অন্তর্যামী
সলিল চক্রবর্ত্তী
আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগের একটা ছোট্ট ঘটনাঃ-
তখনকার গ্রাম বাংলা আজকের মতো নয়। গ্রামের আশি শতাংশ মানুষ দারিদ্র সীমার নিচে, হত দরিদ্র বললেও ভুল বলা হয় না। এমনি এক গ্রামের হাটখোলায় এক পড়ন্ত বিকেলে বিশাল বটবৃক্ষের নিচে বেশ কিছু শিশু আলগা গায়ে, খালি পায়ে অনাবিল আনন্দে খেলায় মত্ত। কেউ নারকের মালার দাঁড়িপাল্লা বানিয়ে মাটি, ঘাস পাতা নিয়ে দোকানদারি খেলছে, তো কেউ পুতুল নিয়ে ঘরকন্না, কেউবা লুকোচুরি ইত্যাদি ইত্যাদি।
বছর পাঁচেকের পুঁটি খেলছে না, ও দাঁড়িয়ে আব্বাসের দোকানদারি খেলা দেখছে। কাঁঠাল পাতার বিনিময়ে অন্য শিশুরা মাটির চাল,ডাল,তেল,নুন কিনছে। একজন এসে কাঁঠাল পাতার বিনিময়ে মুড়ি,চানাচুর চাইল। আব্বাস অভিজ্ঞ দোকানদারের মতো মাটি ওজন করে তার হিসাব মিটিয়ে দিল। পুঁটি দেখছে আর ভাবছে মুড়ি চানাচুরটা যদি মাটির না হয়ে সত্যিকারের হতো তাহলে সে কাঁঠাল পাতা দিয়ে কিনে খেতে পারত।
আজ সারাদিন সে কিছু খাইনি। মা কোন সকালে একটা শুকনো আধপোড়া রুটি দিয়ে কাজে গেছে, এখনো ফেরেনি। পুঁটি পেটের জ্বালা আর সইতে পারছে না। কতক্ষণ আর জল খেয়ে থাকা যায়!
এমতাবস্থায় হাটখোলায় এসে উপস্থিত হল,এক ফেরিওয়ালা। “কটকটি চাই ক-ট-ক-টি,গরম গরম ক-ট-ক-টি। একটা পাঁচ পয়সা, দশ পয়সায় তিনটে হবে।” ফেরিওয়ালার হাঁক শুনে যে যার খেলা ফেলে বাড়ির দিকে দৌড়াল। ফেরিওয়ালা শিশু গুলোর আচরণ অনুমান করে মাথা থেকে কটকটির ঝুঁড়িটা নামিয়ে গামছা দিয়ে গায়ের ঘাম মুছতে থাকল। পুঁটি ছুটে বাড়ি না গিয়ে গুটিগুটি পায়ে ফেরিওয়ালার কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। ফেরিওয়ালার নজর না এড়ালেও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে কটকটির উপর থেকে কাগজের ডাকনা সরাতে ব্যাস্ত হয়ে পড়ল। এরি মধ্যে একে একে শিশুরা সকলে ফিরে এসে ফেরিওয়ালার কাছ থেকে কটকটি কিনে মহানন্দে ভেঙে ভেঙে খেতে থাকল। পুঁটি সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যে খিদে যেন তার চরমে উঠে গেল। তাকে একটা কটকটি কিনে দেওয়ার মতো কেউ নেই। ফেরিওয়ালার বেচাকেনা শেষের দিকে, এবার সেখান থেকে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফেরিওয়ালা দেখল পুঁটি ছুটে এক দিকে চলে গেল। ফেরিওয়ালা ভাবল নিশ্চই বাড়িতে পয়সা আনতে গেছে। আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সে ঝুড়ি মাথায় তুলতে যাবে এমন সময় পুঁটি ছুটে এসে ফেরিওয়ালার সামনে থমকে দাঁড়ালো। ফেরিওয়ালা মাথা তুলে তার মুখের দিকে তাকাতেই সে হাতটা এগিয়ে দিল। ফেরিওয়ালা পুঁটির হাতের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। তার হাতে একটা কাঁঠাল পাতা। অপলকভাবে ভাবে দু’জন দুজনের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। তারপর ফেরিওয়ালা ঠোটের কোনায় একটা প্রশস্তির হাসি হেসে পুঁটির হাত থেকে কাঁঠাল পাতাটা নিয়ে তার হাতে দুটো কটকটি দিল। কটকটি হাতে নিয়ে পুঁটির চোখ আনন্দে ছলছল করে উঠল। ফেরিওয়ালা ঝুড়ি মাথায় তুলে “কটকটি চাই ক-ট-ক-টি, গরম গরম ক-ট-ক-টি” বলে হাঁকতে হাঁকতে চলে গেল। ধীরেধীরে দিনের আলো ফুরিয়ে এল। নির্জনতা ফিরে এল হাটখোলায়। বিরল বেচাকেনার সাক্ষী রইল শুধু প্রহরীর মতো দাড়িয়ে থাকা বটবৃক্ষটি।
—oooXXooo—
![]()







