ছায়া ও সঙ্গ
নবু
অর্জুনপুর — নামটা শুনলেই যেন কানে আসে দুর থেকে ভেসে আসা দমদম এয়ারপোর্টের প্লেন ওঠা নামার আওয়ায, পাড়ার মোড়ে বসা চা-দোকানের জটলা আর হাল্কা কোলাহল, আর তার ফাঁকে ফাঁকে মানুষের জীবনের টুকরো গল্প। দমদমের বুকের ভেতরে একখানা পুরনো এলাকা, কিন্তু তার ধমনীতে আজও সময় প্রবাহিত হয় স্বরলিপির মতো।
এই পাড়ারই এক কোণে, বটগাছ ছাওয়া একটা দোতলা বাড়ি। রং উঠে গেছে, বারান্দার গ্রিলে কাক বসে থাকে নির্বিকার, আর ওপরে থাকেন গৌরী। বয়স বলছে পঁয়তাল্লিশ পেরিয়েছে, কিন্তু মুখে সেই চেনা দীপ্তি — যেমনটা থাকে লুকনো চিঠির ভাঁজে, যে চিঠি কেউ কোনোদিন ডাকবাক্সে ফেলে দেয়নি।
স্বামী অভিজিৎ চলে গেছেন ছ’বছর আগে। অ্যাটাকটা যেন এসেছিল অজুহাত নিয়ে — অফিসের তাড়াহুড়ো, বেশি সময় বিছানায় সুয়ে থাকার খারাপ অভ্যাস, আর একটা ‘আরও পরে ডাক্তার দেখাব’ গোছের দায়িত্বহীন জ্ঞান।
তুষার, ওদের ছেলে, এখন বেঙ্গালুরুতে চাকরি করে। ফোনে বলে, “মা, একবার আসো না এখানে!”
গৌরী হেসে বলেন, “বাবা, এখানে যখন মেঘ ডাকে, জানিস, তখন আমার মন ভিজে যায়। ওখানে এতো শুকনো! আমি বর্ষা ফেলে কোথাও যাই, কি করে যাই বল?”
সকালে ঘুম থেকে উঠেই ছাদে ওঠেন।
ছাদের এক কোণায় তিনটে গামলা, একটায় তুলসী, একটায় লঙ্কা, আরেকটায় — দুঃখ। না না, ভুল বললাম। ওইটায় গাঁদা গাছ। তবে মাঝেমাঝে ওর গন্ধে পুরনো দিনের একটা নিঃশ্বাস খুঁজে পান তিনি।
তারপর ব্যাগ হাতে বাজার। মাছওয়ালা দুলালের সঙ্গে কথাবার্তা এখনো প্রেমিক-প্রেমিকার মতো — “দুলাল, আজ ইলিশটা যেন প্রেমে পড়ে গেছে আমার সঙ্গে।”
দুলাল হেসে গালে হাত বুলিয়ে বলে, “দিদি, ও তো ইলিশ, তুমি হলে ইলিশ-মোহনবাগান।”
রিকশা ধরে বাড়ি ফেরেন। রিকশাওয়ালারা ওনাকে দেখে হাত নেড়ে ডাকে, “দিদি, রোদটা আজ একটু বেশি!”
গৌরী হেসে বলেন, “রোদকে বলেছি, আমি যেন পুড়ে গিয়ে আরও ঝলমলাই। কে জানে শুনেছে কিনা!”
পাড়ার ছেলেমেয়েরা ওনাকে চেনে “গৌরী দিদি” নামে। ওদের কাছে তিনি একধরনের হাঁটাচলা করা গল্পের বই। কেউ প্রেমে ব্যর্থ হলে আসে তাঁর কাছে, কেউ পরীক্ষার আগে মাথায় হাত বুলিয়ে নিতে।
তিনি বলেন, “প্রেমে ফেল করা মানে সব গেল না, বরং জীবনের একটা গল্প জমে গেল।”
আর বড়দের মধ্যে কেউ কেউ গোঁজ হয়ে জিজ্ঞাসা করে, “এই বয়সে আপনি এত হাসেন কি করে?”
তিনি জবাব দেন, “আরে ভাই, আয়নাটা তো আমার বহু পুরনো বন্ধু। ওকে যদি হাসি না দিই, তো ও মুখ চেনেই না। মুড অফ হয়ে থাকে!”
দুপুর হলে এক কাপ চা, আর একটা পুরনো বই হাতে নিয়ে বারান্দায় বসেন। পেছনের খোলা জানালায় বাতাস ঢোকে, সঙ্গে কিছু না বলা কথা।
মাঝে মাঝে অভিজিৎ-এর ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলেন, “আজ যমিয়ে একটা নতুন মেনু করেছি, খেতে বসলে টের পেতে!”
ছবিটা চুপ করে থাকে।
আর গৌরী? তিনি আবার একটা পাতা ওলটান।
এমনি করেই চলছিল দিন, হঠাৎ একদিন খবর এলো — সামনের বাড়ির নতুন ভাড়াটে এসেছে, একজন পঞ্চাশোর্ধ্ব পুরুষ, নাম অমিতাভ বসু। কলকাতা থেকে সদ্য বদলি হয়ে এসেছেন, বিধুর, অফিসে চাকরি করেন। প্রথম কয়েকদিন চুপচাপ ছিলেন, কিন্তু একদিন গৌরী ছাদে কিছু কাপড় মেলতে গিয়ে লক্ষ্য করলেন, ভদ্রলোক তাকিয়ে আছেন।
তাকানোর ভঙ্গিতে অশালীনতা ছিল না, বরং ছিল এক আশ্চর্য কৌতূহল — যেন কেউ অনেকদিন পরে কিছু চেনা খুঁজে পেয়েছে। ধীরে ধীরে পরিচয় হল। রোজ বিকেলে দু’জন ছাদে বসে চা খান, বইয়ের কথা বলেন, রবীন্দ্রসংগীত বাজে পেছনে — পাড়ার কেউ কেউ দেখেও ফেলেন।
যতই তারা আলাপ বাড়ান, ততই সমাজের চোখ সরু হতে থাকে। “এই বয়সে?” “বিধবা আর বিধুর— এক ছাদে চা খাওয়া?” কিছু কুমন্তব্য শুরু হয় দোকান থেকে রিকশাঘর পর্যন্ত। অথচ গৌরী জানেন, এ আলাপ কোনো প্রেম নয় — এটা দুই মানুষের একাকীত্বের ওপরে কিছু আলো ফেলা, এ জীবনের ছাদের ওপরে আরেক জীবনের খোলা জানালা।
একদিন সন্ধ্যাবেলা ছাদে হঠাৎ করে অমিতাভ বলেন, “আপনার স্বামী অভিজিৎ বাবু কি ওষুধ কোম্পানিতে কাজ করতেন?”
গৌরী থমকে যান। এতদিনের আড্ডায় কখনো এই প্রসঙ্গ ওঠেনি।
“হ্যাঁ… কেন বলছেন?”
অমিতাভ একটু থেমে বলেন, “অনেক বছর আগে একবার ওনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল অফিসের কাজে। সল্টলেকের এক কনফারেন্সে। মুখটা মনে আছে… তখনও আপনার কথা জানতাম না।”
গৌরী কিছু বলেন না। তার চোখে তখন ঝড় আসছে, বাইরে না, ভেতরে।
কয়েকদিন কেটে যায়।
অমিতাভ নিয়মিত উঠছেন না ছাদে। ফোন করলে ধরেন, কথা সংক্ষিপ্ত।
গৌরীর বুকের ভেতরে একটা অস্বস্তি গেঁথে বসে। কেমন যেন কিছু বলা হয়নি, অথচ অনেক কিছু বলা হয়ে গেছে।
একদিন তিনি নিজের ভেতরের দ্বিধা সরিয়ে গিয়ে দাঁড়ান অমিতাভের দরজার সামনে। দরজা খুলে যায় — কিন্তু চেনা হাসিটা নেই।
ভেতরে বসার পর অমিতাভ বলেন, “গৌরীদি, কিছু কথা আপনাকে বলা হয়নি, বলার সাহস হয়নি। আজ বলতে চাই।”
ঘরের বাতাস থমথমে।
অমিতাভ টেবিল থেকে একটা পুরনো চিঠি বের করেন।
“এই চিঠিটা আমি বছর দশেক আগের এক তদন্তে পেয়েছিলাম। অভিজিৎবাবুর নাম ছিল সেই ফার্মার ঘুষ নেওয়ার মামলায়। কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়নি, কিন্তু চাকরি থেকে রিটায়ার করার আগেই তিনি খুব ভেঙে পড়েছিলেন।”
গৌরীর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে আসে।
“তাই আপনি…”
“না, আমি ওনাকে দোষ দেইনি। কিন্তু চিঠিটা আমার জীবনে একটা ছায়া ফেলে দিয়েছিল। আমি তখনই বুঝেছিলাম, প্রতিটি মানুষের জীবনে কিছু না বলা ইতিহাস থাকে। যেমন আপনার, তেমন আমারও।”
সেদিন সন্ধেয় ছাদে কেউ ওঠেনি।
পরদিন গৌরী একা ছাদে গিয়ে বসে রইলেন অনেকক্ষণ। একটা গামলায় জলে দাঁড়িয়ে থাকা গাঁদা গাছটা যেন হঠাৎ করে তার দিকে চেয়ে রয়েছে, প্রশ্ন করছে — “তুমি কাকে বিশ্বাস করো?”
ঠিক তখনই পেছনে পায়ের আওয়াজ। অমিতাভ।
চোখে সরলতা, মুখে ক্লান্তি। হাতে দুটো কাপে চা।
“আজ আমিই করেছি। চিনি কম, যেমন আপনি চান।”
গৌরী মৃদু হাসেন।
অমিতাভ যোগ করেন, “জানেন, আপনার হাসিটা অনেক বড়সড় কোর্ট কেসের মতো — শুনানি শেষ হয় না।”
পাড়ার মুখে তখনও ফিসফাস।
কিন্তু সেই ফিসফাস ধীরে ধীরে গলে যায়, কারণ তারা দেখে, প্রেমের গল্প নেই এখানে। এখানে আছে দুই মানুষের জীবনের ভার ভাগ করে নেওয়া।
একদিন গৌরী বলেন, “আপনার সঙ্গে থাকা মানে আমার একটা পুরনো ছায়া একটু একটু করে আলোয় আসছে।”
অমিতাভ বলেন, “আর আপনার সঙ্গে থাকা মানে, আমার জীবনের বন্ধ জানালায় হাওয়া ঢোকে।”
ছাদের ওপরে বসা দুটি মানুষ। পেছনে বাজছে —
“এ মনিহার আমার নাহি সাজে…..”
আসলে, এটা কোনো প্রেম নয়।
এ হলো জীবন নামের এক চুপচাপ উপন্যাসের মাঝখানে দুটো চরিত্রের দেখা হয়ে যাওয়া।
পাড়ার এক কান দুই কান—চুপিচুপি কথা নয়, ঠিক বটতলার চায়ের দোকানের ঘোষণার মতো।
গৌরী আজকাল আবার রঙিন শাড়ি পরে, খোপায় ফুল গুঁজে রাখে। মুখে টুকটাক হাসি, চোখে খানিক স্বপ্নের রেখা।
এ-সব দেখে একদিন পাড়ার সুলেখা বউদি, যিনি নিজে স্বামীর মুখ দেখেন না আজ পাঁচবছর অথচ শাড়ি ছাড়া অন্য কোনো কাপড় পরেন না, বলে ফেললেন ঠিক মুখের ওপর—
“তোমার মানায় এসব? বিধবা হয়ে হাসাহাসি, মাথায় ফিতে, সিনেমায় যাওয়া! ছেলেটা শুনলে কি বলবে?”
গৌরী থেমে গেলেন। কিন্তু মুখে একটুও তিরিক্ষি ভাব নয়। বরং বেশ শান্ত গলায় বললেন—
“আমি তো বিধবা হয়েছি, মরে যাইনি। হাসিটা থামিয়ে কষ্টটা কাকে দেখাবো বউদি? আয়নায় আমি নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছিলাম।”
সুলেখা বউদি মুখ ফিরিয়ে গেলেন, কিন্তু ফিসফিস করে কি যেন বললেন—তা আর শোনা গেল না।
তুষার, গৌরীর একমাত্র ছেলে, তখন হায়দরাবাদে।
একদিন ফোনে বলে, “মা, তুমি যেমন আছ, তেমনই থাকো। যাকে দরকার মনে করো, পাশে রাখো। আমার কোনো আপত্তি নেই।”
এই কথাটা যেন অমৃতের মতো।
গৌরীর চোখ ভিজে যায়। কিন্তু মনটা হঠাৎ শক্ত হয়ে ওঠে।
মনে হয়, ছেলেটা এখন সত্যিই বড় হয়েছে। আর নিজে? তিনি তো নিজের ছোট হয়ে থাকা জীবনের খোলসটা এখন খুলে ফেলতেই পারেন!
তারপর?
ছাদে কাপড় মেলতে মেলতে দেখা হওয়া থেকে শুরু।
একদিন রোদে বই পড়া, একদিন বৃষ্টিতে রিকশা করে সিনেমা দেখা।
রবিবারে মাঝে মাঝে ভাত রাঁধেন গৌরী, আর অমিতাভ মাংস এনে হাজির হন।
পাড়ার কেউ কেউ মুখ টিপে হাসে।
কেউ কেউ আবার এমন ভাব করে, যেন গৌরীর জীবনে বসন্ত আসাটা প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ।
কিন্তু গৌরী আয়নার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠেন,
“বাঁকা চোখে দেখলেই চোখের কোণ কুঁচকে যায়, আমি তো আর সে-কাজে নেই!”
একদিন সকালের রোদে, অমিতাভ বলে ফেলেন, “তুমি জানো, তোমার হাসি, একেবারে প্রাতঃরাশের মতো লাগে—নিত্য প্রয়োজনীয়।”
গৌরী হেসে বলেন, “তাহলে তুমি রোজই এসো, নইলে আমার খিদে টা থেকে যাবে!”
একটুও লজ্জা নেই গলায়, কিন্তু রসিকতায় একটুও খামতি নেই।
আরো পরে, একদিন অমিতাভ গম্ভীর গলায় বলে,
“এইভাবে থাকা যাবে না। সমাজ তো কিছু একটা বলবে, তাই না?”
গৌরী জবাব দেন, “তুমি চুপ করে থেকো, সমাজ আমার মেনুতে নেই। আমি এবার নিজের মতো করে বাঁচবো। ঠিক করেছি।”
পাড়ার লোক এখনও দেখে, মুখ বাঁকায়, কানের কাছে ফিসফিস করে।
কিন্তু এখন গৌরীর আয়নার সামনে এক নতুন মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে।
চোখে হালকা কাজল, ঠোঁটে একটু হাসি।
আর একটুকরো শক্তি—নিজেকে ফিরে পাওয়ার।
—oooXশেষXooo—
![]()







