ঔঁ-জয়-জগদীশ
শুভ্র
ঔঁ :
অরূণার এখন বৃদ্ধত্ব এসেছে। এ সময়েই যেন সবকিছু ছেড়ে ছেড়ে যেতে থাকে ! স্মৃতি, কল্পনা, ভাবনা, এমন কি স্বপ্নগুলিও কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসে !
জীবনভর সংসারের জড়ো করা জিনিসপত্রগুলির কথা ভাবছিলেন অরূণা। তাঁকে প্রথমেই ছেড়ে গেল তাঁর স্বামী, নগেন্দ্র। ষাট বছরের বিবাহ বার্ষিকী পার করে সে চলে গেল অরূণাকে ছেড়ে।একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। এখন একলা জীবন চলছে তাঁর।
নগেন্দ্র আর ওর বিয়েতে পাওয়া আলমারি এখনও দাঁড়িয়ে আছে। আজও ওর হাতের পাট করা, অরূণার সে সব শাড়ি তেমনি ভাবেই রাখা আছে। অরূণা ভাবেন, নগেন্দ্র না থাকলেও তার স্মৃতি তো আছে। এই যে নগেন্দ্রর গায়ের সেই নীল শার্ট । সেটা এক বিবাহ বার্ষিকে অরূণা নিজে গিয়ে কিনে এনেছিল।
নগেন্দ্র সে দিন বলেছিল, এই শার্টটায় ওকে খুব মানিয়েছে! তারপর…তারপর আর কিছু তিনি স্মরণ করতে পারলেন না।
এরপর আজ বেশ কয়েক বছর পার হয়ে গেছে–এর মাঝে অরূণা আর একটাও শাড়ী কেনেননি। ওগুলির প্রয়োজন বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ফুরিয়ে আসছে। আজকাল ঘরের অনেক জিনিসপত্রই তাঁর কাছে বাড়তি লাগে।অবশ্য শরীর জানান দিয়েছে,
আর কটা দিন!তারপর সমস্ত জিনিসই তো পরিত্যক্ত হবে।তারপর অরূণা আর নগেন্দ্র নতুন করে শুরু করতে পারবে, তাঁদের সহজিয়া প্রেম। অপেক্ষা মাত্র নগেন্দ্রর সাথে দেখা হওয়ার।অপেক্ষা নগেন্দ্রর মতন তাঁর নামের আগে শুধু ‘ঔঁ’ বসার।
জয় :
–“মহাজন বাবু তোকে ডাকছে রে “,তরুর মা বলে ওঠে।
–“আমার যেতে ইচ্ছা করে না” তরু বলে।
–“কেন ? তুই কাজ করবি না?শোন কিচ্ছু শুনতে চাই না তোকে যেতেই হবে মহাজনের বাড়ি কাজে।
(এবার একটু নরম সুরে) ওদের বাড়ির কাজ করতেই হবে। না হলে পেট ভরবে কেমন করে বল !”
তরুর বাবা একটি জুট মিলে কাজ করত।কাজটা চলে যাবার পর অন্য কাজের জন্যে হন্নে হয়ে ঘুরত। পায়নি। শেষে মা মেয়েকেই ঝি এর কাজে নামতে হল।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও তরু মহাজনের বাড়ি কাজে এল। এমনিতে তরুকে রোজই আসতে হয়।মহাজন বাবু সুযোগ পেলেই তরুর দিকে কেমন যেন তাকায় ! মিটমিট হাসে। তরু বেশী পাত্তা দেয় না।মহাজন বাবু মাইনে দেবার দিন হটাৎ তার হাতটা ধরে !হাত ছাড়িয়ে নিয়ে,”কি বলবেন বলুন ?” তরু বলে।
–” মাথা ধরেছে।ভাবছি বিশ্রাম করব, ভিতরে চল কথা আছে।” বাবু বলে ওঠে।
ভর দুপুর।চারপাশ এমনি শান্ত। কেবল মহাজনের বসার ঘরের দরজা সামান্য ফাঁক করা।
“কি কথা,বলুন ?”
দুখী মুখ করে বাবু, বলল, “মাথাটা না খুব ধরেছে,একটু টিপে দিবি রে।”
তরু খানিক চুপ করে থাকে। ভাবল, বাবুর মনে কিছু ফন্দি নেই তো ? তবু ও নিজের শরীর বাঁচিয়ে বাবুর কপালে হাত রাখল।
আর আচমকাই ঘটনাটা ঘটে গেল। না, এমন না, বলে বাবু তরুকে একটানে বিছানায় ঠেলে দিল।
মুহূর্ত সময় তরু হতভম্ব হয়েগেছিল, পর মুহূর্তে নিজেকে সামলে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে বলে উঠলো, “এটা কি হচ্ছে বাবু !”
–“তোকে আমি ভালোবাসি রে।”
–“না, এমন ভালবাসায় কাজ নেই।”এক ঝটকায় বাবুর হাত সরিয়ে দিলো তরু।
–“যাস না, তোকে টাকা দেবো,অনেক টাকা!”
–“আমরা ঝিয়ের কাজ করলেও,কষ্ট, চাহিদা জয় করেও মানুষ। তুই তো একটা জানোয়ার।” বলেই হনহন করে বেরিয়ে গেল তরু।
জগদীশ :
সেদিন,ইউটিউবে পেঙ্গুইনদের জীবনধারা নিয়ে তৈরি একটা ডকুমেন্টারি দেখছিলাম।আর ভাবছিলাম,’মা’ এর রূপ যাই হোক। সে ‘মা’ ই হয়।সত্যি,ব্রহ্মাণ্ডের সকল ধরনের প্রাণীর কাছে মা হল একমাত্র জগদীশ্বর। ঠিক যেমন,আমরা অনেকই ছোটবেলায় মায়ের পায়ের উপর পা চড়িয়ে হাঁটতে শিখেছি। কি অদ্ভুদ,এখানেও মা পেঙ্গুইনও ঠিক একইভাবে তার বাচ্চাকে পায়ের উপর পা তুলে গুটিগুটি পায়ে হাঁটা শেখাচ্ছে। বাচ্চাকে দুপায়ের ফাঁকে নরম পশমে আগলে রেখে রক্ষা করছে ঠান্ডা বাতাস থেকে ।কোন কোন বাচ্চা যদি দলছুট হয়। হারিয়ে যায়। এন্টার্কটিকার তীব্র শীতে লড়াই করেও যদি শেষ পর্যন্ত হার মানে মৃত্যুর কাছে।তখন সেই পেঙ্গুইন মা আর বাবা তাদের ছোট্ট শিশুর গা ঘেষে দাঁড়িয়ে থাকে।ওরা মানুষের মত কাঁদতে পারে না।কিন্তু, অবিরাম ট্যাঁ ট্যাঁ শব্দ করে ডাকতে থাকে।মা পেঙ্গুইন ঠোঁট দিয়ে আঁচড় কেটে বারবার বুঝতে চেষ্টা করতে থাকে, বাচ্চাটা এখনো বেঁচে আছে কিনা।হয়ত তাঁর মন কিছুতেই মানতে চায় না। ঐ মৃত দেহটাকেও বুকের সাথে আগলে রেখে আদর করতে থাকে ।বাবা পেঙ্গুইন পিছন থেকে মা পেঙ্গুইনের পিঠে ঠোঁট বুলিয়ে সান্তনা দ্যায়।সেই মা মাথা নিচু করে চুপচাপ তার মৃত বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ ।অবশেষে, এক মায়ের করুণ চিত্কারে, মাথা নুইয়ে শোক প্রকাশ করে দলের অন্যেরাও।
—oooXXooo—

![]()







