সংবাদ প্রতিবেদন, ২৯ শে অক্টোবর, নিউজ ব্যুরো আমার আলো, রঞ্জিত চক্রবর্ত্তী: উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ—এই নামের সঙ্গে হয়তো অনেকেই পরিচিত, কিন্তু এই এলাকার এক অসামান্য মানুষ শ্রী প্রকাশ বিশ্বাস-এর নীরব সংগ্রাম ও প্রকৃতি প্রেমের কথা হয়তো অনেকেরই অজানা। যিনি একই অঙ্গে ধারণ করেছেন বহু পরিচয়: তিনি একটি সরকারি স্কুলের শিক্ষক, নিপুণ চিত্রশিল্পী, ভাবুক কবি, গায়ক—কিন্তু এই সব পরিচয়কে ছাপিয়ে তাঁর প্রধানতম পরিচয়: এক নিবেদিতপ্রাণ ‘বৃক্ষপ্রেমিক’। তাঁর এই সবুজ-সাধনা আজ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে অনুপ্রেরণার এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
একটি ব্রত – দশ হাজার গাছের অঙ্গীকার
শ্রী প্রকাশ বিশ্বাস শুধু নিজের এলাকায় প্রচুর গাছ লাগিয়ে ক্ষান্ত হননি, তাঁর সবুজ স্বপ্নের পরিধি বিস্তৃত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়িয়ে সুদূর ভিন রাজ্যে। অবাক হবেন শুনে, তিনি তাঁর এলাকা থেকে গাছগুলি সযত্নে বয়ে নিয়ে যান এবং ঝাড়খণ্ড, অসম, ছত্তিশগড় ও মধ্যপ্রদেশের মতো বিভিন্ন রাজ্যের মাটিতে সেগুলি রোপণ করে এসেছেন। এ যেন সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসার মতো, যেখানে নিজের হাতে লালন করা চারাগাছটিকে তিনি দেশের অন্য প্রান্তে প্রতিষ্ঠা করছেন একটি উন্নত ভবিষ্যতের জন্য।
তিনি একা নন, ‘সবুজ মন’ (Sabuj Man) নামের একটি সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে ১৯৯৬ সাল থেকে নিয়েছেন এক মহান ব্রত—১০,০০০ গাছ লাগানোর সঙ্কল্প!
‘প্রত্যেকটি শিশুকে একটি করে গাছের দায়িত্ব দিন’—তাঁর যুগান্তকারী মন্ত্র
গাছ লাগানো শুধুমাত্র একটি কাজ নয়, প্রকাশবাবু মনে করেন এটি একটি মানসিক ও আধ্যাত্মিক সংযোগের মাধ্যম। আর সেই কারণেই তাঁর পরিবেশ বাঁচানোর সবচেয়ে শক্তিশালী কৌশলটি হল: শিক্ষা এবং আবেগ দিয়ে সচেতনতা তৈরি করা।
তাঁর মতে, পরিবেশ দূষণ রোধ করতে হলে আইন বা প্রচারের চেয়েও বেশি প্রয়োজন আত্মার সংযোগ। তাই তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন:
“স্কুল কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের সহায়তায় প্রত্যেকটি শিশুকে একটি করে গাছের দায়িত্ব দিতে হবে। যাতে সেই গাছের প্রাণের সঙ্গে শিশুটি একাত্ম হতে পারে। যার ফলে শিশুটির মনে গাছ সম্পর্কে আবেগ তৈরি হয়, এই বন্ধনের ফলেই শিশুটি বড় হয়ে পরিবেশ সম্পর্কে আরও সচেতন হতে পারে এবং বৈশ্বিক পরিবেশ দূষণ রোধ করতে পারে।”
এই দর্শন সত্যিই ব্যতিক্রমী। যখন একটি শিশু একটি চারাগাছের বেড়ে ওঠা দেখবে, জল দেবে, তার পরিবর্তন অনুভব করবে—তখন সেই গাছের মৃত্যু তার কাছে কেবল একটি গাছের মৃত্যু থাকবে না, একটি প্রাণের ক্ষতি বলে মনে হবে। এই গভীর সংবেদনশীলতাই আগামীর প্রজন্মকে আরও বেশি পরিবেশবান্ধব করে তুলবে।
আমাদের প্রতি তাঁর বার্তা
প্রকাশ বিশ্বাস মহাশয় একজন স্কুল শিক্ষক হলেও, তিনি আজ আমাদের সকলের শিক্ষক। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে পেশা বা প্রতিভা যা-ই হোক না কেন, পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সকলের।
তিনি বিশ্বাস করেন—“প্রতিটি গাছই ভবিষ্যতের নিঃশ্বাস।”
বনগাঁর এই মানুষটি তাঁর ব্রত পূরণে আজও অক্লান্তভাবে হেঁটে চলেছেন। তাঁর এই অসামান্য কাজ শুধু এক শিক্ষক বা শিল্পীর ব্যক্তিগত উদ্যোগ নয়, এ হল এক সবুজ বিপ্লবের বার্তা যা আমাদের দেশের প্রতিটি নাগরিকের কানে পৌঁছানো উচিত।
আসুন, আমরাও শ্রী প্রকাশ বিশ্বাস মহাশয়ের এই ‘সবুজ সঙ্কল্প’-এ অনুপ্রাণিত হই এবং প্রতি বছর অন্তত একটি করে গাছ লাগানোর ও বাঁচানোর দায়িত্ব গ্রহণ করি।
![]()






