গল্পের নাম কবিতা
বাসুদেব চন্দ
মায়ের সঙ্গে বিশাল মনোমালিন্য হয়ে গেল; এতটাই বিশাল যে মেপে দেখার ধৈর্য রইল না, রেগেমেগে বাপেরবাড়ি ছেড়ে দিলাম!
মুশকিল হল, সঙ্গে কিছু না-নিলে থাকবটা কী করে। অথচ যা-তেই হাত দিচ্ছি তার কোনোটাই আমার নয়, অধিকার ফলাতেও মানে বাঁধল। বাধ্য হয়ে দু-চারটে বই বগলদাবা করে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ‘অজানা ঠিকানার’ উদ্দেশে।
‘অজানা ঠিকানা’ – শব্দটা বন্ধ দরজা-জানলার মতো, তাই বললাম। আসলে আমার দরজা-জানলা সব ঠিক করাই ছিল। করেছিল ‘অজয়’। প্রফেশনের শুরুর দিকে ও-ই ছিল আমার একমেবাদ্বিতীয়ম সহকারী।
ওর পাড়াতেই একা থাকার মতো একটা ঘর জোগাড় করে দিল। বাড়িওয়ালা’মেসোমশায়ের মনটা ছিল হাত-পা ছড়িয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়া উঠোনের মতো বড়, একটা ঘরের সঙ্গে একচিলতে একটা বারান্দাও দিয়ে দিলেন। সেটার কিছুটা অংশ আবডাল করা, রান্না করার জন্য। যাকে বলে ‘এটাচ কিচেন’।
মেসোমশাই কতটা উদারচেতা মানুষ ছিলেন- তার আরও একটি নমুনা হল-
নিজের শখের রেডিয়োটাও সকলের মধ্যে বিলিয়ে দিলেন! সকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দোতলার ঘর থেকে আকাশবাণীর যাবতীয় বাণী ভাড়াটেদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন!
★★★
নতুন ঘর, একার সংসার। দারুণ রোমাঞ্চকর! ‘একা’ই-বা বলি কী করে, রাতে কয়েকজন আসত আমার ঘরে, সে ব্যবস্থা করেছিলেন আমার বাড়িওয়ালাই।
ঘরের আলো নিভে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ওদের মনের আলো জ্বলে ওঠে, পুরো উদ্যমে নিজেদের কাজকম্ম করতে শুরু করে দেয়।
ঢুকে থেকেই নিজেদের মধ্যে কী যে আলাপ-আলোচনা করে কেএ জানে।
মরুক গে, যাআ খুশি করুকগে।
কিন্তু যেই-না আমার গায়ের চাদরটা ধরে টানাটানি করতে থাকে, তখনই আমি আপত্তি করি!
এ কী অসভ্যতামি রে বাবা!
এদের হাত থেকে বাঁচার উপায়টাও মেসোমশাই বাতলে দিলেন।
বেঁচে যাওয়া খাবারের সবটা ‘কবিতা’কে না দিয়ে কিছুটা রেখে দিতাম বারান্দায়, ওদের জন্য।
তার পরেও দুয়েকবার ঘরে ঢুকেছিল এবং বুঝেছিল, এ- ছোকরার ঘর এখনও সে-ভাবে জমেনি, বারান্দাতেই আটকে আছে।
★★★
আমি জানি, আপনাদের মন এখন ধেড়ে ইঁদুর ছেড়ে ‘কবিতা’কে ধরেছে।
তাতে কোনও লাভ নেই, কারণ কবিতার সীমানা ছিল বারান্দা পর্যন্ত। আমি ঘরে থাকা কালীন কখনোই ঘরে ঢুকত না। আমার বারণ ছিল।
ঘর মোছা, বাসন মাজা সবই করত আমি যখন বাজারে যেতাম তখন। এসে দেখতাম, রান্নার জন্য রেডি হয়ে বসে আছে।
নিজের কিছু কাজকম্ম সেরে ঘণ্টা খানেক পরে যখন চানে যেতাম তখন ওর কাজ শেষ।
এত সুন্দর করে খাবারগুলো ঢাকাঢোকা দিয়ে গুছিয়ে রেখে যেত, দেখে মন জুড়িয়ে যেত। রান্নার স্বাদও যেত বেড়ে।
★★★
সবই ঠিক আছে, কিন্তু বাড়ি ছেড়ে এ-ভাবে একলা পড়ে থাকতে ভালো লাগছে না! দিনের বেলা যেমন-তেমন, রাত হলেই কষ্টটা জাপটে ধরে!
চেপে রাখা মানসিক কষ্ট আমাকে ভাঙতে শুরু করল, শেষে একদিন জ্বরে পড়ে গেলাম!
জ্বরের ঘোরে যেদিন ভুল বকতে শুরু করলাম, সেদিন কবিতা সটান ঘরে ঢুকে পড়ল। মাথা ঠান্ডা রেখে মাথায় জল আর কপালে জল পট্টি দিতে শুরু করল।
বেশ কিছুক্ষণ পর আরাম বোধ করলাম!
কোনোরকম ঝুঁকি না-নিয়ে অজয় ডাক্তার নিয়ে এল। ডাক্তারবাবু ঘড়ি ধরে ওষুধ খাওয়ার কথা বললেন, দায়িত্ব নিল কবিতা।
রাতের ওষুধ অজয় খাইয়ে দিয়ে যেত।
দিন সাতেক পর যখন পুরো সুস্থ হয়ে উঠলাম তখনও কবিতা সেবাযত্ন করে যেতে লাগল, আর যাতে অসুখে না-পড়ি। ও খুব ভয় পেয়ে গেছিল!
★★★
“কোন বাসনটা গরম আর কোনটা ঠান্ডা, তা দেখে বোঝার উপায় নেই, ছুঁলে তবে বুঝতে পারি। সামান্য এককাপ চা করতে গিয়ে কতবার যে ছেঁকা খেয়েছি তার হিসেব নেই”- আমার মুখে এ-কথা শুনে কবিতার সে কি হাসি!
“তোমায় আর চা করতে হবে না, সন্ধ্যার চা-টাও আমি করে দিয়ে যাব।
★★★
সন্ধ্যার সময় ছোট বোনটাকে সঙ্গে করে নিয়ে আসত। ওর নাম সবিতা। একসঙ্গে চা-মুড়ি খেতাম, মাঝে মধ্যে আলুর চপ। কবিতা নিচে বসলেও সবিতা চৌকিতে এসে আমার গা ঘেঁষে বসত। ‘হা’ করে আমার কথা শুনত। কী ভাবতে কে জানে।
★★★
আজকাল আর আগের মতো কষ্ট হয় না। কাজ শেষ হলেই ঘরে ফেরার জন্য মন আনচান করতে থাকে, ‘কবিতা এসে ফিরে গেল না তো!’
এখন কবিতার চলাফেরা-কথাবার্তায় কেমন যেন একটা অধিকার বোধ এসে গেছে! যদিও বাইরের লোকের সামনে এমন ভাবে কথা বলে যেন বগলা’পিসির হেলে পড়া পাঁচিলের গায়ে ঘুঁটে ছুঁড়ছে, আর ঘরে বসে আমার সঙ্গে যখন কথা বলে তখন মনে হয়, লক্ষ্মীর ঘটে স্বস্তিকা আঁকছে! সে-ঘটে জল, বোটা সমেত মিষ্টিপাতা পান, গোটা একটা সুপারি আর কাঠালি কলা, কী নেই সেখানে! প্রতিটিতেই সিঁদুরের টিপ লাগানো আছে!
★★★
এভাবে কয়েকমাস ঘুঁটে দেওয়া আর ঘট পাতার কাজ সমান তালে চলল।
একদিন রাতে একটা স্বপ্ন দেখে যতটা আনন্দ পেলাম তার থেকে ভয় পেলাম বেশি! লজ্জাও কিছু কম নয়!
সেদিন ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরিই হল। দরজা খুলে দেখি, কবিতা দাঁড়ানো। আমায় দেখেই লজ্জায় মুখটা নামিয়ে নিল! ওকে ওভাবে লজ্জা পেতে দেখে আরও লজ্জা পেলাম! মনে হল, দুজনেই একটা স্বপ্নকে ভাগাভাগি করে দেখেছি!
একটা খবর কানে পৌঁছলে তবে সংবিত ফিরে পেলাম! মেসোমশাই দোতলার জানলা খুলতেই গমগম করে খবরটা বেরিয়ে এল-
“বিশেষ বিশেষ খবর পড়ছি দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়- ভারতীয় সময় ভোর ৪:৩৯ জাকার্তার সোয়েকার্নো-হাট্টা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি বিমান রানওয়ে থেকে টেক অফ করার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বিপদ সঙ্কেত পায়, পাইলট অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে বিমানটিকে অবতরণ করাতে সক্ষম হন! এর ফলে অবধারিত এয়ারক্রাশের হাত থেকে ১৩২ যাত্রী মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন!”
সিদ্ধান্ত নিতে আমি এক মুহূর্ত দেরি করলাম না!
★★★
পরদিন সকালে দোকান-বাজার সেরে এসে কবিতার সঙ্গে কথা বললাম।
“বাড়ি ফিরে যাব”- শুনেই কবিতার ছন্দপতন ঘটল!
তারপর থেকেই বিকেলে আসা বন্ধ করে দিল। যে ক’দিন ছিল সে ক’দিন কাজে না ছিল কোনও তাল, না ছিল কোনও লয়, চোখেমুখে অভিমানের ছাপ স্পষ্ট! কষ্ট আমারও হচ্ছিল, বুঝতে দিলাম না।
আমার চলে যাওয়ার খবরে প্রত্যেকের মন খারাপ। একমাত্র মেসোমশাই’ই অন্য কথা বললেন- ‘নিজের বাড়িতে ফিরে যাচ্ছ, এর থেকে আনন্দের কথা আর কী হতে পারে!’
★★★
ভোরবেলা বাড়ির সামনে ভ্যান রিকশা দাঁড়িয়ে গেল। সব মালপত্র গুছিয়ে নিয়ে আমি তৈরি হয়ে নিলাম।
একে একে সবাই এসে দাঁড়ালেন আমার স্কুটারের সামনে, পাশের ঘরের মাসিমা তো কেঁদেই ফেললেন! ওঁদের বড়ছেলে বাইরে থাকে, আমাকে পেয়ে বড়ছেলের উপস্থিতি অনুভব করতেন। কতকিছু যে খাইয়েছেন আমায়!
বিদায় জানাতে সবাই আসলেও কবিতা আসেনি, ওকে খুঁজতে খুঁজতে ওর ছোটবোন সবিতার চোখে চোখ পড়ল-
ওর অনেক প্রশ্ন; উত্তর জানা নেই, চোখ নামিয়ে নিয়ে স্কুটার স্টার্ট করলাম। আমায় এগোতে হবে, অনেক দূর!
★★★
বাড়ি ফেরার কথা কাউকেই জানতে দিইনি। মনে মনে ভেবে রেখেছি- ‘যদি দেখি, আমার ঘরটা কেউ দখল করে নিয়েছে তাহলে আরেক প্রস্ত ঝামেলা করব।’
★★★
কী আশ্চর্য, বাড়ির সামনে স্কুটার থামতেই মা দরজা খুলে বেরিয়ে এল-
“এতদিনে বাড়ির কথা মনে পল্ল! আয় তুই, অনেকদিন আমার হাতে মাইর খাইস নাই!”
আমিও পিঠটা এগিয়ে দিয়ে বললাম-
“মারো, যত খুশি মারো!”
মা-কে জড়িয়ে ধরলাম!
বাবু হাসতে হাসতে বলল-
“বিছানার চাদরটা কেমন হইসে দ্যাখ, কাইল আনসি।”
“খুব সুন্দর তো চাদরটা!”
দেখেই বোঝা যাচ্ছে, ঘরটা পরিষ্কার করে রাখা হয়েছে। দ্বিতীয়বার ঝামেলা করার সুযোগটা হাতছাড়া হয়ে গেল! আনন্দই হল!
সব দেখেশুনে বুঝতে পারলাম- আমার সহকারী ‘অজয়বাবু’ খুব নিপুণতার সঙ্গে সেতুবন্ধের কাজটি করে গেছেন!
★★★
পরদিন চেম্বারে যেতেই অজয় বলল-
“কবিতার খুব জ্বর! ছুটির পর একবার যাবেন না কি দেখতে?”
অজয়ের ওপর একটু রাগই হল, কোন সাহসে আমায় ওদের বাড়িতে যেতে বলে!
ঠান্ডা মাথায় উত্তর দিলাম-
“সিজন চেঞ্জের সময় এমনটা হয়। সেরকম হলে ভালো ডাক্তার দেখাতে বলো।
ভালো কথা – এই খামটা ওকে দিয়ে দিয়ো তো। তুমি না; মেসোমশাইয়ের হাতে দিয়ো, ওনার মুখের ওপর ‘না’ করতে পারবে না।”
“কী আছে এতে?”
“একমাসের মাইনে বেশি দিয়েছিলাম, সে বাবু এমন ভুলোমনা, না নিয়েই চলে গেল!”
অজয় আরও কিছু বলতে চেয়েছিল, উল্টে আমিই ওকে প্রশ্ন করলাম-
“সেন অ্যান্ড সনস-এর ব্যালান্সশিটটা কতদূর এগোল?”
“কিছুতেই মিলছে না।”
“কেন?”
“অ্যাসেটের তুলনায় ল্যাবিলিটি অনেক বেশি হয়ে গেছে।”
—oooXXooo—
![]()







