পথচলতি পরামর্শসমূহ
নিলয় বরণ সোম
না, আমি নকুড়বাবুর সেই পথনির্দেশ চাওয়ার ঘটনা জানতে চাইছি না। তার আগে, যারা জানেন না , অর্থাৎ , আনইনিশিয়েটেড, তাদের জন্য নকুড়বাবুর গল্পটা বলা দরকার। হয়েছিল কী , নকুড়বাবু তখন সদ্য মফস্বল থেকে এসেছেন , কলকাতার রাস্তাঘাট তেমন চেনেন না। ২১৮ নম্বর বসে করে অফিস যান। পরদিন শনিবার , ছুটির দিন , কোনো এক আত্মীয়ের বাড়িতে যাবেন। আত্মীয়র বাড়ি গোপালনগর কী শ্যামনগর যে কোনো জায়গায় হতে পারে , সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয় ; গুরুত্বপূর্ণ হলো, স্বল্প পরিচিত সহযাত্রীদের সেখানে যাওয়ার পথনির্দেশ , বাংলায় যাকে ডিরেকশন বলে , জিজ্ঞাসা করেছিলেন। দেখা গেল , একদিক ব্যক্তি বিভিন্নরকম ডিরেকশন দিচ্ছেন , তাতে নকুরবাবুর ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। এরপর দেখা গেল, দুজন সহযাত্রী সপ্তমে গলা চড়াচ্ছেন, আর অন্য সহযাত্রীরাও দু’ভাগ হয়ে গেছেন, সবই নকুড়বাবুকে সাহায্য করার জন্য। শেষে সেই যে দুই সহযাত্রী , রামবাবু আর শ্যামবাবু , তাদের মধ্যে হাতাহাতি বেঁধে গেল; তাতে বাসের অধিকাংশ যাত্রী জড়িয়ে গেল। শেষমেশ , এমন হাতাহাতি বাঁধল , যে ড্রাইভার গাড়ি রাস্তার একপাশে সরিয়ে নিতে বাধ্য হল, আর সেই রুটে এরপর সাতদিন গাড়ি বন্ধ ছিল!
আমার জীবনে সেরকম কিছু না ঘটলেও , খুচখাচ উটকো পরামর্শ , অযাচিত উপদেশ থেকে শুরু করে জীবনপথের অমূল্য বাণী , অনেককিছুই পেয়েছি আমার এই নগণ্য জীবনে। এক এক করে বলছি সে কথা , একটু ধৈর্য্য ধরে শুনতে হবে, এই যা !
চাকরি জীবনের গোড়ার কথা , নকুড়বাবুর মতোই। সরকারী অফিস, সর্বনিম্ন এক্সিকিটিভ পোস্টে , একটি করে ব্রিফকেস আমাদের পাওনা ছিল , তাই নিয়ে আমাদের একটু গর্ববোধ বা দেখনদারিও ছিল। অফিসশেষে একদিন কী কারণে ধর্মতলায় ঘোরাঘুরি করছি , তারপর বসে ওঠার আগে, রাস্তার এককোনে ব্রিফকেসটা খুলে , কাগজপত্রগুলো গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম ।
হঠাৎ একজন মুশকো মতন লোক, আমার পাশে এসে ধীর অথচ স্পষ্ট গলায় বলে , আমি সাদা পোশাকের পুলিশ আছি। এইসব জায়গায় ব্রিফকেস খুলবেন না , যে কোনো মুহূর্তে ছিনতাই হয়ে যেতে পারে! আমি সঙ্গে সঙ্গে ব্রিফকেস বন্ধ করলাম বটে, কিন্তু সেদিনও মনে হয়েছিল , আজও মনে হয়েছিল , ব্যাটা আর যাই হোক, পুলিশ ছিল না !
পরের ঘটনাটি আমার লেখায় অন্যত্র কোথাও বলে থাকব। এটাও আমার চাকরিজীবনের গোড়ার দিকের কথা। আমার এক দিদি ও বৌদি আমাদের বাড়িতে এসেছেন , তারপর ওদের বাস টার্মিনাসে আমি তুলে দেব , ওর ওদের গন্তব্যে চলে যাবেন। সে যেরকম কথা, ওদের বাসে তুলে দিলাম, ওরাও যথাবিহিত বাই টাই করে, চোখের আড়াল হয়ে গেলেন। বাড়ির পথে ফিরতে গিয়েই দেখি, টার্মিনাসের এক কোনে , এক পসারি হরেক রঙের রঙিন জলের শরবত বিক্রি করছে। এই জিনিসটির উপর আমার ছোটবেলা থেকে লোভ, বাড়ির চোখ রাঙানিতে কোনদিন চাখতে পারি নি। ভাবলাম, অবদমিত ইচ্ছার বাঁধন খুলে দেওয়ার সময় এই সুবর্ন সুযোগ , অর্ডার করলাম এক গেলাস শরবত। ওমা! যে মুখে দিতে যাব, পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাস থেকে এক ভদ্রলোকের পরামর্শ নয়, রীতিমত ধমক, আপনাকে দেখে তো শিক্ষিত মনে হয়, এসব রঙিন জল খাচ্ছেন ? কোনো মানে হয়!
আরেকটা পরামর্শের গল্প করতে ইচ্ছে করছে , যেটা একদিক থেকে অদ্ভুত। বছর পাঁচ ছয় আগে একটা আন্তর্জাতিক কর্মশালায় চীন দেশে গিয়েছিলাম, অর্থাৎ চীন ছিল সেই কৰ্মশালার আয়োজক দেশ। এক সপ্তাহ সেই ট্রেনিং টেনিং নিয়ে , শনি রোববার সাংহাই শহরে নিজের খরচে ছুটি কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম , অবশ্যই সরকরি বিধি মেনেই। আমার ট্যুর গাইড হোটেল থেকেই ঠিক করে দিয়েছিল , সকালে একজন, সন্ধ্যায় একজন। গাইড আমাকে ঘুরে ঘুরে অনেক কিছু দেখাল, তারপর নিয়ে এল মূল বাজার এলাকায়। আমি ওর কাছে ইচ্ছা প্রকাশ করলাম, কিছু উপহার সামগ্রী কিনতে চাই। এরপর গাইড যা বলল, তাতে তাজ্জব বনে গিয়েছিলাম। সে বলল , এখন থেকে কিচ্ছু কিনবে না ,ওরা তোমাকে ট্যুরিস্ট দেখে ঠকিয়ে দেবে!
ওই ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার এযাবৎকাল দেখা কোনো গাইডেরই মিল পেলাম না, এমনকি ওই দেশেরই সকাল বেলায় আমাকে নিয়ে ঘুরতে থাকা গাইডটিরও না। ভদ্রলোকের বয়স নিতান্ত কম ছিল না, এতটা ব্যতিক্রমী সততা নিয়ে উনি যখন এতটা পথ চলে এসেছেন , বাকি জীবন নিশ্চয়ই চালাতে পারবেন , এই আশাই রাখি।
উপরের যে ক’টি ঘটনার কথা বললাম, তাতে পরামর্শ বা উপদেশদাতার কোনো বৈষয়িক স্বার্থ ছিল না , এমনকী নকুরবাবুর ঘটনাটিতেও , ওয়ান আপম্যানশিপের সুতীব্র বাসনা ছাড়া যুযুধান দুই পক্ষের কোনো প্রত্যক্ষ লাভ কিছু ছিল না।
এবার স-স্বার্থ পরামর্শের একটা কাহিনী বলি। একবার মুম্বাই থেকে ঔরঙ্গাবাদ যাচ্ছি , উদেশ্য ইলোরা দর্শন। আমার ইনভার্সিটির এক অতিথি অধ্যাপক তখন ভিডিওকন কোম্পানিতে কৰ্মরত। অবিবাহিত সেই অধ্যাপক কোম্পানি গেস্ট হাউসেই থাকেন , আমি সেই গেস্ট হাউসেই উঠব। যাওয়ার পথে , এক সহযাত্রী আমি কী করি , কোথায় যাচ্ছি , কোথায় থাকবো সব জেনে নিলেন। এসব শুনে আমাকে বললেন, রাত্রি বেলা আমি ওই ভদ্রলোককে যেন বিরক্ত করতে না যাই ! তার থেকে, ভদ্রলোকের নিজস্ব হোটেল আছে, সেখানেই যেন আমি থাকি! এরকম বেয়াড়া পরমার্শ, আজকের দিনেও খুব সুলভ নয়, হলফ করে বলা যায়।
পরের কাহিনিটাও একই যাত্রাপর্বের। আসলে আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল কলকাতা থেকে, কলকাতা টু ঔরঙ্গাবাদ ভায়া মুম্বাই, অনেকটা বজবজ তো তিব্বত ভায়া রানাঘাটের মতন। তখন ট্রেনে নন এসি ফার্স্ট ক্লাস বলে একটি বস্তু ছিল , স্লাইড করা দরজা ঠেলে তাতে চার জনের বসার বন্দোবস্ত থাকত , বেশ আরামের I হাওড়া স্টেশন থেকে যখন ট্রেন ছাড়লো , সেই কূপে ছিলাম আমি ও একজন বয়স্ক ভদ্রলোক, সেন্ট্রাল ব্যাংকের ম্যানেজার I প্রথমেই উনি আমাকে আজকাল কি রকম ডাকাতি রাহাজানি হচ্ছে সেটি বিধৃত করলেন ও সজাগ থাকতে বললেন I আরেকটি ব্যাপারে খুব সাবধান করে দিলেন, বললেন , দেখবেন, অনেকে উঠেই মালপত্রের সঙ্গে বাঁধা আপনার চেনের সঙ্গে নিজের মালপত্রটি বেঁধে দিতে চাইবে -একদম এলাউ করবেন না- এলাউ করেছেন তো ধনে প্রাণে গেলেন!
আমার মনে এতগুলো আশঙ্কা জাগিয়ে উনি বেশ নাক ডাকিয়ে ঘুমোতে লাগলেন I এরকম রাত জাগানিয়া পরামর্শ, পরবর্তীকাল আমাকে আর কোনো সহযাত্রী দিতে আসেন নি, আসলে, ঠিক একটা মার্ডার কেস হয়ে যেত !
জীবনপথের এক অমূল্য বাণী , যা আমার সারা জীবন কাজে লেগেছে , তা আমার অর্ধেক বয়সী এক যুবকের কাছ থেকে পাওয়া। আমার প্রবাস জীবনের এক পর্যায়ে , ইলিয়াস বলে এক ড্রাইভারকে নিযুক্ত করেছিলাম , যার কাজ ছিল গাড়ি চালনো ও যুগপৎ আমাকে গাড়ি চালানো শেখানো। ওদেশে অফিস শুরু হতো সকাল সাড়ে সাতটায়, তাই সাত তাড়াতাড়ি অফিস বেরোতে হত। মাঝে মাঝেই হত, আমি অফিসের আলমারি বা চেষ্টে চাবিটা ভুল করে বাড়িতে ফেলে আসতাম, বেশিরভাগ সময় সেটা পরে থাকত আগেরদিনের ট্রাউজারের পকেটে। ফলে, ইলিয়াসকে আবার আমার কোয়ার্টারে গিয়ে চাবিটি নিয়ে আসতে হতো। একদিন সে আমাকে বলল, Mr Som ( ওদেশে প্রথম নামেই ডাকা রীতি, স্যার বা দাদা নয় ), the first thing you should do after returning home is to put the key
in your office bag !এই কথাটি এরপর থেকে মেনে চলে আর কখনো ঠোক্কর খেতে হয় নি।
তবে যাচিত অযাচিত সব পরামর্শ বা উপদেশ হোক কী অমূল্য বাণী হোক , যে কেবল বাইরের লোক দেয় , সে তো নয়, অভিভাবকরা তো স্রেফ অভিভাবক হওয়ার কারণেই দিয়ে থাকেন। দাম্পত্য সম্পর্কে উপদেশ প্রদান সাধারণত একমুখি হয় , পরিবার কাঠামোর ক্ষমতার প্রান্তে কে বেশি শক্তিশালী, সেই হিসাবে। তবে বাবা যদি উদারমনস্ক হন, তাহলে সন্তানের প্রতি তার উপদেশের ধরন অনেকটাই অন্যরকম হয় । আমাদের পাড়ার বাপ্পার গল্পটা শুনলেই ব্যাপারটা বোঝা যাবে ।
বাপ্পার বাবা পেশায় ইঞ্জিনিয়ার, মননে লিবারেল। ছেলের বয়স আঠেরো হতেই উনি ঠিক করলেন , পানশালার প্রথম পাঠটা, ছেলেকে উনিই শেখাবেন। শহরের একটা বড় রেস্তোরাঁয় সেই সহজপাঠ চলছিল , কোনো এক রবিবারে। কীভাবে গেলাস ধরতে হয়, কীভাবে চিয়ার্স বলতে হয় , হাভাতের মতো স্ন্যাক্স খেতে নেই, এসব শিক্ষাদানের পর, বাপ্পার বাবা বলেছিলেন , ড্রিঙ্ক করলে কখন থামতে হয় , সেটা জানাও খুব জরুরি। এই যে পাশের টেবিলে ভদ্রলোকের সামনে দুটো গ্লাস রাখা আছে , তুই যে মুহূর্তে এটাকে চারটা গ্লাস দেখবি, তখুনি বুঝে যাবি, আর নয় ! বাপ্পা নাকি তখন চোখ গোলগোল করে বলেছিল, কিন্তু পাশের আঙ্কেলের সমানে তো একটাই গ্লাস রাখা আছে !
পিতা পুত্রের প্রসঙ্গে নিজের আরো একটা ঘটনা মনে পড়ল। আমার ছেলে তখন ক্লাস থ্রিতে পড়ে। আমরা দুজনে কোথাও একটা যাচ্ছিলাম, রাস্তায় একটা জায়গা এবড়ো খেবড়ো ছিল ; ওকে বলেছিলাম , ওই বলেছিলাম ওই জায়গাটা এড়িয়ে যেতে। তার উত্তরে সে যা বলেছিল, সেটা শুনে আমি তাজ্জব হয়ে গিয়েছিলাম -আমাকে, স্পষ্ট ইংরেজিতে সে বলেছিল, জীবনের পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয় , আমাদের সামনে যদি দুটি পথ থাকে, একটি কঠিন ও একটি সহজ, আমাদের কঠিন রাস্তাটাই বরণ করা উচিত। বুঝতে পারলাম , ক্লাস টিচারের সদ্য বিবৃত কোনও পাঠ্যবস্তু থেকে সে আমাকে জীবনপাঠ শেখাচ্ছে !
অবশ্য পাঠ্যবস্তুতে কত কিছু লেখা থাকে, কেউ মানে, কেউ মানে না একেবারেই। সদা সত্য কথা বলিবে, না বলিয়া পরের দ্রব্য নিবে না , কাহাকেও ঠকাইও না, এইসব আপ্তবাক্য আমি আপনিও পড়েছি , বিজয় মালিয়া ( আবাপ মতে, মাল্য ) বা মেহুল চোস্কিও পড়েছে। অথবা, কুকথা বলতে নেই, শিক্ষকদের কাছে এই কথা শোনার সুযোগ না হলেও , বাড়ির অভিভাবকরা কি সদাব্রত মণ্ডলকে সেটা শেখান নি? কে জানে !
—oooXXooo—
![]()







