মেঘের কোলে ঘর
— নবকুমার চক্রবর্ত্তী (নবু)
শ্রুতির বিয়েটা যখন ঠিক হলো, কলকাতার আকাশ তখন কালবৈশাখীর অপেক্ষায় থম মেরে আছে। ছেলের নাম নিঝুম, থাকে মেঘালয়ের এক অখ্যাত গ্রামে। পেশায় চাষি, তবে আধুনিক কৃষিবিদ্যা জানা। শ্রুতির বাবা, রিটায়ার্ড সরকারি ক্লার্ক বিমলেন্দু বাবু, যেন যমের দুয়ার থেকে ফিরে এলেন। মেয়ের বয়স উনত্রিশ, গায়ের রঙ তথাকথিত ‘দুধে-আলতা’ নয়, তার ওপর একটা ভেঙে যাওয়া প্রেমের কেচ্ছা পাড়ায় চাউর। মধ্যবিত্তের সংসারে মেয়ে ‘বোঝা’ আর কেচ্ছা ‘কলঙ্ক’। পাত্রপক্ষ পন চায়নি, শুধু মেয়ে চেয়েছে—এটাই বিমলেন্দু বাবুর কাছে লটারি, কিংবা বলা ভালো, আবর্জনার স্তূপ থেকে হিরে কুড়িয়ে পাওয়া।
শ্রুতির আপত্তি করার জোর ছিল না। অনিকেত তাকে গত তিন বছর ধরে ক্যাফে কফি ডে আর নন্দন চত্বরে ‘বিপ্লব’ আর ‘মুক্ত চিন্তা’ শিখিয়েছে, কিন্তু বিয়ের কথা উঠতেই তার মেরুদণ্ডটা যে দোকানে কেনা সস্তা প্লাস্টিকের, সেটা প্রমাণ করে দিয়েছে। অনিকেত বলেছিল, “মা মানবে না রে, তুই তো জানিস আমার ফ্যামিলি স্টেটাস…”
শ্রুতির মনে হয়েছিল, স্টেটাস নয়, আসলে অনিকেতের সাহসের অভাবটাই আসল অসুখ। ভিক্টর হুগো বলেছিলেন, “বিবেকের চেয়ে বড় আদালত আর নেই”—কিন্তু অনিকেতের সেই আদালত কবেই মুলতুবী হয়ে গেছে। তাই যেদিন রেজিস্ট্রি হলো, শ্রুতি কাঁদেনি। চোখের জল ফেলার মতো বিলাসিতা মধ্যবিত্তের সাজে না। সে শুধু অনিকেতের নম্বরটা ব্লক করেছিল আর ব্যাগে ভরে নিয়েছিল একরাশি জমানো অভিমান আর নীরবতা।
শিলং থেকে অনেকটা ভেতরে, ডাউকি ছাড়িয়ে আরও দূরে সেই গ্রাম। নাম সোনাংপেডেং। পাহাড়ি রাস্তা, পাইন আর সুপারি গাছের জঙ্গল। শ্রুতির নতুন বরের নাম নিঝুম। মানুষটাও নামের মতোই। কথা বলে মাপা, হাসে কম। বিয়ের প্রথম রাতে সে শ্রুতিকে বলেছিল, “এখানে নেটওয়ার্ক কম থাকে। অভ্যেস হয়ে যাবে।” ব্যস, ওইটুকুই। কোনো কাব্য নেই, কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, নেই শরীরের উপর জোরজবরদস্তির কোনো পাশবিকতা।
প্রথম ছ’মাস শ্রুতির কাটল নির্বাসনের মতো। কলকাতার ফ্ল্যাটবাড়ি, জ্যাম, মেট্রোর ঘাম আর অফিসের পলিটিক্স—সব যেন এক অন্য গ্রহের স্মৃতি। এখানে সময় থমকে আছে। নিঝুম ভোর চারটেয় ওঠে। চা খেয়েই বেরিয়ে যায় ক্ষেতে। ফেরে দুপুরে। শ্রুতির কাজ নেই বিশেষ। কাঠের দোতলা বাড়ি। বারান্দায় দাঁড়ালে নিচে উমনগোট নদী দেখা যায়, কাঁচের মতো স্বচ্ছ জল। কিন্তু শ্রুতির চোখে সেই স্বচ্ছতা ধরা পড়ত না। সে দেখত আদিমতা। তার মনে হতো, এই জঙ্গল, এই পাহাড় তাকে গিলতে আসছে। সে মিস করত অনিকেতের সেই ইনটেলেকচুয়াল ভণ্ডামিগুলোও। অন্তত সেখানে কথার পিঠে কথা ছিল, এখানে শুধুই ঝিঁঝিঁর ডাক আর অসহ্য নির্জনতা।
নিঝুম মানুষটা বড় অদ্ভুত। সে শ্রুতির গায়ে হাত দেয় না বিশেষ, যদি না শ্রুতি সাড়া দেয়। সে লক্ষ্য করে, শ্রুতি জানলায় বসে আকাশ দেখে। একদিন সে বাজার থেকে একটা রেডিও এনে দিল। বলল, “শহরের খবর পাবে।” শ্রুতি অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। লোকটা কি তার একাকিত্ব বোঝে? নাকি করুণা করে? নাকি এ এক নীরব মনস্তাত্ত্বিক চাল? বোঝা দায়।
ঘটনাটা ঘটল বর্ষায়। মেঘালয়ের বর্ষা কলকাতার মতো রবীন্দ্র-সঙ্গীত মার্কা রোমান্টিক নয়, নিষ্ঠুর। আকাশ ভেঙে জল নামে, পাহাড় ধসে পড়ে। টানা তিনদিন ধরে মুষলধারে বৃষ্টি। বিদ্যুৎ নেই। হ্যারিকেনের আলোয় ঘর অন্ধকার। নিঝুম বাড়িতে নেই। সে গেছে নদীর ধারের বাঁধ আটকাতে। গ্রামের সব পুরুষ গেছে। তাদের ধানের জমি, পানের বরজ বাঁচাতে হবে। শহরের মানুষ বৃষ্টি দেখে খিচুড়ি রাঁধে, আর এরা বৃষ্টি দেখে জীবন বাজি রাখে।
রাত তখন দুটো। বাইরে প্রলয় চলছে। শ্রুতির ভয় করছিল। মনে পড়ছিল অনিকেতের কথা। অনিকেত বৃষ্টির দিনে ফেসবুকে খিচুড়ি আর ইলিশ মাছের ছবি দিত, লিখত—‘বৃষ্টির দিনে মনে পড়ে তোকে’। কত মেকি! কত সস্তা! যেন অনুভূতির বিজ্ঞাপন চলছে! হঠাৎ দরজায় শব্দ। শ্রুতি হ্যারিকেন নিয়ে দরজা খুলল।
নিঝুম দাঁড়িয়ে। সর্বাঙ্গ কাদা আর জলে মাখামাখি। হাতে একটা বড় পলিথিনের প্যাকেটে মোড়া কিছু। সে কাঁপছিল শীতে। শ্রুতি তোয়ালে এগিয়ে দিল। নিঝুম সেটা না নিয়ে প্যাকেটের দিকে ইশারা করে বলল, “তোমার জন্য। শহরে তো এসব খেতে…”
প্যাকেটের ভেতর কয়েকটা ভিজে যাওয়া ম্যাগাজিন আর এক প্যাকেট ডার্ক চকোলেট। শহর থেকে কেউ আসছিল, তার কাছে আনিয়েছে। এই দুর্যোগের রাতে, যখন নিজের ফসল ভেসে যাওয়ার ভয়, তখন লোকটা মনে রেখেছে শ্রুতির চকোলেট প্রীতির কথা! ভালোবাসা যে শুধু শব্দ নয়, ক্রিয়াপদ—নিঝুম সেটা না বলেই বুঝিয়ে দিল।
শ্রুতি সেদিন রাতে ঘুমোতে পারেনি। পাশে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়া নিঝুমের দিকে তাকিয়ে সে প্রথমবার মানুষটাকে দেখল। অনিকেত তাকে শুনিয়েছিল স্বাধীনতার গল্প, কিন্তু নিঝুম তাকে দিচ্ছে নিরাপত্তার চাদর। অনিকেত প্রেমকে পণ্য করেছিল, আর এই চাষি মানুষটা প্রেমকে করেছে ধর্ম আর দায়িত্ব।
পরদিন সকালে বৃষ্টি থামল। শ্রুতি বারান্দায় এসে দাঁড়াল। মেঘ কেটে রোদ উঠছে। পাহাড়ের গায়ে আটকে থাকা মেঘগুলো যেন তুলোর মতো। নিচে নিঝুম নৌকা ঠিক করছে। শ্রুতি নামল। কাদা মাড়িয়ে সে নদীর ঘাটে গেল।
নিঝুম মুখ তুলে চাইল। চোখে প্রশ্ন।
শ্রুতি বলল, “নৌকায় আমাকে নেবে?”
নিঝুম হাসল। খুব ম্লান, কিন্তু মাটির মতো খাঁটি হাসি। বলল, “চলো।”
নৌকা মাঝনদীতে। জল এত স্বচ্ছ যে নিচের পাথর দেখা যাচ্ছে। শ্রুতি হাত ডোবাল জলে। ঠান্ডা কনকনে জল। তার মনে হলো, কলকাতার ধুলো, অনিকেতের দেওয়া অপমান, নিজের মধ্যবিত্ত অহংকার—সব এই জলে ধুয়ে যাচ্ছে।
সে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। নেটওয়ার্কের একটা দাগ দেখা যাচ্ছে। অনিকেতের একটা পুরনো মেসেজ ড্রাফটে সেভ করা ছিল—‘কেন চলে গেলি?’
শ্রুতি ফোনটা বন্ধ করল। তারপর নিঝুমের দিকে তাকিয়ে বলল, “শহরের সব সিম কার্ড এখানে অকেজো, তাই না?”
নিঝুম বৈঠা বাইতে বাইতে বলল, “শহর দরকার নেই। মেঘের কোলে ঘর থাকলে, ছাদের দরকার হয় না। মন পরিষ্কার থাকলে, নেটওয়ার্ক লাগে না।” মনের মধ্যে মন থাকলে খুব শান্ত ভাবে কিছু সময় চোখ বুজে থাকো, দেখবে তুমি তোমার শ্বপ্নের শহর দেখতে পাবে।
শ্রুতির মনে হলো, এই অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত মানুষটা এক লাইনে যা বলল, তা কলকাতার হাজারটা লিটল ম্যাগাজিনেও লেখা নেই। সে বুঝল, ভালোবাসা কোনো আবৃত্তি নয়, ভালোবাসা হলো ঝড়ের রাতে ভিজে চুপচাপ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা। প্লেটো বলেছিলেন, “প্রেমের স্পর্শে সবাই কবি হয়ে ওঠে,” কিন্তু শ্রুতি দেখল, প্রেমের স্পর্শে মানুষ ‘মানুষ’ হয়ে ওঠে।
সেদিন বিকেলে শ্রুতি বারান্দায় বসে ডায়েরি লিখল না। শুধু রেডিওটা বন্ধ করে দিল। পাখির ডাক আর নদীর শব্দ শুনতে শুনতে তার মনে হলো—এতদিন সে ভুল স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষা করছিল। এই জঙ্গল, এই নদী, এই নীরব স্বামী—এটাই তার গন্তব্য ছিল। শহর তাকে চতুর হতে শিখিয়েছিল, গ্রাম তাকে মানুষ হতে শেখাল। শহর শিখিয়েছিল মুখোশ পরতে, পাহাড় শেখাল অনুভুতি দিয়ে মুখ দেখতে।
দিন শেষ হয়ে এল। সন্ধ্যা নামছে। শ্রুতি দেখল, নিঝুম উঠোন দিয়ে হেঁটে আসছে। শ্রুতির আর কলকাতা মনে পড়ল না। সে উঠে গিয়ে চায়ের জল চাপাল। ভাতের হাড়িতে চাল ধুতে ধুতে শ্রুতির মনে হলো, মুক্তি মানে পালানো নয়, মুক্তি মানে শেকড় খুঁজে পাওয়া।
সেদিন রাত্রে, বিছানায় শুয়ে জানলার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে শ্রুতি নিজেকেই প্রশ্ন করল—সে কি হেরে গেল? নাকি জিতে গেল? উত্তরটা জানা নেই। তবে সে জানত, অনিকেত বা কলকাতার ওই তথাকথিত ‘স্মার্ট’ সমাজ তাকে কোনোদিন এই শান্তি দিতে পারত না। ভণ্ডামির মুখোশ পরা শহরের চেয়ে, কাদা মাখা গ্রাম অনেক বেশি সত্য। কাঁচের ঘরে বসে যারা পাথর ছোঁড়ে, তারা কোনোদিন মাটির ঘরের সুখ বুঝবে না।
সমাপ্ত
![]()







