সেরা পুজো
বাসুদেব চন্দ
মা-বাবা সারা জীবন আমাদের জন্য কষ্টই করে গেল। মা এখনও আমাদের সঙ্গে আছে, টুক টুক করে বেঁচে আছে, ভালো আছে। বাবু’টাই শান্তির মুখ দেখার আগে রোগে ভুগে চলে গেল!
বাবাকে আমরা “বাবু” বলতাম।
তখন তারাপদ কাকুর বাড়িতে ভাড়া থাকি। বিধানপল্লী পদ্মপুকুরের সামনে। বাবা তখন একটা প্রাইভেট ফার্মে কাজ করে।
আমরা পাঁচ ভাইবোন। আমাদের কাছে তখন কষ্টটা আলাদা কোনও ব্যাপার ছিল না। কারণ ছোটবেলা থেকেই বিশেষ কিছু চাহিদা না-থাকায় ‘আর্থিক অনটন’ও আমাদের গায়ে গায়ে বেড়ে উঠেছে। সেই হিসেবে আমরা ছ’ভাইবোন।
অনটনের লিঙ্গ জানা নেই, তাই ও আমাদের ভাই না কি বোন, সেটা বলতে পারব না। তবে ও যে আপনজন তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
একবার ওই ‘আর্থিক-অনটন’কে আমরা ভাইবোন মিলে আচ্ছা মতো জব্দ করেছিলাম!
সেবার পুজোয় পঞ্চমীর দিন পর্যন্ত আমাদের কারো কোনও জামা-কাপড় হয়নি। সেদিন বাবুর অফিস থেকে ফিরতে দেরি হচ্ছে দেখে দিদি মা-কে জিজ্ঞেস করল-
-মা, বাবু এখনও আইতে আসে না ক্যান, এতক্ষণে তো চইল্লা আসে!
-আইজ একটু দেরি হইবে , বোনাস পাওয়ার কতা, তাই তো কইয়া গেল!
বোনাসের কথা শুনে আমরা আনন্দে গদগদ হয়ে বইখাতা নিয়ে পড়তে বসলাম।
“বাবু এসে আমাদের পড়তে দেখলে খুশি হবে”- এই ভেবে।
আসলে পুজোতে কে কী নেব- সেই লিস্ট করতে শুরু করলাম!
শত চেষ্টা করেও আমরা দু’ভাই আমাদের লিস্টটা বাড়াতে পারলাম না, হাফ প্যান্ট টেনে টেনে আর কত বাড়ান যায়!
ওদিকে শত চেষ্টা করেও মেজবোন আর ছোটোবোন কিছুতেই লিস্ট কমাতে পারছে না।
লিস্টের তোড়জোড় দেখে দিদি বলল-
“আমার কিছু লাগবে না, বাবু যা দেবে তাতেই হইবে।”
সব দিদিগুলোই এরকম হয়! বোকা!
কিন্তু বাবুর আসতে দেরি হচ্ছে দেখে আমরা সবাই ভয় পেতে শুরু করলাম। যত দেরি হচ্ছে আমাদের লিস্ট তত ছোট হচ্ছে!
আমি আর ভাই শুধু জামাতেই থেকে গেলাম।
বোনরাও যতটা সম্ভব কাটছাঁট শুরু করে দিল!
রাত যখন এগারোটা তখন আমাদের চোখমুখ পাল্টে গেল!
মা উঠোনে পায়চারি করছে আর ঠাকুরের নাম জপ করছে!
আমরাও তখন লিস্ট ফেলে দিয়ে বাবুর জন্য অপেক্ষা করছি!
আমাদের মাঝখানে বসে হ্যারিকেনটা টিম টিম জ্বলে আমাদের সঙ্গ দিচ্ছে!
হঠাৎ ছোট ভাইটা কেঁদে উঠল! দিদি ওকে কোলে নিয়ে মায়ের কাছে গেল!
মিনিট পনেরো-কুড়ি পরে বাবু ঢুকল। মাথা নীচু করে!
মা আর বাবুতে কী যেন কথা হল-
বুঝলাম- বোনাস হয়নি!
***
পরদিন সকালে মা ঘর ঝাঁট দিতে দিতে আমাদের পুজোর লিস্টগুলো কুড়িয়ে পেল।
তাতে লেখা ছিল “মা দুগ্গা, আমাগো জামা-কাপড় লাগবে না, শুধু বাবুরে পাঠাইয়া দাও”!
***
আমাদের সেই “বাবু” এবং সেই পুজো এতটাই সেরা ছিল যে আজকের সেরা থিম পুজোগুলোও তার কাছে হার মানে!
—oooXXooo—
![]()







