ফসিল
নবকুমার চক্রবর্ত্তী (নবু)
“ফসিল—হৃদপিন্ডের কার্বন ডেটিং”
হোয়াট্স-অ্যাপ খুললেই আজকাল আর রক্তমাংসের মানুষ দেখা যায় না, দেখা যায় একগাদা ‘ফরওয়ার্ডেড’ আবর্জনা। ‘শুভ সকাল’ লেখা একটা টকটকে লাল গোলাপ ফুল, যার পাপড়িতে শিশিরবিন্দু এমনভাবে চকচক করছে যেন গ্রাফিক্স ডিজাইনারের পিসিতে তখন ওভারটাইমের মারাত্মক প্রেশার ছিল। কিংবা ‘শুভ সন্ধ্যা’, সঙ্গে ধোঁয়া ওঠা কফি—যে কফিটা আপনি জীবনেও খাননি, আর যিনি পাঠাচ্ছেন তিনিও খাচ্ছেন না; খাচ্ছেন হয়তো মুড়ি-চানাচুর দিয়ে বাসি চা। প্রেম শব্দটা আদতে বড্ড গোলমেলে, তাই না? আমরা প্রেম বলতে বুঝি ওই ডিজিটাল গোলাপ ফুল, ভ্যালেন্টাইনস ডের প্লাস্টিকের হৃদয়, আর ক্যাফে কফি ডে-র এসি মেশিনের শোঁ-শোঁ আওয়াজ। কিন্তু সব প্রেম কি এতটাই ধপধপে ফর্সা? এতটাই ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি মাখা? কিছু প্রেম থাকে যা ঘামের গন্ধে মাখা, ল্যাবরেটরির মতো কেমিক্যাল রিঅ্যাকশনে ভরা… আর ভয়ঙ্কর রকমের রিস্কি। যেন নাইট্রোগ্লিসারিন, একটু ঝাঁকুনি লাগলেই—বুম!
এই গল্পটা সেই ‘ঝকঝকে’ প্রেমের গল্প নয়। এটা মাটির তলার গল্প। আমাদের কলকাতার এক জরাজীর্ণ গলি, যেখানে রোদ ঢুকতে গেলে খোদ পুরসভার পারমিশন লাগে, সেখানকার এক পুরোনো বাড়ির একতলায় থাকে সুবিমল। নামের মানে সত্য, সুন্দর—কিন্তু নিউরোলজি আর জ্যোতিষশাস্ত্র মিলেমিশে বলে, এর মানে ‘সংকুচিত’ বা ‘সিক্রেটিভ’ও হতে পারে। সুবিমল চরিত্রটা অনেকটা কচ্ছপের মতো। বাইরে শক্ত খোলস, ভেতরে থলথলে আবেগ। পেশায় সে ট্যাক্সিডার্মিস্ট—না না, ট্যাক্সি চালায় না মশাই। সে মরা পশুপাখির চামড়া ছাড়িয়ে তাতে ভুসি ভরে জীবন্তের মতো সাজিয়ে রাখে। মিউজিয়ামের পেছনের অন্ধকার ঘরে তার বাস। তার কাজই হলো যা মরে গেছে, তাকে জোর করে বাঁচিয়ে রাখার ভান করা। সমাজের অধিকাংশ মানুষ যেমনটা করে আরকি!
আর গল্পের নায়িকা? অরুনিমা। যার নামের—মানে ‘অহং’ বা ‘অচেনা’। অরুনিমা নব্য কলকাতার প্রতীক। সাউথ সিটি মলের এসকেলেটর দিয়ে গড়িয়ে নামা চকমকে আধুনিকতা তার সর্বাঙ্গে। সে পিএইচডি করছে ‘শহুরে স্থাপত্যের বিবর্তন’ নিয়ে। বিষয়বস্তু সিরিয়াস, কিন্তু তার জীবনটা ইনস্টাগ্রাম রিলের মতো—১৫ সেকেন্ডের বেশি কোনো অনুভূতি সেখানে টেকে না।
ঘটনাটা শুরু হলো এই ভ্যাপসা গরমের দিনে। গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে টিভিতে আঁতেলরা যখন গালভরা বুলি আউড়াচ্ছে, তখন কলকাতার রাস্তায় পিচ গলে আস্ত আলকাতরা হয়ে যাচ্ছে। সুবিমলের ল্যাবরেটরিতে এসি নেই, আছে ফরমালিনের কটু গন্ধ আর ঝিম ধরা ফ্যান। অরুনিমা এসেছিল তার রিসার্চের কাজে, কিছু পুরোনো হাড়গোড়ের তথ্যের জন্য।
সুবিমল তাকে প্রথম দেখলো যেদিন, সেদিন কলকাতার তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি। অরুনিমার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সুবিমলের মনে হলো, ওই ঘামটুকু যদি শিশির হিসেবে শিশিতে ভরে রাখা যেত! এই যে প্রেমের শুরু, এটা কিন্তু ওই সিনেমার মতো ভায়োলিন বেজে ওঠা প্রেম নয়। এটা হলো মারাত্মক কোনো ব্যাকটেরিয়ার মতো। নীরবে শরীরে ঢোকে, তারপর একদিন মাল্টি-অর্গ্যান ফেলিওর, ব্যাস…….।
সুবিমল কথা বলে কম। তার চোখের নিচে কালশিটে, হাতে রাসায়নিকের দাগ। অরুনিমা তাকে দেখত একটা ‘কাজের লোক’ হিসেবে। “আরে দাদা, ওটা একটু বের করে দিন না,” বা “উফ, এই ধুলোয় আমি আর পারছি না”—এইটুকুই ছিল তাদের সংলাপ। সুবিমল শুনত। আর ভাবত, এই যে মেয়েটা এত কথা বলছে, ও কি জানে ও আসলে একটা হাড় আর মাংসের খাঁচা ছাড়া আর কিছু নয়? কিন্তু ওই খাঁচাটাই সুবিমলের কাছে তখন তাজমহল।
দিন যায়। সুবিমলের ডায়েরিতে অরুনিমার আসা-যাওয়ার সময়, তার লিপস্টিকের শেড, এমনকি সে কোনদিন টিফিনে কী এনেছে—সব নোট করা থাকত। এটা কি স্টকিং? উঁহু, সুবিমল বলবে—এটা ‘অবজারভেশন’। বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ। সে জানত, অরুনিমার একটা বয়ফ্রেন্ড আছে—নাম রঞ্জিৎ। মানে ‘রগচটা’ আর ‘রাজসিক’। রঞ্জিৎ বাইকে করে আসে, অরুনিমাকে তুলে নিয়ে যায়। বাইকের ধোঁয়া সুবিমলের নাকে লাগে। সুবিমল ভাবে, “ধোঁয়া তো উড়ে যায়, কিন্তু ছাইটা থেকে যায়। আমি হলাম সেই ছাইদানি।”
একদিন বিকেলে তুমুল কালবৈশাখী। লোডশেডিং। ল্যাবরেটরি অন্ধকারে ডুবে গেছে। অরুনিমা আটকা পড়ে গেছে সুবিমলের ডেরায়। বাইরে বাজ পড়ছে—কড়কড় কড়কড়! অরুনিমা ভয় পেয়ে বলল, “সুবিমলদা, মোমবাতি আছে?”
সুবিমল অন্ধকারে হাসল। সেই হাসিতে কোনো শব্দ ছিল না, ছিল একটা আদিম কৌতুক। বলল, “আলো দিয়ে কী হবে? অন্ধকারেই তো আসল সত্যটা দেখা যায়।”
অরুনিমা চমকে উঠল। গলার স্বরটা অন্যরকম।
সুবিমল এগিয়ে এল। হাতে একটা পুরোনো হাড়। বলল, “জানো অরুনিমা, এই হাড়টা কার? একটা হরিণের। ও যখন দৌড়াত, তখন ভাবত ও বাতাসের চেয়েও দ্রুত। এখন ও আমার টেবিলে, স্থির। প্রেমও তো এরকম, তাই না? দৌড়াতে দৌড়াতে একদিন থামতে হয়।”
অরুনিমা অস্বস্তি বোধ করল। “আমি… আমি বাড়ি যাব। রঞ্জিৎ ওয়েট করছে।”
“রঞ্জিৎ?” সুবিমল যেন শব্দটা চিবিয়ে খেল। “ও তো প্লাস্টিক। রিসাইকল করা যায়। কিন্তু আমি যা বানাই, তা পচে না। নষ্ট হয় না। ফসিল হয়ে যায়।”
এই গল্পের মোড়টা এখানেই। সুবিমল সেদিন অরুনিমাকে যেতে দিয়েছিল, কিন্তু অরুনিমার একটা ওড়না সে রেখে দিয়েছিল। ভুল করে ফেলে যাওয়া ওড়না? নাকি ইচ্ছে করে সরিয়ে রাখা? সেই ওড়নাটা সুবিমল তার রাসায়নিকের জারে চুবিয়ে রাখেনি, রেখেছিল তার বুকের কাছে। কিন্তু সমস্যা হলো, সুবিমলের প্রেমটা ছিল একমুখী বিক্রিয়া। অরুনিমা সেটা জানত না, বা জানতে চায়নি। উচ্চবিত্তের অহংকার আর মধ্যবিত্তের কুণ্ঠার মাঝখানের দেওয়ালটা ছিল বার্লিন প্রাচীরের মতো শক্ত।
সুবিমল একটা চিঠি লিখেছিল। সেই চিঠি, যেটা সে কোনোদিন পোস্ট করেনি। সেই চিঠির বয়ানটা ছিল অদ্ভুত। যেন কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক নিজে হাতে খননকার্য চালাচ্ছে নিজের বুকের ভেতর।
সে লিখছে…
“শোনো অরুনিমা, এই যে হাড়ভাঙা খাটুনি দেখছো আমার শরীরে, এই যে দিনশেষে জমে থাকা লোনা ঘাম… এর প্রত্যেকটা ফোঁটায় মিশে আছে এক টুকরো আনকোরা প্রেম। এখন এটা পবিত্র নাকি অপবিত্র— সেই বিশ্লেষণের ভারটা সম্পূর্ণ তোমার মর্জির ওপর ছাড়লাম। জানো? আমার এই না বলা প্রেমটা বড্ড ভারী। মনে হয় যেন হরপ্পার সেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা কোনো ফসিল। হাজার বছর ধরে মাটির নিচে যেমন হাড়গোড় জমে পাথর হয়ে যায়, আমার বুকের ভেতরের বোবা কান্নাগুলোও ঠিক তেমনই পাথর হয়ে গেছে। খুব… খুব সাধ ছিল বস… আমার সেই অলঙ্কৃত, সাজানো গোছানো প্রেমের কথাগুলো তোমাকে বলব। একদম নিভৃতে। যখন কেউ থাকবে না। কিন্তু সমস্যাটা হলো— তোমার ওই সাইলেন্স। আমি আজও বুঝলাম না, ওটা কি তোমার লজ্জা? নাকি আভিজাত্যের অহংকার? তবে একটা কথা স্বীকার করতেই হবে… তোমার ওই সলজ্জ কিংবা সগর্বিত শরীর… উফ! ওতে আমার একটা শিরশিরানি ছিল। একটা মারাত্মক শিহরণ। কিন্তু লাভ হলো কী? রাস্তার ধারে ফুটে থাকা অবহেলিত ফুল ফুটে থাকতে দেখেছো? অন্ধকারে যার রঙ কেউ চেনে না? আমি ঠিক ওই ফুলটার মতোই ঝরে গেলাম। তোমার পূজোর ফুলশয্যায়, বা তোমার বেডরুমের দামি ফুলদানিতে— আমার আর জায়গা হলো না।”
চিঠিটা অরুনিমা পেয়েছিল। কীভাবে? গল্পটা এখানেই ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে।
মাসখানেক পর। অরুনিমার বিয়ে ঠিক হয়েছে রঞ্জিতের সাথে। জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন। কিন্তু বিয়ের আগের দিন অরুনিমা হঠাৎ উবে গেল কর্পূরের মতো। পুলিশ এল, সিসিটিভি ফুটেজ চেক হলো। শেষ দেখা গেছে তাকে সেই পুরোনো মিউজিয়ামের দিকে যেতে। কেন গিয়েছিল? হয়তো সুবিমলকে বিয়ের কার্ড দিতে? নাকি নিজের অজান্তেই মৃত্যুর গহ্বরে পা দিতে?
পুলিশ যখন সুবিমলের ল্যাবরেটরিতে পৌঁছল, সুবিমল তখন শান্ত হয়ে বসে আছে। সামনে একটা বিশাল কাঁচের জার। তার ভেতর রাসায়নিকের দ্রবণে ভাসছে একটা অদ্ভুত সুন্দর জিনিস। না, কোনো মানুষের কাটা মুণ্ডু নয়, অতটা স্থূল সুবিমল নয়। সে ভাসিয়ে রেখেছে অরুনিমার সেই ফেলে যাওয়া ওড়নাটা, আর তার সাথে একটা মানুষের হৃদপিণ্ড।
পুলিশ অফিসার ধমক দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এটা কার হার্ট?”
সুবিমল শান্ত গলায় বলল, “এটা আমার। আমি তো আগেই বলেছিলাম, আমার প্রেমটা ফসিল হয়ে গেছে। আর ফসিলকে তো মিউজিয়ামেই সাজিয়ে রাখতে হয়, তাই না?”
সবাই ভাবল সুবিমল পাগল। ওকে মেন্টাল অ্যাসাইলামে নিয়ে যাওয়া হলো। কিন্তু গল্পের আসল টুইস্টটা কেউ ধরতে পারল না। ফরেনসিক রিপোর্টে দেখা গেল, ওই জারে রাখা হৃদপিণ্ডটা সুবিমলের নয়। ওটা আসলে একটা প্লাস্টিকের মডেল, যা সুবিমল নিখুঁত হাতে বানিয়েছিল। তাহলে আসল অরুনিমা কোথায়? সুবিমল কি তাকে মেরে ফেলেছে? নাকি লুকিয়ে রেখেছে?
না। সুবিমল অরুনিমাকে মারেনি। কিন্তু সে অরুনিমার মনে একটা চিরস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে দিয়েছে। বিয়ের কার্ডটা সুবিমলের টেবিলে পড়ে ছিল, আর তার নিচে লেখা ছিল— “জীবিত মানুষকে ভালোবাসা খুব রিস্কি, অরুনিমা। তারা বদলে যায়, বুড়ো হয়, বিশ্বাসঘাতকতা করে। তার চেয়ে স্মৃতিকে ভালোবাসা অনেক নিরাপদ। তুমি চলে যাও, কিন্তু তোমার এই ভয়টা, এই আতঙ্কটা—এটা আমার কাছেই থেকে গেল। আমি তোমাকে পেলাম না, কিন্তু তোমার ‘ত্রাস’টাকে আমি জয় করলাম।”
অরুনিমা ফিরে এসেছিল তিনদিন পর। অক্ষত শরীরে। কিন্তু তার চোখ দুটো মরে গিয়েছিল। সে আর কোনোদিন রঞ্জিতের দিকে তাকিয়ে হাসতে পারেনি। সুবিমল তাকে স্পর্শ না করেও, তার মানসিক অস্তিত্বটাকে যেন মমি করে দিয়েছিল। সে বুঝিয়ে দিয়েছিল, প্রেমের চেয়েও বড় হলো অধিকারবোধ—যা একবার গেঁথে গেলে আর বের করা যায় না।
বন্ধুরা, যে প্রেমিকের ফসিল হয়ে যাওয়া কান্না হাজার বছরের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে, সে যখন হঠাৎ মাটির নিচ থেকে উঠে আসে তার পাওনা কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নিতে… তখন সেটা আর রোমান্স থাকে না, হয়ে যায় এক হাড়হিম করা ‘ঝুঁকিপূর্ণ উপাখ্যান’। যাকে বলা যায় এককথায় “ফসিল”।
মানুষ ভাবে প্রেম মানে দুজন মানুষের মিলন। কিন্তু বিজ্ঞানের ভাষায়, প্রেম হলো মস্তিষ্কের ডোপামিন আর অক্সিটোসিনের খেলা। আর সুবিমল জানত, রাসায়নিক ফুরিয়ে গেলে খেলা শেষ। তাই সে রাসায়নিকের ওপর ভরসা না করে, ভয় আর সাইকোলজির ওপর ভরসা করেছিল। কারণ, প্রেম ভুলে যাওয়া যায়, কিন্তু হাড়হিম করা ভয়—সেটা তো আজীবন রক্তের সাথে মিশে থাকে, ঠিক যেন একটা জীবন্ত ফসিল।
“মনে রেখো, যাকে তুমি ছুড়ে ফেলছো আবর্জনা ভেবে, কার্বন ডেটিং করলে দেখবে—তার বুকের পাঁজরও কিন্তু হীরের চেয়ে কম দামি ছিল না।”
সমাপ্ত
![]()







