ওল্ড কয়েন স্ক্যাম CC
বাসুদেব দাশ
টেকনোলজির ডেভেলপমেন্ট যেমন মানুষের জীবনকে স্বাচ্ছন্দের শীর্ষে নিয়ে যেতে পারছে তেমনি আবার মানুষের জীবনকে হারামে পরিণত করেও ছাড়ছে । এই টেকনোলজির সাহায্য নিয়ে বর্তমান জেনারেশনের অনেকেই ও মিডল এজের মানুষ প্রতারণা করে নিজের অর্থনৈতিক উন্নতি করতে পেরেছে ঠিকই কিন্তু সেই উন্নতি করতে গিয়ে তাকে চোরা স্রোতে সমাজের অন্ধ গলিতে ঢুকে যেতে হচ্ছে। কিছু সংখ্যক মানুষকে ঠকিয়ে নিঃস্ব করে পথে বসিয়ে দিতে গিয়ে সেই প্রতারককে জীবনের মূল স্রোত থেকে ছিটকে বেরিয়ে যেতে হচ্ছে । সে আর জীবনের মূল স্রোতে ফিরে আসতে পারছে না। অন্ধকার চোরা গলিই তার জীবনের স্থায়ী ঠিকানা হয়ে যাচ্ছে। লোহার গড়াদের মধ্যে অনুশোচনার জীবন বয়ে বেড়াতে হচ্ছে তাকে। নিজেকে ও কিছু সংখ্যক মানুষকে ধোঁকা দিতে পারলেও আইনকে ধোঁকা দিতে পারছে না এই প্রতারকরা। আইনের চোখকে ফাঁকি দেওয়া মানুষের পক্ষে খুব কঠিন কাজ। প্রতারকের বুদ্ধি যতই তীক্ষ্ণ হউক আর তার ফাঁদ বা কৌশল যতই সুক্ষ হউক না কেনো তাকে ধরা পড়তেই হবে। অপরাধ করলে ধরা পড়তেই হয় এবং তার সাজা সুনিশ্চিত এটাই বাস্তব সত্য। সুতরাং অপরাধ কখন সমাধান হতে পারে না।
রমিতা সাবল মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন মহিলা। ওনার হাসব্যান্ড চাকরি করেন আর উনি গৃহবধূ। তবে বাড়ীতে বসে সামান্য কিছু রোজগার করেন। উনি মহিলাদের শাড়িতে ফলস পার বসান, শাড়ি পিকো করেন, রিপু করেন। পাড়ার অনেক মানুষই ওনাকে চেনেন। উনি বাস্তব বোধ সম্পন্ন একজন মানুষ বলেই পরিচিত মহলের সকলে দাবি করেন। দিনকাল যেভাবে এগোচ্ছে ওনি তার খেয়াল রাখেন। বর্তমান সমাজের প্রতারকদের কার্যকলাপের বিষয়ে উনি যথেষ্ট সজাগ। ওনার একটা হবি আছে উনি অচল কয়েন ও অচল কাগজের নোট যখন যেটা পান যত্ন করে জমিয়ে রাখেন। কোন এক দিন যদি সেগুলো বেশি মূল্যে বিক্রি করা যায় সেই আশায়। উনি শুনেছেন যে পুরানো অচল মুদ্রা, নোট সব বেশি দামে বিক্রি হয়। এই কাজটা ওনার দীর্ঘ দিনের একটা অভ্যাস। আর যদি কেউ বেশি দামে কিনতে না চায় তবে কয়েন গুলোকে কেজি দরে ওনার পরিচিত একটা জায়গায় উনি বিক্রি করে দিতে পারবেন সেটা নিশ্চিত। এই কাজ থেকে কিছু অতিরিক্ত অর্থ উপার্জন করতে পারবেন এটাই ওনার বহু দিনের আশা। এই আশাটা উনি নিজের মধ্যে লালন পালন করে আসছেন। রমিতার হাসব্যান্ড অনাবিল একটা বেসরকারি কোম্পানিতে একাউন্টান্টের চাকরি করেন। অফিস ছুটির পরও অনাবিলকে কিছুটা অতিরিক্ত সময় অফিসে থাকতে হয় কাজের চাপের জন্য।
এক দিন দুপুর বেলা রমিতা দেবী খেয়ে দেখে ঘরে বসে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। সেই সময় হঠাৎ ওনার মোবাইলে একটা কল আসে। কলটার কোন নাম নেই। একটা আননোন কল তাই আগে থেকে ওনার মোবাইলে নাম সেভ করা নেই। আননোন কল দেখে উনি ধরবেন কি ধরবেন না ভাবতে ভাবতে ফোনের সুইচটা অন করে ফ্যালেন। ফোনের আর এক প্রান্ত থেকে এক জন খুব নরম কণ্ঠে বিনয়ের সঙ্গে বলেন যে আমি একটা কোম্পানিতে চাকরি করি। আমার কোম্পানি পুরানো অচল মানে বাতিল হয়ে যাওয়া টাকার নোট ও কয়েন কেনা বাঁচার কাজ করে। আপনার কাছে যদি এই ধরণের কয়েন বা নোট থেকে থাকে তবে আমার কোম্পানিকে এই মোবাইল নাম্বারে জানাতে পারেন। আমি কোম্পানির লোক নিয়ে গিয়ে দাম দিয়ে কিনে নিয়ে আসবো যদি আপনি বিক্রি করেতে চান। রমিতা দেবী এবার খুব উৎসাহ পেয়ে যান। ওনার অনেক দিনের লালিত পালিত সাধ এবার পূর্ণ হবার সুযোগ পেয়ে গেছে। রমিতা দেবী… ” কোন নোটের কি রকম দাম আছে সেটা যদি একটু বলতেন তবে সিদ্ধান্ত নিতে আমার সুবিধা হতো। আর আপনি কে কথা বলছেন আপনার নামটা একটু বলবেন প্লিজ।” ফোনের অপর প্রান্ত থেকে উত্তর আসে, “হ্যাঁ অবশ্যই বলবো। আমার নাম সৈব্য কান্ত পয়রা। আমার বাড়ী খড়দহ। আপনার কাছে কত কত টাকার নোট আছে সেটা একটু বলুন। আমি তার রেট বলে দিচ্ছি।” রমিতা দেবী, “আমার কাছে কটা দশ টাকা, কটা দু টাকা আর কটা কুড়ি টাকার নোট আছে। আর কিছু কয়েন আছে।” সৈব্য, “এক টাকার নোট নেই। এক টাকার নোটের দাম সব থেকে বেশি। কারণ ওটা সব থেকে বেশি পুরানো। ” রমিতা দেবী, “না এক টাকার নোট নেই আমার। আপনি আমার যে নোট আছে তার দাম বলুন প্লিজ।” সৈব্য, ‘আমি আপনাকে একটা রেট চার্ট পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপনি দেখে নেবেন। ” রমিতা,” হ্যাঁ পাঠান।”
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে রমিতার মোবাইলে একটা হোয়াটস্যাপ মেসেজ আসে। ওটা ক্লিক করতেই একটা রেট চার্ট ডাউনলোড হয়ে যায় । রমিতা তাতে দেখে যে দু টাকার একটা নোটের দাম বারো হাজার টাকা, দশ টাকার নোট একটার দাম সাত হাজার টাকা আর কুড়ি টাকার নোট একটা তিন হাজার টাকা।কিছুক্ষণ বাদে সৈব্য আবার ফোন করে জানতে চায় যে কখন টাকা নিতে আসলে ভালো হয় সেটা জানাবেন প্লিজ । রমিতা আজ অনাবিলকে একটা সারপ্রাইস দেবে। তাই উনি বেশি দেরি করতে চাইলেন না। রমিতা বলেন, “আপনি এক ঘন্টা বাদে আসুন। তার মধ্যে আমি সব রেডি করে নিতে পারবো। ” রমিতার কথা মত সৈব্য তার অফিসের এক জন কলিগকে নিয়ে রমিতার বাড়ী এসে হাজির হয় । রমিতা এর মধ্যে তার কাছে ক টাকার কটা নোট আছে সেটা ডিনমিনেশন ওয়াইজ একটা কাগজে লিখে হিসাব করে রেখে দিয়েছে। সৈব্য কাগজটায় চোখ বুলিয়ে সব বুঝে নিয়ে রমিতার কাছে তার সেভিংস একাউন্টের ডিটেইলস চায়। কারণ ওরা তিন লাখ টাকা নাগদে দেবে না। রমিতা সেভিংস একাউন্টের ডিটেইলস দিতে চায় না। তখন সৈব্য বলে, ম্যাডাম তাহলে একটা কাজ করুন আমার কোম্পানি একটা লিঙ্ক পাঠাবে আপনার মোবাইলে। আপনি সেই লিঙ্ক টা ক্লিক করলে আপনার একাউন্টে সব টাকা ঢুকে যাবে। আর টাকা পেয়ে গেলে আপনি ফোন করে আমাকে ডাকবেন আমি এসে আপনার কাছ থেকে পুরানো নোট আর কয়েন নিয়ে যাবো।রমিতা এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়। তখন সৈব্য কান্ত ওখান থেকে চলে যায়। একটু বাদে রমিতার মোবাইলে একটা পিডিএফ আসে। রমিতা ঐ পিডিঅফ টাতে ক্লিক করলে তার মোবাইলটা কিছু সময়ের জন্য পুরো অন্ধকার হয়ে যায়। কিছুই দেখা যায় না । তারপর মোবাইলটা ভীষণ কাঁপতে থাকে আর আপ ডাউন হতে থাকে। রমিতা তার নিজের মোবাইলটা কিছুতেই কন্ট্রোল করতে পারে না। তিন চার মিনিট বাদে মোবাইলে একটা মেসেজ আসে যে সেভিংস একাউন্ট থেকে সব টাকা উইথড্রয়াল হয়ে গেছে । প্রায় দের লাখ টাকা। কে বা কারা সব টাকা তুলে নিয়েছে। রমিতা একটু চিন্তা করেই বুঝতে পেরে যান কি ভাবে কি হয়েছে। ওনার মনে হয় ঐ লিঙ্ক টাতে ক্লিক করা ভীষণ ভুল হয়ে গেছে। ঐ লিঙ্কটাতে ক্লিক করার জন্যই তার একাউন্ট থেকে টাকা উইথড্রয়াল হয়ে গেছে। আর এটা ঐ সৈব্য কান্তর কাজ। তিনি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েন। স্বামীকে আর সারপ্রাইজ দেওয়া হলো না। বহু দিন ধরে তিল তিল করে জমানো টাকা সব প্রতারকরা
আত্মসৎ করে নিল। সাবধান হয়েও তিনি নিজেকে বাঁচাতে পারলেন না। আসলে প্রতারক চক্র এমন ভাবে প্রতারণার জাল বিছায় মানুষ তার রহস্য উদ্ধার করতে পারে না। বোকা বোনতে বাধ্য হয়।
একটু বাদে অনাবিল অফিস থেকে বাড়ী ফিরে আসেন। এসে রমিতার মুখে সব শুনে তাজ্জব বনে যান। আর দেরি না করে সাইবার ক্রাইম হেল্প লাইন ১৯৩০ নাম্বারে ফোন করে সব জানিয়ে দেন অবশ্য সাইবার ক্রাইম পুলিশ স্টেশনেও একটা অন লাইন কমপ্লেইন রেজিস্ট্রার করে দেন। তদন্ত চলতে থাকে।
সমাপ্ত
![]()







