সমীকরণ
চিত্রশিল্পী তপন কর্মকার
গ্রামের গলিপথে পাশাপাশি বড় হলো দুই বন্ধু—অরুণ আর জয়। দুজনের হাতে সমান সুযোগ, সমান অঙ্কের টাকা আসত বারবার, কিন্তু ব্যবহার ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানেই গড়ে উঠেছিল জীবনের অদৃশ্য সমীকরণ।
একদিন মেলায় ফেরার পথে অরুণের হাতে পড়ল এক টাকা। রাস্তার ধারে বসে থাকা ভিখারিকে সে সেটা দিয়ে দিল। চারপাশের লোক বলল, “বাহ, ছেলেটা দয়ালু।” অরুণ বুক ফুলিয়ে হাঁটল।
কিন্তু জয় সেই একই অঙ্ক দিয়ে কিনল সুতো। মায়ের শাড়ি ছিঁড়ে গিয়েছিল—সে তা সেলাই করল। জয় জানত, দান দেখিয়ে নয়, সংসারের টান সামলানোতেই আছে আসল দায়িত্ব।
কিছুদিন পর অরুণের হাতে এল পাঁচ টাকা। গলির মোড়ে রঙিন ঘুড়ি দেখে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। কিনল ঘুড়ি, ছাদে উঠে উড়াল দিল। সুতো কাটতেই ঘুড়ি মিলিয়ে গেল আকাশে। আনন্দটা উড়ে গেল মুহূর্তেই।
অন্যদিকে জয় সেই টাকায় কিনল বটবৃক্ষের দানা। এক বৃদ্ধ বিক্রেতা বলল—“আজ যদি মাটিতে পুঁতে দাও, কাল হয়তো ছায়া পাবে না, কিন্তু তোমার পরের প্রজন্ম আশ্রয় পাবে।” জয় উঠোনে দাঁড়িয়ে দানা পুঁতল। তার মনে হলো—এ পাঁচ টাকা মাটির বুকেই লিখে দিল চিরস্থায়ী সমীকরণ।
এরপর এক সকালে আয়নায় নিজের মুখ দেখে অরুণের মনে হলো—“চেহারা পাল্টানো দরকার।” দশ টাকা নিয়ে গেল নাপিতের দোকানে। মাথায় কাঁচি চালল, দাড়ি সাফ হলো, ঘাড়ে সুগন্ধি ছিটল। আয়নায় ঝকঝকে চেহারা দেখে সে খুশি।
কিন্তু জয় সেই দশ টাকা দিয়ে ভাড়া নিল সাইকেল। ধুলো মাখা পথ ধরে সে পৌঁছোল অচেনা গ্রামে। নদীর ঘাট, কৃষকের ক্ষেত, গাছের ছায়া—সবকিছু তার চোখে নতুন রঙের ছবি হয়ে উঠল। দশ টাকা তাকে দিল অভিজ্ঞতার নতুন আলো।
সময় গেল, অরুণের জন্মদিন এলো। একশ টাকা হাতে নিয়ে সে ছুটল মিষ্টিওয়ালার দোকানে। রসগোল্লা, লাড্ডু, সন্দেশ—সব কিনে আনল। সন্ধ্যায় বন্ধুরা ভিড় করল, হাসি-ঠাট্টা আর হইচইয়ে ভরে গেল আঙিনা। মিষ্টি শেষ হলো, অতিথি চলে গেল, রাত নামতেই ফুরোল খুশির জোয়ার।
অন্যদিকে জয় সেই একশ টাকা দিয়ে কিনল ক্যানভাস আর রং। প্রদীপের আলোয় সে আঁকল মায়ের মুখ, আঁকল গ্রামের পথ, আঁকল স্বপ্ন। অরুণের একশ টাকা মিলিয়ে গেল মিষ্টির স্বাদে, জয়ের একশ টাকা জন্ম দিল এক সৃষ্টির।
কিছুদিন পর হাতে এল হাজার টাকা। অরুণ বন্ধুদের নিয়ে গেল গ্রামের এক বড় পুকুরে। টিকিট কেটে ঢুকল, ছিপ ফেলা হলো জলে। মাছ ধরা, হাসি-আড্ডা, ভোজ—একদিন কাটল আনন্দে। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হলো টাকার আনন্দ।
অন্যদিকে জয় সেই একই অঙ্ক দিয়ে শুরু করল ছোট্ট ব্যবসা। বাঁশের তাকে সাজাল খাতা, কলম, বই। প্রথমদিন এক বাচ্চা খাতা কিনল, পরদিন এল শিক্ষক। ধীরে ধীরে দোকান জমে উঠল। হাজার টাকা থেকে গড়ে উঠল আলোর ভাণ্ডার।
তারপর এলো জীবনের বড় অধ্যায়। ভাগ্যক্রমে অরুণের হাতে এলো এক লক্ষ টাকা। বন্ধুদের প্রলোভনে সে ঢুকে পড়ল শর্টকাট ব্যবসায়। অল্পদিনেই লাভ হলো, আবার খবর পৌঁছোল পুলিশের কাছে। এক রাতেই হাতকড়া পরল অরুণ, গ্রামের লোকজন হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
জয়ও পেল এক লক্ষ টাকা। সে ভাবল, “এই টাকায় যদি একটি গ্রন্থাগার গড়ি, তবে শুধু আমিই নয়, পুরো প্রজন্ম আলোকিত হবে।” ভাঙাচোরা ঘর মেরামত হলো, তাক সাজল নতুন বইয়ে। বাচ্চারা পড়তে এলো, কৃষকরা কৃষিবিষয়ক বই দেখতে লাগল, মেয়েরা শিখল অক্ষর চিনতে। গ্রামের বৃদ্ধ শিক্ষক একদিন এসে বললেন—“জয়, তুই যা করেছিস, তা আমাদের নাম বাঁচাবে চিরদিন।”
অরুণের এক লক্ষ টাকা তাকে বন্দি করল অন্ধকার ঘরে।
জয়ের এক লক্ষ টাকা তাকে অমর করল মানুষের মনে। একই সময়ে জন্ম, একই সুযোগ, একই অঙ্কের টাকা—
তবু দুটো জীবন একে অপরের বিপরীত সমীকরণ।
অরুণের পথ ভোগে শেষ হলো,
আর জয়ের পথ সৃষ্টির আলোয় ছড়িয়ে গেল।
—oooXXooo—
![]()







