জাগরণের বিভাবরী
………………………..
শ্যামাপ্রসাদ সরকার
আজ সকাল থেকে উঠতি প্রমোটার কাম তোলাবাজ বলে কুখ্যাত লখাই মিত্তিরের দলবল হাঁক ডাকে পাড়া গরম করে দিচ্ছে। ওরা আবার এখনকার শাসকদলের লোকাল কাউন্সিলারের কি যেন একটা সূত্রে আত্মীয় হয়। সেজন্য ধরাকে সরা ভাবাটাই এখন দস্তুর। ওরা শিগগিরই এলাকা দখল করে কন্ডোমোনিয়াম সহ একটা এনক্লোজার বানাবে নির্মীয়মান “নিউ নুকস্ এনক্লোজার ” আর মিনি টাউনশীপ প্রজেক্ট ” সিটি লাইটস্” এর জন্য। আর তাতেই পুরনো আদ্যিকালের বাড়ি দুটোর সিকিটাক অংশ ভাঙতে হবে। আসলে নতুন আর পুরনো কিছুই একসাথে থাকতে পারেনা। যুগধর্মের ঋজু নিশান বুক ফুলিয়ে আর মাথা উঁচু করে থাকবে সে কথাটাই এখন সদর্পে বলছে।
……..
ঘাটের কাছ দিয়ে যে রাস্তাটা পূবদিকে চলে গেছে সেখানেই মল্লিকদের ” নিধুকুঞ্জ” আর “প্যারীভিলা ” দুটো জোড়া বাড়ি বটে তবে ওদের মালিক আর ক্যাম্পাস এক। বাবু কলকাতার ধ্বংসাবশেষ ঘাটের বাঁধানো পাড় থেকে ওই বাড়ি দুটোর অবয়বকে ছুঁয়ে আছে। সেটাই এখন টাউনশীপের জন্য দরকার হলে বলপূর্বক অনেকটাই এখন ভাঙতে হবে।
এখানে সেই অতীতের কন্ঠস্বর মাঝেমাঝে ফুকরে ফিরলেও মানুষজন বলতে শুধু রয়ে গেছে গিরিধারী একাই।
……..
তার বাপ -দাদা’রা একশো বছর আগেও এবাড়ির খিদমত্গারী খেটেছে। অবশ্য এখন আর সেসব নেই। বর্তমান মালিক বৃদ্ধ রসিক মল্লিক তাঁর ছেলের পরিবারের সাথে থাকেন বিদেশে। তাও সেই প্রায় নয় নয় করে বিশ পঁচিশ বছর আগে ওঁরাও এসব ছেড়ে চলে গেছেন। তবে যাওয়ার আগে ঘর দোরের দেখভাল করতে গিরিধারীর হাতে চাবির গোছা আর থাকার অনুমতিটা দিয়ে গেছিলেন বলে এই বয়সে এসে আর উদ্বাস্তু হতে হয়নি। ওর একটাই মেয়ে তারও পাঁচবছর আগে বিয়ে হয়ে গেছে কাটোয়ায়। বউ মারা যাবার পরে নিজের বলতে আর কিছুই নেই। শুধু আছে বৃদ্ধ অস্থি-পঞ্জর আর এই দুটি দু -মহলা ঢাউস বাড়ি আর বসবাসযাপনের স্মৃতিটুকুই। আজও গভীর রাতে ঘুম না এলে এই বাড়িদুটো ওকে যেন এখনো সঙ্গ দিতে আসে। ওরা নিজেদের ভাষায় ফিসফিসিয়ে ফেলে আসা অন্দরমহলের গল্প বলে এখনো ওকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়।
……..
হাত বাড়িয়ে টর্চটা খুঁজতে গিয়েও পাওয়া গেল না। রাতচরা পাখির ডাক আর জোয়ার আসার কলকলানিতেও এটুকু বোঝাই যায় রাত এখন বেশ গভীর। বিদ্যূতের লাইন টাইন ওরা সব আজ কেটে দিয়ে গেছে। গিরিধারী যাতে অগত্যা উঠেই যায় তাই এই ব্যবস্হা। টাউনশীপটা হওয়াটাই জরুরী এখন।
ফস্ করে দেশলাই জ্বালিয়ে গিরিধারী বুঝল ঘড়িটাও কে এ ঘর থেকে যেন নিয়ে গেছে। আর আসবাবগুলোও যেন কেমন কেমন ! বড়ো আদ্যিকালের! এরকম বাহারী চৌকি এ ঘরে আবার কবে ছিল?
……..
হঠাৎ নাচমহলের পাশে ভেসে এল ঘুঙুর পড়া পায়ের আওয়াজ। কোনওমতে ঠাহর করে ও ওদিকটায় গিয়ে দেখল একজন গয়নাগাটি পড়া মেয়েমানুষ একজন মোটা গোঁফ ওলা লোকের পা ধরে কাঁদছে। আর লোকটা বলছে,
” ওরে হারামজাদী ! কুলটা! সর্বনাশী ! নষ্ট মেয়ে মানুষ কোথাকার…ভাবছিস আমি তোর আর পরিচয় দেব মেয়ে বলে! এ বাড়ির মেয়ে লক্ষীমণি ওলাউঠোয় মরেচে! সেটাই সকলে জানে! হতভাগী! দূর হয়ে যা…শিবেনের সাথে আশনাই করার বেলায় মনে ছিল না? ওটাকে তো মেরে গুমঘরে পুঁতে দিইচি! তোকে মেয়েছেলে বলে মারতে পারিনিকো! কাল ভোর হতেই পেটের শত্তুর আর তুই দুজনেই ঘাটে নৌকা চেপে দেগঙ্গা বা কুলতলি চলে যাবি! মরতেও পারিস্ অবশ্য! তবে এই প্যারীভিলায় তোর জায়গা হবেনেকো! আমার মেয়ে মরে গেচে! হ্যাঁ হ্যাঁ সে আর নেইকো! ”
এই বলে লোকটা রাগ দেখিয়ে গটমট করে ভেতর মহলে মিলিয়ে গেল।
গিরিধারী দেখতে লাগল মেয়েছেলেটা এবার হাপুস নয়নে কাঁদতে কাঁদতে একটা পুঁটুলি কুড়িয়ে নিল। এবারে ওর থেকে বাচ্চার কান্না ভেসে এল যেন। সদ্যোজাতই বটে, দুই কি তিনমাস হবে। বোধহয় দুধ খাবে। ঠোঁটদুটো ছুঁচলো করে চকচক আওয়াজ করছে। কিন্তু এরা সব কারা? মেয়েটা এত রাতে এবাড়িতেই বা কি করছে?
……..
একটু পরে দেখতে পেল যে ওই মেয়েটা গলার আর হাতের গয়নাগুলো খুলে একটা কাপড়ে বেঁধে রেখে দিল। বোধহয় বাচ্চাকে দুধ খাওয়াবে! কিন্তু না! বাচ্চাটাকে নিল ঠিকই কিন্তু এক পা -দু পা করে ঘাটের সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে একেবারে মাঝগঙ্গায় চলে গেল। একী! সাঁতার টাঁতার আবার না জানলে যে দূর্ঘটনা ঘটবে এক্ষুণি।তাছাড়া এত রাত্তিরে জলে কেউ নামে?
……..
গিরিধারী হাঁক পেরে মেয়েটাকে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখন হঠাৎ দেখল ভোজবাজির মত সব এবারে উবে গেছে। কেউ আর কোথাও নেই।
খানিক আন্দাজে আন্দাজে ও মেয়েটাকে খুঁজল আর ওই কর্তাগোছের লোকটাকেও !কিন্তু নাহ্! ফাঁকা বাড়িটার নিস্তব্ধতা ফুকরে ফুকরে উঠল কেবল। কেউ তো নেই এখানে। গঙ্গার ঘাট থেকে এটুকরো হাওয়া এসে নিধুকুঞ্জ আর প্যারী ভিলার গায়ে খালি যেন শিরেশিরে হাতটা বুলিয়ে দিয়ে চলে গেল।
কেবল শুনতে পেল একটা প্যাঁচা তারস্বরে কোটরের ভিতরে বসে খালি ডেকে যাচ্ছে।
……..
ঘরে এসে দেখল আবার সেই তার দড়ির ক্যাম্পখাটটাই তো ওখানে রয়েছে। কিন্তু তার কাছে একটা পুঁটলিতে অনেককালের পুরনো কাপড়ে জড়ানো একটা মান্তাসা আর মকরমুখী বালা কে যেন হঠাৎ এসে এখানে রেখে দিয়ে উধাও হয়ে গেছে। ওগুলোই তো এর একটু আগে ওই মেয়েটা গায়ে পড়ে ছিল না? ওর মনে পড়ল খানিক আগে দেখা মেয়েটার মুখ যেন এবাড়ির তিনপুরুষ আগের মৃত মেয়ে লক্ষ্মীমণির মত । অকালমৃতা বলেই রাজবাড়ির আনাচে কানাচে লুকিয়ে আছে নানা শোকের কাহিনি। কিন্তু তাই বলে এরকম অবস্থার কথা কে জানত! এখন পুরো ব্যাপারটাই যেন ধোঁয়াটে লাগছে।
……..
গিরিধারী গরীব হলেও চোর নয়। সে এক পা দু’পা করে ঘাটের দিকে এগিয়ে যায়। ওর মেয়ে নয়নতারার বয়সী ওই লক্ষ্মীমণি বলে মল্লিকদের বংশের মৃতা মেয়েটার জন্য বড় মনখারাপ আর কষ্টবোধ জমাট হয়ে আসছে সেটা বুঝতে পারছিল।
ও এবার ঠিক করল কালই কাটোয়া গিয়ে মেয়ে আর নাতিটাকে একবার চোখের দেখা দেখে আসবে।
……..
যখন গিরিধারী ওর হাতে ধরা ওই পুঁটুলির ভিতরের গয়নাগুলো নিয়ে ঝুপ্ করে মাঝগঙ্গায় ফেলে দিতে দিতে যাচ্ছিল তখন একটা অজানা মনকেমন এসে ওর বুকের ভেতরটাকে হু হু করে মুচড়ে দিচ্ছিল আর অযথাই কেমন যেন সবকিছু নিশি শেষের গাঁথা মালার ব্যর্থতার মত বয়ে এসে ওর সত্তর বছরের ভেতরমহলের চেনা অচেনা অব্যক্ত কষ্টগুলোকে এখন গলার কাছটায় এনে কেবল দলা পাকিয়ে তুলছিল।
এর কি আদৌ কোন সুরাহা হবে কি?
অশ্রুর ধারা এসে গাল বেয়ে নামতে নামতে ও বুঝতে পারছিল সবার সবকিছু যে একজন্মে শেষ হয়েও হতে চায় না……!
—oooXXooo—
![]()







