নাগরিকত্বের নথিপত্র
নবকুমার চক্রবর্ত্তী (নবু)
রহস্য গল্প (অনিরুদ্ধ সেন সিরিজ)
বাইরে আকাশটা যেন মন খারাপ করা একখানা স্লেট। গঙ্গার ওপর দিয়ে একটা হাড়হিম করা হাওয়া জানলা দিয়ে ঢুকে সোজা অনিরুদ্ধর হাড়পাঁজরায় ধাক্কা মারল। অনিরুদ্ধ নড়ল না। ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে ও একমনে জানলার গ্রিলের জং পড়া অংশটা দেখছে। যেন মহাবিশ্বের সব রহস্য, মানুষের সম্পর্কের মতোই, ওই জংয়ের মধ্যেই ক্ষয় হতে হতে লুকিয়ে আছে।
আমি বললাম, “চা? আদা দিয়ে?”
অনিরুদ্ধ উত্তর দিল না। ওর নীরবতা মানে সম্মতি। অথবা বিরক্তি। দুটোর তফাত বোঝা আমার সাধ্য নয়। আমি তারক। এই ব্যাচেলর ফ্ল্যাটের রাঁধুনি, বয়, এবং অনিরুদ্ধর তথাকথিত সহকারী—যাকে সমাজ বলে ‘সাইডকিক’, আর আমি বলি ‘নির্বাক দর্শক’।
চা নিয়ে ফিরতেই দেখি ঘরে নতুন অতিথি। মাঝবয়সি ভদ্রলোক। নাম বৈদ্যনাথ ঘোষ। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, গায়ে সস্তা কিন্তু পরিষ্কার সোয়েটার। হাতে একটা বড় খাকি রঙের খাম। ভদ্রলোকের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। অথচ বাইরে তাপমাত্রা বারো ডিগ্রি। ভয় যে তাপমাত্রার তোয়াক্কা করে না, তা ওনার কপাল দেখেই মালুম হলো।
অনিরুদ্ধ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আড়চোখে চাইল, “আপনার সমস্যাটা কি পুলিশকে জানানোর মতো নয়? নাকি পুলিশকে জানালে সম্মানহানির ভয়টা চুরির ক্ষতির চেয়েও বেশি?”
বৈদ্যনাথ বাবু চমকে উঠলেন। “আপনি জানলেন কি করে?”
“আপনার জুতোর সুখতলায় লাল মাটি। ওটা কোচবিহার বা ডুয়ার্সের মাটি। কিন্তু হাতে যে খামটা ধরে আছেন, তার ওপরের স্ট্যাম্পটা আলিপুরের। অর্থাৎ কেসটা লোকাল নয়, আবার পুরোপুরি আইনিও নয়। আইন যেখানে শেষ হয়, মধ্যবিত্তের গোপন পাপ সেখান থেকেই শুরু হয়। বলুন, কী হয়েছে।”
বৈদ্যনাথবাবু একটু নড়েচড়ে বসলেন। গলার স্বর নামিয়ে বললেন, “স্যার, এক অদ্ভুত ভুতুড়ে কাণ্ড। আমি কোচবিহারের ছেলে। পরিবেশকর্মী। সাত বছর আগে, ২০১৮-র শীতে আমার বাড়ি চুরি হয়েছিল। আমি বাড়িতে ছিলাম না। ফিরে দেখি সব তছনছ। আলমারি ভাঙা। কিন্তু সোনাদানা নয়, চোর নিয়ে গেছিল দুটো ফাইল। আমার স্কুল সার্টিফিকেট, বার্থ সার্টিফিকেট, প্যান কার্ড, জমির দলিল—সব।”
আমি বললাম, “কাগজ চোর? আজব তো! টাকা ছেড়ে কাগজ? চোর কি সাহিত্যিক ছিল নাকি?”
অনিরুদ্ধ আমাকে হাত তুলে থামিয়ে দিল। “তারপর?”
“থানায় ডায়েরি করেছিলাম। লাভ হয়নি। সাত বছর কেটে গেছে। আমি হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম। ভোটার তালিকার সংশোধনের কাজ চলছে, সবাই সিএএ (CAA)**, এনআরসি নিয়ে আতঙ্কিত। আমারও ঘুম উড়েছিল। কাগজ ছাড়া আমি তো রাষ্ট্রহীন! আমার অস্তিত্বই তো ওই কয়েক দিস্তা কাগজে বন্দি! ঠিক তখনই, গত পরশু… এই পার্সেলটা এল।”
বৈদ্যনাথবাবু খাকি খামটা টেবিলের ওপর রাখলেন। “ডাকযোগে এসেছে। বক্সিরহাটের লাঙ্গল গ্রাম থেকে। খুলে দেখি, আমার সেই চুরি যাওয়া দুটো ফাইল! সব কাগজ অক্ষত। সাত বছর পর চোর আমার কাগজ ফেরত পাঠাল! কেন? দয়া করে? নাকি অন্য কোনো মতলব আছে?”
অনিরুদ্ধ খামটা হাতে নিল। ওটার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর নাকের কাছে নিয়ে শুঁকল।
“হুম। ন্যাপথলিন আর… পোড়া বিড়ি। সস্তা তামাক। আর দীর্ঘদিনের জমে থাকা ষড়যন্ত্রের গন্ধ।”
অনিরুদ্ধ হঠাৎ বৈদ্যনাথ বাবুর চোখের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টি। যেন এক্স-রে মেশিন, যা চামড়া ভেদ করে সোজা বিবেকে গিয়ে বিঁধছে।
“সাত বছর আগে কাকে সন্দেহ করেছিলেন? সত্যিটা বলুন। জজ সাহেবের এজলাস নয় এটা।”
বৈদ্যনাথ বাবু ঢোক গিললেন। “কাউকে না… মানে, পুলিশকে বলেছিলাম পাড়ার কিছু নেশাড়ু ছেলের কথা।”
“মিথ্যা বলছেন।” অনিরুদ্ধর গলা চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল। “আপনি জানেন চোর কে ছিল। কিন্তু পুলিশকে বলেননি। কেন? আত্মীয়? ভাই? শ্যালক? রক্তের সম্পর্ক যখন পচে যায়, তখন তার দুর্গন্ধ বেশি হয়, তাই না?”
বৈদ্যনাথবাবু ঘেমে নেয়ে উঠলেন। “আমার… আমার ছোট ভাই। সুমিত।”
ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। গঙ্গার বুক চিরে একটা স্টিমারের ভোঁ ভেসে এল—যেন কোনো এক ডুবন্ত মানুষের আর্তনাদ।
অনিরুদ্ধ হাসল। বিদ্রুপের হাসি। “মিডল ক্লাস মরালিটি! ‘লোকে কী বলবে’—এই মন্ত্র জপতে জপতে আপনারা নিজেদের সর্বনাশ করেন নিজেরাই। ভাই চুরি করেছে, তাই পুলিশে দেইনি। কিন্তু ভাই চুরি করল কেন? জমি?”
বৈদ্যনাথ বাবু মাথা নিচু করলেন। “হ্যাঁ। পৈতৃক বাড়িটা আমার নামে। সুমিতের ধারণা ছিল, কাগজগুলো গায়েব করে দিলে আমি আর বাড়ির মালিকানা প্রমাণ করতে পারব না। ও দখল নেবে। ভাই হয়ে ভাইয়ের…”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “তা এখন ফেরত দিল কেন? হঠাৎ ভাইয়ের প্রতি প্রেম জাগল? নাকি বাল্মীকি হয়ে গেল?”
অনিরুদ্ধ খামটা থেকে একটা কাগজ বের করল। একটা পুরোনো খবরের কাগজের টুকরো, যেটা দিয়ে ফাইলগুলো মোড়া ছিল। কাগজটা বক্সিরহাটের স্থানীয় পত্রিকার। তারিখ—সাত দিন আগের।
“প্রেম নয় তারক, ভয়। শুধুই ভয়। স্বার্থপর মানুষ কখনো শুধরোয় না, সে কেবল কৌশল বদলায়।” অনিরুদ্ধ উঠে দাঁড়াল। জানলার দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়াতেই ওর ছায়াটা দীর্ঘ হয়ে মেঝের ওপর পড়ল।
“বৈদ্যনাথবাবু, আপনার ভাই সুমিত এখন কোথায় থাকে?”
“বক্সিরহাটে। শ্বশুরবাড়িতে।”
“বক্সিরহাট বর্ডারের খুব কাছে। তাই তো?”
“হ্যাঁ।”
অনিরুদ্ধ একটা চারমিনার ধরাল। ধোঁয়া ছেড়ে বলল, “অঙ্কটা খুব সোজা। সাত বছর আগে আপনার ভাই ভেবেছিল কাগজ সরালে বাড়িটা ওর হবে। ওটা ছিল লোভ। আর আজ? আজ চারদিকে এনআরসি আর ডিটেনশন ক্যাম্পের জুজু। ও ভাবছে, কাগজ না থাকলে আপনি যদি ‘বিদেশি’ বা ‘রাষ্ট্রহীন’ ঘোষিত হন, তাহলে আইন অনুযায়ী আপনার সম্পত্তি ‘ভেস্টেড’ বা সরকারের বাজেয়াপ্ত হতে পারে। তখন ও আর ওই বাড়ি পাবে না। উল্টে ওর নিজের নাগরিকত্ব নিয়েও টান পড়তে পারে কারণ ও আপনারই রক্তের ভাই। আপনার বিপদ মানে ওর বিপদ।”
বৈদ্যনাথবাবু হা করে তাকিয়ে রইলেন। যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না, রক্তের রঙ এত ফিকে হতে পারে।
“চোর সাধু হয়নি মশাই,” অনিরুদ্ধর গলায় শান দেওয়া ছুরির ধার, “চোর এখন ভীতু। ও কাগজ ফেরত পাঠিয়েছে আপনাকে বাঁচাতে নয়, পৈতৃক সম্পত্তিটাকে সরকারের হাত থেকে বাঁচাতে। যাতে ভবিষ্যতে ওটার ভাগ ও পায়। খামের ওপর হাতের লেখাটা দেখুন। কাঁপা কাঁপা। ওটা অনুশোচনা নয়, ওটা টেনশন। নিজের পিঠ বাঁচানোর টেনশন।”
বৈদ্যনাথবাবু খামটা আঁকড়ে ধরলেন। তাঁর চোখে জল। “আমি… আমি ভাবলাম ভাই হয়তো আমাকে ক্ষমা করেছে। বা নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে।”
“ভুল মানুষ বোঝে না, পরিস্থিতি বোঝায়। আপনার ভাই বক্সিরহাটে বর্ডারের কাছে থাকে। ও ওখানের হাওয়া গরম দেখছে রোজ। ও জানে এই দেশে এখন মানুষের চেয়ে কাগজের দাম বেশি। ও বুদ্ধিমান। বোকামিটা আপনি করেছেন।”
“আমি?”
“হ্যাঁ। আপনি জানতেন ভাই চোর। তবু ‘লোকে কী বলবে’ ভেবে চেপে গেছিলেন। এই প্রশ্রয়টা না দিলে আজ সাতটা বছর আপনাকে নরকে কাটাতে হতো না। আর আজ? আজ আপনি খুশি হচ্ছেন এই ভেবে যে চোর মহানুভব! আসলে সে নিজের চামড়া বাঁচাচ্ছে। ভণ্ডামির চাদরটা খুলে ফেলুন বৈদ্যনাথ বাবু, ঠান্ডা লাগবে না, আরাম পাবেন।”
অনিরুদ্ধ আমার দিকে ফিরল। “তারক, ওনাকে বিদায় দে। আর হ্যাঁ, বৈদ্যনাথবাবু, কাগজগুলো ভালো করে চেক করবেন। আমার ধারণা, দলিলের আসল কপিটা ও পাঠায়নি। ফটোকপি পাঠিয়েছে। আসলটা এখনো ওর কাছে জিম্মি। ওটা ও বের করবে যখন আপনি বাড়িটা ওর নামে লিখে দেবেন। শয়তান কখনো পুরো তাস দেখায় না।”
বৈদ্যনাথ বাবু কাঁপা হাতে ফাইল খুললেন। দলিলের কাগজটা বের করলেন। আলোর বিপরীতে ধরতেই দেখা গেল—হলোগ্রাম নেই। ঝকঝকে কালার জেরক্স।
ভদ্রলোক ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লেন। যেন সাত বছরের জমে থাকা বিশ্বাসটা কাঁচের মতো ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল।
অনিরুদ্ধ জানলার বাইরে তাকাল। কুয়াশা ঘন হচ্ছে।
“মানুষ বড় আজব তারক। আমরা রক্তসম্পর্ককে এতটাই পবিত্র ভাবি যে, বিষধর সাপকেও চন্দনকাঠ ভেবে বুকে জড়িয়ে রাখি। সমাজ আমাদের শিখিয়েছে—ভাইয়ের নামে নালিশ করতে নেই। কিন্তু সমাজ এটা শেখায়নি যে, ভাই যখন কংস হয়, তখন তাকে কৃষ্ণ হয়ে বধ করতে হয়—তা সে জেলেই হোক বা আদালতে।”
বৈদ্যনাথ বাবু যখন টলতে টলতে বেরিয়ে গেলেন, তখন সন্ধে নেমেছে। গঙ্গার ধারের ফ্ল্যাটে আবার সেই হাড়হিম করা নিস্তব্ধতা।
আমি বললাম, “লোকটার জন্য মায়া হচ্ছে।”
অনিরুদ্ধ বলল, “মায়া? মায়া করার বিলাসিতা আমাদের নেই তারক। উনি সাত বছর আগে সত্যটা চেপে গিয়ে বিপদ ডেকেছিলেন। আজও সত্যটা জানলেন, কিন্তু দেখবেন—বাড়ি ফিরে তিনি ভাইকেই ফোন করবেন। ধন্যবাদ জানাবেন। হয়তো বাড়িটার ভাগও দিয়ে দেবেন। কারণ? কারণ ওই যে—সামাজিক ভণ্ডামি। আমরা জেনে বুঝে বিষ পান করি, তারপর অমৃতের আশা করি।”
বাইরে আবার বৃষ্টি নামল। সেই সঙ্গে শহরের বুকে নামল এক রাশ অন্ধকার। আর সেই অন্ধকারে মিশে রইল মানুষের হাজারো গোপন পাপ, যা খামে ভরে ডাকযোগে আসে, কিন্তু প্রাপক কখনো তার আসল মানে বুঝতে চায় না।
“আমরা সবাই কাগজ দিয়ে ঘর বানাই, আর ভাবি ঝড় এলে ওই কাগজই আমাদের ছাদ হবে; ভুলে যাই, ঝড় সবার আগে কাগজকেই উড়িয়ে নিয়ে যায়।”
সমাপ্ত
![]()







