।। তোমাতে আমার ঠিকানা (দশম পর্ব) ।।
বারিদ বরণ
পিঙ্কির সেই মৃত্যুটা—
ওভাবে, আগুন আর ধোঁয়ার মধ্যে….সূচি নিজের চোখে দেখেছে।সেই মুহূর্ত থেকে যেন তার ভেতরে কিছু ভেঙে গেছে।
গত দু’সপ্তাহ সে ঘরের বাইরে পা রাখেনি।দিন-রাতের ফারাক মুছে গেছে তার কাছে।খাবার সামনে এলে কখনো দু’মুঠো খায়, কখনো স্পর্শও করে না।চোখ খোলা থাকলেও দৃষ্টি কোথাও আটকে থাকে,ঠিক যেন সেই আগুনের লেলিহান শিখাতেই।
রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়।দম আটকে আসে।
মায়ের হাত শক্ত করে ধরে ফিসফিস করে বলে—
“ওকে বাঁচানো যেত, মা… যেত না?”
মা সারাক্ষণ পাশে থাকে।কখনো চুলে হাত বুলিয়ে দেয়,
কখনো কিছু না বলে শুধু পাশে বসে থাকে।কথা বলার ভাষা যেন এখানে অপ্রয়োজনীয়।
বাড়িটা অদ্ভুতভাবে নীরব।যেন শব্দ করলেও কেউ ভেঙে পড়বে।বস্তির দিকের বারান্দার দরজাটা সেদিন থেকেই বন্ধ।বিমল বাবু নিজেই তালা লাগিয়েছেন।
ওই দিকটায় তাকালেই আগুন, কান্না, ছুটে বেড়ানো মানুষ—সব আবার ফিরে আসে।
তিনি জানেন,
এই বন্ধ দরজাটা শুধু বাইরে নয়,সুচির মনের ভেতরের দুঃস্বপ্নও কিছুটা আটকে রাখে।
কিন্তু কিছু দৃশ্য তালা মানে না।সেগুলো চোখ বন্ধ করলেও জেগে থাকে।এই দু’সপ্তাহে সূচি দুর্বল হয়নি শুধু শরীরে।সে যেন দ্রুত বড় হয়ে গেছে—নিঃশব্দে, যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে।আর সেই যন্ত্রণার গভীরে কোথাও একটা অপরাধবোধ তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে—
সে বেঁচে আছে, পিঙ্কি নেই।
ঘরের চার দেয়ালের মধ্যেই সূচির দিন কাটছে।
এই চারটে দেয়াল যেন তাকে আগলে রাখছে—আবার একই সঙ্গে বন্দীও করে রেখেছে।
মাঝে মাঝে ডাক্তার আসে।নাড়ি দেখে, চোখে আলো ফেলে, মায়ের দিকে তাকিয়ে কম গলায় কথা বলে—
“শরীরের থেকে মনটাই বেশি ক্লান্ত।”
কিছু ওষুধ লেখে, বিশ্রামের কথা বলে,কিন্তু ওর চোখে চোখ রেখে কিছুই জিজ্ঞেস করে না।
কারণ সবাই বুঝতে পারে—
এই অসুখের নাম কোনো প্রেসক্রিপশনে লেখা যায় না।
ডাক্তার চলে গেলে ঘরটা আবার আগের মতো নিস্তব্ধ।
ঘড়ির কাঁটা চলার শব্দটা পর্যন্ত কানে লাগে।জানালার বাইরে আলো বদলায়, দিন থেকে রাত হয়,কিন্তু সূচির ভেতরে সময় থেমে থাকে।
মা চুপচাপ বসে সেলাই করে,মাঝে মাঝে জল এগিয়ে দেয়। মাঝে মাঝে ঠাকুমা এসে মাথার কাছে বসেন। সুচির মাথায় সস্নেহে হাত বোলাতে বোলাতে বলেন,
” লড়তে হবে দিদিভাই, লড়াই করেই ন্যায় ছিনিয়ে আনতে হবে। কিন্তু তার জন্য তোমাকে যে আগে মানসিক ও শারীরিক ভাবে সুস্থ্য হতে হবে তাড়াতাড়ি।”
সূচি বুঝতে পারে সব, কিন্তু মুখে কিছু বলে না।
তার কথা বলার শক্তিটুকুও যেন আগুনে পুড়ে গেছে। চোখ দিয়ে গড়িয়ে আসে রক্তভেজা দুফোঁটা জল।
ঠাকুমা সযত্নে তার চোখের কোণা মুছিয়ে দেন। ঘরের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।
কখনো হঠাৎ তার মনে হয়—
এই ঘরটা যদি না থাকত,এই চার দেয়াল যদি তাকে আটকে না রাখত,সে হয়তো আবার দৌড়ে যেত বস্তির দিকে।আর সেই ভাবনাতেই সে আরও ভেঙে পড়ে।
চার দেয়ালের এই বন্দিত্বে।
সূচি শুধু অসুস্থ নয়—
সে ধীরে ধীরে নিজের সঙ্গে লড়াই করছে, বেঁচে থাকার মানে খুঁজে পাওয়ার জন্য।
বাইরের কারোরই এখন সূচির সঙ্গে দেখা করা বারণ।
ডাক্তার পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন—এই সময়ে কোনো উত্তেজনা নয়, কোনো প্রশ্ন নয়, কোনো নতুন খবর নয়।
বিমল বাবু তাই কঠোর হয়ে উঠেছেন। বাড়ির ভেতরে-বাইরে এক অদৃশ্য প্রাচীর তুলে দিয়েছেন যেন।
বাবার অবর্তমানে শুধু দু’দিন বাবু এসেছিল।
চুপচাপ..
মায়ের অনুমতি নিয়ে।
বাবুর কাছেই সূচি সব খোঁজ নিয়েছে।সে কথা বলার শক্তি পায়নি অনেকদিন, কিন্তু জানার তাগিদটা থামেনি।
প্রথম দিন বাবু যখন দরজার কাছে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল,
মা বলেছিলেন,
“আজ বেশি কথা নয়।”
সূচি চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিল।
বাবু খুব আস্তে বলল,
“দিদি তুমি ভালো আছো তো।”
সূচি কোনো উত্তর দেয়নি , চোখ মেলে বাবুর দিকে তাকিয়েছিল।
তবু বাবু যাওয়ার আগে সূচি খুব আস্তে ডেকেছিল,
“বাবু…”
শব্দটা ছিল ক্ষীণ, প্রায় শোনা যায় না,কিন্তু বাবু থেমে গিয়েছিল।সূচি চোখ না তুলেই প্রশ্ন করেছিল—
“ওরা… কেমন আছে?”
বাবু বুঝেছিল,
‘ওরা’ মানে বস্তির মানুষ।
সে ধীরে বলেছিল,
“কেউ কেউ আছে… অনেকেই নেই।”
একটু থেমে সূচি আবার জিজ্ঞেস করেছিল,
“ডিটেনশন ক্যাম্প?”
“হ্যাঁ,” বাবু বলেছিল,
“কিছু লোককে ওখানে রাখা হয়েছে, কিছু নিখোঁজ আর কিছুকে এখনো সনাক্ত করা যায়নি।”
সুচির মনের ভিতর টা কেমন যেনো মোচড় দিয়ে উঠলো।
হালকা গোঙানি,
“উফফফ……”
তারপর খুব আস্তে, প্রায় ফিসফিস করে—
“অভি…?”
এই নামটা উচ্চারণ করতেইসূচির গলা কেঁপে উঠেছিল।
বাবু চোখ নামিয়ে বলেছিল,
“ অভিদা রোজ যায়। কারো হাতে খাবার দেয়, কারো জন্য ওষুধ জোগাড় করে। ঠিক আছে…কিন্তু খুব ক্লান্ত দেখায় ওকে।”
সুচি আর কিছু বলেনি।শুধু চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়েছিল।
বাবু বুঝেছিল,
এইটুকু খবরই এখন তার ওষুধ।
দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সূচি মায়ের দিকে ফিরে বলেছিল,
“ওকে বলবে… যেন সাবধানে থাকে।”
মা কিছু বলেননি।
শুধু সূচির কপালে হাত রেখেছিলেন।
এই বাড়ির ভেতরে এখনো নীরবতা,কিন্তু সেই নীরবতার গভীরে সূচির মন বাইরে ছুটে বেড়ায়—
বস্তির ধ্বংসস্তূপে,ডিটেনশন ক্যাম্পের শীতল বাতাসে,
আর একটি ছেলে, অভির ক্লান্ত মুখের দিকে।
আর দ্বিতীয় দিন—
বাবু আবার এসেছিল।এবারও বাবার অবর্তমানে,
এবারও মায়ের অনুমতিতে।
সেদিন সূচি একটু সোজা হয়ে বসেছিল।শরীর দুর্বল, কিন্তু চোখে আগের দিনের মতো শূন্যতা নেই।
মা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল,কথার ভেতরে হস্তক্ষেপ করেনি।
বাবু চেয়ারে বসতেই সূচি নিজেই প্রশ্ন করেছিল,
“কাল রাতটা কেমন কেটেছে?”
বাবু বুঝেছিল—
এই প্রশ্ন কোনো ব্যক্তিগত নয়,এই প্রশ্নে গোটা বস্তি জড়ানো।
সে বলেছিল,
“গঙ্গার ধারে তো।তাই রাতে খুব ঠান্ডা পড়েছিল।
অনেক বাচ্চা কাঁদছিল।”
সূচির চোখে জল চলে এসেছিল।তবু সে থামেনি।
“পিঙ্কির মা?”
বাবু একটু থেমে বলেছিল,
“ও ভাঙা গলার মতো হয়ে গেছে… কথা বলে না।”
একটু চুপ।
তারপর সূচি খুব আস্তে জিজ্ঞেস করেছিল,
“আর… অভি?”
এইবার বাবু সরাসরি তাকিয়েছিল তার দিকে।
সে ধীরে বলল,
“আমি অভিদার সঙ্গে কথা বলেছি।”
সূচির বুকটা একটু কেঁপে উঠল,কিন্তু সে কিছু বলল না।
“আমি ওকে তোমার শরীরের অবস্থার কথা জানিয়েছি,”
বাবু বলল।
“বলেছি—তুমি এখনো পুরোপুরি ভালো নও,ডাক্তার বাইরে বেরোনো বারণ করেছেন।”
সূচি নিঃশ্বাস ফেলল।এই কথাটা তার দরকার ছিল।
বাবু একটু থেমে আবার বলল,
“কিন্তু ওটা বলেই থামতে পারিনি।”
সূচি তাকাল।
“অভিদা খুব দুশ্চিন্তায় আছে,”
বাবু বলল।
“তোমাকে নিয়ে,আর বস্তির মানুষদের নিয়েও।”
সূচি চোখ নামিয়ে বলেছিল,
“ওকে বলো… আমি ঠিক হয়ে যাবো।”
তারপর একটু নিস্তব্ধতা, ঘড়ির কাঁটার টিকটিক। বাইরে টুং টুং করে একটা রিক্সা চলে গেলো।
ঘরের পরিবেশ টা যেন ভারী হয়ে উঠল।
বাবু আবার বলল,
“দাদা দিনে ক্যাম্পে যাচ্ছে,রাতে পড়াশোনা আর টিউশন।
ঘুম ঠিকমতো হচ্ছে না।
মুখে কিছু বলে না,কিন্তু ও ভেঙে পড়ছে সূচি দি—
ভেতরে ভেতরে।”
সূচির চোখ জ্বালা করতে লাগল।
“ও ভাবছে….”
বাবু বলল,একটু থেমে,
“এই সব কিছুর দায় যেন ওরই।পিঙ্কির মৃত্যু,মানুষগুলোর কষ্ট—সব।”
একটা দীর্ঘ নীরবতা নেমে এল।
সূচি খুব আস্তে বলল,
“আমি চাইনি ও এতটা ভেঙে পড়ুক।”
বাবু মাথা নাড়ল।
“কিন্তু দাদা তো এমনই।যেখানে দায় নেবার কথা নেই,
সেখানেও নিজের কাঁধ বাড়িয়ে দেয়।”
সূচি জানালার দিকে তাকাল।
বাইরের আলো ম্লান।আজ সে স্পষ্ট বুঝল—
দুজনেই আলাদা আলাদা ঘরে বন্দী,কিন্তু একই যন্ত্রণায় পুড়ছে।
বাবু উঠতে উঠতে বলল,
“আমি যতটা পারি ওকে সামলানোর চেষ্টা করছি।
কিন্তু কিছু লড়াই…
নিজেকেই লড়তে হয়।”
মা হঠাৎ কাছে এসে দাঁড়ালেন।কথা বদলে দিতে চাইলেন।বাবু উঠে দাঁড়ানোর সময় সূচি আবার ডাকল,
“বাবু…”
“একটু দাঁড়াও।”
সে থামল।
গলাটা এখনো দুর্বল,কিন্তু কথাগুলো পরিষ্কার।
সূচি বালিশের কোণটা শক্ত করে ধরে একটু শক্তি সঞ্চয় করে তারপর ধীরে ধীরে বলল—
“অভিকে বলবে…
ও নিজেকে যেনো অকারণে দোষ না দেয়।এক মুহূর্তের জন্যও না।”
বাবু চুপ করে শুনছিল।
সূচি আবার বলল,
“বলবে—
ও যা করছে ঠিকই করছে।মানুষের পাশে দাঁড়ানো কোনো অপরাধ নয়।”
একটু থেমে সে চোখ নামাল।
তারপর যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলছে,
“আর বলবে…
আমি ভেঙে পড়িনি।শুধু কিছু দৃশ্য এখনো চোখের সামনে ভাসে। এখনো সেই মানসিক যন্ত্রণা থেকে বেরিয়ে আসতে পারিনি। তাই নিজেকে গুছিয়ে নিতে একটু সময় নিচ্ছি মাত্র।”
বাবু মাথা নাড়ল।
সূচি শেষ কথাটা বলল খুব আস্তে,কিন্তু সবচেয়ে জোর দিয়ে,
“ও কিন্তু একা নয়—
এই কথাটা যেন ও ভুলে না যায়।”
বাবু মাথা নাড়ল।
সে বুঝেছিল—এই কথার মানে শক্ত হওয়া নয়,এই কথার মানে লড়াইয়ের প্রস্তুতি।
“আর ওকে বলবে,নিজের শরীরটা যেন একটু খেয়াল রাখতে। ওর কিছু হয়ে গেলে আমি যে বড্ড একা হয়ে পড়বো।”
এইটুকু কথা বলতেই সূচি হাপিয়ে উঠলো।
মা এগিয়ে এলেন,
“বাবু এবার তুমি এসো।”
তিনি বুঝে গেছেন যে এর থেকে বেশি উত্তেজনা সুচির শরীর ও মন জনতার জন্যই ভালো নয় এখন।
বাবু চলে গেলো।যাওয়ার আগে সে শুধু বলে গেলো,
“আমি ঠিক তোমার কথাগুলো দাদার কাছে পৌঁছে
দেব।”
দরজা বন্ধ হলে, সূচি চোখ বন্ধ করল।
এই প্রথম দু’সপ্তাহে তার বুকের ভেতর একটু হালকা বাতাস ঢুকেছিল।
তার মনের কথা অভিকেল পৌঁছে দেওয়া গেছে—
এইটুকুই এখন তার শক্তি।
অনেকদিন পর বারান্দার দরজার ছিটকিনি টা খুলতে গিয়ে সূচির হাত কেঁপে উঠেছিল।
মা কিছু বলেননি, শুধু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
জানতেন, এই মুহূর্তটা আটকানো যায় না।
বারান্দায় পা দিতেই একরাশ শূন্যতা চোখে পড়ল।
যেখানে একসময় টিনের ছাউনি ঝিলমিল করত,
কাপড় ঝুলত,বাচ্চাদের হাসি ভেসে আসত—আজ সেখানে শুধু কালচে দাগ, পোড়া কাঠ,আর ধ্বংসের নীরব সাক্ষ্য।
হাওয়া বইছে,
কিন্তু তাতে আর রান্নার গন্ধ নেই,নেই ভাতের হাঁড়ির শব্দ।
শুধু ছাইয়ের সঙ্গে মিশে থাকা এক অচেনা পোড়া গন্ধ।
সূচি বারান্দার রেলিংয়ে হাত রাখল।
ঠান্ডা লোহার ছোঁয়া তাকে কাঁপিয়ে দিল। সন্ধ্যার হিমেল বাতাসও তার একবুক শূন্যতা কে ছুটে পারল না।
চোখের সামনে হঠাৎ ভেসে উঠল পিঙ্কির মুখ—ধুলো মাখা, ভয় পাওয়া,
তারপর আগুন। কালো হয়ে যাওয়া দুটো কচি হাত।
সূচি চোখ বন্ধ করল।
এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল,কিন্তু সে কাঁদল না।
তার মনে পড়ল—অভি ঠিক এমনই জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল,মানুষকে সাহস দিচ্ছিল,নিজে কাঁপলেও অন্যদের ভরসা হচ্ছিল।
সে ফিসফিস করে বলল,
“আমি ফিরে এসেছি।”
এই কথাটা কার উদ্দেশে—নিজের জন্য,পোড়া বস্তির জন্য,না কি সেই মানুষগুলোর জন্য যারা আর নেই—
তা সূচি নিজেও জানে না।
কিন্তু আজ,এই বারান্দায় দাঁড়িয়ে সে বুঝল—
ভয় এখনো আছে,কষ্ট এখনো আছে,তবু পালিয়ে থাকার দিন শেষ।
সূচি ধীরে ঘরের ভেতরে ফিরল।চোখে এখনো আগুনের ছবি,কিন্তু বুকের ভেতরে একটা কঠিন সিদ্ধান্তের জন্ম নিচ্ছে।
এই বারান্দায় সে আবার আসবে।শুধু দেখার জন্য নয়—
লড়াই করার জন্য।
সেই মুহূর্তে ঘরের দরজা ঠেলে বিমল বাবু ভেতরে ঢুকলেন।প্রত্যেক দিন রাতে বাড়ি ফিরেই বিমল বাবু সোজা সুচির ঘরে যান।
এটা এখন তাঁর অভ্যাস নয়—দায়িত্ব।
ঘরে ঢুকলে তিনি আর সেই কঠিন ব্যবসায়ী মানুষটা থাকেন না।টাই খুলে চেয়ারের হাতলে রাখেন,
চশমাটা খুলে টেবিলে নামিয়ে দেন।কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকেন।
সুচি তখনো অনেক সময় কথা বলে না।কখনো বই হাতে,
কখনো জানালার দিকে তাকিয়ে।
বিমল বাবু জিজ্ঞেস করেন,
“আজ কেমন আছিস?”
প্রশ্নটা খুব সাধারণ,কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে
অগণিত দুশ্চিন্তা।
সুচি কখনো শুধু বলে,
“আছি।”
কখনো একটু বেশি বলে ফেলে—
“আজ বারান্দায় গিয়েছিলাম।”
এইটুকুতেই বিমল বাবুর বুকটা ধক করে ওঠে।
তবু কিছু বলেন না।জানেন, এই যাওয়াটা দরকার ছিল।
কিছুক্ষণ পর তিনি বলেন,
“ডাক্তার আবার ফোন করেছে।বলেছে ধীরে ধীরে বাইরে যাওয়ার কথা ভাবতে।”
সুচি তাকায়।চোখে প্রশ্ন,কিন্তু প্রতিবাদ নেই।
বিমল বাবু উঠে পড়ার সময় প্রতিদিন একই কাজ করেন।
মেয়ের কপালে হাত রাখেন।
এই হাত রাখার ভেতরে ক্ষমতা নেই,নির্দেশ নেই—
আছে একটাই কথা,
যা তিনি মুখে বলতে পারেন না—
“আমি আছি।”
বিমল বাবু আজ উঠে পড়ার আগেই সূচি হঠাৎ প্রশ্নটা করে ফেলল—
“পুলিশ… কিছু করেছে?”
গলাটা শান্ত, কিন্তু ভেতরে চাপা কাঁপুনি।
বিমল বাবু একটু থামলেন।
এই প্রশ্নটা যে একদিন আসবেই,তিনি জানতেন।
চেয়ারের হাতলে আঙুল ঠুকতে ঠুকতে বললেন,
“তদন্ত চলছে।”
সূচির চোখে সঙ্গে সঙ্গে সন্দেহ জ্বলে উঠল।
সে ধীরে বলল,
“মানে?”
বিমল বাবু নিঃশ্বাস ফেললেন।এবার আর এড়ালেন না।
“এফআইআর হয়েছে।কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
কিন্তু…”
তিনি থামলেন।
সূচি তাকিয়ে রইল।
“কিন্তু বড় কেউ এখনো ধরা পড়েনি,”
তিনি সত্যিটা বললেন।ঘরে হালকা একটা ভারী নীরবতা নেমে এল।
সূচি খুব আস্তে বলল,
“তাহলে যারা এটা করলো…
তারা এখনো বাইরে ঘুরছে?”
বিমল বাবু চোখ নামালেন।
এটাই ছিল উত্তর।
সূচির বুকের ভেতর আবার সেই পুরোনো আগুনের ছবি জ্বলে উঠল।তবু সে নিজেকে সামলাল।
“তুমি চিন্তা কোরো না,”
বিমল বাবু বললেন,
“আমি আইনের পথেই থাকবো।”
সূচি তাকিয়ে বলল,
“আইনের পথ যদি থেমে যায় বাবা, তাহলে?”
এই প্রশ্নটার কোনো প্রস্তুত উত্তর বিমল বাবুর কাছে ছিল না।তিনি শুধু বললেন,
“তুমি আগে ভালো হও।”
বিমল বাবু একটু থেমে আবার কথা বললেন। গলার সুরটা এবার আগের চেয়ে দৃঢ়।
“আজ শুভময়বাবুর সঙ্গে আবার কথা হয়েছে,”
তিনি বললেন।
সূচি তাকাল। চোখে কৌতূহল, সঙ্গে চাপা আশঙ্কা।
“উনি বলছেন,শুধু থানার তদন্তে ভরসা করলে হবে না।
পুলিশের যে নিষ্ক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে—
সেটাকেই কোর্টে চ্যালেঞ্জ করতে হবে।”
সূচি ধীরে বসল সোজা হয়ে।
বিমল বাবু বললেন,
“আমরা হাইকোর্টে আবেদন করবো।
পুলিশ ঠিকমতো কাজ না করলে উচ্চতর তদন্ত চাইবো।”
ঘরটা হঠাৎ যেন একটু বড় হয়ে গেল। চার দেয়ালের ভেতরে আইনের ভাষা ঢুকে পড়ল।
সূচি জিজ্ঞেস করল,
“এতে কি সত্যিই কিছু বদলাবে?”
বিমল বাবু সরাসরি তাকালেন।
“আইন ধীরে চলে, কিন্তু একবার নড়লে ওকে থামানো সহজ নয়।”
সূচি নিঃশ্বাস ছাড়ল।
এই প্রথম সে বুঝল—লড়াইটা শুধু রাগের নয়, এই লড়াইয়ের একটা পথ আছে।
সে আস্তে বলল,
“আমি সাক্ষী দিতে পারবো।”
এই কথাটা শুনে বিমল বাবু চমকে উঠলেন।
“এখন না,”
তিনি দ্রুত বললেন,
“এখন তোমার শরীর আর মন, এই দুটোই আগে।”
সূচি আর তর্ক করল না। কিন্তু মনে মনে ঠিক করে ফেলল,
সময় এলে সে পিছিয়ে থাকবে না।
বিমল বাবু উঠে দাঁড়ালেন।
যাওয়ার আগে বললেন,
“শুভময়বাবু কাল আবার ফোন করবেন।
এরপর যা হবে,
সব খোলাখুলি বলবো।”
ঘর থেকে বেরোনোর আগে বিমল বাবু নিজে থেকেই ঘুরে দাড়ালেন। কথাটা বললেন।
এবার আর গলা ঘুরিয়ে নয়—সোজাসুজি।
“একটা কথা তোমাকে জানাই,”
তিনি বললেন।
সূচি তাকাল।
“বস্তির মানুষজন এখন ডিটেনশন ক্যাম্পে আছে।
সবাই ছড়িয়ে পড়েনি—ওখানেই রাখা হয়েছে।”
একটু থেমে তিনি যোগ করলেন,
“আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। খাবার, ওষুধ, কাপড়,
যেটুকু দরকার, ব্যবস্থা করছি।”
সূচির চোখে বিস্ময় নয়, বরং গভীর মনোযোগ।
“আর… টাকার অভাব যেন না হয়, সেটাও দেখছি,”
বিমল বাবু বললেন।
“সবাইকে তো ফিরিয়ে দিতে পারবো না, কিন্তু অন্তত না খেয়ে যেন না থাকে।”
সূচির বুকটা কেঁপে উঠল।এই কথাগুলো সে বাবার মুখে আগে খুব কমই শুনেছে।
সে খুব আস্তে বলল,
“ওরা শুধু সাহায্য নয় বাবা…
ন্যায় চায়।”
বিমল বাবু মাথা নাড়লেন।
“আমি জানি।”
দরজার কাছে গিয়ে তিনি থামলেন।এক মুহূর্ত দেরি করে বললেন,
“তুমি ভেবো না, এই দায়িত্ব আমি এড়াবো না।”
কিন্তু বিমল বাবু একটা কথা বলতে পারলেন না। কিছুটা ইচ্ছে করেই বলেননি তিনি।
তিনি বলেননি—
অভির সঙ্গে তাঁর সেই কথোপকথনের কথা।
যে কথোপকথনে তিনি একটা ছেলের সামনে একটা পাহাড় তুলে ধরেছিলেন।
তিনি বলেননি—অভিকে যে চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন, সে কথা।
ঘর থেকে বেরোনোর সময়একবারও তাঁর মুখে আসেনি
অভির নাম।কারণ এই কথাটা বললে সূচির চোখে তিনি আর সুরক্ষার প্রতীক হয়ে থাকতে পারতেন না।
বিমল বাবু জানতেন—
মেয়ের ভেতরে এখনো আগুন জ্বলছে। এই মুহূর্তে যদি সে জানতে পারে অভিকে “যোগ্যতা প্রমাণ”-এর নামে
এক অসম লড়াইয়ে ঠেলে দেওয়া হয়েছে,তাহলে সে থামবে না।
তিনি এটাও জানতেন—
অভি চুপ করে মেনে নেবে।অভি কখনো অভিযোগ করবে না।এই চ্যালেঞ্জটাকে নিজের ভাগ্য হিসেবেই মেনে নেবে।
বিমল বাবু জানতেন,
তিনি একজন ঘাঘু ব্যবসায়ী, ঝুঁকি কাকে কতটা নিতে হয়,ভালোই বোঝেন।কিন্তু সেদিন গাড়িতে বসে এক মুহূর্তের জন্য তার নিজের মনেই প্রশ্ন উঠেছিল—
তিনি কি খুব বেশি দূর চলে গেছেন?
তারপরই তিনি নিজেকে বোঝান।এই পৃথিবী আদর্শে চলে না।স্ট্যাটাস, শক্তি, সামর্থ্য, এই নিয়মেই চলে।
আর অভির মতো ছেলেদের জন্য এই নিয়ম ভাঙার একটাই রাস্তা—নিজেকে অস্বীকার না করে নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়া।
এই কথাগুলো তিনি সূচিকে বলতে পারেননি।শুধু দরজার বাইরে দাঁড়িয়েএক মুহূর্ত থেমেছিলেন।
ভেতরে মেয়ের নিঃশ্বাসের শব্দ,আর নিজের বুকের ভেতর একটা অস্বস্তিকর নীরবতা, এই দুইয়ের মাঝেই
বিমল সেন বুঝেছিলেন, তিনি শুধু একজন বাবা নন,
একজন বিচারকও হয়ে উঠেছেন।
আর সেই বিচারের রায় এখন অভির জীবনের ঘাড়ে
চুপচাপ ঝুলে আছে।
দরজা বন্ধ হয়ে গেলে ঘরে আবার নীরবতা নামে।
কিন্তু সেই নীরবতা আর আগের মতো শূন্য নয়।
কারণ প্রতিদিন রাতে এই ঘরটায় এসে একজন বাবা
নিজের সমস্ত অহংকার রেখে শুধু বাবা হয়ে বসে থাকেন।
সূচি চুপ করে বসে রইল।
আজ তার বাবাকে সে নতুন করে চিনল।
এই প্রথম মনে হলো—যে মানুষটা এতদিন শুধু ক্ষমতা আর সম্পদের ভাষা বুঝত,আজ সে ধ্বংসস্তূপের মানুষের ভাষাও শুনছে।
আর সেই উপলব্ধিটাই সূচির ভিতরের শক্তিটাকে আরও একটু দৃঢ় করে তুলল।
পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা বিরুদ্ধে আইনের কথা শুনে তার আশঙ্কা পুরোপুরি যায়নি,কিন্তু এই প্রথম তার মনে হল, অন্ধকারের ভেতর কোথাও একটা জানালা খুলছে।
সকালের আলো আজ অনেকদিন পর সূচির ঘরে একটু বেশি ঢুকেছে।দু’সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চার দেয়ালের মধ্যে বন্দী থাকার পর আজ তার মনে অদ্ভুত এক অস্থিরতা—আজ সে কলেজে যাবে।
আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে শাড়ি পরছিল সূচি।শরীর এখনো দুর্বল, হাঁটলেও মাঝে মাঝে মাথা হালকা হয়ে আসে।তবু আজ তার মনে হচ্ছে—এই ঘরের মধ্যে আর থাকা যাচ্ছে না।
ঠিক তখনই দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন মালবিকা।
“তুই কি সত্যিই বাইরে যাবি?”
কণ্ঠে উদ্বেগ স্পষ্ট।
সূচি হালকা হেসে বলল,
“মা, কলেজটা ঘুরে আসবো। এতদিন পরে… একটু বেরোতে ইচ্ছে করছে।”
মা মাথা নাড়লেন,
“না, এখনো শরীরটা ঠিক হয়নি। ডাক্তারও তো বলেছে বিশ্রাম নিতে।”
এমন সময় পাশের ঘর থেকে ঠাকুমাও এসে দাঁড়ালেন।
চোখে স্নেহ, কিন্তু কণ্ঠে কঠোরতা,
“এই অবস্থায় কোথাও যাওয়া হবে না।আর কয়েকটা দিন ঘরে থাক।”
ঘরের ভেতর আবার সেই পুরোনো বন্দিত্বের অনুভূতি নেমে এল।এই সময় নিচ থেকে সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলেন বিমল বাবু।
ঘরে ঢুকেই তিনি একবার মেয়ের দিকে তাকালেন।
চোখে ক্লান্তি আছে, কিন্তু আজ সেই পুরোনো দৃঢ়তাও একটু ফিরে এসেছে।
মালাবিকা বললেন,
“ও আবার কলেজে যেতে চাইছে। তুমি বলো না—এই অবস্থায় কি বাইরে যাওয়া উচিত?”
বিমল বাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
“যেতে দাও।”
মা আর ঠাকুমা একসাথে অবাক হয়ে তাকালেন।
বিমল বাবু শান্ত গলায় বললেন,
“শরীরের যতটা অসুখ ছিল, ডাক্তার দেখছে।
কিন্তু মনের অসুখটা…”
তিনি একটু থামলেন।
“ওটার নিয়ন্ত্রণ ওকেই আনতে হবে।”
ঘরে নীরবতা নেমে এল।
তিনি আবার বললেন,
“ঘরের মধ্যে আটকে রাখলেও আরও ভেঙে পড়বে।
বাইরে যাক, মানুষজনের মধ্যে থাকুক।”
তারপর সূচির দিকে তাকিয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন,
“তবে সাবধানে যাবে।বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি ফিরে আসবে।”
সূচির চোখে হালকা জল এসে গেল।সে কিছু বলল না, শুধু মাথা নাড়ল।
মা ধীরে ধীরে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।তিনি জানেন—বিমল বাবু যখন এভাবে বলেন, তখন সিদ্ধান্ত বদলায় না।
কিছুক্ষণ পর সূচি ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগল।
সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিল সূচি।দু’সপ্তাহ পরে বাড়ির ভেতরের এই পরিচিত পথটাও যেন তার কাছে নতুন লাগছিল।
শরীর এখনো একটু দুর্বল, তাই ধীরে ধীরে পা ফেলছিল সে।
ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে ছিলেন বিমল বাবু।তিনি চুপচাপ মেয়েকে দেখছিলেন।দরজার কাছে পৌঁছতেই তিনি বললেন,
“শোনো সূচি।”
সূচি থামল, ফিরে তাকাল।
বিমল বাবু খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন,
“তোমার গাড়িটা নিয়ে যাও।”
সূচি একটু অবাক হয়ে বলল,
“না বাবা… আমি নিজেই চলে যাব। এতদিন পরে একটু হাঁটতেও ইচ্ছে করছে।”
বিমল বাবু মাথা নাড়লেন।
“না, এখনো শরীর পুরোপুরি শক্ত হয়নি।গাড়ি নিয়েই যাও।”
কথাটার মধ্যে আদেশের সুর খুব জোরালো ছিল না,
বরং একটা চাপা উদ্বেগ ছিল।
তিনি আবার বললেন,
“ড্রাইভার তোমাকে কলেজে নামিয়ে দেবে।ফিরতেও নিয়ে আসবে।”
সূচি কিছুক্ষণ বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।সে বুঝতে পারছিল—এই কঠোর মানুষটার ভেতরে একটা অদ্ভুত নরম চিন্তা কাজ করছে।
সে আর তর্ক করল না।হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“ঠিক আছে বাবা।”
বিমল বাবু দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে দারোয়ানকে ডাকলেন।
“গাড়িটা বার করো।”
দু’সপ্তাহ পর বাড়ির বড় দরজা দিয়ে বাইরে পা রাখতেই
তার মনে হলো, দুনিয়াটা যেন হঠাৎ অনেক বড় হয়ে গেছে।আর সেই বড় পৃথিবীর কোথাও অভি নিশ্চয়ই আছে।এই ভাবনাটা তার বুকের ভেতর আস্তে করে আলো জ্বালিয়ে দিল।
কিছুক্ষণ পর কালো গাড়িটা গেটের সামনে এসে দাঁড়াল।
সূচি ধীরে ধীরে গাড়িতে উঠল।
গাড়ি যখন বাড়ির বিশাল গেট পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল,তার মনে হলো,
এতদিনের বন্দিত্বের পর আজ যেন আবার জীবনের দিকে একটা ছোট্ট দরজা খুলে গেল। আর সেই দরজার ওপারেই অজান্তেই তার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল,
” আজ কি কলেজে অভির সঙ্গে দেখা হবে?”
গাড়ি কলেজের গেটের সামনে এসে থামল।
সূচি ধীরে ধীরে নামল। ড্রাইভার গাড়িটা এক পাশে সরিয়ে রাখল, কিন্তু সূচি তখন আর সেদিকে তাকায়নি।
কলেজের লোহার গেটটা পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই তার মনে হলো,
আজ যেন এই জায়গাটা সম্পূর্ণ নতুন। এই তো সেই একই পথ, যে পথ দিয়ে সে প্রতিদিন ক্লাসে যেত।
একই পুরোনো বিল্ডিং,একই গাছপালা,একই করিডোরে ছাত্রছাত্রীদের ভিড়।তবু আজ সবকিছু যেন একটু অন্যরকম।
দু’সপ্তাহ আগে পর্যন্ত এই জায়গাটা ছিল তার খুব পরিচিত।হাসি, আড্ডা, ক্লাস, বই, ভবিষ্যতের স্বপ্নে ভরা।
কিন্তু আজ…
সবকিছুর মাঝখানে দাঁড়িয়েও সে যেন নিজেকে একটু আলাদা মনে করল।মাঠের ধারে পুরোনো বটগাছটার দিকে তাকিয়ে তার মনে পড়ল—
সেই দিনগুলো,যখন ওখানেই বসে অভি বই নিয়ে পড়ত।
মাঝে মাঝে সূচি এসে পাশে বসত।
একটা হালকা বাতাস এসে তার চুলগুলো এলোমেলো করে দিল।
সূচির মনে হলো—
এই কয়েকটা দিনে যেন অনেক বছর কেটে গেছে।
ক্যাম্পের মানুষের কান্না,পিঙ্কির নিথর মুখ,
আগুনে পুড়ে যাওয়া বস্তি, সব স্মৃতি যেন এখনও তার ভেতরে ধোঁয়ার মতো ভাসছে।
তবু এই কলেজের আঙিনায় দাঁড়িয়ে একটা অন্য অনুভূতিও ধীরে ধীরে ফিরে আসছিল।এটাই সেই জায়গা
যেখান থেকে নতুন করে পথ শুরু করা যায়।
সূচি ধীরে ধীরে সামনে এগোল।
তার চোখ অজান্তেই চারদিকে খুঁজছিল, কোনোও একজনকে।
হয়তো বটগাছের নিচে…
হয়তো করিডোরের শেষ মাথায়…
অভি কি আজ কলেজে এসেছে?
বটগাছটার নিচে এসে সূচি ধীরে বসে পড়ল।
এই গাছটার সঙ্গে যেন তার অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
মাটির উপর ছায়াটা আজও ঠিক আগের মতোই পড়ে আছে, শুধু তার নিজের মনটাই যেন বদলে গেছে।
সে চুপচাপ বসে রইল।
সকালের কলেজ চত্বর তখন ধীরে ধীরে জেগে উঠছে।
এক এক করে ছাত্রছাত্রীরা আসছে।কেউ তাড়াহুড়ো করে ক্লাসে ঢুকছে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে হাসতে হাসতে আড্ডা দিচ্ছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই চারপাশে ভিড় বাড়তে লাগল।
কথাবার্তার শব্দ, হাসির আওয়াজ, সাইকেলের ঘণ্টা, সব মিলিয়ে কলেজটা যেন আবার তার চেনা কোলাহলে ভরে উঠল।
কিন্তু সেই ভিড়ের মধ্যে যে মুখটা খুঁজছিল সূচি, সেটা কোথাও দেখা গেল না।
সূচি একটু সোজা হয়ে বসলো। চোখ দিয়ে আবার চারপাশটা খুঁজে নিল।
না…
অভি নেই।
তার মনে হালকা একটা অস্থিরতা দোলা দিল।
আজ কি তাহলে অভি কলেজে আসেনি?
হয়তো ডিটেনশন ক্যাম্পে গেছে…
হয়তো আবার কোনো দরকারে কোথাও ছুটছে…
সূচি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
অভিকে আজ তার অনেক কিছু বলার ছিল। সে বলতে চেয়েছিল,সে আর ভয় পাবে না। বস্তির মানুষদের জন্য যে লড়াইটা শুরু হয়েছে সেখান থেকে সে আর পিছিয়ে আসবে না।
আর একটা কথা…
যেটা সে এতদিন নিজের কাছেও পুরোপুরি স্বীকার করেনি।
তারপর তারা দুজনে একসাথে ডিটেনশন ক্যাম্পে যাবে,
মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াতে।এই ভাবনাটা তার মনে গত দুদিন ধরে বারবার এসেছে।
কিন্তু আজ…
অভি নেই।
বটগাছের পাতার ফাঁক দিয়ে রোদ পড়ছে তার মুখে।
চারপাশে কোলাহল বাড়ছে,কিন্তু সূচির মনে যেন একটা নীরবতা নেমে এসেছে। সে আস্তে করে নিজের হাতদুটো জড়িয়ে ধরল।
ঠিক তখনই..,
পেছন থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল,
“সূচি… তুই এখানে বসে আছিস?”
সূচি একটু চমকে পেছন ফিরে তাকাল…
সূচি পেছন ফিরে তাকাতেই দেখল অনুমিতা দাঁড়িয়ে আছে।
অনুমিতার চোখে স্পষ্ট উদ্বেগ।
সে এগিয়ে এসে একটু নিচু গলায় বলল,
“তোর শরীর ঠিক আছে তো?”
সূচি হালকা করে মাথা নাড়ল। মুখে একটা মৃদু হাসি আনার চেষ্টা করল, যদিও সেই হাসির ভেতরে ক্লান্তির ছাপ এখনও রয়ে গেছে।
অনুমিতা চারপাশে একবার তাকিয়ে বলল,
“এখানে বসে আছিস যে? চল, ওদিকে। ক্লাস তো শুরু হয়ে যাবে।”
সূচি একটু থামল।
অজান্তেই তার চোখ আবার কলেজের গেটের দিকে চলে গেল।
হয়তো এখনই…
হয়তো ঠিক এই মুহূর্তে অভি ঢুকবে…। বই হাতে, সেই চেনা তাড়াহুড়ো পায়ে। কিন্তু গেটের সামনে শুধু ছাত্রছাত্রীদের ভিড়। অভির চেনা অবয়ব কোথাও নেই।
সূচি আস্তে বলল,
“এই যাচ্ছি…”
সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
বটগাছের ছায়াটা পেছনে পড়ে রইল।আর একবার গেটের দিকে তাকাল সূচি। চোখে একফোঁটা অদ্ভুত অপেক্ষা নিয়ে। তারপর অনুমিতার পাশে হাঁটা শুরু করল।
কলেজের করিডোরে তখন কোলাহল বাড়ছে। ক্লাসের ঘণ্টা বাজতে আর বেশি দেরি নেই।
দুজন পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গেল।
কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে সূচির মনে বারবার একটা প্রশ্নই ঘুরে ফিরে আসছিল,
” আজ অভি কলেজে এল না কেন?”
সে জানেই না,
এই মুহূর্তে অভি হয়তো আবার কোথাও লড়ছে,কারও পাশে দাঁড়াচ্ছে।আর সেই লড়াইয়ের পথই অদৃশ্যভাবে তাদের দুজনের জীবনের পথকে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে দিচ্ছে।
দু’টো ক্লাস কোনোমতে করল সূচি।
শিক্ষকের কথা কানে ঢুকছিল,কিন্তু মন যেন কোথাও স্থির হচ্ছিল না।
খাতায় কলম চলছিল ঠিকই,
তবু তার দৃষ্টি বারবার জানালার বাইরে চলে যাচ্ছিল।
অভি কি আজ কলেজে এলই না?
ক্লাস শেষ হতেই আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না সে।ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল করিডোরে। তার পা যেন নিজে থেকেই বটগাছটার দিকে এগিয়ে গেল।
এই সময়ে অভির ক্লাস থাকে না। সাধারণত ও এখানেই বসে পড়ে। বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে, চারপাশের কোলাহল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
সূচি এসে থামল।
বটগাছের ছায়া আগের মতোই পড়ে আছে।মাটিতে কয়েকটা শুকনো পাতা উড়ছে।কিন্তু আজ সেখানে
অভি নেই।
সূচির বুকের ভেতরটা হঠাৎ যেন ফাঁকা হয়ে গেল।
সে একটু দাঁড়িয়ে রইল।চারদিকে তাকাল।
না… কোথাও নেই।
তার মনে অদ্ভুত একটা অস্থিরতা জমতে লাগল।
আর এখানে বসে থাকার মতো মন তার রইল না।
ধীরে ধীরে গেটের দিকে এগিয়ে গেল সে। বাইরে গাড়িটা অপেক্ষা করছিল।
ড্রাইভার দরজা খুলে দিল।
সূচি গাড়িতে উঠে বসে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর হঠাৎই বলল,
“চলো… ডিটেনশন ক্যাম্পে যাবো।”
ড্রাইভার একটু অবাক হয়ে তাকাল।
“এখন, দিদিমণি?”
সূচি জানালার বাইরে তাকিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল,
“হ্যাঁ… এখনই।”
ড্রাইভার একটু আমতা আমতা করে বলল,
“কিন্তু বড় সাব…”
সূচি বুজলো সে কি বলতে চাইছে।
“বাবাকে আমি বলে দেবো যা বলার, তুমি এখন চলো দেখি। আর দেরি করো না।”
গাড়িটা ধীরে ধীরে কলেজের গেট ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল।
সূচির মনে তখন একটাই ভাবনা ঘুরছিল, অভি যদি কোথাও থাকে, তবে সে নিশ্চয়ই ওই মানুষগুলোর মধ্যেই আছে।
ডিটেনশন ক্যাম্পের সেই অসহায় মানুষগুলোর পাশে।
গাড়িটা ডিটেনশন ক্যাম্পের কাছে এসে থামল।
চারদিকে ধুলো উড়ছে।খোলা মাঠের মধ্যে তড়িঘড়ি করে টাঙানো ত্রিপলের তাঁবু, কোথাও বাঁশের খুঁটি, কোথাও ছেঁড়া কাপড় দিয়ে বানানো অস্থায়ী ঘর। একটু দূরেই গঙ্গার পার। ভাটার টানে জল অনেক দূরে চলে গেছে, সামনে শুধুই কাদা মাটি।
দূর থেকেই মানুষের ক্লান্ত মুখগুলো চোখে পড়ছিল।
সূচি ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামল।
আর নামতেই যেন হঠাৎ একটা সাড়া পড়ে গেল।
কোথা থেকে কয়েকটা বাচ্চা দৌড়ে এলো।তারপর একে একে কয়েকজন মহিলা, কয়েকজন বয়স্ক মানুষও এগিয়ে এল।
মুহূর্তের মধ্যে সূচিকে ঘিরে ধরল তারা।
কেউ বলল,
“দিদিমণি এসেছে… দিদিমণি এসেছে!”
একটা ছোট মেয়ে তার শাড়ির আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে পড়ল। ক্লান্ত, ধুলো মাখা মুখগুলোতে হঠাৎ যেন একটু আলো ফুটে উঠেছে।
যেনো অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ কেউ একটা প্রদীপ জ্বালিয়ে দিয়েছে।
একজন বয়স্ক মহিলা কাঁপা গলায় বললেন,
“দিদিমণি… তুমি এলি মা…”
তার চোখ ভিজে উঠেছে।
আরেকজন বলল,
“তুমি না এলে আমাদের কে দেখবে মা?”
সূচির বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল।
এই মানুষগুলো…
এরা এখনও তাকে ভরসা করে।
সে চারদিকে তাকাল।কত চেনা মুখ।
কিন্তু সেই মুখগুলো আজ ভেঙে গেছে, ক্লান্ত, দিশেহারা।
হঠাৎ তার মনে পড়ল একটা প্রশ্ন।
সে দ্রুত জিজ্ঞেস করল,
“অভি কোথায়?”
মানুষগুলোর ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন বলল,
“ও তো সকাল থেকেই এখানে ছিল দিদিমণি…”
আরেকজন বলল,
“সকাল থেকে এদিক-ওদিক দৌড়াচ্ছে…
কারও জন্য ওষুধ আনছে, কারও জন্য খাবারের ব্যবস্থা করছে…”
একটা ছোট ছেলে হাত তুলে দূরের একটা তাঁবুর দিকে দেখিয়ে বলল,
“ওইদিকে গেছে দাদা…”
সূচির চোখ সেদিকে চলে গেল।
সূচি বাচ্চাগুলোর দেখানো দিকে তাকিয়েই তাকে দেখতে পেল।ত্রিপলের একটা ছাউনির পাশে ঝুঁকে বসে আছে অভি।একটা বৃদ্ধ লোকের হাত ধরে কী যেন বোঝাচ্ছে।
মাঝে মাঝে পাশের একটা ছেলেকে কিছু আনতে বলছে।
ধুলো মাখা জামা, চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ, তবু সেই চেনা দৃঢ়তা এখনও অটুট।
অভিকে দেখামাত্র সূচির বুকের ভেতরটা হঠাৎ আলোয় ভরে উঠল। কয়েকদিনের অস্থিরতা, উদ্বেগ—সব যেন এক মুহূর্তে মিলিয়ে গেল।
সে প্রায় অজান্তেই একটু দ্রুত পা বাড়াল।
ঠিক তখনই অভি মাথা তুলে তাকাল।
আর মুহূর্তের মধ্যে তার চোখে পড়ল,সূচি।
সে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়াল।
মুখে স্পষ্ট বিস্ময়।
“সূচি… তুমি!”
কথাটা প্রায় চিৎকারের মতো বেরিয়ে এল তার মুখ থেকে।পরের মুহূর্তেই তার চোখে উদ্বেগ ভেসে উঠল।
সে দ্রুত এগিয়ে এল।
“তুমি এখানে কেন এসেছো? তোমার তো শরীর এখনও পুরো ভালো হয়নি!”
সূচি হালকা হেসে বলল,
“আমি ঠিক আছি।”
তার চোখে তখন এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতা।
যেন অনেকদিন পরে হারানো কাউকে খুঁজে পেয়েছে।
“তুমি কলেজে আসোনি কেন?”
সে একটু অভিমান মেশানো গলায় বলল।
অভি এক মুহূর্ত চুপ করে রইল।তার চোখে হঠাৎ যেন এক ছায়া নেমে এল।সে তাকিয়ে রইল সূচির দিকে,কিন্তু সেই দৃষ্টির মধ্যে অদ্ভুত এক দ্বন্দ্ব।
কয়েকদিন আগে বিমল সেনের গাড়ির ভেতরে বসে শোনা কথাগুলো হঠাৎ যেন আবার তার কানে বাজতে লাগল,
“সুচির পাশে দাঁড়ানোর যোগ্যতা তোমার নেই।”
আর সেই কথার পর নিজের জেদের মাথায় বলা প্রতিশ্রুতি,
“আমি সেই যোগ্যতা ছিনিয়ে আনব।”
অভির বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।একদিকে সূচির সুস্থ হয়ে ওঠা—যাকে দেখে তার মনে এক অদ্ভুত স্বস্তি জেগে উঠছে।অন্যদিকে সেই কঠিন বাস্তবতা—যে লড়াইটা এখন তাকে জিততেই হবে।
তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য সেই দ্বিধা স্পষ্ট হয়ে উঠল।
সূচি সেটা টের পেল।
সে একটু কাছে এসে ধীরে বলল—
“কি হলো? এমন করে দেখছো কেন?”
অভি হালকা হাসল।কিন্তু সেই হাসির মধ্যে কোথাও একটা চাপা কষ্ট লুকিয়ে রইল।
“কিছু না…”
সে আস্তে বলল।
“তুমি সুস্থ্য হয়ে গেছ… সেটাই সবচেয়ে বড় কথা।”
সূচি তখনও বুঝতে পারেনি,এই মুহূর্তে অভির মনে
একসাথে দুটো যুদ্ধ চলছে।
একটা এই মানুষগুলোর জন্য।আর একটা নিজের ভবিষ্যৎ আর ভালোবাসার জন্য।
আর এই দুই যুদ্ধের মাঝখানেই তাদের সম্পর্কটা দাঁড়িয়ে আছে।
সূচি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল অভির সামনে। তার চোখে তখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি।অনেকদিনের অস্থিরতার পর যেন সে ঠিক জায়গাটা খুঁজে পেয়েছে।
কিন্তু অভির আচরণটা যেন অন্যরকম।সে একটু অস্থির হয়ে চারদিকে তাকাল।মনে হলো যেন ইচ্ছে করেই নিজেকে সামলে নিচ্ছে।
তারপর শান্ত গলায় বলল,
“সূচি… তুমি বাড়ি যাও।”
সূচি অবাক হয়ে তাকাল।
“কেন?”
অভি একটু থামল, তারপর বলল,
“তোমার শরীর এখনো পুরো ভালো হয়নি। এখানে এত ধুলো, এত ভিড়… তোমার পক্ষে ভালো নয়।”
সূচির ভ্রু কুঁচকে গেল।
“আমি ঠিক আছি অভি।”
অভি মাথা নাড়ল।
“না… তুমি বুঝতে পারছো না।”
তার গলায় একটা অদ্ভুত কঠোরতা চলে এল—যা সে নিজেও হয়তো চায়নি।
“এখানে অনেক কাজ আছে। পরে আমরা কথা বলব… ঠিক আছে?”
সূচি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
এই ক’দিনে সে অভিকে অনেকবার কল্পনা করেছে,
দেখা হলে কত কথা বলবে ভেবেছে।কিন্তু এই কথাটা সে আশা করেনি।
অভির চোখে চোখ রাখতেই তার মনে হলো, অভি যেন ইচ্ছে করেই দূরত্ব তৈরি করছে। কিন্তু কেন?
সে ধীরে বলল,
“তুমি কি আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছো?”
অভি একটু চমকে উঠল।
“না… তা কেন করব?”
সূচি মৃদু স্বরে বলল,
“তাহলে এমন বলছো কেন?”
অভি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।তার চোখে তখন আবার সেই দ্বন্দ্ব।একদিকে এই মেয়েটা,যে নিজের সবকিছু ছেড়ে এই মানুষগুলোর জন্য দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে বিমল সেনের সেই কথাগুলো, যেন তার আত্মসম্মানকে চ্যালেঞ্জ করে গেছে।
সে হঠাৎ অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,
“সূচি… এখন সময়টা অন্যরকম।”
তার গলাটা একটু ভারী হয়ে উঠল।
“এই মানুষগুলো এখন আমাকে বেশি দরকার।”
সূচি ধীরে বলল,
“আমাকে না আমাদের?”
অভি এক মুহূর্ত থেমে গেল।
তারপর আবার নিজেকে শক্ত করে বলল,
“তুমি বাড়ি যাও। বিশ্রাম নাও। পরে… সব কথা হবে।”
সূচি আর কিছু বলল না।
কিন্তু তার চোখে হালকা একটা কষ্টের রেখা ফুটে উঠল।
সে আর বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। কষ্ট হচ্ছে তার। তাই কথা না বাড়িয়ে সে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
গাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল।
অভি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে মোচড় দিয়ে উঠছিল।
সে জানে,এই দূরত্বটা সে ইচ্ছে করেই তৈরি করছে।
কারণ এখন সে শুধু ভালোবাসার কথা ভাবলে চলবে না।
এখন যে তাকে প্রমাণ করতে হবে—
সে সত্যিই সেই যোগ্যতা অর্জন করতে পারে কিনা।
বস্তির আগুনের ঘটনার পর কেটে গেছে কয়েকটা সপ্তাহ।
কিন্তু তদন্তের নামে পুলিশের কাজকর্ম দেখে কারও মনেই ভরসা জন্মায়নি।প্রথম দু-একদিন অনেক পুলিশ আসা-যাওয়া করেছে,কাগজে খবর বেরিয়েছে,ক্যামেরা নিয়ে টিভি চ্যানেলও এসেছে।
তারপর সব যেন ধীরে ধীরে থেমে গেছে।অনেক মৃতদেহ এখনও ঠিকমতো শনাক্ত হয়নি,অনেক মানুষ নিখোঁজ—
তবু তদন্ত যেন এগোচ্ছে না।
এই অবস্থাতেই বিমল বাবু আর তাঁর উকিল বন্ধু শুভময় চৌধুরী সিদ্ধান্ত নেন আর অপেক্ষা করা যাবে না।
তারা সরাসরি উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন।
পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে
একটি আবেদন দায়ের করা হয়।কয়েকদিন পর মামলাটি শুনানির জন্য ওঠে।
সেদিন আদালতে শুভময় বাবু যেভাবে যুক্তি সাজিয়ে কথা বললেন,তা অনেককেই অবাক করেছিল।
তিনি একে একে তুলে ধরলেন,
ঘটনার আগেই বস্তির মানুষদের হুমকি দেওয়া হয়েছিল,
স্থানীয় গুন্ডাদের নাম অভিযোগে রয়েছে,তবু পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেয়নি।
তারপর তিনি আদালতের দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বললেন,
“মাই লর্ড,
এই ঘটনা শুধু একটি অগ্নিকাণ্ড নয়।
এটি পরিকল্পিত অপরাধ হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
কিন্তু তদন্তের গতি এবং পুলিশের ভূমিকা দেখে আমাদের আশঙ্কা হচ্ছে সত্যিটা হয়তো চাপা পড়ে যেতে পারে।”
তিনি আরও বললেন,
“যদি তদন্ত এইভাবেই চলতে থাকে,তাহলে প্রকৃত অপরাধীরা আইনের আওতার বাইরে থেকে যাবে। তাছাড়া যাদের নামে অভিযোগ, তারা কেউ কেউ শাসক দলের কর্মী বলেই পরিচিত। সেখানে পুলিশ কতটা নিরপেক্ষ তদন্ত করবে সে সন্দেহ থেকেই যায়।
সেই কারণেই আমরা চাই—এই মামলার তদন্ত একটি স্বাধীন সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হোক।”
আদালত কক্ষে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা।
শুনানি শেষ হওয়ার পর অনেকেই ফিসফিস করে বলছিল, মামলাটা হয়তো বড় মোড় নিতে চলেছে।
বিমল বাবু আদালত চত্বর থেকে বেরিয়ে এসে
গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে গভীর চিন্তায় ডুবে ছিলেন।
শুভময় বাবু ধীরে এসে পাশে দাঁড়ালেন।
“কি মনে হচ্ছে?”
বিমল বাবু জিজ্ঞেস করলেন।
শুভময় বাবু একটু হেসে বললেন,
“এখনই কিছু বলা যায় না…
কিন্তু যেভাবে শুনানি হলো,আমার মনে হচ্ছে আদালত বিষয়টাকে খুব গুরুত্ব দিয়েছে।”
একটু থেমে তিনি আরও বললেন,
“খুব সম্ভব…
তদন্তটা শেষ পর্যন্ত সিবিআইয়ের হাতেই যেতে পারে।”
বিমল বাবু চুপ করে রইলেন।
দূরে কোথাও হালকা বাতাস বইছিল।
এই মামলাটা এখন আর শুধু একটা বস্তির আগুনের ঘটনা নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে ক্ষমতা, রাজনীতি, আর অসংখ্য অসহায় মানুষের ভবিষ্যৎ।
আর সেই লড়াই এখন আদালতের দরজায় পৌঁছে গেছে।
এদিকে সেদিন ডিটেনশন ক্যাম্প থেকে ফিরে আসার পর সূচি আর অভির কথাটা তেমন এগোয়নি।গাড়িতে বসে ফেরার সময় বারবার সেই দৃশ্যটাই তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল,
অভির মুখটা, তার গলায় অদ্ভুত সেই সংযম, আর যেন ইচ্ছে করেই দূরত্ব রেখে কথা বলা।
প্রথমে সূচি ভেবেছিল,হয়তো অভি খুব ক্লান্ত ছিল।
হয়তো পরিস্থিতির চাপে কথা বলতে পারেনি।
কিন্তু ধীরে ধীরে সে বুঝতে শুরু করল,অভি যেন সত্যিই তাকে এড়িয়ে চলছে।
কলেজে মাঝে মাঝে অভিকে দেখা যায়, কখনো লাইব্রেরির সামনে, কখনো সেই বটগাছের নিচে।
কিন্তু সূচি এগিয়ে গেলেই অভি যেন খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে অন্য প্রসঙ্গ তোলে, কিংবা কোনো অজুহাতে উঠে যায়।
একদিন তো সূচি দূর থেকে দেখল,
অভি তাকে দেখেও অন্য দিকে চলে গেল।
মুহূর্তের জন্য তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল।
তবু সে কিছু বলল না।
অভির স্বভাব সে জানে,কোনো কথা জোর করে তার মুখ থেকে বের করা যায় না।তাই সূচি নিজের মনটাকে অন্য দিকে ঘোরানোর চেষ্টা করল।
সে আবার নিয়মিত কলেজ যেতে শুরু করল।
ক্লাস, লাইব্রেরি—সবকিছুতে নিজেকে ডুবিয়ে রাখল।
সন্ধ্যার পর আবার শুরু হলো তার টিউশন। বস্তির যে কয়েকটা বাচ্চা আগেও তার কাছে পড়ত, তাদের জন্য এখন নতুন করে একটা ছোট্ট পড়ার জায়গার ব্যবস্থা করেছে সে।
ডিটেনশন ক্যাম্পের পাশেই একটা খোলা জায়গায়
বাঁশ আর ত্রিপল দিয়ে ছোট্ট একটা ঘর বানানো হয়েছে।
সন্ধ্যা নামলেই সেখানে জড়ো হয় বাচ্চাগুলো।
সূচি নিজের হাতে তাদের পড়ায়—কখনো অক্ষর, কখনো অঙ্ক, কখনো শুধু গল্প বলে।
আর দিনের বেলায় সে ঘুরে ঘুরে বস্তির মানুষদের খোঁজ নেয়।কেউ অসুস্থ হলে ডাক্তার আনার ব্যবস্থা করে,কারও খাবারের অভাব হলে নিজের বাড়ি থেকে পাঠায়।
বিমল বাবুও নীরবে এইসব কাজে সাহায্য করছেন।
এই সর্বহারা মানুষ গুলোও যেনো বাঁচার তাগিদেই এই নতুন পরিবেশ ও পরিস্থিতির সাথে নিজেদেরকে অদ্ভুত ভাবে মানিয়ে নিতে লাগলো।
কিন্তু সূচি জানে—
এই মানুষগুলোকে আবার দাঁড় করাতে হলে তাদের সাহস ফিরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু এই লড়াইটা শুধু টাকার জোরে জেতা যাবে না। তাই আইনি লড়াই টাও লরে যেতে হবে।
এই কাজের মধ্যেই নিজেকে ব্যস্ত রাখে সূচি।
কিন্তু কখনো কখনো…
রাত গভীর হলে,সব কাজ শেষ হয়ে গেলে,তার মনে একটাই প্রশ্ন ভেসে ওঠে—
অভি কেন এমন বদলে গেল?
সে কি সত্যিই দূরে সরে যাচ্ছে?
নাকি তার ভিতরে এমন কিছু চলছে যার কথা সে কাউকে বলছে না?
উত্তরটা সে জানে না। কিন্তু উত্তর টা তাকে যে জানতেই হবে। অভি তো বলবে না মুখ ফুটে । তবে উপায়……
হঠাৎ করেই সুচির মাথায় খেলে গেলো, একজনের নাম,
শুভ দা।
একমাত্র শুভদাই বলতে পারবে কেনো অভি তার সাথে এইরকম আচরণ করছে। সুচির দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে অভির জীবনে খারাপ ভালো যায় ঘটুক না কেন , সে একমাত্র শুভদা কেই তার মনের কথা বলে।
পরেরদিন বিকেলে কলেজ ছুটি হওয়ার পর সূচি অনেকক্ষণ বটগাছটার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
অভি আজও আসেনি।একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে গাড়িতে উঠে বসল।
ড্রাইভার ভেবেছিল সে নিশ্চয়ই ডিটেনশন ক্যাম্পে যাবে।
কিন্তু সূচি ধীরে বলল—
“চলো… অভির মেসের দিকে।”
গাড়ি একটু এগিয়ে গেল।সূর্যের আলো তখন নরম হয়ে এসেছে।অভির মেসটা খুবই সাধারণ—একতলা পুরোনো বাড়ি, উঠোনে একটা আমগাছ, পাশে টিনের ছাউনি দেওয়া রান্নাঘর।
গাড়ি থামতেই সূচি নেমে পড়ল। রান্নাঘরের পাশে সিঁড়ি বিয়ে সে দোতলায় উঠে গেলো।
এই সময় অভি থাকে না, সে জানে।অভি এই সময়ে টিউশন পড়াতে যায়।
ঘরের দরজা টা ভেজানো ছিল। ঠেলে ঢুকতেই সে দেখলো, শুভদা একটা মাটির চেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়ছিল।
সূচিকে দেখে সে একটু অবাক হলো।
“আরে! তুমি?”
সূচি একটু মৃদু হাসল।
“অভি নেই… জানি।”
শুভদা বুঝতে পারল,আজ অন্য কোনো কথা আছে।
সে চুপচাপ আরেকটা চেয়ার এগিয়ে দিল।
“বসো মা।”
“এখন শরীর কেমন আছে?”
“একটু ভালো আছি।” সূচি উত্তর দিলো।
কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলল না।
জানলা দিয়ে হালকা বাতাস বইছিল, উঠোনের আম গাছটার পাতা নড়ছিল আস্তে আস্তে।
শেষে সূচিই কথা শুরু করল।
“শুভদা… একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
“করো।”
“অভি কি আমাকে এড়িয়ে চলছে?”
প্রশ্নটা খুব শান্ত গলায় বলা,কিন্তু তার ভেতরে জমে থাকা কষ্টটা লুকোনো ছিল না।
শুভদা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
সে যেন ভেবে নিচ্ছিল,কতটা বলা উচিত।
তারপর ধীরে বলল,
“হ্যাঁ… কিছুটা।”
সূচি মাথা নিচু করল।
“কেন?”
শুভদা একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“কারণটা তুমি না… মা।”
সূচি মাথা তুলল।
“তাহলে?”
শুভদা একটু ধীরে ধীরে বলল—
“ তুমি যখন অসুস্থ্য ছিলে… তোমার বাবার সঙ্গে অভির দেখা হয়েছিল।”
সূচি চমকে উঠল।
“বাবার সাথে?”
শুভদা মাথা নাড়ল।তারপর সে পুরো ঘটনাটা বলল—
রাস্তার ধারে গাড়ি থামানো,বিমল সেনের শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ কথা,স্ট্যাটাসের পার্থক্য,আর সেই চ্যালেঞ্জ।
সব শুনে সূচি স্তব্ধ হয়ে বসে রইল।
শুভদা আবার বলল,
“তোমার বাবা খুব বুদ্ধিমান মানুষ।তিনি অপমান করেননি… কিন্তু এমনভাবে কথা বলেছেন—যাতে অভির ভিতরে একটা আগুন জ্বলে ওঠে।”
“কেমন আগুন?”
“নিজেকে প্রমাণ করার আগুন।”
শুভদা একটু থেমে বলল,
“অভি এখন নিজেকে একটা লড়াইয়ের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।”
“কোন লড়াই?”
“নিজের সাথে।”
সে আবার বলল,
“ওর মনে হচ্ছে..,.
যতদিন না সে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারছে,
ততদিন তোমার কাছে আসার অধিকারও তার নেই।”
সূচির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
শুভদা শান্ত গলায় বলল,
“তাই সে দূরে থাকছে।”
“তোমাকে এড়িয়ে নয়…
নিজেকে শক্ত করার জন্য।”
শুভদা একটু থেমে বলল,
“আর আমি অভিকে যতটুকু বুঝেছি সেই বিশ্বাস থেকেই বলছি, অভি তোমাকে নিজের থেকেও বেশি ভালবাসে। আমি তো ওকে দেখেছি ,বুঝেছি । তোমার অসুস্থ্যতা তাকে কতটা যন্ত্রণা দিয়েছে। প্রত্যেক টা দিন শুধু তুমি কেমন আছো জানার চেষ্টা করেছে। সে তোমার বাড়িতেও গিয়েছিল। কিন্তু দারোয়ান ঢুকতে দেয়নি।”
শুভদা থামলেন।
” তাই তার ভালবাসা নিয়ে কোনো সন্দেহ রেখো না মা।”
আকাশে তখন সন্ধ্যার আলো নামতে শুরু করেছে।
সূচি অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তার চোখে তখন আর কষ্ট নেই…
বরং এক অদ্ভুত দৃঢ়তা।আর আছে অভির প্রতি আবেগ আর শ্রদ্ধা।
সে ধীরে বলল—
“শুভদা… অভি ভুল ভাবছে।”
“কেন?”
সূচি উঠে দাঁড়াল।
তার গলায় আবার সেই পরিচিত শক্তি ফিরে এসেছে।
“কারণ এই লড়াইটা ওর একার নয়। আর আমি তো ওর স্ট্যাটাস দেখে ওর হাত টা ধরিনি।”
হালকা বাতাসে আমপাতা আবার কেঁপে উঠল।
শুভদা বুঝতে পারল,
গল্পটা এখন নতুন দিকে মোড় নিতে চলেছে।
সূচি যাওয়ার আগে শুধু বলল,
” আমি ওর এই ভুল ধারণা ভাঙবই দাদা। তবে এটুকু জেনে রাখুন ,আমি সারাজীবন ওর পাশে থাকব। ওর দুর্বলতা হয়ে নয় ,বরং ওর শক্তি হয়ে।
পরের দিন সকাল থেকেই সূচির মনে এক অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করছিল।গতকালের কথা গুলো সারারাত তার মাথার ভেতর ঘুরেছে—শুভদার বলা প্রতিটি শব্দ।
আজ আর সে অপেক্ষা করবে না।
কলেজে গিয়ে সে প্রথমেই সেই পুরোনো বটগাছটার দিকে গেল।
যেমনটা সে ভেবেছিল,অভি সত্যিই সেখানে বসে আছে।
মাটিতে পাতা খাতা আর বই,মুখটা গম্ভীর, চোখ দুটো বইয়ের পাতায় গেঁথে আছে।
সূচি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।
অভি প্রথমে খেয়াল করেনি।
তারপর মাথা তুলতেই সূচিকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটু চমকে উঠল।
“তুমি?”
সূচি মৃদু হেসে বলল,
“হ্যাঁ, আমি।”
অভি একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেল।
“তোমার তো এখন ক্লাস…”
“আজ ক্লাসের থেকে জরুরি একটা কাজ আছে।”
“কি কাজ?”
সূচি সোজা তার সামনে বসে পড়ল।
কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর সূচি খুব শান্ত গলায় বলল,
“কাল আমি তোমার মেসে গিয়েছিলাম।”
অভির চোখে বিস্ময়।
“মেসে?”
“হ্যাঁ। শুভদার সাথে কথা হয়েছে।”
অভির মুখটা একটু শক্ত হয়ে গেল।
সে বুঝতে পারল,সবকিছুই এখন সূচি জানে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর সে ধীরে বলল,
“জানতেই যখন পেরেছ… তাহলে নিশ্চয়ই বুঝেছ কেন আমি দূরে থাকছি।”
সূচি মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ, বুঝেছি।”
তারপর একটু ঝুঁকে বলল,
“কিন্তু তুমি আমাকে ভুল বুঝেছ অভি।”
অভি তাকাল।
সূচির চোখ দুটো আজ অদ্ভুত দৃঢ়।
“তুমি ভাবছ এটা তোমার একার লড়াই।”
“কিন্তু তা নয়।”
অভি শান্ত গলায় বলল,
“সূচি… তোমার বোঝা উচিত।”
“তোমার আর আমার পৃথিবী এক নয়।তোমার বাবাও সেটাই বলেছেন।”
সূচি একটু হাসল।
“বাবা ঠিকই বলেছেন…
আমাদের পৃথিবী আলাদা। কিন্তু মানুষ আলাদা নয়।”
অভি চুপ করে রইল।
সূচি আবার বলল,
“তুমি ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট হতে চাও—আমি জানি।”
“এই স্বপ্নটা শুধু তোমার নয়, অনেক মানুষের।”
“আর আমি…
আমি সারাজীবন তোমার পাশে থাকব।”
অভির বুকের ভেতরটা যেন কেঁপে উঠল।
সে ধীরে বলল,
“তুমি জানো না সূচি… এই পথটা কত কঠিন।”
“দারিদ্র্য, পড়াশোনা, লড়াই—সব একসাথে।”
“তার উপর এখন তোমার বাবার সেই কথা…”
সে একটু থেমে বলল,
“আমি যদি হেরে যাই?”
সূচি এক মুহূর্তও দেরি করল না।
“তাহলে আমরা একসাথে আবার শুরু করব।”
অভি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
সূচি আবার বলল,
“কিন্তু একটা কথা মনে রেখো অভি।”
“নিজেকে প্রমাণ করার জন্য আমাকে দূরে সরিয়ে দেবে না।”
“কারণ…”
সে একটু থামল।
তারপর খুব ধীরে বলল,
“তোমার লড়াইটা যত কঠিনই হোক,আমি তোমার পাশে থাকলে সেটা অর্ধেক হয়ে যাবে।”
বটগাছের পাতা হালকা বাতাসে দুলছিল।
অভি অনেকক্ষণ কিছু বলল না।
তারপর ধীরে মাথা নিচু করে বলল,
“তুমি জানো না সূচি…”
“এই কথাগুলো আমাকে কতটা শক্তি দিল।”
কিন্তু তার গলায় এখনও সেই দৃঢ়তা।
“তবুও… আমাকে লড়াইটা জিততেই হবে।”
সূচি শান্তভাবে বলল,
“জিতবে।”
“কারণ তুমি একা নও।”
এই কথাগুলোর পরও সূচির মনে হচ্ছিল, কিছু একটা এখনও বলা বাকি রয়ে গেছে।
অভি বই গুছিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল।
“চলো, আমার ক্লাসে যেতে হবে,” সে বলল।
সূচি হঠাৎ বলল,
“তার আগে একটা জায়গায় যাবে আমার সাথে?”
অভি অবাক হয়ে তাকাল।
“কোথায়?”
“চলো… গেলেই বুঝবে।”
তার গলায় এমন একটা দৃঢ়তা ছিল যে অভি আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। শুধু বলল,
“আচ্ছা যাবো।তবে আজ ক্লাস করাটা খুব জরুরি, তুমিও ক্লাসে যাও। সামনে পরীক্ষা। তোমার স্বপ্নটাও কিন্তু পূরণ করতে হবে……”
“তাই আমরা বিকালে যাবো , তুমি যেখানে নিয়ে যেতে চাও সেখানে।”
সূচি আর কথা বাড়ালো না।
কলেজের একটু দূরেই একটা পুরোনো কালীমন্দির।
লাল রঙের ছোট্ট মন্দির, সামনে পুরোনো বট আর অশ্বত্থ গাছের ছায়া।সিঁড়ির ধারে কয়েকটা প্রদীপ জ্বলছে, বাতাসে ধূপের গন্ধ।
সন্ধ্যা নেমে আসছে ধীরে ধীরে।
মন্দিরের ঘণ্টা হালকা করে বাজছে। সূচি ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উঠল।
অভি তার পেছনেই।
মন্দিরের ভিতরে ঢুকে সূচি কিছুক্ষণ চুপ করে মা কালীর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখে যেন অদ্ভুত এক স্থিরতা।
অভি একটু অস্বস্তিতে পড়ল।
“সূচি… তুমি আমাকে এখানে কেন এনেছ?”
সূচি ধীরে তার দিকে ঘুরে দাঁড়াল।তার মুখে আজ এক অন্যরকম শান্তি।
সে মন্দিরের পাশে রাখা ছোট্ট পিতলের থালার দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে ফুল, ধূপ… আর এক চিমটি সিঁদুর রাখা।
অভি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
সূচি খুব ধীরে সেই সিঁদুরটা আঙুলে তুলে নিল।
তারপর অভির দিকে তাকাল।
“তুমি বলছ তোমার লড়াই কঠিন…
তুমি বলছ তোমাকে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে…”
অভি চুপ করে শুনছে।
সূচির গলাটা একটু কেঁপে উঠল, তবু সে থামল না।
“ঠিক আছে অভি… তুমি লড়াই করবে।তুমি অবশ্যই তোমার স্বপ্ন পূরণ করবে।”
সে একটু থামল।
তারপর খুব শান্ত কিন্তু গভীর গলায় বলল,
“কিন্তু একটা কথা আজ তোমাকে জানিয়ে রাখব।”
মন্দিরের প্রদীপের আলো তার মুখে পড়েছে।
সে ধীরে নিজের সিঁথির দিকে হাত তুলল।
“মায়ের সামনে সাক্ষী রেখে…”
“এই সিঁদুর আমি আজ নিজের সিঁথিতে তোমার নামে ছুঁইয়ে দিচ্ছি।”
অভি যেন হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল।
সে কিছু বলার আগেই সূচি খুব ধীরে নিজের সিঁথিতে সেই সিঁদুর ছুঁইয়ে দিল।
মুহূর্তটা যেন সময়ের মধ্যে স্থির হয়ে গেল।মন্দিরের ঘণ্টা হালকা বাতাসে আবার বেজে উঠল।
অভির চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেছে।
“সূচি… তুমি এটা কি করলে?”
সূচি শান্তভাবে তার দিকে তাকাল।
তার চোখে জল চিকচিক করছে, কিন্তু মুখে অদ্ভুত দৃঢ়তা।
“আজ থেকে এই সিঁথিতে আর কেউ সিঁদুর দেবে না।”
“একদিন… তুমি নিজে এসে এই সিঁথিতে সিঁদুর পরাবে।”
“না হলে…..
কেউ নয়।”
অভির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে যেন বুঝতেই পারছিল না কী বলবে।
“সূচি… এইভাবে নিজের জীবনকে একটা শপথে বেঁধে ফেলো না…”
সূচি মৃদু হাসল।
“এটা শপথ নয় অভি।”
“এটা বিশ্বাস।”
তারপর সে খুব আস্তে বলল,
“আমি জানি তুমি ফিরবে।”
মন্দিরের প্রদীপগুলো তখন নরম আলো ছড়াচ্ছে।
অভি কিছু বলতে পারল না।তার চোখ শুধু সেই সিঁদুর ছোঁয়া সিঁথির দিকে স্থির হয়ে রইল, যেখানে আজ সূচি তার ভালোবাসাকে চিরদিনের জন্য শব্দের থেকেও গভীর এক বন্ধনে বেঁধে দিল।
—oooXXooo—
![]()







