এক শিশুর গল্প
অনুবাদক : নিলয় বরণ সোম
মূলগল্প : দ্য চাইল্ড
লেখক : চার্লস ডিকেন্স
[ চার্লস ডিকেন্স বিখ্যাত ইংরেজি ঔপন্যাসিক ও গল্পকার, যাকে নতুন করে পরিচয় করানোর দরকার নেই । আলোচ্য গল্পটি ওঁর Some Short Christmas Stories গ্রন্থের THE CHILD’S STORY.
নামক গল্পের মুক্ত অনুবাদ। ]
অনেক অনেকদিন আগে , ছিলেন এক পর্যটক।একবার উনি এক রহস্যময় যাত্রা শুরু করেন , যেটা শুরুর সময় খুব দীর্ঘ মনে হচ্ছিল , আর মাঝপথে যাওয়ার পরে , সেটাকে বেশ সংক্ষিপ্ত মনে হচ্ছিল।
ওর যাত্রাপথের অনেকটা পথ বেশ নির্জন এবং অন্ধকারে মোড়া ছিল , যখন উনি কোনো জনমানবের দেখা পান নি। তার পর , অবশেষে উনি একটি অনিন্দ্যসুন্দর শিশুর দেখা পান। শিশুটিকে উনি জিজ্ঞাসা করেন , ” তুমি এখানে কী করছ ? ” বাচ্চাটি হেসে জবাব দিল , ” আমি সবসময় খেলাধুলায় মেতে থাকি – এস , আমার সঙ্গে খেলা করো।
বাচ্চাটির কথা শুনে উনি তার সঙ্গে খেলা শুরু করলেন , বলতে গেলে , সারাদিন আনন্দ উল্লাসেই কেটে গেল। সেদিনটাতে আকাশ ছিল নীল , গাছের পাতাগুলো হরিৎবর্ণের ,আর ফুলগুলো দেখলেই মন ভালো হয়ে যাচ্ছিল।ওরা এত এত পাখির গান শুনল আর এত এত প্রজাপতির দেখতে পেয়েছিল , যে সবকিছু চমৎকার লাগছিল। আবহাওয়াও খুব মনোরম ছিল , এরই মধ্যে যখন বৃষ্টি পড়ছিল , ওরা দু’চোখ ভরে বৃষ্টির ফোঁটা দেখছিল আর সোঁদা মাটির গন্ধ শুঁকছিল যখন বাতাস বইতো , তখন ওরা অবাক হয়ে ভাবতো , এটি কী , কোথার থেকে এ আসে তার বাড়িঘর থেকে দৌড়তে দৌড়তে , শিষ দিতে দিতে আর চিৎকার করতে করতে ও মেঘগুলোর পিছু ধাওয়া করে , গাছপালাগুলিকে নুইয়ে দেয় , চিমনীগুলোতে ভয়ানক শব্দ করে আর সমুদ্রকে করে তোলে উত্তাল। কিন্তু ওরা সবথেকে খুশি হতো তুষারপাত দেখে , তুষারের কণাগুলিকে দ্রুত ঘনহয়ে পড়তে দেখতে ওদের দারুন লাগতো , যেন লক্ষ লক্ষ পাখির বুকের পালক খসে পড়ছে , সেই তুষারপ্রবাহ কতখানি মসৃণ আর গভীর সেই ভেবে ওরা অবাক হয়ে যেত। রাস্তাঘাটের উপর তুষারপাতের শব্দও তাদের আকৃষ্ট করতো।
জগতের সবথেকে সুন্দর খেলনাগুলো দিয়ে ওরা খেলতো , রাজা রাজড়া , ভুত পেত্নী আর দৈত্য দানোর গল্পে ঠাসা সব ছবির বইগুলো ওরা গোগ্রাসে গিলত, ওদের কাছে গল্পগুলো ছিল যেমন সত্যি, তেমনি মজার।
কিন্তু একদিন কী যে হল , সেই পর্যটক আর শিশুটিকে খুঁজে পেলনা। বার বার তার নাম ধরে ডেকেও কোনও সাড়া পাওয়া গেল না। তারপর সে রাস্তায় বেরিয়েই পড়ল , কিন্তু সেখানেও কাউকে দেখতে পেল না। কিন্তু অবশেষে সে এক সুদর্শন বালকের দেখা পেল। বালকটিকে সে জিজ্ঞাসা করল , ” তুমি কী করছ এখানে ?” বালকটি বললো ,” আমি তো কেবল পড়াশুনা করি , এস , আমার সঙ্গে পড়াশুনা কর। “
তাই ছেলেটির সঙ্গে থাকতে থাকতে সে সূর্য আর চন্দ্র সম্বন্ধে জানতে পারলো, গ্রিক আর রোমানদের যুদ্ধ বিগ্রহের কাহিনী পড়ল , আরো কত কী পড়ল আমিও কি চাই জানি , তবে সে পড়ল বিস্তর আর ভুলেও গেল বিস্তর। তবে ওরা দুজনে সারাদিন শুধু পড়াশুনা করতো বললে ভুল হবে ,ওরা খেলাধুলাও করত বেশ। গরমকাযে তারা নদীর বুকে ডিঙি নৌকো বাইত , শীতকালে আমলকি গাছে তলায় আমলকি কুড়োত , কখনও পায়ে হেঁটে , কখনও টাট্টুঘোড়ায় চেপে ওরা এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াত। ওদের প্রিয় কয়েকটা খেলা ছিল চোর পুলিশ , কবাডি , কানামাছি আরও কত কী , যেগুলোতে ওদের কেউ হারাতে পারতো না।
ওদের ছুটিছাটাও মিলতো বেশ , তখন ওরা দুপুরবেলা আপেল আর কমলালেবুর বাগানে ঘুরে বেড়াতো , মেলায় ক্যালিওডোস্কোপ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পৃথিবীর সাতটি আশ্চর্যের ছবি দেখতো আর রাত জেগে থিয়েটারে দেখতো ঝলমলে সব রাজারানীদের। ওদের অগুনতি বন্ধুবান্ধবের কথা বলতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে , কিন্তু এককথায় বলতে গেলে ওরা সকলেই সুদর্শন বালকটির বয়সীই ছিল এবং মনে হত ,ওরা একে অপরকে যেন সারা জীবন চেনে !
এইরকম সুখে দিন কাটানোর পরেও , পর্যটক একদিন ওই ছেলেটিকে খুইয়ে ফেললো, আর ওকে খুঁজে বের করার চেষ্টা বিফল হওয়ার পর ,সে আবার যাত্রা শুরু করল। আবার আগের মতোই রাস্তায় প্রথমে কাউকে দেখতে পেলো না , কিন্তু শেষে দেখা পেল এক যুবকের। যুবকটিকে সে একই প্রশ্ন করল , ” তুমি কী করছি এখানে ?” যুবকটি বলল , ” আমি তো দুমদাম প্রেমে পড়ে যাই -এস, আমার সঙ্গে প্রেমের দুনিয়ায় ঢুকে যাও!”
তাই সে যুবকটির সঙ্গে হাঁটা শুরু করল , কিছুক্ষনের মধ্যে এক পরমাসুন্দরী যুবতীর দেখা পেল, দেখতে যে অনেকটাই সেই গ্রামের রীনার মতো দেখতে- ওর চোখগুলো রীনার মতো , চুলের ধরণ রীনার মতো , গালের টোলটিও রীনার মতো, আর রীনার সঙ্গে কথা বলতে গেলে গালে গোলাপি আভা ফুটিয়ে ও যেমন হেসে গড়িয়ে পরে, যুবতীটিও ঠিক তাই করছিল I যুবকটি প্রেমে পড়ে গেল, ঠিক যেমন কেউ একজন এ গ্রামে এসেই রীনার প্রেমে পড়েছিল।
তবে যুবতীটি মাঝে মাঝে সেই যুবকটির পেছনে লাগতো , ঠিক রীনা যেমন কারো একটা পেছনে লাগতো ,ওরা দুজনে ঠিক রীনা আর তার প্রেমিকের মতোই ঝগড়া করতো। ওরা একজন অন্যজনকে চোখে হারালেও এমন একটা ভাব করতো যেন কিছুই হয় নি। ক্রিসমাসের সময় ওদের বাকদান পর্ব মিটল আর বিয়ের দিনও কাছে এগিয়ে এল , ঠিক যেমন কেউ একজন আর রীনার মধ্যে হয়েছিল।
কিন্তু সেই পর্যটক , একদিন ওদেরও হারিয়ে ফেলল ঠিক আগের বন্ধুদের মতন করেই , আর ওদের ডাকাডাকি করেও আর খুঁজে না পেয়ে আবার হাঁটতে লাগলো। তারপর সে একমধ্যবয়স্ক ভদ্রলোকের দেখা পেল। সে সেও ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করল , ” কী করছেন আপনি এখানে ?” ভদ্রলোকের উত্তর এল , ” আমি সবসময়ই খুব ব্যস্ত , আসুন, আপনিও ব্যস্ততার স্বাদ নিন !”
পর্যটক লোকটির মতই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন , ব্যস্ত হয়ে বনের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করলেন। পুরো যাত্রাপথটাই বনের মাঝখান দিয়ে ছিল -বনের প্রথমদিকটা ছিল বেশ খোলামেলা সবুজরঙের ; বসন্তকালের বনের মতো , তারপর বনখানা আরো গভীর আর অন্ধকার হতে শুরু করে , গরমকালে বনের চেহারা যেমন হয় তেমন , যেই গাছগুলো অনেক পুরোনো , তাদের পাতাগুলো খয়েরি রঙেরও হতে শুরু করে। ভদ্রলোক একা ছিলেন না , তার সঙ্গে তারই বয়সের এক মহিলা ছিলেন, যিনি ছিলেন ওই ভদ্রলোকের স্ত্রী। ওদের সঙ্গে ওদের ছেলেমেয়েরাও ছিল। তাই ওরা সকলে মিলে বনের মধ্যে দিয়ে কাঠ কাটতে কাটতে , গাছের শাখা আর জোড়া পাতার মধ্যে দিয়ে রাস্তা করতে করতে হাঁটতে লাগলো। মাথায় গাছের কেটে নেওয়া ডালগুলির বোঝা বানিয়ে চলতে থাকল ওদের কষ্টসাধ্য পথচলা।
.চলতে চলতে ওরা এক সবুজ বনবীথির মাঝখানে এসে হাজির হয় যেটা আরো গভীর জঙ্গলের দিকে চলে গেছে। হঠাৎ ওরা একটা মৃদু কণ্ঠে কান্নার আওয়াজ শুনতে পায় – “বাবা , বাবা , আমি তোমার আরেকটি সন্তান , আমাকে তোমাদের সঙ্গে নিয়ে চল !” ওরা পেছনে তাকিয়ে দেখে , একটা ছোট অবয়ব আস্তে আস্তে বড় হয়ে আসছে , ওদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য।বাচ্চাটি যখন ওদের ধরে ফেলল , ওরা বাচ্চাটিকে ঘিরে ধরে চুমু খেল আর স্বাগত জানালো আর তারপর আবার হাঁটা শুরু করে দিল।
একসময়ে , ওরা একটা রাজপথের মোড়ে এসে হাজির হল। তখন একটি সন্তান বলে উঠল , “সাগরে চললাম”; আরেকজন বললো , “আমি যাই ভারতবর্ষের দিকে” , আরেকজন বলল , “দেখি আমি বেরিয়ে পড়ি নিজের ভাগ্যের সন্ধানে” , আর একটি বলে উঠেছিল , “বাবা ,আমি স্বর্গের দিকে চললাম !” বিদায়বেলায় ওদের সকলের চোখ অশ্রুতে ভরে উঠেছিল , ওরা একেকজনা এক একটি আলাদা পথ ধরে একাকী যাত্রা শুরু করে দিলো , আর যেই ছেলেটি স্বর্গে যাওয়ার কথা বলল , সে মাটি থেকে বাতাসে মিলিয়ে গেল।
যখনই এই বিদায়ের মুহূর্তগুলো আসত, এই পর্যটক, বন্ধু ভদ্রলোকটির দিকে তাকিয়ে দেখতে পেতেন , উনি উপরের দিকে, গাছপালা ডিঙিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন I এই সময় দিনের আলো কমে আসতো আর সূর্যাস্তের সময় এগিয়ে আসতো। পর্যটক ভদ্রলোক নিজেও বুঝতে পারতেন যে , তার নিজের চুল সাদা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ওরা বেশি বিশ্রাম নিতে পারতো না , কারণ ওদের তো যাত্রাটা বজায় রাখতেই হতো , আর যে জন্য ওদের সবসময় ব্যস্ত থাকা দরকার।
শেষ পর্যন্ত , এতজনে বিদায় নিল যে ওদের সঙ্গে আর কোনও সন্তান রইল না। অর্থাৎ কেবলমাত্র পর্যটক , ওই ভদ্রলোক আর ওই ভদ্রমহিলা একসঙ্গে যাত্রা করতে থাকলেন। এতদিনে হলুদ বনানীর রং হয়ে গেছে বাদামি আর পাতাগুলি , এমনকী বুনো গাছের পাতাগুলোও পড়তে শুরু করল।
তারপর , তারা একটি রাস্তায় এসে হাজির হলো যেটি বেশ ছায়াঘেরা। পর্যটক ও ভদ্রলোক নিজের মনেই হাঁটতে চলেছিলেন , কিন্তু ওরা ভদ্রমহিলার গলা পেলেন।
” শুনছো “, ভদ্রমহিলা বললেন , ” আমার ডাক এসে গেছে !”
পথের ওপর থেকে একটা স্বর ভেসে এলো, ” মা, মা “..
এটা ছিল প্রথম ওর প্রথম সন্তানের গলা, যে বিদায় নেওয়ার আগে বলেছিল , “আমি স্বর্গের ঠিকানায় যাচ্ছি !”
উত্তরে তার পিতা বলছিলেন , ” এখনো নয়। সূর্য প্রায় অস্ত যাচ্ছে এখন , আমি চাই এখন তুমি বিদায় নিও না ,”
পর্যটকের মাথার চুল এতদিনে সাদা হয়ে গেছে , তার গাল বেয়ে অশ্রুধারা নামছিল, কিন্তু তাকে উপেক্ষা করেই সেই দূরাগত কণ্ঠ্যস্বর আবার চিৎকার করে বলল , “মা , মা “.I
সেই মা , সে যতক্ষণে অন্ধকারাচ্ছন্ন রাজপথের দিকে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিলেন , পর্যটকের গলা জড়িয়ে ধরলেন , চুম্বনে এঁকে দিলেন গালে , আর মুখে বললেন , ” প্রিয়তম, আমার ডাক এসে গেছে , আমাকে যেতে হবে !” তারপর উনি চলে গেলেন , পড়ে রইলেন সেই ভদ্রলোক আর পর্যটক।
তারপর ,পর্যটক যখন রাজপথের একটি শাখা ধরে এগিয়ে গেলেন, তিনি তার বন্ধুকে আবার হারিয়ে ফেললেন। উনি বারবার ওর নাম ধরে ডাকলেন , কিন্তু কোনও উত্তর এল না I তারপর বন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরে উনি দেখতে পেলেন , গোলাপি রঙের সূর্যটা দিগন্তের ওপারে চলে যাচ্ছে। সেখানেই উনি এক বৃদ্ধের দেখা পেলেন – সে একটা ভেঙে পড়া গাছের গোড়ায় বসে ছিলেন।
পর্যটক তাকে জিজ্ঞাসা করলেন , ” তুমি এখানে কী করছো ?”
স্মিত হেসে বৃদ্ধ বললেন , ” আমি সারাদিন স্মৃতিচারণ করি। এস ,আমার সঙ্গে স্মৃতিচারণ করো। “
সেই পর্যটক তখন সেই বৃদ্ধের মুখোমুখি বসে পড়লেন। পটভূমিতে তখন শান্ত সমাহিত সূর্য অস্তাচলের পথে। ধীরে ধীরে তার সমস্ত বন্ধুরা একে একে তার পাশে এসে জড়ো হলI- সেই অনিন্দ্যসুন্দর শিশু , সেই সুদর্শন বালক , প্রেমিকপ্রবর তরুণ, সেই পিতা , সেই মা আর তাদের শিশুরা সকলেই সেখানে এসে হাজির হলো। পর্যটক সকলকে ভালবেসে কাছে টেনে নিলেন ,সকলের সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার করলেন ও সকলকে দেখে ভালবাসলেন। ওরা সকলে তাকে ভালোবাসল, সম্মান করলো।
আমার মনে হয় , সেই পর্যটক ঠাকুরদা তুমি নিজেই , কারণ তুমি তো আমাদের সঙ্গে এইরকম ব্যবহারই করো , আর আমরাও তোমাকে এরকমই ভালোবাসায় মুড়িয়ে দেই।
![]()







