যুগাচার্য শ্রীল প্রভুপাদ কৃষ্ণভাবনামৃতের বিশ্বজনীন রূপকার
সায়ন মজুমদার
শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ, যার পূর্বাশ্রমের নাম ছিল অভয়চরণ দে, তিনি ছিলেন একাধারে একজন দার্শনিক, ধর্মগুরু এবং আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন)-এর প্রতিষ্ঠাতা-আচার্যএবং এক বিরল আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন কঠোর সংকল্প, সীমাহীন ভক্তি এবং গুরুদেব কর্তৃক প্রদত্ত আদেশ পালনের এক অনবদ্য উদাহরণ। ১৮৯৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর (১৮ই ভাদ্র, ১৩০৩ বঙ্গাব্দ) তারিখে কলকাতার এক ধর্মপরায়ণ বৈষ্ণব পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর পিতা ছিলেন শ্রী গৌড় মোহন দে এবং মাতা ছিলেন শ্রীমতী রজনী দেবী। তাঁরা ছোটবেলা থেকেই তাঁকে কৃষ্ণভক্তি এবং ভগবানের সেবার আদর্শে দীক্ষিত করেছিলেন। শিশুকাল থেকেই তাঁর মধ্যে ভগবানের প্রতি এক গভীর আকর্ষণ লক্ষ করা যেত। তাঁর পিতা ঘরে কোনো বৈষ্ণব ভক্ত এলে বা পথে দর্শন পেলে, তাঁকে নিয়ে এসে প্রভুপাদকে আশীর্বাদ করতে বলতেন, যাতে সে কৃষ্ণভক্তিতে অটল থাকতে পারে। তিনি কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে ইংরেজি দর্শন ও অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন। কর্মজীবনে তিনি প্রথমে ডক্টর প্রফুল্ল চন্দ্র রায় প্রতিষ্ঠিত বেঙ্গল কেমিক্যালস অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কসে কাজ করেন। পরে তিনি একটি ছোট ওষুধের কোম্পানি স্থাপন করে নিজের সংসার চালাতেন। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিল শ্রীমতী রাধারানী দেবী, এবং তাঁদের মোট পাঁচজন সন্তান ছিল—দুই ছেলে ও দুই মেয়ে, যার মধ্যে পুত্রের নাম বৃন্দাবন চন্দ্র দে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তাঁর জীবনে মোড় আসে ১৯২২ সালে, যখন তিনি তাঁর গুরুদেব শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের সাথে কলকাতায় সাক্ষাৎ করেন। এরপর ১৯৩৩ সালে দীক্ষা গ্রহণের পর, তাঁর গুরুদেব তাঁকে নির্দেশ দেন যে, যেহেতু তিনি একজন শিক্ষিত ব্যক্তি, তাই তিনি যেন বৈষ্ণব প্রচারের জন্য বিদেশে যান। গুরুদেবের সেই আদেশ পালনের সংকল্প নিয়েই তিনি দীর্ঘকাল প্রস্তুতি নেন। অবশেষে, গুরুদেবের আদেশ মাথায় নিয়ে ৬৯ বছর বয়সে তিনি কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচারের জন্য যাত্রা শুরু করেন। ১৯৬৫ সালের ১৩ই আগস্ট, তিনি কলকাতার কিদারপুর বন্দর থেকে ‘এমডি জলদূত’ নামক একটি মালবাহী জাহাজে চড়ে আমেরিকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। এই সময় তাঁর সম্বল ছিল ভারতীয় ৪০ টাকা মাত্র (যা বিদেশে প্রায় ৭ ডলারের সমান), একটি ছোট ব্যাগ, কিছু বই এবং শ্রীমদ্ভাগবতের কিছু খণ্ড, সঙ্গে নিয়েছিলেন শ্রী শ্রী রাধা মাধবের বিগ্রহ। দীর্ঘ এবং বিপদসঙ্কুল এই সমুদ্রযাত্রায় তিনি দুবার হৃদরোগে আক্রান্ত হন এবং সমুদ্রের প্রবল ঝড়ের সম্মুখীন হন। তবুও তিনি অবিচল ছিলেন; কৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা করে বলেছিলেন, “হে কৃষ্ণ, তুমি আমাকে এই সেবার জন্য পাঠিয়েছো, আমি তোমার যন্ত্র মাত্র।” তিনি বিশ্বাস করতেন, তাঁর কৃষ্ণই তাঁকে রক্ষা করেছেন এবং সুরক্ষা দিয়েছেন। অবশেষে, ১৯৬৫ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর, তিনি আমেরিকার বোস্টন বন্দরে পৌঁছান।
আমেরিকায় পৌঁছানোর পর, অক্লান্ত পরিশ্রম ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে, শ্রীল প্রভুপাদ ১৯৬৬ সালের ১৩ই জুলাই (মতান্তরে ১৬ই জুলাই) নিউইয়র্ক সিটিতে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) প্রতিষ্ঠা করেন; তখন তাঁর বয়স ছিল ৭০ বছর। ইসকন প্রতিষ্ঠার আগে তিনি সেখানকার হিপ্পি নামক এক সমাজের কাছে কৃষ্ণভাবনামৃতের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এই সমাজটি সে সময় সমাজের চোখে একপ্রকার ‘অসামাজিক ও হিংস্র’ বলে পরিচিত ছিল, যারা চুরি ও অন্যান্য খারাপ কাজ করত। প্রভুপাদ রোজ একটি গাড়ি করে এসে তাদের মহাপ্রসাদ খাওয়াতেন। প্রথমদিকে তাঁর কিছু জিনিসপত্র চুরি হলেও তিনি হাল ছাড়েননি। নিউইয়র্কের একটি পার্কে বসে তিনি যখন হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন করতেন, তখন অনেকে এসে সেই কীর্তন শুনে নাচানাচি শুরু করে দিত। এভাবেই ধীরে ধীরে সবার মধ্যে কৃষ্ণভক্তির প্রতি আনন্দ জন্ম নেয় এবং তারা বৈষ্ণবে পরিণত হতে শুরু করে। একদিন তিনি প্রসাদ দিতে না আসায় হিপ্পিরা যখন তাঁর খোঁজ করে, তখন তিনি তাদের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় (মন্দিরে) এসে সর্বদা প্রসাদ পাওয়ার আহ্বান জানান। এভাবেই তিনি তাদের হিংস্র জীবনধারাকে বৈষ্ণব জীবনধারায় পরিবর্তিত করে দেন। তাঁর প্রচারকালে তিনি শত শত মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১০০-২০০ জনেরও বেশি শিষ্যকে দীক্ষা দেন। তিনি তাঁর শিষ্যদের মধ্যে ১১ জনকে দীক্ষাগুরু হিসেবে মনোনীত করে যান, যাঁদের মধ্যে শ্রীল জয় পতাকা স্বামী গুরু মহারাজ, শ্রীল লোকনাথ স্বামী গুরুদেব, শ্রীল রাধানাথ স্বামী, শ্রীল ভক্তিবেদান্ত মাধব স্বামী প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
যখন তাঁর গোলকধামে প্রস্থানের সময় আসে, তার চার দিন আগেই তিনি বুঝতে পারেন যে তাঁর সময় ফুরিয়ে এসেছে। তাই তিনি তাঁর শিষ্যদের নির্দেশ দেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাঁকে যেন বৃন্দাবন নিয়ে যাওয়া হয়। অবশেষে, ১৯৭৭ সালের ১৪ নভেম্বর শ্রীধাম বৃন্দাবনে ইসকন কৃষ্ণ বলরাম মন্দিরে তিনি দেহত্যাগ করেন এবং সেখানেই তাঁর সমাধি মন্দির স্থাপিত হয়। এছাড়াও মায়াপুরে তাঁর পুষ্প সমাধি মন্দির রয়েছে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত, এমনকি তাঁর বার্ধক্য বয়সেও, তিনি তাঁর গুরুদেবের আদেশ পালনে অবিচল ছিলেন এবং কৃষ্ণভাবনামৃতকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর এই জীবন উৎসর্গের জন্যই ভক্তরা আজও তাঁকে প্রণাম করেন এই মন্ত্রে: “ওঁ অজ্ঞান-তিমিরান্ধস্য জ্ঞানাজ্ঞন-শলাকয়া। চক্ষুর্মীলিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।।” “নম ওঁ বিষ্ণুপাদায় কৃষ্ণপ্রেষ্ঠায় ভূতলে। শ্রীমতে ভক্তিবেদান্ত-স্বামিন্ ইতি নামিনে।।” “নমস্তে সারস্বতী দেবে গৌরবাণী-প্রচারিণে। নির্বিশেষ-শূন্যবাদী-পাশ্চাত্য-দেশ-তারিণে।।” তাঁর অবদানকে স্মরণ করে ভক্তরা বলেন: “যদি প্রভুপাদ না হইতো, তবে কি হইত, এ জীবন বহিত কিসে?”
শ্রীল প্রভুপাদ কেবল একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তৈরি করেননি, তিনি পশ্চিমে এক আধ্যাত্মিক জাগরণ ঘটিয়েছিলেন, যা আজও কোটি কোটি মানুষের জীবনে শান্তি ও আনন্দ নিয়ে আসছে।
—oooXXooo—
![]()







