।। তোমাতে আমার ঠিকানা ।।
নবম পর্ব
বারিদ বরণ
“অভি… এই অভি… ওঠ শিগগিরই!”
ভোরের আলো তখনও ঠিকমতো ঘরে ঢোকেনি।
মেসের ঘরটা আধো অন্ধকার। জানালার কাঁচে শিশির জমে আছে।
শুভদার গলা কাঁপছে।হাঁপাতে হাঁপাতে সে অভির কাঁধ ধরে ঝাঁকাচ্ছে।
অভি প্রথমে কিছু বুঝতে পারে না।মাথার ভেতর কেমন যেনো ভার হয়ে আছে।
চোখ খুলে তাকায়।
“কি হয়েছে দাদা?”
শুভদা কথা বলতে পারছে না ঠিকমতো।একটা হাত দেয়ালে ঠেকিয়ে শ্বাস টানল।
“চা… চা খেতে গিয়েছিলাম সামনের দোকানে…”
একটু থামে।
“রেডিওতে খবর চলছিল… লোকজন কথা বলছিল…”
অভির বুকের ভেতর কেমন একটা খচখচানি শুরু হয়।
“কী খবর?”
শুভদা চোখ তুলে তাকায়।
চোখ লাল।
“বস্তিতে… আগুন… রাতে…”
এক মুহূর্তের জন্য ঘরটা নিস্তব্ধ।
অভির মাথার ভেতর শব্দটা যেন প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে—বস্তি। আগুন।
“কী বলছ দাদা?”
“সর্বহারা বস্তি শেষ হয়ে গেছে রে, অভি।”
শুভদার কথাটা শুনে অভি থমকে গেল।
“নেই… মানে?”
চোখ কচলে উঠে বসলো সে।
“নেই মানে কী দাদা?”
শুভদা মুখের দিকে তাকাতে পারল না।
গলা ভারী।
“কাল রাতে সব শেষ হয়ে গেছে, অভি।”
অভি হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
এ কি শুনছে সে?
“কি যা তা বলছ দাদা?”
কণ্ঠস্বর শক্ত, কিন্তু চোখে অবিশ্বাস। “এক রাতে… একটা গোটা বস্তি?”
শুভদা মাথা নাড়ল। “আগুন লাগানো হয়েছে লোকজনকে আগে ভয় দেখানো হয়েছিল।
তারপর—”
সে আর বলতে পারল না।
অভির মাথার ভেতর ঝাঁ ঝাঁ শব্দ শুরু হলো।
তার চোখের সামনে ভেসে উঠল— বস্তির বাচ্চারা,
ছেঁড়া খাতা, সুচির পড়ানোর হাসি।
“ আর মানুষগুলো…?”
অভি জিজ্ঞেস করল। “সবাই ঠিক আছে তো?”
শুভদা ধীরে বলল,
“জানিনা রে।”
একটু দম নিয়ে আবার সে বলল,
সব নাকি ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে। অনেক মানুষকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আদৌ কয়জন বেঁচে আছে কেউ জানেনা রে।”
ঘরের ভেতর এক অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো।
“পুলিশ?”
অভির প্রশ্ন এবার সংক্ষিপ্ত।
শুভদা ঠোঁট কামড়ে বলল— “ভোরে গেছে, কাগজে হয়তো লিখবে— ‘অজানা কারণে অগ্নিকাণ্ড’।”
অভি জানালার দিকে তাকাল।বাইরে সকাল। মানুষ কাজে বেরোচ্ছে।কিন্তু অভির জীবনে যেন হঠাৎ করে একটা নতুন যুদ্ধের সকাল নেমে এলো।তার মনে হচ্ছিল একটা যুদ্ধ সে হেরে গেছে।
“সুচি জানে?”
অভি জিজ্ঞেস করল।
“জানবে।”
শুভদা বলল,
“এই খবর লুকিয়ে রাখা যায় না।”
অভির চোখের সামনে ভেসে উঠল— সুচির বারান্দায় বসে থাকা মুখটা,বস্তির বাচ্চাদের পড়ানোর ছবি,রাত নামার আগে সুচির ভয় পাওয়া চোখ।
অভি দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল।এক ফোঁটা জল পড়ল মেঝেতে।
“দাদা…”
গলা ভেঙে গেল। “আমরা দেরি করে ফেললাম, তাই না?”
শুভদা কিছু বলল না।এই প্রশ্নের উত্তর কারও জানা নেই।
“আমাকে যেতে হবে।”
আর এক মুহূর্তও দেরি করলো না সে।
শুভদা সামনে এসে দাঁড়ায়। “অভি, দাঁড়া এখন যাসনা। ওখানকার পরিস্থিতি…..”
শুভ দাকে শেষ করতে দিলো না অভি,
“দাদা, সরো।”
অভির গলায় আজ অন্য রকম দৃঢ়তা।
“ ওখানে আমাকে যেতেই হবে দাদা।”
শুভদা জানে, এবার আর আটকানো যাবে না তাকে।
বাইরে বেরোতেই সকালের রোদ চোখে পড়ল।
নতুন দিনের আলো—কিন্তু অভির মনে কোনো সকাল নেই।পায়ে পায়ে দ্রুত হাঁটতে লাগল সে।রাস্তার ধারে চায়ের দোকানগুলো খুলছে,রিকশাওয়ালারা ডাকছে,
পেপারওয়ালা খবর বিলোচ্ছে।
একটা কাগজের শিরোনামে চোখ পড়ল,
“রাতে বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড”
অভি কাগজটা নিল না।খবর পড়ার দরকার নেই, সে জানে কোথায় যেতে হবে।
বস্তির কাছে পৌঁছেতেই গন্ধটা নাকে এল।
ধোঁয়ার নয়,পোড়া কাঠ, পোড়া কাপড়, পোড়া জীবনের গন্ধ।যেখানে একদিন ঘিঞ্জি ঘর ছিল,আজ সেখানে কালচে ছাই।কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে।
কেউ কথা বলছে না।কেউ কাঁদছে আবার কেউ কাঁদছেও না। কিছু ছেলে দিশাহীনের মত ছুটে বেড়াচ্ছে , সারা গা হাত পা কালো ছাই লেগে। ধ্বংস স্তুপের মধ্যে থেকে যদি একটাও প্রাণ বাঁচিয়ে আনা যায় তার বৃথা চেষ্টা করে চলেছে ওরা।
একটা ছোট মেয়ে ছাইয়ের ভেতর থেকে একটা পোড়া খাতা তুলে নিল।পাতাগুলো জ্বলে গিয়ে একসাথে লেগে গেছে।
অভির বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল।
“অভি দা?”
হঠাৎ কারও কণ্ঠ।
অভি ঘুরে তাকাল।
“বাবু।”
চোখ ফুলে আছে, মুখে ছাই লেগে।
“এটা…”
বাবু চারদিকে তাকিয়ে বলল, “রাত বারোটার সময় শুরু হয়।আগে গন্ধ পাই।তারপর আগুন।”
অভি কিছু বলল না।সে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল ছাইয়ের ওপর।একটা বস্তির জায়গায় আজ শুধু নীরবতা দাঁড়িয়ে।
এই নীরবতা চিৎকার করছে।
হঠাৎ করেই সে নিরাবতা যেন ভেঙে পড়ল।এক কোণ থেকে কান্নার আওয়াজ উঠল, একটা নয়, অনেকগুলো গলা।
“সব শেষ হয়ে গেল রে…”
“এই ঘরেই তো আমার মেয়ে জন্মেছিল…”
“কাগজপত্র সব পুড়ে গেল…”
কেউ ছাই হাতড়াচ্ছে,কেউ পুড়ে যাওয়া হাঁড়ি তুলে ধরছে,
কেউ নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে।
একজন বৃদ্ধা ছাইয়ের ওপর বসে পড়ে
বারবার বলছে— “ দাও না বাবা আমার ছেলেটাকে কেউ খুঁজে দাও না…”
হঠাৎ করে সাইরেনের শব্দ।
দুটো পুলিশ জিপ ঢুকল ভাঙা রাস্তার ভেতর।লোকজন একটু সরে গেল।
পুলিশ নামল।খাতা বেরোল।
মোবাইল ফোনে ছবি তোলা শুরু হলো।
“লাইন করে দাঁড়ান।”
“এইদিকে কেউ যাবেন না।”
একজন অফিসার বাবুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“আগুন কীভাবে লেগেছে?”
বাবু কাঁপা গলায় বলল— “ওরা এসেছিল স্যার…
কাল সন্ধ্যায়… হুমকি দিয়ে গেছিল…”
অফিসার খাতায় কিছু লিখল।
” কারা বল তো?”
বাবু উত্তেজিত হয়ে বলল,
“ওই যে স্যার গোপালের লোকজন?”
গোপালের নাম শুনে আফিসার একটু থামলেন,
তারপর মাথা তুলে বললেন,
“প্রমাণ?”
বাবু চুপ।
অভি এগিয়ে এল।
“পুরো বস্তি সাক্ষী।”
অফিসার ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,
“পুরো বস্তি তো আর নেই, তাই না?”
এই কথাটায় যেন কেউ বুকের ভেতর ছুরি ঢুকিয়ে দিল।
এক কোণায় একজন কনস্টেবল নিচু গলায় আরেকজনকে বলল,
“ফাইলটা আজই পাঠাতে হবে…উপরে চাপ আছে।”
অভির কানে কথাটা এসে গেল।তার চোখে তখন আর জল নেই।শুধু আগুন।
পুলিশ কাজ সেরে ধীরে ধীরে সরে যেতে লাগল।
পেছনে রেখে গেল— ছাই,কান্না,আর প্রশ্ন—
এটা কি দুর্ঘটনা, না পরিকল্পনা?
অভি দাঁড়িয়ে রইল।এইবার সে জানে,এই লড়াই আর থামার নয়।
অভি ধীরে বাবুর সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
চারপাশে কান্না, পুলিশের হাঁকডাক—সবকিছুর মাঝখানে বাবুর চোখটা ফাঁকা।
“বাবু…”
অভির গলা অস্বাভাবিক শান্ত।
“কী করে ঘটল বলতো? ঠিক কী হয়েছিল কাল রাতে?”
বাবু কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না। ছাই মাখা হাত দুটো কাঁপছে।
“রাত তখন সাড়ে বারোটা হবে…”
ধীরে ধীরে বলতে শুরু করল সে।
“বাচ্চাগুলো ঘুমিয়ে পড়েছিল।
আমরা কয়েকজন বসে কথা বলছিলাম,ভয়টা কাটছে না বলেই।”
অভি চোখ সরাল না।
“হঠাৎ পেছন দিক থেকে আওয়াজ পাই।বাইরে বেরোতেই দেখি তিনটে বাইক। চেনা মুখ… গোপালের লোক।”
বাবুর গলা ভেঙে গেল।
“ওরা কিছু বলেনি প্রথমে।শুধু বোতল ছুড়ল…
আগুন লাগানো পেট্রোল বোতল।”
অভির মুঠো শক্ত হয়ে এল।
“তারপর?”
“একটা ঘরে আগুন ধরতেইহাওয়ায় মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে।
চিৎকার… দৌড়…
কেউ কিছু বোঝার আগেই চারদিক আগুন।”
বাবু চোখ মুছল।
“আমরা জল ঢালতে গিয়েছিলাম।কিন্তু তখনই….”
সে থেমে গেল।
“কী?”
অভির গলায় চাপা রাগ।
“ওরা আবার ফিরে এসেছিল। দূরে দাঁড়িয়ে চেঁচাচ্ছিল,
‘দেখে নে… এবার বোঝ।’”
চারপাশে কেউ কেউ শুনে কেঁদে উঠল।
“পুলিশ?”
অভির প্রশ্ন ছোট, ধারালো।
বাবু তিক্ত হেসে বলল— “আগুন প্রায় নিভে যাওয়ার পর। ততক্ষণে সব শেষ।”
অভি চোখ নামিয়ে ছাইয়ের দিকে তাকাল। এই ছাইয়ের নিচে শুধু ঘর নয়—মানুষের ভরসাও পুড়ে গেছে।
“বাবু,”
অভি ধীরে বলল,
“এটা এখানে শেষ হবে না।”
বাবু প্রথমবার অভির দিকে তাকাল।সেই চোখে ভয় আছে, কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা আশা জ্বলছে।
অভির প্রশ্নটা হঠাৎ করে বেরিয়ে এলো, কেমন যেন শ্বাস আটকে রাখা গলার ভেতর থেকে।
“সুচি কোথায়?”
একটু থেমে আবার জিজ্ঞেস করল,
“ও কি এসেছিল?”
বাবু চোখ নামিয়ে নিল। এই নীরবতাটাই অভিকে আরও অস্থির করে তুলল।
“বল না, বাবু।”
বাবু ধীরে মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ দাদা… এসেছিল।”
অভির বুকের ভেতরটা হালকা হলো, আবার পরমুহূর্তেই কেঁপে উঠল।
“কখন?”
“আগুন দেখেই সুচি দিদি আর বিমল বাবু দু’জনেই ছুটে এসেছিল।”
অভির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
“রাত তখন সাড়ে বারোটা পেরিয়ে গেছে,”
বাবু বলতে শুরু করল,
“আগুন তখন পুরো দাউ দাউ করে জ্বলছে। সুচি দি কারও কথা শুনছিল না।এক ঘর থেকে আরেক ঘরে দৌড়াচ্ছিল,
‘কেউ ভেতরে আছে?’
‘সব বাচ্চা বেরিয়েছে তো?’”
বাবুর চোখ ভিজে উঠল।
“সারা রাত দাদা…এক মুহূর্ত বসেনি।কখনও জল টানছে,
কখনও কাউকে টেনে বের করছে,কখনও আবার কারও নাম ধরে ডাকছে।”
অভির চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল সেই ছবি।
সুচি—ধোঁয়ার ভেতর, আগুনের আলোয়।
“ আর বিমল বাবু?”
অভি প্রশ্ন করল।
“উনি পুলিশ ডাকছিলেন, দমকলের সঙ্গে কথা বলছিলেন। কিন্তু সুচি দি…সে যেন নিজের শরীরটাই ভুলে গিয়েছিল।”
বাবু একটু থামল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
“ভোরের দিকে…”
অভির বুক ধক করে উঠল।
“ভোরের দিকে পিঙ্কি নামের ওই ছোট মেয়েটার…
পোড়া দেহটা পাওয়া যায়।”
অভির হাত কেঁপে উঠল।
“পিঙ্কি…?”
ফিসফিস করে বলল সে।
“যে সুচির কাছে পড়ত?”
বাবু মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ দাদা। সুচি দি নিজের হাতে ওকে খুঁজছিল।সব জায়গায়।শেষে যখন দেহটা বের করল….”
বাবুর গলা ভেঙে গেল।
“দিদি কিছু বলল না।চিৎকারও না।শুধু একবার পিঙ্কির মুখটার দিকে তাকাল…
তারপর সেখানেই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল।”
চারপাশের শব্দ হঠাৎ থেমে গেল অভির কানে।পৃথিবীটা যেন দুলে উঠল।
“তারপর?”
অভির গলা কঠিন।
“ডাক্তার ডাকা হয়।ভাগ্য ভালো বড় কিছু হয়নি।কিন্তু ওকে ধরে রাখতে হয়েছিল দাদা…ভাঙা মানুষের মতো লাগছিল।”
অভি চোখ বন্ধ করল।একটা শিশুর মৃত্যু।একটা বস্তি পুড়ে ছাই।আর সুচি—সারারাত লড়ে শেষে অচেতন।
“বাবু,”
অভি ধীরে বলল,
“এই আগুন শুধু ঘর পোড়ায়নি।”
বাবু মাথা নাড়ল।
“না দাদা।এই আগুন যুদ্ধ জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে।”
অভি চোখ খুলল।
তার দৃষ্টিতে আর শুধু শোক নেই, একটা দৃঢ় সিদ্ধান্ত জন্ম নিচ্ছে।
দুপুরের দিকে হঠাৎ করেই বস্তির মুখে গাড়ির শব্দ।কালো কাচ তোলা দু’টো গাড়ি থামল।আগে নামল কয়েকজন পরিচিত মুখ, গোপালের ছেলেরা।
চোখে সেই পুরনো দাপট,হাঁটার ভঙ্গিতে আগের রাতের আগুনের কোনো অনুশোচনা নেই।তারপর গাড়ির ভেতর থেকে নামল লোকাল নেতা।সাদা পাঞ্জাবি, কাঁধে উত্তরীয়,
মুখে গভীর শোকের ছাপ,যেন সারা রাত চোখের জল ফেলেছেন।
“হায় হায়…”
তিনি দু’হাত জোড় করে বললেন,
“কী ভয়ংকর ঘটনা!এমন দুর্ঘটনা এই এলাকায় কখনও হয়নি।”
একজন বৃদ্ধা ফুঁপিয়ে উঠল— “দুর্ঘটনা না বাবা…
ওরা….”
কথাটা শেষ হতে দিল না গোপালের একজন ছেলে।
চোখ রাঙিয়ে বলল,
“চুপ কর, বুড়ি!”
নেতা তৎক্ষণাৎ এগিয়ে এলেন।
“না না, ভয় পাবেন না।আমি আছি।আমি আপনাদেরই লোক।”
তিনি চোখ মুছলেন।ছদ্ম কান্নার অভিনয়।
“এই বাচ্চাটার মৃত্যু…”
পিঙ্কির নাম না নিয়েই বললেন,
“আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।আমি নিজেও বাবা।”
অভি দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিল।তার চোখে একফোঁটা জল নেই।এই কান্না সে চিনে গেছে।
নেতা হাত তুললেন।
“আমি প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছি।আপনাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা হবে।এই জায়গায় আর থাকা নিরাপদ নয়।”
একজন যুবক সাহস করে বলল,
“আমরা এখানেই থাকব।”
নেতার মুখে হাসি জমে গেল।
মুহূর্তের জন্য।
তারপর নরম গলায় বললেন,
“এই জেদটাই তো আপনাদের সর্বনাশ করে দেয়।
ভেবে দেখুন—আপনাদের ভালোর কথাই তো বলছি।”
পেছনে দাঁড়ানো গোপালের ছেলেরা তখন ইচ্ছে করেই লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়াল।
শব্দ না করেও হুমকি।
নেতা আবার চোখ মুছলেন।
“আমি কথা দিচ্ছি, বিচার হবে।”
অভি ফিসফিস করে বলল,
“বিচার না, সমাধি।”
কেউ শুনল না।কিন্তু কথাটা বাতাসে রয়ে গেল।বস্তির মানুষগুলো চুপ করে দাঁড়িয়ে।ওরা জানে,এই কান্না আগুন নেভানোর জন্য নয়,ছাইয়ের ওপর দখল কায়েম করার জন্য।আর এই ছদ্ম শোকের ভিড়ের মাঝেই, একটা নতুন প্রতিরোধ ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে।
ঘৃণায় অভির চোখ লাল হয়ে উঠেছিল।
আর এক মুহূর্তও সে ওই ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না।নেতার কৃত্রিম কান্না,গোপালের ছেলেদের ঠান্ডা চোখ,পোড়া ছাইয়ের ওপর দাঁড়িয়ে বলা,
“পুনর্বাসন”
সবকিছু তার বুকের ভেতর জমে উঠে বিষ হয়ে গেল।
অভি হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল।বাবু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“কোথায় যাচ্ছ দাদা?”
অভি দাঁড়াল না।চলতে চলতেই বলল,
“সুচির বাড়ি যাচ্ছি, বাবু।”
গলায় কোনো প্রশ্ন ছিল না,ছিল না অনুমতির সুর। ওটা ছিল সিদ্ধান্ত।বাবু কিছু বলতে গিয়েও বলল না।
বস্তির শেষ মাথায় এসে অভি একবার পেছনে তাকাল।
কালো ছাই, নীরব মানুষ,আর ক্ষমতার মুখোশ পরা কান্না।
তারপর সে হাঁটা বাড়াল।
এই আগুনের জবাব সে আজ খুঁজবে, সুচির কাছেই।
সুচির এই প্রাসাদপ্রমাণ বাড়িতে অভি এই প্রথম এল।
বাড়ির লোহার গেটের সামনে দাঁড়িয়েই তার পা একটু থমকে গেল। উঁচু দেওয়াল, নিখুঁত রঙ করা গ্রিল, ভেতরে সাজানো বাগান—সবকিছু যেন অন্য এক জগতের। এমন জায়গায় সে কখনও আসে না। এখানকার নীরবতাও আলাদা—বস্তির কোলাহলহীন, অথচ ভারী।
গেটের মুখে দাঁড়িয়েই অভির চোখে পড়ল ভিতরের পরিবেশটা।বড়সড় লন, ছাঁটা ঘাস, ফুলের গাছগুলো সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে—লাল, হলুদ, সাদা রঙে সাজানো।
ফোয়ারা থেকে জল উঠছে ছন্দে ছন্দে,জলের শব্দটাও যেন পরিমিত, শালীন।পাথরের পথ ধরে একটু এগোলেই বিশাল বাড়িটা।সাদা দেওয়াল, বড় বড় জানালা,নরম আলোয় ঝলমল করছে।কোথাও ধোঁয়ার গন্ধ নেই,
কোথাও ছাই উড়ছে না।
অভির চোখে হঠাৎ ভেসে উঠল অন্য ছবি,
পোড়া টিন, কালো দেয়াল,পিঙ্কির নিথর শরীর। কিন্তু এই বাড়ির ভেতর শান্তি সাজানো।
আর বাইরে, গেটের এই পাশেসে দাঁড়িয়ে আছে আগুন বয়ে নিয়ে।অভি বুঝল—এই গেট শুধু লোহার নয়।
এটা দুই জীবনের মাঝখানে দাঁড়ানো এক অদৃশ্য দেয়াল।
আর আজ,এই দেয়াল টপকাতেই সে এসেছে।
গেটের ভেতরে পা দিতেই হঠাৎ একজন দারোয়ান সামনে এসে দাঁড়াল।খাটো নয়, চওড়া চেহারা, চোখে কড়া দৃষ্টি।
“এই যে…”
তার গলা ভারী, কর্তৃত্বপূর্ণ।
“কিসে চাহিয়ে?”
অভি একটু থমকাল।এই প্রশ্নটা যেন শুধু পরিচয়ের নয়—
তার অবস্থান জানিয়ে দেওয়ার প্রশ্ন।
“আমি… সুচরিতা সেনের সাথে দেখা করতে এসেছি,”
অভি শান্ত গলায় বলল।
দারোয়ান উপর থেকে নিচ পর্যন্ত একবার তাকাল।মলিন জামা, ধুলো লেগে থাকা চটি—সবই তার চোখ এড়াল না।
“অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে?”
কণ্ঠে অবিশ্বাস।
“না,”
অভি সোজা বলল।
“কিন্তু ও জানে আমি আসব।”
দারোয়ান ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“এখানে সবাই ঢুকতে পারে না।
আপনি একটু বাইরে দাঁড়ান।”
এক মুহূর্তের জন্য অভির বুকের ভেতর আগুনটা আবার জ্বলে উঠল।বস্তির ছাই, পিঙ্কির মুখ,আর এই গেট,সব একসাথে। কিন্তু সে রাগ দেখাল না।
শুধু চোখ তুলে বলল,
“দয়া করে একবার ভেতরে খবরটা দিন। বলবেন— অভি এসেছে।”
দারোয়ান একটু ইতস্তত করল।নামটার ভেতর যেন সে কিছু বুঝতে পারল।তারপর গেটের ভেতরে ঢুকে গেলো।
অভি বাইরে দাঁড়িয়ে রইল।এই গেটের একপাশে রাজকীয় নীরবতা,আর তার মনে আগুনে পোড়া এক বস্তির আর্তনাদ।আজ এই দুটো দুনিয়া মুখোমুখি।
কিছুক্ষণ পর দারোয়ান আবার ফিরে এল।এইবার তার গলার সুরটা আগের থেকে একটু নরম, কিন্তু কথার অর্থটা কঠিন।
“দেখুন বাবু,”
সে চোখ নামিয়ে বলল,
“এখন দেখা হবে না। মেমসাহাব অসুস্থ।”
এই কথাটা শোনামাত্রই অভির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
“অসুস্থ?”
একটুখানি এগিয়ে এসে বলল সে।
“কী হয়েছে ওর?”
দারোয়ান মাথা নাড়ল।
“আমরা বেশি জানি না বাবু।ডাক্তার আসা–যাওয়া করছে।এখন কাউকে ঢুকতে বারণ।”
অভি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।ভেতরের বাড়িটার দিকে তাকাল।নরম আলো, শান্ত বারান্দা,কিন্তু সেই শান্তির আড়ালেই যেন এক অদৃশ্য ভার।তার মনে পড়ে গেল,সারারাত ধোঁয়ার ভেতর দৌড়ানো সুচির মুখ।
একটা শিশুর নিথর দেহ।ভোরের অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাওয়া।অভি ধীরে মাথা নাড়ল।
“ঠিক আছে,”
শান্ত গলায় বলল সে।
“বলবেন— অভি এসেছিল।”
এই কথাটুকু বলেই সে ঘুরে দাঁড়াল।গেটের বাইরে পা রাখতেই তার মনে হলো—কিছু দূরে নয়, সুচি এখনো আগুনের মধ্যেই আছে।
গেটের বাইরে বেরিয়ে ধীরে ধীরে এগোতে লাগল,মাথার ভেতর একরাশ চিন্তা, বুকের মধ্যে চাপা আগুন। সুচির অসুস্থতা, বস্তির ছাই, পিঙ্কির মুখ—সব মিলিয়ে তার মনে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল,
ও এখন কী করবে সে?
হাঁটতে হাঁটতে সে খেয়ালই করল না,দোতলার বারান্দা থেকে একজোড়া চোখ নীরবে তাকে অনুসরণ করছে।
বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন বিমল সেন।
চশমার কাঁচের আড়াল দিয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে।
গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটাকে তিনি চিনলেন—
এই সেই ছেলেই তো,যার নাম বারবার শুনছেন,যার জন্য তাঁর মেয়ে আগুনের ভেতর ঝাঁপিয়েছিল।
বিমল বাবুর মনে দুটো উদ্বেগ একসাথে মাথা তুলল।
একদিকে সুচির শরীর—ডাক্তার স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন, মানসিক ধাক্কাটা শারীরিকের চেয়েও গভীর।আর অন্যদিকে এই ছেলেটা—মলিন জামা, অগোছালো চুল,চোখে অদ্ভুত দৃঢ়তা।এই ছেলেটার সংস্পর্শে এসে
তাঁর মেয়ের জীবন যে কোন পথে গড়াচ্ছে,সেটাই তাঁকে সবচেয়ে ভয় দেখাচ্ছে।
বিমল বাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
এই আগুন শুধু বস্তিতে লাগেনি,এই আগুন তাঁর বাড়ির ভেতরেও ঢুকে পড়েছে।
অভি এখন মেসে যাবে না।তার পায়ের দিকটাই ঘুরে গেল অন্য পথে।সন্ধ্যার আলোয় শহরের বড় বাড়িগুলো আলাদা করে চোখে পড়ে—উঁচু গেট, ঝকঝকে আলো, পাহারায় লোক। সকাল থেকে কিছুই প্রায় খাওয়া হয়নি তার, এখন মেসে গেলেও খবর পাবে না। সেই একেবারে রাতে। পকেটে পঞ্চাশ টাকা তার সম্বল। হাটতে হাটতে মোরের মাথায় মুড়ির দোকান টা দেখে সে দাঁড়িয়ে পড়ল। দশ টাকার মুড়ি আর বাদাম কিনে,খেতেখেতে এগিয়ে চলো সে।
যে বাড়িটার সামনে সে দাঁড়াল, সেটাকে বাড়ি না বলে “প্রাসাদ” বলাই ঠিক।
প্রায় এক বছর হয়ে গেছে।অভি এখন আর নতুন মাস্টার নয়।এই বাড়ির দরজাটা তার কাছে চেনা, দারোয়ানের চোখেও আর অবজ্ঞা নেই।সন্ধ্যেবেলা সে আসে, রাত নামলে যায়—নিয়ম করে।
তবে যে ছেলেটাকে প্রথম দিন সোফায় আধশোয়া, মোবাইলে ডুবে থাকতে দেখেছিল, সে এখন আর ঠিক সেই রকম নেই। বদলটা চোখে পড়ে না হঠাৎ করে, কিন্তু ধীরে ধীরে জমেছে—জলের মতো।
শুরুর দিকে পড়ার টেবিলে বসত ঠিকই, কিন্তু চোখ থাকত জানলার বাইরে।এখন জানলাটা খোলা থাকে, তবু চোখ থাকে খাতায়।আগে ইচ্ছা করে ভুল করত, আজ ভুল হলে চুপ করে থাকে—লজ্জা পায়।
অভি কখনো চেঁচায়নি।
কখনো বলেনি, “আমি তোমার শিক্ষক।”
সে শুধু নিয়ম করে এসেছে, নিয়ম করে পড়িয়েছে, আর প্রতিদিন একটু করে বিশ্বাস ঢেলে গেছে।
কিছু দিন এমনও গেছে—
ছেলেটা চুপচাপ বসে থেকেছে, কিছু পড়েনি।অভিও জোর করেনি।সে জানে, জোর করে শেখানো যায় না,
কিন্তু পাশে বসে থাকা যায়।
একদিন হঠাৎ করেই ছেলেটা প্রশ্ন করেছিল,
“তোমার বাবা কী করেন?”
অভি একটু থেমে বলেছিল,
“ভ্যান চালান।”
সেদিন আর পড়া হয়নি। শুধু শুনেছিল অভির পারিবারিক অবস্থা, শুনেছিল অভির লড়াইয়ের গল্প,
গ্রামের নদীর ধারে তার শৈশব, ভ্যানচালক বাবার ঘাম ভেজা মুখ, অথবা হেডমাস্টার মশাইয়ের নিঃস্বার্থ ভালোবাসার গল্প।
সেই রাতের পর ছেলেটা আর কোনোদিন অভিকে “মাস্টার” বলে ডাকেনি।
ডাকত—“দাদা।”
একদিন হঠাৎ অভি বলল,
“তুমি জানো, পড়াশোনা শুধু পরীক্ষায় পাস করার জন্য নয়। পড়াশোনা মানে হলো মাথা উঁচু করে বাঁচা, অন্যায়ের সামনে দাঁড়ানো। আমি স্বপ্ন দেখি একদিন সমাজে ন্যায় ফিরিয়ে আনব। তুমি কি স্বপ্ন দেখো না?”
ছেলেটি একটু থমকালো। মুখ ঘুরিয়ে নিলেও তার চোখে এক অদ্ভুত দোটানা দেখা গেল।
দিন গড়াতে লাগল। ধীরে ধীরে অভির কথায় ছেলেটির মনে যেন আলগোছে দাগ কেটে যাচ্ছিল। বাইরে থেকে সে এখনও অবাধ্য, দুষ্টুমি করছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে বদল শুরু হয়েছে।
একদিন খাতা খুলে হঠাৎ ছেলেটি বলল,
“অভি দা, তুমি সত্যিই গ্রাম থেকে এসেছ? এত কষ্ট করে পড়ছ?”
অভি হেসে বলল,
“হ্যাঁ। আমি মাটির ঘরে থাকি, কিন্তু আমার স্বপ্ন আকাশের মতো বড়। আর আমি চাই তোমারও একটা বড় স্বপ্ন থাকুক।”
সে উত্তর দিলো না কিন্তু ভিতরে ভিতরে কিন্তু রাহুল নিজেকে নতুন করে গড়তে শুরু করে দিয়েছে।
এখন সে পরীক্ষার আগে নার্ভাস হয়।খাতা ঠিকঠাক রাখে।ভুল হলে নিজেই খুঁজে বার করে।
বাড়ির লোকেরা বলে,
“ছেলেটা আগের মতো নেই।”
কেউ জানে না, এই বদলের পেছনে কোনো শাসন নেই,
কোনো লোভ নেই,শুধু এক বছর ধরে প্রতিদিন এসে বসে থাকা এক তরুণের নীরব ছোঁয়া আছে।
অভি জানে, এই ছেলেটা হয়তো বড় ছাত্র হবে না।
কিন্তু মানুষ হওয়ার পথে সে প্রথমবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখছে।
আর সেই এক বছরের প্রতিটি সন্ধ্যায়,অভি যেন নিজের জন্যও একটু করে যোগ্যতা ছিনিয়ে নিচ্ছে—
কারো সামনে দাঁড়ানোর,কারো পাশে থাকার।
অভি ভিতরে ঢুকে সোজা সিঁড়ি ভেঙে রাহুলের ঘরে উঠে গেল।এই সময়টা রাহুলের জানা,এই সময়েই অভি আসে। তাই টেবিলের আলো জ্বালানো, খাতা খোলা।
অভিকে দেখেই রাহুল উঠে দাঁড়াল।
“নমস্কার দাদা।”
অভি হালকা হেসে বলল,
“বসো। আজ কী পড়ছিলে?”
“ইতিহাস… কিন্তু একটা জায়গায় আটকে গেছি।”
রাহুল খাতা এগিয়ে দিল।অভি পাশে বসে পড়তে লাগল, আঙুল দিয়ে লাইন ধরে।
“এখানে তুমি শুধু মুখস্থ করছ। বোঝার চেষ্টা করো,লোকগুলো কী চাইছিল।”
রাহুল একটু ভেবে বলল,
“তাহলে ওরা শুধু ক্ষমতার জন্য নয়… নিজেদের জায়গা বাঁচানোর জন্য?”
অভি তাকাল ছেলেটার দিকে।
“হ্যাঁ। পড়া মানে শুধু পরীক্ষায় নাম তোলা নয়, মানুষকে বুঝতে শেখা।”
একটু চুপচাপ।
রাহুল হঠাৎ বলল,
“দাদা, আগে আমার পড়া একঘেয়ে লাগত। এখন… যদি না বুঝি, খারাপ লাগে।”
অভি ধীরে বলল,
“এই কিছু লাগাটাই আসল। না বুঝে পাশ করলে কিছু হয় না।”
রাহুল মাথা নাড়ল।
“আজকে আমি নিজে নিজে একটা উত্তর লিখে দেখেছি। ভুল হলে ঠিক করে দেবেন?”
“অবশ্যই। ভুল না করলে শেখা যায় না।”
রাহুল খাতায় চোখ নামাল।
“দাদা… আমি কি সত্যিই পারব?”
অভি এক মুহূর্ত থেমে বলল,
“পরিশ্রম করলে সবাই পারে। তুই তো করছিস।”
ঘরের বাইরে, দরজার আড়ালে ছেলেটির বাবা দাঁড়িয়ে ছিলেন।ছেলেটার কণ্ঠে কোনো ভয় নেই।চোখে কোনো অবহেলা নেই।শুধু একটা চেষ্টা করার ইচ্ছে।
তিনি নীরবে দাঁড়িয়ে থাকলেন।
মাথার ভেতরে ভেসে উঠল—এক বছর আগের সেই উদাস, বেপরোয়া ছেলেটার মুখ।আজকের রাহুল আলাদা। তিনি কোনো শব্দ না করে সরে এলেন।
চোখের কোণে একটা অচেনা উজ্জ্বলতা।
তিনি বুঝলেন—এই পরিবর্তন নম্বরের জন্য নয়।
এই পরিবর্তন মানুষ হওয়ার।আর যে মানুষটা, নীরবে বসে পড়াচ্ছে—সে অভি।
বেশ কয়েকটা দিন কেটে গেছে।
এই ক’দিনে একবারও সুচির সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পায়নি অভি।গেটের সামনে গিয়ে ফিরে এসেছে,খবর নিয়েছে—সব খবরই এসেছে বাবুর মুখে।
“শরীরটা আগের থেকে ভালো,”
বাবু বলত,
“কিন্তু মনটা… এখনো ভাঙা।”
এইটুকুই অভির জন্য যথেষ্ট ছিল বুঝে নেওয়ার।সুচির মানসিক ক্ষতটাই সবচেয়ে গভীর।সুচিদের বাড়িতে এখন বাইরের লোকের আনাগোনা প্রায় নেই। আত্মীয়স্বজন দূরে,বন্ধুদের যাতায়াত বন্ধ।এই বাড়িতে যাতায়াতের অনুমতি আছে কেবল একজনের—বাবুর।
আর শহরের অন্য প্রান্তে,বস্তির জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে ধ্বংসস্তূপ।
অনেকেরই খোঁজ নেই।
পুলিশ এখনো ছাই আর ভাঙা টিনের নিচ থেকে
সব দেহ শনাক্ত করতে পারেনি।কেউ নিখোঁজ,কেউ অচেনা নম্বরে পড়ে থাকা লাশের তালিকায়।যারা বেঁচে আছে,স্বজনহারা, ঘরহারা মানুষগুলো,তাদের ঠাঁই হয়েছে শহরের বাইরে,তৈরি করা ডিটেনশন ক্যাম্পে।
শহর ছেড়ে একটু দূরে, গঙ্গার ধারে অস্থায়ীভাবে গড়ে তোলা হয়েছে এই ডিটেনশন ক্যাম্পটা। দূর থেকেই চোখে পড়ে—মাটির ওপর এলোমেলোভাবে পাতা নীল আর কালো ত্রিপলের ছাউনি।বাঁশের খুঁটি দিয়ে কোনোরকমে দাঁড় করানো ছোট ছোট ঘর,যেগুলোকে ঘর বলাও কষ্টকর।পা রাখলেই কাদায় দেবে যায়,ও। গঙ্গার দিক থেকে আসা স্যাঁতসেঁতে বাতাসে ভেজা গন্ধ।ক্যাম্পের ভেতরে ঢুকতেই এক অদ্ভুত নীরবতা।
চেঁচামেচি নেই,কান্নাও যেন ক্লান্ত হয়ে গেছে।শুধু মাঝে মাঝে ভেসে আসে কোনো শিশুর কাশি,বা দূরের কোথাও অসহায় দীর্ঘশ্বাস।এক কোণে সারি দিয়ে বসে আছে কয়েকজন বয়স্ক মানুষ।
চোখে শূন্যতা,হাতে ভাঙা থালা—
কারো কারো মনে নেই কবে শেষ ঠিকঠাক খাবার খেয়েছে।অন্যদিকে কিছু শিশু।খেলছে না,দৌড়োচ্ছে না।
ছাইমাখা চোখে তারা শুধু তাকিয়ে থাকে—যেন কিছু খুঁজছে,কিন্তু কী খুঁজছে সেটাও জানে না।
একটা টিনের চালার নিচে অস্থায়ী মেডিক্যাল ক্যাম্প।
দু-একজন ক্লান্ত নার্স।
একজন ডাক্তার—সারাদিন একই প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে গলা শুকিয়ে গেছে।
“আমার স্বামীকে দেখেছেন?”
“আমার মেয়েটা কি বেঁচে আছে?”
রাত নামলে ক্যাম্প আরও ভয়ানক হয়ে ওঠে। অপর্যাপ্ত আলো,চারদিকে অচেনা ছায়া।ভয় আর অনিশ্চয়তা গঙ্গার বাতাসের সঙ্গে মিশে থাকে।
এই জায়গাতেই প্রতিদিন আসে অভি।
এই মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে সে বোঝে—আগুন শুধু ঘর পোড়ায়নি,মানুষের ভবিষ্যৎও পুড়িয়ে দিয়েছে।
আজও এসেছে অভি।
গঙ্গার দিক থেকে আসা কাঁচা হাওয়াটা ত্রিপলের ছাউনিগুলো কাঁপিয়ে দিচ্ছে।পায়ের নিচে কাদা,
চারদিকে সেই চেনা গন্ধ—ভেজা মাটি, ঘাম আর ওষুধের।অভি ধীরে ধীরে হাঁটে ক্যাম্পের ভেতর।
কাউকে দেখে সে থামে,কারও হাতে জলের বোতল তুলে দেয়,কখনও বা শুধু জিজ্ঞেস করে,
“কেমন আছেন?”
একজন বৃদ্ধা তার হাত চেপে ধরে। কাঁপা গলায় বলে,
“বাবা, আমার ছেলেটার কোনো খবর পেলে জানিও…”
অভি কথা খুঁজে পায় না। শুধু মাথা নাড়ে।এই মাথা নাড়াটুকুই এখন প্রতিশ্রুতি।
এক কোণে বসে থাকা একটা মেয়ে,চুল এলোমেলো,
কোলের মধ্যে ছোট ভাইকে জড়িয়ে।
অভি ওদের সামনে বসে পড়ে।ব্যাগ থেকে বিস্কুট বের করে দেয়।মেয়েটা প্রথমে নেয় না,তারপর ধীরে ধীরে হাত বাড়ায়।
অভি বোঝে, এই জায়গায় বড় বড় কথা চলে না।
চলে ছোট ছোট উপস্থিতি।
সে জানে,
সে কাউকে ঘর ফিরিয়ে দিতে পারবে না। মৃতদের ফিরিয়ে আনতে পারবে না।কিন্তু এই মুহূর্তে এই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা,
এটাই তার দায়িত্ব।
গঙ্গার জল ধীরে বয়ে চলে।আর অভি,প্রতিদিনের মতো আজও এই মানুষের যন্ত্রণার পাশে বসে থাকে,নিঃশব্দে।
সন্ধ্যা গড়িয়ে আসছে।
গঙ্গার দিক থেকে আসা বাতাসটা এখন আর শুধু ঠাণ্ডা নয়,হিমেল।ত্রিপলের ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ে কাঁপিয়ে দিচ্ছে শরীরগুলো।ক্যাম্পের এক পাশে, মাটির ওপর গুটিসুটি হয়ে বসে আছে এক মা।কোলের মধ্যে ছোট্ট একটা বাচ্চা।
মেয়েটার শরীর কাঁপছে,ঠাণ্ডায় না ভয়ে, বোঝা যায় না।
অভির চোখ আটকে যায় ওদের দিকেই।এক পা এগিয়ে গিয়েই সে থেমে যায়।এই মুখটা সে চেনে।
এই মেয়েটাই তো, সুচির স্কুলের ছাত্রী।যে মেয়েটা সুচিকে দেখলে দৌড়ে এসে
“দিদি, দিদি” বলে গলা জড়িয়ে ধরত।আজ তার চুলে কোনো ফিতা নেই।স্কুলের ইউনিফর্ম নেই।চোখে শুধু অবুঝ ভয়।
অভি ধীরে কাছে গিয়ে বসে পড়ে।মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,
“কেমন আছে?”
মহিলাটা কথা বলতে পারে না।শুধু শিশুটাকে আরও শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে।মেয়েটা অভির দিকে তাকায়।
কাঁপা ঠোঁটে ফিসফিস করে বলে,
“দিদি কবে আসবে?”
এই প্রশ্নটার কোনো উত্তর নেই।অভির বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে।সে নিজের গায়ের শালটা খুলে
শিশুটার গায়ে জড়িয়ে দেয়।মেয়েটা একটু থামে কাঁপা।
সন্ধ্যার অন্ধকার ধীরে ধীরে ক্যাম্প ঢেকে ফেলে।
আর অভি বুঝে যায়—
এই আগুনের ক্ষতশুধু বস্তিতে নয়,সুচির পৃথিবীতেও গভীরভাবে বসে আছে।
অভি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।
সারা দিনের ক্লান্তি শরীরটাকে যেন ভারী করে দিয়েছে।
পা দুটো টেনে টেনে ক্যাম্পের বাইরে বেরিয়ে আসে সে।
পেছনে ফেলে আসে ত্রিপলের ছাউনি,ভাঙা কান্না, অপূর্ণ প্রশ্নগুলো।গঙ্গার ধার ধরে হাঁটতে হাঁটতে,তার মাথার ভেতর শুধু ঘুরতে থাকে সেই ছোট্ট মেয়েটার কাঁপা শরীর,
আর প্রশ্ন—
“দিদি কবে আসবে?”
আকাশটা গাঢ় হয়ে এসেছে।দূরে শহরের আলো জ্বলে উঠছে,কিন্তু এই আলো তার ভেতরের অন্ধকার ছুঁতে পারে না।হাঁটতে হাঁটতে সে বুঝতে পারে কতটা একা হয়ে পড়েছে সে। তবু থামে না।কারণ থেমে গেলে এই সব মুখগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
ধীরে ধীরে সে বাড়ির পথ ধরে এগোয়—
ক্লান্ত শরীর,ভারী মন,আর বুকের গভীরে জমে থাকা এক নীরব প্রতিজ্ঞা নিয়ে।
অভি গঙ্গার দিকের পথ ধরে এগোচ্ছিল।মাথার ভেতর তখনো ক্যাম্পের দৃশ্যগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে।এই অন্যমনস্কতার মধ্যেই তার পাশ দিয়ে এসে নিঃশব্দে একটা গাড়ি দাঁড়াল।
অভি প্রথমে খেয়ালই করেনি। দু–এক পা এগিয়েও গিয়েছিল।
হঠাৎ পিছন থেকে একটা কণ্ঠস্বর,
“এই ছেলে ,শোনো!”
অভি চমকে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে
পেছন ফিরে তাকাল।গাড়ির পিছনের জানলাটা নেমে গেছে। ভেতরের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে একজনের গম্ভীর মুখ।চোখে ক্লান্তি, তবু দৃষ্টিতে কঠোরতা।
অভির বুকের ভেতর কেমন করে ওঠে।
এই মানুষটাকে সে চেনে।জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে যিনি ডাকছেন—তিনি সুচরিতার বাবা,
বিমল সেন।
অভি নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে।মাথা একটু নিচু।এই প্রথমবার,এই প্রাসাদের মানুষটি তার নাম না জেনেও সরাসরি তাকে ডাকলেন।
বিমল সেনের চোখে মুখে স্পষ্ট ঔদ্ধত্য। জানলার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে আছেন এমন দৃষ্টিতে, যেন অভি শুধু একটা নামহীন ছায়া, অপ্রয়োজনীয়, অস্বস্তিকর।
কিন্তু বিমল সেন বুদ্ধিমান মানুষ। গলা চড়ালেন না, বিরক্তি ভাবটা লুকিয়ে ফেললেন।
এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে তিনি বললেন,
“দাঁড়িয়ে আছ কেন? ওঠো, গাড়িতে ওঠো।”
অভি হতভম্ব।
এই প্রথম বার সুচরিতার বাবার এত কাছ থেকে ডাক।
সে ইতস্তত করল,
“না… না স্যার… আমি—”
বিমল সেন হাত তুলে থামিয়ে দিলেন। গলা শান্ত, কিন্তু আদেশের মতো দৃঢ় সুরে বললেন,
“ভয় পেও না। কথা বলতেই ডাকছি। কিন্তু এখানে রাস্তায় দাঁড়িয়ে নয়।”
অভি বুঝতে পারল—এই মানুষটা হঠকারী নন,প্রতিটি সিদ্ধান্ত ভেবে নেন।একটু দ্বিধা নিয়ে, ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে
অভি গাড়ির দরজার কাছে এগিয়ে গেল।
মনের ভেতর হাজার প্রশ্ন—
কিন্তু অদ্ভুত ভাবে, একটা অজানা সম্মানবোধও জেগে উঠল।
অভি ধীরে গিয়ে গাড়িতে উঠলো।গাড়ির ভেতরের আলোয় তাঁর মুখে একধরনের স্থিরতা।
গাড়ির দরজা বন্ধ হতেই বাইরের কোলাহলটা কেটে গেল।ভেতরে তৈরি হলোদু’প্রজন্ম, দু’জগতের এক নীরব মুখোমুখি মুহূর্ত।
গাড়িটা চলতে শুরু করল ধীরে।
কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলল না।শুধু ইঞ্জিনের মৃদু শব্দ, আর জানলার বাইরে পিছিয়ে পড়তে থাকা আলো।
বিমল সেন ইচ্ছে করেই চুপ ছিলেন।
তিনি দেখছিলেন, এই ছেলেটা কতটা ক্লান্ত, কতটা ভাঙা,
আর তবু ভেতরে কোথাও একটা অদ্ভুত দৃঢ়তা।
কিছুক্ষণ পর তিনি শান্ত গলায় বললেন,
“এই কটা দিন… যেটা ঘটেছে, সেটা যে কারোর মাথা এলোমেলো করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তাই আগে একটু স্বাভাবিক হও। তাড়া নেই।”
অভি ধীরে শ্বাস নিল।
চোখ নামিয়ে বলল,
“জি।”
আরও কয়েক সেকেন্ড চুপ।
তারপর বিমল সেন কথার ভূমিকা টানলেন,
“আমি অনেক ব্যবসা করেছি, অভি।মানুষ চিনেছি।
কেউ কথা বলে জোরে, কেউ নীরবে। তোমার মধ্যে আমি দ্বিতীয়টাই দেখছি।”
অভি কিছু বলল না।
সে জানত—এই প্রশংসা নয়, একটা পর্যবেক্ষণ।
বিমল সেন এবার মূল কথায় এলেন।কণ্ঠে কোনো রাগ নেই,কিন্তু বাস্তবতার ওজন ছিল,
“সুচরিতা আমার মেয়ে।সে বড় হয়েছে নিরাপত্তার মধ্যে, সুযোগের মধ্যে, পছন্দ করার স্বাধীনতার মধ্যে।
তুমি বড় হয়েছ লড়াই করে। এই দুইটা পথ এক নয়।”
তিনি জানলার দিকে তাকালেন, তারপর বললেন,
“এটা ভালো-মন্দের প্রশ্ন না।এটা স্ট্যাটাসের পার্থক্য।”
অভির বুকের ভেতর কিছু একটা কেঁপে উঠল।তবু সে চুপ রইল।
বিমল সেন ধীরে ধীরে বোঝালেন,
“সুচি চাইলে তোমার পাশে দাঁড়াতে পারে। সে সাহসী।
কিন্তু সমাজ তোমাকে দু’জনকে একসাথে দাঁড়াতে দেবে কি না—এই প্রশ্নটাই আসল।”
একটু থেমে, গলা আরও নরম করে বললেন,
“ভালোবাসা অনেক সময় যথেষ্ট হয় না, অভি।কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেটা যুদ্ধ ডেকে আনে।”
গাড়ির ভেতরে নীরবতা নেমে এলো।এই নীরবতায় কোনো অপমান ছিল না—ছিল এক নির্মম সত্য,যেটা অস্বীকার করা যায় না।
অভি জানত,এই কথা সে আগেই ভেবেছে। আজ শুধু
অন্যের মুখে শুনল।
বিমল সেন আর একটু সামনের দিকে ঝুঁকলেন। কথার গতি ধীর, স্বর স্থির। যেন তিনি জানেন, প্রতিটা শব্দ কাউকে ভাঙছে।
“দেখো অভি,” তিনি বললেন,
“যোগ্যতা মানে শুধু মেধা না। যোগ্যতা মানে পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষমতা।”
অভি চুপ করে শুনছিল।
তার হাত দুটো শক্ত হয়ে মুঠো বেঁধে গেছে, তবু সে চোখ তুলল না।
বিমল সেন বলতেই থাকলেন,
“আজ তুমি ডিটেনশন ক্যাম্পে যাচ্ছ, মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছ—এটা মহৎ।কিন্তু কাল যদি এই লড়াই আরও বড় হয়,যদি আদালত, রাজনীতি, ক্ষমতা—সব জড়িয়ে যায়,
তখন তুমি কী নিয়ে দাঁড়াবে সুচির পাশে?”
তিনি একটু থামলেন।এই থামাটাই সবচেয়ে ভারী।
“আমি টাকাকে বড় করছি না,”
বিমল সেন শান্ত গলায় যোগ করলেন,
“কিন্তু টাকা ছাড়া ক্ষমতার সামনে দাঁড়ানো যায় না, এই সত্যটা আমি জীবনে শিখেছি।”
অভির বুকের ভেতর যেন কেউ হাত ঢুকিয়ে চেপে ধরল।
সে বলতে চাইল,
আমি লড়ব,
কিন্তু শব্দগুলো বেরোল না।
বিমল সেন এবার প্রায় ফিসফিস করে বললেন,
“সুচির পাশে দাঁড়াতে হলে শুধু ভালো মানুষ হলেই হয় না, অভি। তার জীবনটা যে ঝড়ের মধ্যে পড়েছে, সেই ঝড় সামলানোর মতো শক্ত ভিত দরকার।”
তারপর খুব ধীরে, প্রায় নির্দয়ভাবে যোগ করলেন,
“সেই ভিতটা এখন তোমার নেই।”
এই কথাটাই শেষ পেরেক।কোনো অপমানের শব্দ নেই,
কিন্তু সিদ্ধান্তটা পরিষ্কার।গাড়ির ভেতর নীরবতা জমে গেল।অভি জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল।আলো, রাস্তা, মানুষ সব কেমন জেনো ঝাপসা হয়ে আসছে।
“সে ভিত টা তোমার নেই” — এই সামান্য একটি কথাই অভির মেরুদণ্ড টাই নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
সে বুঝে গেল—এই মানুষটা তাকে ছোট বলছে না।সে বলছে,এই লড়াইয়ে দাঁড়ানোর জায়গা এখনও তার হয়নি।আর সেই উপলব্ধিটাই সবচেয়ে বেশি ব্যথা দেয়।
অভির বুকের ভেতরটা হঠাৎ যেন শক্ত হয়ে উঠল।এতক্ষণ যে কথা গুলো গিলে যাচ্ছিল, সেগুলো এবার আর চেপে রাখা গেল না।
সে ধীরে মাথা তুলল।
চোখে তখন কোনো ভিক্ষার দৃষ্টি নেই, আছে একরাশ জেদ, আর অপমানকে শক্তিতে বদলে ফেলার দৃঢ়তা।
“আপনি বলছেন…”
অভি শান্ত গলায় বলল,
“আমার যোগ্যতা নেই।”
এক মুহূর্ত থামল।
তারপর খুব স্পষ্ট করে, প্রতিটা শব্দ আলাদা করে উচ্চারণ করল,
“আর আমি যদি সেই যোগ্যতাটাই ছিনিয়ে আনতে পারি?”
গাড়ির ভেতরের বাতাসটা যেন থমকে গেল।
বিমল সেন প্রথমবারের মতো একটু অবাক হলেন।
এই ছেলেটার গলায় চিৎকার নেই, কিন্তু কথার ভেতরে এমন এক দৃঢ়তা, যা হালকা করে নেওয়া যায় না।
অভি বলে চলল,
“আমি আজ যা নই, সেটা আপনি ঠিকই বলছেন।
কিন্তু আমি যা হতে পারি, সেটার হিসেব আপনি করেননি।”
তার কণ্ঠে এবার কোনো আবেগ নেই, আছে প্রতিজ্ঞা।
“ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট হওয়া আমার স্বপ্ন,”
সে ধীরে বলল,
“শুধু নিজের জন্য নয়।এই মানুষগুলো—যাদের আপনি গাড়ির জানলা দিয়ে দেখেন, তাদের জন্য।”
একটু থেমে সে যোগ করল,
“আমি শর্টকাট জানি না। কিন্তু আমি হার মানতেও জানি না।”
বিমল সেন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।তার অভিজ্ঞ চোখে অনেক মানুষ দেখেছে।কিন্তু এই জেদটা নতুন।
অভি শেষ কথাটা বলল, প্রায় নিঃশব্দে,
“আজ যদি আপনি বলেন, আমি যোগ্য নই, তাহলে আমি সেটাকে অজুহাত বানাব না। আমি সেটাকেই সিঁড়ি বানাব।”
বিমল সেন ঘাঘু ব্যবসায়ী মানুষ।মানুষের চোখ পড়তে তাঁর ভুল হয় না,সংখ্যা, লাভ-ক্ষতি যেমন পড়তে পারেন, তেমনি পড়তে পারেন মানুষের মনও।
তিনি অভির চোখের দিকে আরেকবার তাকালেন।সেই দৃষ্টিতে আবেগ নেই, উন্মাদনা নেই,আছে হিসেবি দৃঢ়তা। দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রস্তুতি।
একটু হেসে নিলেন বিমল সেন।সে হাসি প্রশ্রয়ের নয়, চ্যালেঞ্জের।
“তোমার চোখে আজ আমি ফাঁকা সাহস দেখছি না,”
তিনি ধীর স্বরে বললেন,
“দেখছি এমন একটা আগুন,যেটা সময় পেলেই জ্বলে উঠবে।”
একটু থেমে জানালার বাইরে তাকালেন।
তারপর খুব ঠান্ডা মাথায় আসল কথাটা বললেন,
“যেদিন তুমি সত্যিই ওই যোগ্যতাটা ছিনিয়ে আনতে পারবে,যেদিন এই সমাজ তোমার নামের আগে
নিজে থেকে সম্মান বসাবে। সেদিন আমি নিজেই সূচিকে তোমার হাতে তুলে দেবো।”
কোনো নাটকীয়তা নেই।কোনো আবেগের চুক্তি নয়।
এটা একেবারে ব্যবসায়ীর ভাষায় করা শর্ত—স্পষ্ট, নির্মম, কিন্তু সৎ।
গাড়ি থামল।
বিমল সেনের গলা এবার আর আগের মতো নিশ্চিন্ত নয়।
একটু নিচু, একটু কঠিন।
“কিন্তু যদি না পারো তুমি?”
গাড়ির ভেতর কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা।ইঞ্জিনের মৃদু শব্দ ছাড়া কিছু শোনা যায় না।অভি কোনো তাড়াহুড়ো করল না।চোখ নামাল না বরং যেন এই প্রশ্নটার জন্যই সে তৈরি ছিল।
ধীরে বলল,
“তাহলে আপনি সূচিকে আমার কাছ থেকে নয়,
জীবন থেকেই সরিয়ে নেবেন।”
একটু থেমে যোগ করল,
“কিন্তু কি জানেন তো স্যার, আমি ব্যর্থ হলে সেটা আমার হার হবে, সূচির নয়।”
“আর আমি চেষ্টা না করলে হয়তো আজও ভাঙ্গা মাটির ঘরের ছায়াতেই পড়ে থাকতাম।”
বিমল সেন এবার সত্যিই চুপ করে গেলেন।
এই উত্তরটা তিনি হিসেবের খাতায় ফেলতে পারলেন না।
অভি শেষ কথাটা বলল,
“আপনি আমাকে সময় দিলেন, আমি নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ পেলাম…
এটাই আমার সবচেয়ে বড় পুঁজি।”
অভি গাড়ী থেকে নেমে এলো। দরজার হাতল ধরল।
পেছন ফিরে তাকিয়ে শুধু বলল—
“আমি ভাঙার জন্য হাঁটছি না, স্যার।আমি গড়ার জন্যই নামছি।”
গাড়ির জানালা ধীরে উঠে গেল।
ভিতরে বসে বিমল সেন ভাবলেন,
“এই ছেলেটা বিপজ্জনক। কারণ ও হার মানলেও মাথা নিচু করবে না।”
আর অভি হাঁটতে হাঁটতে বুঝে গেল,
আজ থেকে তার স্বপ্নের নাম শুধু ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট নয়, আজ থেকে তার স্বপ্নের নাম —
যোগ্যতা।
—oooXXooo—
![]()







