প্রতিবেদন: কেন বিশ্ব রাজনীতিতে বাম-উদারপন্থার অবক্ষয়, এবং কেন ‘ভারতপন্থা’ই হতে পারে নতুন বিশ্ব মডেল?
সাম্প্রতিক বিশ্ব রাজনীতিতে এক গভীর পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একসময় যে বামপন্থা বা উদারনীতি বিশ্ব জনসংখ্যার বিরাট অংশে প্রভাব বিস্তার করত, আজ তা দ্রুত কোণঠাসা। ঠিক তখনই উল্কার গতিতে উত্থান ঘটছে জাতীয়তাবাদী ও দক্ষিণপন্থী রাজনীতির। এই আদর্শগত সংঘাতের মাঝেই কি লুকিয়ে আছে প্রাচীন ভারতীয় এক অর্থনৈতিক মডেল, যা আধুনিক বিশ্বের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার এক নতুন দিশা দেখাতে পারে?
১. বিশ্বজুড়ে দক্ষিণপন্থার উত্থান – এক নতুন রাজনৈতিক ঢেউ
গত কয়েক বছরে, বিশ্বজুড়ে একাধিক শক্তিশালী দেশে জাতীয়তাবাদী বা অতি-দক্ষিণপন্থী নেতাদের উত্থান হয়েছে। এই প্রবণতা শুধুমাত্র রাজনৈতিক নয়, এটি বাম-উদারনৈতিক পন্থার প্রতি মানুষের বিশ্বাস হারানোরই প্রতিফলন।
বাম-ইসলামিক পন্থার বিতর্কিত মডেল: এতে ‘বাম-ইসলামিক পন্থার’ উত্থান নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই পন্থার মূল লক্ষ্য ছিল মুসলিম সমাজকে বিশ্বজুড়ে ‘নিপীড়িত জাতি’ হিসেবে তুলে ধরা এবং ইসলামোফোবিয়ার ধারণা ছড়িয়ে দেওয়া। এর পেছনে সৌদি আরব ও কাতারের মতো দেশগুলো পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয় ও হলিউডে বিপুল অর্থ ঢেলেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এই মডেল ইসলামিক দেশগুলোতে নারী বা সংখ্যালঘুদের অধিকারের বিষয়ে সম্পূর্ণ নীরব থেকে এক ধরনের ‘দ্বিচারিতা’ সৃষ্টি করেছে বলে সমালোচিত।
২. বামপন্থার ঐতিহাসিক ব্যর্থতা:
বামপন্থা বা কমিউনিজম (একসময় বিশ্বের প্রায় ৩৫% জনসংখ্যার ওপর রাজত্ব করত) এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। এর মূল কারণ ছিল অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার জন্য রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগ এবং অর্থনীতির উপর সম্পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দেওয়া।
মার্ক্সের সমাধান ছিল জোর করে ধনীদের থেকে সম্পদ কেড়ে নিয়ে গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া, যা সমাজে পারস্পরিক শত্রুতা তৈরি করে।
৩. বৈষম্য দূরীকরণে ‘ভারতপন্থা’ – প্রাচীন মন্দির অর্থনীতি
যেখানে ইউরোপীয় ‘ইজম’গুলো সংঘাত এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বৈষম্য দূর করতে চেয়েছে, সেখানে প্রাচীন ভারতে হাজার বছর ধরে সমাজের ভারসাম্য বজায় রেখেছিল এক সম্পূর্ণ ভিন্ন মডেল—মন্দির অর্থনীতি। এটিই হলো ‘ইন্ডিয়ানিজম’ বা ‘ভারতপন্থা’-র মূল ভিত্তি।
মন্দির অর্থনীতির মূল স্তম্ভসমূহ:
-
দান ও বিতরণ (স্বতঃস্ফূর্ত): মন্দিরগুলো ছিল সমাজের সম্পদ ও জনকল্যাণের কেন্দ্রবিন্দু। ধনী ব্যক্তিরা তাদের অতিরিক্ত সম্পদ স্বেচ্ছায় দেবতার পায়ে উৎসর্গ করত। এতে দাতার মধ্যে অহংকার বা গ্রহীতার মধ্যে সংকোচ জন্মাত না, কারণ দানটি সরাসরি মানুষে-মানুষে না হয়ে দেবতার মাধ্যমে হচ্ছিল।
-
সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান (ব্যাংক ও পাবলিক ফান্ড):
-
স্বাস্থ্য ও শিক্ষা: মন্দিরের অর্থে অভুক্তদের খাবার, স্কুল, হাসপাতাল এবং নানা জনসেবামূলক কাজকর্ম চলত। আধুনিককালেও, ভারতের ধনী মন্দিরগুলো বিপুল পরিমাণ তহবিল পরিচালনা করে হাসপাতাল চালানো এবং শিক্ষা বৃত্তি প্রদান করে চলেছে।
-
ব্যাংকিং ব্যবস্থা: মন্দিরগুলো সেই সময়ের ব্যাংক হিসেবেও কাজ করত। তারা বিভিন্ন বাণিজ্যিক উদ্যোগে পুঁজি বিনিয়োগ করত এবং সেখান থেকে লভ্যাংশ আসত। এমনকি রাজা-মহারাজারাও সেনাবাহিনী পরিচালনা বা অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনে মন্দিরের কোষাগার থেকে ঋণ নিতেন।
-
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা: দেবতাকে কেন্দ্র করে ঋণ লেনদেন হওয়ায় ঋণখেলাপির ভয় কম ছিল, যা ইউরোপের মতো ব্যাংক ডিফল্টের আশঙ্কা দূর করত।
-
-
সংঘাতহীন সমাধান: ফ্রান্সে যখন রাজকোষ খালি হওয়ায় রাজা ষোড়শ লুইকে জনগণের বিদ্রোহের মুখে প্রাণ দিতে হয় (ফরাসি বিপ্লব) [২৩:৩৪], তখন ভারতে এই মন্দির অর্থনীতিই রাজাদের পাশাপাশি সমাজের দরিদ্রতম মানুষটির পাশেও দাঁড়াতো, যা সমাজে বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে সাহায্য করেছে।
অতএব, প্রাচীন ভারতে হাজার বছরের এই ব্যবস্থাটি ক্যাপিটালিজম বা কমিউনিজমের বাইরে এক উন্নত মানবতাবাদী সমাধান দিতে সক্ষম হয়েছিল, যেখানে বৈষম্য দূর করার জন্য রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগের প্রয়োজন ছিল না।
৪. ভারতপন্থা: ‘ইজম’-এর ঊর্ধ্বে এক সংস্কৃতি
বামপন্থীরা যখন নানা ‘ইজম’ (ফেমিনিজম, পরিবেশবাদ, অ্যান্টি-রেসিজম) আমদানি করতে চাইল, ভারতপন্থা দেখাল যে এই সমস্ত উদ্দেশ্য ভারতের সংস্কৃতিতে আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত।
-
নারী অধিকার: ভারতে মহিলাদের দেবী রূপে পূজা করা হয়।
-
পরিবেশ সুরক্ষা: গাছপালা, জীবজন্তু এবং পরিবেশকেও ঠাকুর রূপে পূজা করা হয়, যা তাদের সংরক্ষণের জন্য কোনো স্লোগান বা আইন ছাড়াই মানুষকে উৎসাহিত করে।
তাই, ভারতপন্থা কোনো ইউরোপীয় আমদানিকৃত তত্ত্ব নয়, বরং হাজার বছরের পুরোনো এক জীবনদর্শন যা বৈষম্য ও সংঘাত ছাড়াই সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম। ভবিষ্যতেও, এই ‘ইন্ডিয়ানিজম’ই এক স্থিতিশীল, আধ্যাত্মিক এবং অর্থনৈতিক মডেল হিসেবে বিশ্বকে পথ দেখাতে পারে।
![]()






