চাঁদনী রাতের বাঁশিওয়ালা
-সুবর্ণ রুদ্র
ফুলবাগান বললে লোকে এককালে ফুল খুঁজে দেখত, এখন খুঁজে দেখে আবর্জনা। পুরোনো ইঁট, পলেস্তারা খসা দেওয়াল, আর এঁদো গলির গ্যাসলাইট—এই নিয়ে বস্তি। কিন্তু বস্তি তো শুধু ইঁট-পাথরের জট নয়, সে হলো মানুষের পেটের মধ্যেকার খিদে আর বুকের মধ্যেকার ভালোবাসা, দুটোই সেখানে সমান জোরে চিল্লায়। আর এই বস্তির একেবারে মাঝখানে, এক ভাঙা কুঁড়েঘরের তলায় থাকত মনোজ।
মনোজ—সে আর কি! বস্তির লোকেরা তাকে ডাকত ‘বাঁশি’, কারণ একটা বাঁশিই ছিল তার একমাত্র সম্পত্তি। ফুটপাতে বসে সে বাঁশি বাজাত, আর তার বাঁশিতে এমন একটা মন-কেমন করা সুর থাকত যে রিকশাওয়ালার প্যাডেল থেমে যেত, বড়লোকের গাড়ির জানালা গলে ভেসে আসত দীর্ঘশ্বাস। বাঁশিটা যেন মনোজের মনের কথা বলত—যা সে মুখে বলতে পারত না, কারণ “জিভ কখনো পিছলে যায় না, মনের মধ্যে যা জমা থাকে তাই সব সময় জিভে নিজে থেকেই চলে আসে” — আর মনোজের মনে ছিল রাশি রাশি অব্যক্ত প্রেম।
বস্তির জীবনটা মনোজের কাছে ছিল একটা হাজার ফুটো বাঁশির মতো। অভাব, দারিদ্র্য, অসুস্থতা—এসব ফুটোই তো। তবু মনোজের বিশ্বাস, “জীবন একটা বাঁশির মত যতই ছিদ্র থাকুক না কেন, যে তাকে বাজাতে জানে সে বাজাবে, কখনো ব্যার্থ হবে না।” মনোজ সেই বাঁশি বাজাতে জানত। সে বাঁশি বাজাত তার প্রেমিকার জন্য—ফুলি।
ফুলি। বস্তির এক ঝলমলে জোনাকি। নামটা যেমন, মেয়েটিও ঠিক তেমনি। সারা দিনে বাসন মাজে, কাপড় কাচে, আর রাতের বেলায় চাঁদনী রাতে চুল আঁচড়াতে বসে। ফুলির হাসিটা যেন বস্তির অন্ধকারকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পারত। মনোজের বাঁশির সুর ফুলির কানে গেলেই ফুলি বুঝতে পারত, “বাঁশিওয়ালা” তাকে ডাকছে।
মনোজ আর ফুলির প্রেমটা ছিল বস্তির খোলা নর্দমার ধারের লতানো মাধবীলতার মতো। কেউ দেখত না, পাত্তা দিত না, শুধু তারা দু’জনই জানত, সেখানে কি নিবিড় সুবাস! রাতে যখন বস্তির ঝগড়া, মাতলামি, আর কান্নার শব্দ একটু নরম হতো, তখন মনোজ বাঁশি বাজাত। সে সুরে ছিল তাদের জীবনের সমস্ত বাস্তবতা—পেটের কষ্ট, অভাবের টানাপোড়েন, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল এক গভীর বিশ্বাস।
একদিন সকালে, মনোজের বাঁশি আর ফুলির কলসি ভাঙা হাসির মধ্যে ঢুকে পড়ল এক নতুন সমস্যা। বস্তিতে হানা দিল পুরসভার লোক। বস্তি ভাঙা হবে। সেখানে হবে ঝাঁ-চকচকে ফ্ল্যাট।
“এ্যাই, সর্ সর্! নোটিশ দেখেছিস? কাল থেকে ভাঙা শুরু হবে,” মেয়রের চামচা, যাকে বস্তির লোকে “প্যান্টু” বলে ডাকত (কারণ সে সব সময় একটা টকটকে লাল প্যান্ট পরে থাকত), এসে হাঁক পাড়ল।
সবাই যেন আকাশ থেকে পড়ল। বুড়ো ভিখারি গফুর মিঞা তার একমাত্র কম্বলটা জড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। আর বাঁশিওয়ালা মনোজের হাত থেকে বাঁশিটা টুপ করে পড়ে গেল।
ফুলি দৌড়ে এলো। “কি হবে গো?” ভয়ার্ত কণ্ঠে সে মনোজকে জিজ্ঞেস করল।
মনোজ বাঁশিটা তুলে, তাতে ধুলো ঝেড়ে, বাঁকা হেসে বলল, “কি হবে আবার! ‘মানুষ সুখের সন্ধানে তার কর্মফল ভুলে যায়, কিন্তু সে জানে না প্রতিটি সুখের শেষ তার কর্ম দিয়েই শুরু হয়।’ প্যান্টু বাবুর সুখের শুরুটা তো আমাদের বস্তি ভাঙা দিয়ে। দেখা যাক শেষটা কি দিয়ে হয়!” মনোজের এই রসিকতা বস্তির মানুষকে একটু সাহস দিল।
বস্তির সমস্যাগুলো চিরকালই এক ধাঁচের। বস্তি মানেই সেখানে জল-আলো-হাওয়া নেই। স্বাস্থ্য বলে কিছু নেই। ফুলির ছোট ভাইটা হামে মরে গেল, কারণ ওষুধ জোটেনি। শিক্ষা—সে তো স্বপ্ন। বাচ্চারা বস্তির মাঠে নোংরা ঘাঁটে, আর বড়রা খাট-খাট খাটতেই থাকে, তবুও পেট ভরে না। কিন্তু এর মাঝেই বস্তির মানুষ অদ্ভুত এক সামাজিক বন্ধনে বাঁধা। কারও ঘরে ভাত ফুটলে, পাশের ঘরেও তার গন্ধ যায়। কারও বিপদ হলে, সবাই এসে দাঁড়ায়। এইটাই তাদের সমাজের আসল শক্তি।
কিন্তু এখন বিপদটা সবার। উচ্ছেদ।
ফুলি বলল, “চলো, আমরা গিয়ে ওদের পায়ে ধরি।”
“আহ্, ন্যাকা কোথাকার! পায়ে ধরলে কি কেউ জমি ছাড়ে? জমি ছাড়লে পেট চলে না। আমরা তো জমি ছাড়ব না,” মনোজের স্বরে দৃঢ়তা। “আমাদেরও একটা সমাজ আছে, ফুলি। আর সেই সমাজের সমস্যা আমাদেরই মেটাতে হবে। আমরা ওদের কাছে ভিক্ষা চাইব না, আমরা বাঁচতে চাইব।”
রাতে মনোজ বাঁশি বাজাল না। তার বদলে সে বস্তির সব যুবক-যুবতীদের জড়ো করল। চাটাই পেতে বৈঠক বসল। সবার চোখে মুখে চিন্তা, ভয়।
মনোজ বলল, “দেখ, আমরা তো ভুল করি। ভুল না করলে তো জীবনে শেখা যায় না। ‘আমার সফলতা এই যে আমি আমার করা ভুল থেকে শিক্ষা নিয় বড় হয়েছি।’ আমরা বারবার ভুল করেছি। নিজেদের ছোট মনে করেছি। এইবার ভুলটা শুধরে নেব। আমরা লড়ব। কিন্তু মারামারি করে নয়। বাঁশির সুর দিয়ে।”
পরের দিন ভোরবেলা। পুরসভার বুলডোজার এলো। প্যান্টু বাবাজি তার লাল প্যান্টের উপর সাদা পাঞ্জাবি চাপিয়ে হম্বিতম্বি করতে করতে এলেন। পুলিশও তৈরি।
কিন্তু বস্তির মানুষজন এবার আর কান্নাকাটি করল না। তারা একটা অদ্ভুত কাজ করল। মহিলারা সব মিলে শাড়ি দিয়ে বস্তির চারপাশ ঘিরে ফেলল, যেন তারা এক বিরাট দুর্গ। আর পুরুষেরা সবাই হাতে তাদের পেশার সরঞ্জাম নিল—রিকশাওয়ালার প্যাডেল, মুচির কাঁচি, রাজমিস্ত্রির গাঁইতি। মনোজ দাঁড়াল মাঝখানে, হাতে তার বাঁশি।
“কি হচ্ছে এটা?” প্যান্টু চেঁচিয়ে উঠল।
মনোজ বাঁশি বাজানো শুরু করল। সে সুরটা অন্যরকম। প্রতিবাদ নয়, করুণা নয়, এ যেন এক আত্মবিশ্বাস আর জীবনের প্রতি অপার ভালোবাসার সুর। সে সুরে ছিল ফুলির হাসি, গফুর মিঞার কম্বলের উষ্ণতা, আর বাচ্চাদের নোংরা ঘাঁটা আনন্দ।
প্রথমটায় পুলিশ আর প্যান্টু বিরক্ত হল। কিন্তু সুর যত গভীরে যেতে লাগল, ততই যেন একটা ম্যাজিক হলো। পুলিশের কানের কাছে মনোজের বাঁশির সুর পৌঁছল, আর তাদের মনে পড়ল তাদের গ্রামের কথা, তাদের মায়ের হাসি। বুলডোজারের ড্রাইভারের হাত স্টিয়ারিং থেকে নেমে গেল।
প্যান্টু দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “এ্যাই, বন্ধ কর্ ওই ফালতু বাজনা!”
কিন্তু কেউই তার কথা শুনল না। বস্তির মানুষ এবার গান ধরল। জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার গান। লোকগান। সেই গানের কথাগুলো সহজ—মাটির কথা, ভালোবাসার কথা। এই গান, এই সুর, এই মানবিক আবেগ—এটাই ছিল বস্তিবাসীর শেষ অস্ত্র।
মনোজের বাঁশি আর বস্তির মানুষের ঐক্য দেখে প্যান্টু বুঝল, জোর করে এ বস্তি ভাঙা যাবে না। এদের আত্মবিশ্বাস ভাঙা কঠিন।
সেদিন বুলডোজার ফিরে গেল। প্যান্টু যাওয়ার আগে মনোজকে শাসিয়ে গেল, “তোদের দেখব। কতদিন বাঁচিস!”
মনোজ হাসল। “বেঁচে থাকাটা তো আমাদের কাছে একটা আর্ট, প্যান্টু বাবু। যতদিন বাঁশি বাজাতে জানি, ততদিন হারব না।”
সেদিন রাতে, মনোজ আর ফুলি কুঁড়েঘরের চালে বসেছিল। আকাশে চাঁদ, ফুটফুটে জ্যোৎস্না।
“বাঁশি,” ফুলি ফিসফিস করে বলল, “তুমি আজ আমাদের বাঁচালে।”
মনোজ বাঁশিটা হাতে নিল। “আমি বাঁচাইনি, ফুলি। বাঁচিয়েছে আমাদের ভেতরের জোর, আর এই বাঁশি—যার এত ফুটো, তবুও যে বাজতে পারে। আমাদের জীবনও তাই। যত সমস্যা আসুক, আমরা তো জানি কেমন করে বাঁচতে হয়, ভালোবাসা দিতে হয়।”
ফুলি মনোজের কাঁধে মাথা রাখল। ফুটপাতের বাঁশিওয়ালা আর চাঁদনী রাতে বস্তির এক কোণে—তাদের ভালোবাসা আরও গভীর হলো। তারা জানত, সমস্যা আবার আসবে, কিন্তু জীবন তো একটা নদীর মতো। পথ খুঁজতে খুঁজতে ঠিকই সে সমুদ্রে পৌঁছাবে। আর তাদের প্রেম? সে তো ফুটপাথের হাজারো কষ্টের মাঝে এক চিলতে সুখ, যা তাদের কর্মফলকে ভুলিয়ে দেয় না, বরং আরও কর্মঠ করে তোলে।
শেষ
![]()







