতুন করে বোঝাতে এসোনা।”
তারমানে বিশুর ভাই বিয়ে করছে। এতে অশান্তির কী হল বিশুর মাথাতে ঢোকে না। ভেবেছিল খেতে বসে মাকে জিজ্ঞেস করবে ধান বিক্রির ব্যাপার টা। কিন্তু এই আবহে সেটা মুশকিল হবে। সরমা আজ বিশুকে ডাকলে। কাঁসার থালাতে ভাত তরি তরকারি সাজিয়ে বললে “পেট ভরে খেয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড় বাবা। আর কাল তোর ভাই এর পাকাদেখা। আমাদের পাল্টি ঘর। কাল বাড়িতে থাকিস। “
বিশু ভাবছিল আবার তাকে কেন। পরক্ষণেই সে ভাবলে কাল না থাকলে সবাই হয়ত ভাববে নিজের বিয়ে হয় নি তাই দুঃখ পেয়েছে। বলল “ঠিক আছে”।
সরমা বিশুর বিছানা ঝেড়ে মশারী টাঙিয়ে দিলে। বিশুর আজ মাকে ভীষণ ভালো লাগল। তার মা তাকে সত্যিই ভালোবাসে।
সরমা বললে “আজ তাড়াতাড়ি ঘুমো। কাল বাড়িতে অনুষ্ঠান। তুই বড়দাদা। তোর অনেক কাজ।”
রাতের অন্ধকার। বিশুর মনে এখন উর্মি। খুব বোকা আর সহজ সরল এই মেয়েটাকে বিশু ভালোবাসে। আজ উর্মির চোখে জল দেখেছে বিশু। খুব কষ্ট পেয়েছে নিশ্চয়ই। বিশুর প্রতি এত অভিমান। আজ মাথাটা গরম হল বাসুদেব এর কথাতে। নৈলে উর্মির হাতের রান্না না খেয়ে ও আসতো ই না।
বিশুর মনে হল উর্মিকে সে কষ্ট দেবে না। ভালোবাসার মানুষ কে কষ্ট দিতে নেই। কাল ভাই এর পাকাদেখা। পরে বিশু উর্মিকে বিয়ে করবে। খুব সুন্দর থাকবে ওরা।
জন্মের পর বিশুর মা যেমন চলে গেছে উর্মির ও তাই। তবুও বিশুর বউ হলে সরমা উর্মির ও মা হবে। তখন কত সুন্দর জীবন হবে বিশুর। এইসব ভাবতে ভাবতেই ঘুম এলো। স্বপনের মধ্যে বিশু দেখল তার পাকাদেখা হচ্ছে। ভূবনকাকা এসেছে বাড়িতে। হাত বড়ো কাতলা মাছ আর দৈ এর হাঁড়ি।
স্বপ্ন মাঝপথে ই ভঙ্গ হল। একটা আওয়াজ শুনে ঘুম ভেঙে গেল বিশুর। আসলে অনেক আগে ঘুম এসেছিল আজ। বিশুর ঘুমাতে দেরী হয়। গতকাল ভূবনকাকার ওখান থেকেই তো চলে এসেছে। ঘড়ি দেখলে বিশু। এখন তিনটে বাজছে। কাদের যেন ফিসফিস আওয়াজ। অশরীরী নাকি? এত রাতে কারা কী করছে বাড়ির উঠানে। আলো জ্বালা ঠিক হবে না। টর্চ টা বিছানার উপর ছিল। হাতে নিল বিশু। গোয়াল এর পাশেই ওর ঘর। ঘুলঘুলি দিয়ে দেখলে গরুগুলো ঠিক আছে কিনা। ওরা ঠিক আছে। একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললে বিশু।
বিশুর চোখ কপালে উঠে গেল বাইরে বেরিয়ে আসতেই। এতবড় সত্য সত্যই তার জ্ঞান চক্ষু খুলে দিল। গোলার মাথা খোলা। কয়েক জন লোক উঠানে ধানের বস্তা করছে। চাঁদের আলোতে সব দেখা যাচ্ছে। তারমানে ধান চুরি হচ্ছে। ঘরের শত্রু বিভীষণ। বিশুর মাথা কাজ করছে না। মা এই কাজ করছে! বিশু কিছুই বলবে না ঠিক করলে। বাপের সম্পত্তিতে মায়ের অধিকার আছে।
বিশু ভাবলে এই দৃশ্য দেখার চেয়ে পালিয়ে যাই। কত পরিশ্রম করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বিশু গোলাভরা ধান করেছে। আর আজ তাকে একবার বলার প্রয়োজন মনে করল না মা। প্রচন্ড অভিমানে বিশু ঘর ছেড়ে চলে গেল।
আর সরমা সব ধান বেচে দিলে। সমগ্র উঠান ধুলাতে ভরা। ঘরের ভেতর টাকা গুনছে সরমার ছেলেরা।
অন্য দিন হলে দেবু মন্ডল এতক্ষণ চা পেয়ে যায়। বিশু নিজেই চা তৈরি করে। আর সরমা তো এত সকালে ওঠে না। দেবুর হাসি এল। নিজের ছেলের পাকাদেখা বলে কথা। দেবুর কোনও কথাই ওরা গ্রাহ্য করে না। আস্তে আস্তে বিশুর ঘরের দিকে এগিয়ে এল দেবু। আজ কী হল ছেলেটার। এখন ও গোয়াল থেকে গরু বের হয়নি। তবে কি শরীর খারাপ বিশুর। বাপের প্রাণ হু হু করতে লাগল।
সরমা আজ খুব খুশি। দেবুর জন্য চা আনল। বললে “বিশু খুব ঘুমাচ্ছে। এখনও ওঠেনি”।
দেবুর বিশ্বাস হল না। বিশু কাকভোরে ওঠে।
সরমার ও খটকা লাগল। ঘরে ঢুকে দেখলে বিশু নেই। এই সুযোগ টা হাতছাড়া করা যাবে না।
সরমা উঠান ঝাঁটানোর নাম করে তার অভিনয় শুরু করল। বলল “কী সর্বনাশ হয়েছে একবার দেখে যাও। গোলার মাথা খোলা। গোলাভর্তি ধান হাওয়া। “
দেবু মন্ডল ছুটে এল। কী বলছ কী? কে চুরি করলে ধান?”
সরমা ততোধিক বড়ো গলাতে চেঁচাতে লাগল “ওই সতের গুষ্টি ছাড়া কে করবে। দুধকলা দিয়ে কালসাপ পুষেছি। এখন ঠ্যালা বোঝো।”
বিশু ভোরে বেরিয়েছে। মনে মনে ভাবলে এখন আর বাড়ি ফিরবে না। পকেটে দুশো টাকা আছে। খুব চিন্তার বিষয়। এই টাকাতে কদিন চলবে? হঠাৎই আংটির দিকে নজর গেল। সেই কবে থেকেই এটা পরে আছে। বাবা পরিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল তোর মায়ের দেওয়া। পরে থাক। ওটাই অসময়ের ভরসা। চাষের প্রতি ঘেন্না। কী হবে চাষ করে কলুর বলদ হয়ে।
ভোরের বাসে চেপে বসল বিশু। এই বাসটা কলকাতা যাচ্ছে। অনেক টা পথ। শুনেছে কলকাতাতে টাকা উড়ে বেরায়। শুধুই ধরে নিতে হয়। ভূবনকাকার চায়ের দোকান বিশুকে অনেক শিখিয়েছে। বিশুর মনে হল সেও পারবে। জমি চাষ করুক ভাই রা। ও নিজের পথ দেখে নেবে।
সারাদিন বিশুর পথ চেয়ে বসেছিল দেবু। বুকের ভিতর যেন পাষান ভার। সরমা দেখলে কিছুতেই দেবুকে টলানো যাবে না। এদিকে ছেলের বিয়ের পাকাদেখা। কোথাকার কোন মেয়েকে পছন্দ করেছে ছেলে। কিছুদিন অপেক্ষা। তারপর বিয়ে। ধান বিক্রির সমস্ত টাকা ছেলের হাতে। এবার গায়ে গতরে খাটাবে কাকে। বিশু চলে আসবে ভেবেছিল সরমা। এবার ভয় পাচ্ছে। কে চাষের কাজ করবে বিশু ছাড়া। তার ছেলেরা হদ্দ কুঁড়েশুল। এখন কী হবে?
2
গভীর রাতে সরমার ঘরে আলো জ্বলে। ছেলেরা বলে “বিশুর এবাড়ির কোন ও অধিকার নেই। আমরা বিয়ের পর দুভাই সবকিছুই সমান ভাগে ভাগ করে নেবো।”
ওদের সব কথা শুনে বিধাতা পুরুষ ও হাসলেন। মানুষ ভাবে অন্যকে প্রতারিত করে অনেক সুখ পাওয়া যায়। তবে মহাকালের নিয়ম আলাদা।
সরমা দেবুর ঘরে যায়। কুমীরের কান্না কাঁদে। বলে “বিশু একটা অপরাধ করে বাড়ি থেকেই পালিয়ে গেছে। সে হয়ত আর বেঁচে নেই। নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতাপে আত্মহত্যা করেছে। বাকী দুই ছেলের বিয়ের আগে ওদের সম্পত্তির হিসাব বুঝিয়ে দাও। নৈলে এরা যদি বিশুর মতো ভুল করে “।
এইসব কথা কত অবলীলায় বলতে পারে সরমা। এই নারী জাতি কত ভয়ঙ্কর তার উদাহরণ এই পিশাচিনী। তবুও চুপ করে থাকে দেবু। বুকের বাঁ দিক টা চিনচিন করছে কাল থেকে। রাতে ঘুম হয় নি। বিকালে এক কাপ চা খেয়ে তাগাদাতে বেরিয়েছিল দেবু। শরীর অবসন্ন ।
এদিকে কলকাতা এসে অথৈ জলে পড়ল বিশু। সমস্ত দিন ফুটপাথে। কাউকেই তো চেনে না। হঠাৎই বাবার জন্য ব্যাকুল হল সে। নিশ্চয়ই বাবা কাতর হয়ে আছে। আর উর্মি। সে যদি শোনে যে বিশু নেই তাহলে সে কী করবে। খুব ভুল হয়ে গেছে। আবার বাড়ির দিকেই ফিরছে সে।
দেবু প্লাটফর্ম এ দাঁড়িয়েছিল। ভীষণ গরম আজ। একটা স্টেশন মাত্র। ওখানে টাকা নিয়েই চলে আসবে। ওই তো। ট্রেন ঢুকছে। কিন্তু দেবু এত টলছে কেন। একবার এগোচ্ছে তো একবার পিছচ্ছে। ট্রেন প্লাটফর্ম এ থামলো। গন্তব্যে নিয়ে যাবে। দেবু সামনের রডটা ধরতে যাবে হঠাৎই কান আর নাক দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে প্লাটফর্ম। দেবু মন্ডল স্থির। ট্রেন চলে গেল। সাথে গেল দেবুর অতৃপ্ত প্রাণ। পাড়ার অনেক লোক ছিল। স্টেশন মাস্টার বললে “বেঁচে আছে বলে নিয়ে চলে যাও। নৈলে অনেক হ্যাপা”।
টক পাড়ার মোড়ে বাসটা থামল। বিশু বাড়ির পথ ধরল। এই গাঁয়ের রাস্তায় সবাই গরু বাঁধে। তিল সরষে শুকনো করে। বললে ও শোনে না। বাবাকে গিয়ে বিশু কী যে বলবে ভাবতে থাকে। খুব ভুল হয়ে গেছে।
বেশ কিছুটা আসার পর ভূবনকাকার চায়ের দোকান। বিশুকে দেখতে পেয়ে উর্মি পাগলের মতো ছুটে আসে। চিৎকার করে বলে “বিশুদা গো। সর্বনাশ হয়েছে। আগে বাড়ি যাও।”
বিশু কাতর হয়। কী হয়েছে উর্মি? বাবা ভালো আছে?’
উর্মির কণ্ঠ রোধ হয়ে গেছে। কেঁদে চলেছে। আর বিশু বিন্দুমাত্র দেরী করে না। দৌড়ে যায় বাড়ির দিকে।গাঁয়ের লোক ভেঙে পড়েছে উঠানে। নিথর দেহ পড়ে আছে। আড়তদার সামন্ত বিশুর দিকে এগিয়ে এল।
বললে “বিশু। বড়ো ভুল হয়ে গেল। অমন করে ধান কেনার জন্য তোমাদের সংসারে এমনটা হয়ে গেল। তোমার মায়ের কথাতে রাজী হওয়া আমার ভুল হয়েছিল। “
বিশু বাবার পায়ের উপর মাথা রেখে হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকলে।
সরমার সব খেলা শেষ। স্বামীকে হারিয়ে অনুশোচনা এসেছে তার। বিশুর উপর সব দোষ চাপায় সে সাধ্য আর তার নেই। গোটা গাঁয়ের লোক সব জেনেছে। বিশুকে সবাই খুব ভালোবাসে।
সরমার ছেলেরা মানুষ হয় নি। ওরা বললে “বাবার মুখে আগুন দিক বিশু। এই গুরুদশাতে কষ্টের শেষ নেই। যা করবার বিশু করবে”।
সরমা বলল “বিশু বড়ো ছেলে। ও করুক। তবে ধান বিক্রির টাকাটা তোরা দে। বাপের শ্রাদ্ধ শান্তিতে খরচা আছে”।
ছেলেরা গর্জে ওঠে। বললে “একটা পাই পয়সা দেবো না। আমরা দুভাই ভাগ করে নেবো”।
বিশুর কোনও দিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। মাতৃহারা সন্তান কে শুধুই পিতার নয় মায়ের স্নেহ দিয়েছিল তার বাবা। আজ অন্তিম সংস্কারের জন্য টাকাটা বড়ো করে দেখবে এমন আহাম্মক সে নয়।.গাঁয়ের শ্মশান নয়, গঙ্গার ধারে ত্রিবেণীতে শেষ কৃত্য সম্পন্ন করবে সে। এই মুহূর্তে কিছু টাকার দরকার।
মনে পড়ল ভূবনকাকার কথা। সুদখোর ভূবনকাকার কাছে হাজির হল বিশু। আপাতত কুড়ি হাজার টাকা তার লাগবে। কিন্তু বিশুর এই প্রয়োজনে এগিয়ে এল উর্মি। বললে “আমি টাকা দিচ্ছি। কোনও সুদ লাগবে না”।
উর্মির প্রতি কৃতজ্ঞতাতে মাথা নত হয়ে গেল বিশুর।
উর্মি বললে “সব অন্যায় যারা মুখ বুজে মেনে নেয় তারা কাপুরুষ। তোমার সঠিক কথা বলার সময় উপস্থিত “।
বিশু ঘাড় নেড়ে চলে যায়।
চিতাতে বাবার মুখে আগুন দিলে বিশু। শিশুর মতো কাঁদছে আজ। আগুন টা দাউদাউ করে জ্বলছে।.বিশু দেখলে ওই আগুন এর মধ্যেই একটা রথ। তার বাপের মুখে হাসি। ছেলের হাতের আগুন। সেটা কী মুখের কথা। বাপ তার সগ্গে যাচ্ছে “।
3
বিশুর জীবন নাট্যের পালাবদল হল। এখন তার কাছে সব পরিস্কার। তাকে কেউ ভালোবাসে না। সব অভিনয়। বাবা ছিল। যার টান ছিল বিশুর উপর। রক্তের টান। আর কেউ নেই। শুধুই একটা মুখ বিশুর হৃদয়ের মণিকোঠাতে আছে। উর্মি। একটাই আশ্রয়।
বিশুর কোথায় আশ্রয় হবে? সেখানেও তো ভূবনকাকার ডেরা। বেগুন পোড়ার মতো মুখ। চুল গুলো ঘাড় পর্যন্ত। গলাতে তুলসীর মালা পরেছে। অবনী সেদিন বলেছিল “তুলসীর মালা পরে মিথ্যা কথা বলতে নেই। আর তুমি তো আবার সুদে টাকা খাটা ও। পাপের শেষ নেই গো”।
ভূবনকাকার সাফ জবাব “যত নিয়ম কানুন ন্যায় নীতি শুধুই আমাদের জন্য বটে। যারা দুনিয়া লুটে খায় তারাই দেখো ভোট এলে পথে নামবে। তারপর হেই উঠে যাবে এক্কেরে এ সি ঘরে।”
বিশুর হাসি পায়। সত্যিই কথাটা। উর্মির বিয়ে দেয় নি ভূবনকাকা। ঠিক হয়েছে। নৈলে বিশুর জীবন মরুভূমি হয়ে যেত।
হঠাৎই বিশুর মনে পড়ল টাকার কথাটা। উর্মির টাকা ফেরত দিতে হবে। কীভাবে দেবে সে। আকুল চিন্তা তার মাথার মধ্যে। পাশের গোয়াল থেকে গরু গুলো চিৎকার করছে। কদিন খড় বিচালী পায় নি।
এদের জন্য বিশুর পেছটান। নৈলে এ বাড়ির ছায়া স্পর্শ করতে ইচ্ছা নেই তার। বাবা নেই। মনটা হু হু করে উঠল। কাল সকাল হলেই গরু নিয়ে গরুর হাটে যাবে। বিক্রি করে পিতৃশ্রাদ্ধের ঋণ শোধ করে দেবে।
কথামতো পরদিন সকালে গরুদুটো নিয়ে গোহাটে যাচ্ছিল বিশু। সরমা দ্রুত এসে বললে “এত সকালে গরু নিয়ে কোথায় চললি”?
বিশু স্পষ্ট জবাব দিলে “গরু বিক্রি না করলে পিতৃশ্রাদ্ধের ঋণ পরিশোধ হবে না”।
সরমা আকাশ থেকে পড়ে। ঋণ কীকরে হল?
বিশু কোনও উত্তর না দিয়ে এগিয়ে যায়।
এইসময়ই সরমার দুই ছেলে তেরে আসে বিশুর দিকে। বলে “গরুর টাকাতে আমাদের অধিকার। “
বিশুর রুদ্রমূর্তি তারা এর আগে দেখেনি। দুটোকে ই ঠেলে ফেলে দেয়। বিশুর কোদাল কুঠার ধরা হাত দিয়ে চড় মারে দুজন কে। সরমা ভয় পেয়েছিল। বললে “যাক। ওর সাথে পেরে উঠবি না তোরা”।
দুধেলা গাই। একলাখে বিক্রি হল। বিশু ঠিক করল উর্মির টাকা মিটিয়ে বাকী টাকাতে ঘর ঠিক করবে ও। তারপর উর্মির সাথে ও সংসার পাতবে। তখন বাঁচার ইচ্ছা জাগবে বিশুর।
কথামতো কাজ হল বিশুর। সরমা বললে “শোন বিশু। তোকে আর চাষের কাজ করতে হবে না। কাল আমার ছোট ছেলে বিয়ে করবে তারকনাথ মন্দিরে। তারপর জমি ভাগ করে নেবো”।বিশুর কোনও দিকেই নজর নেই। মায়ের কথার জবাব দেয়ার নাম করে না। উর্মির ওখানেই খেয়ে আসে। চাষাবাদ বন্ধ।
রাতের অন্ধকারে সরমার সাথে ছেলেদের শলাপরামর্শ হয়। বাপের জমি বিক্রি করে দেবে বিশুকে না জানিয়ে।
দালাল দের কাছে খবর যায়। খদ্দের আসতে থাকে। অমন উর্বর জমি এই চত্বরে কারো নেই। সবাই কিনতে চায় মোটা দামে।
আড়তদার পালেরা বললে “জমির খাজনা মেটানো আছে কি না দেখি আগে”।
সরমার আনন্দ আর ধরে না। বললে “আমার কত্তা পাকাপোক্ত লোক ছিল যে। কোনও সমস্যার কারণ নেই “।
পরের দিন রাতে বিশুর দুচোখের পাতা সবে এক হয়েছে হঠাৎই কানে এল মায়ের আর্তনাদ। দুই ছেলে রাতের অন্ধকার এ সরমাকে বার করে দিয়েছে। পালেরা কাগজ পত্র সরেজমিনে তদন্ত করে জেনেছে কত্তা দেবু মণ্ডল তার সমস্ত সম্পত্তি তার বড়ছেলে বিশুর নামে উইল করে গেছে। তাই সরমার ছেলেরা মাকে দেখবে না।
এসব তো বিশুর আগেই জানা। মায়ের কষ্ট তাকে বিচলিত করল। বাড়িতে বউ খুব দরকার। বিশুর বউতো উর্মি। সেই কবে ওদের মনে মনে বিয়ে হয়েছিল। এখন টক পাড়ার বিশু পালিয়ে গেছে উর্মির সাথে। ফিরে এলে মহাভোজ হবে মন্ডল বাড়িতে। বিশু সবাই কে আসতে বলবে।
(সমাপ্ত)
![]()







