নয়াদিল্লি, ০৯ নভেম্বর ২০২৫, নিউজ ব্যুরো আমার আলো: মানসিক সুস্থতা কেবল ভালো থাকা নয়, এটি হলো জীবনের সমস্যা মোকাবিলা করে পূর্ণাঙ্গ জীবন যাপনের একটি মৌলিক ভিত্তি। কিন্তু ভারতে এই মানসিক স্বাস্থ্য এখন এক ‘নীরব মহামারীর’ আকার নিয়েছে, যা ব্যক্তিগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে এক বিরাট বাধা সৃষ্টি করছে। প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলা হয়েছে, ভারত সরকার কিভাবে দৃঢ় নীতি ও ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে এই সঙ্কট মোকাবিলা করছে।
১. ভারতে মানসিক স্বাস্থ্যের ভয়াবহ চিত্র – পরিসংখ্যান কী বলছে?
বিশ্বব্যাপী মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা প্রতিবন্ধকতার অন্যতম প্রধান কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, বিশ্বজুড়ে প্রতি সাতজনের মধ্যে একজন কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভুগছেন। ভারতের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরোসায়েন্সেস (NIMHANS) দ্বারা পরিচালিত ২০১৫-১৬ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য সমীক্ষা (NMHS) অনুসারে, মানসিক রোগের ব্যাপকতা গ্রামীণ এলাকার (৬.৯%) তুলনায় শহুরে এলাকায় (১৩.৫%) প্রায় দ্বিগুণ। এছাড়া, পুরুষদের (১০%) তুলনায় মহিলাদের মধ্যে (২০%) মানসিক সমস্যার উপস্থিতি বেশি।
আত্মহত্যার হার – এক মর্মান্তিক বাস্তবতা
২০২৩ সালের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো (NCRB)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে ১,৭১,৪০১টি আত্মহত্যার ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছে। এই ক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈষম্য লক্ষ্যণীয়—মোট আত্মহত্যার ৭২.৮% পুরুষ এবং ২৭.২% মহিলা। তরুণ প্রজন্ম, বিশেষত ১৫-২৯ বছর বয়সীরা, বিষণ্ণতা এবং উদ্বেগজনিত রোগের কারণে ‘প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে অতিবাহিত বছর’ বা YLD-এর প্রধান শিকার।
২. শারীরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব – এক গভীর সঙ্কট
খারাপ মানসিক স্বাস্থ্য কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবেও বিপুল ক্ষতি করে।
- শারীরিক স্বাস্থ্য দুর্বলতা: মানসিক স্বাস্থ্য খারাপ হলে সামগ্রিক স্বাস্থ্যও খারাপ হয়। বিষণ্ণতায় ভোগা মানুষদের মধ্যে হৃদরোগের ঝুঁকি ৭২% পর্যন্ত বেড়ে যায় (‘ল্যানসেট সাইকিয়াট্রি’র গবেষণা)।
- বিরাট অর্থনৈতিক বোঝা: বিষণ্ণতা এবং উদ্বেগজনিত রোগ বিশ্ব অর্থনীতিতে বছরে প্রায় $১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি করে উৎপাদনশীলতা হারানোর কারণে। অনুমান করা হচ্ছে যে ২০৩০ সালের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার বিশ্বব্যাপী আর্থিক বোঝা $১৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।
৩. সঙ্কটকালীন অনুঘটক – কোভিড-১৯ এর প্রভাব
কোভিড-১৯ অতিমারী বিশ্বব্যাপী মানসিক স্বাস্থ্যের উপর এক গভীর প্রভাব ফেলেছে। লকডাউন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণে:
- বিশ্বব্যাপী উদ্বেগজনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ২৫% বৃদ্ধি পেয়েছিল।
- কেস স্টাডি অনুযায়ী, কোয়ারেন্টাইন এবং বিধিনিষেধের কারণে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে একাকীত্ব এবং হতাশার অনুভূতি তৈরি হয়েছিল, যা মানসিক চাপকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
৪. ভারতের সুসংহত উদ্যোগ ও আশার আলো
মানসিক স্বাস্থ্যের ক্রমবর্ধমান বোঝা মোকাবিলায় ভারত সরকার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে।
ক) নীতিগত ভিত্তি:
- জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচি (NMHP – ১৯৮২): প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সাথে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে একীভূত করা।
- জেলা মানসিক স্বাস্থ্য কর্মসূচি (DMHP – ১৯৯৬): বর্তমানে ৭৬৭টি জেলাকে অন্তর্ভুক্ত করে গোষ্ঠী-ভিত্তিক যত্ন প্রদান।
- জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ কৌশল (NSPS – ২০২২): ২০৩০ সালের মধ্যে আত্মহত্যার হার ১০% কমানোর লক্ষ্য নিয়ে স্কুল, কলেজে মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং এবং সংকটকালীন হেল্পলাইন স্থাপন।
খ) ডিজিটাল বিপ্লব: ‘টেলি মানস’ (Tele MANAS)
পেশাদারদের ঘাটতি ও চিকিৎসার ব্যবধান কমাতে সরকার টেলিমেডিসিনের ওপর জোর দিয়েছে।
টেলি মানস (Tele MANAS: Tele Mental Health Assistance and Networking Across States)
- চালু: বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস, ২০২২
- ব্যাপ্তি: ৩৬টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল।
- কার্যকারিতা: টোল-ফ্রি নম্বর (১৪৪১৬ / ১৮০০-৮৯১-৪৪০৬) এর মাধ্যমে প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর ও পেশাদারদের দ্বারা গোপনীয় সহায়তা প্রদান।
- ব্যবহার: ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত ২৮,৩৮,৩২২টি ফোনকল সামলানো হয়েছে।
- স্বীকৃতি: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) টেলি মানস-কে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে একটি ‘উদ্ভাবনী এবং কার্যকর মডেল’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
গ) আয়ুষ্মান ভারত-এর মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা
আয়ুষ্মান আরোগ্য মন্দিরগুলির মাধ্যমে প্রাথমিক পরিচর্যায় মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবাগুলিকে একীভূত করা হয়েছে।
- আর্থিক সুরক্ষা: আয়ুষ্মান ভারত প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনার মাধ্যমে, মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যাগুলির জন্য প্রতি পরিবারে বার্ষিক ৫ লক্ষ টাকার বীমার আওতায় নগদবিহীন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়। এর মধ্যে সিজোফ্রেনিয়া, অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার-সহ ২২টি পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত।
ঘ) ভবিষ্যতের পথ – অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৪-২৫
সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৪-২৫ এ মানসিক সুস্থতাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে যে ভারতের জনসংখ্যাগত লভ্যাংশ কেবল শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর নয়, যুবসমাজের মানসিক সুস্থতার উপর নির্ভরশীল। সমীক্ষার মূল সুপারিশ: বিদ্যালয়গুলিতে মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা জোরদার করা এবং কর্মক্ষেত্রের মানসিক স্বাস্থ্য নীতি বাস্তবায়ন করা।
৫. মূল বাধা: পেশাদারদের অপ্রতুলতা
যদিও উদ্যোগগুলি প্রশংসনীয়, তবে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদারদের ঘাটতি একটি বড় সমস্যা। WHO প্রতি ১ লক্ষ মানুষের জন্য কমপক্ষে তিনজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ দিলেও, ভারতে প্রতি ১ লক্ষ মানুষের জন্য মাত্র ০.৭৫ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। এই ঘাটতি পূরণের জন্য সরকার ম্যানপাওয়ার ডেভেলপমেন্ট স্কীম-এর মাধ্যমে ২৫টি ‘উৎকর্ষ কেন্দ্র’ (CoE) এবং ১৯টি স্নাতকোত্তর বিভাগের মানোন্নয়ন করছে।
এই নীরব মহামারীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে তৃণমূল স্তরে পৌঁছে দেওয়া এবং সামাজিক কলঙ্ক দূর করাই এখন ভারতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
#মানসিকস্বাস্থ্য #ভারতসরকার #টেলিম্যানাস #আত্মহত্যাপ্রতিরোধ #মানসিকসুস্থতা #স্বাস্থ্যসংকট #যুবসমাজ
#MentalHealthIndia #TeleMANAS #SuicidePrevention #IndianHealthcare #AyushmanBharat #MentalWellness #YouthMentalHealth
![]()






